ট্যুরিস্ট হটস্পট পুষ্কর



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভারতের রাজস্থান রাজ্যে ইতিহাসের স্পর্শময় বহু স্থাপনা ও জনপদের পাশাপাশি রয়েছে দুটি ধর্মীয় পবিত্র স্থান। একটি হল মুসলমানদের কাছে অতীব প্রিয় আজমির শরিফ আর অন্যটি হিন্দুদের তীর্থস্থল পুষ্কর।

ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও এসব স্থান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্যকর আবাস রূপে পরিচিত। যে কারণে সারা বছর পর্যটকদের ভিড় উপচে পড়ে। বিশেষত পুষ্করকে বলা হয় ভারতের ট্যুরিস্ট হটস্পট।

আজমির আর পুষ্কর হল 'প্রাকৃতিক টুইন সিটি'। নাগ পাহাড় আজমির আর পুষ্করকে পৃথক করেছে। পাহাড়ে দুই পাশের দুই উপত্যকায় শহর দু'টি অবস্থিত।

রাজস্থানী ড্রাইভার সুখবিন্দর আজমির থেকে পুষ্কর যেতে ১০ কিলোমিটার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরুতে জানান নানা তথ্য। বিশেষত, এই মোহনীয় পথে বহু বিখ্যাত হিন্দি ছবির রোমান্টিক দৃশ্যের চিত্রায়ন হয়েছে। মরুভূমির দৃশ্য দেখাতেও বেছে নেওয়া হয়েছে পুষ্করকে। কারণ, পাহাড়ের ঢালে যে পুষ্কর, সেখান থেকে মরুভূমির শুরু। তারপর বিশাল থর মরুভূমি গিয়ে মিশেছে একদিকে কচ্ছের রানে, একদিকে গুজরাতে আর অন্য একদিক দিয়ে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে।

ফলে ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে পুষ্কর গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সমতলের সবুজ আর মরুময় ঊষর ভূমির শেষ সাক্ষাত আর কৌশল জনক বহু স্থানে যাওয়ার পথের শুরু। এসব ছাড়াও পুষ্করের রয়েছে ধর্মীয় তাৎপর্য।

হিন্দু শাস্ত্রমতে, সৃষ্টিকর্তা বলে মান্য করা হয় 'প্রজাপতি ব্রহ্মা'কে। ব্রহ্মা ছাড়াও হিন্দুদের আরও ৩৩ কোটি দেবতা আছে বলে পুরাণ অনুযায়ী জানা যায়। সারা পৃথিবীতে যেখানে যত হিন্দু রয়েছে, সেখানেই গড়ে উঠেছে নানা হিন্দু দেবতাদের মন্দির। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, শত শত দেবতার শত শত মন্দির থাকলেও সমগ্র পৃথিবীতে ব্রহ্মার মন্দিরের সংখ্যাটা মাত্র একটিই। রাজস্থানের পুষ্করে এই মন্দিরটি অবস্থিত।

পুষ্করের ব্রহ্মা মন্দির সম্পর্কে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত। জানা যায়, এটি তৈরি করা হয়েছিল সেই ১৪’শ শতকে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মন্দিরটি ২ হাজার বছরের পুরনো। বলা হয়ে থাকে, মন্দিরটি স্বয়ং ঋষি বিশ্বমিত্র তৈরি করেন। সেই প্রাচীন মন্দির আর নেই। ১৮০৯ সালে পার্শ্ববর্তী মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া রাজবংশের মন্ত্রী গোকুল পারেখ মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।

ব্রহ্মা মন্দিরের সামনে মহা ভিড়। ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে দেখি শত শত ভক্ত আসা-যাওয়া করছেন। গাঢ় গোলাপি রঙের এই মন্দির ৫০ টি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। এর দু'ধারের দোকানে পাওয়া যায় পূজা সামগ্রী। রাজস্থানের লোকশিল্প, রাজপুত তরবারি, ছোরা, ক্যামেল লেদারের সামগ্রী, কাঁসা, পিতলের তৈজসপত্র, বিচিত্র ভাস্কর্য ছড়িয়ে আছে গ্রামীণ হাট বা মেলার আবহে নির্মিত শত শত দোকানে।

ড্রাইভার সুখবিন্দরই জানান, মহাভারত আর রামায়ণেও তীর্থ স্থান হিসেবে উল্লেখ আছে পুষ্করের নাম। তিনি নিয়ে চললেন, মন্দিরের কাছেই পুষ্কর সরোবরে। এর পাড়ে আছে ৫২টি ঘাট । অন্তত ৪০০ মন্দির আছে সরোবরটিকে ঘিরে। আছে মঠ আর মসজিদও।

