নির্দয়রকম নতুন কবিতার ঘ্রাণ



ফারুক আহমেদ
ছবি: মারুফুল ইসলাম / অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

ছবি: মারুফুল ইসলাম / অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

কবিতা কেমন হওয়া উচিত, এর উত্তরে ছন্দ, মাত্রা, অনুপ্রাস, কবিতার অলঙ্কার এইসব নিয়ামক নিয়ে নানারকম টানাহেঁচড়া করা যেতে পারে। কিন্তু কবিতা কেমন, তার উত্তর পাওয়া যাবে না শেষতক। কবিতা কেমন, এর উত্তর আসলে একটাই, তা হলো কবিতার ইতিহাস। বাংলা কবিতার আধার ও আধেয় অনুসন্ধান করতে গেলে এর ইতিহাস, মানে ধারাবাহিক কবিতাপাঠই আমাদের কোনো একটা সিন্ধান্তে পৌঁছে দিতে পারে। এর বাইরে আর কিছু না, না ছন্দ, না অলংকার। এগুলো সবই একটি বৃহৎবৃক্ষের ডালপালা, সৌন্দর্যস্বরূপ।

এখন যদি বাংলা কবিতার ইতিহাসের কথা বলতে হয়, তবে মোটাদাগে কিছু সময় এসে হাজির হবে; সে সময় ধরে কোনো কোনো কবির নামও। বাংলা কবিতার হাজার বছরের ইতিহাসে আমরা না গিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার উদ্গাতা মাইকেলের নাম স্মরণে নিয়ে, সমসাময়িক ধারার সুত্রপাতকারীগণের স্মরণে নেওয়া যেতে পারে। এই সূত্রপাতকারী পঞ্চপাণ্ডবদের শীর্ষজন জীবনানন্দের নাম স্মরণ করে আরেকটু যদি এগুনো যায়, তাহলে চলে আসে গত শতকের পঞ্চাশ দশক। পঞ্চাশ বা ষাট—এই দুই দশক স্বাধীনতাত্তোর বাংলা কবিতার পথঘাট ঠিক করে দিয়েছে। সেই পথঘাট ধরেই আমরা হেঁটে হেঁটে মুগ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াই। এর মধ্যে হয়তো ভেতরে ভেতরে নতুন পথ তৈরি হয়ে গেছে, অথবা যায়নি। স্বাধীনতাত্তোর কবিতায় প্রবল পরাক্রমে আছেন আল মাহমুদ। পরবর্তী সময়ে আরো অনেকেই আছেন। আবিদ আজাদ নামে এক কবির কবিতা পড়ে, আমরা কিছুদূর পথ হাঁটি বা তারও পরে রিফাত চৌধুরী, সে অন্য একটা ধরন বা কামরুজ্জামান কামু, দিন দিন তীব্র হয়ে ওঠা এক কবি। এমন তো আরো আছেন। তাঁর মধ্যে এমন অনেকে বোধহয় আছেন যাঁদের আমরা জানি না। যেমন জানতাম না, কবি মারুফুল ইসলামকে। মারুফ ভাইকে প্রথম জানলাম, সাবের (মঈনুল আহসান সাবের) ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে। কেননা সাবের ভাইয়ের একটা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে, তাঁর সঙ্গে পরিচয়। এরপর দুয়েকটা কবিতা পড়ে মনে হলো, উনি শুধু সাবের ভাইয়ের বন্ধু নন, উনি একজন কবিও।

তো মারুফুল ইসলাম কেমন কবি—ফাস্টক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস না গৌণ কবি। উনি অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী পেয়েছেন, বিদ্যার দৌড়ে উনি একজন প্রথম শ্রেণীর বিদ্যান। তো কবিতায়? এর উত্তর নাই। কবির ফাস্ট, সেকেন্ড নাই। আছে মুখ্য এবং গৌণ। এই মুখ্য এবং গৌণতার নির্ধারক কে? অবশ্যই পাঠক। না পাঠক না, অবশ্যই অন্য আরেকজন কবি। একজন প্রকৃত কবি (নকল, গোষ্ঠীকানা নয়) আরেকজন প্রকৃত কবিকে সাধারণত শনাক্ত করতে পারে, অন্য কেউ না। আর আমি পাঠক বলব, মারুফুল ইসলাম একজন নির্দয় কবি, একজন উপমা-চিত্রকল্পের ব্যবসা-বাণিজ্য করা কবি। একই সঙ্গে কবিতার চিরকালের আধেয়- ছন্দ, অনুপ্রাণ এইসব বিরাজমান তার কবিতায়, তিনি তাতে সিন্ধহস্ত। সবচেয়ে বড় কথা, মূল কথা, মারুফুল ইসলাম নতুন কবিতার কবি। যাহোক এই যে একজন নির্দয় কবি, এটাই টেনেছে তাঁর কবিতার প্রতি। শব্দ ব্যবহারে খুব বেশিরকম সচেতন এই কবির কবিতা পড়ে প্রথমে আমার ভেতর একরকম ক্ষোভ জন্মায়, মনে হয়, কী অসুবিধা ছিল, দুটা শব্দ বেশি ব্যবহার করলে? কী অসুবিধা একটু গীতিময়তা থাকলে। প্রকৃতই গীতময় যদি আশা করি, সে গোপন, আবিষ্কার করে নিতে হবে। যখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার পড়ি, তখন কিন্তু একটু একটু করে আবিষ্কার করি ভেতরের আনন্দ, ভেতরের ঐশ্বর্য। বহিরাঙ্গে মারুফুল ইসলামের কবিতার শরীর জুড়ে টান টান শব্দই মুখ্য হয়ে আছে। এটা একই সঙ্গে আমার ভেতর ক্ষোভের জন্ম দেন, আবার টেনে নেয় তাঁর কবিতায়। এরকম কবিতা আসলে অনেকদিন পাই না।

