নীলক্ষেতে কেন যাই

ফয়জুল ইসলাম
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

নীলক্ষেতের আলোকোজ্জ্বল ফুটপাতে পুরনো বইপত্তরের দোকানে পড়ে আছে ফিরোজা রঙের কাভারের একটা বই। নিমাই ভট্টাচার্যের লেখা উপন্যাস ‘গোধূলিয়া’। নীলক্ষেতের ফুটপাতে এরকম অনেক পুরনো বইপত্তরই পড়ে থাকে। এটা কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে কোথাও কোনো বইয়ের দোকানে বা কারো বইয়ের শেলফে ‘গোধূলিয়া’ দেখলেই আমি চমকে উঠি আর তখন আমি বইটা স্পর্শ করতে চাই। আমার ভেতরে এ প্রবণতাটা বেশ আগের।

আমার সাংবাদিক ও অনুবাদক বন্ধু আব্দুল্লাহর জোরাজুরিতে মাঝেমাঝে আমি নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের বাজারে ঘুরে বেড়াই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে ঢাকাতে চাকরি করতে এসে আমার বন্ধু ইমতির মাধ্যমে আব্দুল্লাহর সাথে পরিচয় ঘটে। সেই থেকে আব্দুল্লাহ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আড্ডার প্রলোভন দেখিয়ে আজকের সন্ধ্যায়ও আব্দুল্লাহ আমাকে নীলক্ষেত নিয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ ধরেই আমি আব্দুল্লাহর পিছেপিছে হেঁটে বেড়াচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাতে পুরনো বইপত্তরের ভেতরে আমি ‘গোধূলিয়া’ নামের উপন্যাসটা পড়ে থাকতে দেখি। আমি থমকে দাঁড়াই। ফুটপাতে পড়ে থাকা ফিরোজা কাভারের বইটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি আমি। ততক্ষণে পিলপিলে গিজগিজে ভিড় ঠেলে আব্দুল্লাহ সামনে এগিয়ে গেছে খানিকটা। আমি তাকে ডাকি না, ডাকার প্রয়োজনও মনে করি না কেননা ওকে জায়গা মতোই পাব। রবের পুরনো পত্রিকার দোকানে তার যাওয়ার কথা। ‘গোধূলিয়া’ নামের বইটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি বুঝতে পারি, পুরনো খবরের কাগজ, সয়াবিন তেলের বাতিল প্লাস্টিক ক্যান, স্পঞ্জের ছেঁড়া স্যান্ডেল ইত্যাদি জিনিসের সাথে ফেরিওয়ালার কাছে বইটা বেচে দিয়েছে কেউ। পুরনো বইপত্তরের দোকানদার তা কিনে নিয়ে ফেলে রেখেছে ফুটপাতে বিছিয়ে রাখা ময়লা নীল পলিথিনের ওপরে। ফুটপাতে ছড়ানোছিটানো বই আর পত্রপত্রিকার গাদা থেকে এবার হয়তো বইটা কিনে নিয়ে যাবে কোনো খদ্দের, হয়তোবা কেউ কিনবেই না।

নীলক্ষেতের পুরনো বইপত্তরের দোকানগুলোর উজ্জ্বল বাতির আলোতে আমি দেখতে পাই, ‘গোধূলিয়া’র স্পাইনের নিচের দিকে খানিকটা কাগজ ছিঁড়ে গেছে, বিবর্ণ ফিরোজা কাভারের ওপরে কয়েক জায়গাতে পড়ে আছে কালো দাগ—সরষের তেলেরই নিশ্চয়। আর কাভারের ওপরে ধুলোর আস্তর তো আছেই! ভেতরের পাতাগুলোর দুরাবস্থা বাইরে থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে গেলেই হয়তো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে কোনো কোনো পাতা—এমনই কাহিল। ভিড়ের একটা ফাঁক গলে কোমর ঝুঁকে নীল পলিথিনের ওপর থেকে আমি এবার বইটা তুলে নিই। বইটা হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বুঝতে পারি যে নিমাই ভট্টাচার্যের ‘গোধূলিয়া’র এই সংস্করণটা নিউজপ্রিন্টে ছাপা হয়েছে। বইটার কাভারের বোর্ডের সাথে গাম দিয়ে লাগানো প্রথম সাদা পাতাটা ছেঁড়া। সাধারণত এখানে হাতবদলের সূত্রে বইয়ের বিভিন্ন মালিকের নাম লেখা থাকে। টাইটেল পেজেও পূর্বতন মালিকের বা মালিকদের নামেরও কোনো উল্লেখ নেই। নিউজপ্রিন্টের বিবর্ণ পাতাগুলোর ক’টা উল্টাই আমি। পাতায় পাতায় কাটুনিপোকার ধ্বংসের চিহ্ন—বিভিন্ন মাপের ফুটো সেখানে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভেতরের একটা পাতায় একসময় আটকে যায় আমার চোখ। বিমূঢ় হয়ে আমি তাকিয়ে থাকি সেখানে। কোথা থেকে প্রমত্ত এক হাতিশুঁড়া উঠে এসে তখন আমার মাথার ভেতরে শুরু করে দেয় তাণ্ডবনাচন। আর আমার সমস্ত শরীর কেমন অবশ অবশ লাগতে শুরু করে। এ আমি কী দেখলাম? সেই পাতাটায় তিনটা লাইন লাল কালি দিয়ে দাগানো। পাতাটার বামের মার্জিনে ইংরেজিতে লেখা—দিস ইজ নট অলওয়েজ ট্রু। এ তো দীপ্তির হাতের লেখা! তারপর বইটার জরাজীর্ণ পাতাগুলো আমি দ্রুত উল্টে দেখি। বইটার আর কোনো পাতায় দীপ্তির হাতের লেখার কোনো চিহ্ন নেই। তবে বইটার ব্যাক কাভারে কলমের কালো কালিতে দীপ্তি এঁকে রেখেছে ছোট্ট একটা আয়তক্ষেত্র। তা ছাড়া ব্যাককভারের ভেতরের দিকের সাদা পাতায় পেন্সিলে আঁকা আছে একটা ছোট্ট ষড়ভুজ ফুলদানি, তার ভেতরে ক’টা ফুল। আমি মনে করতে পারি, একদা আমাদের ডিপার্টমেন্টের সেমিনার রুমে বসে আমি এই ফুলদানিটা এঁকেছিলাম। দীপ্তি তখন আমার সামনেই বসে ছিল।

আমার আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে এটা সেইই ‘গোধূলিয়া’! ঠিক তের বছর আগে খুলনা শহরের মেয়ে দীপ্তিকে তার জন্মদিনে এই বইটা আমি উপহার দিয়েছিলাম। আমি আর দীপ্তি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। আমি ছিলাম ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। আর দীপ্তি পড়ত সমাজবিজ্ঞানে—আমার দুই ক্লাস নিচে। বলে রাখা ভালো যে আমি মাস্টার্স শেষ করে বের হওয়ার পরপরই দীপ্তির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আমরা পরস্পরকে আর খুঁজিনি। আমার বন্ধু মিজানুর রহমানের কাছে শুনেছি, দীপ্তি এখন খুলনাতেই থাকে—খালিশপুরে। দীপ্তির জামাই খুলনা শহরের একটা বীমা কোম্পানির উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। তাদের একটা কালো রঙের কার আছে। কারটা মিতসুবিশি কোম্পানির।
পুরনো বইয়ের দোকানদার ব্যাটা চরম বেয়াদব বলে আমার ধারণা হয়! অনেক সময় নিয়ে আমাকে বইটা নাড়াচাড়া করতে দেখে সে খেইখেই করে ওঠে, “কী? নিবেননি?”

“আরে ভাই দাঁড়ান না! বইটা একটু দেখতেছি!” আমার অসহিষ্ণু উত্তরের পর দোকানদার আরেক জন খদ্দেরের দিকে মনোযোগ দিয়ে ফেলে।

আমার দ্বিধা হয়—‘গোধূলিয়া’ কিনে নেব নাকি? নিয়েই বা কী করব? মগবাজার এলাকার পেয়ারাবাগ রেলগেট পার হলেই আমাদের ভাড়াবাসা। ট্রেনলাইনের ঠিক পাশেই বলে সাংঘাতিক ধুলো পড়ে বাসাটায়! সেক্ষেত্রে যত্ন করে বইটা পলিথিনের প্যাকেটে ভরে আলমারিতে তুলে রাখা যায়। এসব নিয়ে আমি কয়েক মুহূর্ত ভাবি। তার ভেতরেই দোকানদার আমাকে দ্বিতীয়বার তাগাদা দেয়, “লইলে লন, না লইলে সরি খাড়ান। কাস্টমার ব্যাকে বই দেহনের লাই লাইন দিছে! দেখছেননি?”
কথাটা ঠিক। ফুটপাতের আর সব পুরনো বইয়ের দোকানের মতোই এই দোকানটার সামনেও সম্ভাব্য ক্রেতাদের জটলা। বাম দিয়ে একজন, ডান দিয়ে একজন ঢুকতে চাচ্ছে আমাকে গুঁতিয়ে, আমার কাঁধের ওপর দিয়ে নিচে ছড়ানোছিটানো বইটইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়তে চাচ্ছে আরেকজন। দোকানদারের সমস্যাটা বুঝতে পেরেও মেজাজ খিঁচড়ে যায় আমার। আমি বলি, “ঐ ব্যাটা! ভদ্রভাবে কথা কইতে পার না? দাম কও এখন। কত?”

