আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ



ফরিদ কবির
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

২৫ মার্চ সকাল থেকেই শুনছি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

সকালে আব্বুজি আম্মাকে বললেন, তুমি ফরিদ-শরিফরে লয়া আইনথা চইলা যাও। শুনে আম্মা বললেন, কী কও? নিজের ঘর রাইখা আমি যামু না। এর চাইতে এক কাম করো, তুমি ফরিদ-শরিফরে আইনথায় রাইখা আসো। আইন্তা কেরানিগঞ্জের একটা ছোট্ট গ্রাম। বুড়িগঙ্গার ওপারেই।

আমাদের যাওয়া নিয়া দুজনে কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কে জড়িয়ে গেলে কায়কোবাদ কাকা বললেন, ভাবী, আপনে আর দাদায় বাচ্চাগো লয়া আইনথায় যান গা। আমি বাড়ি পাহারা দিমুনে।

আম্মা কিছুতেই যাবেন না। তিনি বলেন, সংসার রাইখা আমি যামু না।

শেষ পর্যন্ত আম্মা গেলেন না। দুপুরের দিকে আমার নানা এসে হাজির। বললেন, সবতে আমার লগে চল। ঢাকা টাউনে থাকনের কাম নাই।

কিন্তু আম্মা যেতে রাজি হলেন না। তিনি আমাকে আর শরিফকে পাঠিয়ে দিলেন।

আমরা ২৫ মার্চ দুপুরে খেয়ে-দেয়েই নানার সঙ্গে কেরানিগঞ্জে নানাবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। জিন্দাবাহার থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক বেশ দূরেই। কিন্তু নানা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে হেঁটেই রওনা হলেন। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে বাস লোহার পুল হয়ে নারায়ণগঞ্জ যেত। আমরা মার্চের তীব্র গরমের মধ্যেই হেঁটে এসে ভিক্টোরিয়া পার্কের বাসস্টেশনে পৌঁছলাম। বাস স্টেশন ছিল লোকে লোকারণ্য। একটা করে বাস আসে, আর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাতে। নানা আমাদের দু ভাইকে নিয়ে অনেক কষ্টে একটা বাসে উঠলেন। আমরা কোনো সিট পেলাম না। শরিফের তখন মাত্র ৭-৮ বছর বয়স। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে ও হাঁসফাঁস করছিল। নানা সিটে বসে থাকা একটা লোককে বললেন, বাবা, আমার নাতিটাকে আপনার কোলে দেই?

লোকটা শরিফের দিকে এক নজর দেখে বললো, আচ্ছা, দেন।

নানা শরিফকে সেই লোকের কোলে বসিয়ে দিলেন। আমাকে বললেন, চল, সামনে কুনু বাসস্টপে সিট খালি হইলে তরে বসায়া দিমুনে।

নানা এক হাতে বাসের হাতল ধরলেন অন্য হাতে আমাকে।

বাস এসে মুন্সিখোলায় নামল। আমরা কোনো বাসস্টপেই লোকজন ঠেলে খালি সিটে বসতে পারলাম না।

মুন্সিখোলা থেকে বুড়িগঙ্গা পার হতে হবে আমাদেরকে। নদীর ওপার থেকে মাইল দেড়েক হাঁটাপথ। গ্রামের নাম আইন্তা। ছোট্ট একটা গ্রাম। এর মধ্যে ভূঁইয়া বাড়িই তুলনায় বড়।

আমার নানার পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে একদম বড়টাকে আমরা দেখিনি। পরের জন থাকেন পুরোনো ঢাকার কায়েৎটুলিতে। বাকি তিন ভাই তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আইন্তায়ই থাকেন।

আমরা যখন মুন্সিখোলায় নামি তখন বিকেল। কিন্তু মার্চের বিকেল। সূর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়লেও তার তেজ এতোটুকু কমেনি। তীব্র গরমে আমরা বেশ কাহিল। শরিফকে খুবই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। ও এমনিতেই শুকনো, চিকনা-চাকনা। সেই দুপুরে আমরা খেয়ে-দেয়ে জিন্দাবাহার থেকে বেরিয়েছি। পথে আমাদের মুখে আর কিছু পড়েনি। শরিফের মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

