উত্তর-উপনিবেশবাদ ও বাংলাদেশের সাহিত্য : একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা



মাসুদুজ্জামান
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

১. উত্তর-উপনিবেশবাদ ও বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের মতো দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়ার পর একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে এর। ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে অন্যান্য অনেককিছুর মতো সাহিত্য যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, স্বাধীনতার পর তা অনেকটাই বদলে যায়। একটি সদ্যস্বাধীন দেশের সাহিত্য উপনিবেশের চিহ্ন যেমন তার শরীরে ধারণ করতে বাধ্য হয়, তেমনি উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিবেশ পরিস্থিতির দ্বারাও প্রভাবিত হয়। সেজন্যেই দেখা যায়, আধুনিক কালের উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির সাহিত্যে তার নিজস্ব এমন কিছু লক্ষণ ফুটে ওঠে, যেসব লক্ষণ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাহিত্য থেকে আলাদা। বাংলাদেশের সাহিত্যের ওই সব বৈশিষ্ট্য কমবেশি লক্ষ করা যাবে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সাহিত্য বলে আমরা যে সাহিত্যের উল্লেখ করে থাকি, তা অনেকটাই রাজনীতিস্পৃষ্ট। তবে সরলরেখায় নয়, উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের রাজনীতি যেমন আঁকাবাকা পথে অগ্রসর হয়েছে, বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিও তেমনি বিসর্পিল। উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্যের এই লক্ষণগুলি সনাক্ত করতে হলে বাংলাদেশের রাজনীতির একটা রূপরেখা তুলে ধরা জরুরি বলে মনে করি।

একথা আমাদের আজ আর অজানা নেই যে দু-দুটো উপনিবেশের অধীন ছিল বাংলাদেশ; প্রথমে ব্রিটিশদের, পরে পাকিস্তানিদের। দীর্ঘদিন ধরে উপনিবেশের অধীনে থাকলে যেমন হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে। স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক এবং জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে যেমন নৈরাজ্য ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে, তেমনি এসব নৈরাজ্য কাটিয়ে এ-দেশকে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। লড়তে হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক আত্মস্বাতন্ত্র্য এবং উন্নত জীবনমান অর্জনের জন্যে। এ সংগ্রাম যে খুব সহজে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, তা বলা যাবে না। কোনো কোনো সময়ে বিরোধের মাত্রাটি বেশ জটিল ও সংঘাতময় ছিল। তবে এতসব জটিলতার মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অর্জন করেছে অভূতপূর্ব সাফল্য। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যতবাণী হিসেবে ‘মধ্য-আয়ে’র দেশে পরিণত হবে আর তার পরের ধাপেই পৌঁছে যাবে উন্নত দশেরে সারিতে।

তবে এখন বিশ্বব্যাপী কোভিদ-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত সমস্ত পৃথিবী। বাংলাদেশেও এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে জীবনযাত্রা যেমন থমকে গেছে, তেমনি এর প্রভাবও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। এ থেকে মুক্তি কিভাবে ঘটবে, সাম্প্রতিক দুর্যোগ কেটে গেলেই কেবল সেটা বোঝা যাবে। তবে আমাদের জীবনযাপন যে বদলে যাবে, অর্থনীতি যে নতুন রূপ পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তো, এটা তো ভবিষ্যতের ব্যাপার। আমি না হয়, স্বাধীনতার পর আমাদের সাহিত্য কীরকম চেহারা পেয়েছে তাই নিয়ে কথা বলি।

২. উত্তর-উপনিবেশবাদী বাংলাদেশ ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব
আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন, উপনিবেশের অধীনে থাকার সময়ই কখনো কখনো রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সংঘাতের বীজ প্রোথিত হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে সংগ্রাম করবার সময় সেই শাসকদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করলেও স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক চরিত্র কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম করবার সময় যদি সেই শাসকগোষ্ঠীকে কেউ মিত্র মনে করে সমর্থন করে থাকে, তাহলে স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তস্বাধীন ওই জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হতে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ব্যাপারটিই লক্ষ করেছি আমরা।

স্বাধীনতার সময় যারা ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকদের সমর্থন করেছে, বা যারা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তারা স্বাধীনতার পর মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করে। এটা অবশ্য একদিনে করা হয়নি, ধীরে ধীরে করা হয়েছে। এই গোষ্ঠী মতাদর্শিকভাবে পূর্বের অবস্থানে স্থির থেকে একদিকে যেমন রাজনৈতিকভাবে নিজেদের সুসংহত করেছে, অন্যদিকে তেমনি সমভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের প্রভাববলয় বাড়িয়ে নিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যে-দল (বা দলগুলি) নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের নানা ভুলের সুযোগও তারা নিয়েছে। অবস্থা তখন এমন দাঁড়িয়েছিল যে, স্বাধীনতা-বিরোধী ওই গোষ্ঠী অনেক দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছে, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের জাল বিস্তার করে তারা তরুণ-সমাজকে ভুল পথে চালিত করতে পেরেছে।

ফলে স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসনকাঠামো কী হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার সাংস্কৃতিক চারিত্র্য কী হওয়া জরুরি—এসব প্রশ্নে দেখা দিয়েছে দ্বিধাবিভক্তি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাহিত্য যে একধরনের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে জটিল হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। বাস্তবে হয়েছেও তাই। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের লেখকেরা এই ধরনের বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের চোরাবালিতে পা দেননি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, বেশিরভাগ লেখকই—তাঁরা যে-দেশেরই হোন না কেন, যে-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসুন না কেন—সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকেন। নিঃসন্দেহে দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি তাদের একধরনের কমিটমেন্ট থাকে।

৩. বৈদেশিক নির্ভরতা, আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও বাংলাদেশ
আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমকালীন বাংলাদেশ নানা জটিল ও বিচিত্র পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিল। আর্থসামাজিকভাবে সবাই একমত যে, দেশটি একশ্রেণীর লুটেরা পেশাজীবীর স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল। আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্রের কবলে পড়ে দেশটির অর্থনীতি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিভিন্ন ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানি এবং যেসব ধনী দেশ তাদের মুনাফার সবচেয়ে বড় অংশ ভোগ করে, বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলি ছিল তাদের আগ্রাসী থাবার নিচে। আমাদের সনাতন চাষাবাদ পদ্ধতি, স্বাস্থ্য ইত্যাদিকে তারা তাদের পেস্টিসাইড বা জন্ময়িন্ত্রণের নানা উপকরণ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছে। সংস্কারের নামে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা সার্বক্ষণিকভাবে চাপের মধ্যে রেখেছে এই দেশটিকে। আমাদের নিজস্ব গণমাধ্যমের দুর্বলতার সুযোগে বিদেশি স্যাটেলাইট টিভির চোরাস্রোতের টানে বিপন্ন হয়ে পড়েছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এভাবে একদিকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ, অন্যদিকে দেশীয় ক্ষমতাবান লুটেরা শ্রেণির শাসনশোষণ বাংলাদেশকে সবদিক থেকে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

সামাজিক অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থার পাশপাশি রাজনীতিতেও দেখা গেছে চরম নৈরাজ্য। উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলির শাসনব্যবস্থায় একধরনের প্রহসনের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। এরকম পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে তারা মুক্তি পেয়ে হঠাৎ করেই প্রবেশ করে আধুনিক ইউরোপীয় উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, যার মূলমন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্র। কিন্তু এই গণতন্ত্রকে হজম করার বা জারিত করে নেওয়ার প্রস্তুতি ও শক্তি তার থাকে না। ফলে গণতন্ত্র পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। পাকিস্তানি শাসনের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্র, সামাজিক সাম্য, মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতার উদার ক্ষেত্রে প্রবেশ করবে এটাই ছিল প্রত্যাশিত। আমাদের পূর্বসূরিরা সেই পথেই এগোচ্ছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম অসংশোধিত সংবিধানে তার প্রমাণ মিলবে। কিন্তু তারপর? সামরিকতন্ত্রের কবলে পড়ে ছিন্নভিন্ন হলো গণতন্ত্র। পুনরুত্থান ঘটলো ধর্মের, স্বৈরতন্ত্রের, সাম্প্রদায়িকতার। জনরোষের ফুৎকারে সামরিক শাসকগোষ্ঠী বিতাড়িত হলেও অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক সাম্যের প্রতিষ্ঠা ঘটতে বিলম্ব হলো। সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র এলেও মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপিত হলো না। তবে সাংবিধানিকভাবে ধর্মকে এখন প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহার করা হয় না। ফলে, বাংলাদেশের আধুনিক উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এখনও মসৃণ নয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী—যারা আমাদের ঋণ দেয়—তারা বিরূপ হবে বলে এ-পথে অগ্রসর হওয়াটাকে নিরাপদ মনে করা হয় না। আশার কথা, বাংলাদেশ এই বিদেশ-নির্ভরতা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠছে। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনকাঠামোর প্রায় প্রতিটি স্তরে ধর্মের যে প্রচ্ছন্ন ব্যবহার ঘটেছে, সেটা অস্বীকার করবার উপায় নেই। বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাঙালিরা আবার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনো দারিদ্রসীমার নিচে। যদিও গত দেড় দশকে দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ফলে, জনজীবনেও স্বস্তি নেই। সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ জর্জরিত। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তি দিতে হলে জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ, সেই পথেই এগুচ্ছে। উন্নয়নের দৃশ্যমান ছোঁয়া লেগেছে। উন্নয়নের অনেকগুলি মেগাপ্রজেক্ট নিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আরো গতি পেয়েছে। বর্তমান সরকার যে উন্নয়নের সরকার, সেকথা বলাই যায়। সার্বিকভাবে এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাহিত্য যে নানা দিক থেকে বহুবর্ণিল হয়ে উঠবে তা বলাই বাহুল্য।

৪. স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য
স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের সাহিত্য অনেকটা সরলরেখার অগ্রসর হচ্ছিল। নিরুদ্বিগ্ন নাগরিক জীবন কিংবা নিস্তরঙ্গ সরল গ্রামীণ জীবনই তাতে উপজীব্য হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাহিত্য হয়ে উঠেছে জটিল, বহুমাত্রিক, সর্বোপরি বৈশ্বিক নানা অনুষঙ্গে বিজড়িত। কী প্রসঙ্গ, কী প্রকরণ—সবদিক থেকেই স্বাধীনতাপূর্ব সাহিত্যের সঙ্গে ঘটে গেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সাহিত্যের পার্থক্য। উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রায় সবটাই উঠে এসেছে আমাদের কথাসাহিত্যে, কবিতায় কিংবা নাটকে। বাংলাদেশের সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করলেই এর মূল প্রবণতাগুলি সনাক্ত করা যাবে। এই লেখাটি সেই লক্ষ্যেই, অর্থাৎ স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি কী দাঁড়িয়েছে তারই সংক্ষিপ্ত রূপরেখা বলা যেতে পারে।

স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জায়মান হয়ে ওঠে একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সংগ্রামের মূল ঘটনাটি যে সাহিত্যে প্রাধান্য পাবে, সেকথা বুঝতে কোনো অসুবিধে হয় না। মুক্তিযুদ্ধের বীজ অবশ্য স্বাধীনতার ঠিক পরে নয় অনেক আগেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। আইয়ুবি আমলে তা বাংলাদেশের সাহিত্যে অনুসূক্ষ্মভাবে অন্তঃশীল ছিল। ঊনসত্তরে এসে এই প্রবণতাটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে গেলে প্রায় সব লেখকেরই—অবশ্য যারা তখন লেখালেখি করতে পেরেছেন—মুক্তিযুদ্ধ তাদের রচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরে মুক্ত স্বদেশে তাই অনেককেই দেখা গেল এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গল্প, উপন্যাস বা কবিতা রচনা করতে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কালজয়ী উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’তে উপজীব্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার উজ্জ্বল পটভূমি—উন্মাতাল ঊনসত্তর। বন্দী সময়ের তমসাচ্ছন্ন পরিবেশে মানুষ যে কিভাবে মুক্তির প্রত্যাশী হয়ে উঠতে পারে, ইলিয়াস তারই এপিক রূপায়ণ ঘটালেন এই উপন্যাসে। আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাতে’ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী যে-নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, পাওয়া গেল তারই আত্মজৈবনিক রূপ। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি সফল উপন্যাস লিখলেন শওকত ওসমান—‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘দুই সৈনিক’, ‘নেকড়ে অরণ্য’ এবং ‘জলাঙ্গী’। এই ধরনের উপন্যাস রচনায় সৈয়দ শামসুল হকের সাফল্যও কম নয়। তার ‘নীল দংশন’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’ ইত্যাদি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে উপজীব্য করা হয়েছে। উপনিবেশ-উত্তর বাংলাদেশে জাতিরাষ্ট্রের রূপরেখাটি সৈয়দ হকের উপন্যাসে সাফল্যের সঙ্গেই উৎকীর্ণ হয়েছে বলতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গত দু-তিন দশকে আরো যেসব উপন্যাস লেখা হয়েছে সেগুলি হচ্ছে রশীদ করীমের ‘আমার যত গ্লানি’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারী সূর্য’, আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’, রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ ও ‘অন্ধ কথামালা’, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘জীবনভর’, শওকত আলীর ‘যাত্রা’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’, মিরজা আবদুল হাইয়ের ‘ফিরে চলো’, হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, হারুন হাবীবের ‘প্রিয়যোদ্ধা, প্রিয়তম’, রিজিয়া রহমানের ‘একটি ফুলের জন্য’, শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ও ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ ইত্যাদি।