কথায় কথায় জানা গেলো, পৌরাণিক মতে, ব্রহ্মা একবার যজ্ঞ করবার কথা ঠিক করেন আর হাতের থেকে পদ্মফুল ছুড়ে দেন। তিনি স্থির করেন ফুল যেখানে গিয়ে পড়বে, সেখানেই যজ্ঞ করবেন। ফুলটি এসে পড়ে এখানে (পুষ্করে), যার থেকে দুটো পাপড়ি খসে পড়ে কাছাকাছি দুটি জায়গায়। ফলে তিন জায়গায় সরোবরের সৃষ্টি হয় । ব্রহ্ম কর বা হাত থেকে ফেলা পুষ্প থেকে এর সৃষ্টি বলে এর নাম হলো পুষ্কর। মূল পদ্মটি যেখানে পড়েছিল তার নাম জ্যেষ্ঠ পুষ্কর। এর তিন কিলোমিটার দূরে মধ্যম পুষ্কর। তার পাশেই হল কনিষ্ঠ পুষ্কর। পুষ্করের আরেক নাম এজন্য নীলপদ্ম শহর।

পুষ্করে আরও আছে রঙ্গনাথজির মন্দির, বরাহ মন্দির, রাজবৈকুন্ঠর মন্দির, অষ্টপাটেশ্বর মন্দির ও অজগন্ধেশ্বর মন্দির। অষ্টপাটেশ্বর মন্দির সম্বন্ধে বলা হয়, স্বয়ং ব্রহ্মা নাকি এখানে শিবের অষ্টপটেশ্বর নামে লিঙ্গ স্থাপন করে পূজা করেন।

পুষ্কর সরোবরের পশ্চিম দিকে সাবিত্রী পাহাড় আর উওর দিকে গায়ত্রী পাহাড়। সাবিত্রী পাহাড়ের উপর ব্রহ্মার পত্নী সাবিত্রী মাতার মন্দির। পুষ্করকে মন্দিরের শহর বললে ভুল হয়না।

আজমির থেকে পুষ্করকে পৃথক করেছে যে নাগ পাহাড়, তাতেও রয়েছে অনেক মন্দির। থর মরুভূমির একেবারে ধারে অবস্থিত পুষ্করে সম্মিলিত হয়েছে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ধারা। এখানে উটের বাজার আর রাজস্থানী লোকজ কারুশিল্পের বিখ্যাত বাজার সারা বছরই বসে। আর চলে বারো মাসে তেরো পার্বণ। পুষ্করে প্রতিদিন কোনও না কোনও মেলা বা মন্দিরের প্রার্থনা চলছেই। ফলে সাংবৎসরিক জনসমাগম এখানকার সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

তবে, কার্তিক পূর্ণিমাতে মোহনীয় রূপ ধারণ করে পুরো জনপদ। পুষ্কর সরোবরের পাশে অক্টোবর মাসে ৫ দিন ব্যাপী পুষ্করমেলাও বসে। সে মেলায় গরু, ছাগল আর ভেড়াও বিক্রি হয় বটে, কিন্তু উটকে কেন্দ্র করেই মূলত জমে এই মেলা । এ মেলা শুরুই হয় উট দৌড়ের প্রতিযোগিতা দিয়ে। তাছাড়া পুষ্করে সারা বছরই উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে ডেজার্ট সাফারি করা যায়। সারি সারি উট এজন্য বিচিত্র রঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে অপেক্ষমাণ।

বিশিষ্ট হিন্দুতীর্থ পুষ্কর সম্পূর্ণভাবে আমিষ-বর্জিত এলাকা। মাছ, মাংস, ডিম দূরস্থ, পেয়াজ বা রসুনের গন্ধও পুষ্করে পাওয়া অসম্ভব। তবে বহু রকমের পানীয় পাওয়া যায় পুষ্করে, যার অধিকাংশই রাজস্থান বা থর মরু অঞ্চলের দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি এবং এসবের মধ্যে নেশা ও মাদকতার প্রাধান্য রয়েছে।

ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা জীবনে একবার হলেও বিশ্বের একমাত্র ব্রহ্মা মন্দিরের শহর পুষ্করে আসতে চেষ্টা করেন। ফলে সারা বছরই চলছে ভিড়। ব্রহ্মা মন্দিরের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পাই, জনারণ্যে বিদেশিদের সংখ্যা অনেক। ভারতে যে কয়েকটি স্থান পর্যটক সমাগমের নিরিখে শীর্ষে, পুষ্কর তার অন্যতম। মেলা, লোকশিল্প, লোকজ সামগ্রী আর উত্তর ও পশ্চিম ভারতের গ্রামীণ লোক ঐতিহ্যের ছোঁয়া পেতে বিদেশিরা হোটেলে, তাঁবুতে ঠাঁই নেন।

চলে আসার পথে ক্রমশ অপস্রিয়মাণ পুষ্করের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখি, অস্তায়মান সূর্যের রক্তিমাভা লেকে, পাহাড়ে, মন্দিরের শিখরে সৃষ্টি করেছে এক পৌরাণিক আবহ।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;