মাতৃভূমির কুরসিনামা



আলমগীর রেজা চৌধুরী
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুটঘুটে অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ওর ছায়া দীর্ঘ হয়। বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসে একটা নেড়ে কুকুর। শরীরে দগদগে ঘা, লোমগুলো উঠে গেছে। মুখ দিয়ে লালা পরছে। কুকুরের ছায়াও দীর্ঘ হচ্ছে। কারফিউর মতো নির্জন রাস্তায় ওর চলার শব্দ কুকুরটির শব্দ ‘ঘেউ’ ছাড়া শব্দহীন সরণিতে এগোতে থাকে। ওর ছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এখন অন্ধকার। বিকট শব্দে শম্ভূগঞ্জ ব্রিজ দিয়ে ট্রেন ছুটে যায়। আজ আকাশে তারার মেলা বসেছে। কালপুরুষ বেশ বীরদর্পে পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সপ্তর্ষীমণ্ডল সুখেই মিটমিট করছে। ওর কিছুই মনে পড়ে না। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত হোমোসেপিয়েন। দূরে শম্ভূগঞ্জের গায়ে অন্ধকার। কোনো পিদিমের আলো জ্বলে না। হেঁসেলের ধোঁয়া নজরে আসে না। এত তাড়াতাড়ি সব ঘুমিয়ে গেল!

এত শান্ত গ্রাম! ধনচে গাছ আড়াল করে জল বরাবর চোখ বুলাতে থাকে ও। কতক্ষণ। কৃষি বিশ্বদ্যিালয়ের দিকে সিগনাল দিচ্ছে নীলাভ আলো। বলাশপুরের দিকে কনভয় ছুটে চলার বিকট শব্দ ভেসে আসে। প্রায় এক ঘণ্টা জেগে ওঠা চরের মধ্যে বসে আছে। সাহেব কোয়ার্টার, সার্কিট হাউসসহ নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি বাঙ্কার। কামানসহ অন্যান্য ভারী অস্ত্র নাক বরাবর তাক করা।

একটা টুস শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার গুলি ছুটে আসবে। ও ঘড়ির দিকে তাকায়। আটটা সতের। হঠাৎ ওর মনে পড়ে, হাতে কাপড়ে পেঁচানো আগ্নেয়াস্ত্র অত্যন্ত মারাত্মক। এটা হাতে নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হেঁটে আসা ঠিক হয়নি। এস কে হাসপাতালের কাছে একটা ট্রুপস অ্যামবুস করেছে। নদী পথে এসে যেন বটতলার এই বিপদসংকুল রাস্তায় সরাসরি ঢুকে গেরিলা আক্রমণ করতে না পারে। পেছন দিক থেকে কেউ ‘হল্ট’ বললেই ধরা পরে যেত। নইলে গোলাগুলির মধ্যে পরে বেঘোরে প্রাণ হারানো ছাড়া উপায় ছিল না। হঠাৎ করে ওর গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে। শিড়দাঁড়ায় বয়ে গেল শৈত্যের হলকা। এই বোকামিটা করা ঠিক হয়নি। কমান্ডারকে বলা যাবে না। জাবেদকে বলা যাবে। কিন্তু এখনো আসেনি। আদৌ আসবে কি না! তারও ঠিক নেই। আসলে না হয় প্ল্যানমাফিক এগোনো যাবে। না এলে? আবার এতটা পথ মাড়িয়ে কমান্ডারের নাগাল পাওয়া দুস্কর। সকালের দিকে দুবলাকান্দা পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করার কথা। সিগারেটের তৃষ্ণায় কণ্ঠ কাঁপছে। জ্বালানোর উপায় নেই। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হঠাৎ আলো ভয়ঙ্কর। সহজে টার্গেট করে। ছুটে আসে এক ঝাঁক মেশিনগানের গুলি। ওরা প্রশিক্ষিত। মিস হয় কম। নান্দিয়া পাড়ার সৈয়দ আলী এভাবেই ঝাঁঝরা হয়েছিল। তারপর সবাই সতর্ক। অন্ধকারে মিশে থাকতে হবে। আলোতে নয়।