ছোটগল্প বাংলাদেশের সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ শাখা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা হয়েছে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প। শওকত ওসমানের ‘বারুদের গন্ধ লোবানের ধোঁয়া’, ‘দুই ব্রিগেডিয়ার’, শহীদ আখন্দের ‘ভিতরের মানুষ’, বশীর আল হেলালের ‘সেবিকা’, রশীদ হায়দারের ‘এ কোন ঠিকানা’, হাসান আজিজুল হকের ‘ঘরগেরস্থি ও ফেরা’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোঁয়ারি’, সেলিনা হোসেনের ‘ঘৃণা’ ইত্যাদি গল্পেও মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ও সংগ্রামমুখর বাংলাদেশের ছবি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় ও ভঙ্গিতে উপস্থিাপিত হয়েছে।

বাংলাদেশের কবিতাতেও লক্ষ করা যাবে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক বিস্ময়কর প্রকাশ। বাঙালি জাতির সত্তাতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ইতিবৃত্তটি কবিতাতেই সবচেয়ে সফলভাবে ধরা পড়েছে। আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সিকান্দার আবু জাফর, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো কবিরা তো বটেই, স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে ষাটের দশকের শেষ দিকে যেসব কবির আবির্ভাব ঘটলো—হুমায়ুন কবির, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান, মাহবুব সাদিক, সাযযাদ কাদির প্রমুখের কবিতা মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত হতে থাকল। তবে স্বাধীনতার পর সত্তর দশকে যেসব কবির আবির্ভাব ঘটল, সব কবির কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ যেন পেল বহুমাত্রকি রূপ। যেসব কবির রচনায় মুক্তিযুদ্ধ নানাভাবে উপজীব্য হয়েছে তাদের কয়েকজন হচ্ছেন মাশুক চৌধুরী, আবিদ আজাদ, দাউদ হায়দার, মাসুদুজ্জামান, শিহাব সরকার, মাহবুব হাসান, মুজিবুল হক কবির, ফারুক মাহমুদ, জাহিদ হায়দার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লা, কামাল চৌধুরী। তবে গতশতকের আশির দশক থেকে শুরু করে এই শতকের দ্বিতীয় দশকে পৌঁছে দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের কবিতা পূর্বতন কবিদের হাতে তো বটেই তরুণতরদের হাতে আরো নানামাত্রায় নানা অনুষঙ্গে উদ্ভাসিত। এই সময়ে যেসব তরুণ কবি বাংলাদেশের কবিতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে চলেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন : ফরিদ কবির, খালেদ হোসাইন, আবু হাসান শাহরিয়ার, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মাসুদ খান, খন্দকার আশরাফ হোসেন, মুজিব ইরম, সাজ্জাদ শরিফ, তসলিমা নাসরিন, সৈয়দ তারিক, টোকন ঠাকুর, মজনু শাহ, কামরুজ্জামান কামু, বায়তুল্লাহ কাদেরী, সরকার আমিন, মুজিব ইরম, ইমতিয়াজ মাহমুদ, জাহানার পারভীন, নওশাদ জামিল, পিয়াস মজিদ, বিজয় আহমেদ, মোস্তাক আহমাদ দীন, শামীম রেজা, ওবায়েদ আকাশ, আলতাফ শাহনেওয়াজ, রুহুল মাহফুজ জয়, তানিম কবির, হাসান রোবায়েত, মোস্তফা হামেদী, অরবিন্দ চক্রবর্তী, হিজল জোবায়ের, সৌম্য সালেক, তিথি আফরোজ, অনুপমা অপরাজিতা, রিমঝিম আহমেদ, রোজেন হাসান, নাহিদ ধ্রুব, সালেহীন শিপ্রা, নুসরাত নুসিন প্রমুখ।

তবে উপন্যাস ও কবিতার তুলনায়, অনেকের ধারণা, নাটকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। আসলে আজ বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটারের যে ব্যাপক চর্চা দেখা যাচ্ছে, কলকাতা থেকে প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধারাই আমাদের নাট্যান্দোলনে সেই ধারণারই বাস্তব রূপায়ন ঘটিয়েছেন বলা যায়। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাট্যকার ও নাট্যকর্মী মামুনুর রশিদ বলেছেন, ‘যুদ্ধকালীন অবস্থায় অনেক নাট্যকর্মীর সুযোগ ঘটে কোলকাতার নাটক, নাট্যসংগঠন, নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কুশলীদের সাথে পরিচিত হবার।... বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত যেসব ছাত্র-ছাত্রীরা যুদ্ধে গিয়েছিল তারাও ফিরে এসে দ্রুত সংগঠিত করতে লাগল নাটককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলিতে, ডাকসুতে, সর্বত্র একটা সাড়া পড়ে গেল।’ লক্ষ করলে দেখা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের নাটকগুলির বেশিরভাগই আবেগনির্ভর, মননঋদ্ধ নয়। তবু এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে বেশকিছু কালোত্তীর্ণ নাটক। এসব নাটকের মধ্যে মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারে সংগ্রাম’ ও ‘বিবাহ ও কি চাহ শঙ্খচিল’, জিয়া হায়দারের ‘সাদা গোলাপে আগুন ও পঙ্কজ বিভাস’, সাঈদ আহমদের ‘প্রতিদিন একদিন’, রণেশ দাশগুপ্তের ‘ফেরী আসছে’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ উল্লেখযোগ্য। সেলিম আল দীন, মামুনুর রশিদ, আবদুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ নাট্যকারও মুক্তিযুদ্ধকে তাদের নাটকে উপজীব্য করেছেন বিভিন্ন সময়ে। বাংলাদেশের গ্রুপথিয়েটার আন্দোলনকে তাই বলা যায় মুক্তিযুদ্ধেরই প্রত্যক্ষ অবদান।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যের আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা লক্ষ করা যায় মধ্যবিত্তের জীবনযাপনের নানামাত্রিক উপস্থাপনে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া স্বাধীন দেশে মধ্যবিত্তের বিকাশ নানা কারণে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় তার প্রকাশ হয়ে উঠেছে বহুমুখী ও জটিল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমানসের আত্মযন্ত্রণা, আত্মরতি, রিরংসা, হতাশা ও ভোগবাদের চূড়ান্ত প্রতিফলন লক্ষ করা যাবে এই সময়ের বাংলাদেশের সাহিত্যে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের সংবেদনশীল অভিব্যক্তি হিসেবে এই বিষয়টি কথাসাহিত্যিকদেরতো বটেই কবিদেরও আন্দোলিত করেছে।

হুমায়ূন আহমদের ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘একজন’, রশীদ করীমের ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ ও ‘সাধারণ লোকের কাহিনী’, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’, শওকত আলীর ‘অপেক্ষা’, বশীর আল হেলালের ‘কালো ইলিশ’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘আমার আততায়ী’, সেলিনা হোসেনের ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’ ও ‘পদশব্দ’, রাজিয়া খানের ‘চিত্রকাব্য’, শামসুর রাহমানের ‘অক্টোপাস’ ও ‘নিয়ত মন্তাজ’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’ ইত্যাদি উপন্যাসে রিরংসায় আক্রান্ত আত্মকেন্দ্রিক ভঙ্গুর জীবন, বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, বিনষ্টি, লুণ্ঠন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটের সামগ্রিক চিত্র উপজীব্য হয়েছে। সিরাজুল ইসলামের উপন্যাসগুলি কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

ঝর্না রহমান, আহমাদ মোস্তফা কামাল, প্রশান্ত মৃধা, শাহীন আখতার, মোহিত কামাল, জাকির তালুকদার, স্বকৃত নোমান, মাহবুব আজীজ, খালিদ মারুফ, রাসেল রায়হান, মোস্তফা কামাল, মাসরুর আরেফিন, মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, অদিতি ফাল্গুনী, পাপড়ি রহমান, হাবিব আনিসুর রহমান, আবুল কাসেম, তাশরিক-ই-হাবিব, হামিম কামাল, ইশরাত তানিয়া, নাসিমা আনিস, বর্ণালী সাহা, মোজাফ্ফর হোসেন, নিলুফা আক্তার, রিমঝিম আহমেদ এঁরাও সাম্প্রতিক কালে এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক হিসেবে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। ভিন্নধারার ঔপন্যাসিক হিসেবে সাদাত হোসাইন, আবদুল্লাহ আল ইমরান, কিঙ্কর আহসানও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

এই সময়ের ছোটগল্পেও বিচিত্রভাবে সমকালীন জীবনের উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। বাংলাদেশের ছোটগল্পেও মূর্ত হয়েছে মধ্যবিত্তের জটিল ভঙ্গুর, আত্মকেন্দ্রিক কুণ্ডলায়িত জীবন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, কায়েস আহমেদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রাহাত খান, রশীদ হায়দার, সিরাজুল ইসলাম, মঈনুল আহসান সাবের, সৈয়দ ইকবাল, নাসরীন জাহান, আবু সাঈদ জুবেরী, ইমতিয়ার শামীম, সেলিম মোরশেদ, পারভেজ হোসেন, আকিমুন রহমান, শাহনাজ মুন্নী, মামুন হুসাইন, শাহাদুজ্জামান, মোস্তফা কামাল, তাপস রায়, আশান উজ জামান, কিযী তাহ্নীন, আনিফ রুবেদ, প্রমুখের গল্পে এই জীবনের বহুমাত্রিক রূপ খুঁজে পাওয়া যাবে সহজেই।

অবশ্য শুধু কথাসাহিত্য নয়, এই সময়ের কবিতাতেও লক্ষ করা যাবে মধ্যবিত্তের জীবনযাপন ও মানসিকতার সার্বিক প্রতিচ্ছবি। শামসুর রাহমান এজন্যেই লিখতে পেরেছেন ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’, ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’, ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে’, ‘মাতাল ঋত্বিক’, ‘নায়কের ছায়া’, ‘এক ফোঁটা কেমন অনল’, হাসান হাফিজুর রহমান ‘শোকার্ত তরবারি’, ‘ভবিতব্যের বাণিজ্যতরী’, সৈয়দ শামসুল হক ‘অপর পুরুষ’, ‘রজ্জুপথে চলেছি’, ‘এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি’, শহীদ কাদরী ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ‘তৃতীয় তরঙ্গে’, ‘কোলাহলের পর’, ফজল শাহাবুদ্দীন ‘আততায়ী সূর্যাস্ত’, ‘অন্তরীক্ষে অরণ্য’, ‘আলোহীন অন্ধকারহীন’, নির্মলেন্দু গুণ ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ ও ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’, আবুল হাসান ‘যে তুমি হরণ করো’ ও ‘পৃথক পালঙ্ক’, মহাদেব সাহা ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’, ‘কী সুন্দর অন্ধ’, ‘একা হয়ে যাও’, সিকদার আমিনুল হক ‘বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকারে’, ‘এক রাত্রি এক ঋতু’, ‘কাফকার জামা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রস্থ।

বাংলাদেশের সাহিত্যের আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এইসময়ে যে গ্রামজীবন ও আঞ্চলিক জীবনের ছবি আমাদের সাহিত্যে পাওয়া যায় পূর্বের তুলনায় তা অনেকটাই আলাদা। আগে লেখকেরা গ্রামকেন্দ্রিক প্রবহমান জীবনকে দেখেছেন অনেকটাই অনড় অচল নিস্তরঙ্গ হিসেবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই গ্রামজীবনে যে চাঞ্চল্য দেখা গেল—স্বার্থান্বেষীদের হানাহানি, দ্বন্দ্ব আর রাজনৈতিক অস্থিরতার স্পর্শ লাগে, বাংলাদেশের লেখকেরা, বিশেষ করে কথাসাহিত্যিকেরা সেই ছবি চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন তাদের লেখায়। সেইসঙ্গে ভুলে যাননি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের চিত্রটি আঁকতে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে যে-বিষয়টি তা হলো নিম্নবর্গের মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা। গ্রামীণ কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ফতোয়াবাজি, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদিকে তারা উপজীব্য করছেনে তাদের লেখায়। সাধারণ ব্রাত্যজীবনকে পরম মমতার সঙ্গে উপন্যাসের বিষয় করে তুলেছেন। এ সংক্রান্ত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘দূরত্ব’, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’, ‘আয়না বিবির পালা’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘তিমি’, সেলিনা হোসেনের ‘জলোচ্ছ্বাস’, ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, আবুবকর সিদ্দিকের ‘জলরাক্ষস’, ‘খরাদাহ’, হরিপদ দত্তর ‘ঈশানে অগ্নিদাহ’, ‘অন্ধকূপে জন্মোৎসব’, বশীর আল-হেলালের ‘শেষ পানপাত্র’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘জন্মজাতি’ ও ‘মৈনপাহাড়’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘ভূমিপুত্র’, ‘নূরজাহান’, ইমতিয়ার শামীদের ‘অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর’ ইত্যাদি। বাংলাদেশে ছোটগল্পেও গ্রামীণ জীবনের নানা টানাপোড়েনের ছবি পাওয়া যায়। হাসান আজিজুল হক (‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’), শওকত আলী (‘লেলিহান সাধ’, ‘শুন হে লখিন্দর’), আবদুস শাকুর (‘ক্রাইসিস’, ‘সরস গল্প’), সেলিনা হোসেন (‘খোল করতাল’) এবং সাম্প্রতিককলের একঝাঁক তরুণ গল্পকার গ্রামজীবনকেই প্রধানত তাদের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছেন।

স্বাধীনতার পরে নতুন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে আমাদের উপন্যাসে আরো বেশ কিছু অভিনব অথচ অনিবার্য বিষয় যুক্ত হয়। এর একটি হচ্ছে বেসরকারি সংস্থাগুলির (এনজিও) কর্মতৎপরতা গ্রামগুলিকে আন্দোলিত করার সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়টি আমাদের কথাসাহিত্যেও প্রতিফলিত হতে থাকে। প্রধানত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই এজিওকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে উপন্যাসে তুলে এনেছেন আমাদের লেখকেরা। এ প্রসঙ্গে ইমতিয়ার শামীমের ‘ডানা কাটা হিমের ভেতর’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করা যায় বিশেষভাবে। শুধু এনজিও নয়, বিশ্বায়নের প্রভাবে আমাদের জনপদ ও জনজীবন যে আমূল বদলে যাচ্ছে, তাও তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। এ বিষয়টি উপজীব্য হয়েছে ইমতিয়ার শামীমের ‘গ্রামায়নের ইতিকথা’ উপন্যাসে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পটভূমিতে ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ নামে চমৎকার একটি উপন্যাস লিখেছেন বর্ণালী সাহা।

