রাহুর আরোহী



রাশিদা সুলতানা
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
সকাল থেকে হেনা কেঁদেছে। ঘরের কোনায় বাসি হাঁড়ি ডেকচি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিছানা ছেড়ে কলপাড়ে যায় হাঁড়িপাতিলসহ। তার পড়শি হাসনা কলপাড়ে ডেকছি মাজছে। “অগো নিজেগো ভাতারেরা কী করে হেইডার ঠিক নাই, আমার জামাই আমার লগে কানল না হাসল এই খবরের লাইগা পাগল হয়া যায়।” হাসনা কার উদ্দেশে এই বাক্যবাণ ছুঁড়ছে হেনার জানতে আগ্রহ হয় না। আকাশে কালো মেঘ ঘন হয়ে উঠেছে। ঝড় আসবে। হেনা ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। পাশের রান্নাঘর থেকে আসা চ্যাঁপা-শুঁটকির গন্ধে বাতাস আচ্ছন্ন হয়ে আছে।

নর্দমা, ডাস্টবিন, ঘুপচিগলি, আর কুচকুচে কালো পানির পুকুরের পাশ দিয়ে তার বড় ভাই এসে অন্ধকার ঘরে ঢোকে। রামপুরা থেকে এসেছে। বিছানায় তার পায়ের কাছে বসে বলে, “বাচ্চাডা যখন উল্টাপাল্টা পোলাপানের লগে মিশতে শুরু করছে তখনই এই সর্বনাশ হইছে। একটা মাত্র বাচ্চা তোর, কার লগে মিশে, কই যায়, কোনো খোঁজ তুই রাখতে পারস নাই।”

“মাস্টরি ছাইড়া তার পিছে ঘুরলে আমার পেটের ভাত কে জোগাইত?”

ঝড়ের প্রবল তোড়ে টিনের চাল উড়ে যাবার উপক্রম। বাতাসের সাথে উড়ে-আসা শুকনা পাতা, ধুলা আর কাঁকর ঘরের অন্ধকারের সাথে মিশে একটা পরাজাগতিক আবহ তৈরি করেছে। টিমটিমে সাত-ওয়াটের বাল্বটা নিভে যায়। ভাই বোন কেউই উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে না।

“কিন্তু আমার পোলা তো খুন করে নাই, দাদা। যেই লোকের মার্ডার কেসে ঢুকাইছে, সেই বেটা মরার সময় আরিফ আমার লগে কুমিল্লায় ছিল। ভাবিও তো গেছিল আমাদের সাথে। তোমরাও তো জানো আমার পোলা খুনি না। ফুঁপিয়ে কাঁদে হেনা। “আরিফের বন্ধুরা কইছে, এমপি সাহেবই আরিফরে মার্ডার কেসে ঢুকাইছে। এমপির খাতিরের এক লোকেরে আরিফ দুই বছর আগে সবার সামনে চড় মারছিল। আবার কেউ কয় যে এমপি সাহেব এলাকার ডাইলের ব্যবসা কন্ট্রোল করে। মুক্তিযোদ্ধা এমপি। যেন মুক্তিযুদ্ধ সব আকাম জায়েজ করনের লাইসেন্স।”

“কিন্তু তোর পোলা তো শুনছি ফেনসিডিলও ধরছিল।”

“হঁ, ধরছে তো। এমপি কুত্তার বাচ্চার লগে যহন মিশছে তহনই ধরছে। সে তো এলাকার হিরোইন, ফেনসিডিল সব ব্যবসা কন্ট্রোল করে।” তারপর ক্লান্ত গলায় বলে, “দাদা, আমার সব শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধের সময় থিকা সব হারাইতে শুরু করলাম। শেষ ছিল আমার বাচ্চাটা, সেইটাও গেল এখন।” চোখ গড়িয়ে পানি কানের দুপাশ দিয়ে চুলের ভিতর ঢোকে। গভীর অবসাদে পেয়েছে তাকে। গায়ের কাঁথা দু গালের মেচেতা-পড়া মুখ-অবধি টেনে নেয়। ভাইকে পাশে বসা রেখেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে, কিংবা ঘুমের ওপর হাওয়ায় ভাসে। আধো-ঘুম-আধো-জাগরণে মন জুড়ে উঁকিঝুঁকি দেয় কত হারানো সুখ, হারানো মুখ...

২.
সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি। ঘুম ভেঙে হেনা সকালের নাস্তা তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রী বারান্দার টেবিলে বসে। উঠানের দেয়ালের পাশেই পাহাড়ে সুবিশাল পত্রপল্লব নিয়ে শালগাছ মৌনী দাঁড়িয়ে আছে। উঠানের কোনায় মরিচগাছ। মরিচ পেকে লাল হয়ে আছে। শ্যাওলা-ঢাকা বাউন্ডারি ওয়ালে রশি বেয়ে পুঁইশাক শাখাপ্রশাখা নিয়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে যতদূরসম্ভব। হেনার স্বামী হামিদ কর্ণফুলী রেয়ন মিলের হিসাবরক্ষক। রেয়ন মিলের স্টাফ কলোনিতে তাদের একতলা বাসার সামনেই উঁচু পাহাড়ের চূড়া বৃষ্টিতে ধূসর হয়ে আছে। চার বছরের ছেলে আরিফ তার ছোট ফুটবলটি দেয়ালে, উঠানে, জানালায় ছুঁড়ে মারছে।

আরিফকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করে হেনা। তার গলায় ‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল’ গানটি খানিক পর-পর আপনি-আপনিই থেমে যাচ্ছে। হেনার স্বামী ফিসফিসিয়ে বলে, “গান বন্ধ করো। বিহারী-পাকিস্তানিগো সাথে তোমার যা পিরিতি, তোমারে আইসা হয়তো দুইতিনদিনের মধ্যে খুন কইরা যাইব।” স্বামীর আশঙ্কা ও আতঙ্ক হেনার মাঝেও সঞ্চারিত হয়। বাইরে যে কোনো পদশব্দে হেনা চমকে ওঠে। হামিদ আবারও বলে, “কয়দিন আগে শুনলাম ঢাকায় মিলিটারি নাইমা সব মানুষ মাইরা ফালাইতেছে। তারপর শুনি এইখানকার, মানে চন্দ্রঘোণার বাঙালিরা বিহারিগোরে মাইরা ফালাইতেছে, তোমারে তো কালকেই কইছি আমাগো অফিসের ফিরোজ খান আর তার বউয়ের লাশ পাওয়া গেছে কর্ণফুলী নদীতে। এখানকার বাঙালিরা দুইজনরেই জবাই কইরা পানিতে ভাসায়া দিছে।”

ফিরোজ খান রাস্তায় হেনাকে দেখলেই বলত, “আসসালামু আলাইকুম, ভাবিসাহাব। ক্যায়সি হ্যাঁয় আপ?” লোকটার বিনয়ী সম্ভাষণ হেনার মাথায় ঘুরেফিরে বারবার আসে। গতকাল সারারাত একবিন্দু ঘুম হয় নাই তার।

বৃষ্টির পানি দেয়াল বেয়ে ওঠা পুঁইয়ের পাতায় পড়ছে। পানির ফোঁটার চাপে পুঁইপাতা নুয়ে পড়ছে একটু পর-পর। হামিদ বাজারে যেতে চাইলে হেনা বাধা দেয়। “বৃষ্টি থামলে বিকালে গলির সামনের দোকানের থিকা চাইল, ডাইল, ডিম, পিঁয়াজ কিনা নিয়া আইসো, বাজারে যাওয়ার দরকার নাই।” দরজায় মৃদু টোকার শব্দে দুজনেই চমকে ওঠে। হামিদ বলে, দরজা খুইলো না। আগে ফুটা দিয়া দ্যাখো কে আসছে।” হামিদ গজগজ করে, “পাকিস্তানিগো লগে তোমার পিতলা-খাতিরের কারণে কপালে কী আছে খোদা জানে।”

হেনা কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, “কে দরজায়? কে?”