মুন্সিখোলা ঘাটেও অসম্ভব ভিড়। অনেকবার আমি এ পথে নানাবাড়ি গেছি। এত ভিড় কখনো দেখিনি। আমি শুধু এটুকু শুনেছি, আজ রাতে ভয়ংকর একটা কিছু ঘটতে চলেছে। কী ঘটবে, কেন ঘটবে তার কিছুই জানি না।

কায়কোবাদ কাকা আর আব্বুজির কথা থেকে জেনেছি আর্মিরা হামলা করতে পারে। তখন থেকেই আমার মনে একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, আমরা কী দোষ করেছি? আর্মি আমাদের ওপর কেন হামলা করবে? এর উত্তর জানা নাই। আম্মা আর আব্বুজি ঢাকা টাউনে রয়ে গেছেন। রয়ে গেছেন কায়কোবাদ কাকাও। তাদের কোনো বিপদ হয় কিনা—এ নিয়ে একটা ভয় থেকে থেকেই আমাকে বিষণ্ণ করে ফেলছে।

অনেকক্ষণ হলো আমরা মুন্সিখোলা ঘাটে এসেছি। গিজগিজ করছে লোকে। নানান বয়সী। অনেকের সঙ্গেই বিশাল বিশাল ব্যাগ। দেখে মনে হবে পুরো সংসারটাই সঙ্গে নিয়ে ফিরছেন। ঈদ-পার্বণের সময় এমনটা দেখা যায়। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সবাই গ্রামের বাড়িতে আসেন। কিন্তু তখন সবার চোখে-মুখে যেমনটা হাসি-খুশি ভাব থাকে, আজ তেমনটা মনে হচ্ছে না। সবার চোখে-মুখেই কেমন আতঙ্কের ছাপ। অবশ্য সেটা বড়দের মধ্যেই। তাদের সঙ্গে থাকা ছোটরা ঠিকই নদীর পাড়ে খোলামেলা জায়গা পেয়ে ছুটোছুটি করছে।

ব্যতিক্রম শুধু শরিফ। ও চুপচাপ আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। একবার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, আমরা কখন যামু?

আমি বলেছিলাম, দেখছ না, নাওয়ে অনেক ভিড়।

সূর্য যখন প্রায় ডুবুডুবু তখন আমরা একটা নৌকায় উঠতে পারলাম। নৌকার মাঝি নানারই পরিচিত কেউ। তাকে দেখেই মাঝি চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, খসরু বাই, আমার নাওয়ে আহেন।

নানা তার চিৎকার শুনেই আমাকে আর শরিফকে নিয়ে দ্রুত সেই নৌকার দিকে এগোলেন। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি ওঠা যায়! নৌকা পাড়ে ভিড়তেই ভিড় সেদিকে হামলে পড়ল। মাঝি এক হাতে ভিড় ঠেলে আমাদেরকে নৌকায় ওঠার জন্য আরেকটা হাত বাড়িয়ে দিলেন।

মাঝি যখন নৌকা ছাড়লেন তখন সেটা প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা। নানার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি বিড়বিড় করে সুরা পড়ছেন। আমার কেন জানি মনে হলো, আমাদের নৌকাটা ডুবে যাবে। নানার দেখাদেখি আমিও সুরা পড়তে শুরু করলাম। দুটো সুরা তখন আমার মুখস্ত ছিল। সুরা ফাতিহা আর সুরা ইখলাস। আমি সে দুটোই পড়তে শুরু করলাম।

ঠিক সে সময় একটা লঞ্চ আমাদের প্রায় গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। সদরঘাটের দিকে যাচ্ছে সেটা। লঞ্চের একটা বিশাল ঢেউ এগিয়ে আসছে আমাদের নৌকার দিকে। সন্ধ্যের আবছা আলো-ছায়াতেও বুড়িগঙ্গার ঢেউকে মনে হলো সমুদ্রের এক বিশাল ঢেউ। সমুদ্র আমি সামনাসামনি কখনো দেখিনি। সমুদ্র সম্পর্কে আমার ধারণা জোছনা খালাম্মার বাড়িতে টেলিভিশন দেখে। আমি চোখ বুঝলাম। মনে হলো, শক্ত একটা কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আমাদের নৌাকাটা। তারপর থেমে গেল। সেই ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। কেউ একজন আমাকে ধরে ফেলল। চোখ খুলতে দেখি, একটা লোক মিটমিট করে হাসছে।