“পঞ্চাশ টিহা।” নিস্পৃহ সুরে জবাব দেয় পুরনো বইয়ের দোকানদার।

“এই ফাটাফুটা বইয়ের দাম পঞ্চাশ টাকা হইতেই পারে না!” মিনমিন করে আমি প্রতিবাদ জানাই। আমি ভাবতে থাকি, আসলে কত দাম হতে পারে বইটার? তিরিশ? পঁচিশ? কুড়ি? আব্দুল্লাহ এসে তখন তর্জনী দিয়ে জোরে একটা খোঁচা মারে আমার পিঠে। সে বলে, “তুই এইহানে খাড়ায়া খাড়ায়া কী করোস? আমি তোরে খুঁজতে খুঁজতে পেরেশান হইতাছি!”

আমি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই আমার হাতে ‘গোধূলিয়া’ দেখে সে জিজ্ঞাসা করে, “কিনবি নেকি?” আব্দুল্লাহ নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলোর অনেক পুরনো কাস্টমার। এখানকার পুরনো বইয়ের দোকানদারেরা কমবেশি সবাই তাকে চেনে, সমীহও করে। আমার উত্তরের অপেক্ষা না-করেই বইটা হাতে নিয়ে সে দ্রুত কয়েকটা পাতা উল্টায় এবং নিমিষেই বইয়ের দূরাবস্থা মেপে নিয়ে দোকানদারের চোখের দিকে তাকিয়ে সে তার প্রত্যাশিত দাম জানায়, “দশ ট্যাকা।”

আঁইগুঁই করে দোকানদার, “আর পাঁচটা টিহা বাড়ায় দেন বাইসা!”

“এক পয়সাও বেশি হইব না।”

নীলক্ষেত এলাকার পুরনো খদ্দের আব্দুল্লাহর কথায় শেষপর্যন্ত দশ টাকাতেই ‘গোধূলিয়া’ ছেড়ে দেয় দোকানদার।

বইটা হাতে নিয়ে আব্দুল্লাহর সাথে রাতের নীলক্ষেতে ঘুরতে ঘুরতে আমার খুব খিদে পায়। কিন্তু নীলক্ষেতের কোনো রেস্টুরেন্টে একটা টেবিলও ফাঁকা নেই। কাজেই একটা রেস্টুরেন্টের সামনে রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আমি আর আব্দুল্লাহ ডালপুরি খাই। ডালপুরি খেতে খেতে আমি আব্দুল্লাহকে মনে করিয়ে দিই, “খবরদার! আজকেও কিন্তু দেরি করায় দিবি না বল্লাম! সারা দিন অফিস করে খুব টায়ার্ড লাগতেছে। সেই তোপখানার পুরনো বইয়ের দোকানগুলা থেকে আমাকে হাঁটাচ্ছিস তুই! আর তা ছাড়া আজকে বাসার বাজারের ডেট। দেরি করে বাজার নিয়ে গেলে আমার বউ কিলায়ে মেরে ফেলবে আমাকে।”

আমার সমস্যা শুনে আব্দুল্লাহ বরাবরের মতোই মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “আরে না ব্যাটা! দেরি করুম না! দুইডা পত্রিকা খুঁইজাই যামুগা।”

রেস্টুরেন্টটার সামনে দাঁড়িয়ে চা’র অর্ডার দেয়ার পর দুটো সিট ফাঁকা হলে আমরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে গিয়ে বসি। মনোযোগ দিয়ে নতুন-কেনা কোনো একটা ইংরেজি পত্রিকার পাতা দ্রুত উল্টায় আব্দুল্লাহ। তখন খুব উৎসাহ নিয়ে আমি তাকে বলি, “বইটা কেন কিনলাম জানিস?”

আমার দিকে না-তাকিয়ে ভাবলেশহীনভাবে আব্দুল্লাহ আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে, “না-কইলে জানুম কী কইরা? আমি কি ব্যাটা গণক নেকি?”

“আরে শোন না! মেলা দিন আগে এই বইটা কিন্তু আসলে আমিই কিনছিলাম!”

পত্রিকা থেকে মুখ তুলে ভুরু কুঁচকে আব্দুল্লাহ আমার দিকে তাকায়। তারপর সে অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “তুই কিনছিলি? তোর বই এইডা? তাইলে এইডা নীলক্ষেতে আইল কী কইরা?”

“একজনকে উপহার দিছিলাম।” আব্দুল্লাহর জেরার মুখে আমি একটু হড়বড় করি।

“ও আচ্ছা! তুই একজনরে বইডা উপহার দিছিলি আর হেইডা আইসা পড়ছে নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানে! হেয় বেইচা দিছে আর কী!”—এটুকু বলে আবারও পত্রিকায় ঢুকে যায় আব্দুল্লাহ।

“আরে শোন না শালা! বল দেখি কাকে বইটা দিছিলাম?” দীপ্তির কথা কাউকে বলার জন্য আমি তখন এমনই কাঙাল!

“ঝামেলা করিস না তো! থাম এহন। পত্রিকাডা ভালো কইরা চেক কইরা লই আগে! মেরুজ্যোতির উপরে একটা লিখা খুঁজতাছি।” তাঁতিয়ে ওঠে আব্দুল্লাহ।

আব্দুল্লাহর বিরক্তি পাত্তা না-দিয়ে আমি তাকে বলি, “দীপ্তিকে দিছিলাম।” একটু লাজুক হাসি আমার। অনেক দিন পর দীপ্তির কথা কাউকে বলা গেল তবে! দীপ্তিকে নিয়ে আজকাল আমি কারো সাথে আর আলাপ-আলোচনা করি না। দীপ্তির বিরুদ্ধে এখন আর আমার তেমন কোনো অনুযোগ অবশিষ্ট নেই।

“ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় যেই মাইয়াডার লগে তুই লাইন মারতি তার নাম দীপ্তি আছিল—তাই না? সেই একযুগ আগের কথা! এহনো পুইষা রাখছোস এইসব? এইগুলারে কী কয় জানোস তো? বালখিল্যতা! তোরে না ছুঁইড়া রাস্তায় ফালায়া দেওয়া দরকার! শালা পাবনাইয়া ভুত!” আমাকে গাল দিতে দিতে চোখমুখ কঠিন হয়ে যায় আব্দুল্লাহর। আর তাই দীপ্তিকে নিয়ে আর কোনো কথা তোলারই সাহস হয় না আমার। অপ্রিয় সত্য কথার তোপে তখন আমি একেবারে কেঁচো হয়ে যাই।

দীপ্তিকে নিয়ে আব্দুল্লাহর সাথে কথা বলতে ব্যর্থ হয়ে আমি ব্যাদানমুখে রবের বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। রবের দোকানে আব্দুল্লাহ ঘাঁটছে পুরনো সব ম্যাগাজিন—পিপলস্, ফেমিনা, কস্মোপলিটান, ভোগ, বিভিন্ন ইনফ্লাইট ম্যাগাজিন—এসব। সাংবাদিকতার পাশাপাশি জীবনধারণের জন্য আব্দুল্লাহ বিভিন্ন পাবলিকেশন হাউসে প্রুফ রিডিংয়ের কাজ করে এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ফিচার লিখে। আর তাই প্রতি দিন সন্ধ্যায় ফিচারের ম্যাটার খোঁজার জন্য নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে সে অক্লান্ত ঘুরপাক খায়, এ বই নাড়ে, ও পত্রিকা উল্টায়, দোকানদারদের সাথে ঘ্যানঘ্যান করে দাম কমানোর জন্য, আতকা ঝাড়ি লাগায় দোকানদারদেরকে—ঐ মিয়া! এইসব আনছডা কি? একটার ভিতরেও মাল নাই! এভাবে প্রতিদিন আব্দুল্লাহ এক থেকে দেড় ঘণ্টা নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে ব্যয় করে। আব্দুল্লাহর পাল্লায় পড়লে তাই মহাগ্যানজাম! ওর জন্য অকাজে নীলক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি সবসময়েই অস্থির হয়ে উঠি। এ মুহূর্তটাও তেমন।

আর পত্রপত্রিকার শত শত পৃষ্ঠা নিমিষেই উল্টাতে উল্টাতে সে কখনো আমাকে আনমনে বলে, “এই আর দুইডা মিনিট খাড়া না!” কখনো সে আমাকে ধামকি মারে, “এত সকাল সকাল বাসায় গিয়া করবিডা কী শুনি? ভাবছোস, বউ তোর লিগা বইসা বইসা কানতাছে?” আবার আব্দুল্লাহ আমাকে তোয়াজও করে কখনো কখনো, “তোরে কাবাব খাওয়ামুনে! আরেকটু থাক না ব্যাটা!” সে জানে যে শিককাবাব আর নান আমার খুব পছন্দ। কিন্তু আজকে এক ঘণ্টার ওপরে চলতে থাকা আব্দুল্লাহর হুজ্জুতি একেবারে জানের ওপর দিয়ে উঠে যায় আমার। তবু সে আমাকে ছাড়বে না—পত্রপত্রিকা খোঁজাখুঁজি শেষ হলে সে আমার সাথে আড্ডা দেবেই দেবে। তার দাপটের মুখে আমিও ছুটতে পারি না। বিকালবেলায় আব্দুল্লাহ যখন অফিস থেকে আমার সাথ ধরেছে তখনই বুঝেছিলাম, এবার আমার শনি লেগেই গেল! অফিসে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রী লতা বলেছিল, বাটার দোকান থেকে ওর জন্য একটা চার নম্বর মাপের স্যান্ডেল কিনে নিয়ে যেতে। লতার ঘরে পরার স্যান্ডেলটা তালিতুলি মারতে মারতে আর মেরামতের উপযুক্ত নয়। কিন্তু নীলক্ষেতে এসে আজ দেরিই হয়ে গেল অনেক। আর তার ওপর আজ বাজারের ডেট। ব্যাচেলার আব্দুল্লাহ সংসারের এসব দায়দায়িত্বের কিছুই বোঝে না।