“বাজি, বাজি, দরওয়াজা খুলো না।” দরজা খুলতেই শাহজাদি তার দশ বছরের ছেলে ওসমানসহ তটস্থ ঘরে ঢুকে যায়। “বাজি, হাম আপকো ঘরমে পানা চাইয়ে, হামারা বাচ্চেকে আপলোগ বাঁচাইয়ে।” অনুময় করে তার দশ বছরের ছেলে ওসমানকে তাদের ঘরে আশ্রয় দিলে সে আজীবন তাদের গোলাম হয়ে থাকবে। হেনারা দুজনেই নীরব। আকাশী রঙের সালওয়ার-কামিজ-পরা শাহাজাদি ওড়নার কোনা দিয়ে নাক মুছছে। হেনার দু হাত চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শাহজাদি আবারও বাংলা উর্দু মিশিয়ে বলে, বাচ্চাটাকে জীবন ভিক্ষা দাও শুধু, কোথাও লুকিয়ে রাখো।

হেনা স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। হামিদের চেহারা কঠোর এবং নিস্পৃহ। সে বলে, “আমাদের বিপদ ডেকে আনতে চাই না, প্লিজ, আপনারা চলে যান এখান থেকে।”

বিস্ময় ও কৌতূহল-ভরা দু চোখে সবাইকে দেখে ওসমান। ফর্সা গোলগাল মুখ, আল্লাদি একজোড়া চোখ, পায়ে কালো চামড়ার স্যান্ডেল, গায়ে খয়েরি সালওয়ার, কুর্তা, মাথাভর্তি রেশমি-কালো চুল, হাতে কালো রঙের কাঠের ঘোড়া। ঘোড়াটা হাত ফসকে মাটিতে পড়ে হেনার খাটের নিচে ঢুকে যায়। খাটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে ঘোড়া আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ওসমান। ঘোড়ার কাছেই ধুলামাখা বল। হাত ছিন্ন, মুণ্ডু ছিন্ন প্লাস্টিকের পুতুল।

হামিদ নিজেই দরজা খুলে দেয়, “প্লিজ, আপনারা চলে যান এখান থেকে।”

ওরা চলে গেলে হেনা ডুকরে ওঠে, “আল্লাহ তোমারে এত বড় সীমার বানাইয়া পাঠাইছে!” হামিদ চোখ রাঙিয়ে বলে, “নিজের জান বাচাঁও আগে।” এরপর আর সারাদুপুর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো বাক্যবিনিময় হয় না। বাতাসে উড়ে-উড়ে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নামছে পাহাড়ে। বৃষ্টির পানি পেয়ে দেয়ালের গায়ে শ্যাওলা আভিজাত্যে, গরিমায় ফুলে উঠেছে। বিকালে হামিদ বিছানা ছেড়ে উঠে যায়। হেনা ঘুমাতে চেষ্টা করে। দরজায় করাঘাত, হামিদের কণ্ঠস্বরে দরজা খুলে দেয় হেনা। বাজারের ব্যাগটা হাতে তুলে দিতে-দিতে হামিদ বলে, “ওসমানের বাপ, মা আর ওসমানরে মাইরা কর্ণফুলিতে ভাসায়া দিছে। ওসমানরে জায়গা দিলে ওরে খুঁইজা না পাইয়া হয়তো আমাগোরেও মাইরা ফেলত।”

হেনা চিৎকার করে ওঠে, “তোমার জন্য বাচ্চাডা মরছে। আমরা তো দুইতিনদিনের মধ্যে দেশের বাড়ি বা ইন্ডিয়া কোনোখানে যামু গিয়া, ওরে আমাগো সাথে নিয়া যাইতে পারতাম না? স্বার্থপর, ভিতু!”

হামিদ হিসহিসিয়ে ওঠে, “আস্তে কথা বলো, তোমার বাপেরা তোমারে আইসা খুন করবে। ওরা যদি জানে যে উর্দুতে কথা কয় এমন বাচ্চা তোমার ঘরে আছে তোমার লাশও পইড়া থাকত ওসমানের মায়ের লাশের সাথে। তোমার পাড়াপড়শিরাই জানাইয়া দিত। বরং যদি বাঁইচা থাকো, মনে রাইখো আমার লাইগাই বাঁইচা আছো। আর মরছে তো পাকিস্তানি। ঢাকায় যে হাজার-হাজার বাঙালি মারতাছে হেরা। পাকিস্তানিগো লাইগা কান্দো, ওরা তোমারে কয়দিন বাঁচাইয়া রাখে দেইখো।”

হেনা আর তার পড়শি জাহেদা মাথায় ঘোমটা দিয়ে মুখে কাপড় চেপে কর্ণফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখে, নদীতে পেপার মিলের কাঁচামাল হিসাবে ভেসে আসা বাঁশের স্তূপের গায়ে আটকে আছে ওসমানের লাশ। ঢেউয়ে দুলছে। মাথাভর্তি ঘনকালো চুল। নদীর ওপারে রাবার বন। পিছনে ঘনসবুজ পাহাড় মেঘ ছুঁয়েছে। আকাশের পানে মুখ তুলে ঘুমন্ত শিশু। আর নদীতীরে তার বাবার লাশ, শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ডাঙায়, নিম্নাংশ জলে। পাশেই একটা খালি নৌকা দুলছে। মায়ের মৃতদেহ বাঁশের স্তূপের ওপাশে। আকাশী সালওয়ার-কামিজ আর মাথার চুল শুধু দেখা যায়।

পাহাড়, জঙ্গল, শ্যাওলা, মাছ, কচুরিপানা আর মৃতদেহেভরা নদী, ভারতে শরণার্থী ক্যাম্প, লাশের-দুর্গন্ধে-ভারি জনপদ পার হয়ে নিজ গ্রামে পৌঁছায় হেনা। দীর্ঘ পথে শত শত জীবিত বা অর্ধমৃত মানুষ পিঁপড়ার মতো সার বেঁধে অথবা কখনো সিলমাছের মতো হাঁচড়েপাছড়ে ভারী শরীর টেনে প্রাণভয়ে ছুটছে। ঝকঝকে সোনালি সূর্যের নিচে তাদের সাথে হেনা তার স্বামী-পুত্র-সহ ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটে চলেছে। এক হিন্দু গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তারা। পথে চোখে পড়ল মুণ্ডুহীন এক শিশুর পাশে এক তরুণীর দেহ। লোকজন বলাবলি করছিল, তাদের গ্রামে রজব আলী নামে এক রাজাকার তার দলবল নিয়ে ঘরে ঘরে ঢুকে সবাইকে রামদা দিয়ে জবাই করেছে। মেয়েকে বাড়িতে ঘুম পাড়িয়ে রেখে পুকুরে গিয়েছিল মরিয়ম। রজব আলী বাড়ি-বাড়ি হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, পুকুর ঘাটের এই খবরে তার ঘুমন্ত মেয়েকে নিয়ে এক নিশ্বাসে দৌড়ে বড় রাস্তায় ওঠে সে। লোকজন যখন বলে, ‘আহা রে, বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইছে,’ তখন তার চোখে পড়ে কোলের শিশুটি মুণ্ডুবিহীন। সে বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই রজব আলী তার বাচ্চাকে দ্বিখণ্ড করে যায়। সন্তানের ধড় হাতে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় মরিয়ম।

৩.
উঠানের কাঁদাপানিতে ছপছপ শব্দ করে বিশ্ব আসে। খানিক আগে ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে। ফুলশার্টের দু হাতের বোতাম খোলা। রঙ-উঠে-যাওয়া খয়েরি ফুলশার্ট আর লুঙি পরা বিশ্বর মাথার চুল তখনও ভেজা। হেনা জিজ্ঞাসা করে, “কী রে, আম টোকাইতে বাইরইছিলি? কতগুলা আম টোকাইছস?”

