বস্তির বস্ত্রশিল্প ও অলিম্পিক ভিলেজ



মঈনুস সুলতান
অলিম্পিক ভিলেজ

অলিম্পিক ভিলেজ

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রচুর পর্বত ও হালকা বনানীতে পূর্ণ আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য লিসোটোতে কিছুদিন হলো আমি বাস করছি। লিসোটোর রাজধানী হচ্ছে মাসেরু। কিছু দিন আগে আমি মাসেরুতে বেড়াতে আসি। তখন খুঁজে বের করি বছর দুয়েক আগে জিম্বাবুয়ের কবি সন্মেলনে পরিচয় হওয়া এক তরুণী—কবি নাকাতুলে মোপালেসাকে। নাকাতুলের সাথে আমার জানাশোনা বন্ধুত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাই এ যাত্রায় তার দরাজ হাতে সঙ্গদানের ওপর ভরসা করেছিলাম। কিন্তু নসিব খারাপ, ইতিমধ্যে লিসোটোতে কর্মরত জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির এক বিপত্নীক কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. সাইমন ইনগ্রাম হিলের সাথে তরুণী কবিটির জোরালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মাসেরুতে এসে আমি নাকাতুলের সঙ্গ পেয়েছি স্বল্প, তবে সে একটি উপকার করেছে, ড. ইনগ্রাম হিলের সাথে আমার যোগসূত্র ঘটিয়ে দিয়ে কনসালটেন্ট হিসাবে ছোটখাট কিছু কাজ পাইয়ে দিয়েছে।

এধরনের একটি কনসালটেন্সি জাতীয় কাজের হিল্লা ধরে আমি এ মুহূর্তে মাসেরু শহরের একটি হোটেলের লবিতে বসে আছি। লবির দেয়াল জুড়ে ঝুলছে চমৎকার সব চিত্রিত বস্ত্র। কোনো কোনো কাপড়ে ছাপ দিয়ে করা নকশা। অন্যগুলোতে আছে সুইসুতা দিয়ে আঁকা ছবি। আমি নোটবুকে এসবের একটি ডিটেল বর্ণনা লিপিবদ্ধ করছি। ইউএনডিপির কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ ড. ইনগ্রাম-হিল আমাকে এ কাজের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি কয়েকদিনের জন্য জোহানেসবার্গে গিয়েছেন। আগামী বুধবারের ফ্লাইটে তার ফিরে আসার কথা। গেল বছরের প্রচুর সময় তিনি কাটিয়েছেন স্থানীয় একটি বস্তিতে হস্তশিল্পের প্রকল্প বাস্তবায়নে। বস্তির মানুষজনরা সকলে একসময় বাস করতেন মাসেরু শহরের প্রান্তিকে বেশ উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে। তারপর ব্যাপক ভূমিধসে তারা বাস্তুহারা হয়ে শহরের অন্য একটি বস্তিতে আশ্রয় নেন। ড. ইনগ্রাম-হিল এদের মাঝে যে সব নারী খানিকটা হাতের কাজ জানেন, তাদের জড়ো করে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন এ প্রকল্প। ইউএনডিপি সচরাচর এধরনের মাইক্রো প্রজেক্টে জড়ায় না। পুরা ব্যাপারটা হচ্ছে তার নিজের উদ্যোগে। তবে তিনি ইউএনডিপির কানেকশন ব্যবহার করে বস্তির হস্তশিল্প প্রকল্পের ফান্ডের সংকুলান করে দিচ্ছেন। উইকএন্ডের ছুটিতে তিনি বস্তিতে নিজে কাজের তত্ত্বাবধান করেন। আজ মাসেরুর একটি হোটেলে বস্তি প্রকল্পের হস্তশিল্পের নমুনার প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। আরো ঘণ্টা দেড়েক বাদে দাওয়াতি দেখনেওয়ালারা হাতের কাজ দেখতে আসবে। উদ্যোক্তারা দেয়ালে সূচিকর্ম ও চিত্রিত বাটিক ঝুলিয়ে বিরতি নিয়ে বাইরে গেছেন লাঞ্চ সারতে।

