ভাষা রাজনীতি আধিপত্য



আহমেদ স্বপন মাহমুদ
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
কেবল এই মুল্লুকে নয়, ভাষা নিয়ে সর্বত্রই একটা জবরদস্তি লক্ষ করা যায়। এই জবরদস্তি অরাজনৈতিক নয়। বরং বেশি মাত্রায় রাজনৈতিক। কেবল ভাষা বলতে কিছু নাই, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভীপ্সা ছাড়া।

বাংলা ভাষার গতিপ্রকৃতি যদি লক্ষ করা যায়, তাহলে এটি একটি জবরদস্তিমূলক ভাষা, সন্দেহ নাই। আপনি যখন আপনার ভাষার আধিপত্য জারি রাখতে চান, রাজনৈতিকভাবেই তা রাখতে চান—অন্যের ভাষাকে আক্রমণ করে, দখল করে তা যেন জারি রাখতে হয়। আদিবাসীদের ভাষার দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গারো, তঞ্চইঙ্গা, চাকমা, মারমা ইত্যাদি বহু ভাষা খোদ বাংলা ভাষার আক্রমণের কারণে নাই হয়ে যাচ্ছে।

ভূখণ্ডের রাজনীতি ভাষাকে ভাষা হতে দেয় এবং দেয় না, ভাষার ওপর প্রভাব জারি রাখে এবং রাখে না। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ভাষা আর বাংলাদেশের ভাষার রাজনীতিকে এক বলে ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই, কখনো কখনো মিল থাকলেও। ভাষার আধিপত্য রাজনীতিরই আধিপত্য। এটি কি বাংলা ভাষার সাথে গারো ভাষার, বা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার সাথে বাংলাদেশের ভাষার তুলনামূলক রাজনীতির অংশ নয়!

আবার একই ভাষার নানা রূপ থাকে। ভাষা বাংলা বটেন, কিন্তু সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ বা বরিশালের ভাষার বিভিন্নতা ভাষার বৈচিত্র ও জীবনধারারই অংশ, যে জীবনপ্রবাহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

ভাষার আধিপত্যই ভাষাকে জীবিত রাখে, অন্য অর্থে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিস্তার ভাষাকে ভাষা হিসেবে জারি রাখে। কলকাতার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, হিন্দি ভাষার আগ্রাসন সেখানে কতটা। ইংরেজি ভাষার প্রভাব ও বিস্তার অরাজনৈতিক নয়, সারা দুনিয়া তা টের পাচ্ছে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে, ভাষা এক হলেও, সাহিত্য এক না। ইংরেজি সাহিত্য বলতে আমরা অস্ট্রেলিয় সাহিত্যকে বুঝি না। অস্ট্রেলিয়া, গ্রেট ব্রিটেন ও আমেরিকার ভাষা ইংরেজি। কিন্তু আমেরিকান সাহিত্যকে কেবল ভাষার অভিন্নতার কারণে ব্রিটিশ সাহিত্য বলি না। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য বলা তাই তেমন কোনো দোষের নয়। কারণ ভারতের প্রদেশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অভীপ্সা ভারতের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলন করে তার ভাষা দিয়েই, যেমনটা বাংলাদেশও। তবে শিল্প-নন্দন গুণাগুণ দেশকালের বাইরে, সে কথা আমরা জানি। ভাষা যখন তার অন্তরমর্মে পৌঁছে তখন ভাষা লুপ্ত হয়ে কেবল সুর ছড়ায়; যে কারণে সাহিত্যিকের বড়ত্ব ও মহত্ব, মহৎ শিল্পকর্ম দেশকালের সীমারেখা মানে না কোনোদিন।

কেউ কেউ দেশভাগের মর্মপীড়ায় বাংলাদেশের ভাষা ও সার্বভৌমত্বকে যদি ভারতের হাতে তুলে দেওয়াকে সমাধান মনে করেন, বা ভাষার ঐক্যকেই রাজনীতি ও সম্প্রীতির মূলমন্ত্র হিসেবে মনে করেন, তারা ভূগোলোর রাজনীতি ও সময়ের দায়কেই অস্বীকার করতে চান, এদেশের মর্ম ও স্বাধীনতাকেও তারা অস্বীকৃতি জানাতে চান বলে মনে করতে পারি আমরা। স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যে কারণে উজ্জ্বল, ভাষার রাজনীতিও সেই কারণে আলাদা, সাহিত্যও।
তবে ইতিহাস ভাষার দায় নেয় সময় সময়।