অফিসে টিফিন নিয়ে যাওয়ার হট পটটা আমার বাম কাঁধে ঝুলছে। হট পটের স্ট্র্যাপে আমার বাম হাত আর ডান হাতে ‘গোধূলিয়া’। রবের পুরনো পত্রিকার দোকানের সামনে এভাবে আমি দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই! নীলক্ষেতের উত্তরদিকের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোর এ দিকটা থেকে তাও আকাশটা একটু দেখা যায়! সেখানে দঙ্গল পাকিয়ে ছোটাছুটি করে বেড়ায় আষাঢ়মাসের থমথমে কালো মেঘ। আমার গায়ে এসে লাগে ঠান্ডা একটা হাওয়া। আষাঢ়ের চিটচিটে গরমে তখন স্বস্তি লাগে আমার। একটু পরেই হয়তো শুরু হয়ে যাবে দিক মুছে দেওয়া অঝোর বৃষ্টি। আমার মনে হয়, এখনই কি একটা পলিথিনের ব্যাগের ব্যবস্থা করে রাখব নাকি? না-হলে আমার ডানহাতে ধরে রাখা বইটা তো ভিজে নষ্ট হয়ে যাবে! তাই আমি রবের দোকান থেকে একটা পলিথিনের ব্যাগ চেয়ে নিয়ে তার ভেতরে বইটা ভরে ফেলি। দীপ্তির কাছে ‘গোধূলিয়া’ নামের বইটার কোনো মূল্য না থাকতে পারে; পুরনো খবরের কাগজ, বইপত্র আর শিসিবোতলের সাথে বইটা সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে কোনো ফেরিওয়ালার ঝাঁকায়, কিন্তু এই বইটা আমার কাছে অনেক মূল্যবান! আমি চাই না, জরাজীর্ণ এই বইটা বৃষ্টির পানি লেগে আরো নষ্ট হয়ে যাক!

তখন দীপ্তির ওপরে আমার ভয়ানক মেজাজ খারাপ হয়। একদা ‘গোধূলিয়া’ নামের বইটা আমি তাকে তার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম আর সে কিনা বইটা ফেরিওয়ালার ঝাঁকায় ঝেরে ফেলে দিল! এটা কেমন হৃদয়হীন আচরণ? এই দীপ্তিই একদা আমাকে বলেছিল, “নিমাইয়ের ‘গোধূলিয়া’ বইটা কিনে দেও না? কিপটামি করো কেন? খুব সুন্দর গল্প! জেবার কাছে শুনতে শুনতে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি!” বিয়ের পরে নিশ্চয়ই কালে কালে দীপ্তির সংসারে জমা হয়েছে অনেক আসবাব, অনেক বই আর ঘর সাজানোর বিস্তর জিনিসপত্তর এবং সেই বিশাল রাজ্যে এই একটা হালকা বইয়ের স্থান হয়নি। অথচ এই বইটা আমার কাছে সবুজ মতিহার, প্যারিস রোডে গগনশিরিষের ছায়া, লাইব্রেরির সামনের লাল রঙের নিচু দেয়াল, দেয়ালের সাথে রোগাপটকা একটা কামিনী। এই বইটার সাথে আরো জড়িয়ে আছে মমতাজ উদ্দিন কলাভবন, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সেমিনার রুম, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির নির্জন জার্নাল সেকশন, দীপ্তির মন্নুজান ছাত্রীবাস। এই বইটা দীপ্তির ডাবল বেণি, তার গ্রীবার কালো তিল, তার দীঘল আঙুল, বইখাতার ব্যাগ, নীল রঙের ফোল্ডিং ছাতা, গাঢ় বাদামি সানগ্লাস। এই বইটা আমার শের-ই-বাংলা হলে দীপ্তির অগুনতি টেলিফোন, হলের মেইনগেটে হঠাৎ সাদা শাড়ি-কালো পারের দীপ্তি। এই বইটা বিরহে আক্রান্ত অজস্র রাত।

দীপ্তিকে আমি বইটা কিনে দিয়েছিলাম, তাও আবার আমার বন্ধু মিলুর কাছ থেকে টাকা ধার করে। সে দিন দীপ্তির জন্মদিন। শহীদুল্লাহ কলাভবনে সকাল আটটা দশের ক্লাস শেষ করে একদৌড়ে দোতলা থেকে আমি নিচে নামি। কলাভবন থেকে যে রাস্তাটা সোজা প্যারিস রোডে গিয়ে মিশে যায় তার মাথার কালভার্টে বসেছিল দীপ্তি, তার সথে তার সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন বন্ধু। সেদিন আমি আর দীপ্তি যার যার ক্লাস ফাঁকি দিয়েছিলাম। সেদিন আমরা প্রথম মতিহার ক্যাম্পাসে একসাথে সময় কাটিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। প্যারিস রোড ধরে মতিহার হলের সামনে দিয়ে আমরা অনেকদূরের মেডিক্যাল সেন্টার পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলাম। মেডিক্যাল সেন্টার থেকে দীপ্তি ক’টা এন্টাসিড তুলেছিল। তারপর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে থার্ড সায়েন্স বিল্ডিংয়ের নির্জন রাস্তাটা ধরে আমরা মমতাজ উদ্দিন কলাভবনের সামনে ফিরে এসেছিলাম।

আর সেদিন তুমি সাদা শাড়ি পরেছিলে। শাড়ির পার আর ব্লাউজটা ছিল ফিরোজা রঙের। তোমার চুলে ছিল সোনালি রঙের ক্লিপ আর পায়ে চটি। তার আগের দিন তোমার চাবির রিংটা নিয়ে খেলতে খেলতে ভুল করে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছিলাম আমি। তাই আবুর ক্যান্টিনে দুপুরের খানা খেয়ে আমাকে আমার শের-ই-বাংলা হলে যেতে হয়েছিল তোমার চাবির রিংটা ফেরত আনতে। সেই দুপুরে তুমি ভাদ্রের তীব্র গরম থেকে বাঁচার জন্য লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে ঢুকেছিলে এবং একটা টেবিলে পেডেস্টাল ফ্যানের পাশে বসেছিলে আমার অপেক্ষায়। মন্নুজান হলে তোমার রুমে আর তুমি ফিরে যাওনি। আমি আমার হল থেকে তোমার চাবির রিং নিয়ে ফিরে আসার পর আমাকে দেখে তুমি হেসেছিলে অনেক! ব্যাপার হলো, আমার দুপায়ে ছিল ভুল স্যান্ডেল—একটা খয়েরি রঙের, আরেকটা কালো। কালো স্যান্ডেলটা ছিল আমার রুমমেট জলিল ভাইয়ের।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেসব দিনগুলো কেবল ছুটে ছুটে পালায়, দূরে দাঁড়িয়ে থাকে তারা ভীষণ মুখ গোমড়া করে। কোনো এক সেগুনবনের ভেতর দিয়ে তবু তোমারই খোঁজে ঊর্ধ্বশ্বাসে আমি দৌড়ে মরি। খুঁজে পাওয়া যায় না তোমাকে কোথাও। হঠাৎ একটা মোটা সেগুনগাছের আড়াল থেকে যেন বের হয়ে এলে তুমি। তুমি হাসতে হাসতে শুয়ে পড়লে সেগুনমঞ্জরীতে ছাওয়া মাঠের ওপর। আর তখন মিহিদানা সেগুনমঞ্জরী শূন্য থেকে ঝরে পড়ছে তোমার শরীর লক্ষ্য করে। একটা মৃদু সুগন্ধের ভেতরে আলগোছে ডুবে যাচ্ছে সেই দিনটা। সেগুনের মস্তবড় ক’টা শুকনো পাতা ঝরে পড়েছে তোমার শরীরের ওপর। খয়েরি জালিকা ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই। তার ফাঁকে ফাঁকে জেগে আছে তোমার অস্পষ্ট মুখ। সেই দিনগুলোর কেবল পালাই পালাই। ও সোনা! একটু বসো। গুড়মুড়ি খাও? পানদোক্তা? কোরমাপোলাও? নাহ্! তারা কিছুতেই আর আমার পাশে বসতে পারবে না।

রবের পুরনো পত্রিকার দোকান থেকে বের হয়ে আব্দুল্লাহ তখন আমাকে গুঁতো দেয়। দীপ্তি বিষয়ক ভাবনা থেকে আমি বাস্তবে প্রত্যাবর্তন করি। দ্রুত বেগে পুরনো একটা ইংরেজি পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতেই আব্দুল্লাহ আমাকে বলে, “আরেকটু খাড়া না ব্যাটা! রবে একটা পত্রিকা খুঁজতে গেছে। আইসা পড়ব অহনই।” কিন্তু আব্দুল্লাহর বিলম্বের কারণে আমি ততক্ষণে সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেছি। তাই আমি লতার স্যান্ডেল কিনতে যাওয়ার জন্য বইয়ের মার্কেট থেকে বের হয়ে যাই। অগত্যা পুরনো বইপত্তর খোঁজা বাদ দিয়ে আমার পিছু নেয় বেজার আব্দুল্লাহ। নীলক্ষেতের পুরনো বইপত্রের দোকানগুলো ফেলে উত্তরদিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দিকে আগালে বাটা’র একটা দোকান পড়ে। সেদিকে হাঁটা শুরু করতেই কোথা থেকে আছড়ে নামে বাতাসের একটা ঝটকা! পুরনো বইপত্তরের দোকানগুলোর টিনের চাল কেঁপে যায়, আওয়াজ ওঠে কড়কড়। দোকানদারেরা দুরদার করে তাদের দোকানের শাটার ফেলে দেয়। আর ফুটপাতের দোকানদাররা ব্যস্ত হয়ে পথের ওপরে অথবা কাঠের চরাটের ওপরে বিছিয়ে রাখা বইপত্তরগুলো গুছিয়ে নেয়; তারপর বইয়ের গাদা ঢেকে দেয় মোটা পলিথিনে। তখন নিরাপদ জায়গার খোঁজে আমি বলাকা সিনেমাহল লক্ষ্য করে হাঁটতে থাকি দ্রুত। কিছু ধুলো পাক দিয়ে উঠে এসে বেহুদা ঢুকে পড়ে আমার নাকের ভেতরে। অস্বস্তিতে আমি আমার মাথা ঝাঁকিয়ে উঠি। আব্দুল্লাহ আমাকে তাড়া দেয়, “পা চালা ব্যাটা! বৃষ্টি আইসা পড়ব অহনই। ভিজা যামু তো!” তার কথা শেষ হতে না হতেই ধুন্ধুমার বৃষ্টি নামে তপ্ত এই শহরে। পলিথিনের ব্যাগের ভেতরে রাখা বইটা বুকের কাছে আড়াল করে আমি দৌড়ে উঠি গিয়ে বলাকা সিনেমাহলের বারান্দায়। উপায় না-দেখে আমার পিছু পিছু দৌড়ে আব্দুল্লাহও তার পত্রিকাগুলো হাতে নিয়ে সিনেমাহলের বারান্দায় উঠে পড়ে।