আমি এখানে লবির নিরিবিলিতে নোটবুক নিয়ে একটি টেবিলে বসেছি। লিসোটো খুবই ছোট্ট দেশ। পথঘাট দুর্গম, মাসেরু শহরে পর্যটক আসে অল্প। তাই বস্তির হস্তশিল্প চড়া দামে বিক্রি হাওয়ার সম্ভাবনা কম। ড. ইনগ্রাম-হিল চাচ্ছেন এসব পণ্য সাউথ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ বা কেপ টাউনের মতো বড় শহরে বাজারজাত করতে। ওখানে আছে হস্তশিল্পের ওপর বেশ কয়েকটি পর্যটকভোগ্য ম্যাগাজিন। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন ‘ভূমিধসে বাস্তুহারা মানুষের হাতের কাজ’ শিরোনামে বর্ণনাত্মক স্টোরি তৈরি করে দিতে; যা তিনি একটি ম্যাগাজিনে ছাপাবেন। আমাকে অনুরোধ করার পেছনে কারণ হচ্ছে কয়েক দিন আগে তার সক্রিয় সাপোর্টে আমি মাসেরুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘অলটারনেটিভ টু ভায়োলেন্স’-এর ওপর একটি প্রশিক্ষণ করেছি। ওই সময় কিছু কয়েদিদের সাথে কথাবার্তা বলে কারাগারে কিভাবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হচ্ছে সে বিষয়ে বর্ণনাত্মক রিপোর্ট তৈরি করে দিয়েছি। বর্ণনা তার পছন্দ হয়েছে, তাই তিনি আমাকে বস্তির বস্ত্রশিল্পের ওপর স্টোরি তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। আমি অপেক্ষা করছি লাঞ্চের পর প্রদর্শনীর উদ্যোক্তারা সাথে করে নিয়ে আসবেন বস্তির কয়েকজন নারীকে যারা মূলত নিজ হাতে এ কাজগুলো করেছেন; আমি তাদের সাথে একটু কথাবার্তা বলব।

লবিতে বস্ত্রশিল্পের নমুনা

হাতে সময় আছে দেখে আমি নোটবুকে অন্য একটি বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করি। এ ঘটনায় জড়িয়ে ছিলাম গতকাল ও তার আগের দিন। যার সাথে মাসেরু শহরের বাইরে গিয়েছিলাম তার সঙ্গ কোর্তায় লেগে থাকা বাসি আতরের মতো এখনো মনে ছড়াচ্ছে মৃদু মৃদু সৌরভ। কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কবি নাকাতুলে মোপালেসার অপেক্ষায় সকালবেলা দাঁড়িয়ে ছিলাম গুড টাইম ক্যাফের সামনে। ঝকঝকে একখানা সাদাটে ক্রিমকালারের ভেসপা চালিয়ে সে আসে। অফ হোয়াইট জিন্সের সাথে একই কালারের জ্যাকেট ও হেলমেট পরাতে মেয়েটিকে খানিকটা নভশ্চরের মতো দেখাচ্ছিল। সে ড. ইনগ্রাম-হিলের ভেসপা চালিয়ে এসেছে। তিনি তো এখন জোহানেসবার্গে। নাকাতুলে ভেসপাখানা ক্যাফের মালিকের গ্যারাজে নিরাপদে পার্ক করে আমাকে বেশ খানিকটা দূরে পাহাড়ি এলাকায় আউটিংয়ে যাওয়ার তথ্য দেয়। যেতে আমার আপত্তি আছে, তা নয়। তবে আমি তো বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ওভার-নাইট ব্যাগ ইত্যাদিসহ আসিনি। সে তার ব্যাকপ্যাক দেখিয়ে বলে, এতে সব ব্যবস্থা আছে। একটু খটকার মাঝে পড়ি। পার্কিংলটে হর্ন বাজিয়ে এসে দাঁড়ায় বেজায় বড় লাল রঙের একটি গাড়ি।

ভ্যান গাড়িটি যিনি ড্রাইভ করছেন তিনি গায়ে গতরে বিশাল এক কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। ভদ্রসন্তান কম্বল কেটে তৈরি একটি হুডওয়ালা কানমাথা ঢাকা কালচে লোমশ জ্যাকেট পরে আছেন, তাই তাকে কেমন যেন আধবুড়ো গরিলার মতো দেখায়। তার পাশের সিটে লাল টিশার্ট পরে বসে আছেন আরেক ব্যক্তি। তার গলা থেকে ঝুলছে সাদা পুতির সাতনরী হার, তাতে গাঁথা জানোয়ারের দুটি শিং। তিনি নেমে এসে আমার সাথে হাত মিলিয়ে নিজেকে মাকগথলা মাবই নামে পরিচয় দেন। পেশায় তিনি জংগল গাইড। ছোটখাট কথায়বার্তায় বুঝতে পারি, আমার আন্দাজ বেঠিক নয়, ভ্যানখানা একসময় ফায়ার ব্রিগেডের অগ্নি নির্বাপক গ্যাস বহন করার গাড়ি ছিল। ইঞ্জিন বিকল হলে তা নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এখন যিনি ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন তিনি ছিলেন মাসেরু ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী। মাইনা যথেষ্ট নয় বলে তিনি সার্ভিসে ইস্তেফা দিয়ে জংগল ট্যুরের কোম্পানি খুলেছেন। নিজের শরীর-গতর বেমক্কা কিসিমের ওজনদার, তাই সচরাচর পর্যটক নিয়ে তিনি বনজংগলের আশেপাশে গাড়ি পার্ক করে তাতে বসে বসে ঝিমান। মাকগথলা মাবই দেখনেওয়ালাদের পায়ে হাঁটিয়ে পাহাড়-পর্বত, হ্রদ-গণ্ডার, হাতি ও জিরাপ দেখান। গাড়িতে চড়ার সময় দেখি, তার দরোজায় লালের ওপর কালো আলকাতরা দিয়ে সৃজনশীল বানানে লেখা ‘জ্যংগোল ট্যুর লিমিলেড’, পাশে মাথা হেট করা দুটি জেব্রার ছবি।