নৌকা ডোবেনি। সেটা পাড়ে এসে লেগেছে। আমি হাঁফ ছাড়লাম।

আইন্তায় যখন এসে পৌঁছলাম তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকতেই নানি ঘরের ঠিলা থেকে পিতলের একটা গ্লাসে পানি ঢেলে শরিফের দিকে এগিয়ে দিলেন। তারপর নানার দিকে তাকিয়ে বললেন, আহা রে, আমার নাতিটার মুখ এক্কেরে হুগায়া গেছে গা। অরে আপনে কিছু খিলান নাই?

নানা বিরক্তমুখে বললেন, আরে, রাস্তায় কিছু আছে নিহি। মানু জান লয়া পলাইতাছে।

শরিফ পানি খাওয়া শেষ করলে নানি আমাকেও এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন। তারপর নানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনেরও যেমুন কথা। নাতি গো একটা লেবেঞ্চুশও তো মানু কিনা দেয়। কন যে বুইলা গেছিলেন গা।

নানা এসব কথার কোনো জবাব না দিয়ে পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বললেন, হুমায়ুন ফিরছে?

হুমায়ুন আমাদের একমাত্র মামা। তিনি শ্যামপুরের সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন।

নানি বললেন, না ফিরে নাই তো। আপনে ইট্টু গিয়া দেখেন না, গোলে আইছে নিহি।

গোলে মিয়া আমাদেরই কী রকম আত্মীয়। আমরা ডাকি গোলে ভাই। গোলে ভাইও সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতেই কাজ করেন।

নানা পাঞ্জাবিটা আবার পরে নিলেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আমিও জামাকাপড় বদলে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নানি জিজ্ঞেস করলেন, কী তর সইতাছে না? আগে খায়া-দায়া ল, তারপর যাইছ।

আমি বললাম, আপনে খাওন বাড়তে থাকেন আমি অহনই আইতাছি। এক লৌড়ে যামু, আরেক লৌড়ে আমু।

নানি বললেন, হ তর লৌড় তো জানা আছে। আক্কু-মুজাহিদ গো পাইলে তর তো আর উঁশ থাকব না। আমি কই, খায়া-দায়া তারপর বাইরে যা। নানি সাহিদা খালাম্মার উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন, সাহিদা, ফরিদ-শরিফ রে খাওন দে।

আমি নিজের জামা-কাপড় বদলালেও নানি শরিফের শার্ট খুলে ওকে একটা গেঞ্জি পরিয়ে দিলেন।

খেয়ে দেয়েই আমি ছুটলাম মুজাহিদের খোঁজে। মুজাহিদ আমারই সমবয়সী। আক্কু, মানে আকতারও আমার সমবয়সী। আকতার সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই। আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। মুজাহিদ আর আক্কু দুজনকেই পাওয়া গেল।

আমরা ভূঁইয়া বাড়ির কবরস্থানের এক পাশে বসলাম। আমাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হলো আরো কয়েকজন।

রাতে হুমায়ূন মামা ফিরলেন না। নানিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, হুমায়ূন মনে অয়, তগো বাড়িতই গেছে।

