বই ও বইমেলা



আন্দালিব রাশদী
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

“বই মৃত। পঞ্চদশ শতকের প্রযুক্তিতে পৌরসভার আবর্জনার গাড়িতে তুলে দিন।”
একুশের বইমেলা সামনে রেখে এমন ভয়ঙ্কর কথা শুনলে কাগজ-ছাপা বইয়ের ভক্ত পাঠক মেজাজ তো খারাপ করবেনই। অমন কথা যিনি বলবেন প্রথম ছাপাখানার কারিগর গুটেনবার্গের (Gutenberg) বিদেহী আত্মা রেগেমেগে তার ঘাড়ও মটকে দিতে পারে।

ইউহানেস গুটেনবার্গ (১৩৯৮-৩ ফেব্রুয়ারি ১৪৬৮)

“বই মৃত—এ কথা বলা বন্ধ করুন। বই আগের চেয়েও বেশি জীবিত।”
আমরা বই বলতে যা বুঝি তার দিন কি শেষ? ডিজিটাল বিপ্লব কি ছাপাখানার যুগের অবসান ঘটাচ্ছে? এমন কি যখন ১৯৩৯ সালে যখন প্যাঙ্গুইন পেপারব্যাক প্রথম প্রকাশিত হলো, অনেকেই ভবিষ্যৎবাণী করেছেন প্রকাশনা শিল্পের বারোটা বেজে গেছে। যখন হোম ভিডিও এলো, শুনেছি সিনেমার দিন শেষ। এমন কি ছাপাখানা আবিষ্কারের পর ক্যাথলিসিজমের বিদায়ঘণ্টা বাজার আশঙ্কাও করাও হয়েছে।

যখন কাদামাটি কিংবা ধাতব প্লেটে বই লেখা হতো সেই লেখকরাও শুরুতে ভাবেননি প্যাপিরাস এসে ভারী ভারী এক একটা বই হঠিয়ে দিয়ে কম পরিসরে বই হিসেবে বছরের পর বছর টিকে থাকবে।

বহনযোগ্য ধাতব টাইপ ব্যবহার করে ১৪৫৫ সালে একালের প্রথম বই গুটেনবার্গ বাইবেল প্রকাশিত হয়। টাইপ তৈরির জন্য জন্য যে মণ্ড তৈরি করা হয় তাতে শিসা, টিন ও এন্টিমনি ব্যবহার করা হয়।

গুটেনবার্গ যন্ত্র আবিষ্কারের ৬০০ বছর আগেও চীনে দু একটি করে বই ছাপা হয়েছে কিন্তু বেশি সংখ্যায় ছাপার সূচনা গুটেনবার্গ যন্ত্রের মাধ্যমে।

প্রাচীন মিশরে প্যাপিরাসে লিখিত চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রথম বই

জার্মানির গুটেনবার্গ বিপ্লব রেনেসাঁ, রিফর্মেশন, দ্য এজ অব এলাইটেনমেন্ট ও সাইন্টিফিক রেভ্যুলুশন-এর পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তারপর ৫৪০ বছর কেটে যায়। মুদ্রণশিল্পের অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। তারপরও বই কিন্তু কাগজ, ছাপাখানা, বাঁধাই—এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। 

১৯৯৫ সালে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, দেখা যায়, পড়া যায়, সযত্নে রেখে দেওয়া যায় এমন একটি বই বিক্রি হলো। বইয়ের লেখক ডগলাস হফসতাদার (Douglas Hofstadter), বইয়ের নাম Fluid Concepts of Creative Analogies : Computer Models of the Fundamental Mechanisms of Though—গুটেনবার্গ প্রযুক্তি বাস্তব হুমকির মুখে পড়ল।

গুটেনবার্গের মতোই একটানা লেগে থেকে যিনি এ কাজটি করলেন তিনি জেফ বেজোস নামের আমেরিকান এক যুবক, জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৯৬৪। তিনিই আমাজন ডট কম-এর প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৯৭ সালে, মাত্র দু বছরের মাথায় আমাজন দাবি করে বসল যে এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান। খান্দানি বইয়ের দোকানগুলো চটে গেল। বার্নস অ্যান্ড নোবেল মিথ্যাচারের অভিযোগ এনে আমাজনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল ১৯৯৭-র মে মাসে। তাদের দাবি এটা আদৌ কোনো বইয়ের দোকান নয়, বরং জেফকে বলা যায় বইয়ের দালাল। ১৯৯৮-তে ওয়ালমার্ট মামলা করল, আমাজন তাদের ব্যবসায়ের গোপন সূত্র চুরি করেছে।