“মাত্র দুই বালতি হইছে, মাসি। মায়ও আমার সাথে টোকাইছে। ঠান্ডা যখন বেশি বেশি পড়তেছিল মায়ও ভিতরে গেছে, আমারেও টাইন্যা লইয়া গেছে।”

বিশ্বর চাচারা কেরোসিনের ব্যবসা করে। তার বাবা মারা গেছে তার শৈশবে, রক্তবমি করে। সকালে পুকুরঘাটে বিশ্বর মা, সন্ধ্যার সাথে দেখা হলে বাড়িতে কেরোসিন পাঠিয়ে দিতে বলেছিল। চোঙা দিয়ে বিশ্ব কেরোসিন ঢালে গভীর অভিনিবেশে। যেন একটুও কম না হয়, অথবা একবিন্দুও উপচে না পড়ে। বাঁ হাতের কনিষ্ঠার নখটি অপর সব নখের চেয়ে বড়। শীর্ণ, শ্যামলা মুখে বড়-বড় পাপড়ির উজ্জ্বল দুই চোখ।

কেরোসিন ঢালা শেষে দিগ্বিজয়ীর হাসি। হেনা বলে, “তুই তো বেটা বড় হয়া গেছোস। কেরোসিন ঢালা শিখা গেছোস।”

লাজুক হেসে বিশ্ব বলে, “মাসি, বাজার থিকা এহন আমিই কেরোসিন কিনা আনি।”

“তোর মায়ের কমু এহন একটা বিয়া করায়া দিতে।”

হেনার চাচাত বোন নাসিমা পাশের ঘরে হেনার ভাবির সাথে গল্প করছে। কালচে-নীল রঙের ঢাকাই বিটি শাড়ি পরা, চপচপে তেলে-ভেজানো চুলে নাসিমা একাই কথা বলে যাচ্ছে, তার স্বামীর কথা, সন্তানের গল্প। যে-মেয়ে সারাজীবন খুব কম কথা বলত, এখন সে বলতে শুরু করলে আর থামে না। একই গল্প, একই কথা বহুবার পুনরাবৃত্তি করে।

হেনার মতোই মৃত ও অর্ধমৃতের জনপদ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নিজ গ্রামে ফেরে হেনার চাচাত বোন নাসিমা। স্বামী-সন্তানহীন, একা। চট্টগ্রামে তাদের বিহারী পড়শিরা তাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা আর তাদের নিজ বাসায় ফিরতে দেয় নাই। সন্ধ্যায় শাহিদা নামের এক মহিলা জানায়, পুরুষেরা অন্য বাসায় থাকবে, এমনকি তার কিশোর পুত্রও। সেই সন্ধ্যায় চুমু খেয়ে ছেলেকে বিদায় দেওয়ার পর নাসিমা আর কোনোদিন তাকে দেখে নাই। একদিন সকালে এক বিহারী ভদ্রলোক তার স্বামীকে নিয়ে আসে। ক্লান্ত, দুর্বল, বিমর্ষ তার স্বামী মিজান জানায়, “মনে হয় আমাগোরে মাইরা টাইরা ফালাইব। তোমার ছেলেরে নিয়া আসতে চাইলাম, দিল না। বাচ্চাডা প্রত্যেক রাতে কাঁদে তোমার লাইগা।” তার পরের কথাগুলো নাসিমার বোধশক্তির উপর দিয়ে যাচ্ছিল। যাওয়ার আগে তার স্বামী তার হাতে কয়েকটা ব্লেড দিয়ে যায়। “অরা হয়তো তোমারেও ধর্ষণ কইরা মাইরা ফালাইব। তোমারে কেউ নষ্ট করতে আইলে তার আগেই আত্মহত্যা কইরো।” নাসিমা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, তার স্বামী-সন্তান মারা যাবে না। তারা ফিরে আসবে। সে জানে সে জীবনে কোনো অন্যায় করে নাই। রাস্তার ভিক্ষুককেও কখনো আঘাত করে কথা বলে নাই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে বারো-তেরো বছর থেকে। নিশ্চিত ছিল সে, আল্লাহ তার ওপর এত নিষ্ঠুর হবে না। সাতআটদিন পর পাকিস্তানি মেয়ে শাহিদা নিশ্চিত করে তার স্বামী-সন্তান মারা গেছে। সে তাকে পালাতেও সাহায্য করে। সেও আশঙ্কা করত নাসিমা না-পালালে হয়তো তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করবে।

ধর্মভীরু পাকিস্তানি শাহিদার কাছে, নাসিমার স্বামী-সন্তান হত্যার চেয়েও সবাই মিলে মেয়েটাকে ধর্ষণ করবে তা হয়তো আরো বেশি পাপ-কাজ মনে হয়েছে। অথবা হয়তো তার স্বামী-সন্তান হত্যার অপরাধবোধ থেকেই তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে সে।

হেনার বড়ভাইয়ের ছেলে রাজীব বিশ্বর চেয়ে বছর-তিনেকের ছোট। যুদ্ধের কারণে বাবা-মায়ের সাথে ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছে। সুন্দর জামা, পায়ে সারাক্ষণ জুতা বা স্যান্ডেল পরিহিত রাজীবের পিছু-পিছু ছুটে বেড়ায় গোটা পাড়ার শিশুকিশোর। এমনকি রাজীবের চেয়ে পাঁচ-ছয় বছরের বড় কিশোরেরাও। শহুরে চাকচিক্য আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে একদল ছেলের নেতৃত্ব দিয়ে বেড়ায় রাজীব। তার নানাবয়সী শিষ্যেরা রঙবেরঙের ঘুড়ি, নাটাই, হাতে-বানানো নানা খেলনা নিয়ে রাজীবের সামনে হাজির হয়, তাকে চমৎকৃত করার আশায়। ভক্তকুল ছেড়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে রাজীবের মা চটাস-চটাস পুত্রের দু গালে চড় মারে।

“গ্রামের ফকিরনির জিকিরনির পোলাপান সবাই তোর বন্ধু হইয়া গেছে ক্যান? ফকিন্নিগো সাথে মাঠে-গোপাটে ঘুইরা হাত-পা-চেহারার নমুনা তো পুরা ফকিন্নিগো মতো বানাইয়া ফালাইছোস। যুদ্ধের মধ্যে ঘর থিকা বাইরাবি না, এমনকি উঠানেও নামবি না।”

বিকালে বিশ্ব এসে রাজীবকে ডাকে, “রাজীবমণি, রাজীবমণি, খেলাইতে আসো।” ঘর থেকে রাজীবের মা বের হয়ে বলে, “রাজীবরে নিয়া বাইরে যাইয়ো না। উঠানে বা পাকঘরের সামনে খ্যালো।”