বৃষ্টি আর থামে না কিছুতেই! আচ্ছা কুফা লাগল তো! বলাকা সিনেমাহলের বারান্দায় অনেক ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাদাম খেয়ে, কখনো সিগারেট টেনে আর আব্দুল্লাহর সাথে কথা বলে কতক্ষণ আর সময় পার করা যায়? সমকালীন রাজনীতি; মতিঝিলে আমার সদাগরি আপিসের ক্লান্তিকর চাকরিবৃত্তান্ত; আলু, পটল, টেম্পু আর বাড়িভাড়ার উর্দ্ধগতি—এসব নিয়ে কথা বলতে তখন আর ভালো লাগে না আমার। মাথার ভেতরে একটা চাপ ঘন হয়—রাত হয়ে যাচ্ছে। বাসায় ফিরতে হবে জলদি। বাচ্চারা না আবার ঘুমিয়ে পড়ে! আব্দুল্লাহ তো অবিবাহিত। তার বাসায় ফেরার কোনো তাড়া নেই। সে আমার বাসায় ফেরার চাপটা বুঝবে না—আমি সেটা জানি। তাই একসময় আমি সমর্পিত হই মৌনতায় আর ঘড়ি দেখতে থাকি ঘনঘন। ঘড়ি তো নয় যেন গরুর গাড়ি—এমনই ঢিলা! এভাবে সময় আর কাটে না আমার! আধাঘণ্টা পর বৃষ্টি কিছুটা থামে। কিন্তু রাতের আকাশে তখনও কাজলকালো মেঘ। কাজেই সহসাই আবার বৃষ্টি নামবে বলে আমরা আশঙ্কা করি। নীলক্ষেত থেকে মতিঝিল, মতিঝিল থেকে মালিবাগ মোড়, তারপর মালিবাগ মোড় থেকে মগবাজার—এভাবে প্রতিদিনের মতো ভেঙে ভেঙে বাসে আর টেম্পুতে করে পেয়ারাবাগের বাসায় ফেরাটা আর নিরাপদ মনে হয় না আমার কাছে। কোথায় কখন বৃষ্টির ভেতরে পড়ে যাব আর মাঝখান থেকে ভিজে যাবে ‘গোধূলিয়া’!

আর কতক্ষণ এভাবে বৃষ্টিতে আটকে থাকা যায়? তাই “শালা! বৃষ্টির গুষ্টি মারি!”—বলে গাল দিয়ে আব্দুল্লাহ রিকশা নিতে চায় শহীদবাগে তার মেসে ফিরবে বলে। আমি তার সাথে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত যাব। তাই আমরা বলাকা সিনেমাহলের সামনে থেকে শেয়ারে রিকশা ভাড়া করি। বাটা’র দোকানে গিয়ে লতার জন্য আর স্যান্ডেল কেনা হয় না আমার। আমি ভাবি, মালিবাগ থেকে বাসায় ফেরার পথে মৌচাক মার্কেট থেকে লতার জন্য স্যান্ডেল কিনব। কিন্তু রিকশায় ওঠার পর পরই আবার জোর বৃষ্টি শুরু হয়। জলদি জলদি রিকশার হুড তুলে দেয় রিকশাওয়ালা। আর বৃষ্টির ছাঁট আটকাতে ছেঁড়াফাটা পলিথিনের পর্দায় আমরা নিজেদেরকে ঢাকার চেষ্টা করি। আমি যতটুকু না বৃষ্টি থেকে আমার নিজের শরীর আড়াল করি তার চাইতেও বেশি আড়াল করি বইটাকে।

তখন আমার মনে পড়ে কোনো আষাঢ়স্য এক দুপুরের কথা যখন মতিহারের সেকেন্ড সায়িন্স বিল্ডিংয়ে আমি আর দীপ্তি অবিরাম বৃষ্টিতে আটকে ছিলাম প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে। তাতে আমাদের কোনো অভিযোগ ছিল না। আমরা দুজন বৃষ্টি দেখতে দেখতে বিল্ডিংয়ের গেটের সিঁড়িতে বসে অনেক গল্প করেছিলাম। একসময় দীপ্তি তার তপ্ত শরীরে বৃষ্টির স্পর্শ নিতে চেয়েছিল। দীপ্তি তাই তার নীল ছাতাটা খুলে মন্নুজানহলের দিকে রওয়ানা দিয়েছিল আর আমি দীপ্তির শারীরিক ঘনিষ্ঠতার লোভে তার ছাতার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম। এভাবে সে দিন আমরা দুজনেই ভিজেছিলাম স্বেচ্ছায়। আবুল হাসানের কবিতা ‘বৃষ্টিচিহ্নিত ভালোবাসা’ স্মরণ করে দীপ্তি তখন আমাকে বলেছিল: আজকে এক্বেবারে ডাউনট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থামল আমাদের ইস্টিশনে! বৃষ্টি এখন জলডাকাতের মতো করে সারাটা শহরে উৎপাত শুরু করে দিয়েছে, দেখলে তো তুমি! ঠিক আবুল হাসানের কবিতার মতো কোনো এক দিন আমরা দুজন আকাশের অন্ধকার বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে পাশাপাশি শুয়ে থাকব সারা দিন, হ্যাঁ? আমি দীপ্তির ছাতার নিচে ভিজতে ভিজতে তার স্বপ্নের সাথে যোগ করেছিলাম, “তাহলে কিন্তু আমরা সে দিন আমাদের হৃদয়ে অক্ষরভরা উপন্যাস পড়ব। রাজি তো তুমি?” আমার কথা শুনে দীপ্তি কপট রাগে বলেছিল, “এই শুরু হলো তোমার ফাজলামি! তোমার মতো পাজি এত সুন্দর একটা কবিতার মর্ম বুঝবে কী করে!” এবং তারপর সে আমার বুকের খাঁচায় তার ডান কনুই দিয়ে একটা গুঁতা মেরেছিল। আমি জোরে হেসে উঠেছিলাম।

সেই মুহূর্তে রিকশায় বসে সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আব্দুল্লাহর বগরবগর চলছে। তার ভেতরে আমি চুপ করে মতিহারের সেই বৃষ্টিচিহ্নিত দিনের কথা ভাবছি। এবং আমি বিষণ্ন হচ্ছি এই ভেবে যে বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে আমার আর দীপ্তির কোনোদিনই পাশাপাশি শুয়ে থাকা হয়নি, আর হবেও না।

রিকশাটা মালিবাগ মোড়ে পৌঁছালে বৃষ্টি আগ্রাহ্য করেই আমাকে নেমে পড়ার পরিকল্পনা করতে হয়। আমার গন্তব্য ভিন্ন—পেয়ারাবাগ। মালিবাগ মোড় থেকে আমাকে পেয়ারাবাগ যাওয়ার টেম্পু ধরতে হবে। কাজেই রিকশা থেকে নেমে একদৌড়ে আমি আশ্রয় নিই একটা ওষুধের দোকানের শেডে। আব্দুল্লাহ তার শহীদবাগের মেসের দিকে রওয়ানা দেয়। বৃষ্টি পড়ছে তখনও। মগবাজারগামী বাস বা টেম্পু আসছে কমকম। যেগুলো আসছে নিমিষেই সেগুলো ভরে যাচ্ছে যাত্রী দিয়ে। গাদাগাদি মানুষের সাথে লাফালাফি করেও শেষপর্যন্ত আমি ভিড় ঠেলে টেম্পুতে উঠতে পারি না। এদিকে রাত প্রায় নয়টা বেজে যায়। কাজেই বৃষ্টি থামার জন্য আর অপেক্ষা না-করে পেয়ারাবাগ রেলগেট পর্যন্ত আমি রিকশা ভাড়া করি। বৃষ্টির কারণে রিকশা ভাড়া বাবদ আট টাকার জায়গাতে আমাকে পনের টাকা ফেলার জোগাড় হলো। তাতে করে আমি সংকুচিত হয়ে যাই।