জুন মাসের গুমোট গরমে ঘামছে ও। আবার আকাশের দিকে তাকায়। তারার মেলা। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে নক্ষত্রের মুখ জ্বলজ্বল করছে। তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখান থেকে দুইশ গজ দূরে ব্রহ্মপুত্র কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। ভারী বর্ষণ হলে গাড়ো পাহাড়ের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে জোয়ার বইবে। ও এখানে বসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করছে তাও তলিয়ে যাবে অথৈ জলে। স্রোতের কলকল ধ্বনি, বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণনের গোত্তা মেরে দু কূলে ভাঙনের গান গেয়ে বয়ে যাবে। ট্রিগার ধরে অত্যন্ত সন্তর্পণে ও ব্রহ্মপুত্রের দিকে এগিয়ে যায়। জলের কিনারায় অস্ত্র রেখে আজলা ভরে পানি পান করে। শীতল পানি নাকে মুখে ছিটকা মারে। আবার সেই ধনচে গাছের ঢিবির কাছে এসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

ঘড়িতে এখন পৌনে নয়টা। জাবেদের পাত্তা নেই। জাবেদ না এলে ওর করণীয় কী? ইত্যাকার ভাবে। হ্যান্ড ব্যাগে দুটো গ্রেনেড আছে। যা বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ওদের মিশন। জাবেদ এলেই কাজটা সম্পন্ন করার ভাবনা করা যেত। মশা, ডাঁশ, ওলা পোকার বিস্তর উৎপাত। নাকে মুখে হিচকা পরছে। তারপরও ও স্থির বসে থাকে। রাত পোকাদের গুঞ্জরণে পৃথিবীকে শব্দহীন করে দিয়েছে।
মাস তিনেক আগেও অন্ধকারকে ভয় ছিল। সাপের ভয়, ভূতের ভয়, মানুষের ভয় মিলিয়ে আঁধার আতঙ্কের মধ্যে যার পৃথিবী, সেই কিনা চার মাইল অন্ধকার মাড়িয়ে কেওয়াটখালী পাষাণবেদী বায়ে রেখে এখন ব্রহ্মপুত্রের চর ভেসে ওঠা ধনচে বনে আশ্রয় নিয়েছে একা। একাকী। ভয় শব্দটা এখন ওর মধ্যে বিরাজ করে না।

বরঞ্চ উন্মত্ত হিংস্রতা বসতি গেড়েছে। ওর হাতে স্টেনগানের মতো মারাত্মক মারণাস্ত্র। যার প্রতিটি কার্তুজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক একটি মানুষের প্রাণ। না, ও মানুষ হত্যা করতে চায় না। জীবনকে তুল্যমূল্য করে পশু হত্যা করতে চায়। যারা অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পরে সবুজ প্রান্তর জুড়ে রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছে, তাদের সঙ্গে ফয়সালা না করে ফিরে যাবার পথ নেই। মৃত্যু নইলে স্বাধীনতা। নিরীহ পিতা মাতা, থেকে অবোধ কিশোর হত্যা করে যারা, তাদের জন্য কোনো অনুকম্পা নয়। ওকে কোনো অনুকম্পা করেনি। হাজার হাজার পাকিস্তানী আর্মি এই চর পর্যন্ত ছুটে আসছে। হায়েনার মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই শ্যামল প্রান্তর জুড়ে।

হঠাৎ ওর মনে পড়ে, ‘এ দেশের শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি।’ ও ইষৎ মুচকি হাসে। কবি, রমণীরা সব সম্ভ্রম রক্ষায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এসব খবর কি রাখেন? দরকার কী? এই সুন্দর তো তোমার। মহাকাব্যিক দার্শনিকতা। আহারে শ্যামল রমণী! মাতৃকূল। তোমার জন্য বিরল এই প্রান্তরে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে অপেক্ষা করছি। একটি বুলেট নাক বরাবর ছুটে যাবে। আবার আরেকটি বুলেট আমার দিকে ফিরে আসবে। কী চমৎকার! তুমি ভাবতে পারো? রক্তের মহাজন সেজে বসে আছি।

