আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ



ফরিদ কবির
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

২৫ মার্চ সকাল থেকেই শুনছি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

সকালে আব্বুজি আম্মাকে বললেন, তুমি ফরিদ-শরিফরে লয়া আইনথা চইলা যাও। শুনে আম্মা বললেন, কী কও? নিজের ঘর রাইখা আমি যামু না। এর চাইতে এক কাম করো, তুমি ফরিদ-শরিফরে আইনথায় রাইখা আসো। আইন্তা কেরানিগঞ্জের একটা ছোট্ট গ্রাম। বুড়িগঙ্গার ওপারেই।

আমাদের যাওয়া নিয়া দুজনে কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কে জড়িয়ে গেলে কায়কোবাদ কাকা বললেন, ভাবী, আপনে আর দাদায় বাচ্চাগো লয়া আইনথায় যান গা। আমি বাড়ি পাহারা দিমুনে।

আম্মা কিছুতেই যাবেন না। তিনি বলেন, সংসার রাইখা আমি যামু না।

শেষ পর্যন্ত আম্মা গেলেন না। দুপুরের দিকে আমার নানা এসে হাজির। বললেন, সবতে আমার লগে চল। ঢাকা টাউনে থাকনের কাম নাই।

কিন্তু আম্মা যেতে রাজি হলেন না। তিনি আমাকে আর শরিফকে পাঠিয়ে দিলেন।

আমরা ২৫ মার্চ দুপুরে খেয়ে-দেয়েই নানার সঙ্গে কেরানিগঞ্জে নানাবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। জিন্দাবাহার থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক বেশ দূরেই। কিন্তু নানা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে হেঁটেই রওনা হলেন। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে বাস লোহার পুল হয়ে নারায়ণগঞ্জ যেত। আমরা মার্চের তীব্র গরমের মধ্যেই হেঁটে এসে ভিক্টোরিয়া পার্কের বাসস্টেশনে পৌঁছলাম। বাস স্টেশন ছিল লোকে লোকারণ্য। একটা করে বাস আসে, আর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাতে। নানা আমাদের দু ভাইকে নিয়ে অনেক কষ্টে একটা বাসে উঠলেন। আমরা কোনো সিট পেলাম না। শরিফের তখন মাত্র ৭-৮ বছর বয়স। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে ও হাঁসফাঁস করছিল। নানা সিটে বসে থাকা একটা লোককে বললেন, বাবা, আমার নাতিটাকে আপনার কোলে দেই?

লোকটা শরিফের দিকে এক নজর দেখে বললো, আচ্ছা, দেন।

নানা শরিফকে সেই লোকের কোলে বসিয়ে দিলেন। আমাকে বললেন, চল, সামনে কুনু বাসস্টপে সিট খালি হইলে তরে বসায়া দিমুনে।

নানা এক হাতে বাসের হাতল ধরলেন অন্য হাতে আমাকে।

বাস এসে মুন্সিখোলায় নামল। আমরা কোনো বাসস্টপেই লোকজন ঠেলে খালি সিটে বসতে পারলাম না।

মুন্সিখোলা থেকে বুড়িগঙ্গা পার হতে হবে আমাদেরকে। নদীর ওপার থেকে মাইল দেড়েক হাঁটাপথ। গ্রামের নাম আইন্তা। ছোট্ট একটা গ্রাম। এর মধ্যে ভূঁইয়া বাড়িই তুলনায় বড়।

আমার নানার পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে একদম বড়টাকে আমরা দেখিনি। পরের জন থাকেন পুরোনো ঢাকার কায়েৎটুলিতে। বাকি তিন ভাই তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আইন্তায়ই থাকেন।

আমরা যখন মুন্সিখোলায় নামি তখন বিকেল। কিন্তু মার্চের বিকেল। সূর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়লেও তার তেজ এতোটুকু কমেনি। তীব্র গরমে আমরা বেশ কাহিল। শরিফকে খুবই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। ও এমনিতেই শুকনো, চিকনা-চাকনা। সেই দুপুরে আমরা খেয়ে-দেয়ে জিন্দাবাহার থেকে বেরিয়েছি। পথে আমাদের মুখে আর কিছু পড়েনি। শরিফের মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