২.
ভাষা গড়ে ওঠে, পক্ব হয় এবং বিস্তার পায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে—এ কথা যেমন সত্য, একইভাবে ভাষা রসময় হয়, ভাষা মধুর হয় এবং বিচিত্র মাত্রায় অর্থপূর্ণ হয় সাহিত্যের কারণে। ভাষা তার সাধারণ ব্যবহারিক স্বভাব ছাড়িয়ে যখন ভাবে উন্নীত হয় তখনই ভাষার বহিরার্থ লুপ্ত হয় এবং বিবিধ অর্থ নিয়ে সে নতুন মাত্রায় প্রকাশ পায়। সম্ভবত এই কারণে নিরেট শব্দরাশি ভাষাকে কোনো সৌন্দর্য দেয় না, বরং প্রকৃত কাব্য ও সাহিত্য ভাষাকে সুন্দর করে তোলে এবং মনে আনন্দ দেয়। ধরুন, আমি বললাম—
এনা মেনা তেনা খান
সেনা ফেনা বেনা ধান।
উপর্যুক্ত শব্দগুলোর কোনো অর্থপূর্ণ তাৎপর্য নেই। এখানে এক ধরনের ছন্দের দোল আছে বটে, কিন্তু তা কবিতা হয় নাই। কিন্তু যখন কবি বলেন—
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই
তখন আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এই ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি কেবল ছন্দের দোলা নয়, মনকেই পুরোপুরি নাড়িয়ে দেয়। বেদনার্থ করে তোলে। এলোমেলো করে দেয়। এবং এক ধরনের বেদনার প্রশান্তিও দেয় মনে। ভাষার শক্তি এখানেই। সাহিত্যেরও। কারণ ভাষা লুপ্ত হয়ে তখন অন্য অর্থ ধারণ করে, মর্মমূলে ভাষা পৌঁছে দেয় গভীর অর্থপূর্ণ দ্যোতনা।

বলেছিলাম, ইতিহাস ভাষার দায় নেয় সময় সময়। উল্টা করে বললেও ভুল হবে না যে, ভাষা ইতিহাসের দায় বহন করে অনেক সময়। ইতিহাস বহন করে বলেই ভাষা সাক্ষ্য হয়ে উঠে আসে; ব্যক্তির ও ইতিহাসের, সমষ্টির। ধরুন, দেশভাগ নিয়ে কতজনের কত মর্মপীড়া। বহুজনের লেখাপত্রে, গল্পগুজবে, আলাপসালাপে শোনা যায় যারা এখনো পীড়িত বোধ করেন। বিভাজনের তাৎক্ষণিকতার পীড়া আছে বৈ কি! কিন্তু বিভাজনও সমষ্টির আকাঙ্ক্ষা হয়। এবং পূর্ণ হয় খণ্ড থেকে। ভাষার ক্ষেত্রেও এমনটি লক্ষ করা যায়। ভারতীয় ভূগোলের বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে খণ্ড থেকেই পূর্ণ হয় সমষ্টির স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে; কারো একক কোনো স্বপ্ন ও ইচ্ছায় নয়। বরং সমষ্টি একক হয়েই খণ্ডকে পূর্ণতা দেয়। স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড তাই অর্থপূর্ণ হয় ভাষায়, মাধুর্যে, তাৎপর্যে। দেশভাগ হয়তো ইতিহাসের দায়, কিন্তু ভাষাভাগ বলতে কি কিছু আছে?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভাষাভাগও আছে এবং সময়ের দায় বহন করে চলে। ১৯৪৭-এর দেশভাগ পূর্ণ থেকে খণ্ড নয়, পূর্ণ থেকে সে পুনরায় পূর্ণ হয়েছে। পাকিস্তান এরই নজির। বাংলাদেশও। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরির আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান—পূর্ববাংলা) কোনো প্রতিবাদ করেনি তখন। না ভাষার প্রশ্নে, না ধর্মের প্রশ্নে জোরালো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়। ইতিহাসে অদ্ভুত রকমের কাণ্ডও ঘটে! দেশভাগ সময়ের রাজনীতির প্রয়োজনে ঘটলেও ধর্মের প্রশ্নে এটি অদ্ভুত আচরণ করে! সংখ্যাগরিষ্ঠ সমগ্র পাকিস্তানের মুসলমান ভাষা নিয়ে তর্ক তোলেনি, বরং আনন্দের ঢেকুর তুলেছে; হিন্দুআধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে তারা নিজেরাই স্বতন্ত্র মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র পেয়েছে বলে।