নাকাতুলের সাথে আমি পেছনের দিকে বসি। ভ্যান গাড়িটির এদিকে খোলা জায়গা প্রচুর। তাতে রাখা খনিতে পাথর ভাঙার হাতিয়ার, তীরধনুক, বল্লম, দোনলা বন্দুক, ও বোধ করি পর্যটকদের ভয় দেখানোর জন্য কোনো জানোয়ারের দাঁতমুখ খিঁচানো খটখটে করোটি। আমি হাতিয়ারগুলোর দিকে কৌতূহলী নজরে তাকাই। অতীতে আমি আফ্রিকার ট্যুর কোম্পানির গাড়িতে বনেলা জানোয়ার দেখার সুবিধার জন্য বাইনোকুলার রাখা দেখেছি, তীরধনুক ও বল্লমের অভিজ্ঞতা এই প্রথম হতে যাচ্ছে। তবে কি আজকের কর্মসূচীতে বন্যপশুর সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহের আশঙ্কা আছে?

যাই হোক, প্যাত প্যাত করে হর্ন বাজিয়ে ভ্যান স্টার্ট দিতেই আমি জাঁকিয়ে নাকাতুলের পাশে বসি। পেছনে সিট বলতে যে সুপরিসর কাঠামোটিতে আমরা বসেছি, তা বোধ করি কাঠমিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করা। তাতে জাজিমের মতো পুরু গদি পাতা। বালিশ, কুশন ও কম্বলের ঢালাও বন্দোবস্ত আছে। চাইলে পা ছড়িয়ে শোওয়া যায়। সিটটি এমনই আরামদায়ক যে মওকা পেলে এখানে সঙ্গম সেরে নেওয়া যায়।

নাকাতুলের সাথে আউটিংয়ে আমি আগেও গিয়েছি। তখন অবশ্য ট্যুর কোম্পানি বা ড্রাইভারের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দামদর, কোথায় যাব, কী করতে বাসনা হচ্ছে—এসব আমিই ঠিক করেছি। এবারের আয়োজনে সে উদ্যোগ নিয়েছে। তা নিক, পুরুষ হিসাবে বিল তো আমাকে পে করতে হবে। লিসোটোতে ক্রেডিট কার্ডের চল কম। তাই মাসেরু শহর থেকে তোড়ে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি, “তুলিকা সুইট লিটিল গার্ল, ড্রাইভারকে বলো গাড়ি ঘোরাতে। শহরের মধ্যিখানের স্কোয়ারে আছে সাউথ আফ্রিকান নেড ব্যাংক, ওখানকার এটিএম মেশিন থেকে একটু টাকাপয়সা তুলতে হচ্ছে যে।” সে গোলাপি রঙ মাখানো পূর্ণ ঠোঁট খানিক বাঁকা করে বলে, “হোয়াই? এ ট্যুরের জন্য তোমাকে কিছু পে করতে হচ্ছে না, অল আর এডভান্স পেইড ফর।” আমি না বলে পারি না, “তুমি হঠাৎ করে এত টাকাপয়সা পেলে কোথায়?” সে মাথা ঝাঁকায়, তাতে তার কিন্তিলি চুলের মৌচাকাকৃতিতে যেন মধুভুক পতঙ্গের ভেতর মৃদু আলোড়ন শুরু হয়। সে দুহাতে চুলের শেইপকে অগোছালো হতে না দিয়ে বলে, “ড. ইনগ্রাম-হিল পেইড ফর এভরিথিং, আমার বার্থ-ডে গিফ্ট হিসাবে তিনি এ ট্যুরের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।” কোথায় দূরের কোন তেপান্তরের মাঠে আমার ওড়ানো ঘুড়িটিকে অদৃশ্য কেউ যেন কাচ-গুড়োর মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় কেটে নেয়। আমি কান্নি খেয়ে পড়ে যেতে থাকা ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে ফাস্টট্রেটেড হয়ে বলি, “তুলিকা, আমাকে জিঞ্জেস করবে তো, আমি ড. ইনগ্রাম-হিলের তোমাকে দেওয়া ট্যুরে যেতে চাচ্ছি কিনা?” সে চোখমুখে কপট কঠিন অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বলে, “তুমি আমার কাছে জানতে চেয়েছো আমি জন্মদিনে মার্বেল পাথরের টেবিল চাই কি না? গতকাল ফার্নিচারের একটি কোম্পানি থেকে পিকাপ ট্রাকে করে টেবিলটি আমার দিদিমার ঘরে পৌঁছে দিয়েছে, লুক হোয়াট হেপেনড? ভারি টেবিলটি টানাটানি করতে গিয়ে..।”