তবে এসব বিষয়কে ছাপিয়ে সাম্প্রতিকালে অন্য যে বিষয়টি কথাসাহিত্যিকদের, বিশেষ করে নারী লেখকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে নারী। নারীর জীবনযাপন, স্বপ্নকল্পনা, আশাআকাঙ্ক্ষা, পুরুষের আধিপত্য, নির্যাতন, নিপীড়নকেই নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের লেখায় উপজীব্য করেছেন। সেলিনা হোসেনের ‘দ্বিপান্বিতা’, ‘মোহিনীর বিয়ে’, রাজিয়া খানের ‘হে মহাজীবন’, নাসরীন জাহানের ‘উরুক্কু’, ঝর্ণা রহমানের ‘অন্য এক অন্ধকার’, ‘ঘুম-মাছ ও একটুকরো নারী’, শাহীন আখতারের ‘পালাবার পথ নেই’, ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’ শীর্ষক উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থে পাওয়া যাবে এই বহুমাত্রিক বিচিত্র জীবনের ছবি। তবে সেলিনা হোসেনের আগ্রহ যেখানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর অধস্তন অবস্থাকে নিরীক্ষণ করা, নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনের জটিলতার মধ্যদিয়ে আবার চলতে থাকে শাহীন আখতারের উপন্যাস ও গল্পের চরিত্রগুলি। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো ও সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীর জীবন যে কিভাবে বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে তার জীবনদৃষ্টি, উল্লিখিত নারী লেখকদের রচনা সেই দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে পুরুষ লেখকেরাও যে নারীবিষয়ের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে শক্তিশালী গল্পকার হাসান আজিজুল হকের ‘মা মেয়ের সংসার’-এ টুকরো টুকরো মর্মভেদী কাহিনী আর ‘আগুনপাখি’, ‘সাবিত্রী উপখ্যানে’র আখ্যানে।

মুক্তিযুদ্ধ, মধ্যবিত্তের জীবনযাপন বা নারীর অধস্তন অবস্থা আমাদের সাহিত্যের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকলেও রাজনীতিই হচ্ছে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রধান প্রবণতা। এই বিষয়টির প্রতি আমাদের লেখকদের ঝোঁক যে দুর্মর, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে উপনিবেশের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিশ্বায়নের খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই লেখকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এই ঝোঁক। বৈশ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রটিও নানা মতাদর্শিক বিভ্রান্তি, সংঘাত ও হানাহানিতে পূর্ণ। একাত্তরে যেসব প্রসঙ্গের প্রায় মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তানের প্রতি সহমর্মী রাজনীতিবিদ ও ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবীরা আবার সেইসব প্রসঙ্গকেই রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। ফলে, এদেশে সামরিক শাসনের আবির্ভাব ঘটেছে, পুনর্বাসিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। কিন্তু লেখকেরা, আগেই যেমন বলেছি, সত্যনিষ্ঠ হওয়ার ফলে ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এরই প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও নাটক। সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ প্রতিরোধকে তারা তাদের লেখার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন।

স্বাধীনতা পূর্বকাল ও পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কাহিনী যেসব উপন্যাসে নানা আঙ্গিকে ধরা পড়েছে সেগুলি হচ্ছে শওকত ওসমানের ‘পতঙ্গ পিঞ্জর’, ‘আর্তনাদ’, সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’, ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’, শওকত আলীর ত্রয়ী উপন্যাস ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’, ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’, ‘ওয়ারিশ’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’, ‘খোয়াবনামা’, প্রশান্ত মৃধার ‘মৃত্যুর আগে মাটি’ শীর্ষক উপন্যাস। এসব উপন্যাসের বিষয়বস্তু দেশভাগ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্বাধীকার আন্দোলন, মতাদর্শিক ঘাতপ্রতিঘাত থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যদিয়ে এই সময় কেউ কেউ বাংলাদেশের মর্মমূলকে ছুঁতে চেয়েছেন। শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে পাওয়া যাবে তারই চমৎকার ভাষ্য।

বাংলাদেশের নাটকে প্রধানত সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপজীব্য হয়েছে এই রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। এসব নাটকে প্রাধান্য পেয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেতনা। রাজনৈতিক ও সামাজিক অসঙ্গতি, শোষক ও শোষিতের শ্রেণিদ্বন্দ্ব নাট্যকারদের আকৃষ্ট করেছে। এসব নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’, ‘ওরা আছে বলেই’, ‘ইবলিশ’, ‘এখানে নোঙর’, ‘গিনিপিগ’, আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘শপথ’, ‘সেনাপতি’, ‘এখনো ক্রীতদাস’, ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘চারিদিকে যুদ্ধ’ ইত্যাদি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারের মধ্যদিয়েও আমাদের নাট্যকারগণ সমকালীন রাজনৈতিক চেতনাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। ব্রতী হয়েছেন বাঙালি জাতিসত্তার উৎস ও অস্তিত্ব সন্ধানে। এই ধারায় রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, সাঈদ আহমদের ‘শেষ নবাব’, সেলিম আল দীনের ‘শকুন্তলা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’ প্রভৃতি। প্রতিবাদী নাটকের ধারাতেই বাংলাদেশে বেশকিছু নাট্যাঙ্গিকের সূত্রপাত ঘটে। এই আঙ্গিকগুলি হচ্ছে পথনাটক, গ্রামথিয়েটার, মুক্তনাটক ইত্যাদি।

তবে কথাসাহিত্য ও নাটকের তুলনায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ সবচেয়ে প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের কবিতায়। শামসুর রাহমানের উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ থেকে শুরু করে রফিক আজাদের ভাত দে হারামজাদা পর্যন্ত কবিতাগুলি পাঠকের একান্ত অভিনিবেশের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পঁচাত্তরের পটভূমিতে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ লেখেন, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন’। এছাড়া হাসান হাফিজুর রহমানের ‘আমার ভেতরের বাঘ’, শামসুর রাহমানের ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই’, ‘ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ’, ‘দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে’, ‘বুকে তার বাংলাদেশের হৃদয়’, আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’, নির্মলেন্দু গুণের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’, ‘পৃথিবীজোড়া গান’, ‘দূর হ দুঃশাসন’, ‘ইসক্রা’, রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’, ‘অঙ্গীকারের কবিতা’, মহাদেব সাহার ‘ফুল কই শুধু অস্ত্রের উল্লাস’, ‘কোথা সে বিদ্রোহ’, ‘যদুবংশ ধ্বংসের আগে’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘আমরা তামাটে জাতি’, ‘জাতিসত্তার কবিতা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যক্তিক শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে নানা মাত্রায়।

৫. দীর্ঘ সময়, বহুমুখী প্রকাশ
১৯৭২ থেকে ২০২০ সাল—এক দীর্ঘ সময়। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ এইসময় নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে অগ্রসর হয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রটি হয়ে উঠেছে জটিল ও সংক্ষুব্ধ, বাঁক নিয়েছে কয়েকবার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা ও মতাদর্শিক সংঘাত; বাদ-প্রতিবাদ। পুনরুত্থান ঘটেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির; তাদের সহযোগিতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে অতিডানপন্থী শক্তি। সামাজিক সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকৃত চর্চার জায়গা থেকে সরে আসবার ফলে বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ চিহ্নিত হয়েছে মৌলবাদী দেশ হিসেবে। এখন আবার অবশ্য বাংলাদেশ ফিরে যাচ্ছে তার রাষ্ট্রিক উৎসে, মুক্তিযুদ্ধের মতাদর্শিক জায়গায়। এই লেখার সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমাদের সাহিত্যে উল্লিখিত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়টি কিভাবে রূপায়িত হয়েছে, তুলে ধরা সহজ হয়নি। তবু চেষ্টা করেছি এই সময়ে রচিত বাংলাদেশের সাহিত্যের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার। কিন্তু এর মাধ্যমে যে বাংলাদেশের সাহিত্যের সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরা যায়নি, লেখাটির উপসংহারে পৌঁছে তা বিলক্ষণ মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশের সাহিত্যের মনোযোগী পাঠকমাত্রেই লক্ষ করবেন, এদেশের সাহিত্য নানা সময়ে নানা বাঁক নিয়েছে। স্বাধীনতার পর যে ধরনের উদ্দীপনামূলক লেখা আমরা কবি ও কথাসাহিত্যিকদের কাছ থেকে পেয়েছি, শাহবাগের গণজাগরণের পর তা আবার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের রূপ নেয়। কবিতার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি আত্মস্বীকারোক্তিমূলক এবং রাজনৈতিকভাবে ঝাঁঝালো কবিতার পরিবর্তে এখন লেখা হচ্ছে ‘অন্তর্মুখী ব্যক্তিক’ কবিতা, অন্তর্লীনতার হার্দ্র কারুণ্যে যে কবিতা স্নাত। এখন আবার দেখা যাচ্ছে আশির দশকের বিমূর্ত কবিতার পরিবর্তে সহজ কবিতার প্রতি কবিদের ঝোঁক। আবার শাহবাগের গণজাগরণে প্রভাবে লেখা হয়েছে প্রতিবাদমূলক ঝাঁঝালো কবিতা, ছড়া, গল্প ও উপন্যাস। তরুণ কবিদের মধ্যে দেখা গেছে রূপকল্প নির্মাণে, প্রতীক ব্যবহারে, ভাষাভঙ্গিকে অভিনব করে তুলবার প্রবণতা। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তরুণ লেখকেরা। জাদুবাস্তবতা তাদের অনেকটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গত দুই দশকে নগরজীবন ও গ্রামকে কেন্দ্র করে কখনো আত্মজৈবনিক, কখনো যাদুবাস্তবতা, কখনো নিরীক্ষাধর্মী গদ্যে তারা গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। নাটকেও পাওয়া যাবে নানা বৈচিত্র্যের সন্ধান।

সবমিলিয়ে বলা যায়, এই সময়ের সাহিত্য সরাসরি বক্তব্য প্রকাশের স্তর থেকে সরে এসে হয়ে উঠছে অস্তিত্ব-নিরস্তিত্বের ব্যক্তিক গাথা। লেখকেরা প্রথাগত ভাষা ও ভঙ্গিতে সরাসরি ঘটনার বর্ণনায় আর আগের মতো আগ্রহী নন, তারা ব্যক্তিঅস্তিত্বের গভীরে কিংবা অন্তর্লোকে নিমজ্জিত হয়ে উপলব্ধি করতে চান তার যাপনের প্রকৃত স্বরূপ। বাংলাদেশের সাহিত্য এভাবেই হয়ে উঠেছে মানবীয় অন্তর্লোকের উদ্ভাষণ, মনোবাস্তবতার যাপিত দলিল। সহজ ছন্দোবদ্ধ কবিতার দিকে যেন আবার ফিরছেন কবিরা। কেউ কেউ একে হাল আমলের ফ্যাশনদুরস্ত শব্দ উত্তর-আধুনিক বলে চিহ্নিত করতে চাইছেন। কিন্তু উত্তর-আধুনিকতার স্বরূপ যে কী তা এখনো সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, হবেও না হয়তো। কারণ, উত্তর-আধুনিকতা নিজেই নির্দিষ্ট কোনো ছকে নিজেকে আটকে রাখতে চায় না, সেটাই তার বৈশিষ্ট্য। তাহলে কিভাবে ব্যাখ্যা করব একে? আসলে সাহিত্যকে বোধহয় এখন আর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নয়, উপলব্ধি করে জারিত করার সময় এসে গেছে। নির্দিষ্ট দেশকালের মধ্যে তার শিকড় চাড়িয়ে দিয়েও যে বাংলাদেশের সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছে, বুঝে নিতে হবে সেটাই। তবে মতাদর্শিকভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করে যারা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচ্যুত করে ভুল পথে চালিত করতে চেয়েছিল, তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফলে, সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখক সর্বমানবিক অসাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটেই তাদের সাহিত্য রচনা করছেন। সবধরনের বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্নের কথাই কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও লেখকেরা বলে চলেছেন।

ঢাকা, ২৪ মার্চ ২০২০

   

তৃতীয় পক্ষ



ওমর শরিফ
অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এ শহরে বাড়ি আর বাড়ি। ছায়া, শান্তি দেবে এমন গাছ কোথায়? গত বারের তুলনায় এবার গরমটা একটু বেশী পড়েছে। দুপুরবেলা তাই খাঁ খাঁ করছে রাস্তাঘাট। প্রায় জনমানব শূন্য চারিদিক। মাঝে মাঝে কিছু রিক্সা, ট্যাক্সি চলছে এদিক সেদিক। ভাগ্যিস দুই রাস্তার মাঝের ডিভাইডারে সারি সারি গাছ আছে। তবু একটু সবুজ দেখা যায়, তা-না হলে কিযে হতো? কথাগুলো ভাবলো মিতু। কলেজ পড়ুয়া তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মিতু। কলেজে কোন ভাবেই মন বসছিলোনা মিতুর। একটা ঘটনা অস্থির করে রেখেছে তাকে কাল থেকে। তাই মাত্র তিনটা ক্লাস করে বেরিয়েছে ধানমন্ডি লেক যাবে বলে। ধানমন্ডি লেকে অনেক গাছ, অনেক শান্তি। সায়েলা, রবি দু’একবার জিজ্ঞেস করেছে কোথায় যাচ্ছে জানার জন্য। সায়েলা, রবি মিতুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মিতু ওদের মিথ্যে বলেছে।

-বলেছে ‘বড় চাচার বাড়ি যাচ্ছি, চাচা একটু অসুস্থ তাই দেখা করে ওখান থেকেই বাসা চলে যাবো’।     

‘ক্লাস শেষে বন্ধুদের আড্ডা জমে উঠেছিলো খুব তবু ছাড়তে হয়েছে। এই খাঁ খাঁ রোদে কার দায় পড়েছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসার? কল দিলে কল ধরো না, কেটে দাও আবার ব্যাকও করনা! এটা কি ধরনের কথা’? রিক্সার ভাড়া দিতে দিতে বলল মিতু। মিতুর রাগ দেখে সামনে দাঁড়ানো স্বপন মিটমিট হাসছে। ছয় ফিটের মতো লম্বা, ট্রিম করা দাড়ি, মাথার চুল এলোমেলো, একটা হাওয়াই শার্ট সঙ্গে জিন্স পড়া। পায়ে স্যান্ডেলের বদলে স্নিকার পড়েছে আজ। একটু আগোছাল যাকে বলে ‘স্বযত্নে অবহেলা’। স্বপনের এই ব্যাপারটাই দারুণ টানে মিতুকে। ওর মধ্যে কোথায় একটা ব্যাপার আছে। কি নেই, আবার আছে। ঠিক পূর্ণ নয় আবার খালিও নয়। স্বপন মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে। দেশের নামকরা একটা পত্রিকা অফিসে কাজ করে। কথা কম বলে। যা কথা বলে তা ওর গিটার বলে। খুব ভালো গিটার বাজায় স্বপন।      

রিক্সা থেকে নেমে তেড়ে এলো মিতু। ‘কি কানে শোন না। হাসছো আবার, লজ্জা নেই’? রাগে বলল মিতু।

‘আচ্ছা বাবা রাগ পরে হবে। আগে চলো লেকের ভেতরটায় যাই, এখানে অনেক রোদ’। বলল স্বপন। লেকের পার ধরে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাশে থাকা রেস্টুরেন্ট ‘জলসিরি’তে গিয়ে বসলো। রেস্টুরেন্টে লোকজন কম। দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারকে এসিটা অন করে দিতে বলল স্বপন। মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো কি হয়েছে, এতো জরুরি তলব কেন?’