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি তখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেনি, ভাষাকেও সামনে আনেনি, বরং দেখা যায়, বাংলার কবিসাহিত্যিকদের কেউ কেউ এই বিভাজনের পূর্ণতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এমনকি, অদ্ভুত, বায়ান্নে যখন বাংলাভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়নের জন্য আন্দোলন হয়, তখনও স্বাধীনতার প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়। যদিও বায়ান্নে ভাষা পুরোমাত্রায় রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ইতিহাসের দায় এখানেই।

৩.
ভাষা জীর্ণ হয় যেমন ভাষার গৌরবও জীর্ণ হয়। প্রতিদিন ব্যবহারে ভাষা পুরাতন হয়ে পড়ে, নতুন শব্দরাশি এসে ভাষাকে নতুনত্ব দেয়। সাধারণ্যের অলক্ষেই ঘটে এসব। সময় যেমন ভাষার ধারক, আবার সময়ই ভাষাকে, ভাষাভঙ্গিকে বদলে দেয়। যে কারণে ভাষা কোনো একক, স্থির নির্দিষ্ট বিষয় বা বস্ত নয়, না নির্দিষ্ট কোনো অভিব্যক্তি। কারণ নতুন সময় নতুন ভাষা নতুন অভিব্যক্তিই ভাষার শক্তি। আর পুরাতন ভাষার ঐতিহ্য, ইতিহাসের সাক্ষ্য, রাজনীতি-অর্থনীতির স্মারক।

ভাষার গুরুত্ব লোপ পায়, ভাষাও বিলুপ্ত হয়। বিলুপ্ত হয় ঐতিহ্য, রজনীতি, শক্তি ও ইতিহাস। প্রতিদিন হাজার হাজার শব্দ, শত শত ভাষা এই জগৎ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন শব্দ। কিন্তু ভাষার বিলুপ্তির সাথে জনপদের আশা-আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নও বিলুপ্ত হয়। কেবল ভাষা নয়, এই প্রাণবৈচিত্রময় জগতের অনেক প্রাণসম্পদ বিলুপ্তির সাথে সাথে ভাষা ও আচার বদলে যায়। ভাষা ও প্রকৃতি তাই একক ও বৈচিত্রময়। কারণ নতুন নতুন শব্দের উদ্ভব যেমন হয় প্রকৃতি ও বিজ্ঞান থেকে, মানুষের স্বপ্ন ও উপলব্ধি থেকে একইভাবে শব্দের বিনাশও প্রকাশের শক্তিমত্তার বিনাশ করে, ভাবিভঙ্গির বিনাশ করে। মনে রাখা দরকার, ভাষার বিনাশ প্রকৃতিরও বিনাশ, বৈচিত্রেরও বিনাশ। এবং এই বিনাশ প্রাকৃতিক নয়, বরং অধিকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক।

নতুন নতুন শব্দের, রীতির, ভাষাভঙ্গির ও ভাষাশৈলির উদ্ভব ও প্রকাশ ঘটে সাধারণত লেখক ও কবি সাহিত্যিকদের হাতে। এইক্ষেত্রে কাব্যসাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, ভাষাভাণ্ডারে তার অবদানের কারণেই। কিন্তু সমাজের উৎপাদন, ভোগ ও বিনিময় রীতি ভাষার আদলকে বদলে দেয়, ভাষাকাঠামোর ভঙ্গি পরিবর্তন করে এমনটিই লক্ষ করা যায়। আবার এমন বললেও অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ভাষা নিজেই উৎপাদন, ভোগ ও বিনিময় রীতি ঠিক করে। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে ভাষার নতুন অভিব্যক্তি ও প্রকাশ লক্ষ করা যায়। নাট-বল্টু-স্ক্রু ইত্যাদি শব্দ যেমন কারখানায় হরহামেশা বলা হয়, এবং তাদের অর্থের তারতম্য হয় প্রকাশ্যে, একইভাবে ভার্চুয়াল জগতে গুগল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি শব্দ পুরো প্রকাশব্যবস্থা ও যোগাযোগ আদান-প্রদান ব্যবস্থাকে আমূলে বদলে দিয়েছে। এবং এইগুলে কেবল শব্দ নয় বরং একেকটি প্রতিষ্ঠান যা ব্যবসাবাণিজ্যের অনুঘটক হয়ে কাজ করছে সমাজের উৎপাদন ও ভোগ ব্যবস্থায়।