নাকাতুলে ডিজাইনার স্নিকার খুলে মোজা গুটিয়ে তার পা-টি বাড়িয়ে তুলে দেয় আমার ঊরুর ওপর। চামড়া খানিক ছড়ে গিয়ে পায়ের গুছিতে বেগুনি হয়ে আছে। আমি ওখানে মৃদু আঙুল বুলিয়ে বলি, “এ ট্যুর ছাড়া ড. ইনগ্রাম-হিল তোমাকে জন্মদিনে আর কিছু দেয়নি?” সে কুশনে আধশোয়া হয়ে ঝুঁকে ব্যাকপ্যাকের জিপার খুলতে খুলতে ফিচেল হেসে বলে, “আর ইউ শিওর ইউ ওয়ান্ট টু সি দিস?” আমি “লেট মি সি” বলে হাত বাড়াই। খুব বড় না, এ-ফোর সাইজের সেলোফোনে মোড়া সাদা কাডবোর্ডে পেন্সিল দিয়ে আঁকা...প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় পালকে ঠোঁট-মাথা গুঁজে বসা দুটি কপোতের ছবি। তার নিচে সিসোটো ভাষায় লেখা ‘লেবা লা-কা’, বা ‘মাই পিজিওন’। আমি কার্ডবোর্ডটি ঘুরিয়ে অন্য পারসপেক্টিভ থেকে তাকাই। তখনই বিষয়টা পরিষ্কার হয়, যা দেখছি তা কিন্তু আদপে জোড়া কবুতরের চিত্র নয়, আমার চোখে পরিষ্কার হয়ে ওঠে পরস্পরের সাথে সন্নিবেশিত হয়ে থাকা যুগল স্তনের দৃশ্য। আমি তার দিকে তাকাই। সে আধশোয়া হয়ে কিন্তিলি চুলে দুহাতে বিলি কাটলে তার ভরাট বুক তীব্রভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে শরীরের ভঙ্গি বদলিয়ে তা আড়াল করার চেষ্টা না করে বোধ করি নীরবে আমার রিএকশন শোনার জন্য অপেক্ষা করে। তো আমি বলি, “সো, আই আন্ডারস্ট্যান্ড ড. ইনগ্রাম-হিল লাভস্ ইউ।” সে ফিনকি দিয়ে হেসে বলে, “হি ইজ মাই সুগার ড্যাডি। সে আমাকে নিয়ে কী ভাবে.. আই সিম্পলি ডোন্ট কেয়ার। তাকে যে পছন্দ করি না, তাও না। হি ইজ মাই টুথসিওটসি বাটার কাপ। এক্সপেনসিভ গিফ্ট দেওয়াই তো তার কাজ।” বলে সে আমার সিনিওর সার্ভিসের প্যাকেট থেকে একটি সিগ্রেট বের করে তাতে লাইটারে আগুন দেয়।

আমি ‘সুগার ড্যাডি’ টার্মটি নিয়ে মনে মনে তর্পণ করি। সুগার ড্যাডি হচ্ছে মূলত মাঝবয়সী বা বয়োবৃদ্ধ বিত্তবান পুরুষ, যিনি অল্পবয়সী কোনো মেয়েকে সঙ্গদান ও দৈহিক ভালোবাসার বিনিময়ে প্রদান করেন দরাজ হাতে গিফ্ট ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকাপয়সা। ধোঁয়ার রিং ছুড়তে ছুড়তে নাকাতুলে যেন স্বগতোক্তি করে, “হি ইজ ভেরি গুড, বাট আ বিট অব আ সেক্স ডেভিল।” আমি সাবধানে সেলোফোনের র‌্যাপার মুড়িয়ে পেন্সিল স্কেচটি তার ব্যাকপ্যাকে রাখি। তারপর কল্পনায় জুতা দিয়ে আধপোড়া সিগ্রেটকে পিষে নেভানোর মতো প্রতিক্রিয়াকে প্রশমিত করি।