আমি হুমায়ূন মামার ঘরেই ঘুমুতে গেলাম।

অনেক রাতে হৈ-চৈ আর গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙল। আমি উঠে বসলাম। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। ঘরের বাইরে অনেক লোকের কথা শোনা যাচ্ছে। আমি উঠে দরোজা খুললাম। ঘরের বাইরে অসংখ্য মানুষ। আমরা সবাই ‘বন্দে’ চলে গেলাম। সেখানে আশেপাশের বাড়ির মানুষেরাও ভিড় করেছে। দূরে ঢাকা টাউনের যতটুকু দেখা যায়, সেখানে কিছুক্ষণ পরপরই আগুনের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে দ্রিম-দ্রিম-টা-টা-টাস-টাস শব্দে গুলি আর বোমার আওয়াজ। শহরের একটা জায়গায় আগুনের শিখা আকাশ ছুঁয়েছে। দাউ-দাউ করে বাড়িঘর পুড়ছে! কোথায় আগুন লেগেছে, কারা গুলি করছে, কাদের করছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে সেন্টুকে দেখলাম। সেন্টু সম্পর্কে আমার মামা। আমার মায়ের চাচাতো ভাই। বয়সে আমার বেশ কিছুটা বড় হলেও আমি ওকে নাম ধরেই ডাকি। ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী অইছে রে? এত্তো গুল্লি কারা মারতাছে?

সেন্টু আমার কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল, আর্মি গুল্লি করতাছে। ডাকা টাউনের সবতেরে মাইরা ফালাইতাছে।

মাইরা ফালাইতাছে! ক্যান? আমি অবাক হয়ে গেলাম।

সেন্টু ভয়ার্ত গলায় বললো, শেখ মুজিবরে যারা ভোট দিছে, তাগো সবাইরেই নাকি মাইরা ফালাইতাছে! দ্যাখতাছস না, বাড়ি-গরে আগুন লাগায়া দিছে।

শুনেই আমার বুক ধরাস করে উঠল। আমার আম্মা-আব্বুজি তো ঢাকায়! তাদেরকেও মেরে ফেলবে নাকি আর্মি?

কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব সেন্টু দিতে পারবে না। আমি দৌড়ে ঘরে ফিরলাম। নানা-নানি কেউ ঘরে নেই। শরিফ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো, কী অইছে, ভাইয়া?

আমি বললাম, কিছু অয় নাই। তুই ঘুমা। আর্মিরা গুল্লি করতাছে। ঘর থেইকা বাইর অইছ না কলাম। ঘরে থাকিছ। আমি নানিরে বিছরায়া লয়া আইতাছি।

ঘরের বাইরে বের হতেই পুঁটি খালাম্মাদের আঙিনায় দেখা গেলো একটা ভিড় জমাট বেঁধে আছে। সেখানে গিয়ে নানির দেখা পাওয়া গেল। তবে তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তিনি মাটি থাপড়াতে থাপড়াতে চিৎকার করে কাঁদছিলেন আর কিছুটা সুর করে গাইছিলেন, আমার মিনার কী অইবো রে খোদা। আমার হুমায়ূনের কী অইবো...!

উপস্থিত লোকজন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আরে, মিনার কিছু অইবো না। আপনে আল্লা আল্লা করেন। আয়াতুল কুরসি পড়েন। আরেকজন তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিলেন। মুখে বলছিলেন, ও ফুপু, গরে চলেন, মিনা আপার কিছু অইবো না। চলেন, গরে চলেন।

নানি কিছুতে উঠবেন না। তিনি চিৎকার করে কাঁদতে থাকলেন।

নানির কান্না দেখে আমার কিছুটা ভয় লাগতে শুরু করলো। আম্মা-আব্বুজি ঠিক আছে তো? কায়কোবাদ কাকা? হুমায়ূন মামা?

বুকের ভেতরটা ঢিবঢিব করতে লাগল।

আমি ভয় আর আশঙ্কা নিয়েই এক সময় ঘুমুতে গেলাম। কিন্তু ভূঁইয়া বাড়ির মানুষ সারা রাত ঘুমুল না। সারা রাতই ঘরের চারপাশে তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল গোলাগুলি আর অসংখ্য মানুষের কথাবার্তা শুনে। বিছানা থেকে উঠে দেখি দরোজা খোলা। বিছানা ছেড়ে দরোজার বাইরে গিয়ে দেখি, বাড়ির সবাই জেগে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে এখানে সেখানে। আমাকে দেখে আক্কু এগিয়ে এসে বলল, তুই গুমাইতাছোস? পাকিস্তান আর্মি তো ঢাকা টাউনে হাজার হাজার মানু মাইরা ফালাইছে। তারপর আস্তে আস্তে এইদিকে আইতাছে। লোকজন ঢাকা ছাইড়া পলাইতাছে।

আমি বললাম, লোকজন পলাইতাছে ক্যামনে বুঝলি?