জেফ বেজোস

জেফ বেজোসের তখন এমনিতে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। মামলার কারণে নয়, ক্ষতি সামলে উঠতে পারছেন না। এরই মধ্যে টাইম ম্যাগাজিন আর্থিক দৈন্যদশায় ডুবে থাকা মানুষটিকে ১৯৯৯ সালে ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করল।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বইয়ের দোকানের মালিকরা স্থানীয় ট্যাক্স অফিসের স্বীকৃতিটুকু কেবল পেয়েছেন আর টাইম ম্যাগাজিন আমাজনের মালিক হিসেবে তাকে ‘বছরের সেরা ব্যক্তি’ নির্বাচন করেছে।


দ্য গার্ডিয়ানের সমীক্ষায় (২০০৮) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দশটি বইয়ের দোকান হচ্ছে:
১০. হ্যাচার্ড (১৯৯৭-তে প্রতিষ্ঠিত, লন্ডনের পিকডিলিতে)
৯. কিবুনসিয়া (জাপানের কিয়োটোতে)
৮. এল পেনডুলো (মেক্সিকো সিটি)
৭. পোসাডা (ব্রাসেলস)
৬. স্কার্থিন বুকস (ক্রমফোর্ড)
৫. বোর্ডারস্ (গ্লাসগো)
৪. হেডকোয়ার্টার্স কমিক বুকস্টোর (লস অ্যাঞ্জেলেস)
৩. লিব্রারিয়া (লন্ডন)
২. এল অ্যাটেনিও (বুয়েনস আইরেস)
১. বোয়েখান্দেল সেলেক্সিজ ডোমিনিকানেন (মাসট্রিখট)


কানাডার টরোন্টোর এই বইয়ের দোকানটির নামই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বইয়ের দোকান

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এর তালিকায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান নিউ ইয়র্ক সিটির ফিফথ অ্যাভিনিউ-র বার্নস অ্যান্ড নোবেল কলেজ বুকস্টোর। ফ্লোরস্পেসের হিসেবে ধরলে এটিই সর্ববৃহৎ। বার্নস অ্যান্ড নোবল বইয়ের দোকানের ৭৬৯টি ক্যাম্পাস শাখা।

কিন্তু শেলফ স্পেস বিবেচনা করলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ডের পলওয়েল’স বুকস। টরোন্টোর একটি বইয়ের দোকানের নামই ছিল ওয়ার্ল্ডস বিগেস্ট বুকস্টোর। তিনতলা ভবনের তিনটি তলাতেই মোট ২০ কিলোমিটার শেলফ জুড়ে কেবল বই আর বই। ১৯৮০-তে প্রতিষ্ঠিত এই বইয়ের দোকানটি ২০১৪ সালে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ভবনটি গুঁড়িয়ে ফেলা হয়। এখানে চারটি রেস্তোরাঁ নির্মিত হয়।

বার্নস অ্যান্ড নোবল বইয়ের দোকানের আছে ৭৬৯টি ক্যাম্পাস শাখা

আমাজনের ধাক্কা পৃথিবীর সব বড় বড় বইয়ের দোকানে লেগেছে। ২০০১ সালে আমাজন প্রথম লাভের মুখ দেখে। এখন আমাজনের কর্মচারীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৫৫ হাজার। আর জেফ বেজোস পৃথিবীর পঞ্চম শ্রেষ্ঠ ধনী, সম্পদের পরিমাণ ৭০.৪ বিলিয়ন ডলার। তিনি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাটিও অনেক খরিদ্দারকে টেক্কা মেনে কিনে নিয়েছেন। তিনি বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছেন সনাতন প্রকাশনা জগতকে। ই-বই ছাপা-বইকে মার দেবেই। ছাপা বই সাড়ে পাঁচশত বছর রাজত্ব করেছে, আর কত?