মুন্সিখোলা ঘাটেও অসম্ভব ভিড়। অনেকবার আমি এ পথে নানাবাড়ি গেছি। এত ভিড় কখনো দেখিনি। আমি শুধু এটুকু শুনেছি, আজ রাতে ভয়ংকর একটা কিছু ঘটতে চলেছে। কী ঘটবে, কেন ঘটবে তার কিছুই জানি না।

কায়কোবাদ কাকা আর আব্বুজির কথা থেকে জেনেছি আর্মিরা হামলা করতে পারে। তখন থেকেই আমার মনে একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, আমরা কী দোষ করেছি? আর্মি আমাদের ওপর কেন হামলা করবে? এর উত্তর জানা নাই। আম্মা আর আব্বুজি ঢাকা টাউনে রয়ে গেছেন। রয়ে গেছেন কায়কোবাদ কাকাও। তাদের কোনো বিপদ হয় কিনা—এ নিয়ে একটা ভয় থেকে থেকেই আমাকে বিষণ্ণ করে ফেলছে।

অনেকক্ষণ হলো আমরা মুন্সিখোলা ঘাটে এসেছি। গিজগিজ করছে লোকে। নানান বয়সী। অনেকের সঙ্গেই বিশাল বিশাল ব্যাগ। দেখে মনে হবে পুরো সংসারটাই সঙ্গে নিয়ে ফিরছেন। ঈদ-পার্বণের সময় এমনটা দেখা যায়। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সবাই গ্রামের বাড়িতে আসেন। কিন্তু তখন সবার চোখে-মুখে যেমনটা হাসি-খুশি ভাব থাকে, আজ তেমনটা মনে হচ্ছে না। সবার চোখে-মুখেই কেমন আতঙ্কের ছাপ। অবশ্য সেটা বড়দের মধ্যেই। তাদের সঙ্গে থাকা ছোটরা ঠিকই নদীর পাড়ে খোলামেলা জায়গা পেয়ে ছুটোছুটি করছে।

ব্যতিক্রম শুধু শরিফ। ও চুপচাপ আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। একবার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, আমরা কখন যামু?

আমি বলেছিলাম, দেখছ না, নাওয়ে অনেক ভিড়।

সূর্য যখন প্রায় ডুবুডুবু তখন আমরা একটা নৌকায় উঠতে পারলাম। নৌকার মাঝি নানারই পরিচিত কেউ। তাকে দেখেই মাঝি চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, খসরু বাই, আমার নাওয়ে আহেন।

নানা তার চিৎকার শুনেই আমাকে আর শরিফকে নিয়ে দ্রুত সেই নৌকার দিকে এগোলেন। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি ওঠা যায়! নৌকা পাড়ে ভিড়তেই ভিড় সেদিকে হামলে পড়ল। মাঝি এক হাতে ভিড় ঠেলে আমাদেরকে নৌকায় ওঠার জন্য আরেকটা হাত বাড়িয়ে দিলেন।

মাঝি যখন নৌকা ছাড়লেন তখন সেটা প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা। নানার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি বিড়বিড় করে সুরা পড়ছেন। আমার কেন জানি মনে হলো, আমাদের নৌকাটা ডুবে যাবে। নানার দেখাদেখি আমিও সুরা পড়তে শুরু করলাম। দুটো সুরা তখন আমার মুখস্ত ছিল। সুরা ফাতিহা আর সুরা ইখলাস। আমি সে দুটোই পড়তে শুরু করলাম।

ঠিক সে সময় একটা লঞ্চ আমাদের প্রায় গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। সদরঘাটের দিকে যাচ্ছে সেটা। লঞ্চের একটা বিশাল ঢেউ এগিয়ে আসছে আমাদের নৌকার দিকে। সন্ধ্যের আবছা আলো-ছায়াতেও বুড়িগঙ্গার ঢেউকে মনে হলো সমুদ্রের এক বিশাল ঢেউ। সমুদ্র আমি সামনাসামনি কখনো দেখিনি। সমুদ্র সম্পর্কে আমার ধারণা জোছনা খালাম্মার বাড়িতে টেলিভিশন দেখে। আমি চোখ বুঝলাম। মনে হলো, শক্ত একটা কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আমাদের নৌাকাটা। তারপর থেমে গেল। সেই ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। কেউ একজন আমাকে ধরে ফেলল। চোখ খুলতে দেখি, একটা লোক মিটমিট করে হাসছে।