আজকাল হিসাব করে টাকাপয়সা খরচ করাটা আমার জন্য খুবই জরুরি। এই জগতসংসারে আমি এখন আর একা নই। আমার সাথে জড়িয়ে আছে আমার স্ত্রী লতা আর আমাদের দুই সন্তান। ট্রেডিং ফার্মের মার্চেন্ডাইস অফিসার হিসাবে আমার বেতন গুনেগেঁথে ছয় হাজার টাকা মতো। বাড়িভাড়া, গ্যাস, পানি আর ইলেকট্রিসিটি—এসব মিলিয়ে খরচা হয় তিন হাজার দুশো টাকা। রইল বাকি কত? এতই কম টাকা রোজগার করি আমি! ভাগ্যি ভালো যে পেয়ারাবাগের মতো কমদামি একটা এলাকাতে বাসা খুঁজে পেয়েছিলাম! বিয়ে করার আগে আমি থাকতাম আরামবাগের একটা মেসে। একটা রুম শেয়ার করতাম আমি আর জামাল নামের একজন প্রফেশনাল প্রুফরিডার। লতার সাথে বিয়ের পরে আমার একটা পৃথক ঘরের প্রয়োজন পড়ে। তারপর থেকে আমি পেয়ারাবাগে থাকি। আমার মনে হয়, আসলে দীপ্তি ভালোই করেছে শেষপর্যন্ত আমার সাথে না-ঝুলে। এই দারিদ্র্যে কারই বা পোষায়? আমার সাথে থাকতে গিয়ে লতার কষ্ট বাড়ছে বলেই আমি নিশ্চিত। দুই ছেলেকে বড় করতে সংসারে আগের চাইতে টাকাপয়সা বেশি লাগছে আজকাল। তাই এখন টিউশনি করে লতা। পাশের বাসার ক্লাস ওয়ানের একটা মেয়ে তার কাছে পড়তে আসে সপ্তাহে পাঁচ দিন। প্রতি মাসে সে সাতশ টাকা সম্মানি পায়। এইতো আমাদের ঝুক্কুরঝুক্কুর সংসারের চেহারা!

পলিথিনের ব্যাগে মোড়া ‘গোধূলিয়া’ বাম বগলের নিচে আড়াল করে জোর বৃষ্টির ভেতরে একদৌড়ে আমি রিকশাতে উঠি। মৌচাক মার্কেটের সামনের ভাঙাচোরা রাস্তায় প্রবল ঝাঁকিতে আমার বাম কাঁধ থেকে হটপটটা বেকায়দাভাবে দুলতে শুরু করে। রিকশার পর্দাটা ফুটোফাটা। কাজেই পর্দার আড়ালে বসে বইটাকে আমি বগলের নিচে ভালো মতো আড়াল করতে চাই। বইটা বাঁচানো গেলেও তুমুল বৃষ্টিতে আমার জামা ভিজে যায়, জুতা ভিজে যায়, ভিজে যায় মোজা। আমি তো মাত্র একজোড়া জুতা দিয়ে অফিস করি! তখন আমার দুর্ভাবনা হয়। একরাতের মধ্যে ভিজে যাওয়া জুতাজোড়া শুকাবে না কিছুতেই। কালকে তবে অফিসে স্যান্ডেল পরেই যেতে হবে দেখা যায়! এসব ভাবতে ভাবতে পলিথিনের পর্দার নিচে বইটা ছাড়াও আমার বৃষ্টিসিক্ত শরীরটাকে আমি যথাসম্ভব আড়াল করতে চেষ্টা করি। বৃষ্টির কারণে আমার আর পেয়ারাবাগের বাজারে গিয়ে শাকসব্জি এবং ছোট মাছ কেনা হয় না, মৌচাক মার্কেট থেকেও স্যান্ডেলও কেনা হয় না লতার জন্য।

পেয়ারাবাগ রেলগেটে নেমে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বাসায় ফেরার পর আমি কাপড় পাল্টাই। বইটাকে ভেজা পলিথিনের ব্যাগ থেকে বের করে আমি শোয়ার ঘরের টেবিলে রাখি। ভাগ্যিস! ভিজে যায়নি বইটা! তারপর আমি বাচ্চাদের সাথে একটু খেলি—বাচ্চাদের সাথে বিল্ডিংব্লক দিয়ে বহুতল ভবন বানাই। ওরা ঘুমিয়ে গেলে সারা দিনের কিছু বিষয় নিয়ে গল্প করতে করতে রাতের খাবার খাই আমি আর লতা। রাতের খাবার খেয়ে শোয়ার ঘরের টেবিলে বসে ‘গোধূলিয়া’র ময়লা কাভারটা আমি একটা ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে যত্ন করে মুছি। কাভারের ওপর থেকে তেলের দাগটা যায় না তবে ধুলোবালির দৃশ্য এবং অদৃশ্য আস্তর কিছুটা উঠে যায় তখন। তাতে করে চকচকে না-হলেও বইটার চেহারা পরিষ্কার হয় কিছুটা। কিন্তু জরাজীর্ণ বইটার ঢিলা হয়ে যাওয়া বাইন্ডিংটা আর কিভাবে ঠিকঠাক করা যাবে! দীর্ঘ অযত্নে বইটার বিবর্ণ নিউজপ্রিন্টের পাতাগুলো যে পোকায় কেটে গেছে তারও তো কিছু করা যাবে না! তাই আমি দুঃখিত হই। খুব সাবধানে বইটার ক্ষতিগ্রস্ত পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখি আমি। ভেতরের একটা পাতায় লাল কালিতে লেখা দীপ্তির মন্তব্য আর ব্যাককাভারে তার আঁকা ছোট একটা আয়তক্ষেত্র ছাড়া সারা বইতে দীপ্তির ফেলে যাওয়া অন্য কোনো চি‎‎হ্নই নেই। বইটার ভাঁজে ভাঁজে তবু উজ্জ্বল হয়ে আছে বৃক্ষছায়ায় উৎফুল্ল মতিহার আর এক মৃতপ্রেমের অজস্র সব স্মৃতি।

বইটার কাভার নড়াচড়া করতে দেখে লতা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “নীলক্ষেত গেছিলা নেকি?”

মাথা নেড়ে আমি হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেই।

লতা এবার বলে, “নতুন বই কিনতে পারতা! কার না কার বই! ঘেন্না লাগতেছে আমার!”

লতা খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষ। পুরনো সব হাঁড়িপাতিল, কোক-পেপসির বোতল, এমনকি পুরনো জামাকাপড় পর্যন্ত সে বুয়াদেরকে বিলিয়ে দেয়। তাই তার মন্তব্যে আমি মোটেই বিস্মিত হই না। আমি উত্তর দেই, “সস্তায় পাইলাম আরকি! এই বইটা না হয় তুমি পইড়ো না!”

“আমি বাবা তোমার ঐ বই ধরতেছি না!”

লতার উপসংহার শুনে আমি হাসতে হাসতে বলি, “আচ্ছা। ধইরো না তুমি।”

কিন্তু লতাকে আমি আর ‘গোধূলিয়া’র ইতিহাস বলি না। আমার অতীত নিয়েও লতা অধিকারপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করি। বইটা বন্ধ করে সন্তানদের পাশে বিছানায় শুয়ে আমি খবরের কাগজে মুখ লুকাই। আমার চারদিকে দাঁত বের করে ঘুরে বেড়ায় দীপ্তির বিবিধ কথোপকথনের শবদেহ, শূন্যতে ভেঙে পড়ে তার অজস্র সব ছবি! বড় বিষণ্ন লাগে আমার।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে লতা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “আমার স্যান্ডেল?”

আমি উত্তর করি, “আর বইলো না! বৃষ্টি সব ম্যাসাকার করে দিছে। কালকে কিনে আনবনে।”

লতা কখনোই অভিযোগ করে না তেমন। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। পুরনো একটা ‘সানন্দা’ নিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে; পত্রিকা পড়তে পড়তে তার ক্লান্ত শরীরে নিমিষেই ঘনায় গভীর ঘুম। দরজা খুলে আমি আমাদের দু ঘরের ফ্লাটের লাগোয়া খোলাছাদে যাই। সেখানে বসে আমি সিগারেট টানি। আমি জীবন দিয়ে জানি যে অনুশোচনা, শোকসন্তাপ আর বিরহের তীব্রতা কমে যায় ধীরে ধীরে; কেবল কিছু দুর্দান্ত স্মৃতি পড়ে থাকে—প্রেমের, ঘৃণার; স্মৃতিরা অস্পষ্টও হয়। শুধু জেগে রয় মমতার অতল এক খনি যা দিয়ে দীপ্তি আমাকে স্পর্শ করেছিল একদা। দীপ্তির সে মমতার কথা অনেকদিন পর খুব মনে পড়তে থাকে আমার। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এই পাঁচতলা বাসাটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে একের পর এক রেলগাড়ি যায়-আসে—কোনোটা ডাউনট্রেন, কোনোটা আপট্রেন। আর সেই শব্দে আমি উদাস হই। আমার মনে পড়ে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পেছন দিয়ে এভাবই সারাদিন রেলগাড়ি ছুটত। রাতগুলোতে রেলগাড়ির আওয়াজ শুনতে শুনতে আমরা বন্ধুরা আত্মীয়-পরিজনহীন ক্যাম্পাস ছেড়ে যার যার বাড়িতে ছুটে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতাম। আরো মনে পড়ে, আমি দীপ্তির সাথে প্রায়ই চা খেতে যেতাম সেই ছোট্ট ট্রেনস্টেশনটায়। চা’র দোকানটার নামটা আমি এখন আর মনেও করতে পারি না।