ঠিক এসময় ক্ষীণ পদশব্দ। ও মাটির সঙ্গে দেহ মিশিয়ে অপেক্ষা করে। জাবেদ না অন্য কেউ? ঢিবিটার অতি কাছে হেঁটে যায় জাবেদ। জলের সঙ্গে ওর দেহের ছায়া মিলিয়ে ডাক দেয়, ‘পুটটুস।’ থমকে দাঁড়ায় জাবেদ। তড়িৎ উত্তর দেয়, ‘টুকু।’

কাছে এসে ধপাস করে ধনচে গাছে পিঠ রেখে শুয়ে পরে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘জানে বেঁচে গেছি, প্রায় জীবনটা গেছিল।’ টুকু উত্তর দেয়, ‘আমারও। বোকামি করে ফেলেছিলাম। আমিও।’

টুকু ঘড়ির দিকে তাকায়। প্রায় দশটার কাছাকাছি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।

‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে।’

‘তোর জন্য রুটি এনেছি।’

‘দে।’

জাবেদ কার্তুজের ব্যাগ থেকে একখণ্ড বনরুটি বের করে দেয়।

কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করে টুকু রুটি খেতে খেতে জলের নিকট হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকে। ক’ আজলা জল খেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে। যেন কতকাল ধরে ও এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রস্রাব শেষ হতে চায় না। জলের গায়ে দুয়েকটা নক্ষত্র। তার আলোয় মাছ কিলবিল করে।

জাবেদ ডাক দেয়, ‘টুকু।’

ডাকও যেন শব্দহীন। জাবেদের কণ্ঠ ভরাট সত্ত্বেও ওর কণ্ঠ রাতের পাখির ডাকের মতো শোনায়। টুকু বুঝতে পারে। এই বুঝতে পারার বয়স দুমাস হয়নি। টুকু আবার হামাগুড়ি দিয়ে জাবেদের কাছে ফিরে আসে।

‘এখন?’ টুকু প্রশ্ন করে।

‘অপেক্ষা।’

‘কার জন্য?’

‘মতি ভাই আসবে।’

‘কখন?’

‘জানি না।’

ধনচে গাছে গায়ের শার্টবিছিয়ে স্টেন জাপটে ধরে টুকু বলে, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে।’

‘তুই ঘুমা। আমি অপেক্ষা করি।’

‘শত্রু এলে তুই একা কী করবি?’

‘গুলি করতে করতে ব্রহ্মপুত্রের জলে হারিয়ে যাব।’

‘ওরা আসবে না। ভীতু। রাজাকাররাও আসবে না। ওরা ভয় পায়। ওরা নিরীহ মানুষ হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধার নাগাল পায় না।’

‘তা ঠিক।’

ঠিক এক মিনিটের ভেতর টুকু ঘুমিয়ে যায়। ওলাপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে। দূরে কোথাও শেয়ালের হুক্কাহুয়া ভেসে আসছে। শম্ভূগঞ্জের ব্রিজের পাশেই পাষাণবেদি। এখন শেয়াল-কুকুরের মহোচ্ছব চলছে। গুলিবিদ্ধ বঙ্গসন্তানের নাড়িভুড়ি নিয়ে ওরা মহাসুখে আছে। তাই রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে ডেকে ওঠে। ওটুকুই। এ নিয়ে জাবেদ ভাবতে চায় না। প্ল্যান করে এগোতে হবে। কমান্ডার যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই। চুল পরিমাণ এদিক সেদিক হবার জো নেই। ভুলটা করেছিল ও। মণিকাকে খুঁজতে যাওয়া ঠিক হয়নি। দিনমজুরের কেমোফ্লেক্স ঠিক ছিল। কিন্তু কাপড়ের ব্যাগে রাখা স্টেনগান-কার্তুজ-ব্যাগ অত্যন্ত বিপজ্জনক। চ্যালেঞ্জ করলেই আটকে যেত। ধরা পরলেই নির্ঘাত মৃত্যু। সশস্ত্র শত্রুকে কেউ বাঁচিয়ে রাখে না। ও নিজেও রাখবে না।

বড় সড়ক ক্রস করে গলির মাথায় দাঁড়ায়। তখন এদিকটায় বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল কেওয়াটখালি পাওয়ার স্টেশনে হামলা হয়েছে। ভয়ঙ্কর রকেট ল্যান্সার দিয়ে হামলা। তিনটা ইউনিটের মধ্যে একটা পুরোপুরি বিধ্বস্ত। শহরে লোডশেডিং চলছে।