বিশ্ব মাথা নেড়ে সায় দিয়ে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে ভেজা মাটি খোঁচায়। লুঙির ওপর বের হয়ে আছে কোমরে-বাঁধা কালো সুতা। তার পায়ের কাছে মাটি থেকে একটা কেঁচো মাথা তুলেছে। বাড়ির বাঁধা কাজের মানুষ হালিম ঘর থেকে একটা জলচৌকি টেনে এনে দেয় পরিচ্ছন্ন জামা প্যান্ট, দুপায়ে জুতা-পরা রাজীবকে বসার জন্য। মলিন শার্ট-লুঙি গায়ে, খালিপায়ের বিশ্বকে ডেকে নেয় তার কাজে সাহায্য করার জন্য। রাজীব জলচৌকিতে বসে দ্যাখে বিশ্ব একটা টুকরা কাঠ দিয়ে আরেকটা কাঠের ফালির ওপর একেকটা শামুক ভাঙছে। শামুকের খোলসের ভিতর থেকে নরম অংশটুকু বের করে রান্নাঘরের পাশে জড়ো হওয়া হাঁসকে খাওয়াচ্ছে। রাজীব দ্যাখে নরম হলুদ তুলার মতো হাঁসের বাচ্চাদের খাওয়ানোতে নিমগ্ন হয়ে আছে বিশ্ব। রান্নাঘরের পাটকাঠির বেড়ায় ফাঁক দিয়ে উৎসারিত ধোঁয়ায় সন্ধ্যা রহস্যময় হয়ে ওঠে। হাঁসগুলোকে খাওয়ানোতে ব্যস্ত বিশ্ব রাজীবের সাথে খেলতে আসার কথা বিস্মৃত হয়ে যায়।

গ্রামের পাশেই থানাশহরে পাকিস্তানি সৈন্য নেমেছে বলে সারা গ্রামে আতঙ্ক ছড়ায়। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালাবে কিনা ভেবে পেন্ডুলামের মতো দোদুল দুলছে। গ্রামে গ্রামে শান্তি কমিটি তৈরি হয়েছে। দিনে রাতে সন্ধ্যায় মানুষের ফিসফিস শোনা যায়। মাঝে মাঝে কিছু লোকজন পোটলা-বোঁচকা নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। গ্রামে ফিরে আসার পর থেকে হেনা প্রায় প্রতি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে, এমনকি দিনের বেলা ঘুমালেও দুঃস্বপ্নে, ভয়ে জেগে ওঠে।

প্রতি ভোরে আলো ফুটবার খানিক আগে যখন চট্টগ্রামগ্রামী ট্রেনটি তার বাড়ির কাছের স্টেশনে হুইসেল বাজায়, হেনা ঘুম ভেঙে ধড়মড় বিছানায় উঠে বসে। ফুঁপিয়ে কাঁদে। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্বামীকে প্রায়দিনই জাগিয়ে তোলে, “মনে হয় এক-ট্রেন পাকিস্তানি মিলিটারি স্টেশনে নামছে। হয়তো আধঘণ্টার মধ্যে আমরার বাড়িঘর জ্বালায়া পুড়ায়া দিব। ঘুমাইলেই আমি স্বপ্নে দেখি আমি।”

স্বামীও সায় দেয়, “তোমরার বাড়ির সবারে আগে জ্বালাইব, তোমার চাচাত ভাইয়েরা তো সব মুক্তিবাহিনীতে গেছে।”

বাতাসে নানা খবর আসে আশপাশের গ্রাম থেকে। আর গ্রামের মানুষগুলি অনুচ্চ স্বরে কথা বলে ফিসফিসিয়ে। ঘরের চালের ওপর দিয়ে বয়ে যায় নদীর বাতাস। সে-হাওয়া ঘুলঘুলির ফাঁক গলে মানুষের কানে-কানে ফুঁ দিয়ে যায়। তাকে নতুন কোনো ফিসফিসানি ভেবে মানুষজন আরো চমকে ওঠে। মায়েরা শক্ত করে বুকে আঁকড়ে ধরে সন্তানকে।

সন্ধ্যারানি হেনার মাকে একদিন এসে বলে, “মাসি, বাপছাড়া বিশ্বরে কত সংগ্রাম কইরা বড় করতেছি আপনেরা তো জানেন। পাকিস্তানি আর্মি যদি গেরামে ঢুকে, বিশ্বরে খালি আপনেগো ঘরে লুকাইয়া রাইখেন। আমার পোলাটারে খালি বাঁচায়েন। আমরা বাঁচি-মরি, কপালে যা আছে হইব।

“তোগো লগে আমাগো ভালো খাতির, এইডা গ্রামের হগলতে জানে। তোগোরে না পাইলে সবার আগে আমাগো বাড়িই আইব হেরা।” হেনার মায়ের জবাবে সন্ধারানির মুখে সন্ধ্যা ঘনায়।

দিনের বেলা বাবা-মায়েরা প্রাণান্ত চেষ্টা করে সন্তানকে ঘরে বেঁধে রাখতে। এর মাঝেও শিশু কিশোরেরা বাবা-মায়ের গেরস্থালি ব্যস্ততার ফাঁক গলে বেরিয়ে পড়ে দুরন্তপনায়। দিনের আলো ফুটতেই বাতাসের সবুজ ধানক্ষেতে ঢেউয়ের হাতছানি উজ্জ্বল ঝকঝকে দিনের আলোর উদ্ভাস তাদের মনের যাবতীয় শঙ্কা দূর করে দেয়। বাইরের নরম বাতাস তাদের উতলা করে। বৃষ্টিতে ভেজে। পুকুরে বা নদীতে সাঁতরায়। মাঠে গুলতি আর সাতচাড়া খেলে। সবার ফিসফিসানি থেকে সংক্রমিত আতঙ্কের মেয়াদ রাত্রির অন্ধকার পর্যন্তই। হেনাদের গ্রামে যুদ্ধকালীন প্রথম হত্যার সংবাদটি আনে খালেকউদ্দিন। আমগাছে ঝুলানো লাশটি সে প্রথম দেখেছিল জোহর নামাজ থেকে ফেরার পথে।

বন্ধুদের সাথে শামুক কুড়াতে গিয়েছিল বিশ্ব গ্রামের পশ্চিম পাড়ার শেষমাথায়। শামুক, ঝিনুক, ঢ্যাপ সবকিছু মিলিয়ে বেতের ডুলি ভরে হৈচৈ করতে বাড়ি ফিরছিল। হানিফ মিয়ার ছাড়াবাড়ির আমবাগান পার হচ্ছে যখন, মাঠে বসেছিল শান্তি কমিটির সচিব মিনহাজউদ্দিন ও তার দুই সাকরেদ আজগর আলি আর কামরুজ্জামান। গ্রামে কয়টা হিন্দু ঘর আছে, কবে-নাগাদ পাক আর্মি পৌঁছাতে পারে, পাক আর্মি আসবার আগে শান্তি কমিটির পূর্বপ্রস্তুতি কী হওয়া দরকার—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছিল। আজগর আলিই প্রথম বলে, “ঐ মালুর বাচ্চারে ডাকি। বিশ্ব, এদিকে আয়!” তার সঙ্গী অন্য শিশুদের আজগর বাড়ি চলে যেতে বলে।

বিশ্ব এগিয়ে এলে তাদের একজন বলে, “ডাব পাইড়া খাওয়া আমাগোরে।” ডাব পাড়ার জন্য একজন দৌড়ে গিয়ে তার বাড়ি থেকে দা নিয়া আসে। এ গ্রামের লোকজন জানে এ কিশোর দুহাতে গাছ জড়িয়ে ধরে দুপায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে যেতে পারে নারকেল গাছের মাথায়।

গাছের মাথায় উঠে বিশ্ব বলে, “কাকা, নারকেল পারমু নাকি খালি ডাবই?”