আক্কু বললো, আমার লগে আয়।

আক্কুর পেছনে পেছনে আমি বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালাম।

অসংখ্য মানুষের সারি ভূঁইয়া বাড়ির লাগোয়া সড়কে। নদী পার হয়ে তারা ছুটছে। কারো কারোর শরীরে গুলি লেগেছে। ছেলে-বুড়ো সবার চোখেই আতঙ্ক।

পাকিস্তান আর্মি কেন নির্বিচারে সবাইকে মারছে এটা বুঝতে আমার আরো কয়েকদিন লাগল। এও জানলাম, বাঙালিদের নেতা শেখ মুজিবকে আটক করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে আর্মিরা। তিনি জীবিত আছেন, নাকি তাকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে কেউ কলতে পারছে না।

সেদিন দুপুরের মধ্যেই ভূঁইয়া বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল।

শুনলাম ঢাকায় কার্ফিউ চলছে। কার্ফিউ কী জানতাম না। মুজাহিদকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, কার্ফিউ মানে অইলো, কেউ গরের থন বাইর অইতে পারব না। বাইর অইলেই আর্মি তারে গুল্লি কইরা মাইরা ফালাইব।

নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগল! কত কিছুই যে জানি না আমি!

সন্ধ্যার একটু পরেই একটা খ্রিস্টান পরিবার আমাদের ভূঁইয়া বাড়িতে এলো। ভদ্ররোকের নাম অশোক খান। ‘খান’ কিভাবে খ্রিস্টান হয় ভেবে পেলাম না। শুনলাম তিনি সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। হুমায়ূন মামার বস। সঙ্গে আছেন তার স্ত্রী, দুই ছেলে মিখায়েল ও প্রিন্স, আর এক মেয়ে ঝর্না। ঝর্না আর মিখায়েল আমাদেরই বয়সী। প্রিন্স কিছুটা ছোট।

তা হোক, আমাদের বন্ধুদের দল ভারি হয়ে গেল।

দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। হুমায়ূন মামা ঢাকা থেকে ফিরতে পারলেন না। আমরা ভয়ানক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়লাম। পাকিস্তান আর্মির নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে তারা বেঁচে আছেন কিনা আমরা জানতে পারছি না।

যুদ্ধ শুরু হবার ছয় দিনের মাথায় হুমায়ূন মামা আইন্তায় ফিরে এলে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তিনি জানালেন, ঢাকায় আম্মা-আব্বুজিসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা ভালো আছেন। তবে, হাজার হাজার লোক মারা গেছে। হুমায়ূন মামা আসার সময় কতগুলি লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন তার বিবরণ দিলেন। গ্রামের লোকজন ভিড় করে তার গল্প শুনছিল।

ভূঁইয়াবাড়ির লাগোয়া সড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষের মিছিল দিন দিন বাড়ছিলোই। নদী পার হয়ে এ পথে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিলেন অসংখ্য মানুষ।

কিন্তু আম্মা আর আব্বুজি গ্রামে এলেন না। তারা থেকে গেলেন ঢাকা শহরেই।
জুন মাসের শেষের দিকে আমরা ঢাকা ফিরলাম।

আমাদের বাসার দরোজায় দেখলাম, লাল কালি দিয়ে উর্দু ভাষায় বিশাল করে লেখা আছে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ তার একটু ওপরে আরবিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।’ আব্বুজির হাতের লেখা।

অনেকদিন পর ঢাকায় নিজের বাসায় ফিরে বেশ ভালো লাগছিল।

আমাদের বাসায় কোনো রেডিও ছিল না। বাসায় এসে দেখি আমাদের টেবিলের ওপর রাখা আছে নতুন একটা রেডিও। ফিলিপস ব্রান্ডের।