গলি পেরিয়ে মণিকাদের বাড়ির আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভেতরে জনমনিষ্যির আঁচ পাওয়া যায়। অনেকটা বেদিশার মতো মণিকার বাবা এডভোকেট ত্রৈলঙ্গর গোস্বামী বাড়ির টপ-বারান্দায় উঠে আসে। সতর্ক পদক্ষেপ, নিশব্দ পদচারণা, সজাগ কান শুধুই অশুভ ইঙ্গিত করতে থাকে। তারপরও মণিকার পড়ার রুমের বদ্ধ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ইতিউতি ভাবতে থাকে। ভেতরের মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর অচেনা। গোস্বামী কাকা তো না! অন্য কেউ। নারীকণ্ঠ আছে। মণিকা বা মাসীমার নয়। অন্য কারো।

নানা রকম চিন্তা মাথায় কাজ করতে থাকে। হিসাব মতে মণিকাদের থাকার কথা নয়। পঁচিশ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পরপর ওরা এ বাসা থেকে সটকে পরেছে। শহরে দুবার বিমান হামলার পর গোস্বামী কাকা মণিকাদের আর এ শহরে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। এখানে মনে হয়, তার সিদ্ধান্ত সঠিক। এ দেশে আর মানুষ বাস করতে পারে না। দখলদার দস্যু আর ফুঁসে ওঠা রাগী যুবকের মুক্তির ‘জয় বাংলা’র গেরিলা।

তারপরও কেন যে মণিকাকে খুঁজতে এলো, তা ও নিজেই জানে না। কেষ্টপুর দিয়ে পাস হওয়ার কথা ছিল। পুরবী’র দুলাল ভাইয়ের কাছ থেকে গ্রেনেড নিয়ে চর ধরে টুকুর কাছে পৌঁছানোর কথা।

‘এ বাড়ির মালিক ইন্ডিয়ায় গেছে গা। আমরার দহলে আছে। বাড়ি আমাগো। পাকিস্তান সরকার লেইক্কা দেব।’

ওর মনে হয় মণিকাদের বাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। মণিকার সঙ্গে আর দেখা হবে না। ভাবতে ভাবতে নারকেল গাছের আড়ালে আবার চলে আসে। ঠিক এ সময় বিদ্যুৎ এলো। দুয়েকটা বাতি জ্বললেও ল্যাম্পপোস্ট প্রায় তিনশ গজ দূরে। এদিকে অন্ধকার ছেয়ে আছে। খুব সহজে বের হয়ে যাওয়া যাবে। ঠিক এ সময়ে জিপ ছুটে এলো গলির মুখ থেকে। ধামধাম করে ওপাশের আমগাছের গোড়ায় দুজন পাক আর্মি নেমে আসে। পেছন থেকে দুজন রাজাকার। মুখ বাঁধা প্রায় বিবস্ত্র এক নারী, রাজাকাররা ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। দ্রুততায় গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় উঠে যায় ওরা। অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে মেয়েটাকে জাপটে ধরে ডাক দেয়, ‘মানিক স্যার আইছে।’ খুঁট করে দরজা খোলার শব্দ হয়। ওরা ঢোকার পরে আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ও নারকেল গাছ আড়াল করে স্টেনগান লোড করে, অপেক্ষায় থাকে। জিপ একলা আম গাছের গোড়া বরাবর। বের হওয়ার উপায় নেই। জিপে ফৌজি থাকতে পারে। ঘড়ির কাঁটা এক সেকেন্ড করে এগিয়ে যেতে থাকে। দুয়েকবার ঐ নারীর আর্তনাদ শুনেছে। তারপর থেকে অপেক্ষা করছে। ওর কিছুই শুনতে ইচ্ছে করে না।

