আমেরিকা: উপনিবেশ থেকে স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
একদার উপনিবেশ আমেরিকা এখন একক বিশ্বশক্তি, ছবি: সংগৃহীত

একদার উপনিবেশ আমেরিকা এখন একক বিশ্বশক্তি, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক ও অর্থনীতির শীর্ষস্থানের অধিকারী, বর্তমান বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র একদা ছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অধীনস্থ কলোনি বা উপনিবেশ। আমেরিকার নানা অঞ্চল ছিল ইউরোপের নানা দেশের দখলে। সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে দেশটি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মতাদর্শ গ্রহণ করে বিশ্বসেরা হয়েছে। উপনিবেশ থেকে আমেরিকার স্বাধীন ও শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র রূপে গড়ে উঠার ইতিহাস অনেকেরই আগ্রহ ও মনোযোগের বিষয়।

আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সন্নিহিত অঞ্চলের দেশগুলো আবিষ্কৃত হয় ষোড়শ শতকে। জন ক্যাবট নামক একজন ইংরেজ প্রশাসক সর্বপ্রথম আমেরিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছান এবং মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ইত্যাদি এলাকায় বসতি স্থাপন করেন।

অবশ্য তারও আগে, ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের পতাকা বহন করে আমেরিকা মহাদেশের বর্তমানের পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করেন। কলম্বাসের দেখানো সমুদ্রপথ ধরে অপরাপর স্প্যানিশ দখলদারগণ পুরো দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশকে অধীনস্থ করেন। কেবল ব্রাজিল বাদ পড়ে স্প্যানিশ আগ্রাসন থেকে। ব্রাজিলে কায়েম হয় আরেক ঔপনিবেশিক দখলদার পর্তুগালের কর্তৃত্ব।

জন ক্যাবট দ্বারা আমেরিকায় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশটির পূর্ব-উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্রিটেনের তৎকালীন রাজা সপ্তম হেনরি’র শাসন কায়েম হয়। যেহেতু ক্যাবট ছিলেন একজন ব্রিটিশ, তাই তিনি সপ্তম হেনরির হাতে শাসন ক্ষমতা তুলে দেন।

এরইমাঝে আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে এবং স্থানীয় আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের নিধন ও নির্মূল করে উপনিবেশ তৈরি হতে থাকে। উপনিবেশ গঠনের কাজে আফ্রিকা থেকে শত শত জাহাজ ভর্তি করে কালো মানুষদের দাস হিসাবে নিয়ে আসা হয়। চলতে থাকে দাস ব্যবসা এবং অবাধে সম্পদ লুণ্ঠন। নিউল্যান্ড বা নিউ ওয়ার্ল্ড নামে পরিচিতি সদ্য-আবিষ্কৃত নতুন অঞ্চল আমেরিকা ভূখণ্ডটি ইউরোপীয় নানা দেশের শোষণ, নির্যাতন ও আধিপত্য কায়েমের ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ইতিহাস জানাচ্ছে যে, ইংরেজরা বর্তমান আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে দখল করলেও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের আজকের ফ্লোরিডা ও আশেপাশের এলাকায় শাসন প্রতিষ্ঠা করে স্পেন। ফরাসিরা নোভো-স্কটিয়া অঞ্চলে, ওলন্দাজ বা ডাচগণ হাডসন নদীর উপত্যকায় এবং সুইডিশরা ডেলাওয়ার অঞ্চলে নিজেদের উপনিবেশ কায়েম করে।

 
বিশ্বের কর্তৃত্বে আমেরিকা, ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের কর্তৃত্বে আমেরিকা, ছবি: সংগৃহীত 

ঐতিহাসিক তথ্য মতে, আমেরিকার প্রথম স্বীকৃত উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০৭ সালে, জেমস টাউন-এ। ১৭৩২ সালে পুরো অঞ্চলে উপনিবেশের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩টিতে এবং সকল উপনিবেশই ছিল ইউরোপের বিভিন্ন শক্তির দখল কর্তৃত্বে।