এখানে অর্থনীতির যোগসূত্রই কেবল নয়, অর্থাৎ ভাষার অর্থনীতিই শুধু নয়, ভাষার রাজনীতিও সমানভাবে উপস্থিত ও ক্রিয়াশীল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শুধু মতপ্রকাশের উন্মুক্ত জায়গা নয়, এটি একইসাথে রাজনীতি ও অর্থনীতির জায়গা। মুক্তবাণিজ্য অর্থনীতির কালে এ নিয়েও রমরমা বাণিজ্য, বাণিজ্যের রাজনীতিও সক্রিয়। অন্যদিকে, ভাষাবাণিজ্য তো রয়েছেই। আমরা দেখছি, কী করে ইংরেজি ভাষা সারা দুনিয়ায় নিজে বাণিজ্য করছে এবং অপরাপর ভাষার বিনাশ করছে। এই বিনাশ সহসা বোঝা না গেলেও তা টের পাওয়া যায় সমাজের রীতিনীতি ও প্রকাশভঙ্গির ওপর নজর দিলে। বাংলা ভাষার বিস্তার নেই এমন নয়, কিন্তু একইসাথে বাংলা যে বিনাশের পথে তা সহজেই অনুমেয়। একটু বাড়িয়ে বললে, এই ভাষাবিনাশ রাষ্ট্রের জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিনাশের অংশ নয়—এমন বলা যাবে না।

   

কোরবানি



শাহেদ শফিক
কোরবানি

কোরবানি

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি তো হাজির হে আমার রব
তোমার প্রিয় ঘরে
উজাড় করে দিতে পারি সব
প্রভু তোমার তরে।

নত মনে আজ তোমার চরণে
সঁপেছি এই শীর
তুমি তো মহান, চির অম্লান,
মালিক ধরিত্রীর।

আজ দূর হয়ে যাক মনের পশু
ধুয়ে যাক সব জিদ
জাগ্রত হোক কণ্ঠে সবার
বাজুক তোমার গিদ।

তুমি তো আমায় দিয়েছিলে রব
জগতের সব কিছু।
আমি তো ছুটেছি জীবন জুড়ে
পাপের পিছু পিছু।

কী দিয়ে তোমার, সুধিবো ঋণ
নেই যে কিছু আর
তাই তো প্রভু তোমার সকাসে
ছুটি বারং বার।

আজ দূর হয়ে যাক সব বেধাবেধ
পড়রে কালিমা
হিংসা বিভেদ, ফাসাদ ভুলিয়া
ছড়াক মহিমা।

১৭ জুন ২০২৪।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

;

কদম



আকিব শিকদার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঋতুটি শরৎ এখন পঞ্জিকার পাতায়।
বর্ষার আমেজ কাটেনি বুঝি, সারাটি আকাশ
কালো করে নামে বৃষ্টি।
একটানা ভিজে শালবন, মহুয়ার কিশলয়। সতেজ হয়-
লতানো পুঁইয়ের ডগা।

এ বর্ষণ দেখার সৌভাগ্য আমার নেই। দূর পরবাসে
বসে আমি ভাবি- আহ, কি সহজেই ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম
প্রিয় ফুল কদমের কথা...!
পড়ার টেবিলে দুটো কদম, আষাঢ় শ্রাবণে তরতাজা দুটো কদম
জিইয়ে রেখেছি কতো-
কাচের বোতলে। ভেজা বাতাসে কদমের হালকা সুবাস।
তিনটে বছর, মাত্র তিনটে বছর
ভুলিয়ে দিলো চব্বিশ বছরের বর্ষার স্মৃতি, যেন চব্বিশ বছর
পরাজিত তিন বছরের পাল্লায়।

পরিজন ফোন করে খবর নিতে- ‘কি পাঠাবো বল...?
কাঠালের বিচি ভাজা, চিনে বাদাম, ঝুনা নারকেল
নাকি আমের আচার...?’-ওদের তালিকায়
আমার পছন্দ অনুপস্থিত।

সাহেবদের বিলেতী ফুলের ভীড়ে
ঠাঁই নেই কদমের-
যেমন আছে কাঁদা মাটির সুঁদাগন্ধ ভরা বাংলায়।
ক্যালেণ্ডারের পাতায় দেখি
ফুটফুটে কদমের শ্বেত রেণু বিনিময়, আর অন্তরে অনুভবে
রূপ-রস-গন্ধ।

;