নৌকা ডোবেনি। সেটা পাড়ে এসে লেগেছে। আমি হাঁফ ছাড়লাম।

আইন্তায় যখন এসে পৌঁছলাম তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকতেই নানি ঘরের ঠিলা থেকে পিতলের একটা গ্লাসে পানি ঢেলে শরিফের দিকে এগিয়ে দিলেন। তারপর নানার দিকে তাকিয়ে বললেন, আহা রে, আমার নাতিটার মুখ এক্কেরে হুগায়া গেছে গা। অরে আপনে কিছু খিলান নাই?

নানা বিরক্তমুখে বললেন, আরে, রাস্তায় কিছু আছে নিহি। মানু জান লয়া পলাইতাছে।

শরিফ পানি খাওয়া শেষ করলে নানি আমাকেও এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন। তারপর নানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনেরও যেমুন কথা। নাতি গো একটা লেবেঞ্চুশও তো মানু কিনা দেয়। কন যে বুইলা গেছিলেন গা।

নানা এসব কথার কোনো জবাব না দিয়ে পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বললেন, হুমায়ুন ফিরছে?

হুমায়ুন আমাদের একমাত্র মামা। তিনি শ্যামপুরের সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন।

নানি বললেন, না ফিরে নাই তো। আপনে ইট্টু গিয়া দেখেন না, গোলে আইছে নিহি।

গোলে মিয়া আমাদেরই কী রকম আত্মীয়। আমরা ডাকি গোলে ভাই। গোলে ভাইও সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতেই কাজ করেন।

নানা পাঞ্জাবিটা আবার পরে নিলেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আমিও জামাকাপড় বদলে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নানি জিজ্ঞেস করলেন, কী তর সইতাছে না? আগে খায়া-দায়া ল, তারপর যাইছ।

আমি বললাম, আপনে খাওন বাড়তে থাকেন আমি অহনই আইতাছি। এক লৌড়ে যামু, আরেক লৌড়ে আমু।

নানি বললেন, হ তর লৌড় তো জানা আছে। আক্কু-মুজাহিদ গো পাইলে তর তো আর উঁশ থাকব না। আমি কই, খায়া-দায়া তারপর বাইরে যা। নানি সাহিদা খালাম্মার উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন, সাহিদা, ফরিদ-শরিফ রে খাওন দে।

আমি নিজের জামা-কাপড় বদলালেও নানি শরিফের শার্ট খুলে ওকে একটা গেঞ্জি পরিয়ে দিলেন।

খেয়ে দেয়েই আমি ছুটলাম মুজাহিদের খোঁজে। মুজাহিদ আমারই সমবয়সী। আক্কু, মানে আকতারও আমার সমবয়সী। আকতার সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই। আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। মুজাহিদ আর আক্কু দুজনকেই পাওয়া গেল।

আমরা ভূঁইয়া বাড়ির কবরস্থানের এক পাশে বসলাম। আমাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হলো আরো কয়েকজন।

রাতে হুমায়ূন মামা ফিরলেন না। নানিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, হুমায়ূন মনে অয়, তগো বাড়িতই গেছে।