হঠাৎ রেডিও কেনা হলো কেন তা সন্ধ্যে হতেই বোঝা গেল।

কায়কোবাদ কাকা অনেক কসরৎ করে একটা স্টেশন ধরলেন। শুনলাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সেটা।

রাজনীতি বিষয়ে আমার বিশেষ কোনো জ্ঞান বা উৎসাহ কিছুই সে বয়সে ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির নির্বিচার হত্যাকাণ্ড আর অত্যাচার-নির্যাতনের নানা বর্ণনা আমার কানে আসছিল। ফলে পাকিস্তান বাহিনীর প্রতি একটা ঘৃণা মনের মধ্যে কিভাবে যেন জায়গা করে নিচ্ছিল।

আইন্তায় থাকতেই কারোর মুখে শুনেছিলাম, আর্মিদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের মানুষ যুদ্ধ করছে। কোনো কোনো জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে, কত পাকবাহিনী মারা যাচ্ছে তার খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়।

আইন্তায়, মানে নানাবাড়ি থাকতে স্বাধীন বাংলা কেতার কেন্দ্র কখনো শোনা হয়নি। কার ঘরে কখন রেডিও ছেড়ে এই স্টেশনের খবর শোনা হয় তা আমরা কখনো জানতে পারিনি! হয়তো খুব গোপনে এই স্টেশন শোনা হয়। অবশ্য গ্রামে থাকতে আমরা এসব খবর শোনার ব্যাপারে খুব যে আগ্রহী ছিলাম তাও না। সন্ধ্যের পর আমরা সমবয়সীরা নানান খেলায় মেতে উঠতাম। স্কুল নেই, পড়া নেই। আমাদের তখন আনন্দ আর আনন্দ।

জিন্দাবাহারে নিজেদের বাসায় ফিরে আসার পর আমাদের বাইরে যাবার উপায় ছিল না। ঘরেই থাকতে হতো। ফলে, কায়কোবাদ কাকা যখন স্বাধীন বাংলা বা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকা ধরতেন আমরাও তখন তা শুনতাম। আমাদের ছোট ঘরটিতে রেডিও শোনার জন্য আশেপাশের অনেক মানুষ জড়ো হতেন। পাশের বাসার সাহিদা আপার বাবা মনছুর খলিফা অবধারিতভাবেই উপস্থিত থাকতেন। কায়কোবাদ কাকার সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতেন।

কায়কোবাদ কাকা খুব মনোযোগ দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানগুলো শুনতেন। খবর আর গান ছাড়াও শুনতেন চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার।

কায়কোবাদ কাকা আর মনছুর খলিফার আলাপ আমিও কেন জানি না মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তাদের আলাপ থেকেই জেনেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় পাকসেনারা ‘গাবুর মাইর’ খাচ্ছে।

আব্বুজি স্বাধীন বাংলার খবর খুব একটা বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন, এইগুলি একদমই ফালতু খবর। পাক আর্মিরা অনেক শক্তিশালী। তাদের কাছে আছে আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র। কোনো ট্রেনিং ছাড়া বাঙালিরা তাদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য না।

কায়কোবাদ কাকা বলতেন, দাদা, গেরিলাযুদ্ধের কাছে কুনু কিছুই টিকব না। আপনের পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আর মিলিশিয়ারা দেইখেন ক্যামনে জান লয়া পলায়।

কয়েক মাস পার হতেই কায়কোবাদ কাকার কথাই সত্যি প্রমাণ হতে শুরু করল। সারা দেশে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং বিভিন্ন জায়গায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পন করার খবর শুনছিলাম।

বিজয়ের দিন

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা আবার আমরা নানাবাড়ি আইন্তাতেই ফিরে গেলাম। মার্চের দিকে যখন এসেছিলাম তখন মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক দেখেছিলাম সেটা আর নেই। মানুষ অপেক্ষা করছে, কখন পাকিস্তানি হানাদাররা সারেন্ডার করে।