ওই কাতর নারীর কথাও মনে হয় না। অপেক্ষা করে। অপেক্ষারত জিপটা নিথর। ড্রাইভারসহ হয়তো গোস্বামী কাকার বাসায়। ও অপেক্ষা করে। ওরা চারজন, অভাগী নারী, বাড়ির দখলদার। মোট ছয় জন। ও ভাবে লোডেড কার্তুজ আটাশটা। এক ম্যাগাজিন একস্ট্রা। তিনটা গ্রেনেড। দুঃখী নারীকে বাদ দেয়। ওর বেঁচে থাকবার দরকার নেই। ও এই পৃথিবীতে সব অধিকার খুইয়েছে। ব্রাশ ফায়ারে মরে গেলে ক্ষতি কী? বাকি পাঁচজনকে অন্ধকারের এত নিকট থেকে...। সাত-পাঁচ ভাবে। সাহস হারাতে থাকে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিপদ। মৌডালের ঝোঁপ পেছনে রেখে উঠে দাঁড়ায়। এদিক দিয়ে দ্রুত বেরোবার পথ আছে। মসজিদের পাশ ঘেঁষে ধানক্ষেত দিয়ে বড় রাস্তা ক্রস করে বেরিয়েই নদীর পাড়। ধনচের আড়ালে আড়ালে টুকুর কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। টুকু অপেক্ষা করছে। হঠাৎ করে ওর ভয়ানক সিগারেটের তৃষ্ণা পায়। মণিকাকে মনে পড়ে।

এম কলেজে মণিকা ওর সহপাঠী। কলেজ থেকে পূজাতে দল বেঁধে এ বাড়িতে এসেছে। হইচই করে বাড়ি মাতিয়েছে। গোস্বামী কাকা বেশ শিক্ষিত মানুষ। কন্যার বন্ধুদের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাত দেখিয়েছে। মণিকা সাদামাাঁ তরুণী। বুদ্ধিদীপ্ত ক্লাসের সবাই মণিকাকে মনে রাখতে চায়। অথচ আজ মণিকা কি জানে, কি ভয়ংকর সময়ের মুখোমুখি ও। ওর বিছানায় ধর্ষিত হচ্ছে বঙ্গললনা। একজন অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ওপারে। ওর মনে হয় ক্যাচ করে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিল। দরজা খুলে টপ-বারান্দায় এসে দাঁড়ালো চারজন। একজনের হাতে সিগারেট। ‘আচ্ছা হ্যায়, মান্তা হ্যায়’ এই জাতীয় বাতচিতের মধ্যে ও স্পষ্ট দেখতে পায়। ও অপেক্ষা করে। ট্রিগারে আঙুল। আরো একজনের জন্য অপেক্ষা করে। সে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়েছে। ও অপেক্ষা করে। ঠিক এ সময় পঞ্চম লোকটি বের হয়।

‘পা-মুখ বাইন্ধা আইলাম।’

ঠিক এ মুহূর্তে আঙুলে চাপ পরে। ঠা-ঠা শব্দ চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। ধপাধপ পাঁচটি দাঁতাল গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় লুটিয়ে পরে। ও দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে। তারপর মৌডাল আড়াল করে অন্ধকারে মিশে যায়। বড় রাস্তায় কনভয় ছুটিয়ে পাকসেনারা এদিকে আসছে। ও তখন দড়াইখাল পেরিয়ে বলাশপুর পৌঁছে গেছে। এ সময় একবার মনে হয়েছিল স্টেশন কোয়ার্টারে শোয়েব সিদ্দিকীর বাসার কথা। ওর বাবা গার্ড সাহেব। স্টেশন সংলগ্ন কলোনিতে থাকে। বড় ছেলে শোয়েব সিদ্দিকী এপ্রিল থেকে লাপাত্তা। শোয়েব ওর বন্ধু। সবাই জানে। প্রয়োজনে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে। পুত্র শোকার্ত ওর মায়ের মুখ মনে পরায় কষ্ট পায়, কি জবাব দেবে?

তারপর অনেক কাঠখড় পেরিয়ে টুকুকে আবিষ্কার করা। টুকু এখন ঘুমুচ্ছে। স্টেনের ম্যাগাজিন খুলে পরিষ্কার করে। এ ম্যাগজিনের চৌদ্দ কার্তুজ পাঁচ দানব খেয়ে ফেলেছে। মনে মনে হাসে। আহারে বেচারারা!