আমি হুমায়ূন মামার ঘরেই ঘুমুতে গেলাম।

অনেক রাতে হৈ-চৈ আর গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙল। আমি উঠে বসলাম। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। ঘরের বাইরে অনেক লোকের কথা শোনা যাচ্ছে। আমি উঠে দরোজা খুললাম। ঘরের বাইরে অসংখ্য মানুষ। আমরা সবাই ‘বন্দে’ চলে গেলাম। সেখানে আশেপাশের বাড়ির মানুষেরাও ভিড় করেছে। দূরে ঢাকা টাউনের যতটুকু দেখা যায়, সেখানে কিছুক্ষণ পরপরই আগুনের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে দ্রিম-দ্রিম-টা-টা-টাস-টাস শব্দে গুলি আর বোমার আওয়াজ। শহরের একটা জায়গায় আগুনের শিখা আকাশ ছুঁয়েছে। দাউ-দাউ করে বাড়িঘর পুড়ছে! কোথায় আগুন লেগেছে, কারা গুলি করছে, কাদের করছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে সেন্টুকে দেখলাম। সেন্টু সম্পর্কে আমার মামা। আমার মায়ের চাচাতো ভাই। বয়সে আমার বেশ কিছুটা বড় হলেও আমি ওকে নাম ধরেই ডাকি। ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী অইছে রে? এত্তো গুল্লি কারা মারতাছে?

সেন্টু আমার কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল, আর্মি গুল্লি করতাছে। ডাকা টাউনের সবতেরে মাইরা ফালাইতাছে।

মাইরা ফালাইতাছে! ক্যান? আমি অবাক হয়ে গেলাম।

সেন্টু ভয়ার্ত গলায় বললো, শেখ মুজিবরে যারা ভোট দিছে, তাগো সবাইরেই নাকি মাইরা ফালাইতাছে! দ্যাখতাছস না, বাড়ি-গরে আগুন লাগায়া দিছে।

শুনেই আমার বুক ধরাস করে উঠল। আমার আম্মা-আব্বুজি তো ঢাকায়! তাদেরকেও মেরে ফেলবে নাকি আর্মি?

কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব সেন্টু দিতে পারবে না। আমি দৌড়ে ঘরে ফিরলাম। নানা-নানি কেউ ঘরে নেই। শরিফ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো, কী অইছে, ভাইয়া?

আমি বললাম, কিছু অয় নাই। তুই ঘুমা। আর্মিরা গুল্লি করতাছে। ঘর থেইকা বাইর অইছ না কলাম। ঘরে থাকিছ। আমি নানিরে বিছরায়া লয়া আইতাছি।

ঘরের বাইরে বের হতেই পুঁটি খালাম্মাদের আঙিনায় দেখা গেলো একটা ভিড় জমাট বেঁধে আছে। সেখানে গিয়ে নানির দেখা পাওয়া গেল। তবে তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তিনি মাটি থাপড়াতে থাপড়াতে চিৎকার করে কাঁদছিলেন আর কিছুটা সুর করে গাইছিলেন, আমার মিনার কী অইবো রে খোদা। আমার হুমায়ূনের কী অইবো...!

উপস্থিত লোকজন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আরে, মিনার কিছু অইবো না। আপনে আল্লা আল্লা করেন। আয়াতুল কুরসি পড়েন। আরেকজন তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিলেন। মুখে বলছিলেন, ও ফুপু, গরে চলেন, মিনা আপার কিছু অইবো না। চলেন, গরে চলেন।

নানি কিছুতে উঠবেন না। তিনি চিৎকার করে কাঁদতে থাকলেন।

নানির কান্না দেখে আমার কিছুটা ভয় লাগতে শুরু করলো। আম্মা-আব্বুজি ঠিক আছে তো? কায়কোবাদ কাকা? হুমায়ূন মামা?

বুকের ভেতরটা ঢিবঢিব করতে লাগল।

আমি ভয় আর আশঙ্কা নিয়েই এক সময় ঘুমুতে গেলাম। কিন্তু ভূঁইয়া বাড়ির মানুষ সারা রাত ঘুমুল না। সারা রাতই ঘরের চারপাশে তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল গোলাগুলি আর অসংখ্য মানুষের কথাবার্তা শুনে। বিছানা থেকে উঠে দেখি দরোজা খোলা। বিছানা ছেড়ে দরোজার বাইরে গিয়ে দেখি, বাড়ির সবাই জেগে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে এখানে সেখানে। আমাকে দেখে আক্কু এগিয়ে এসে বলল, তুই গুমাইতাছোস? পাকিস্তান আর্মি তো ঢাকা টাউনে হাজার হাজার মানু মাইরা ফালাইছে। তারপর আস্তে আস্তে এইদিকে আইতাছে। লোকজন ঢাকা ছাইড়া পলাইতাছে।

আমি বললাম, লোকজন পলাইতাছে ক্যামনে বুঝলি?