কিছুক্ষণ আমরা কোনো কথাবার্তা বলি না। ফায়ার ব্রিগেডের ভ্যানটি অনেকক্ষণ হয় পাড়ি দিয়েছে উপত্যকার দিগন্তে ছাড়ানো প্রান্তর। এখন আঁকাবাকাঁ সড়ক বেয়ে ভ্যানটি ছুটে যাচ্ছে পাহাড় থেকে পাহাড়ে। পর্বতগুলোতে গাছপালা বৃক্ষলতা তেমন কিছু নেই। কী রকম যেন খাঁ খাঁ শূন্যতার ভেতর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছে শিলা পাথরের মন্সস্টারগুলো। দেখতে দেখতে পাথরের কালচে খয়েরি শরীর ধূসর হতে হতে ভরে ওঠে শুভ্রতায়। মাসেরু শহর থেকে যখন এ ভ্যানে চাপি, তখন নগরীর জনপদে ছলকে যাচ্ছিল ঝকঝকে রোদ। এখন ঘুম ভাঙতে দুস্বপ্নের মতো তা উবে গিয়ে আকাশ হয়ে এসেছে ভারী মেঘলা। আর গুঁড়িগুঁড়ি তুষারের শুভ্র হালকা পালকে ভরে যাচ্ছে গিরিকন্দর। নাকাতুলে গাড়ি স্লো করতে বলে। আমরা মালিবামাটসো নদীর সাদা ফেনায় জলচর পাখিদের সাঁতার কাটতে দেখি। সামনের সিট থেকে জংগল গাইড মাকগথলা মাবই ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চান, আমি ‘পিডিপিডি’ বা বেলেহাঁসের ছবি তুলতে চাই কি না? আমার ভেতরে কেন জানি উৎসাহ মরে আসছে, তাই কোনো জবাব দিই না।

ভ্যান স্পিড পিক করে আবার ছুটে চলে। পহাড়ের ঠিক কার্নিশে ঝুলে আছে টেনিস কোর্টের সমান একটি শিলাপাথরের সমতল চাকলা। ওখানে ভ্যান পার্ক করলে আমরা নেমে আসি। জায়গাটি অনেকটা লুক আউটের মতো। দূরে পরিষ্কার দেখা যায় কাটসে ড্যাম। টারবাইনে চূর্ণিত হয়ে জলবিদ্যুতের এ প্রকল্প থেকে পানি নেমে আসছে প্রপাতের ধারা প্রবাহে। তুষার ঝরা তীব্র শীতে কাবু হয়ে আমরা ফিরে আসি গাড়িতে। ড্রাইভার তীব্র দক্ষতায় মিনিট পনেরোর ভেতর আরেকটি বাঁক ঘুরে আমাদের নিয়ে আসেন কাটসে ড্যামের বেশ কাছাকাছি। বাঁকানো ব্রিজের মতো করে তৈরি একটি সিমেন্টের সড়ক লিসোটো হাইল্যান্ড ওয়াটার প্রজেক্টের বিখ্যাত বাঁধটিকে ঘিরে আছে। তার ওপর দিয়ে একজন মানুষকে অলস পায়ে হেঁটে যেতে দেখি। এদিকে কোনো তুষারপাত কিছু হচ্ছে না, ঘাসপাতা সমস্ত কিছু খটখটে শুকনা দেখে বড় অবাক লাগে।

বাঁধ ঘিরে সিমেন্টের সড়ক

ভ্যান গাড়িটি আবার চড়াই উৎরাই ভাঙে। আরো মিনিট তিরিশেক আমরা পথ চলি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি হ্রদের জল, তার অতলে প্রতিফলিত হচ্ছে বিশাল মেঘভাসা আকাশ। আমি গাড়ি থেকে নেমে হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে তার ভেতরবাগে জেগে ওঠা ছোট্ট দ্বীপাণুর দিকে তাকাই। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে গাড়িতে পোশাক চেঞ্জ করে নীলাভ ট্র্যাকস্যুট পরে বেরিয়ে আসে নাকাতুলে। তার পকেটে বাজছে সিডি ওয়াকম্যান। মৃদু মৃদু সুরধ্বনি শুনে আমি লিরিকটি চিনতে পারি—‘নো মোর ওয়াক ইন দ্য উড/ দ্য ট্রিজ হ্যাভ অল বিন কাট ডাউন।’ ১৯৭১ সালে লস এ্যঞ্জেলসে ‘দ্যা ঈগলস্’ নামে একটি আমেরিকান রক ব্যান্ডের গাওয়া গান। বছর তিন বা চারেক আগে জিম্বাবুয়েতে যখন নাকাতুলের সাথে প্রথম দেখা হয়, তখন আমি তাকে এ সিডিটি গিফ্ট হিসাবে দিই। সে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে বলে, “এ জায়গাটি তুমি দেখতে চেয়েছিলে। ডু ইউ রিমেমবার?” বিষয়টি এবার আমার মনে পড়ে।