আমি যেই সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি, সেই আপিস বাংলাদেশের বিভিন্ন গার্মেন্টস ফার্মে মেশিনারি আর ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করে এবং সেই সাথে আফটার সেলস সার্ভিসও দিয়ে থাকে। সম্প্রতি আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে যে বাংলাদেশের একজন কাস্টমারের অর্ডারের প্রেক্ষিতে কোরিয়ার নামসুই কোম্পানি যে মেশিনগুলো সরবরাহ করেছে তার কয়েকটা স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়নি। তাই পরদিন অফিসে গিয়ে আমাদের কোম্পানির ডিরেক্টরের (অপারেশন) ডিক্টেশন নিয়ে নামসুইকে পাঠানোর জন্য আমি একটা চিঠি ড্রাফট করি। এসব মার্চেন্ডাইজিংয়ের কাজ আমার ভালো লাগে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ইংরেজি সাহিত্য পড়েছি বলে এখন আমাকে দুনিয়ার সব চিঠিপত্তর ইংরেজিতে ড্রাফটিং করতে হয়। যাহোক, চিঠি ড্রাফটিংয়ের পাশাপাশি আমি বিগত বোর্ড মিটিংয়ের মিনিটস লিখার কাজটাও শেষ করি। চিঠি আর মিনিটসটা কম্পিউটার অপারেটরকে টাইপ করতে দিয়ে ডেস্কে বসে আমি সিগারেট ধরাই। সেই মুহূর্তে ইন্টারকমে বস আমাকে খুঁজবে না। কাজেই আমার মনে হয়, মিলুকে ফোন করার কাজটা এখনই সেরে ফেলা যাক। টেলিফোন অপারেটর যথারীতি নাম্বার লাগাতে দেরি করে। মিলুকে ফোনে পেয়ে আমি সোজা ঘোষণা দেই, “মিলু! তোকে খুব দরকার।”

গার্মেন্টস কোম্পানির নব্যমালিক মিলু তখন ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে ওঠে, “জলদি বলে ফেল। ব্যস্ততায় মারা যাচ্ছি!”

“শোন, গতকাল না একটা মজার ঘটনা ঘটছে! আব্দুল্লাহর সাথে নীলক্ষেত গেছিলাম। ঐখানে”... কিন্তু কথাটা শেষ করা হয় না। বিরক্তিতে ব্যস্ত মিলু হিসহিস করে, “পরে শুনবোনে তোর এইসব কথা। ফোন রাখ তো এখন! সন্ধ্যায় ফ্যাক্টরিতে আসিস।”

“তোর ফ্যাক্টরিতে যাব? মতিঝিল থেকে মিরপুর? অতদুর যাইতে পারব না বাবা!” কাতর হয়ে উঠি আমি।

“ওকে। শাহবাগ। আজিজ কো-অপারেটিভ। সন্ধ্যা সাতটায়।” এই বলে লাইন কেটে দেয় মিলু।

ছোটখাট একটা গার্মেন্টস কোম্পানি দাঁড় করাতে গিয়ে মিলু এখন এমনই ব্যস্ত! তার আর আড্ডা দেওয়ার সময় নেই। সেজন্য আমরা বন্ধুরা মিলুর ওপরে ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে আছি। শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেটের দোতালায় একটা রেস্টুরেন্টে বসেও মিলুর ব্যস্ততার বহর কমে না। মোবাইল ফোনে একের পর এক এর-ওর সাথে সে কথা বলেই চলে। তখন মেজাজটা খাট্টা হয়ে যায় আমার। বিরক্তি নিয়ে আমি মিলুকে বলি, “মোবাইলটা অফ করে দেস না কেন?”

জামাল না জামিল—কার সাথে যেন কথা শেষ করে নিস্পৃহ গলায় মিলু বলে, “এইবার কও মামা, মামলাটা কী।”

সাথে সাথেই আমি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠি, “বুঝলি, কালকে নীলক্ষেতে পুরানো একটা বই পাইছি।”

“ও আচ্ছা। কোন বইরে?” আমার দিকে না-তাকিয়েই পকেট থেকে ছোট একটা নোটবুক বের করে সেখানে কিছু একটা লিখতে শুরু করে মিলু।

“নিমাই ভট্টাটার্যের ‘গোধূলিয়া’। তুই বিশ্বাস করবি কিনা, ঠিক এই বইটাই দীপ্তিকে গিফট করছিলাম আমি। বইটার ভিতরে ওর হাতের লেখাও আছে। বইটার কথা তোর মনে আছে তো? আমি তো শালা তাজ্জব হয়ে গেলাম!” বলতে বলতে আমি ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে পড়ি।

দীপ্তিকে নিয়ে আরো কথা, আরো অনেক কথা বলা চাই তখন! দিনে দিনে কত কথার ভারই না জমেছে আমার ভেতরে—ছোট কথা, মেঝ কথা, বড় কথা! আমি জানি যে স্মৃতির ভেতরে নিমজ্জন কেবল শোকসন্তাপই বাড়ায়! কিন্তু দীপ্তিকে ঘিরে আমার স্মৃতি তো কেবল মৃতপ্রেমের স্মৃতিই নয়, সেই স্মৃতির সাথে আমার তারুণ্যের একটা বড় অংশ জড়িয়ে আছে যেখানে বৃক্ষরাজিতে ছাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একদল তরুণ সারাদিন আবুর ক্যান্টিন, আলির ক্যান্টিন আর মেইনগেটের উল্টোদিকের মন্টুর ক্যান্টিনে আড্ডা দেয়; গগনশিরিষের চিহ্ন ধরেধরে তারা হেঁটে বেড়ায় প্যারিস রোডের এমাথা থেকে ওমাথা; জুবেরি হাউসের সামনের পুকুরপারে বসে তারা লক্ষ করে মন্নুজানহল আর রোকেয়াহলের মেয়েদের চলাচল; তারপর তারা কাজলাগেটে চা খেয়ে রাত বাড়লে যার যার হলে ফিরে যায়। শের-ই-বাংলা হলের টেনিস গ্রাউন্ড, পূর্ব আর পশ্চিম হাউসের বিভিন্ন রুম অথবা শহীদ মিনারের বেদিতে আবার রাত্রিকালীন আড্ডা চলে তাদের। সবশেষে আমি আমার জন্য নির্ধারিত সিঙ্গেলরুমের বিছানায় শুয়ে বাতি নিভাই। আমার জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া মহুয়াগাছের পাতারা আমার সাথে জেগে থাকে। চৈত্রমাসে মহুয়াফুলের তীব্র গন্ধ আমাকে উন্মাতাল করে দেয়। তখন আমি দীপ্তির অভাব বোধ করি। মাঝেমাঝে একা-ঘরে আমার ভীষণ ভুতের ভয় হয়। বালিশের নিচে মাথা লুকিয়ে আমি বিছানায় পড়ে থাকি। তা শুনে হাসতে হাসতে দীপ্তি আমাকে বলে, “তোমার সাথে ঝগড়া করে হলেও আমি কখনো আলাদা ঘরে শোব না। তাহলে চলবে?” দীপ্তির কথা শুনে আমার খুবই স্বস্তি লাগে তখন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি আর তখনকার নাম করা ক্রিকেট খেলোয়ার মিলু শের-ই-বাংলা হলে পাশাপাশি রুমে থাকতাম। ‘গোধূলিয়া’ সংক্রান্ত ব্যাপারটা তার ভোলার কথা নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আজিজ কো-অপারেটিভ মার্কেটের দোতালার রেস্টুরেন্টে বসা মিলুর ভেতরে সেই বইটা নিয়ে এক ছটাকও উত্তেজনা নেই, কোনো আগ্রহ নেই। টেবিলে ঝুঁকে পড়ে গভীর উৎসাহ নিয়ে সে মোটেই আমাকে প্রশ্ন করছে না—‘তারপর? তারপর কী হলো?’ নোটবুক থেকে চোখ তুলে কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে বরং সে দ্রুত অর্ডার দিচ্ছে, “দুইটা চিকেন স্যান্ডউইচ আর দুইটা কফি। জলদি লাগাও।”

মিলুর নৈর্ব্যক্তিকতায় আমি আহত হই। অথচ এই মিলু আর আমি একদা রাতের পর রাত শের-ই-বাংলা হলের টেনিস গ্রাউন্ডে বসে বসে অথবা রাতের মতিহারে হাঁটাতে হাঁটতে অধরা মেয়েদেরকে নিয়ে কতই না আলোচনা করেছি! যেমন, এক দিন মেইনগেটে মন্টু ভাইয়ের চা’র দোকানে বসে গাঁজা খেতে খেতে হিন্দি মুভির ডাকসেটে নায়িকা রেখাতে মুগ্ধ হয়ে আমি মিলুকে বলেছিলাম, “দীপ্তি নামের ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েটা—খুলনা না কোথাকার—তার চোখ যদি রেখাজির চোখের মতো কথা না-বলে তাহলে আমি তাকে দেখতেও যাব না দোস্ত!” আর মিলু তখন তার প্রেমিকা রেহানার মন্নুজান হলের রুমমেট দীপ্তির রূপকীর্ত্তণে ব্যস্ত, “রেখার সাথে দীপ্তির চেহারার এত মিল! মেয়েটার চোখ রেখার মতো বড় বড়। আর মেয়েটা লম্বাও অনেক!” তারপর মিলু যে রসিকতা করেছিল, এতদিন পরে মিলুর সেই রসিকতাটাও মনে পড়ছে আমার। মিলু বলেছিল, “তোকে মোটেই ঝুঁকে দীপ্তিকে চুমা খেতে হবে না। ঝুঁকে চুমা খেতে গেলে তোর কোমরে আবার টান পড়তে পারে! দীপ্তির পিছে তুই লাইগা পড় ব্যাটা!” তারপর গাঁজার নেশায় ভীষণ এলোমেলো আমরা দুজন অকারণে বেদম হেসে উঠেছিলাম। মিলু হাসতে হাসতে জড়ানো কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “আমি কোনো দিন শুনি নাই যে মাইনষের চোখ কথা কয়! চোখ দিয়ে আওয়াজ বাইর হয় নেকি দোস্ত? তোকে না গাঞ্জায় ধরছে!” মাতাল আমি কোনো মতেই গুছিয়ে মিলুর সেই প্রশ্নের উত্তর করতে পারিনি সেদিন এবং আমি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি করতে থাকি মেইনগেটের সাথের বিশাল মাঠটায়। আমার সাথে যোগ দেয় মিলুও। আর এখন সেই মিলুর কিনা দীপ্তিকে নিয়ে কথা বলার সময়ও নেই! আশ্চর্য! হারিয়ে যাওয়া রেহানাকে নিয়েও মিলুর কোনো দুঃখবোধ আছে বলেও আমার মনে হয় না!