আক্কু বললো, আমার লগে আয়।

আক্কুর পেছনে পেছনে আমি বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালাম।

অসংখ্য মানুষের সারি ভূঁইয়া বাড়ির লাগোয়া সড়কে। নদী পার হয়ে তারা ছুটছে। কারো কারোর শরীরে গুলি লেগেছে। ছেলে-বুড়ো সবার চোখেই আতঙ্ক।

পাকিস্তান আর্মি কেন নির্বিচারে সবাইকে মারছে এটা বুঝতে আমার আরো কয়েকদিন লাগল। এও জানলাম, বাঙালিদের নেতা শেখ মুজিবকে আটক করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে আর্মিরা। তিনি জীবিত আছেন, নাকি তাকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে কেউ কলতে পারছে না।

সেদিন দুপুরের মধ্যেই ভূঁইয়া বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল।

শুনলাম ঢাকায় কার্ফিউ চলছে। কার্ফিউ কী জানতাম না। মুজাহিদকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, কার্ফিউ মানে অইলো, কেউ গরের থন বাইর অইতে পারব না। বাইর অইলেই আর্মি তারে গুল্লি কইরা মাইরা ফালাইব।

নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগল! কত কিছুই যে জানি না আমি!

সন্ধ্যার একটু পরেই একটা খ্রিস্টান পরিবার আমাদের ভূঁইয়া বাড়িতে এলো। ভদ্ররোকের নাম অশোক খান। ‘খান’ কিভাবে খ্রিস্টান হয় ভেবে পেলাম না। শুনলাম তিনি সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। হুমায়ূন মামার বস। সঙ্গে আছেন তার স্ত্রী, দুই ছেলে মিখায়েল ও প্রিন্স, আর এক মেয়ে ঝর্না। ঝর্না আর মিখায়েল আমাদেরই বয়সী। প্রিন্স কিছুটা ছোট।

তা হোক, আমাদের বন্ধুদের দল ভারি হয়ে গেল।

দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। হুমায়ূন মামা ঢাকা থেকে ফিরতে পারলেন না। আমরা ভয়ানক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়লাম। পাকিস্তান আর্মির নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে তারা বেঁচে আছেন কিনা আমরা জানতে পারছি না।

যুদ্ধ শুরু হবার ছয় দিনের মাথায় হুমায়ূন মামা আইন্তায় ফিরে এলে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তিনি জানালেন, ঢাকায় আম্মা-আব্বুজিসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা ভালো আছেন। তবে, হাজার হাজার লোক মারা গেছে। হুমায়ূন মামা আসার সময় কতগুলি লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন তার বিবরণ দিলেন। গ্রামের লোকজন ভিড় করে তার গল্প শুনছিল।

ভূঁইয়াবাড়ির লাগোয়া সড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষের মিছিল দিন দিন বাড়ছিলোই। নদী পার হয়ে এ পথে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিলেন অসংখ্য মানুষ।

কিন্তু আম্মা আর আব্বুজি গ্রামে এলেন না। তারা থেকে গেলেন ঢাকা শহরেই।
জুন মাসের শেষের দিকে আমরা ঢাকা ফিরলাম।

আমাদের বাসার দরোজায় দেখলাম, লাল কালি দিয়ে উর্দু ভাষায় বিশাল করে লেখা আছে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ তার একটু ওপরে আরবিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।’ আব্বুজির হাতের লেখা।

অনেকদিন পর ঢাকায় নিজের বাসায় ফিরে বেশ ভালো লাগছিল।

আমাদের বাসায় কোনো রেডিও ছিল না। বাসায় এসে দেখি আমাদের টেবিলের ওপর রাখা আছে নতুন একটা রেডিও। ফিলিপস ব্রান্ডের।