ডিসেম্বরের তের-চৌদ্দ তারিখের দিকে পাকসেনাদের ওপর বিমান হামলাও তীব্র হয়ে উঠল। সাঁ-সাঁ করে যখন মিগ টুয়েন্টি ওয়ান উড়ে যেতো মানুষ উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠত। কেউ কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে উঠত।

১৫ ডিসেম্বর আইন্তা ভূঁইয়া বাড়িতে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে আশ্রয় নিলেন। তারা আমাদেরই দূরসম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন। হুমায়ূন মামাকে দেখলাম, তাদের সঙ্গে গল্প করছেন। এক সময় দেখা গেল তিনি তাদের একজনের কাছ থেকে একটা লাইট মেশিনগান নিয়ে সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। আমি তার পাশে গিয়ে বললাম, মামা, আমি একটু দেখি?

মামা বললেন, মাম্মা, এইটা তো আপনে তুলতে পারবেন না। অনেক ভারী।

আমি বললাম, পারমু।

মামা আমার দিকে মেশিন গানটা এগিয়ে দিলেন। আমি সেটা নিতে গিয়ে বুঝলাম, বেশ ভারী। হুমায়ূন মামা অস্ত্রটা আমার হাত থেকে নিয়ে যার অস্ত্র তাকে ফিরিয়ে দিলেন।

আগে কখনো মুক্তিযোদ্ধা দেখিনি। ঢাকায় আমার বন্ধুরাও কখনো মুক্তিযোদ্ধা দেখেনি। এরকম কাছ থেকে কোনো অস্ত্রও তারা দেখেনি। আমিও হাত দিয়ে কখনো কোনো অস্ত্র ধরে দেখিনি। আজ একই সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কয়েকজনকে দেখে এবং নিজের হাতে অস্ত্র নিয়ে ভেতরে কেমন একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম।

আমার পাশে আক্কু আর মুজাহিদ দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের বললাম, চল আমরাও মুক্তিবাহিনীর খাতায় নাম লেখাই।

ওরা আমার কথা শুনে রাজি হয়ে গেল। আক্কু বলল, অরা তো আমগো নিব না। আঠারো বছর অইলে নিত। আমি হুনছি, আঠারো বচ্ছর বয়স অইলে মুক্তিবাহিনিতে যাওন যায়।

ওর কথা শুনে আমাদের মনের কথা মনেই রয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় ভূঁইয়াবাড়ির উঠোনে একটা নাটক মঞ্চস্থ হলো। গত কয়েক মাস ধরেই এর রিহার্সাল চলছিল। নাটকের নাম: নবাব সিরাজুদ্দৌলা। হুমায়ূন মামাও এতে অভিনয় করলেন। তিনি হলেন লর্ড ক্লাইভ।

অনেক রাত পর্যন্ত নাটক চলল।

তখন তেমন কারোর কাছে ঘড়ি ছিল না। কিংবা আমাদের ঘড়ি দেখার কেনো প্রয়োজনও ছিল না। রাত দশটা হোক কিংবা দুটো। দুটোই আমার কাছে সমার্থক। ভূঁইয়া বাড়িতে আমরা সমবয়সীরা সংখ্যায় নেহায়েৎ কম না।

সারাদিন আমাদের তাস খেলে, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা হাডুডু খেলে কাটত। এই তাস অবশ্য বড়দের তাস ছিল না। আমরা খেলতাম সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে। কিংস্টর্ক, সিজর্স, প্যারট, ক্যাপস্টান- এসব সিগারেটের খালি প্যাকেট সংগ্রহ করে আমরা খেলতাম।

নাটক শেষ করে আমরা প্রায় ভোরের দিকে ঘুমুতে গেলাম। পরের দিন একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙল। নাস্তা করছি এমন সময়ে দেখলাম, বাইরে বেশ হৈ-চৈ হচ্ছে। কে একজন বলল, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!