সেই মুহূর্তে আজিজ কো-অপারেটিভের রেস্টুরেন্টে বসে ছোট একটা কাগজে কী জানি সব হিসাব করছে মিলু আর আমার দিকে না-তাকিয়েই সে আমাকে প্রশ্ন করছে, “কী একটা বইয়ের কথা যেন বলতেছিলি? শুনতেছি তো! বলে যা না!”

মিলুর ওপরে অভিমানের কারণে তখন আমার চুপ থাকার পণ। শালা, খুব ব্যস্ততা ফুটাচ্ছ না? পণ ভাঙি না আমি। কফিতে চুমুক দিয়ে আমি রেস্টুরেন্টে বসে থাকা অন্যান্য খদ্দেরদের চেহারা দেখতে থাকি খামোখাই। আমার নীরবতায় শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ হয় মিলু। সে বলে, “একটুতেই গায়ে ফোস্কা পড়ে গেল, না? কালকে ফার্স্ট হাফের ভিতরে ছাব্বিশ লাখ টাকা জোগাড় করা দরকার, জানিস? খালি তো অফিস কর, খাওদাও আর ঘুমাও! ব্যবসার চোদন তুমি কি বুঝবা!”

তবুও আমি চুপ। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে মাইক্রোবাসে উঠতে উঠতে মিলু আমাকে বলে, “চল আমার সাথে। বাইরে খাব। রাতে বাসায় পৌঁছায় দিবনে, যা!” কিন্তু ফুটপাত থেকে নড়ি না আমি; তাকে জানাই, “আজকে না, আরেক দিন যাবনে।”

“যাকগা। কালকে রাতে তোর বাসায় খাব। লতাকে বলিস কিন্তু!” একথা বলে চলে যায় ব্যস্ত মিলু।

তবে কি আমি এ্যালিফেন্ট রোডে ধ্রুব, ইমতি আর শওকতের ডেরায় যাব? ওখানে গিয়ে ‘গোধূলিয়া’ খুঁজে পাওয়ার গল্পটা বলব নাকি তাদেরকে? আমি নিশ্চিত যে ওখানে সাহিদ, কায়সার, মিজান, আব্দুল্লাহ, সুব্রত, আদিল অথবা মাসুদ—এদের কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই। আর বিষ্ণু তো হারিয়েই গেছে কলকাতার ভিড়ে! ওকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। নাকি দীপ্তির ঘনিষ্ঠ বন্ধু সালমার মিরপুরের বাসায় যাব? সালমার সাথে দীপ্তির যোগাযোগ আছে বলে জানি। থাক! এই সবগুলো জায়গাই শাহবাগ থেকে অনেক দূরে। তার চাইতে পেয়ারাবাগে নিজের বাসাতেই ফিরে যাই। ঘামে শরীরটা কেমন চিটিরমিটির করছে!

শাহবাগ থেকে আমি মগবাজারের দিকে হাঁটছি মিন্টো রোড ধরে। মিন্টো রোডে জমে আছে রাত আর নির্জনতা। ময়লাগাদার শহরে এই পথটা গাছপালার মমতায় আজও কী সুন্দর সেজে আছে! মতিহারের প্যারিস রোডের কথা তোমার মনে আছে দীপ্তি? একবার তুমি অদ্ভুত একটা স্বপ্নের গল্প বলেছিলে। ঘন কুয়াশায় সাজানো প্যারিস রোড। এত কুয়াশা যে দু গজ দূরেও কাউকে দেখা যায় না! তুমি একাকি হেঁটে আসছো প্যারিস রোডের পশ্চিমদিক থেকে। ভিসির বাসার সামনে কুয়াশা ফুঁড়ে তখন নাকি তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম এই আমি! তুমি আমাকে বলেছিলে, তখন আমার সারাটা শরীর থেকে বের হচ্ছে সাদাসাদা কুয়াশা। কুয়াশার মোড়কের ভেতর আবৃত আমি তখন নাকি তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তুমি অনেকক্ষণ ধরে চুমু খেয়েছিলে আমার ঠোঁটে। আর আমার ঠোঁট থেকে বিন্দু বিন্দু কুয়াশা ঢুকে পড়ছিল তোমার মুখে, নাকে, চোখে আর শরীরের সর্বত্র। অনেক দিন পরের এক সকালে তুমি এই স্বপ্নটার কথা আমাকে বলেছিলে। জনৈক সামরিকজান্তার সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষের কারণে তিনমাস বন্ধের পর সেদিন ভোরে আমি পাবনা শহর থেকে রাজশাহী ফিরেছি। তুমি তার আগের দিনে ফিরেছো খুলনা থেকে। তোমার প্রতীক্ষাতে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনের লাল দেয়ালের ওপর আমি শীতের রোদে বসেছিলাম চুপচাপ। দীর্ঘ অদর্শনের পর প্রথমদেখাতেই তুমি সেই স্বপ্নটার বর্ণনা দিয়েছিলে এবং স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না—এই ভেবে আমরা আশ্চর্য এক বিষাদে চুপ করে ছিলাম অনেকক্ষণ।

গতকাল তো বাজার করা হয়নি। একে তো আব্দুল্লাহ-বন্ধুর প্যাঁচে পড়েছিলাম, তারপর ‘গোধূলিয়া’, তারপর তুমুল বৃষ্টি, তারপর দীপ্তি—কেবলই দীপ্তির স্মৃতি। আজ সকালের খবর, মাত্র চারটা আলু আছে টুকরিতে আর ফ্রিজে রয়ে গেছে তিনটা ডিম। কাঁচা মরিচ? আছে, হাড় জিরজিরে ক’টা কাঁচা মরিচ পড়ে আছে বটে। লতার ধারণা মতো এতে করে কেবল ডিম আর আলুর ঝোলই রান্না করা সম্ভব হবে, আর কিছু নয়। “মসুরের ডাল তো খুবই পুষ্টিকর। আজকের মতো ডালভাতই চালায় দিও!”—লতাকে এটুকু বলে সকালে আমার অফিসযাত্রা হয়েছিল। সন্ধ্যাবেলায় অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় মালিবাগ মোড়ে টেম্পু থেকে নেমে আমি মৌচাক মার্কেটে গিয়ে লতার জন্য স্যান্ডেল কিনি। তারপর মৌচাক মার্কেট থেকে পেয়ারাবাগ অভিমুখে হাঁটতে হাঁটতে দীপ্তির স্মৃতির পাশাপাশি আমার এই কথাটাও মনে পড়ে যে বাসায় রান্না করার মতো তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই প্রচণ্ড বিরক্তি লাগলেও পেয়ারাবাগ মিউনিসিপাল মার্কেট থেকে আমি কিছু শাকসব্জি, ছোট মাছ আর পেঁয়াজ-মরিচ কিনে বাসায় ফিরি।

পেয়ারাবাগে আমাদের ভাড়াবাড়িতে দুটো ঘর—একটা শোয়ার ঘর এবং আরেকটা ঘর ব্যবহৃত হয় বসার ঘর হিসাবে। দ্বিতীয় ঘরটা আকারে একটু ছোট যেখানে একটা সিঙ্গেল খাট পাতা আছে আর সম্ভাব্য অতিথিদের বসার জন্য রাখা আছে দুটো বেতের মোড়া। বাসায় ফিরে দ্বিতীয় ঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রতি দিনের মতো দ্বিতীয় দফায় খবরের কাগজ উল্টাই আমি। আমাদের ছোট ছেলে তপু তখন শোয়ার ঘরের অন্ধকারে মা’র কাছে ঘুমাচ্ছে। আর আমার পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে টেলিভিশনে কার্টুন দেখছে আমাদের তিন বছরের বয়সী বড় ছেলে অপু। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে একসময় ‘গোধূলিয়া’র কথা মনে পড়ে আমার। উঠে গিয়ে শোয়ার ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দেখি, আমার টেবিলের ওপরে বইটা নেই। কী ব্যাপার? সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বইটা তো এখানেই ছিল! লতা অন্য কোথাও বইটা সরিয়ে রাখেনি তো! হতেই পারে! এমনটা ভেবে আমি শোয়ার ঘরের বাতি জ্বালিয়ে বইটা খুঁজতে শুরু করি। চেস্ট অব ড্রয়ার অথবা আলমারির মাথায় সাধারণত জিনিসপত্র রাখে লতা। চেস্ট অব ড্রয়ারের ওপরটায় চাবির রিং, মাটির ব্যাংক, ওষুধ, দুধের কৌটা রাখা আছে। এসবের সাথে আমার জরুরি কাগজপত্তরও আছে কিছু। সেখানে বইটা নেই। আলমারির মাথাতেও সংসারের জিনিসপাতি কম নেই! অনেক খোঁজাখুঁজির পরো সেখানে বইটা খুঁজে পাই না আমি।

আধোঘুমের ভেতর থেকে লতা তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “কী এত খুটুরখাটুর করতেছো?”

“একটা বই খুঁজে পাচ্ছি না—ঐ যে যেই বইটা সেইদিনকা নীলক্ষেতের পুরানো বইয়ের দোকান থেকে কিনলাম!”