কেন ই-বইয়ের জন্য পক্ষপাত বেড়েই যাবে, আমরা যারা প্রযুক্তির সড়কে পা রাখতে পারব না পিছিয়েই পড়ব, তার কিছু কারণ জানলে বরং ভালো
১. ই-বুক হচ্ছে গ্রিন বুক (লিবিয়ার মুয়ামের গাদ্দাফির গ্রিন বুক নয়)—পরিবেশ বান্ধব বই। বইয়ের কাগজ উৎপাদনের জন্য একটি গাছও কাটতে হবে না।
২. বাসায় বই রাখার কোনো জায়গা না থাকলেও সমস্যা নেই। ই-বুক নিজের জায়গা করে নেবে।
৩. ঘরে বসে তাৎক্ষণিক ই-বুকের সরবরাহ নেওয়া যাবে। বইপত্র আমদানি-রফতানির আইন কানুন ও প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করা যাবে।
৪. বইয়ের জন্য গাড়ি ভাড়া দিয়ে এ দোকানে ও দোকানে এ লাইব্রেরিতে ও লাইব্রেরিতে ছুটোছুটি করতে হবে না।
৫. ফটোকপি করা স্ক্যান করা এসব ঝামেলা পোহাতে হবে না।
৬. ই-বুক গুদামজাত করার জন্য গুদামঘর লাগে না, বড় দোকান লাগে না। ব্যবহারের জন্য বিশাল লাইব্রেরি লাগে না। ল্যাপটপ কি রিডিং ডিভাইসে হাজার বই সঞ্চিত রাখা যায়।
৭. বাসে ট্রেনে প্লেনে স্টিমারে কোর্ট কাচারিতে যে কোনো জায়গায় পড়া সম্ভব।
৮. অতি সহজে বহন করা যায়। শত মেট্রিক টন ওজনের বইও ই-বুক হিসেবে অনায়াসে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, এক দেশ থেকে অন্যদেশে নিয়ে যাওয়া যায়।
৯. ই-বুক পরিবহনে রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হবার কোনো আশঙ্কা থাকে না।
১০. ই-বুক বাজারজাত করার সময় মেগা স্টোরের যে কোনো পণ্যের মতো বোনাস দেওয়া যায়। মূল্যমানের ওপর পয়েন্ট দেওয়া যায়। পয়েন্ট ঠিক টাকার মতোই আরো বই কিনতে সুযোগ করে দেয়।
১১. ই-বুক লিঙ্ক ধরিয়ে দিয়ে জ্ঞানের আরো জানালা খুলে দেয়।
১২. ই-বুকে পাতা উল্টে উল্টে খোঁজার দরকার হয় না, সার্চ দিয়েই নির্দিষ্ট বিষয় বের করা যায়।
১৩. ই-বুক পাঠাতে, আনাতে প্যাকেজিং করাতে হয় না, শিপিং খরচও নেই।
১৪. কাগজে ছাপা অবস্থায় পড়তে চাইলে কোনো সমস্যা নেই, কেবল প্রিন্টার থাকলেই হলো। ই-বুক থেকে কমান্ড দিয়ে মুদ্রিত পাতা পাওয়া সম্ভব।
১৫. ই-বুক আরামে পড়ার জন্য ফন্ট সাইজ ছোট-বড় সোজা-ইটালিক যেমন ইচ্ছে করা যায়।
১৬. ই-বুকের বিপণন ও বিতরণ অত্যন্ত সহজ। শুধু দরকার ব্যবহারকারীর ভালো নেটওয়ার্ক।
১৭. ই-বুক বৈষম্য দূর করে। কসমোপলিটান সিটিতে হোক কি অজপাড়া গাঁয়ে—ই-বুকে সবার প্রবেশাধিকার সমান।
১৮. কম্পিউটারের সামনে যেহেতু আপনাকে অনেকক্ষণ থাকতেই হচ্ছে, আর একটি উইন্ডো খুলে একই সঙ্গে আপনার প্রিয় লেখকের বইটিও পড়তে পারেন।
১৯. খেতে খেতে শুয়ে শুয়ে যে কোনো সময় যে কোনো অবস্থায় ই-বুক পড়তে পারেন।
২০. ভুলবশত মূল্যবান বইটি কোথাও হারিয়ে ফেলার কিংবা লোপাট হতে দেবার সুযোগও নেই।
২১. আইপ্যাড, আইফোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহার করে বই পড়া যায়।
২২. বইয়ের প্যাসেজ সার্চ করা, স্কিমিং করা ই-বুকে খুব সহজ হয়ে গেছে। হাইলাইট করা ও আংশিক অনুবাদ করাও সহজ ব্যাপার।
২৩. বাধ্যতামূলক মিটিং, কনফারেন্স বিরক্তিকর বক্তৃতা—এসব এড়াতে ই-বুক শ্রেষ্ঠ সহায়ক। চেয়ারটা দখল করে অমনি পড়তে বসে যান।
২৪. ই-বুক পড়ার জন্য সন্ধ্যা কিংবা রাতের ভূমিকা নেই। অন্ধকারেও বিষয়ভিত্তিক পাঠ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
২৫. একহাতে নিয়ে পড়া চালিয়ে যেতে পারেন।
২৬. পৃষ্ঠা ভেঙে রাখার কোনো দরকার হবে না।
২৭. ডিকশনারি কেনার দরকার নেই। কম্পিউটারে কিংবা রিডিং ডিভাইসে ডিকশনারি থাকছেই।
২৮. ই-বুক যদি কষ্ট করে না পড়তে চান তাহলে অডিও অপশনে গিয়ে শুনুন, অন্যকেউ পড়ে শোনাবে; ভিডিও দেখতে পারেন।
২৯. চব্বিশ ঘণ্টার যে কোনো সময় ই-বুক কিনতে পারেন; যে কোনো দিন, যে কোনো মাস, যে কোনো বছর—কোনো ছুটি নেই ই-বুক শপে।
৩০. ই-বুকের দাম ছাপা বইয়ের সিকিভাগেরই কম।
৩১. একবার আগুন ধরিয়ে দিতে পারলে ছাপা বইয়ের পুরো লাইব্রেরিই ভষ্মীভূত করে ফেলা সম্ভব। ই-লাইব্রেরি আগুন আগুন আতঙ্কে নেই।
৩২. উঁইপোকার সাধ্য নেই ই-বুকে কামড় বসায়।
৩৩. বই বহন করে কোমর ব্যথার দিন ফুরোবে।