কয়েক বছর আগে আমি ইউরোপীয় এক রাজকুমারের লেখা লিসোটো নিয়ে একটি ট্র্যাবেল একাউন্ট পড়ি। লিসোটোর রাজা গ্রিফিথ লিরোথলির মেহমান হয়ে রাজকুমার এখানে তিনদিন তাঁবু খাটিয়ে বাস করেন। তার বর্ণনাতে হ্রদের কোনো উল্লেখ নেই। তবে তিনি এখানে প্রচুর কনিফার বৃক্ষের চিরহরিৎ একটি উপবনের দৃশ্য বর্ণনা করেছেন। লিসোটোর এ অঞ্চলের পাহাড়ে গাছপালা তেমন কিছু জন্মায় না। তবে এখানে হঠাৎ করে সবুজের বিপুল সমারোহ দেখে রাজকুমার অবাক হয়েছিলেন তীব্রভাবে। তার তাঁবুর চারদিকে ছিল ‘ইরিকাস’ নামে এক ধরনের ঝোপ। তাতে ওড়াউড়ি করছিল অজস্র পাখি। তিনি ‘টুসোক’ বলে এক ধরনের দীর্ঘ ঘাসের উল্লেখ করেছেন যেখানে লুকোচুরি করছিল খরগোস। জলবিদ্যুত প্রকল্পের কারণে এখানে ওয়াটার রিজারভার হিসাবে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সরোবর। উপবনটি বরফে ডুবে গেছে তার তলায়। আমি নিসর্গপটের এ পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভ্যান গাড়িতে ফিরে যাই। নাকাতুলে গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলে, “লিসেন, উপবনের জলে নিমজ্জন নিয়ে আমি বাঁধতে চাচ্ছি একটি পালা গান। ঈগল নামে রক ব্যান্ডের করা গানটির স্ট্রাকচার থেকে সুরের অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। কিন্তু লিরিকের কথাগুলো ঠিক মতো সাজিয়ে উঠতে পারছি না। উইল ইউ হেল্প মি আ বিট?” আমি নোটবুক খুলে তাতে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে বলি, “জাস্ট ট্রাই টু ডেসক্রাইব ইন প্লেইন এন্ড সিম্পল সিসোটো লেংগুয়েজ...ইউরোপের রাজকুমার আবার যদি ফিরে আসেন, হোয়াট হি উইল সি..।” তখনই জংগল গাইড মাকগথলা মাবই ঘাড় ঘুরিয়ে বলেন, “পিডিপিডি.. পিডিপিডি...” আমরা জানালা দিয়ে তাকাই, দেখি সরোবরের জলে ঝাপিয়ে পড়ছে এক ঝাঁক বেলেহাঁস। আমি নাকাতুলের হাতে নোটবুক দিয়ে বলি, “ট্রাই টু ইউজ দিস ইমেজ এ্যজ ইয়োর হুক। সরোবরের জলে বেলেহাঁসের জল ঝাপটানো নিয়ে শুরু করো। তারপর ফিরে যাও আরেকটু পেছনে, বর্ণনা করো উপবনে তাঁবু খাটিয়ে রাজকুমারের বসবাস, আর টুসোক গ্রাসে খরগোসের ছোটাছুটি। চাইলে এ গাঁথাতে তুমি মেশাতে পারো খানিক কল্পনা, রাজকুমারের এনগেজমেন্ট রিংটি যে ঘাসের গুচ্ছে হারিয়ে গিয়েছিল সে কাহিনী।” সে চোখ বড় বড় করে জানতে চায়, “ওয়াজ দ্য প্রিন্স রিয়েলি লস্ট হিজ এনগেজমেন্ট রিং হিয়ার?” আমি বলি, “তুলিকা, নট রিয়েলি, ইন ফ্যাক্ট হি লস্ট হিজ রোলেক্স ওয়াচ। ঘাসের আড়ালে বসে থাকা খরগোসের ছবি তুলতে গিয়ে তার কব্জি থেকে চেন লুজ হয়ে খসে পড়ে ঘড়িটি। নাও ডিসাইড, গানের পালায় তুমি রোলেক্স ঘড়ির ডিটেল ব্যবহার করবে, নাকি জুড়ে দেবে এনগেজমেন্ট রিং হারিয়ে যাওয়ার কাল্পনিক গল্প? অল ইজ নাউ আপ টু ইউ।”