মিতু প্রতিত্তরে বলল, ‘আগে বলো এতক্ষণ ধরে তুমি আমার ফোন ধরছিলে না কেন’? কতোবার ট্রাই করার পর তোমাকে পেয়েছি, তোমার হিসাব আছে? এতো কথার পরও স্বপনকে শান্ত দেখে মিতু আরও খানিকটা রেগে গেলো। বলল, ‘তুমি কি অনুভূতিহীন, তোমার কি জানতে ইচ্ছে করেনা, আমি কেন এতবার ফোন দিয়েছি’?

স্বপন একটু সিরিয়াস হয়ে গলা খাকিয়ে বলল, ‘আসার পর থেকে আমাকে বলার সুযোগ দিয়েছ তুমি? শুধু নিজেই বলে যাচ্ছ’।

এতক্ষণে নিজেকে যেন খুঁজে পেলো মিতু, একটু লজ্জাও পেলো। কিছুটা নমনীয় হয়ে বলল, ‘আচ্ছা বলো কেন ফোন ধরতে এত সময় নিলে’?

স্বপনের সরল উত্তর, ‘খুব জরুরি মিটিং এ ছিলাম তাই তোমার ফোন আসার সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরতে পারেনি। মিটিং শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছি। তারপর সব কাজ ফেলে এইতো তোমার সামনে আমি’।

মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বোঝা গেলো উত্তরে মিতু সন্তুষ্ট হয়েছে। কিন্তু কিসের যেন উদ্বেগ স্পষ্ট। ব্যাপারটা দৃষ্টি এড়ায়নি স্বপনের।  সে বলল, ‘কি হয়েছে? কোন সমস্যা? আমাকে খুলে বলো’।

মিতু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘স্বপন আমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে বাসা থেকে। পাত্র পক্ষ জানিয়েছে আমাকে খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। আগামীকাল আসবে ডেট ফাইনাল করতে। আমি এখন কি করবো স্বপন? আমাকে বলে দাও’।

স্বপন বলল, ‘বিয়ে করে ফেল। বাবা মা যা চাই তাই করো এতে সবার মঙ্গল’।

মিতু অবাক হয়ে স্বপনের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। বলল, ‘মানে কি? তাহলে এতদিন আমারা কি করলাম। তুমি একটা প্রতারক। তুমি একটা হিপোক্রেট। এখন দায়িত্ব নেয়ার সময় পালাচ্ছো। কাপুরুষ কোথাকার’। তখনও স্বপনের ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখে অবাক হয়ে গেলো মিতু।

স্বপন মিতুর দুহাত টেনে কাছে নিয়ে বলল, ‘এতো দিনেও চিনতে পারলেনা আমাকে। তুমি যা ভাবো আমি তার থেকে অনেক অনেক বেশী ভালোবাসি তোমাকে’। বলে উঠে দাঁড়িয়ে স্বপন বলল,‘চলো’। মিতু বললো,

- ‘চলো’। মিতু বললো,
- ‘কোথায়’?
- চলোই না।
- আগে বলো কোথায়?
- কাজী অফিসে।
- মানে?!
- আমরা আজই এক্ষুনি বিয়ে করছি।
- কি বলো এসব?
- যা বলছি ঠিক বলছি। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোন পথ নেই।
- তোমার বাসা?
- আমি ম্যানেজ করবো।
- আমার বাসা?
- ওটা পরে ম্যানেজ হয়ে যাবে।

 

দরজা খুলতেই নাসরিন স্বপনের সঙ্গে একটি মেয়েকে দেখতে পেলো। দুজনেই পা ছুঁয়ে সালাম করতেই নাসরিন অবাক হয়ে পা সরিয়ে নিলো। কিছুটা সংকোচেও। নাসরিন স্বপনের মা। নাসরিন কিছুটা হতভম্ব হয়ে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন। সোফায় বসতে দিলেন। সোফাতে বসে মাকে উদ্দেশ্য করে স্বপন বলল, ‘মা আমরা বিয়ে করে ফেলেছি। তোমাকে  পরিচয় করিয়ে দিই। এ হচ্ছে মিতু। মিতু, ‘ইনি তোমার শাশুড়ি’।

নাসরিন ছেলের দিকে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘এসব কি বলছিস স্বপন, কাউকে না জানিয়ে এতবড় কাজ তুই কিভাবে করলি? তোর বাবাকে আমি কি উত্তর দিবো। আর চিনি না জানি না একটা মেয়েকে এনে ঘরে তুললি?

স্বপন পাত্তা না দিয়ে উত্তর দিলো, ‘মিতু ভালো ঘরের মেয়ে। বাবা মা শিক্ষিত। সে নিজেও শিক্ষিত অনার্স করছে। দেখতে ভালো, স্বভাব চরিত্রেও ভালো। তোমার সামনেই আছে দেখে নাও’। বলে হাসতে লাগলো।

নাসরিন আর বেশী কথা না বাড়িয়ে মিতুর দিকে তাকালেন। প্রথমিক কিছু কথা বার্তা জিজ্ঞেস করলেন।

বললেন, ‘বিয়েটা কি কোন ভাবে থামানো যাচ্ছিল না বা বাবা মা কে বুঝিয়ে শুনিয়ে অনার্স শেষ করে তারপর বিয়েটা হলে বোধহয় ভালো ছিল’। মিতু মাথা নিচু করে শুধু শুনে যাচ্ছে।

শুধু বলল, ‘আন্টি আমি বাবাকে খুব ভয় পাই আর বাবা সরকারি চাকরি ছাড়া বিয়ে দিবেন না। বললে আরও ঝামেলা বাড়বে’। 

নাসরিন মিতুকে থামিয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে যেতে বললো।

স্বপন দু’জনের উদ্দেশ্যে বললো, ‘অফিসে বিশেষ কাজ আছে, আমাকে একবার এক্ষুনি অফিস যেতে হবে। এর মধ্যে আশা করি তোমাদের চেনা জানা হয়ে যাবে’।

স্বপনের কথা শুনে মা ও মিতু দুজনেই বেশ অবাক হয়ে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

নিজের রুমে বসে বসে মিতু ল্যাপটপে হানিমুনের ছবি দেখছিল। কাশ্মীর যে কি সুন্দর ভাবাই যায় না। পাহেলগাম, সোনমার্গ, গুলমার্গ জায়গাগুলো ভোলার মতো না। সেবারই জীবনের প্রথম বরফ পড়া দেখেছিলো মিতু। কিছু ছবি দেখেতো মিতু রীতিমত না হেসে পারল না। সে সময় ওরা দুজনেই কেমন বাচ্চা বাচ্চা ছিল। ‘দেখতে দেখতে বিয়ের প্রায় চার বছর হতে চললো’ ভাবল মিতু। একটু কি দীর্ঘশ্বাসের মতো বয়ে গেলো বুকের ভিতরটায়? হানিমুনের ছবি দেখা শেষে পুরনো কিছু ছবিতে চোখ গেলো মিতুর। বাবা মা’র ছবি। বাবা মা পাশাপাশি বসা। বাবার কোলে মিতু। মিতুর বয়স তখন ছয় কি সাত হবে। কি দারুন একটা ছবি। মনের অগোচরেই চোখটা ভিজে এলো মিতুর। এখনও বাবার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক হয়নি।

মিতুর বাবা মিতুর বিয়ের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘মিতু নামে আমার মেয়ে ছিল আমি ভুলে গেছি। বাবার অপমান করতে যে মেয়ের বিন্দুমাত্র বাঁধে না; সে আমার মেয়ে হতে পারে না। মিতুর মুখ আমি দেখতে চায়না’।

মাস্টার্স পাস করে মিতু চাকরির কথা ভাবেনি, যদিও স্বপন ওকে বার বার বলেছে বাসায় একা একা বোর লাগবে, তবুও। মিতুর শাশুড়িও একই কথা বলেছে, কিন্তু মন থেকে সায় দেয়নি মিতু। বাচ্চা পালন করবে আর সংসার সামলাবে এটিই ছিল তার চিন্তা।

মিতুর বাচ্চার খুব শখ কিন্তু স্বপন এখন বাচ্চা নিতে নারাজ। বললেই বলে, ‘আরে বাচ্চার জন্য এতো তাড়া কিসের, অঢেল সময় পড়ে আছে, আগে নিজেদের মতো করে সময় পার করি’।

স্বপন সকাল সকাল বেরিয়ে যায় ফেরার কোন সময় নির্দিষ্ট নেই। কখনও আটটা কখনও দশটা পেরিয়ে যায়। আবার কখনও কাজের এতো চাপ থাকে যে কোন কোন রাতে বাসা ফেরা হয়না। কাজ নিয়ে খুব সিরিয়াস স্বপন। খুব তাড়াতাড়ি কয়েকটা প্রমশনও পেয়েছে সে। এই বছর প্রমোশন নিয়ে গাড়ি কিনেছে ওরা। মিতুর পছন্দতেই কেনা। লাল রঙের গাড়ি। লাল রঙের গাড়ি মিতুর খুব পছন্দ। স্বপনের উন্নতিতে মিতুর গর্বের শেষ ছিলনা। মিতুর কেবলই মনে হতো স্বপনের যত সাফল্য সবই তার নিজের। সে নিজে অনুভব করতো আর আনন্দ নিয়ে সেলেব্রেট করতো। মিতুর বন্ধু বান্ধবী পাড়া পরশি যার সঙ্গেই কথা হোক না কেন, ইনিয়ে বিনিয়ে স্বপনের সাফল্যের কথা বলবেই। সে কথায় কথায় স্বপন যে তার ক্যারিয়ারে খুব ভালো করছে, সে হাসবান্ড হিসেবে খুব কেয়ারিং, পরিবারের ব্যাপারে যত্নবান সেগুলো অন্যকে বলে আত্মতৃপ্তি পায়। সেদিন পাশের বাসার ভাবি বললেন, ‘মিতু ভাবি কি যে করি বলেন তো? আমার হাসবান্ড তো আমার হাতের রান্না একেবারেই খেতে পারেনা। আপনি কিভাবে যে ম্যানেজ করেন’?

মিতু হাসতে হাসতে বলন, ‘আপনার ভাইতো আমার হাতের রান্না ছাড়া খেতেই পারেনা। আসলে এ হচ্ছে ভালোবাসা, বুঝেছেন ভাবি ভালবাসা থাকলে বিষও মধু মনে হয়’।

মিতুর সেদিনের সেই আত্মতৃপ্তি ভোলার মতো না। কথা যখন বলছিলো তখন দু চোখ চকচক করে উঠছিল যেন। 

কিছুক্ষণ ধরে মোবাইলটা বেজে চলেছে। মিতু রান্না করছিলো তাই ধরতে দেরি হলো।

হাত মুছে ফোনটা ধরে বলল, ‘হ্যালো স্লামালেকুন। কে বলছেন’?  

মোবাইল ওপাশ থেকে ভেসে এলো, ‘ভাবি আমাকে চিনতে পারছেন আমি ফারুক বলছি। ঐযে নিউ মার্কেটে দেখা। আপানারা প্লাস্টিকের কিছু জিনিস কিনছিলেন। মনে আছে’?  

মনে পড়ে গেলো মিতুর। সে বলল, ‘ও হ্যাঁ ফারুক ভাই! কেমন আছেন? বাসায় সবায় কেমন আছে? বাচ্চারা কেমন আছে’? সরি ফারুক ভাই আপনার নম্বারটা আমার মোবাইল সেভ ছিল না’।  

ফারুক উত্তরে বলল, ব্যাপার না ভাবি, হতেই পারে। আপনাদের দোয়ায় সবাই ভালো আছে। আলহামদুলিল্লাহ। ভাবি একটা কাজে একটু ফোন করেছিলাম’।

মিতু বলল, কি ব্যাপার বলুন তো?

স্বপন ভাইকে একটু দরকার ছিল। উনি কি বাসায় আছে না কোন কাজে বাইরে গেছেন?