একগুচ্ছ কবিতা



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পরাবাস্তবতা-জাদুবাস্তবতা
আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব অথচ বাস্তবের অধিক
অসম্ভব তবু প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার শঙ্কা জাগায়
তারই নাম পরাবাস্তবতা
অন্যভাবে বলতে জাদুবাস্তবতা:
যেমন, এই যে আশ্চর্য সকাল
এর কতtটুকু তুমি দেখো
কতটুকু আমি
আর কতটুকু দিগন্তের ওপাশে অদেখার!
জলের উপর একলা মুখ ঝুঁকিয়ে থাকা
শেষবিকেলের মর্মবেদনা জানে
শিরীষ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ভাসমান পাতা
তুমি আর আমি কতটুকু জানি!
অর্থবোধ্য সীমানা পেরিয়ে
আমাদের যাতায়াত নেই
এমন কোনো ঠিকানায়
যার দিক নেই, চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই!

সম্পর্ক

প্রিজমের টুকরোয় ছিটকে পড়া আলোয়
অধ্যয়ন করছি সম্পর্ক
সম্পর্কের উত্থান-পতন
বাঁক ও শিহরণ
লগ-ইন বা লগ-আউটে
নিত্য জন্মাচ্ছে নতুন সম্পর্ক
সম্পর্কের বিভিন্ন রং
লিখে লিখে মুছে দিচ্ছে ফেসবুক
সন্তরণশীল সম্পর্ক খেলা করছে
মানুষের জীবনের বহুদূরের ভার্চুয়ালে
সম্পর্ক হয়ে গেছে স্বপ্নময় জগতে
মনকে জাগ্রত রাখার কৌশল

জোনাকি

দূরমনস্ক দার্শনিকতায়
রাতের পথে যারা আসে
তারা যাবে দিগন্তের দিকে
আত্মমগ্ন পথিক-পায়ে।
এইসব পদাতিকের অনেকেই আর ফিরবে না
ফিরে আসবে অন্য কেউ
তার চিন্তা ও গমনের ট্র্যাপিজ ছুঁয়ে
অন্য চেহারায়, অন্য নামে ও অবয়বে।
তারপর
গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে সরল রেখায়
আলোর মশালে জ্বলে উঠবে
অনুভবের অসংখ্য জোনাকি।

নিঃসঙ্গতা

নিঃসঙ্গতা শীতের কুয়াশার মতো প্রগাঢ়
তমসাচারী মৃত পাখির নিঃশব্দ কুহুতান-স্মৃতি
নিহত নদীর শ্যাওলাজড়ানো জলকণা
দাবানল-দগ্ধ বনমর্মর:
মায়ায় মুখ আড়াল করে অনন্য বিমূর্ত বিবরে
নিঃসঙ্গতা কল্পলোকে রঙ মাখে
নীলাভ স্বপ্নের দ্যুতিতে
অস্তিত্বে, অনুভবে, মগ্নচৈতন্যে:
জীবনের স্টেজ অ্যান্ড স্ক্রিনে!

আর্কিওপটেরিক্স

পনেরো কোটি বছরের পাথরশয্যা ছেড়ে তিনি
প্রত্নজীববিদের টেবিলে চলে এলেন:
পক্ষী জীবাশ্ম দেখে প্রশ্ন শুরু হলো পৃথিবীময়
‘ডানার হলেই তাকে পাখি বলতে হবে?‘
তাহলে ‘ফ্লাইং ডাইনোসরস‘ কি?
তাদের শরীরে রয়েছে ডানা, কারো কারো দুই জোড়া!
পাখি, একলা পাখি, ভাবের পাখি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান
বিজ্ঞানী থেকে বিপ্লবী কবিগণ
আর্কিওপটেরিক্স কি পাখির আদি-জননী?

;

কবি অসীম সাহা আর নেই



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি অসীম সাহা মারা গেছেন। ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

মঙ্গলবার (১৮ জুন) বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বিষযটি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

তিনি জানান, মাঝখানে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অসীম সাহা মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। অল্প ক’দিন আগেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আজ শুনি তিনি আর নেই। বর্তমানে অসীম সাহাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাকে দেখতে সেখানেই যাচ্ছি।

অসীম সাহার শেষকৃত্য সম্পর্কে তাঁর ছোট ছেলে অর্ঘ্য সাহা বলেন, তাঁর বাবা মরদেহ দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কবি অসীম সাহা। চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষণ্নতায় ভুগছেন কবি। এছাড়া পারকিনসন (হাত কাঁপা রোগ), কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়াবেটিস রোগেও আক্রান্ত হন।

১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নানারবাড়ি নেত্রকোণা জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন কবি অসীম সাহা। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগে। সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

;