“কোথায় রাখছিলে?”

“সকালে তো টেবিলেই ছিল!”

“অপু কিন্তু বিকালে তোমার টেবিলের উপরে উঠছিল! দেখো তো, ও আবার বইটা নিল কিনা!”

“সেকি!”—শোয়ার ঘর থেকে আমি পাশের ঘরে ছুটে যাই। কয়েকটা প্রশ্নের পরেই বইটার কথা অপু মনে করতে পারে। কার্টুন দেখা থামিয়ে বিছানার চাদরের একপ্রান্ত তুলে তিন বছরের অপু তখন সোজা ঢুকে যায় খাটের নিচে এবং বের করে আনে বইটা। তার হাত থেকে একরকম ছোঁ মেরেই বইটা নিয়ে নিই আমি। আমি দেখতে পাই, কাভারের সামনের বোর্ডটা ছিঁড়ে গিয়ে বোর্ডটা স্পাইনের সাথে ঝুলছে! আমি জলদি জলদি বইটার পাতা উল্টে দেখতে বসি। পাতা উল্টালে দেখা যায়, সেখান থেকে কয়েকটা পাতা গায়েব হয়ে গেছে কোথাও! এমন একটা অবস্থায় গম্ভীর কন্ঠে আমি অপুকে জিজ্ঞাসা করি, “অপু! তুমি আমার বই ধরছো কেন?”

তিন বছরের শিশু আমার প্রশ্ন বুঝতে পারে না বলেই মনে হয়। সে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে আগের মতোই।

আমি আবার পুত্রকে প্রশ্ন করি, “বইটা ছিঁড়লে কেন, বলো?” আমি খুবই অসহিষ্ণু তখন।

আধো গলায় অপু উত্তর দেয়, “না, আমি ছিঁড়ি নাইতো! ছবি আছে কিনা, দেখতেছিলাম। একটাও ছবি নাই বাবা!” বলতে বলতে অপু তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাগজের গোল্লা বের করে আমার হাতে দেয়। গোল্লাটার ভাঁজ খুলে দেখি, ‘গোধূলিয়া’র চারটা ছেঁড়া পাতা সেখানে জড়ো করেছে অপু। আমি চরম বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে আমার পুত্রের দিকে তাকিয়ে থাকি। কয়েক সেকেন্ড ধরে অপু আমার গুমোট মেজাজ লক্ষ করে তারপর তার খেলনা গাড়িটা হাতে নিয়ে একদৌড়ে সে পাশের ঘরে তার মা’র কাছে চলে যায়।

আর আমি ‘গোধূলিয়া’ খুলে ছেঁড়া পাতাগুলো কোনোরকমে খাঁজে খাঁজে মিলিয়ে স্কচটেপ মেরে দেই। হিসাব করে দেখি যে আরো দুটো পাতা বইটা থেকে ছিঁড়ে নিয়েছে অপু। পাতাগুলো অপু কোথায় ফেলেছে তা কে বলবে! কী আর করা! একজন শিশুর পক্ষে তো আর বইয়ের মর্ম বোঝার কথা নয়! তাছাড়া বাইন্ডিংটা মজবুত রাখার জন্য বোর্ডটার বাইরে আর ভেতরে দু দিকেই প্লাস্টিক গাম মেরে কাগজ সেঁটে দিই। তারপর অপুর নাগালের বাইরে রাখব বলে বইটাকে আমি চেস্ট অব ড্রয়ারের ওপরে তুলে রাখি। মেঝে থেকে পাঁচ ফুট মতো উচ্চতায় অপুর উঠতে পারার সম্ভাবনা কম বলেই আমার মনে হয়।

আমার খুব বিষণ্ন লাগে তখন। চুপচাপ খোলাছাদে বসে থাকি আর সিগারেট খাই আমি। আমার সাথে রাত্রি জাগে, জাগে অন্ধকার। আমার বিবিধ বঞ্চনার ভেতরেও তারা আমাকে কোনো দিন পরিত্যাগ করেনি। অনেক দিন পর আবারও আমার মনে হয়, পথের ধুলোরা আমাকে ডাকছে; রেললাইনের নুড়িপাথরেরা ডাকছে; আমাদের বাসার সামনের বাতিল ইট, কাঠ, লোহা আর প্লাস্টিকের পাইপের গাদা আমাকে ডাকছে। তারা বলছে: আইস সহোদর! সেই মুহূর্তে সামনে থাকলে দীপ্তি হয়তো আগের মতো করেই বলত, “তুমি এত ইমোশনাল! আমার খুব ভয় হয়!” না দীপ্তি! আমি এখন আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। নিশ্চয়ই আমি কোনোদিনও তোমাকে ‘গোধূলিয়া’ খুঁজে পাওয়ার গল্পটা বলব না।

নীলক্ষেতের ফুটপাতে পুরনো বইপত্তরের দোকানে নিমাই ভট্টাচার্যের ‘গোধূলিয়া’ পড়ে পাওয়ার পর প্রথম দু সপ্তাহ আমি ভয়ানকভাবে টালমাটাল হয়ে যাই। মতিহার ক্যাম্পাসে ফেলে আসা তারুণ্যের দিনগুলো, বন্ধুবান্ধব আর দীপ্তির কথা অনেক অনেকদিন পরে আমার খুব মনে পড়তে শুরু করে। এও সত্য যে সেই উন্মাতাল দিনগুলোতে আমি এখনো ফিরে যেতে চাই কিন্তু সেখানে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাই না আমি। তবে মানুষের জীবনযাপন এত সর্বগ্রাসী আর এত মধুর যে আমার মনোযোগ থেকে সরতে সরতে ফিরোজা রঙের কাভারের ‘গোধূলিয়া’ একসময় অনেকদূরে মিলিয়ে যায়।

‘গোধূলিয়া’র কথা আবার আমার মনে পড়ে মাস তিনেক পরের একদিনে। আমি তখন মতিঝিলের সদাগরি আপিসের ডেস্কে বসে এক জন ক্লিয়ারিং এ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টের সাথে দাপ্তরিক কথা বলাতে ব্যস্ত। ‘গোধূলিয়া’র কথা মনে পড়াতে আমি তখন তখনই বাসায় গিয়ে বইটা একটু দেখে আসার তাড়া বোধ করি। কিন্তু ডিরেক্টরের কাছ থেকে ছুটি খসবে না মরে গেলেও। উপরন্তু, সে দিন ঘণ্টা দেড়েক অতিরিক্ত কাজ করতে হয় আমাকে। অফিস থেকে পেয়ারাবাগের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাই সন্ধ্যা পার হয়ে যায়। আমি আর আড্ডায় যাই না কোথাও। আব্দুল্লাহ ফোন করেছিল দুপুরে, বিকালে মিজান আর মাসুদ। তাদেরকে বলেছি, আজ আর আড্ডা দিতে পারব না কেননা বাসায় জরুরি কাজ আছে একটা। বাসায় ফিরে হটপটটা খাবার টেবিলে নামিয়ে রেখেই আমি ছুটে যাই শোয়ার ঘরের চেস্ট অব ড্রয়ারের দিকে। আমি দেখি, অবাক হয়ে দেখি, বইটা সেখানে নেই! আমি আতঙ্কিত হই এই ভেবে যে চেয়ার লাগিয়ে চেস্ট অব ড্রয়ারের ওপর থেকে আমার ছেলে অপু ফের বইটা কব্জা করে ফেলেনি তো! আমার আশঙ্কা হয় এবার হয়তো ছোট্ট অপু ছিঁড়ে ফেলবে পুরো বইটাই!

চেস্ট অব ড্রয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে দিশেহারা অবস্থায় খাবি খেতে দেখে লতা জিজ্ঞাসা করে, “কী খুঁজতেছো কখন থেকে?”

আমি তাকে বইটার বিবরণ দেই। মনে করতে চেষ্টা করে লতা, “গোধূলিয়া...গোধূলিয়া...দাঁড়াও তো! চার-পাঁচ দিন আগে পুরানো খবরের কাগজগুলা সব বেচে দিছি। পুরানো বইটইও তো বেচলাম কিছু! ঐগুলার ভিতরেই চলে গেল নেকি বইটা!”

বাসার এদিক-ওদিক খুঁজে এসে লতা জানান দেয়, বইটা পাওয়া যায়নি কোথাও! লতা তখন অপরাধী হয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিতে চায়, “পুরানো বইই তো! গেছে, যাক! নিউমার্কেট থেকে তোমার জন্যে নতুন একটা ‘গোধূলিয়া’ কিনে আনবনে!”

আমি কোনো কথা বলি না। বইটা বিক্রি করে দেওয়ার জন্য লতার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ তৈরি হয় তলে তলে। একটু পরে লতা বইটার প্রসঙ্গ ভুলেও যায় এবং সে রুটিনমাফিক বাচ্চাদেরকে রাতের খানা খাওয়াতে বসে।

ক’বার ঘরের কোনাটোনা হাতড়েহুতড়ে বইটা খুঁজে না-পেয়ে থেমে যাই আমিও। আমি স্থির করি, নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে এবার আমি খুঁজে বেড়াব নিমাই ভট্টাচার্যের ‘গোধূলিয়া’ নামের বইটা যেই বইটা আজ থেকে তের বছর আগে আমি দীপ্তিকে উপহার দিয়েছিলাম। দীপ্তি অথবা লতার মতো করেই কেউ হয়তো কোনোদিন কোনো ফেরিওয়ালার কাছে আবারও সেই জরাজীর্ণ বইটা বিক্রি করে দিতে পারে। পারেই তো!

তারপর থেকে আমি ঘনঘন নীলক্ষেতে যাই।

আপনার মতামত লিখুন :