কেন আপনি জানেন না? আপনার স্বপন ভাইতো আপনাদেরই অফিসের ট্যুরে চট্টগ্রাম গেছে।

ফারুক একটু অবাক হয়ে বলল, ‘কি বলেন ভাবি? আমার জানা মতে স্বপন ভাইতো অফিসের ট্যুরে কোথাও যাননি। বরং উনি তো বাসার কাজের কথা বলে দু’দিন ছুটি নিয়েছেন।!

মিতু আর কথা বাড়ায় না। কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, অনুমানে সে তা বুঝেছে। সে কথাটা ঘুরিয়ে ফারুককে বলল, ‘হ্যাঁ স্বপন বলছিলো বাসার কাজের সঙ্গে অফিসের কাজও সেরে আসবে। তাইতো সেদিন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলো। আমি হয়তো বুঝতে ভুল করেছি’।

ফারুক ওপাশ থেকে বলল, ‘ও আচ্ছা ঠিক আছে ভাবি, স্বপন ভাইয়ের অন্য কোন নম্বার থাকলে দিলে ভালো হয়। জরুরি আলাপ আছে’।

ফারুক ভাই স্বপনের তো একটাই নম্বার। ও তো আর অন্য কোন নম্বার ব্যবহার করেনা। ও কল দিলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবো’।

কথা বলার সময় যতদূর সম্ভব মাথাটাকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলো মিতু। কথা শেষ করে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লো সে। সে কিছু একটা গড়বড় আছে অনুমান করছে। কিন্তু আবার এও চিন্তা করছে অনুমান নির্ভর কিছু ভেবে বসা ঠিক না। সে মনে মনে চিন্তা করলো, ‘স্বপন এলে কথা বলবে’।

স্বপন দুই দিন পর অফিসের কাজ করে বাসায় ফিরে এলো। এসেই মিতুকে জরিয়ে ধরে চুমু খেল। গভীর আদরে বুকের মধ্যে নিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘আহা কি শান্তি। তোমাকে বুকে নিলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এই কি আছে তোমার মধ্যে? তোমাকে বুকে নিলেই আমার কেন এতো শান্তি শান্তি লাগে?

মিতু শুধু হুম হলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। বেশী কথা বাড়ালো না। স্বপন মিতুর এই ব্যবহারে কিছুটা অবাক হল। বলল, কি ব্যাপার শরীর খারাপ নাকি? কিছু হয়েছে? মন খারাপ?

মিতু উত্তরে বলল, ‘রান্না করতে করতে একটু টায়ার্ড হয়ে গেছি মনে হয়। ঠিক হয়ে যাবে। তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি’। বলে মিতু রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। স্বপনও ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।

মিতুর স্বপনের এরকম ব্যবহার দেখে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো। মন থেকে কালো মেঘ যা এতক্ষণ খেলা করছিলো তা কেটে গেলো। নিজেকে খুব হাল্কা হাল্কা বোধ করছে এখন। দুজনে একসঙ্গে বসে খেল। ডাইনিং টেবিলে স্বপন অনেক গল্প করলো মিতুর সঙ্গে। মনে হল এই দুইদিনে অনেক গল্প জমা ছিল। মিতুকে পেয়ে সব বাধা সরে গিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে লাগলো সব।

এতো কিছুর পরও মিতু লক্ষ্য করলো, ‘আগে কথায় কথায় স্বপন মিতুর গায়ে হাত দিত। ট্যুর থেকে এলে বেডে অনেক আদর করতো। কিন্তু এবার টায়ার্ড বলে পাশ ফিরে শুয়ে গেলো। মিতুর শরীরটাকে কাছে টেনে পর্যন্ত নিলো না। স্বপনের ব্যবহার মিতুর কাছে কিছুটা আলাদা মনে হল। শুয়ে শুয়ে মিতুর কেবলই মনে হতে লাগলো অফিস থেকে দেরিতে ফেরা, হুটহাট ট্যুরের নামে বাইরে যাওয়া। মোবাইল চ্যাট করা আর মোবাইল বেজে উঠলে খুব সন্তর্পণে অন্য রুমে গিয়ে কথা বলা, কেমন যেন আলগা একটা অনুভূতির সৃষ্টি করলো মিতুর কাছে। মিতু ঠিক বুঝতে পারছে কিছু তো একটা আছে যা মোটেও স্বাভাবিক নয়। কোথায় যেন কি নেই। মিতু মনে মনে ছটপট করে উঠলো। এতদিন তাহলে কেন বুঝতে পারেনি সে? নাকি এ সবই তার ভুল, দুর্বল মনের বিকার মাত্র।

শুক্রবার ছুটির দিন। এই দিনটিতে স্বপন কিছুটা বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। মিতু সকালের রান্না করতে ব্যাস্ত সময় পার করছে। আজ পরোটা, ডিমভাজা আর আলুর দম রান্না হচ্ছে। স্বপনের ফেভারিট। নাস্তা প্রায় রেডি। স্বপনকে উঠাতে ঘরে ঢোকা মাত্র স্বপনের মোবাইল মেসাজের শব্দ কানে ভেসে এলো মিতুর। স্বপন তখনও ঘুমে অচেতন। ‘কোন জরুরি মেসেজ নাকি’? ভাবলো মিতু। মিতু কাছে গিয়ে মোবাইল তুলতেই আরেকটি মেসেজ ভেসে উঠলো। রিয়া নামে কেউ লিখেছে, ‘তোমাকে খুব মিস করছি’। মেসেজ দেখে মিতুর কেমন যেন বাজে অনুভূতি হল। সে সম্পূর্ণ মেসেজ পড়ার জন্য মোবাইল আনলক করতেই একগাদা হার্ট ইমজি ভেসে উঠলো। মিতুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে স্ক্রল করতে শুরু করলো। সে যতই পড়ছে ততই অবাক হচ্ছে। স্বপন লিখেছে চট্টগ্রামের ট্যুরটা অতুলনীয় ছিল। রিয়ার উত্তর, ‘না মোটেও না। আমার মতে গুলশান হোটেলে আমাদের সময়টা ছিল বেস্ট। তবে কক্সবাজার ট্যুরটাও বেশ উপভোগ্য ছিল। বেডে যে তুমি কি পাগলের মতো করো না। তোমাকে সামলানোই যায় না। ইউ আর আ রিয়েল ওয়াইল্ড টাইগার। আই লাভ ইউ’।

উত্তরে স্বপন লিখেছে, ‘তোমার কোন তুলনা হয় না। তুমি বেস্ট। আই লাভ ইউ ঠু’।

সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপছে যেন। নিজেকে দিশেহারা মনে হচ্ছে। পাগল পাগল লাগছে সব। পড়ছে আর মিতুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ওদের দুজনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি দেখা যাচ্ছে। এসব দেখে মিতুর কেবলই মনে হচ্ছে কেউ যেন ওর হৃৎপিণ্ডটাকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে দিচ্ছে। বুকের ভেতর প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছে সে। কষ্টে কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যেন। 

হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে মিতুকে তার মোবাইল হাতে কি যেন করছে দেখতে পেলো স্বপন। এমন সময় উঠে এসে পেছন থেকে মিতুর কাছ থকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বললো, ‘হাউ ডেয়াড় ইউ। তুমি আমার মোবাইলে হাত দিয়েছো কেন? মেসাজ কেন পড়ছো? মানুষের প্রাইভেসি বলে একটা কথা আছে। আনশিভিলাইসড কোথাকার’।

মিতু কিছুই বললোনা শুধু ফ্যালফ্যাল করে স্বপনের দিকে চেয়ে থাকলো। স্বপনের উদ্ধতপূর্ণ কথাবার্তা  নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না সে। এ ধরনের অন্যায় করার পর কোন মানুষ যে এতো নির্বিকার হতে পারে মিতুর চিন্তার বাইরে ছিল। শান্ত থাকতে থাকতে হঠাৎ মিতু চিৎকার করে উঠলো। বলল, চরিত্রহীন, লম্পট কোথাকার? অফিসের ট্যুরের নাম করে বান্ধবী কে নিয়ে ঘুরে বেড়াও। ছি ছি তোমার লজ্জা করেনা?

স্বপন মিতুকে থামাতে এগিয়ে আসতেই মিতু একরকম পাগলের মতো চড়, থাপ্পড় দিতে শুরু করে দিলো। আক্রোশে স্বপনের রাতে পড়া জামাটা একটানে ছিঁড়ে ফেললো মিতু। মুখে বলল কুত্তার বাচ্চা তুই আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আমার জীবন নিয়ে খেলেছিস। বাস্টার্ড।

স্বপন মিতুকে থামাতে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। মুখে বলল, ‘আর একটা কথা বললে তোকে এখানেই মেরে ফেলবো। কি প্রমাণ আছে তোর কাছে যে আমি লম্পট। ... উল্টাপাল্টা কথা বললে তোকে আমি খুন করে ফেলবো’।

মিতু তখনও স্বপনের জামার কলার ধরে আছে। বলল, ‘ফারুক ভাই কল করেছিলো উনি বলেছেন তুমি অফিসের ট্যুরে যাওনি। তুমি তোমার লাভারের সঙ্গে হানিমুনে গিয়েছ চট্টগ্রামে। তারও আগে কক্সবাজারে আর গুলশানে একসঙ্গে রাত কাটিয়েছ। সবই পড়েছই আমি। তোমাদের একসঙ্গে ইন্টিমেট সব ছবিও দেখেছি। ছি তোমার ঘেন্না করেনা। চরিত্রহীন, লম্পট কোথাকার?

সব শুনে স্বপন একটা ধাক্কা খেল যেন। একটু বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। সে আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে বসলো। কোন উপায় না পেয়ে মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ভুল হয়েছে মিতু, আমাকে তুমি ক্ষমা করো। এবারের মতো মাফ করে দাও, প্লিজ’।

অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছিলো স্বপনের। ক্ষণিকের আনন্দের জন্য এ কোন ভুল করে বসলো স্বপন। সে চাইলেও নিজেকে আর ক্ষমা করতে পারবেনা।  

এতক্ষণে মিতুও কিছুটা ধাতস্ত হয়ে এসেছে। স্বপনের দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলো, ‘স্বপন আমার কি দোষ ছিল? আমিতো তোমাকে নিজেকে উজাড় করে চেয়েছি। এতো বড় কষ্ট তুমি আমাকে দিতে পারলে? তুমি আমার পৃথিবী ধ্বংস করে দিয়েছ। আমাকে শেষ করে দিয়েছ। কিভাবে পারলে? এসব জানার আগে আমার মৃত্যু হলনা কেন? স্বপন আমি যে তোমাকে খুব খুব ভালোবেসে ছিলাম। এত বড় প্রতারণা তুমি কেন করলে? আমাকে বললে আমিই তোমার জীবন থেকে চলে যেতাম। তাই বলে এতবড় আঘাত তুমি আমাকে দিতে পারলে’?

 

সময় যেন থেমে গেলো। মিতু আর আগের মতো উচ্ছ্বসিত হয়না। স্বপন বিরাট ভুল করেছে এবং তা সে বারবার স্বীকার করেছে। মিতু স্বপনকে মন থেকে ক্ষমাও করেছে। কিন্তু দিন শেষে যখন মুখোমুখি হয় তখন নিজের মূল্য নিয়ে সংশয় দেখা দেয় মিতুর। বড্ড সস্তা লাগে নিজেকে। পরিপূর্ণভাবে কিছু দিতে না পারার বেদনা নিজেকে কুড়ে কুড়ে খায়। মিতু বুঝতে চেষ্টা করে তাদের মাঝে কি ছিলনা যে স্বপনকে অন্য মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। সম্মানবোধ? মিতুর মতে, ‘স্বপন মিতুকে ভালোবাসতো ঠিক কিন্তু তার মধ্যে গভীরতা ছিলনা, সম্মান ছিলনা। যা ছিল তা প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যেস। মাপ করে চুমু দেয়া, বাহির থেকে এসে জড়িয়ে ধরা, সাংসারিক কথা বলা, রুটিন করে মিলিত হওয়া। এর মধ্যে নতুনত্ব কি আছে? যা আছে তা সবই অভ্যেস। মিতু স্বপনকে রিয়ার কাছে কেন যাচ্ছে না জানতে চাইলে বলে, ‘রিয়াকে আমি সেভাবে কখনই দেখিনি। এটা একটা মোহ’।

মিতু বুঝতে পারে রিয়া স্বপনের পাঞ্চ লাইন। অনেকটা সারাদিনের ক্লান্তির পর এক পেগ মদ যেমন তেমন। স্বপনের কাছে ঘরটা থাকলো ঠিকই, মাঝে মাঝে একটু বাম্পার রাইডিং ও থাকলো, যা জীবনে স্পাইস যুক্ত করবে। এই সমীকরণ যা বোঝায় তা হচ্ছে। স্বপনের লয়াল থাকা প্রায় অসম্ভব, মিতুও সেটি বোঝে।

আগে দুজনার অনেক কথা হতো এখন সত্তুর শতাংশ কথা কমে গেছে দুজনার মধ্যে। প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না। একে ওপরের দিকে ঠিক ভাবে তাকাতে পর্যন্ত পারে না। অনুশোচনায় আর অপমানে দুজনেই শুধু হারিয়ে থাকে। দুজনেই অনুভব করে, কোন কিছুই আর আগের মতো নেই। ঘটনা প্রবাহে সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। স্বপন মিতুকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট সাহায্য চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মিতু নিজের সামনে নিজেই দাঁড়াতে পারছেনা। দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিতু ভাবছে সে আর কি করলে এমন ঘটনা ঘটতো না? কি করলে স্বপনকে আগলে রাখতে পারতো? বার বার একই উত্তর পেলো। অভ্যেস! টানটা আর আগের মতো নেই।

পরের দিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মিতু বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের আকাশ দেখছে। আনমনে কি যেন ভাবছে। স্বপন মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, ‘অফিসে যাচ্ছি’ বলে বের হয়ে গেলো। মিতু একবার সকালের নাস্তার কথা জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না। বারান্দায় বসে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে  কাঁদতে শুরু করলো।