“খালি ডাবই পাইড়া আন।”

বিশ্বকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে ডাবের পানি খায় তারা। তারপর তাকে পাশে বসতে বলে। বিশ্ব ভাবে হয়তো ডাব কেটে তাকে খাওয়াবে এখন। ডাবের পানির চেয়ে ভিতরের শাঁসটুকু বেশি পছন্দ তার।

নারকেল গাছের নিচে বকুল ফুলের মতো নারকেল ফুল ছড়ানো। গাছের গোড়ার কালো এক গহ্বর হা করে আছে। কালো পিঁপড়া, নানারকমের পোকা আসা-যাওয়া করছে। বিশ্ব একবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল “গাছের গোড়ায় এত বড় গাত্থা ক্যান?” মা বলেছিল যে গাছকে নুন খাওয়াতে হয়।

সে যেন চিৎকার দিতে না পারে, সেজন্য মিনহাজ পিছন থেকে তার মুখ বেঁধে ফেলে। বিহ্বল বড়-বড় দু চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বিশ্ব তাদের দিকে তাকায়। ডাব কাটার দা দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। মৃত কিশোরের দু চোখ বিস্ময়ে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে আসে কোটর থেকে। মৃতদেহের লুঙ্গি তুলে আজগর বলে, “লন, মালুর বাচ্চারে মোসলমানি করাইয়া দেই।” আজগর নিজেই মৃতের শিশ্নটিকে আড়াআড়ি চারভাগ করে কাটে ফুলের মতো করে। লাশটি একটা আমগাছে ঝুলিয়ে দেয়। এ-সংবাদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সবার ধারণা হয় পাকিস্তানি বাহিনী হয়তো গ্রামে চলে এসেছে। ঘর থেকে কেউ বের হয় না।

বাতাসে ঢেউয়ে ধানক্ষেত দোলে, পুকুরে কচুরিপানার আড়ালে ভাসে টুকরো-টুকরো মেঘ। বেলা পড়ে এসেছে। ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। মসজিদের পাশে কোনো গাছে ঘুঘু ডেকে যাচ্ছে ক্রমাগত। মৃতদেহের কাছেও ভিড় নাই। সন্ধারানি নিজেই পুত্রের মৃতদেহ নামায় গাছ থেকে। আঁচল দিয়ে যত্ন করে রক্ত মুছে দেয়। ঢেউখেলানো সবুজ ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে পুত্রের রক্তাক্ত মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে আমবাগান, কাঁঠালগাছ, লেবুঝোপের পাশ দিয়ে, বাঁশবাগানের মধ্যে দিয়ে ধীর পদক্ষেপে সন্ধ্যারানি বাড়ি ফেরে। শ্যামলা, মিষ্টি, রক্তাক্ত মুখটি মায়ের কাঁধে পড়ে আছে। মুখ থেকে রক্তমাখা লালা বের হচ্ছে। দীর্ঘ পাপড়িময় দু চোখের পাতা তখনও খোলা।

বাকি যতদিন বিশ্বর মা বেঁচেছিল, কারো সাথে একটা কথাও সে বলে নাই।

৪.
হেনাদের বাড়ির লেবুঝোপের পাশের সরু রাস্তার মাথায় মসজিদ। মিনারে চাঁদ-তারার সিরামিকের নকশা। মসজিদের পিছনেই কবরস্তান। হেনার বাবা, দাদা-দাদি শায়িত এখানে। কবরস্তান আর রাস্তার মাঝামাঝি একটা চওড়া খাল। খালপাড়ের উঁচু সড়ক ধরে যুদ্ধ শুরুর তিন মাসের মাথায় গ্রামে ফেরে ঝর্না। হেনার ছোট বোন। জেলাশহরে খালার বাড়িতে থেকে কলেজ পড়ত সে। কলেজে যেতে শুরু করার অল্পকিছুদিনের মধে শহরে গুঞ্জন ওঠে, শহরে এসেছে “ধারালো তলোয়ার।” হলুদ রঙের দক্ষিণমুখী দোতলা বাড়ি। গেটে মাধবীলতার ঝাড়, বাড়ির সামনে দিয়ে ছেলেরা গান গেয়ে যায়, “তোমারে লেগেছে এত যে ভালো...।” সারা শহরের যুবকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হলুদ রঙের মাধবীলতার বাড়ি।

কোমর ছাপানো দিঘল কালো চুল। ছন্দোময় হাঁটার ভঙ্গি। ছোট-বড় সবার চোখে চোখ রেখে সরাসরি কথা বলা এমন আত্মবিশ্বাসী মেয়ে এই শহরে কেউ কোনোদিন দেখে নাই। তরুণরা আড্ডায় ঝর্নাকে নিয়ে শ্লীল-অশ্লীল নানা কথা বলে। হাসিতে ভেঙে পড়ে। ঝর্নার হাসিমুখের কয়েকশত গজের মধ্যে যে-বিদ্যুৎ বিচ্ছুরিত হয় তাতে আত্মাহুতি দিতে পাড়ার যুবকেরা হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার দিকে ধাবমান শিশুদের মতো ধেয়ে যায়।

কলেজে সদ্য-যোগদানকারী অর্থনীতির শিক্ষক তার নোটবইয়ের ফাঁকে চিরকুট গুঁজে দেয়।

‘There is sparkling glow in your eyes. To be honest, I can’t maintain eye contact with you for more than a few seconds.’

চিরকুট পেয়ে ক্লাস-শেষে শিক্ষককে একা পেয়ে সে বলে, “স্যর, আমার সামনে আপনি যেভাবে নার্ভাস হয়ে যান, ক্লাস কিভাবে নিবেন?”

কোনো জবাব না দিয়েই শিক্ষক প্রেমাতুর দু চোখের নিচে করুণ হাসি ঝুলিয়ে রাখে। ছাদে খোলা-চুল মেলে যখন আপন মনে সে গাইত “মধুমালতী ডাকে, আয়, ফুল ফাগুনের এ-মেলায়,” অথবা তার প্রিয় অন্য কোনো গান, পাড়ার তরুণদের কেউ-কেউ গোলাপ বা গন্ধরাজ ছুঁড়ে মারত তার দিকে, বা শিস বাজাত। প্রাণ ভরে সে উপভোগ করত আক্রান্ত-বিভ্রান্ত প্রণয়প্রার্থীদের উন্মাদনা। কিন্তু নিজে কারো প্রেমে পড়ত না। আর তাকে নিয়ে প্রণয়প্রার্থীদের উল্লাস-উচ্ছ্বাসে দিনকেদিন তার তিল-তিল আত্মবিশ্বাস মহাসমুদ্র হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের মাঝে ঝর্না গ্রামে ফিরে এলে এটা একটা খবর হয়ে যায়। কেউ-কেউ ফিসফিসিয়ে বলে, “এহন যখন পাক আর্মি গেরামে ঢুকতাছে, এইসময় এই মাইয়া ফিরা আইলো ক্যান।” গ্রামের হাইস্কুলে ক্লাস টেন-এ পড়ার সময় গ্রামের বখাটে ছেলে আরজু ওড়না ধরে টান দেওয়ায় ঝর্না তাকে চড় মেরেছিল। তার পর-পরই দৌড়ে গিয়ে সে তার বান্ধবীদের সাথে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। স্কুলের হেডমাস্টার ঝর্নাকে পুরাপুরি সমর্থন করায় সে-যাত্রা তার পরিবারের সম্মান বাঁচে। বরং আরজুকেই সবার সামনে ক্ষমা চাইতে হয়।