বইমেলা
১৪৫৫ সালে জোহানেস গুটেনবার্গ উদ্ভাবিত ছাপাখানায় মুদ্রিত হলো পৃথিবীর প্রথম বই। তার পরপরই স্থানীয় বই বিক্রেতারা ফ্রাঙ্কফুর্টের পাশেই একটি উপশহরে আয়োজন করলেন পৃথিবীর প্রথম বইমেলা। এই মেলাতে পাণ্ডুলিপি বেচাকেনাও চলেছে। সপ্তদশ শতক পর্যন্ত এই মেলা নিয়মিতই চলেছে। তখন এটাই ছিল ইউরোপের, বরং বলা যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা। পরে মহাসমারোহে লিপজিগ বইমেলা চালু হলে ফ্রাঙ্কফুর্ট মার খেয়ে যায়। রাজনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্র তখন লিপজিগ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত ও দ্বিখণ্ডিত জার্মানির পশ্চিমাংশে ১৯৪৯ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের সেইন্ট পল চার্চে আবার বইমেলা শুরু হয়। এর উদ্যোক্তা প্রকাশক ও বই বিক্রেতারাই। ক বছরের মধ্যেই ফ্রাঙ্কফুর্ট হারানো গৌরব ফিরে পায়—আকারে বৈচিত্র্যে ও আর্থিক লেনদেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য হালে জনসমাগমের হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করছে ইতালির তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা চার্চের বাইরে ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রতিবছর অক্টোবরে ৫ দিনের এই মেলায় প্রথম তিনদিন কেবল বাণিজ্যিক দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। মেলার স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে রয়েছেন প্রকাশক, লেখক, সম্পাদক, লেখক ও প্রকাশনের এজেন্ট, বই ব্যবসায়ী, লাইব্রেরিয়ান, শিক্ষাবিদ, চিত্রশিল্পী, অনুবাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, মুদ্রণকারী, বাণিজ্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, সফটওয়ার ও মাল্টি মিডিয়া সরবরাহকারী, ইলেক্ট্রনিক রিডিং ডিভাইস সরবরাহকারী এবং অবশ্যই বৃহত্তর পাঠক গোষ্ঠী।