এখনো এক ম্যাগজিনসহ চৌদ্দটা কার্তুজ আছে। গ্রেনেড আছে তিনটা। ও এখন মতি ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। ঘড়ির দিকে তাকায় এগারটা সাতাশ। দূরে শম্ভূগঞ্জের চটকলে অসংখ্য বাতি জ্বলছে। জলের রেখায় বাতির ঝিলিক।
ওর মনে হয়, এতক্ষণের মধ্যে লাশগুলোসহ ওই নারীকে আরেক জিপে তুলে নিয়ে গেছে। অথবা সহযোগী হিসেবে বেয়নেটের খোঁচায় হৃদপিণ্ড এখন এফোঁড়-ওফোঁড়। তাহলে কেউ বাঁচতে পারেনি! পূর্বাপর ঘটনাটি ভাবতে থাকে জাবেদ। এক ইস্টু পাঁচ। মুচকি হাসে। পাঁচ ডেড বডি দেখে কী প্রতিক্রিয়া দাঁতালদের। পাগলা কুত্তা! ভাবনার মধ্যে মণিকাকে মনে পড়ে, পড়বেই তো। মণিকার জন্য। প্রিয় মণিকা, তোমার বিছানায় ধর্ষিত নারীর প্রতিশোধ নিয়েছি। তুমি কি খুশি হও নি? আমি এখন মাতৃভূমির সৈনিক। মাতৃভূমির কন্যা-জায়া-জননীর জন্য...।

মশা-ডাঁশ ছেঁকে ধরেছে। টুকু মাঝে মাঝে হাত নাড়ছে। শরীর ক্লান্ত। তারপরও তন্দ্রা আসছে না। জাবেদের মনের মাঝে তড়পাতে থাকে। হুট-হাট পাঁচটি গুলিবিদ্ধ মানুষ গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় পড়ে গেছে। ওর জন্য এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এত কাছ থেকে শত্রু নিধনের আনন্দই আলাদা। ওর বুক ভরে উদ্বেলিত আনন্দ। প্রকাশ করতে পারে না। টুকুকে বলা যেত। টুকু ঘুমাচ্ছে। সড়সড় শব্দে দুয়েকটা শেয়াল শন খেতে ঢুকে পরে। হুক্কাহুয়া ডেকে ওঠে। জাবেদ শুধু কান খাড়া করে থাকে, কখন মতি ভাই আসবে? ওর হঠাৎ করে আজিজুল হক স্যারের কথা মনে পড়ে। স্যার এম কলেজে বাংলা পড়ান। অসাধারণ বাগ্মী।

রবীন্দ্রনাথের শত শত কবিতা তার মুখস্ত। কী তার উচ্চারণ! সুমিষ্ট। এখনো কানে লেগে আছে। তার সঙ্গে শেষ ক্লাস ১৩ জানুয়ারি। এরপর আর দেখা হয়নি। উত্তাল বাংলাদেশ। হঠাৎ করে মণিকার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই মেয়ে, নাজিম হিকমতের নাম জানো?’

মণিকা অসহায়ের মতো মাথা নাড়ে।

‘তুরস্কের কবি। মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি মাটির প্রতি দায়বদ্ধ সচকিত কণ্ঠস্বর। কবিতা লেখার অপরাধে জেল-জুলুমসহ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত কবি। ভ্রাম্যমাণ জীবন নিয়ে শুধু মাতৃভূমিকেই মনে রেখেছে। নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে, ‘তুমি আমার কোমল প্রাণ মৌমাছি, চোখ তোমার মধুর মতো মিষ্টি।’ লিখেছে, ‘দড়ির একপ্রান্তে মৃত্যু, সে মৃত্যু আমার কাম্য নয়। তুমি জানো, জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পড়ায় নাজিমের নীল চোখে ওরা ব্যথায় খুঁজে ফিরবে ভয়।’ তারপর স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নির্ধারিত সময়ের আগে।

মণিকা কি মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে? ও কি জানে ওর বন্ধুরা প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করছে। ওর শান্ত, নির্লিপ্ত স্বভাবের জন্য মণিকা ভাবতেই পারে ওর পক্ষে যুদ্ধফ্রন্টে হামাগুড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। আহা! মণিকা, তুমি জানবে না শত্রু নিধনের মধ্যে কী অসীম আনন্দ জড়িয়ে আছে। আসলে মণিকাকে কিছুই বলা হয়নি। সুযোগ কোথায়? আর বললেই বা কী হতো?