রাতে স্বপন অফিস থেকে ফিরে এসে কলিং বেল দিলো। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না দেখে একটু ভয় পেয়ে গেলো সে। ব্যাগে রাখা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল স্বপন। রাতে লাইট জ্বালায়নি মিতু। পুরো বাসা চুপচাপ। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো স্বপনের। হঠাৎ ভয় পেয়ে মিতু মিতু বলে ডাকতে শুরু করে দিলো স্বপন। বেডরুমে ঢুকে দেখল মিতু সেখানে নেই। লাইটের সুইচ অন করলো স্বপন। বাথরুম, পাশের রুম, বেলকণি ঘুরে ঘুরে দেখল, কয়েকবার ডাকলো মিতু নাম ধরে কিন্তু কোন সাড়া নেই। বেড রুমে ফিরে এসে বিছানায় বসে পড়লো স্বপন। দুই হাতের তালুতে মুখ লুকাল সে। ভয়ে টেনশনে ঘেমে নেয়ে গেছে একেবারে। হাত থেকে মুখ তুলতেই লক্ষ্য করলো এস্ট্রের নিচে চিঠির মতো কি যেন চাপা দেয়া আছে টেবিলের উপর। স্বপন উঠে এসে দেখল হ্যাঁ মিতুর লেখা চিঠি একটা।

চিঠিতে লেখা,

স্বপন, আমরা পছন্দ করে পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে সংসার পেতে ছিলাম। সুখে দুখে আমরা সব সময় এক ছিলাম। পাশাপাশি ছিলাম। ভেবেছিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সঙ্গে পাড়ি দিবো। তা আর হলনা। এই ৮ বছরের সম্পর্কে কোনদিন বুঝিনি তুমি আমার কেউ নও। আজকের পর থেকে শুধুই মনে হচ্ছে তুমি আমার কেউ নও, তুমি আর পাঁচটা মানুষের মতো। তুমি নিশ্চয় জানো একটা সম্পর্ক টিকে থাকে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর সম্মান বোধ থেকে। একটা সম্পর্কের আয়ু বেড়ে যায় একে অপরকে বোঝা পড়ার মাধ্যমে। জানিনা কি পাপ করেছিলাম যে আল্লাহ আমাকে এতো বড় শাস্তি দিলেন। হ্যাঁ, শাস্তিই বটে। সম্পর্কে প্রতারণার কোন জায়গা থাকতে পারে না। আমি জানি আমাকে তুমি ঠিক ভালোবাসতে পারোনি। যা তুমি ভালবাসা বলছো তা আমার প্রতি নিছক ইনফাচুয়েসন। পুরনো অভ্যেস। কেন? সেটির উত্তর তুমিই ভালো দিতে পারবে। তুমি আজ আমাকে যে অসম্মান করেছ তার কোন তুলনা হয় না। আয়নার সামনে কোনদিন দাঁড়াতে পারবো এ বিশ্বাস আমার মরে গেছে। তোমার প্রতি রাগ বা ঘৃণা কোনটিই নেই আমার। তুমি আমার কাছে এখন যে কোন পুরুষ। তবু আমি তোমার ভালো চাইবো। তুমি ভালো থেকো। অনেক ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিয়ো। শুধু জেন মিতু নামের একটি মেয়ে তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল। তোমাকে খুব খুব চেয়েছিলো। তার দাম সে পায়নি বলে চলে যাচ্ছে। আমাকে খুঁজনা।-মিতু

চিঠিটা পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বুকের মাঝে ধরে, ‘মিতু আমাকে মাফ করে দাও, আমাকে ক্ষমা করে দাও’ বলে বিলাপ করতে লাগলো স্বপন। কেমন পাগলের মতো মিতু মিতু বলে ডাকতে লাগলো সে। কিছুক্ষণ পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনটাকে অসম্ভব ভারি বলে মনে হতে লাগলো স্বপনের। বিস্তীর্ণ আকাশে জীবনের অসীম অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু।      

;

নৃত্য-গীতে জীবন্ত হল রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কালজয়ী আখ্যান



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্ব পরিভ্রমণের সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আর্জেন্টিনায় ল্যাটিন আমেরিকার কালজয়ী সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক ও নারীবাদী লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ঐতিহাসিক সাক্ষাতের শতবর্ষ এ বছর।

১৯২৪ সালে এই দুই কালজয়ী লেখকের সাক্ষাত অক্ষয় হয়ে আছে দু’জনের জীবনস্মৃতিতে, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদান-প্রদানে আর ভিক্টোরিয়াকে রবীন্দ্রনাথের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করার মতো বহু ঘটনাবহুল আখ্যানকে ঘিরে। দু’জনের এই মধুর এ আখ্যানকে ঢাকার সাহিত্য ও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে তুলে ধরলো ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার (আইজিসিসি)।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে ‘TAGORE AND VICTORIA OCAMPO-VIJAYA the victorious: 100 years on’ শীর্ষক নৃত্য-গীতে সেই অবিস্মরণীয় আখ্যানকেই ফুটিয়ে তুললেন যুক্তরাজ্য থেকে আগত বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও শিল্পী ডা. অনন্ত গুপ্ত এবং তাঁর সহশিল্পীরা।

বক্তব্য রাখছেন ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারসেলো সি. চেসা

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার (আইজিসিসি) এর পরিচালক ড. মৃন্ময় চক্রবর্তী আয়োজনের পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে অতিথি ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারসেলো সি. চেসার লাতিন আমেরিকার জনগণের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কথা তুলে ধরে তাকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন রচনকারী মহান লেখক হিসেবে বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনায় অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ রচিত বিভিন্ন কালজয়ী গান নৃত্যসহযোগে পরিবেশন করেন শিল্পীরা। একইসঙ্গে সেইসব গানের প্রেক্ষিত তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯২৪ সালে পেরু সরকারের আমন্ত্রণে দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবর্ষ উদযাপনে যোগ দিতে গিয়ে তেষট্টি বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ সমুদ্রপথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এসময় তিনি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে থামেন এবং ওঠেন সান ইসিদ্রো শহরের এক হোটেলে। সেখানে কবির ভীষণ অনুরাগী আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নারীবাদী লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (যিনি কবির গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদ পড়ে তাঁর কবিতার সঙ্গে কবিরও অনুরাগী হয়ে উঠেন)। রবীন্দ্রনাথের আগমনের খবরে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ছুটে যান কবির কাছে। তিনি কবিকে সুস্থ করার জন্য হোটেল থেকে নদী তীরে বাগানবাড়িতে নিয়ে আসেন।

অনুষ্ঠান মঞ্চে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন আইজিসিসি পরিচালক ড. মৃন্ময় চক্রবর্তী

এরপর এই দুই লেখকের সম্পর্ক গভীর আত্মিক সম্পর্কে পর্যবসিত হয়। কবি তাঁকে বিজয়া বলে সম্বোধন করতেন। কবির বিভিন্ন গানেও ভিক্টোরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। তাকে উৎসর্গ করেন কাব্যগ্রন্থ ‘পূরবী’। রবীন্দ্রনাথকে চিত্রকর্মে প্রাণিত করেন ওকাম্পো। ব্যবস্থা করেন প্রদর্শনীরও। দুই কালজয়ী সাহিত্যিকের মাঝে যেসব পত্র বিনিময় হয় তা সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদে পরিণত হয়েছে।

;

বর্ষবিদায় - বর্ষবরণ

  ‘এসো হে বৈশাখ’



প্রদীপ কুমার দত্ত
মঙ্গল শোভাযাত্রা/ ছবি: নূর এ আলম

মঙ্গল শোভাযাত্রা/ ছবি: নূর এ আলম

  • Font increase
  • Font Decrease

আবারও বছর ঘুরে এসেছে বৈশাখের পয়লা দিন। আমাদের জাতীয় উৎসব নববর্ষ। গত বেশ কয়েক বছর ধরে দেখতে পাই এই উৎসব নিকটবর্তী হলেই মঙ্গল,আনন্দ,আশার প্রতীক দিনটিকে বিতর্কিত করে একে বানচাল করার এক অশুভ প্রচেষ্টা দানা বাঁধানোর উদ্দেশ্যে একশ্রেণির লোক মাঠে নামে। পহেলা বৈশাখ উৎযাপন উপলক্ষে যে উৎসবমুখরতা, তা আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়,আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এই জাতীয় নানা বিষয়ের অবতারণা করে দিনটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।

বিতার্কিকদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এর মধ্যে ধর্মাচরণকেও টেনে আনেন। গত বছর তো আইনগত ব্যবস্থা নেয়াও শুরু হয়েছিল। সেই প্রচেষ্টা অবশ্য হালে পানি পায় নি। এবারেও দন্ত-নখর বের করা শুরু করেছিল আমাদের বাংলার আদি সংস্কৃতির বিরোধীরা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় সরকার ক্ষমতায় থাকায় অংকুরেই সেই চেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়ে থেমে গেছে। অবশ্য সরকার উভয়পক্ষকে খুশি রাখার চেষ্টা করে উৎসব পালনের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করে নির্দেশনা জারি করেছেন। এই রকম আপোষ করে সেই কুৎসিত শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা সরকারের উপযুক্ত মহলের উচিৎ।

উৎসব পালনের কোনও নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। সময়ের সাথে সাথে এবং অঞ্চলভেদে বিভিন্ন অনুষঙ্গ ও ধরন পাল্টায়। সংস্কৃতি ও কৃষ্টি গতিশীল। সমাজে গ্রহণযোগ্য এবং শালীনতার মাত্রা অতিক্রম না করা আনন্দে মেতে ওঠার বিভিন্ন কার্যক্রমের সমষ্টিই উৎসব। আদিকাল থেকেই বৈশাখী মেলা, হালখাতা, চৈত্র সংক্রান্তি, গাজন, নীলপূজা, চড়ক, বিভিন্ন প্রকৃতির লোকজ সংস্কৃতির ও খেলাধুলার আয়োজন,সাধ্যমত নতুন পোষাক ও ভালো খাবারের আয়োজন,অতিথি আপ্যায়ন, ইত্যাদি নিয়ে বাঙ্গালীরা পুরাতন বর্ষ বিদায় ও নববর্ষের আগমনকে একটি উৎসবের রূপ দিয়ে আসছে।

কালক্রমে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাংলা সংস্কৃতির উপর পাক সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন কতৃপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার অংশ হিসাবে ছায়ানট রমনা বটমূলের বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন শুরু করে। সেই আয়োজন আজ ডালপালা বিস্তার করে সারা দেশে এমনকি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাস স্বাক্ষী, মৌলবাদের কালো থাবা সেই আয়োজন থামিয়ে দিতে রমনা বটমূলের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করে নিরীহ সংস্কৃতি প্রেমীদের হত্যা করেও সফল হয়নি।২০০১ সালের সেই হামলার পর নিরীহ বাঙ্গালী গর্জে উঠে ২০০২ সালে আরও অধিক সংখ্যায় রমনায় হাজির হয়েছে। দেশের শহর ও গ্রামের দিকে দিকে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আরও ব্যপ্তি লাভ করেছে।

ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট বিগত শতাব্দীর আশির দশকে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু করে। এই আনন্দ উৎসব পরবর্তীতে মঙ্গল শোভাযাত্রার রূপ ধারণ করে। এই সফল আয়োজন ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। আনন্দ প্রকাশের এই বহিঃপ্রকাশ নিয়ে এক শ্রেণির লোকের প্রচন্ড গাত্রদাহ রয়েছে।ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা এই শোভাযাত্রা বন্ধ করতে চায়।দেশের প্রাগ্রসর প্রগতিশীল নাগরিকরা এই জাতীয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে চায় না। মঙ্গল শোভাযাত্রা, রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান সহ বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের সকল আয়োজন দিন দিন আরও সবল,সতেজ ও পরিশীলিতভাবে অগ্রসর হবেই।

বৈশাখী উৎসবের বিরোধিতাকারী কূপমণ্ডূকদের অনেকের জানাই নেই যে এই উৎসব একই সময়ে দুই একদিন আগে বা পরে বহু জায়গায় বিভিন্ন নামে পালিত হয়। আমাদের নববর্ষ, আসামে বিহু,পাণ্জাবে বৈসাখ,থাইল্যান্ডে সাংক্রান,বার্মায় থিংইয়ান,নেপাল ও সংলগ্ন উত্তর ভারতে বিক্রম সম্ভত,কম্বোডিয়ায় চউল চ্নাম থিমে, সিংহলে আলুথ অনুরুদ্ধা, লাওসে বা পি মেই, কেরালায় ভিষু, তামিলনাড়ুতে পুথান্ডু, এই সব উৎসবই দক্ষিণ /দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রাচীণ কাল থেকে চলে আসা বর্ষবিদায়/বর্ষবরণ। অনেক এলাকায়,এমনকি আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল বা একে অপরের শরীরে পানি ছিটানো এই উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। জল শুচি,পবিত্রতা ও শুভ্রতার প্রতীক। পুরনো বছরের ভুল, অসাফল্য, গ্লাণি সব ধুয়ে নতুন বছর আরও উন্নততর জীবনযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক এই জল ক্রীড়া।

যে সকল অন্ধকারের শক্তি এই বর্ষবিদায়/বর্ষবরণ উৎসবকে হিন্দুয়ানীর সাথে সম্পর্কিত অনুষ্ঠান বলে প্রচার করেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই যে সনাতনী ধর্মাচার ও সামাজিক আচার কিছু এই সময়ে অবশ্যই থাকে। সেগুলো সবই তাঁরা পালন করেন পণ্জিকা অনুযায়ী। সেই পঞ্জিকার সনাতনী ধর্মের পূজা বা উৎসব সমূহ নির্ধারিত হয় বিক্রম সম্ভত বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। সেই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী চন্দ্র/সূর্য/নক্ষত্র এর অবস্থান সমন্বয় করে বিভিন্ন মাস ২৯,৩০,৩১ এমনকি ৩২ দিনেও হয়।