১৯৭৬ থেকে প্রতিবছর একটি দেশকে গেস্ট অব অনার হিসেবে মেলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়, সে দেশের সাহিত্য হয় মেলার থিম। ২০১৭-র বইমেলায় ফ্রান্স ছিল গেস্ট অব অনার এবং ফরাসি সাহিত্য এর থিম। ২০১৬-তে গেস্ট অব অনারে ছিল ফ্ল্যান্ডার্স ও নেদারল্যান্ডস আর থিম ফ্লেমিশ ও ডাচ সাহিত্য। ২০১৮-তে গেস্ট অব অনার জর্জিয়া, ২০১৯ সালে নরওয়ে। এ বছরের মেলায় অতিথি দেশ কানাডা।

ফ্রাঙ্কফুর্ট ও তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা ছাড়া প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাইপেই, কলকাতা, নয়াদিল্লি, জেরুজালেম, ডাবলিন, প্যারিস, বোলোনা, ব্যাঙ্কক, লন্ডন, বোগোটা, বুয়েলস আইরেস, আবুধাবি, জেনেভা, প্রাগ, উয়ারশ সওল, নিউ ইয়র্ক, কেপটাউন, টোকিও, বেইজিং, মস্কো, কলম্বো, বার্সেলোনা, ইস্তাম্বুল ও শারজাহ বইমেলা। ঢাকার মাসব্যাপী একুশে বইমেলা তো রয়েছেই।

আগামী দিনের বইমেলা কেমন হবে ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলা এর মধ্যেই তার একটি বার্তা দিয়ে দিয়েছে। ২০১১-র বইমেলায় ৪৭ শতাংশ প্রদর্শক তাদের মুদ্রিত পণ্যের সাথে ডিজিটাল পণ্যের প্রদর্শনীও করেছে। প্রদর্শকদের মধ্যে ৭ শতাংশ কেবল ডিজিটাল সামগ্রীরই প্রদর্শনী করেছে। আর এই হার ক্রমেই বেড়ে আসছে। পঞ্চাশ বছর পর ২০৭০ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় কেবলমাত্র ছাপা-বই প্রদর্শকের অনুপাত যদি ৭-এ নেমে আসে আমরা অবাক হব না।

ইত্যাদি
২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে আমেরিকার বেস্ট সেলার ফিকশন লেখক জেমস প্যাটারসন তখনকার ডলার-টাকা বিনিময় হার অনুযায়ী কামিয়েছেন ৫০১ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। দিনের কামাই ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা। ১৬ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশের সকল ফিকশন লেখক মিলে এক বছরে জেমস প্যাটারসনের এক দিনের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারেননি—এটা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়।

হ্যারি পটার সিরিজের জন্য এক বছরে জে কে রাউলিং কামিয়েছেন ৫০০ মিলিয়ন ডলার। চোরাবাজারের ডলারের দর অনুযায়ী প্রতিদিন ৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা; জেমস প্যাটারসনের পাঁচগুণ। তিন বছরে এক মুদ্রণের ৫০০ বই বেচতে আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রকাশকরাও হিমশিম খেয়ে যান।

এমন ঘটনা ইউরোপেও ঘটে। ১৭১৬ সালে কপটিক থেকে ল্যাটিনে ভাষান্তরিত নিউ টেস্টামেন্টের ৫০০ কপির মুদ্রণের শেষ বইটি বিক্রি হয়েছে ১৯০৭ সালে। ১৯১ বছরে ৫০০ কপি বইয়ের সদগতি হওয়া একটি বিশ্বরেকর্ড। এটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে ওদের বইয়ের গুদামে উঁই নেই?