অনেক কবির একইরকম কবিতা পড়ে, এসব কবিতা পড়লে মনে হয়, ভেতরে যে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে, তা আসলে নতুন একটা দিকে টেনে নেওয়ারই উপলক্ষ। জীবনানন্দের অজস্র চিত্রকল্প বা আল মাহমুদের কবিতায় বিরোধাভাস যেমন টেনে নেয়, মারুফুল ইসলামের কবিতাও টানে শব্দ ব্যবহারের কৃপণতা এবং বহুবিচিত্র চিত্রকল্পের কারণে। ধরা যাক, তাঁর ‘আয়নাশহর’ কাব্যগ্রন্থের কথা। পৃথিবীর নানা শহর, যেসব শহর উনি ঘুরে বেরিয়েছেন, সেসব শহর ঘিরে এই কাব্যগ্রন্থ। এতে শহর ঘিরে তাঁর যে অনুভূতি সেটুকুতে আবন্ধ থাকেনি। দেখা যায় কবিতার দুটা লাইন ধরে চলে এসেছে সে শহরের ইতিহাস, অথবা শহরটির চরিত্র, বেদনা, আনন্দ—এইসব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে কবিতার শেষে হয়তো। একইসঙ্গে কবিরসঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া, বা শহরের সঙ্গে কোনো একটা সময় কবি যে ভাগাভাগি করেছে, সেটুকু চলে এসেছে এসব কবিতায়। দুটা উদাহরণ দিই, প্রথমত, ‘মাদ্রিদ’ শিরোনামে কবিতার চারটি লাইন—“ধাতব ঝংকারে মূর্তিমতী স্পেনীয় কামনা/তার কণ্ঠে তার ওষ্ঠে তার স্তনে মাদকতার মোহর/তার যোনি মেলে ধরে যামিনীর তৃতীয় প্রহর/তার যোনিলোমে লেগে থাকে আরবীয় ভোগের বিলাস।” কখনো যদি মাদ্রিত যাওয়া হয়, তাহলে আগে থেকে জানা থাকলো মাদ্রিক কখন তার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করে। আরেকটি কবিতা, যে শহর ধরে রেখেছে কবির শৈশবের সময়—“প্রথম সিগারেট তুমি, ফেনী/প্রথম চুমু/প্রথম অনুভব প্রেম প্রেম/প্রথম চোখ মেলে দেখতে চাওয়া বয়সের গোপন কুঠুরি”... ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব তাঁর কবিতার কর্মের খণ্ডিত অংশ। এসব কোনোমতেই তাঁর কবিতার প্রতিনিধিত্বও করে না; তাঁর একাধিক কবিতা পাঠই অনুভব করা সম্ভব কবিতার স্বাদ।

আরেকটি ব্যাপার, এই কবির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। একটি কবিতায় অনেকগুলো পথ থাকে। ফলে পাঠক অনেকসময় বিভ্রান্ত হতে পারে, কবিতার মূল কোথায়। অন্য সমসাময়িক কবি থেকে আল মাহমুদকে যে জায়গায় আলাদা করা যায়, তা হলো দুই বা তারো বেশি পথ/সুর তিনি একই কবিতায় যুক্ত করেছেন। একভাবে হয়তো শুরু হলো, অন্য প্যারায় অন্য এক দৃশ্য, সেসব ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য শেষে গিয়ে মিলে যাচ্ছে। অথবা যাচ্ছে না, কিন্তু শেষে একটি দারুণ অনুভূতি বা ঘটনার দ্যোতনা পাওয়া যায়। এই ব্যাপারটা মারুফুল ইসলামের কবিতা মুহূর্মুহ আছে। এত যে, মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হতে হয়, এত পথ এতটুকু জায়গায়, মাত্র কয়েকটি লাইনে ঢুকে গেলে কবিতার পাঠক বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক উৎসমুখ বা পরিসমাপ্তি কোথায় ঘটল। আমাদের কবিতার পাঠক ততদূর যাবে সেই জায়গা এখনো তৈরি হয় নাই। অথবা আমরা সেরকম অনেক কবি এখনো পাই নাই যা হোক, এসব বাদ দিয়ে যদি একটি অভাবনীয় চিত্রকল্প পাই, তবে থামতে হয়। সেটা এই কবির কবিতায় দেখতে পাওয়া যায়। আর নতুন কবিতা, নির্দয়রকম নতুন কবিতার ঘ্রাণ তাঁর কবিতা পাঠে পাই। পাঠক হিসেবে আমি এরকম কবিতাপাঠেই আগ্রহ বোধ করি।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;