সেই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ বেশির ভাগ বছর ১৫ এপ্রিল তারিখে হয়ে থাকে।লিপ ইয়ার সেই বর্ষপণ্জিতে না থাকার কারনে মোটামুটি চার বছরে একবার এটি ১৪ এপ্রিলে হয়। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের জন্য বহু বছর গবেষণার পর বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি চালু করেছে। সেই বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে প্রায় বছরই বাংলাদেশের সনাতনী সম্প্রদায় নববর্ষের দিন (১৪ এপ্রিল) তাঁদের সামাজিক/ধর্মীয় চৈত্র সংক্রান্তির পালনীয় ক্রিয়াকর্ম নিজেদের ঘরে পালন করেন।কিন্তু পহেলা বৈশাখের নববর্ষের সকল উৎসব ও কর্মকাণ্ডে আপামর দেশবাসীর সাথে সানন্দে অংশগ্রহণ করে থাকেন। একই কথা তাঁদের অন্য সকল পূজা পার্বণের বেলায়ও খাটে।


আমাদের পার্বত্য এলাকায় এই নববর্ষ পালন হয় জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে। এই অঞ্চলে বহু বাঙ্গালী তো আছেনই। কিন্তু বৃহৎ সংখ্যায় থাকেন ১৪টি বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার মানুষ। নৃতাত্ত্বিক,সাংস্কৃতিক,ভাষাগত এবং বিভিন্ন ভাবে তাঁরা সমতলের বাঙ্গালীদের চাইতে তো বটেই, এমনকি একে অপরের চাইতেও আলাদা। এই বিভিন্নতা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এই সৌন্দর্যের নামই বহুল প্রচলিত শব্দবন্ধ ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি বা বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য।

এখানকার বম,খিয়াং,লুসাই,পাঙ্খোয়া ও খুমিরা বৃহত্তর সংখ্যায় খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। তাঁদের বড় উৎসব বড়দিন(ক্রিসমাস)।বকি সকলের জন্য তিন দিন ব্যাপী বর্ষবিদায় /বর্ষবরণ উৎসবই বছরের সেরা পার্বণ। এই সময় সব পাহাড় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে উৎযাপনে।যোগ দেন তাঁদের খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী অন্যান্য জাতিসত্ত্বার প্রতিবেশীরা এবং পাহাড়ে থাকা বাঙ্গালীরা। আমোদে অংশ নিতে দেখা যায় সমতল থেকে এই উপলক্ষে ছুটে আসা পর্যটকদেরও।

তাঁদের উৎসব আনন্দ উৎযাপনের মধ্যে অনেক উপাদান। মঙ্গল শোভাযাত্রার আলোকে র‍্যালী হয় সবাইকে নিয়ে।আয়োজনে থাকে প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। হয় বিচিত্রানুষ্ঠান। খাওয়া দাওয়ার আয়োজন সকলে করেন সাধ্যানুযায়ী উঁচুমানের। তার মধ্যে বিশেষ একটি আয়োজন হল বিভিন্ন তরিতরকারির মিশ্রণে পাঁজন বা লাবড়া। কে কত পদের তরকারি/শাক/ওষধি দিয়ে পাঁজন রেঁধেছেন তার চলে অঘোষিত প্রতিযোগিতা। ক্ষেত্র বিশেষে এই সংখ্যা পণ্চাশ ছাড়িয়ে যায় বলে শুনেছি।


উৎসবমালা শুরু হয় দেবতা ও প্রয়াতঃ পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতে পাহাড়ি ঝরণা বা নদীতে ফুল ও প্রদীপ ভাসিয়ে। নতুন কাপড় পরিধান নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানানোর প্রতীক।মন্দিরে চলে মহামতি বুদ্ধদেবের আরাধনা আগত বছরে সকলের মঙ্গল কামনায়। অনেক বড় মন্দিরে বহু লোক সমাগম হয় প্রথম দিন রাতে।সারা রাত উৎসবমুখর পরিবেশে পিঠা তৈরিতে সবাই হাত লাগায়। প্রত্যুষে সেই পিঠা দেবতাকে নিবেদন করা হয়। প্রথম দিন বহু মন্দিরের বুদ্ধ মূর্তি বাদ্য সহযোগে আনন্দ মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হয় নিকটবর্তী নদীর পানিতে স্নান করানোর জন্য।

পাহাড়ে নববর্ষের সবচাইতে বড় আকর্ষণ সাংগ্রাইং জলক্রীড়ার কথা আগে উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়াও থাকে পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা, কুস্তি,তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা, ইত্যাদি। সৌহার্দ্য বাড়াতে একে অপরের বাড়িতে যাওয়া,দলবদ্ধ ভাবে পান ভোজনের ব্যবস্থা করাও এই তিন দিনের কার্যক্রমের বিশেষ একটি দিক। চাকমারা বিজু, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক,মারমারা সাংগ্রাইং, ম্রো জনগণ চাক্রান নামে এই উৎসবকে অভিহিত করেন। তণ্চঙ্গাদের কাছে বিষু,অসমীয়া সম্প্রদায়ের কাছে বিহু নামে পরিচিতি এই উৎসবের।

নামে কি বা আসে যায়। যে যেই নামেই জানুক এই উৎসব আমাদের লোকজ সংস্কৃতির একটি প্রাণের উৎসব। বাঙ্গালী ক্ষুদ্রতর নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই যার যার পছন্দ ও সাধ্য অনুযায়ী উৎসব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারো যদি পছন্দ না হয় তিনি উৎসব পালনে বিরত থাকতেই পারেন। সেটা তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা। কিন্তু অন্যের উৎযাপনে বাধা সৃষ্টি করার অধিকার কারও নেই।

প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা এই নববর্ষের সাথে সাথে হিজরি সাল;চন্দ্র,সূর্য, নক্ষত্র মন্ডলীর অবস্থান;ফসল তোলা;খাজনা পরিশোধ; ইত্যাদি বিষয়ের সমণ্বয় করে জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ্ সিরাজী ও রাজা টোডরমলের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাদশাহ আকবর চালু করেন আমাদের বর্তমানে চলিত বাংলা বর্ষপঞ্জি। সেই বর্ষপঞ্জির ১৪৩১ সাল সমাগত।

আসুন আমরা ১৪৩০ কে বিদায় জানিয়ে আবাহন করে নেই ১৪৩১কে। দেশবাসী ও বিশ্ববাসী সকলকে জানাই নববর্ষের শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি সকলের। কামনা করি ক্ষুধা মুক্ত,বণ্চনা মুক্ত, প্রতারণা মুক্ত, ব্যথা মুক্ত ও যুদ্ধ মুক্ত পৃথিবী। কল্যাণ হোক সকলের।সুখী ও সমৃদ্ধ হোন সবাই।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

বাংলাদেশের বৈশাখি মেলা

  ‘এসো হে বৈশাখ’



সাইমন জাকারিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ হাজারো মেলার দেশ। এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাম-শহর জুড়ে প্রতি বছর এখনও প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত প্রতিটি মেলা আয়োজনের পিছনে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। সেটি হয় ধর্মীয়, নয় ব্রত-পালা-পার্বন অথবা যে কোনো একটি নির্ধারিত বিষয় বা ঐতিহ্যকে স্মরণ করে।

মেলার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে- নির্ধারিত স্থানে নির্ধারিত তারিখ বা তিথি-লগ্নে এক একটি মেলাতে নর-নারী, শিশু-কিশোর এমনকি আবাল বৃদ্ধরাও সমাগম ও সমাবেশ করে থাকে। উল্লেখ্য, একটি জায়গায় অনেক লোকের সমাবেশ ও সমাগম মানেই সাধারণ বাংলা অর্থে মেলা বলা হয়। তবে, মেলার বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে- ব্যবহার্য পণ্য ও গৃহ সামগ্রীর বিরাট সমাবেশ এবং চিত্তবিনোদনের জন্যে যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ ইত্যাদির আসর।

আধুনিক এই যুগের খেয়ালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাসমূহ এখন অনেকটাই তার চরিত্র বদলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এরমাঝে তাকে নানা উত্থানপতন ও অবক্ষয়ের ধকল সইতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের মেলাগুলো কিছুতেই তার ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে পুরোপুরি যেতে নারাজ। বাংলাদেশের মেলাগুলো এখন আগের সনাতন চেহারা থেকে রূপান্তরিত হয়ে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও অতিমারি কালে বাংলাদেশের বহু ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মতো মেলাগুলোও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। তবে, মানুষের জীবিকার চাহিদা ও মননশীল মনের তাগিদে ঐতিহ্যগত মেলাগুলো আয়োজনে সাময়িক বাধাপ্রাপ্ত হলেও কোভিড-১৯ উত্তরকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যগত মেলাগুলো আবার আগের মতো অনুষ্ঠিত হতে শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, এদেশের প্রচলিত মেলাগুলির প্রকৃতি বহুবিধ ধরনের। এক বাক্যে তার প্রকৃতি অনুসারে শ্রেণী করণ দুঃসাধ্য। আলোচনার সুবিধার্থে এখানে এদেশে প্রচলিত মেলাগুলির একটি সরল শ্রেণীকরণ করা হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশের মেলা প্রায় সর্বাংশই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক, যুগের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে সেই চিত্র পাল্টে গিয়ে এদেশের মেলা বর্তমানে গ্রাম ও শহর উভয় স্থানেই ছড়িয়ে পড়েছে।

চারিত্র্য বিচারে এদেশে প্রচলিত মেলাসমূহকে মোটামুটি সাতটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যেতে পারে, যথা- ১. ধর্মীয় উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলা, ২. কৃষি উৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলা, ৩. ঋতুভিত্তিক মেলা, ৪. সাধু-সন্তের ওরশ উপলক্ষে ফকিরী মেলা ৫. জাতীয় জীবনের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি যেমন, কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ইত্যাদির স্মরণোৎসব উপলক্ষে স্মারক মেলা, ৬. জাতীয় দিবসসমূহ উদ্যাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃৃতিক মেলা, ৭. বাণিজ্যিক সামগ্রী প্রদর্শনী ও বিক্রয় মেলা। উল্লেখ্য, যেসকল মেলার ঐতিহ্য বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রচলিত আছে এই শ্রেণীবিন্যাসে কেবল সেসকল মেলাগুলিকেই বিবেচনায় আনা হয়েছে। তবে, ভিন্ন বিবেচনায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মেলাসমূহের এমন সরলকৃত শ্রেণীবিভাগকে যে কেউ নতুনভাবেও পুনর্বিন্যস্ত করতে পারেন।

এক

উপলক্ষই বাংলাদেশের মেলা উদ্যাপনের স্বাভাবিক উৎস কথা। কিন্তু উপলক্ষ যা-ই থাকুক বাংলাদেশের মেলার একটা সার্বজনীন রূপ কিন্তু আছেই। এদেশের মেলায় অংশগ্রহণে সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিন্নতা কোনো দিনই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বাংলাদেশের সবগুলো মেলাই আর্থ-সাংস্কৃৃতিক বৈশিষ্ট্য ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে মিলন কথাকেই প্রকাশ করে থাকে। সে কারণে এদেশের মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল ধর্ম ও শ্রেণীর মানুষের আনাগোনা ঘটে। অতএব, বাংলাদেশের মেলা মানে মৈত্রী সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র। নারী-পুরুষ, শিশু -কিশোর সকলেই আসে এই মেলাতে।

এখানে সকলের অভিন্ন আকাক্সক্ষা একটিই, আর তা হলো- মেলা বা আড়ৎ দেখা। যার সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে আরেকটি বিষয় জড়িয়ে থাকে, তা হচ্ছে-বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান। মেলাতে গাঁয়ের বধুর ঝোঁক থাকে আলতা-সিঁদুর-স্নো-পাউডার-সাবান আর ঘর-গৃহস্থালির টুকিটাকি সামগ্রীর প্রতি। আরেকটি আকর্ষণ থাকে বিনোদনের প্রতি, আর তা হচ্ছে- যাত্রা, পুতুল নাচ বা সার্কাস প্রদর্শনী দেখা।

তবে, শিশু-কিশোরদের টান থাকে মূলত খেলনার দিকে, যেমন- মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, টিনের জাহাজ। শিশু-কিশোরদের আরেক আকর্ষণের বস্তু হচ্ছে- খই, বাতাসা, রসগোল্লা, চমচম, কদমা, খাগড়াই, মুড়ি-মুড়কি, জিলিপি আর দানাদার। তার সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের খেলনা বাঁশির কথাও বলা যায়। মেলার প্রাঙ্গণে গিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু-কিশোরই বাঁশি কিনে থাকে।

বাংলাদেশের মেলার একটি দিকে থাকে অনিবার্যভাবেই বিনোদনের ব্যবস্থা। যেমন- নাগরদোলা, পুতুলনাচ, ম্যাজিক, সার্কাস, যাত্রা, বাউল-ফকির বা কবি গান, বায়োস্কোপ, লাঠিখেলা, কুস্তি, জারিগান ইত্যাদি। কিছু কিছু মেলাকে মাতিয়ে রাখে সঙ-এর কৌতুক ও মশকরা, তারা স্বাধীনভাবে মেলাতে ঘুরে ঘুরে রঙ্গ করে থাকে। এছাড়া, মেলায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তাড়ি-মদ আর জুয়ার আসর বসে থাকে। নেশায় এমন ডুবে এবং জুয়ার খেলায় সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে অনেকেই। এটা বাংলাদেশের মেলার একটি প্রাত্যহিক চিত্র।

তবে, বাংলাদেশে বর্তমানে চিত্তবিনোদনের ক্ষেত্রেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। এদেশের মেলায় এখন হর-হামেশাই মাইকে বা সাউন্ড বক্সে উচ্চ আওয়াজে গান বাজে। মেলায় পসরা সাজিয়ে বসা দোকানে দোকানে এখন মোবাইল বা ল্যাপটপের মাধ্যমে ইউটিউব থেকে পছন্দমতো গান বেছে নিয়ে তা সাউন্ডবক্সে বাজানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো করা হয়।