আমেরিকান স্কুল জরিপে পাওয়া একটি তথ্য : বাইরের বই পড়ে না এ সংখ্যাটিই বেশি। কিন্তু তাদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বই পড়ে না, যারা পড়ে না তাদের ভয়ে। বইয়ের পাঠক জানতে পারলে ছাত্রটিকে অন্যান্যদের বুলির শিকার হতে হয়। এটা বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে।

সেরা ৩০ লেখক
সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন ড্যানিয়েল বার্ট তাদের একশো জনের একটি তালিকা করেছেন। বিশ্বজুড়ে অনূদিত হয় তাদের রচনাবলী। সেই তালিকার প্রথম ৩০ জন—১. উইলিয়াম শেকসপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬) ২. দান্তে অ্যালিঘেরি (১২৬৫-১৩২১) ৩. হোমার (খ্রিস্টজন্মের ৭৫০ বছর আগে জন্মেছেন বলে অনুমান) ৪. লেভ তলস্তয় (১৮২৮-১৯১০) ৫. জিওফ্রে চসার (১৩৪০-১৪০০) ৬. চার্লস ডিকেন্স (১৮১২-১৮৭০) ৭. জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) ৮. জন মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪) ৯. ভার্জিল (খ্রিস্টপূর্ব ৭০-১৯ অব্দ) ১০. ইউহান উলফগ্যাঙ্গ ফন গ্যায়টে (১৭৪৯-১৮৩২) ১১. মিগুয়েল সার্ভেন্টিস (১৫৪৭-১৮৩২) ১২. মুরাকামি শিকিবু (৯৭৮-১০৩০) ১৩. সোপোক্লেস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৬-৪০৬ অব্দ) ১৪. উইলিয়াম ফকনার (১৮৯৭-১৯৬২) ১৫. ফিউদর দস্তয়েভস্কি (১৮২১-১৮৮১) ১৬. টি এস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) ১৭. মার্শেল প্রুস্ত (১৮৭১-১৯২২) ১৮. জেইন অস্টিন (১৭৭৫-১৮১৭) ১৯. জর্জ এলিয়ট (১৮১৪-১৮৮০) ২০. উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) ২১. আলেক্সান্ডার পুশকিন (১৭৯৯-১৮৩৭) ২২. ইউরিপিডেস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০-৪০৬ অব্দ) ২৩. জন ডান (১৫৭২-১৬৩১) ২৪. হারমান মেলভিল (১৮১৯-১৮৯১) ২৫. জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) ২৬. ওভিদ (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩-১৭ অব্দ) ২৭. তু ফু (৭১২-৭৭০) ২৮. উইলিয়াম ব্ল্যাক (১৭৫৭-১৮২৭) ২৯. অ্যাস্কিলাস (খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫-৪৫৬ অব্দ) ৩০. গুস্তাব ফ্লবেয়র (১৮২১-১৮৮০)।

ড্যানিয়েল বার্ট প্রভাব বিস্তারকারী ১০০ জন সাহিত্যিকের তালিকা করেছেন। তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ‘ইংলিশ বায়াস’ স্পষ্ট; ইংরেজি সাহিত্যের কম গুরুত্বপূর্ণ লেখকও জায়গা করে নিতে পেরেছেন। এই তালিকায় অ-ইংরেজ লেখকদের মধ্যে আরো রয়েছেন—ফ্রানৎজ কাফকা, মলিয়ের, থোমাস মান, হেনরিস ইবসেন, আন্তন শেখভ, ভ্লাদিমির নবোকভ, বালজাক, স্তাদাল, ফ্রান্সেস্কো পেত্রার্ক, আলবেয়ার কামু, ভোলতেয়ার, মার্কেজ, বোর্হেস প্রমুখ।

বই নিয়ে আরো কথা
বই হচ্ছে একটি আয়না। একটি গাধা যখন এই আয়নার দিকে তাকাবে সে একটি ঘোড়া দেখবে এটা আশা করা উচিত নয়। গ্রন্থ-সভ্যতার সূচনা থেকে এ পর্যন্ত বহুবার লাইব্রেরিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। যে কোনো একনায়ক ও স্বৈরাচারী শাসক ও তার সৈন্যবাহিনীর আক্রোশের শিকার হয় বইপত্র। বইয়ের অগ্ন্যুৎসব অবশ্যই অপরাধ। তবে জোসেফ ব্রডস্কি বলেছেন, আগুন দিয়ে বই পোড়ানোর চেয়েও বড় অপরাধ আছে। সেগুলোর একটি হচ্ছে—বই না পড়া।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;