শঙ্কা বা সামাজিক অনুশাসন, কোনোকিছুই ঝর্নার আত্মবিশ্বাস আর জীবনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বদলাতে পারেনি। চারিদিকে ফিসফিস, মা-ভাই-বোনের আতঙ্ক, আহাজারি, সবই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে সে। তারপর এক রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরে ফেরার সময় মাঝ-উঠান থেকে আরজু ও তার সঙ্গীরা ঝর্নাকে তুলে নিয়ে যায়। মাত্র কিছুদিন আগে আরজু শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছিল। অন্ধকারে কুপির আলোয় আরজুকে চোখে পড়া-মাত্র ঝর্না একদলা থুথু মারে তার মুখের ওপর। একটু আগে তার মুখের বাধঁন খুলে দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত সবাই মিলে চড়, লাথি, ঘুষি মারে তাকে। তারপর গণধর্ষণ। ঘুষিতে রক্তাক্ত ঠোট ফুলে ফেটে ঢোল হয়ে যায়। তার নাক আর গোপন স্থান থেকে রক্ত ঝরছিল।

গ্রামে কয়েকদিন গণধর্ষণের পর তাকে রাতের অন্ধকারে জেলাশহরে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানি আর্মির জন্য। একটা পুরানো লাল দালান। রেলওয়ের বাড়ি ছিল হয়তো। বাড়ির সামনে উঁচু ঘাস। ঘাসের নিচে খেলা করছে বাদামি কেন্নো। পাশে উঁচু অশ্বত্থ গাছে ডানা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে কাক, শকুন। অদূরেই কলা গাছের ঝোপ, কয়েকটা গাছে মোচা ঝুলছে। ছাদের একটু নিচে ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে সোনালি আলোর রেখা ঘরে ঢোকে। সেখান থেকে বাঁদুড় বের হয় সন্ধ্যার পর। সব জানালা তালাবদ্ধ। ঘরে পেশাব-পায়খানার ঝাঁঝালো গন্ধ।

বিশাল মাকড়শার জাল দেয়ালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। মেঝেতে ইট বালি সুড়কি আর বাদুড়ের বিষ্ঠা। দেয়ালে টিকটিকি, মাকড়শা, বাঁদুড় আর মেঝেয় পশুর মতো পড়ে ঘুমাচ্ছে অর্ধনগ্ন নানাবয়সী বাঙালি নারী। এদের মাঝে অন্তঃসত্ত্বা বেশ কয়জন। মাঝে মাঝে দুয়েকজন উঠে গিয়ে ঘরের এক কোণে মেঝের গর্তে বসে সবার সামনেই কাপড় তুলে মলমুত্র ত্যাগ করছে। ঝর্নাকে ভিতরে রেখে তালা দিয়ে চলে গেলে একদুইজন তাকে চোখ তুলে দেখে আবার ঝিমাতে থাকে। বেশিরভাগ মানুষই এমনকি চেয়েও দেখে না কে এলো। দু চারদিনের মধ্যে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয় এক গেস্ট হাউসে। পরিচ্ছন্ন বেডরুম, গোসলখানা। পাক ক্যাপ্টেন সাহেব তার সাথে দুর্ব্যবহার করে না। হাসিমুখে চেষ্টা করে সম্পর্ক তৈরি করতে। সে কাছে এলে, ঝর্না কোমর-ছাপানো দিঘল চুলের মাঝে প্রস্ফুটিত ফুলের মতো মুখ থেকে একদলা থুথু ছুঁড়ে মারে তার মুখে। বেসিন থেকে মুখ ধুয়ে এসে ক্যাপ্টেন তার দু গালে চড় মারে। চলে যাবার সময় মনঃস্থ করে তাদের এখানকার সবচেয়ে বদমেজাজি মেজরের হাতে তাকে তুলে দেবে।

মেজর ওয়াসিম ইউনিফর্ম ও বুট পরে ঘরে ঢোকে। ডিউটি থেকে সে ফিরেছে। মুখে থুথু খেয়ে শুরুতে সে থতমত খেয়ে যায়। তারপর বুটসহ বিছানায় উঠে দাঁড়ায়। ঝর্নার চুল টেনে ধরে বসায়। খাট থেকে লাথি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আবার চুল টেনে তোলে খাটে। এভাবে কয়েকবার ফুটবলের মতো লাথি দিয়ে ফেলার সময় ঝর্নার গলা থেকে জান্ত্যব শব্দ বের হয়ে আসে। রক্ত বেরিয়ে আসে নাক, ঠোঁট দিয়ে। চেয়ারের কোনায় লেগে চোখের নিচে অনেকখানি কেটে যায়। তারপর ঝর্না নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মেজর ওয়াসিম অপেক্ষা করে ভোর হবার জন্য। সকালবেলা মোটর বাইকের পিছনে ঝর্নাকে বেঁধে নেয় তার সৈনিকদের সহায়তায়। শহরবাসী দেখছে হোন্ডার সাথে হাত-বাঁধা দিঘল চুলের এক নারীদেহ পিচের রাস্তায় ছেঁচড়ে যাচ্ছে। মোটর বাইকটা বারবার চক্কর দিচ্ছে শহরময়। রাস্তায় চুল, টুকরা টুকরা থেতলানো মাংস। চৌরাস্তায় নিচের ঠোঁটটা পুরোটাই খুলে পড়ে আছে। যে-হাসিতে শহরের তরুণদের হৃৎস্পন্দন দ্রিমিক দ্রিমিক শব্দে ড্রামের মতো বেজে উঠত, সেই হাসির ঠোঁট। রক্তাক্ত ছোট একটা মাংসপিণ্ড। যে-চুলে মুখ ডোবানোর স্বপ্নে বিভোর থাকত তরুণ কলেজ-শিক্ষক, সে-চুল শহরের পথে-পথে দিগ্ভ্রান্ত উড়ে বেড়াচ্ছে। যে-পিঠ, গ্রীবার আলো শুষে মদির হওয়ার স্বপ্ন দেখত শহরের বহু তরুণ, সেখানকার থ্যাঁতলানো মাংসখণ্ড শহরের রাস্তা জুড়ে। কতগুলো কাক এসে রাস্তার মাংসপিণ্ড, রক্তে ঠোকর দেয়। দীর্ঘ দিন শহরের মানুষের এ-বিস্ময় কাটে নাই, মেয়েটা মারা যাওয়ার পরও সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংস খুলে খুলে না-পড়া পর্যন্ত কেন লোকটা থামে নাই।

যেসময় শহরে ঝর্না মারা যাচ্ছে, সেসময়ই তাদের গ্রামে পাক আর্মি ঢুকছে।

গ্রামের তরুণ আহমেদ আলি যখন বাড়ি-বাড়ি চিৎকার করে বলে, “আর্মি আইছে, গেরামে মিলিটারি ঢুকছে।” হেনার ছোট চাচি ফাতেমা দৌড়ে পুকুরে ঝাঁপ দেয়। কচুরিপানার ভেতর থেকে শুধু মাথা ভাসিয়ে রাখে। কচুরিপানার ওপর একটা মাছরাঙা বসে দ্যাখে ফাতেমার মাথা, কচুরিপানার ভিতর। পুকুরপাড়ে তেঁতুলগাছের নিচে প্রাচীন এক পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে নাসিমা নির্বিকার বসে থাকে। তার ভয়শূন্য দৃষ্টি দেখে পাক সেনারা তাকে পাগল কিংবা সন্ন্যাসী ভেবে কিছু বলে না।