সময় বদলের সঙ্গে এদেশের মেলার চিত্র-চরিত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলার রূপ ও মেজাজ অনেকখানিই বদলে গেছে। সনাতন ধর্ম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পার্বণ উপলক্ষে এইদেশে যে সকল মেলার আয়োজন হতো তার মধ্যে অনেক মেলার আয়োজন এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এবং অনেক মেলা এখন বিলুপ্তির পথে, কিছু মেলা এরই মাঝে রূপান্তরিত হয়ে নতুন রূপ গ্রহণ করে বেঁচে আছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামীণ মেলাতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এদেশের গ্রামীণ মেলার স্বাভাবিক ও সাধারণ চিত্র কুটির শিল্পজাত গ্রামীণ পণ্যের বদলে দেশী-বিদেশী চোখ ধাঁধানো বাহারি পণ্যের জৌলূস ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি চ্যানেলে প্রচলিত কাটুনের চরিত্রের মুখ ও নকশা এখন প্লাস্টিক ও বাতাস দিয়ে ফোলানো বেলুনের উপর শহর থেকে গ্রামের মেলায় বাতাসে উড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে জনপ্রিয় কাটুন চরিত্র মটু-পাতলু সারা বাংলাদেশের মেলাগুলোতে প্রত্যক্ষ করা যায়। এগুলোই এখন শিশুদের প্রধান আকর্ষণের বস্তু হয়ে গেছে।

এদেশের বহু নাগরিক প্রয়াসের সঙ্গেই বাংলায় প্রচলিত মেলার লৌকিক ধারা এসে মিশেছে। যেমন- বৈশাখীমেলা, ঈদমেলা, বইমেলা, বিজয় মেলা ইত্যাদি মূলত এদেশে প্রচলিত মেলার লোকধারার প্রেরণা নিয়ে নতুন আঙ্গিক ও মাত্রায় আজ নগরজীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং তা এর মধ্যেই ঐতিহ্যে পরিণতি লাভ করেছে। এমত ধারায় সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বিজয়মালা, যা যথার্থ অর্থেই ‘ঐতিহ্য ও আধুনিক চেতনার.. অপূর্ব সমন্বয়’।

দুই

বাংলা নববর্ষ ১৪৩১-এর শুরু উপলক্ষে এখানে এদেশের বৈশাখি মেলার অতীত ও বর্তমান চালচিত্র সম্পর্কে কিছু কথা উল্লেখ করতে চাই।
বৈশাখ হচ্ছে বাংলা সনের প্রথম মাস। ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল থেকে যখন বাংলা সনের গণনা শুরু হয় তখন বছর সূচনার মাস হিসেবে বৈশাখকেই প্রথমে রাখা হয়। অনেকের ধারণা, সম্ভবত তখন থেকেই নববর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বৈশাখী মেলার সূচনা। বৈশাখী মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এ মেলা ধর্মসম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল বাঙালির মেলা।

বৈশাখি মেলার অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যকে কোনো দিনই কোনো ধর্মের গোঁড়ামী খর্ব করতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এই বৈশাখী মেলারও রয়েছে অন্যান্য মেলার মতো দুটো দিক। একটি বাণিজ্যিক আর একটি সাংস্কৃতিক। বাংলার ব্যবসায়ীরা চৈত্রের শেষ দিন বা ‘চৈত্রসংক্রান্তি’তে এবং বৈশাখের প্রথম দিনে ‘হালখাতা’ করে থাকে। আসলে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’র দিনটা পালন করে বাংলাদেশের মানুষেরা পুরনো বছরকে বিদায় দেওয়ার উৎসব করে থাকে।

এতে মেলা, গান-বাজনা ও খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশে বাংলার একটা বছর বিদায় নেয় এবং নতুন একটা বছরের সূচনা হয়। এই দেশে তাই বৈশাখি মেলার সূচনা হয় বৈশাখের আগে থেকেই মানে চৈত্রের শেষ দিক থেকে। তবে, বৈশাখের প্রথম দিনটিই আসলে উৎসবের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সবাই পরিষ্কার ও সুন্দর জামা-কাপড় পরে। ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। আর ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে ছোটে মেলাতে।

বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি, ময়রা এবং অন্যান্য শিল্পী-কারিগরেরা যে সব সামগ্রী তৈরি করে, বৈশাখী মেলায় তা প্রদর্শন ও বিক্রি করার সুযোগ এনে দেয়। গ্রামীণ কৃষিজাত পণ্য, মিষ্টান্ন দ্রব্য, কুটির শিল্পজাত পণ্য, মাটি ও বেতের তৈরি শিল্পসামগ্রী প্রভৃতি নিয়ে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা দোকান সাজায় এই মেলায়। বাঁশ ও তালপাতার রঙিন বাঁশি, ভেঁপু, একতারা, দোতারা, ডুগডুগি, বেলুন, লাটিম, মার্বেল, ঘুড়ি-লাটাই, চরকি, পুতুল, মাটির ঘোড়া, কাঠের ঘোড়া, কাঠ, কাগজ ও বাঁশের পাখি, মাটির হাড়ি-বাসন, কলস, কাচের চুরি, পুঁতির মালা ইত্যাদি জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে ছোট ছোট দোকানিরা।

এছাড়া আছে কাঠের আসবাবপত্র, খাট, পালঙ্ক, চৌকি, চেয়ার-টেবিল, আলনা, আলমারি, ঢেঁকি, পিঁড়ি, গাড়ির চাকা প্রভৃতি। মেলায় আরও পাওয়া যায় পিতলের হাড়ি, কলস, বাসন-কোসন, লাঙল-জোয়াল, লোহার দা, বটি, কুড়–ল, খন্তা, কাচি, নিড়ানি, গরুর গলার ঘুঙুর। ময়রারা তৈরী করে নানা রকমের মিষ্টান্নদ্রব্যÑ কদমা, জিলিপি, বাতাসা, খাজা, ছাঁচের মিঠাই, খাগড়াই আরো কতো কি। বলে রাখা ভালো এসব মিষ্টান্নদ্রব্য মেলাতে আগেও যেমন ছিল এখনও তেমনি আছে মেলার প্রচলিত রীতিকে ধরে। মুড়ি, মুড়কি, খই, চিড়ে, ছাচ খাজা, মোয়া, নারিকেলের নাড়–, বুট, চানাচুর, বাদাম ভাজা আর দিল্লির লাড্ডু, মটরভাজা, তিলের খাজা আজও মেলা আগত মানুষের প্রিয় খাবার।

বৈশাখি মেলার আরেক আকর্ষণ হচ্ছে তাঁতবস্ত্র। এই মেলাতে তাঁতিরা নিয়ে আসে নক্সীপাড়ের শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি, গামছা, বিছানের চাদর প্রভৃতি। মেলার একপাশে ছেলেমেয়েদের জন্য তৈরি জামা-কাপড়ও পাওয়া যায়। স্যাকরার দোকানে মেয়েরা ভীড় জমায় রূপা, তামা ও পিতলের গহনা কিনতে। বৈশাখী মেলায় গ্রামের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের উন্নত জীবন গঠনের উপযোগী কিছু শিক্ষামূলক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকে।

এরমধ্যে রয়েছেÑ পশু প্রদর্শনী, চরকায় সুতা কাটা, গালার কারিগরি, গাছের চারা বা নার্সারি এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক প্রদর্শনী। গ্রামের মেয়েদের তৈরি নানাপ্রকার পাখা, মাদুর, কাঁথা, শিকে, বেত ও বাঁশের তৈরি হরেক রকম জিনিসপত্র সাজানো হয়। আর থাকে উন্নত ধরনের শাক-সবজি,উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, শস্যের বীজ প্রদর্শনী ও কেনার ব্যবস্থা।

যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মেলার যে রীতি ও ধরন আমাদের দেশে চালু রয়েছে, বৈশাখি মেলা তার সবটাই ধারণ করে আছে। যেমনÑ ১. বহু মানুষের সমাবেশ, ২. গানবাজনাসহ চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা, ৩. গ্রামীণ ব্যবহারিক শিল্পসামগ্রীর প্রদর্শনী ও বিক্রয়, ৪. বিভিন্ন রকমের খেলার আয়োজন।

মেলায় এসে মানুষ আনন্দের উপকরণ খোঁজে। তাই এখানে থাকে আনন্দলাভের নানা আয়োজন। পালাগান, বাউলগান, যাত্রা, কবিগান, গম্ভীরা, আলকাপ, জারিগান, পুতুলনাচ, সার্কাস প্রভৃতি বৈশাখি মেলার প্রধানতম সাংস্কৃতিক দিক। দেশজ খেলাধূলাও যে মানুষকে আনন্দ দিতে পারে তার প্রমাণ মেলে আমাদের বৈশাখি মেলায়। লাঠিখেলা, কুস্তি, হা-ডু-ডু, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড়দৌড়, মোরগের লড়াই, বানেরর খেলা ইত্যাদি দেশজ মজার খেলা সবাইকে মাতিয়ে রাখে।

গ্রামই ছিল একসময় বৈশাখি মেলার প্রধান ক্ষেত্র। সাধারণত পথের তেমাথায়, তিন নদীর মিলনস্থানে, ফাঁকা মাঠে, কিংবা বিশাল অশ্বত্থ বা বট গাছের নিচে এই মেলা বসত। যেখানে নানান দিক থেকে অনেক লোক এসে জড়ো হতে পারত। কালক্রমে মেলার স্থান গ্রাম থেকে শহরে বি¯তৃত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

এখন তাই পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ সারাদেশের সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তবে, রাজধানী ঢাকা থাকে এই উৎসবের কেন্দ্রস্থলে। ছায়ানট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ঢাকায় নববর্ষের উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা (বিসিক) বৈশাখি মেলার আয়োজন করে আসছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত বিসিকের বৈশাখি মেলা দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে। কয়েকটি লক্ষ্য সামনে রেখে বিসিক বৈশাখী মেলার আয়োজন করে, যেমন- ১. কুটির ও হস্তশিল্পজাত পন্যের বাজার সৃষ্টি,

২. গ্রামীণ কারুপণ্য শহুরে মানুষ ও বিদেশীদের সামনে তুলে ধরা, ৩. ক্রেতার চাহিদা সম্বন্ধে উৎপাদকদের অবহিত করা, ৪. কারুশিল্পীদের বিভিন্ন পণ্য, নক্সা ও নমুনার সঙ্গে মানুষের পরিচিতি ঘটানো। এবছর ঈদের ছুটির পর পরই পহেলা বৈশাখ পড়ে গেছে বিধায় বিসিক বৈশাখী মেলা ঈদের পর সুবিধাজনক সময়ে করবে বলে আশা করা যায়।

মনে রাখা দরকার, বৈশাখি মেলা কেবল একদিনেই শেষ হয় না। একদিন, তিনদিন, সাতদিন, পক্ষকাল, পুরো মাস আবার কোথাও-বা দুই মাসব্যাপীও বৈশাখি মেলা চলে। সারা বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই কোনো না কোনো স্থানে বৈশাখি মেলা বসে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, যশোর, বরিশালসহ আরো অনেক জেলায় পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে মাসব্যাপী বৈশাখি মেলা চলতে থাকে।

উত্তরবঙ্গের উল্লেখযোগ্য বৈশাখি মেলার মধ্যে দিনাজপুরের আমবাড়ির মেলা, বগুড়ার গাঙনগরমেলা, যশোরের নিশিনাথ তলার মেলা, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-বিত্তিপাড়ার ঘোড়াপীরের মেলা এবং বরিশালের বাকালের মেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ।

কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দনা গ্রামের বৈশাখি মেলা ছিল বিখ্যাত। এই মেলার আড়ম্বর, জাঁকজমক অন্যান্য মেলার চেয়ে বেশি হতো। এছাড়া, কুমিল্লা জেলার সিদলাই, কান্দুঘর, ময়নামতিসহ বিভিন্ন স্থানে বৈশাখি মেলার ঐতিহ্যের সুখ্যাতি রয়েছে। এ অঞ্চলে বৈশাখি মেলায় বিক্রির জন্য বাঁশের বাঁশি তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাদুঘর, গোকর্ণঘাট, নবীনগর, খড়মপুর প্রভৃতি স্থানে বৈশাখি মেলা বসে।

চট্টগ্রামে বৈশাখী মেলার অন্যতম পর্ব ‘জব্বারের বলীখেলা’। একদিনের এই বলীখেলা উপভোগ করতে সমবেত হয় অসংখ্য মানুষ। চৈত্রের শেষে চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা আয়োজন করে ‘মহামুনির মেলা’। এই মেলা বর্ষবরণেরই অংশ। চট্টগ্রামের আদিবাসী মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরাদের বর্ষবরণ উৎসব পরিচিত সাংগ্রাই, বিঝু বা বিষু নামে। এই উৎসব উপলক্ষেও মেলা জমে ওঠে।

বর্তমানে প্রচলিত বৈশাখিমেলার তালিকা প্রণয়ন ও তার সম্পূর্ণ বিবরণসহ আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্রে নথিভুক্ত করা জরুরি। ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিম-লে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই বৈচিত্র্যময় রূপ তুলে ধরতে পারলে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সময় এদেশে যেমন প্রচুর বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটতো, তেমনি নতুন প্রজন্ম বৈশাখি মেলার ঐতিহ্য সুরক্ষায় সচেতন হতো।

বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতো এবং বৈশাখি মেলায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা উদ্ধুদ্ধ হতেন ঐতিহ্যপ্রেমে। এমনকি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির সাধনা বিস্তার ঘটতো এবং বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তো।

লেখক: বিশিষ্ট লোক-ঐতিহ্য গবেষক, নাট্যকার ও উপ-পরিচালক, সংস্কৃতি উপবিভাগ, বাংলা একাডেমি। 

;