আইন্তা গ্রামটা একটা অদ্ভুত গ্রাম। বেশিরভাগ মানুষই এখানে অশিক্ষিত। আমি যখনই গ্রামে এসেছি, কোনো না কোনো গুজব আমি শুনেছি।

মার্চে যখন এখানে এসেছিলাম, তখনও শুনেছিলাম, শেখ মুজিবকে পাকবাহিনী মেরে ফেলেছে। পরে, শুনেছি তাকে বন্দী করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে! অবশ্য কোনটা যে ঠিক আমরা তখনও জানি না।

তবে, চারদিকে বেশ গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে সড়কে একটা ছোটখাটো মিছিলও বের হতে দেখলাম। মিছিল থেকে স্লোগান উঠছে, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। জয় বাংলা।

আমরাও সেই মিছিলে মিশে গেলাম।

মিছিল নিয়ে আমরা দোলেশ্বর চলে গেলাম। দোলেশ্বরে গিয়ে দেখা গেল একটা লঞ্চ বুড়িগঙ্গার তীরে অপেক্ষা করছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেক মানুষ তাতে গিজগিজ করছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র থেকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ছিলো আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিল।

আমরাও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে লঞ্চে উঠে পড়লাম। বুড়িগঙ্গা দিয়ে যেসব নৌকা ও লঞ্চ যাচ্ছিল সেগুলো থেকেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান চারদিক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর আমাদের লঞ্চও চলতে শুরু করল। লঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ছিল শ খানেক মানুষ। বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোরও ছিল দশ-বারোজন।

লঞ্চ বিকেলের দিকে সদরঘাটে এসে ভিড়ল। আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে নামতে যাচ্ছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের নামতে দিল না।

মুক্তিযোদ্ধাদের নেতাগোছের একজন চিৎকার করে সকলের উদ্দেশে বললেন, দয়া কইরা আপনারা কেউ নামবেন না। সবাই লঞ্চে থাকেন।

আমরা ডেকে এসে দাঁড়ালাম। মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন লঞ্চঘাটে নেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একটা লোককে চোখ বেঁধে ঘাটের একপাশে এনে দাঁড় করাচ্ছে। তার দু হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।

নিশ্চয়ই রাজাকার কিংবা আল বদর।

আমরা লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। কী ঘটতে যাচ্ছে আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিল আক্কু। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকটারে কি অহন মাইরধর করব?

আক্কু বিজ্ঞের মতো ভঙ্গি করে বললো, দেখ না কী অয়! চোদনাটারে মনে অয় ভালোই ঠেঙ্গানি দিব।

আক্কুর কথা শেষ না হতেই গুলির আওয়াজ হলো। প্রথমে পিস্তলের একটা গুলি ছুটল। পর মুহূর্তেই এলএমজি টা-টা-টা করে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দিল। আমাদের চোখের সামনেই চোখ আর হাত-পা বাঁধা লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে লাথি দিয়ে নদীতে ফেলে দিলেন।

এত কাছ থেকে কাউকে মেরে ফেলার দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। আমার বুকটা ঢিবঢিব করতে লাগল।

লঞ্চ যখন সদরঘাটে এসে ভেড়ে তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম, আমি এখানে নেমে যাব। সদরঘাট থেকে জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেনে আমাদের বাসা আধাঘণ্টার পথ। আম্মা-আব্বুজি আর কায়কোবাদ কাকাকে দেখতে খুব মন চাইছিলো। তা ছাড়া, ঢাকায় আজ অনেক কিছু ঘটবে। সেসব দেখার ইচ্ছেটাও মনের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার পা লঞ্চে কেউ যেন পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে। বেশ কিছু লোক লঞ্চ থেকে তখন নেমে গেলেও আমি নামতে পারলাম না।

কিছুক্ষণ পরই লঞ্চ ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে লঞ্চটা তখন ঘাট ছেড়ে আবার দোলেশ্বরের দিকে যাত্রা করেছে। একটু পরেই সদরঘাট টার্মিনাল আমার চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। তখনো লঞ্চের মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর রাইফেলের ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বিজয় উদযাপন করছে।

কিন্তু আমার চোখের সামনে অচেনা এক রাজাকারের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বারবার ভেসে উঠতে লাগল।

দেশ স্বাধীন হবার পরের দিনই আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;