হেনা, হেনার ছেলে, মা, ভাবি, ভাইয়ের ছেলে, ঘরের সবাইকে হামিদ ঘরের মাচাঙে তুলে দেয়। দরজা বন্ধ করতে গেলে চোখে পড়ে উঠানে পাকবাহিনী, একেবারে চোখের সামনেই। “ঘরকো সবলোগ কাঁহা? মুক্তি কাঁহা?” বুট দিয়ে কেউ একজন তার নিম্নাঙ্গে লাথি মারে। কোনো প্রশ্নেরই জবাব তার মুখ থেকে বের হয় না। আবারও লাথি। সে মেঝেয় পড়ে যায়। একটা শব্দ মুখ দিয়ে বার করে না তবু। চার বছরের ছেলে আরিফ মাচাঙের উপর থেকে দেখে বাবাকে গুলি করে, পুরো ঘর লণ্ডভণ্ড করে পাকিস্তানিদের চলে যেতে। মৃতদেহ মেঝেয় পড়ে থাকে। ছেলের মুখ থেকে যাতে কোনো আওয়াজ না বেরয়, মা পুরোসময় তার মুখ চেপে রেখেছিল।

যুদ্ধের অনেক বছর পরও, প্রায় ভোর-রাতেই হেনার মাথায় ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠত। একট্রেনভর্তি পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে ট্রেন থামে তার মগজের ভিতরে। স-বুট প্যারেড করে। ঘুম ভেঙে যায় নিজের তীব্র হৃৎস্পন্দনে।

৫.
যুদ্ধের পর বড়ভাই-ভাবির সাথে হেনা পুত্রসহ ঢাকায় চলে আসে। ভাই সরকারি কর্মকর্তা। তারই তদবিরে ঢাকায় স্কুলে চাকরি নেয়। বড়ভাবি আকারে ঈঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়, তার ভাই চাকরি জোগাড় করে দিয়েছেই যখন, সে যেন এখন আলাদা বাসায় উঠে যায়। উত্তর গোড়ানের টিনশেড একতলা দেড়-রুমের বাসায় সাবলেট ওঠে হেনা। বাসা ভাড়া দিয়ে মা-ছেলের খাবারের পয়সাও আর প্রায় থাকে না। কোনোরকম দু বেলা খেয়ে ছেলের হাত ধরে সে মাথা নিচু করে স্কুলে যায়। মামার বাড়ি বা অন্য কোথাও দাওয়াত থাকলে ছেলেটা সেদিন পেট পুরে খায়। হামেশাই এত বেশি খায় যে খেয়েই প্রকৃতির ডাকে দৌড়ায়। ভাইয়ের বউ বা অন্যান্য আত্মীস্বজনের সামনে মা খানিক সংকুচিত হয়ে পড়ে এ-জন্য। সাবলেটের বাসার পাশের রুমে দাম্পত্য কলহে কথ্য-অকথ্য নানা খিস্তিখেউড়ের ফুলঝুড়ি বইতে থাকে। প্রাণপণ চেষ্টা করে গল্প, ছড়া শুনিয়ে ছেলের মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে। কিন্তু ছয় বছর বয়সের মধ্যেই বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় যাবতীয় গালি আরিফের ঠোঁটস্থ হয়ে যায়।

যুদ্ধের কয়েক বছর পর বৈশ্বিক ক্ষমতা-দ্বন্দ্ব আর নব্য সুবিধাবাদীদের অবার লুটপাটে দেশে যখন চরম খাদ্যাভাব তৈরি হয়, হেনার জোড়াতালির জীবনও শতখণ্ড হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বড়ভাবি সেসময় ত্রাতা হয়ে আসে জীবনে। মাঝেমধ্যেই দুই তিন সের চাল, ডাল, আনাজ, সবজি পাঠিয়ে দেয়। সেসময় গ্রাম থেকে সংবাদ আসে শ্বশুর মুমূর্ষু। হেনার স্বামী হামিদ অবিকল তার বাবার চেহারা পেয়েছিল। স্কুলের বাচ্চাদের খাতা দেখতে-দেখতে হেনার এসব কথা মনে পড়ে। হামিদের মুখটা মনে করতে চেষ্টা করে সে। শাশুড়িও মারা গেছে বছরখানের আগে। তার অসুস্থতার খবর পেয়েও দেখতে যাওয়া হয় নাই।

ভাবির কাছে থেকে ধার করে শ্বশুরকে দেখতে গ্রামে যায় হেনা। ট্রেন-বাসের ধকলের পর গ্রামের উদার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায় আরিফ। মায়ের হাত গলে দৌড়ে যায় সর্ষেক্ষেতে প্রজাপতি, ফড়িং ধরতে। কোমল হাওয়ার ঢেউয়ে দোদুল ধানক্ষেত, তার ওপর উড়ন্ত আরিফের রেশমি চুল। গ্রামের পুরো পথটা আরিফ লাফিয়ে-লাফিয়ে যায়। একটা বড় দিঘির পাড়ে পরিত্যক্ত প্রাচীন এক মন্দির, শ্যাওলায় কালচে রঙ ধরেছে। মন্দিরের গোড়ায় ঘন উঁচু ঘাস। আরিফ ভিতরে উঁকি দেয়। মানুষ আর পশুর শুকনো বিষ্ঠা। মা তাকে টেনে নিয়ে আসে, “সাপ আছে ভিতরে।” দিঘির একপাশে বসতবাড়িঘর, ঘাট, অন্যপাশগুলিতে বাঁশঝাড়, আমগাছের সারি, কালচে-সবুজ জলে শুকনো বাঁশপাতা-আমপাতার মাঝে কতগুলি হাঁস সার বেঁধে প্যারেডের ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছে। দিঘির কাছেই গোয়ালঘরের পাশে বেড়ার ছোট একচালা ঘরে মেঝেয় পাতা পাটিতে শ্বশুর শুয়ে আছে। বেড়ার গায়ে ঝোলানো রশিতে নোংরা, মলিন কিছু কাপড়চোপড় ঝুলছে। শ্বশুরের চেহারার সাথে হামিদের আর কোনো সাদৃশ্য নাই। শীর্ণ হতে হতে পশুর মতো হয়ে গেছে তার মুখ। বুকের চামড়া হাড়ের ভিতর ঢুকে গেছে। হেনা বৃদ্ধের শিরাওঠা জীর্ণ হাত ধরে।

“আমি হেনা।”

বৃদ্ধ চোখ তুলে দেখতে চেষ্টা করে। দু চোখের কোটর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে।

“এই যে আপনার নাতি।”

আরিফকে দেখিয়ে দেয় হেনা। বৃদ্ধ কামরানউদ্দিন নাতিকে দু হাতে স্পর্শ করে। মাথার চুলে, চোখে, কানে, গলায়, হাতের আঙুলে, সর্বত্র। বৃদ্ধ বলে, “তোমার শাশুড়ি বাঁইচা থাকতে আইলা না। তুমার পুতের লাইগা যে কত কান্দা কানছে গো।”

“শরীর কেমন এহন? খাওয়া-দাওয়া করতারেন নি?”