হঠাৎ রেডিও কেনা হলো কেন তা সন্ধ্যে হতেই বোঝা গেল।

কায়কোবাদ কাকা অনেক কসরৎ করে একটা স্টেশন ধরলেন। শুনলাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সেটা।

রাজনীতি বিষয়ে আমার বিশেষ কোনো জ্ঞান বা উৎসাহ কিছুই সে বয়সে ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির নির্বিচার হত্যাকাণ্ড আর অত্যাচার-নির্যাতনের নানা বর্ণনা আমার কানে আসছিল। ফলে পাকিস্তান বাহিনীর প্রতি একটা ঘৃণা মনের মধ্যে কিভাবে যেন জায়গা করে নিচ্ছিল।

আইন্তায় থাকতেই কারোর মুখে শুনেছিলাম, আর্মিদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের মানুষ যুদ্ধ করছে। কোনো কোনো জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে, কত পাকবাহিনী মারা যাচ্ছে তার খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়।

আইন্তায়, মানে নানাবাড়ি থাকতে স্বাধীন বাংলা কেতার কেন্দ্র কখনো শোনা হয়নি। কার ঘরে কখন রেডিও ছেড়ে এই স্টেশনের খবর শোনা হয় তা আমরা কখনো জানতে পারিনি! হয়তো খুব গোপনে এই স্টেশন শোনা হয়। অবশ্য গ্রামে থাকতে আমরা এসব খবর শোনার ব্যাপারে খুব যে আগ্রহী ছিলাম তাও না। সন্ধ্যের পর আমরা সমবয়সীরা নানান খেলায় মেতে উঠতাম। স্কুল নেই, পড়া নেই। আমাদের তখন আনন্দ আর আনন্দ।

জিন্দাবাহারে নিজেদের বাসায় ফিরে আসার পর আমাদের বাইরে যাবার উপায় ছিল না। ঘরেই থাকতে হতো। ফলে, কায়কোবাদ কাকা যখন স্বাধীন বাংলা বা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকা ধরতেন আমরাও তখন তা শুনতাম। আমাদের ছোট ঘরটিতে রেডিও শোনার জন্য আশেপাশের অনেক মানুষ জড়ো হতেন। পাশের বাসার সাহিদা আপার বাবা মনছুর খলিফা অবধারিতভাবেই উপস্থিত থাকতেন। কায়কোবাদ কাকার সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতেন।

কায়কোবাদ কাকা খুব মনোযোগ দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানগুলো শুনতেন। খবর আর গান ছাড়াও শুনতেন চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার।

কায়কোবাদ কাকা আর মনছুর খলিফার আলাপ আমিও কেন জানি না মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তাদের আলাপ থেকেই জেনেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় পাকসেনারা ‘গাবুর মাইর’ খাচ্ছে।

আব্বুজি স্বাধীন বাংলার খবর খুব একটা বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন, এইগুলি একদমই ফালতু খবর। পাক আর্মিরা অনেক শক্তিশালী। তাদের কাছে আছে আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র। কোনো ট্রেনিং ছাড়া বাঙালিরা তাদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য না।

কায়কোবাদ কাকা বলতেন, দাদা, গেরিলাযুদ্ধের কাছে কুনু কিছুই টিকব না। আপনের পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আর মিলিশিয়ারা দেইখেন ক্যামনে জান লয়া পলায়।

কয়েক মাস পার হতেই কায়কোবাদ কাকার কথাই সত্যি প্রমাণ হতে শুরু করল। সারা দেশে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং বিভিন্ন জায়গায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পন করার খবর শুনছিলাম।

বিজয়ের দিন

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা আবার আমরা নানাবাড়ি আইন্তাতেই ফিরে গেলাম। মার্চের দিকে যখন এসেছিলাম তখন মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক দেখেছিলাম সেটা আর নেই। মানুষ অপেক্ষা করছে, কখন পাকিস্তানি হানাদাররা সারেন্ডার করে।

