দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম রাজধানী আগ্রা



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
সুরম্য মুঘল নগরী আগ্রা, ছবি: সংগৃহীত

সুরম্য মুঘল নগরী আগ্রা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আগ্রার দুর্গ থেকে বের হলাম পড়ন্ত বেলায়। অতীতের উজ্জ্বলতায় ঝলমল আগ্রা শহরের কথায় ইতিহাসের নানা বিষয় মনে পড়ে। যদিও বিশাল ভারতবর্ষের কথা আসলেই চলে আসে দিল্লির নাম, তথাপি দিল্লি নয়, অধিকাংশ সময় আগ্রা ছিল ভারতের রাজধানী।

মধ্যযুগের ভারতবর্ষের রাজধানী হিসাবে যেসব শহরের নাম জানা যায়, তার মধ্যে আগ্রা ছিল সুদীর্ঘকাল। দক্ষিণ এশিয়ার আগ্রা ছাড়া অন্য কোনও শহর এতো অধিক বছর রাজধানীর মর্যাদা পায় নি।

মুসলিমরা ভারত জয় করে রাজধানী গড়েন দিল্লিতে। দিল্লির প্রতিষ্ঠাতা ধরা মুহাম্মদ ঘোরীকে। দিল্লি সালতানাতের শাসনকালেরই এক পর্যায়ে আগ্রায় রাজধানী স্থাপন করা হয়, যেখানে কয়েক শত বছর আগে গজনীর সুলতান মাহমুদ দুর্গ গড়েছিলেন। আগ্রা থেকে উত্তর, মধ্য, পশ্চিম ভারত শাসন ছিল সহজতর। এবং পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে গমনের পথও ছিল সুগম। ফলে আগ্রা রাজধানী ও কেন্দ্রীয় শহরের মর্যাদা পায় ভারত শাসনকারীদের কাছে।

মুঘলরা বরাবরই ছিলেন আগ্রা কেন্দ্রীক। উপমহাদেশের নানা স্থানে নানা স্থাপনা, দুর্গ, প্রাসাদ নির্মাণ করলেও মুঘলদের মূল আবাস ছিল আগ্রা এবং শাসনের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল এই শহর। যদিও আকবর কিছুদিনের জন্য রাজধানী আগ্রার পাশে ফতেহপুর সিক্রিতে স্থানান্তরিত করেন। এবং তারপর বর্তমান ভারতের বাইরে একমাত্র শহর পাকিস্তানের লাহোরে সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত হয় স্বল্পকালের জন্য। অবশেষে আগ্রা হয়ে দিল্লি হয় ভারতের রাজধানী। রাজধানী বদলালেও মুঘল ক্ষমতা ও স্থাপনার অন্যতম কেন্দ্র ছিল আগ্রা।

কলকাতায় ক্ষমতাসীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারত দখল করে ইংরেজরা রাজধানী বানায় কলকাতায়। তারপর ১৯১৩ সালে আবার ভারতের রাজধানী হয় দিল্লি। এভাবে আগ্রার ক্ষমতা ও শক্তি লোপ পায়। তথাপি আগ্রার চেয়ে সুদীর্ঘ বছর রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার গৌরব ভারত বা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কোনও শহরের নেই।

পেছন ফিরে দেখতে পেলাম, অপসৃয়মান সূর্যের রক্তিমাভায় আগ্রার লালাভ দুর্গ টকটক করছে। ততক্ষণে বৃষ্টি কমে সূর্যের আলো ছড়িয়েছে প্রাসাদ আর উদ্যান ঘেরা নগরী আগ্রার দিগন্তে। পায়ে পায়ে হোটেলের দিকে যেতে যেতে কানে বাজে রণধ্বনি, উৎসব আর হুল্লোড়ের কোলাহল। আগ্রার আশেপাশেই হয়েছে ভারতবর্ষে বিখ্যাত ও ভাগ্যনির্ণায়ক যুদ্ধগুলো। কাছেই মুহাম্মদ ঘোরী আজমিরের শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে ভারত অধিকার করেন। সন্নিকটের পানিপথে লোদি বংশকে পরাজিত করে বাবুর বসেন ভারতের মসনদে। আকবর এই পানিপথেই হিমুকে হারিয়ে ভারতের ক্ষমতা সুসংহত করেন। আফগান আহমাদ শাহ আবদালি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা-শিখদের বিতারণ করেন। আগ্রাকে নাভিশূলে রেখেই মধ্যযুগের ভারতের ক্ষমতার পালাবদল আর রাজনৈতিক শক্তির বিন্যাস রচিত হয়েছে।

এতো যুদ্ধ ও দামামার মধ্যেও আগ্রাকে সাজানো হয়েছে সুরম্যভাবে। লোদি গার্ডেন, শাহজাহান গার্ডেন, মাহতাব বাগ ইত্যাদি এখনো অটুট সবুজে-শ্যামলে। আর স্থাপনার তো শেষ নেই! ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া তাজমহল, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা দুর্গ ছাড়াও শত শত মসজিদ, প্রাসাদ ছড়িয়ে আছে আগ্রায়।

বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমনবৃত্তান্তে আগ্রা লাভ করেছে স্বপ্নের শহরের মর্যাদা। শান-শওকত, আভিজাত্য, সমৃদ্ধিতে আগ্রাতে তুলনা করা হয়েছে ভেনিস, প্যারিসের সঙ্গে। আগ্রার নান্দনিক অবয়ব লোভনীয় হয়ে ধরা দিয়েছিল তৎকালীন পৃথিবীর মানুষের কাছে।