“খাইতে পারি গো, মা। কিন্তু খাওন তো পাই না। তোমারে দেওরে তো বালবাচ্চারেই খাওয়াইতে পারে না, আমারে খাওয়াইব কই থিকা। এমন অভাব জীবনে দেখি নাই। মা গো, আমারে ২০-৩০টা টাকা দিয়া যাও।”

হেনা ধার করে মা-ছেলের আসা-যাওয়ার টাকা এনেছে। এই টাকা মাস-শেষে ভাবিকে ফেরত দিতে হবে। শ্বশুরকে কাঁদতে দেখে সেও কাঁদে, আর বলে, “আব্বা, বাচ্চাডারে খাওয়ানের পয়সাও আমার কাছে নাই।”

হঠাৎ লোকটা উপুড় হয়ে হেনার দু পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। “মা গো, পায়ে ধরি, তুই আমারে টাকা দিয়া যা।”

সারাজীবন গম্ভীর, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন যে-শ্বশুরকে সে চিনত তার জায়গায় ক্ষুধার্ত পশুর মতো একটা জীর্ণশীর্ণ একজন মানুষকে তার পায়ে পড়তে দেখে সে অবাক। “আব্বা, আমার ট্রেনের ভাড়া হইব না।” বলে হেনা কাঁদে।

গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে এসে রাতে আরিফ স্বপ্নে দেখে, চেয়ারে বসে খোলাচুল মা আকাশে উড়ে যাচ্ছে। আদুড়-গায়ে কুঁজো দাদা তার মায়ের পা ধরে ঝুলে আছে।

৬.
হেনা মন্ত্রীর রুমের সামনে ওয়েটিংরুমে অপেক্ষমাণ সকাল ১১টা থেকে। সচিবালয়ের গেটের পাশে ওয়েটিংরুমে সকাল নয়টা থেকে এগারোটা টানা দুইঘণ্টা বসে ছিল। তার সাথে আছে ভাইয়ের ছেলে রাজীব। গেটে অপেক্ষার সময়টা রাজীবের কেটে যায় এসএমএস লেনদেনে। হেনার ভাবির খালাত ভাই ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। তিনিই পাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। হেনার বড় ভাই পরামর্শ দেয় মন্ত্রী আব্দুস সালিমের কাছে যেতে। তিনি যদিও মুক্তিযুদ্ধে তাদের এলাকায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধের চৌত্রিশ বছর পর মন্ত্রী হয়ে এলাকার লোকজনের তদবির-টদবির শোনেন। মিথ্যা খুনের মামলায়ে ছেলে জেল খাটছে, ছেলের ফাঁসি হয়ে যেতে পারে, এ-ভাবনা মন্ত্রীর কাছে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে তাকে। সচিবালয়ে যায় ভাইয়ের ছেলেকে নিয়ে।

হেনার বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ছেলে আরিফকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। সরকারি দলের এক ছাত্রনেতা খুনের মামলায় দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে তাকে। থানার অফিসারকে হেনা কত যে বোঝাতে চেষ্টা করল, “শোনেন, এই লোক যখন খুন হয়, আমার ছেলে তখন কুমিল্লায় আমার সাথে আমার ফুপাত বোনের বাসায়। আমি আপনাদের ঐখানকার অ্যাড্রেস দিয়া দেই, আপনারা খোঁজ করেন।”

হেনার এসব অনুরোধে পুলিশ জবাব দেয়, এমপি সাহেব ব্যক্তিগতভাবে চান আসামিরা ধরা পড়ুক। আসামি ছেড়ে দিলে উনি তাদের সাসপেন্ড করাবেন। পরে পুলিশরাই আকারে-ইঙ্গিতে জানায় মার্ডারকেসে এক থেকে সাত নম্বর পর্যন্ত কে কে আসামি হবে, সব স্থানীয় এমপি সাহেব ঠিক করে দিয়েছেন।

হেনা বলে, “এতবড় মুক্তিযোদ্ধা!”

অফিসার হেসে বলেন, “আপা, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা সবাই একই আচরণ করে।”

আশৈশব শান্ত, এত কম-কথা-বলা আরিফ কিভাবে ফেন্সিডিল ধরল, রাজনীতি, এমপি, কার সাথে কখন মিশেছে, হেনা বুঝে উঠতে পারে নাই। আরিফ ক্লাস টেন-এ পড়ার সময় তার শিক্ষক হেনাকে ডেকে বলেছিল আরিফ প্রায়ই স্কুলে যায় না, এবং তার কাছে খবর এসেছে যে সে আজেবাজে ছেলেদের সাথে মেশে। হেনা উন্মত্তের মতো মারধর করে আরিফকে, আর সারাদিন কান্নাকাটি করে। মার খেয়েও নীরব থাকে আরিফ, মায়ের কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেয় না। তিন দিন মা ছেলে বাসা থেকে বের হয় না। তিন দিন তারা কেউ পানি ছাড়া তেমনকিছুই খায়ও নি। মায়ের শত অনুনয়েও আরিফ মুখে কিছু দেয় না। হেনা আরিফের বন্ধুদের ডেকে তাদের টাকা দিয়ে বলে ওকে বাইরে কিছু খাইয়ে আনতে। এর পর, ছেলে দেরি করে ফিরলে বা পড়াশোনা না-করলে কান্নাকাটি করেছে, অনুনয়-বিনয় করেছে, কিন্তু গায়ে হাত তোলেনি আর। আরিফ পড়ালেখায় একসময় মনোযোগী হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স ক্লাসে ভর্তি হয়। কিন্তু রাজনীতি, এমপি, আর ক্ষমতার কাছের লোকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে না।

মন্ত্রীর রুমে একজন একজন মানুষ ঢোকে আর হেনার হৃৎস্পন্দন বাড়তে থাকে। এখনই হয়তো তাদের ডাক পড়বে। স্যুট-টাই-পরা বড় অফিসার ঢুকেছে। সে বেরিয়ে এলেই হেনার মুখ সাদা হয়ে যায়। শক্ত করে রাজীবের হাতটা ধরে রাখে। রাজীব বলে, “ফুম্মা, কাঁপতেছেন ক্যান? ভয় লাগে?”

“না,” হেনা জবাব দেয়।

ফুপুর হাত ধরে রাখা রাজীব তার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে তার দু চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। অফিসাররা সবাই একে-একে বেরিয়ে যায়। রাজীব গিয়ে পিএস-এর কাছে খোঁজ নিয়ে জানে, মন্ত্রী এখন একটা মিটিংয়ে বেরিয়ে যাবেন। ফিরবেন ঘণ্টা-দুই পরে। তারপরে দেখা হবে। মন্ত্রীর পিএস-এর রুমে তারা উঠে গিয়ে বসে। কিছু পুরানো ম্যাগাজিন। বেশিরভাগই সরকারি প্রকাশনা। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত রাজীব এক গ্লাস পানি চেয়ে খায়। তার পাশে তার ফুপু পাথরের মতো নিথর বসে আছে। রাজীব এসএমএস লেনদেনে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ব্যক্তিগত সচিবের খোলা দরজা দিয়ে তারা দ্যাখে মন্ত্রী ঘরে ঢুকছে। একাত্তরের শান্তি কমিটির লোকটা ২০০৩-এ মন্ত্রী। হেনার মাথার ভিতর একট্রেন মিলিটারি নামে “বল, মুক্তি কাঁহা?”

ছেলে আরিফ জেলখানার দুর্গন্ধে শুয়ে কাতরাচ্ছে, “মা গো, বাইর কইরা নাও আমারে!” প্রতিরাতে ঘুমানোর সময় কুকুরগুলি কাঁদে। হেনার মনে হয় তার ছেলেটাই কাঁদছে যেন।

হঠাৎ মন্ত্রীর পিএস-এর রুমে বিস্ফোরণ ঘটে, “আল্লার দুনিয়ায় আর-কারো কাছে যামু না রে, আর কারো কাছে না!” রাজীব দ্যাখে তার ফুপু ঘামতে ঘামতে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। মন্ত্রীর পিএস অপ্রস্তুত দাঁড়িয়ে পড়ে, “এই সব অসুস্থ, পাগল, মরা-ধরা মানুষ নিয়া মিনিস্ট্রিতে আসো ক্যান?” গজ গজ করে একাই, “যতসব ফালতু ঝামেলা!” বিহ্বল, ভীত, সন্ত্রস্ত রাজীব বলে, “ফুফু আম্মা মনে হয় মারা যায় নাই। আপনার ফোন থিকা আব্বারে একটু ফোন করি, স্যর?”

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;