ডিসেম্বরের তের-চৌদ্দ তারিখের দিকে পাকসেনাদের ওপর বিমান হামলাও তীব্র হয়ে উঠল। সাঁ-সাঁ করে যখন মিগ টুয়েন্টি ওয়ান উড়ে যেতো মানুষ উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠত। কেউ কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে উঠত।

১৫ ডিসেম্বর আইন্তা ভূঁইয়া বাড়িতে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে আশ্রয় নিলেন। তারা আমাদেরই দূরসম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন। হুমায়ূন মামাকে দেখলাম, তাদের সঙ্গে গল্প করছেন। এক সময় দেখা গেল তিনি তাদের একজনের কাছ থেকে একটা লাইট মেশিনগান নিয়ে সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। আমি তার পাশে গিয়ে বললাম, মামা, আমি একটু দেখি?

মামা বললেন, মাম্মা, এইটা তো আপনে তুলতে পারবেন না। অনেক ভারী।

আমি বললাম, পারমু।

মামা আমার দিকে মেশিন গানটা এগিয়ে দিলেন। আমি সেটা নিতে গিয়ে বুঝলাম, বেশ ভারী। হুমায়ূন মামা অস্ত্রটা আমার হাত থেকে নিয়ে যার অস্ত্র তাকে ফিরিয়ে দিলেন।

আগে কখনো মুক্তিযোদ্ধা দেখিনি। ঢাকায় আমার বন্ধুরাও কখনো মুক্তিযোদ্ধা দেখেনি। এরকম কাছ থেকে কোনো অস্ত্রও তারা দেখেনি। আমিও হাত দিয়ে কখনো কোনো অস্ত্র ধরে দেখিনি। আজ একই সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কয়েকজনকে দেখে এবং নিজের হাতে অস্ত্র নিয়ে ভেতরে কেমন একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম।

আমার পাশে আক্কু আর মুজাহিদ দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের বললাম, চল আমরাও মুক্তিবাহিনীর খাতায় নাম লেখাই।

ওরা আমার কথা শুনে রাজি হয়ে গেল। আক্কু বলল, অরা তো আমগো নিব না। আঠারো বছর অইলে নিত। আমি হুনছি, আঠারো বচ্ছর বয়স অইলে মুক্তিবাহিনিতে যাওন যায়।

ওর কথা শুনে আমাদের মনের কথা মনেই রয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় ভূঁইয়াবাড়ির উঠোনে একটা নাটক মঞ্চস্থ হলো। গত কয়েক মাস ধরেই এর রিহার্সাল চলছিল। নাটকের নাম: নবাব সিরাজুদ্দৌলা। হুমায়ূন মামাও এতে অভিনয় করলেন। তিনি হলেন লর্ড ক্লাইভ।

অনেক রাত পর্যন্ত নাটক চলল।

তখন তেমন কারোর কাছে ঘড়ি ছিল না। কিংবা আমাদের ঘড়ি দেখার কেনো প্রয়োজনও ছিল না। রাত দশটা হোক কিংবা দুটো। দুটোই আমার কাছে সমার্থক। ভূঁইয়া বাড়িতে আমরা সমবয়সীরা সংখ্যায় নেহায়েৎ কম না।

সারাদিন আমাদের তাস খেলে, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা হাডুডু খেলে কাটত। এই তাস অবশ্য বড়দের তাস ছিল না। আমরা খেলতাম সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে। কিংস্টর্ক, সিজর্স, প্যারট, ক্যাপস্টান- এসব সিগারেটের খালি প্যাকেট সংগ্রহ করে আমরা খেলতাম।

নাটক শেষ করে আমরা প্রায় ভোরের দিকে ঘুমুতে গেলাম। পরের দিন একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙল। নাস্তা করছি এমন সময়ে দেখলাম, বাইরে বেশ হৈ-চৈ হচ্ছে। কে একজন বলল, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!