ভ্যান গাড়িটি আবার ছুটে চলছে বাঁকা হয়ে তিমি মাছের পেটের মতো ছোট ছোট উপত্যকা মাড়িয়ে ভিন্ন এক পাহাড়ের দিকে। নাকাতুলে উডপেন্সিলে পালাগানের লিরিকের বাক্য সাজাচ্ছে। আর থেকে থেকে পেন্সিলের গোড়ার রাবার দিয়ে কণ্ঠার কাছে চুলকাচ্ছে। তাতে লালচে বেগুনি হয়ে উঠছে তার ত্বক। এদিককার একটি পাহাড়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক কেতার অনেকগুলো কটেজ। আমরা গাড়ি থেকে নামি। ড্রাইভারও তার বেমক্কা কিসিমের ভারী শরীর নিয়ে নেমে পড়েছেন। তিনি শরীর বাঁকিয়ে হাতপা ছুড়ে বাতাসে ঘুষাঘুষির ভঙ্গি করে হাতপায়ের খিল ছোটাচ্ছেন। চোখ মুদে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে মুখ ব্যাদান করে হাঁপানি ও শ্লেষা জড়ানো কণ্ঠে তিনি গ-র-র-র আওয়াজ করছেন। ভদ্রলোকের অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয়, তিনি গণ্ডার ফন্ডারের সাথে মল্লযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জংগল গাইড মাকগথলা মাবই

নাকাতুলে ও আমি কটেজগুলোর মাঝ বরাবর তৈরি পিচঢালা পথে একটু হাঁটি। সাউথ আফ্রিকার এক তেজারতি কোম্পানি এ গ্রামটি তৈরি করেছে অনেকটা অলিম্পিক ভিলেজের কায়দায়। আমাদের পাশ দিয়ে জগিং করে ছুটে চলে শ্বেতাঙ্গ স্পোর্টসম্যানদের তিন চার জনের ট্রুপস্। কোনো কোনো কটেজের সামনের লনে শর্টস্ পরে স্বর্ণকেশী যুবতীরা খেলছে স্কিপরোপ। বারান্দায় বুকডন দিচ্ছেন মাথা কামানো তিনজন নওজওয়ান কিসিমের সাহেব। তাদের একজন আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লে তার মুখমণ্ডলকে দেখায়, প্রচুর মাখন আর গুঁড়ামরিচ দিয়ে ভাজা কাঁকড়ার মতো লালচে। নাকাতুলে বলে, জলবিদ্যুত প্রকল্প গড়ে ওঠার আগে এখানে ছিল দরিদ্র বাসোটো সম্প্রদায়ের মানুষদের টমালেতালি নামে একটি গ্রাম। এরা সকলে উচ্ছেদ হয়ে বর্তমানে বাস করছে মাসেরু শহরের বস্তিতে। তাদের সনাতনী কেতার কুটিরগুলো ভেঙেচুরে সাফসুতরা করে গড়ে তোলা হয়েছে অলিম্পিক ভিলেজের রেপ্লিকা। ইউরোপের স্পোর্টস করনেওয়ালা সাহেব মেমদের সন্তানাদি এখানে আসছে সস্তায় উইন্টার অলিম্পিকের প্রস্তুতি নিতে। আমি এবার নির্দ্দিষ্টভাবে জানতে চাই, “হোয়াট এলজ্ ডু ইউ নো তুলিকা আবাউট দিজ ভিলেজ? এ গ্রাম সম্পর্কে আমাকে কিছু তথ্য দিতে পারবে কি?” সে জবাব দেয়, “ড. ইনগ্রাম-হিল একটি স্থানীয় এনজিওকে নিযুক্ত করেছেন টমালেতালি গ্রামের বাস্তুহারাদের মাঝে ত্রাণ প্রকল্প করার জন্য। তারা ছোট্ট একটা সার্ভে করে রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাতে কিছু দুঃখজনক তথ্য আছে—এ গ্রামের কেউ কোম্পানির কাছ থেকে এখনো খেসারত হিসাবে কোনো টাকাপয়সা পায়নি। আর তরুণী মেয়েরা প্রায় সকলে শরীর বিক্রি করছে পর্যটকদের কাছে।”