১৬৬৪ সালে ব্রিটিশরা ওলন্দাজদের হটিয়ে দিয়ে ওলন্দাজ-অধিকৃত অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এরপর স্পেন-অধিকৃত অঞ্চলেও ইংরেজরা নিজেদের শাসন কায়েম করতে সক্ষম হয়। অবশেষে ১৭৬৩ সালে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধে জয়ী হয়ে ইংরেজরা সমগ্র আমেরিকার উপর নিজেদের দখল ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ব্রিটিশ অধিকৃত সমগ্র আমেরিকায় উপনিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সেখানে তীব্র হয় স্বাধীনতার আন্দোলন, যা মাত্র ১৩ বছরের মাথায় ভেঙে পড়ে ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে। ১৭৭৬ সালে ১৩টি উপনিবেশ একত্রে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লড়তে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের মুক্তির দাবিতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। উপনিবেশগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতা ও ঐক্যের পাশাপাশি নিজস্ব সামরিক বাহিনীও গড়ে তুলে। ৪ জুলাই, ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর করে ১৩টি উপনিবেশের নেতৃবৃন্দ।

৪ জুলাই (১৭৭৬) তারিখটি আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কারণ, এদিনে স্বাধীন-সার্বভৌম আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সূচনা হয়। বর্তমানেও ৪ জুলাই সেদেশের স্বাধীনতা দিবস রূপে পালিত হয়।

তবে ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশের কবল থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অবয়বটি সম্পূর্ণ হয় দীর্ঘ শাসনতান্ত্রিক আলাপ-আলোচনা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৮৭ সালে সর্বপ্রথম আমেরিকার সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৩টি রাজ্য নিয়ে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। দেশটি প্রজাতান্ত্রিক নীতিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃত্ব শাসিত হওয়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করে।

দুই বছর পর ৪ মার্চ, ১৭৮৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সকলের সম্মতির ভিত্তিতে কার্যকর হয়। সংবিধান অনুযায়ী মার্কিন সংসদে দুটি কক্ষ থাকে। একটি নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি সভা (হাউস অব রিপরেসেনটিটিভ) এবং অপরটি উচ্চকক্ষ বা সিনেট। একই বছর ৩০ এপ্রিল প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসাবে জর্জ ওয়াশিংটন এবং উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে জন অ্যাডামস নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণ করেন।

প্রাথমিকভাবে ১৩টি রাজ্য নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০টি। এর বাইরে ফেডারেশন শাসিত রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, পাঁচটি মেজর টেরিটোরি ও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র দ্বীপও রয়েছে বিশাল এ দেশের মধ্যে।

আধুনিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ১৭৭৬ সালে শুরু হয়ে ২৪৪ বছরের আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ইতিহাস ২৩৩ বছরের। বলা বাহুল্য, আজকের এই মহাশক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু শুরুতে এতো প্রবল ছিলনা। ছিল সাদা আর কালোর গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। যে কারণে প্রায় আড়াই শ বছরের পুরনো রাষ্ট্র হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বশক্তি হিসাবে অতি নবীন।

কারণ রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ১৫০ বছর আভ্যন্তরীণ সমস্যার মোকাবেলা ও পুনর্গঠনের কাজে ব্যস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এই সময়কালে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণে দেশটির বিদেশ নীতি ইচ্ছুক ছিলনা। মার্কিনি পররাষ্ট্র নীতির ইতিহাসে এই সময়কালকে বলা হয় ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী পর্যায়’।

তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবলভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, বিশেষত ১৯৪০ সাল থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে দেশটি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অগ্রসর হয়, যার ফলে মহাযুদ্ধ বিজয়ের অন্যতম নির্ণায়ক শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তারপর স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা যুদ্ধকালীন উত্তপ্ত দ্বিমেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ব্লকের বিপরীতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ব দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব হলে বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে আসীন হয় যুক্তরাষ্ট্র। এবং কঠিন পথ পেরিয়ে উপনিবেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে ক্রমে একবিংশ শতকের পৃথিবীতে একক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;