আইন্তা গ্রামটা একটা অদ্ভুত গ্রাম। বেশিরভাগ মানুষই এখানে অশিক্ষিত। আমি যখনই গ্রামে এসেছি, কোনো না কোনো গুজব আমি শুনেছি।

মার্চে যখন এখানে এসেছিলাম, তখনও শুনেছিলাম, শেখ মুজিবকে পাকবাহিনী মেরে ফেলেছে। পরে, শুনেছি তাকে বন্দী করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে! অবশ্য কোনটা যে ঠিক আমরা তখনও জানি না।

তবে, চারদিকে বেশ গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে সড়কে একটা ছোটখাটো মিছিলও বের হতে দেখলাম। মিছিল থেকে স্লোগান উঠছে, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। জয় বাংলা।

আমরাও সেই মিছিলে মিশে গেলাম।

মিছিল নিয়ে আমরা দোলেশ্বর চলে গেলাম। দোলেশ্বরে গিয়ে দেখা গেল একটা লঞ্চ বুড়িগঙ্গার তীরে অপেক্ষা করছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেক মানুষ তাতে গিজগিজ করছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র থেকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ছিলো আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিল।

আমরাও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে লঞ্চে উঠে পড়লাম। বুড়িগঙ্গা দিয়ে যেসব নৌকা ও লঞ্চ যাচ্ছিল সেগুলো থেকেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান চারদিক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর আমাদের লঞ্চও চলতে শুরু করল। লঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ছিল শ খানেক মানুষ। বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোরও ছিল দশ-বারোজন।

লঞ্চ বিকেলের দিকে সদরঘাটে এসে ভিড়ল। আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে নামতে যাচ্ছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের নামতে দিল না।

মুক্তিযোদ্ধাদের নেতাগোছের একজন চিৎকার করে সকলের উদ্দেশে বললেন, দয়া কইরা আপনারা কেউ নামবেন না। সবাই লঞ্চে থাকেন।

আমরা ডেকে এসে দাঁড়ালাম। মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন লঞ্চঘাটে নেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একটা লোককে চোখ বেঁধে ঘাটের একপাশে এনে দাঁড় করাচ্ছে। তার দু হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।

নিশ্চয়ই রাজাকার কিংবা আল বদর।

আমরা লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। কী ঘটতে যাচ্ছে আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিল আক্কু। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকটারে কি অহন মাইরধর করব?

আক্কু বিজ্ঞের মতো ভঙ্গি করে বললো, দেখ না কী অয়! চোদনাটারে মনে অয় ভালোই ঠেঙ্গানি দিব।

আক্কুর কথা শেষ না হতেই গুলির আওয়াজ হলো। প্রথমে পিস্তলের একটা গুলি ছুটল। পর মুহূর্তেই এলএমজি টা-টা-টা করে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দিল। আমাদের চোখের সামনেই চোখ আর হাত-পা বাঁধা লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে লাথি দিয়ে নদীতে ফেলে দিলেন।

এত কাছ থেকে কাউকে মেরে ফেলার দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। আমার বুকটা ঢিবঢিব করতে লাগল।

লঞ্চ যখন সদরঘাটে এসে ভেড়ে তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম, আমি এখানে নেমে যাব। সদরঘাট থেকে জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেনে আমাদের বাসা আধাঘণ্টার পথ। আম্মা-আব্বুজি আর কায়কোবাদ কাকাকে দেখতে খুব মন চাইছিলো। তা ছাড়া, ঢাকায় আজ অনেক কিছু ঘটবে। সেসব দেখার ইচ্ছেটাও মনের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার পা লঞ্চে কেউ যেন পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে। বেশ কিছু লোক লঞ্চ থেকে তখন নেমে গেলেও আমি নামতে পারলাম না।

কিছুক্ষণ পরই লঞ্চ ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে লঞ্চটা তখন ঘাট ছেড়ে আবার দোলেশ্বরের দিকে যাত্রা করেছে। একটু পরেই সদরঘাট টার্মিনাল আমার চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। তখনো লঞ্চের মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর রাইফেলের ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বিজয় উদযাপন করছে।

কিন্তু আমার চোখের সামনে অচেনা এক রাজাকারের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বারবার ভেসে উঠতে লাগল।

দেশ স্বাধীন হবার পরের দিনই আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;