আগ্রা দুর্গের পরিদর্শনের পর প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোর কথা মনে পড়ে। কি নেই এই দুর্গে। একটি আস্ত শহর আড়াই-তিন মাইল জায়গা জুড়ে সুপরিকল্পিতভাবে সজ্জিত করার কৃতিত্ব মুঘলদের। আবাস, রাজকার্য, যুদ্ধ, বিনোদন ইত্যাদি সবই হয়েছে এখানে। খেলার মাঠ, মল্লযুদ্ধ, হাতি বা বাঘের লড়াইয়ের ব্যবস্থাও ছিল। শীশ মহল, স্নানাগার, হারেম ও হাভেলিতে মশগুল আগ্রার দুর্গে জীবন যেন প্রবহমান ছিল আরব্য রজনীর মখমল কার্পেটে।

আগ্রা দুর্গের বাইরেও সাধারণদের বসবাসের জায়গায় মিনাবাজার, মসজিদ, প্রমোদালয়, বিশ্রামাগার, সরাইখানার অন্ত ছিল না। এখনো আগ্রার পথে পথে গম্বুজওয়ালা প্রহরী ছাউনির দেখা পাওয়া যায়, যা মুঘল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে বিরাজমান ছিল।

শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যই নয়, কিংবা যুদ্ধ আর বিজয়ই নয়, আগ্রার উপর দিয়ে বয়ে গেছে মর্মান্তিক রক্তস্রোত। সিপাহি বিদ্রোহে মুঘল-ভারতীয় পক্ষ পরাজিত হলে দিল্লির মতো আগ্রাতেও বয়ে যায় রক্তের বন্যা। শুধু মুঘল পরিবারের সদস্যই নয়, মুসলিম সম্ভ্রান্ত, অভিজাত ও সৈনিকদের গণহারে হত্যা করা হয়। দিল্লির পতন হলে বিপুল মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আগ্রা দুর্গে। তাদের ধরতে গণহত্যা চালানো হয়।

এখনো আগ্রার পথে-প্রান্তরে, দুর্গের দেয়ালে কালচে রক্তের ছোপ মিশে আছে। নিহতের আহাজারি আর নিগৃহীত রমণীর বিলাপ গুমড়ে কাঁদে আগ্রায়। একটি প্রচলিত উপকথার বিষয়ে লোকমুখে শুনেছি। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে পরাজিত করে ইংরেজরা বন্দি বানিয়ে পাঠিয়ে দেয় সুদূর বার্মার রেঙ্গুনে। তার পরিবারের অনেককেই হত্যা করা হয় দিল্লিতে। দিল্লির হুমায়ূন মাকবারা বা কবরগাহে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। সেই স্থানে কাতার বন্দি করে শত শত মুঘল পরিবারের সদস্যকে হত্যা করে ইংরেজ সেনাপতি। আগ্রায় যারা লুকিয়ে এসেছিলেন, তাদেরকেও দুর্গের ভেতরে চিরুনি তল্লাশি করে খুঁজে বের করে মারা হয়। আজও নাকি সেসব নিহত আত্মা প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আগ্রা দুর্গে ফিরে আসে। অনেকেই দুর্গের অভ্যন্তরে, খিলান ও স্তম্ভের পাশে নারী ও শিশুদের কান্না শুনতে পান!

এইসব কাহিনীর সত্যাসত্য যাচাই করা দুরূহ। কিন্তু যে বীভৎসতা এ নগরের উপর দিয়ে বয়ে গেছে, তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সাজানো-সুন্দর শহরকে ছারখার শ্মশানে পরিণত করার কষ্ট শুধু মানবতার কষ্ট নয়, সভ্যতার জন্যও বেদনার। আগ্রা এখনও বেঁচে আছে মৃত্যু ও বেদনা নিয়ে। সঙ্গে আছে সভ্যতার এমন বহু চিহ্ন, যা ধ্বংস ও আক্রমণের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে মুঘল সভ্যতার জয়গান গাইছে।

আবার ফিরে যাবো জয়পুরে, সেখান থেকে দিল্লি। ভ্রমণ পরিকল্পনায় ভুল করায় এখান থেকে সহজে দিল্লি যাওয়ার বদলে আবার জয়পুর হয়ে দিল্লি যেতে হচ্ছে। ফেরার পথে গাড়িতে একে একে চোখের সামনে থেকে সরে যাচ্ছিল তাজমহল, অসংখ্য বাগিচা, স্থাপনা, আগ্রা দুর্গের মজবুত দেয়াল, ফতেহপুর সিক্রির আবছা কাঠামো। ভাবছি, ধ্বংস করলেই সব শেষ হয় না। হত্যা করলেও সবকিছুর অবসান ঘটানো যায় না। সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশিক শাসনের কবলে নিষ্পেষিত হয়েও শত বছরের মুঘল ঐতিহ্য ঠিকই মাথা উঁচিয়ে আছে। সমগ্র বিশ্বে সভ্যতার অংশ হিসাবে ভারতবর্ষ তথা পুরো উপমহাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করছে। আর প্রতিনিয়ত শাসক ও শোষকদের দিচ্ছে ইতিহাসের শিক্ষা।

কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষণীয় বিষয়ের মধ্যে এই নির্মম সত্যটিও প্রকট হয়ে আছে যে, ইতিহাস শিক্ষা দিলেও ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। তবু ইতিহাস শিক্ষা দিয়েই যাচ্ছে। একদার মুঘল রাজধানী সুমর‌্য আগ্রা নগরী ধ্বংসের করাল গ্রাস থেকে নিজেকে রক্ষা করে তেমনই এক ইতিহাসের শিক্ষালয় হয়ে আছে। জীবন্ত ইতিহাস বইয়ের মতোই আগ্রা ঐতিহাসিক শিক্ষা বিতরণ করছে আজ এবং আগামীর পৃথিবীকে।

আরও পড়ুন: আগ্রা দুর্গে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;