মণিকার মুখাবয়বে কে যেন একটি সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত পৌনে একটা। মতি ভাই আসেনি। অপেক্ষা করছে। শান্ত নির্জন রাতের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে জাবেদের মনে হয়, এ পৃথিবীতে এত ক্রন্দন কেন? এ সময়ে ঘোর ভাঙে। তাকাতেই চোখের মণিতে নক্ষত্রের ঝিলিক খেলে যায়। আরমোড়া ভেঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে জলের দিকে এগিয়ে যায়। আজলা ভরে জল খায়। নাকে-মুখে জলের ছিটা দেয়। জাবেদের কাছে গিয়ে বলে, ‘মতি ভাইয়ের কী খবর?’

‘আসেনি। সংবাদহীন।’

‘তাহলে?’

‘অপেক্ষা।’

‘মাঝরাত।’

‘অপেক্ষা।’

‘কী ভাবছো?’

‘কিছুই না। ভাবতে চাই না।’

‘খুব শিগগির অপেরেশন শেষ করতে হবে।’

‘জানি।’

‘হাতে সময় আছে।’

‘এতক্ষণ অপেক্ষা করা বিপজ্জনক।’

সুনসান নীরবতা। ওলাপোকা ডাকছে। তারপর ওদের আর কিছুই মনে নেই। ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়।

জাবেদের ঘুম ভাঙে শেষ প্রহরের একটু আগে। আকাশের গায়ে তখনও নক্ষত্রের মুখ। তড়িঘরি করে টুকুকে ডাকে।

‘ওঠ। মতি ভাই আসেনি। একটু পরে সকাল হবে।’

টুকু আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে, ‘উপায়!’

‘মতি ভাই ছাড়াই প্ল্যান মাফিক আক্রমণ করতে হবে।’

‘সম্ভব!’

‘ভয় পাস?’

‘না।’

‘তাহলে আমার পিছে পিছে আয়।’

জাবেদ স্টেনগান হাতে পেছনে ধনচে গাছ রেখে উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সামনে পা বাড়ায়।

টুকু জাবেদকে অনুস্মরণ করে। জাবেদ খুব পথ হাঁটে। অনেকটা তেলেসমাতির মতো জুবলিঘাট বরাবর ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেঁষে মন্দিরের ভিমের আড়ালে এসে দাঁড়ায়। টুকুর দিকে গ্রেনেডের ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘রুটি আছে। খেয়ে নে। গ্রেনেডগুলো দে। চার্জ করার পরে এক মিনিট অপেক্ষা করবি। ফিরে না এলে কিছুই ভাববি না। কমান্ডার তোর জন্য অপেক্ষা করবে। হিঙ্গানগর রাজাকার ক্যাম্প...।’

টুকু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারে হেঁটে গেল জাবেদ। রুটি মুখে দিতেই বিকট শব্দে পরপর তিনটা গ্রেনেড ফাটার ভয়াবহ ভয় নিয়ে শেষ রাতে জেগে উঠল। সাইরেন বাজছে। পটাপট গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এই আতঙ্কিত সময়ের মধ্যে ১-২ করে ৩ মিনিট অপেক্ষা করে। তারপর দুর্দান্ত গেরিলা কায়দায় ধনচে ক্ষেত পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলে মিশে যায়। ঠিক এ সময় বড় মসজিদ থেকে ভেসে আসছে, ‘কল্যাণের জন্য এসো।’

পাদটীকা
পরদিন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম আর আকতার মুকুল চরমপত্র পড়ে, ‘আমাদের ময়মনসিংয়ের বিচ্ছুরা কলেজ রোডে ব্রাশ ফায়ারে পাঁচ জন, জুবলী ঘাটে গ্রেনেড দিয়া পাকসেনারে খতম। হা হা হা। এর মধ্যে আবার দুজন জন্মের দুশমন, জন্মভূমির কুলাঙ্গার রাজাকার আছে। কে বা কারা এই সফল গেরিলা আক্রমণ করেছে, কেউ জানে না। শুধু গেরিলা টুকুর বরাত দিয়া মিয়া চাঁদ কমান্ডার জানায়, মাতৃভূমির যোগ্য সন্তান জাবেদ শহীদ হয়েছেন, ইন্না...রাজেউন।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;