ভ্যান গাড়ির দিকে হেঁটে ফিরতে ফিরতে আমরা আবার ঘাড় ঘুরিয়ে অলিম্পিক ভিলেজের পিকচারাস দৃশ্যপটের দিকে তাকাই। নাকাতুলে মন্তব্য করে, “ড. ইনগ্রাম-হিল ইজ রিয়েলি কাইন্ড টু দি পুওর হোমলেস পিপুল্ অব টমালেতালি ভিলেজ।” আমি বিরক্ত হয়ে বলি, “উনার প্রসঙ্গ পরে আলাপ করলে হয় না।” সে প্রথমে অবাক হয়, তারপর মুখে কঠিন ভাব ফুটিয়ে তুলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমাকে মোকাবেলা করে, “আই থিংক আই নিড টু ক্লারিফাই মাই রিলেশনশিপ টু ড. ইনগ্রাম-হিল।” আমি জবাব দিই, “নো, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু। তুমি তো বলেছো হি ইজ ইয়োর সুগার ড্যাডি। আর সুগার ড্যাডি হলে কী ধরনের সম্পর্ক হতে পারে এটা আমি বুঝতে পারি।” এবার সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে সে বলে, “আই লাইক ইউ টু আন্ডারস্ট্যান্ড দিস ইজ আফ্রিকা। লিসোটোতে মেয়েদের মনোগমাস হওয়ার কোনো রীতি নেই, শুনেছি ভারতবর্ষে এখনো অনেক মেয়ের এমন কি বিবাহবহির্ভূত একজন প্রেমিক থাকলেও তা নেগেটিভভাবে দেখা হয়।” আমি এবার অসহিষ্ণু হয়ে বলি, “তুলিকা, হোয়াই আর উই টকিং আবাউট দিস?” সে জবাব দেয়, “বিকজ, আই লাইক ইউ টু আন্ডারস্ট্যান্ড মি, আই অ্যাম আ বাসোটো গার্ল ইউথ নো মানি। ড. ইনগ্রাম-হিল হচ্ছেন মাকগোওয়া বা বিত্তবান শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। বিয়ের আগে একটি বাসোটো মেয়ের নিইয়াটসি বা মিসট্রেস হতে সামাজিক আপত্তি কিছু নেই। ১৯০১ সালে আমাদের রাজা মহান লিটসে লিরোথলি এধরনের সম্পর্ক অনুমোদন করে ফরমান জারি করে গেছেন।” আমি এবার আলোচনার কনক্লুসনে আসতে চেয়ে পকেট ডিকশনারি বের করে সরাসরি সিসোটো ভাষায় জানতে চাই, “ও থাবিলে” বা “আর ইউ হেপি তুলিকা?” সে ঠোঁট কামড়ে জবাব দেয়, “আই অ্যাম নট গোয়িং টু আনসার দিস টু ইউ, আন্ডারস্ট্যান্ড?” আমি মাথা হেলিয়ে বলি, “ইয়েস, আই ডু।”

আমরা চলে আসি ভ্যানের পাশে। ড্রাইভার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের তীব্রটানে দারুণভাবে হাঁপাচ্ছেন। মাকগথলা মাবই দেখি উবু হয়ে বসেছেন পাহাড়ের কার্নিশে। ভাবি এ ভদ্রসন্তানের প্রক্ষালনের প্রয়োজন হয়েছে। একটু পর তিনি হাঁটু ভাঁজ করা দু পায়ের ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে কানের লতি ছুঁয়ে কোলাব্যাঙের মতো লাফিয়ে ওঠেন। আর থেকে থেকে তার কন্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে আসে, “কা-ট-ছো পো-লা না-লা” ধ্বনি। ব্যাপার কী জানতে চাইলে নাকাতুলে বলে, “মাবই প্রার্থনা করছেন যেন ঝরে বৃষ্টি অজোর ধারায়, জংগল ভরে ওঠে পত্রপল্লব ও ঘাসপাতায়, আর প্রাণীদের যেন অনটন হয়না খাবারের।” এ ব্যাখ্যার পরও আমি তার আচরণ ভালো করে না বুঝলে সে আবার বলে, “একটু পর মাবই আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন জংগলে রাজার খাস মহালে। বাসোটো সম্প্রদায়ের মাঝে শিকারে যাওয়ার আগে বনানীর মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করার রেওয়াজ আছে। এতে করে বন্যপ্রাণীর সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।” মাকগথলা মাবই এবার তার গলায় ঝোলানো শিঙ্গা বাজিয়ে আমাদের ভ্যানে উঠে পড়ার ইশারা দেন। আমি বিরস বদনে নাকাতুলের পাশে বসতেই সে চোখের পাঁপড়ি কাঁপিয়ে বলে, “তোমার মতো যারা ঘুরে বেড়ায়, ট্র্যাবেল করতে ভালোবাসে, সিসোটো ভাষায় তাদের বলা হয় মোয়েতি। ইউ আর আ ফাইন মোয়েতি, এন্ড আই লাভ টু ট্রাবেল উইথ ইউ”—বলে হাত বাড়ালে আমি তার করতল স্পর্শ করি।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;