নির্দয়রকম নতুন কবিতার ঘ্রাণ

ফারুক আহমেদ
ছবি: মারুফুল ইসলাম / অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

ছবি: মারুফুল ইসলাম / অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

কবিতা কেমন হওয়া উচিত, এর উত্তরে ছন্দ, মাত্রা, অনুপ্রাস, কবিতার অলঙ্কার এইসব নিয়ামক নিয়ে নানারকম টানাহেঁচড়া করা যেতে পারে। কিন্তু কবিতা কেমন, তার উত্তর পাওয়া যাবে না শেষতক। কবিতা কেমন, এর উত্তর আসলে একটাই, তা হলো কবিতার ইতিহাস। বাংলা কবিতার আধার ও আধেয় অনুসন্ধান করতে গেলে এর ইতিহাস, মানে ধারাবাহিক কবিতাপাঠই আমাদের কোনো একটা সিন্ধান্তে পৌঁছে দিতে পারে। এর বাইরে আর কিছু না, না ছন্দ, না অলংকার। এগুলো সবই একটি বৃহৎবৃক্ষের ডালপালা, সৌন্দর্যস্বরূপ।

এখন যদি বাংলা কবিতার ইতিহাসের কথা বলতে হয়, তবে মোটাদাগে কিছু সময় এসে হাজির হবে; সে সময় ধরে কোনো কোনো কবির নামও। বাংলা কবিতার হাজার বছরের ইতিহাসে আমরা না গিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার উদ্গাতা মাইকেলের নাম স্মরণে নিয়ে, সমসাময়িক ধারার সুত্রপাতকারীগণের স্মরণে নেওয়া যেতে পারে। এই সূত্রপাতকারী পঞ্চপাণ্ডবদের শীর্ষজন জীবনানন্দের নাম স্মরণ করে আরেকটু যদি এগুনো যায়, তাহলে চলে আসে গত শতকের পঞ্চাশ দশক। পঞ্চাশ বা ষাট—এই দুই দশক স্বাধীনতাত্তোর বাংলা কবিতার পথঘাট ঠিক করে দিয়েছে। সেই পথঘাট ধরেই আমরা হেঁটে হেঁটে মুগ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াই। এর মধ্যে হয়তো ভেতরে ভেতরে নতুন পথ তৈরি হয়ে গেছে, অথবা যায়নি। স্বাধীনতাত্তোর কবিতায় প্রবল পরাক্রমে আছেন আল মাহমুদ। পরবর্তী সময়ে আরো অনেকেই আছেন। আবিদ আজাদ নামে এক কবির কবিতা পড়ে, আমরা কিছুদূর পথ হাঁটি বা তারও পরে রিফাত চৌধুরী, সে অন্য একটা ধরন বা কামরুজ্জামান কামু, দিন দিন তীব্র হয়ে ওঠা এক কবি। এমন তো আরো আছেন। তাঁর মধ্যে এমন অনেকে বোধহয় আছেন যাঁদের আমরা জানি না। যেমন জানতাম না, কবি মারুফুল ইসলামকে। মারুফ ভাইকে প্রথম জানলাম, সাবের (মঈনুল আহসান সাবের) ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে। কেননা সাবের ভাইয়ের একটা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে, তাঁর সঙ্গে পরিচয়। এরপর দুয়েকটা কবিতা পড়ে মনে হলো, উনি শুধু সাবের ভাইয়ের বন্ধু নন, উনি একজন কবিও।

তো মারুফুল ইসলাম কেমন কবি—ফাস্টক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস না গৌণ কবি। উনি অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী পেয়েছেন, বিদ্যার দৌড়ে উনি একজন প্রথম শ্রেণীর বিদ্যান। তো কবিতায়? এর উত্তর নাই। কবির ফাস্ট, সেকেন্ড নাই। আছে মুখ্য এবং গৌণ। এই মুখ্য এবং গৌণতার নির্ধারক কে? অবশ্যই পাঠক। না পাঠক না, অবশ্যই অন্য আরেকজন কবি। একজন প্রকৃত কবি (নকল, গোষ্ঠীকানা নয়) আরেকজন প্রকৃত কবিকে সাধারণত শনাক্ত করতে পারে, অন্য কেউ না। আর আমি পাঠক বলব, মারুফুল ইসলাম একজন নির্দয় কবি, একজন উপমা-চিত্রকল্পের ব্যবসা-বাণিজ্য করা কবি। একই সঙ্গে কবিতার চিরকালের আধেয়- ছন্দ, অনুপ্রাণ এইসব বিরাজমান তার কবিতায়, তিনি তাতে সিন্ধহস্ত। সবচেয়ে বড় কথা, মূল কথা, মারুফুল ইসলাম নতুন কবিতার কবি। যাহোক এই যে একজন নির্দয় কবি, এটাই টেনেছে তাঁর কবিতার প্রতি। শব্দ ব্যবহারে খুব বেশিরকম সচেতন এই কবির কবিতা পড়ে প্রথমে আমার ভেতর একরকম ক্ষোভ জন্মায়, মনে হয়, কী অসুবিধা ছিল, দুটা শব্দ বেশি ব্যবহার করলে? কী অসুবিধা একটু গীতিময়তা থাকলে। প্রকৃতই গীতময় যদি আশা করি, সে গোপন, আবিষ্কার করে নিতে হবে। যখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার পড়ি, তখন কিন্তু একটু একটু করে আবিষ্কার করি ভেতরের আনন্দ, ভেতরের ঐশ্বর্য। বহিরাঙ্গে মারুফুল ইসলামের কবিতার শরীর জুড়ে টান টান শব্দই মুখ্য হয়ে আছে। এটা একই সঙ্গে আমার ভেতর ক্ষোভের জন্ম দেন, আবার টেনে নেয় তাঁর কবিতায়। এরকম কবিতা আসলে অনেকদিন পাই না।

অনেক কবির একইরকম কবিতা পড়ে, এসব কবিতা পড়লে মনে হয়, ভেতরে যে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে, তা আসলে নতুন একটা দিকে টেনে নেওয়ারই উপলক্ষ। জীবনানন্দের অজস্র চিত্রকল্প বা আল মাহমুদের কবিতায় বিরোধাভাস যেমন টেনে নেয়, মারুফুল ইসলামের কবিতাও টানে শব্দ ব্যবহারের কৃপণতা এবং বহুবিচিত্র চিত্রকল্পের কারণে। ধরা যাক, তাঁর ‘আয়নাশহর’ কাব্যগ্রন্থের কথা। পৃথিবীর নানা শহর, যেসব শহর উনি ঘুরে বেরিয়েছেন, সেসব শহর ঘিরে এই কাব্যগ্রন্থ। এতে শহর ঘিরে তাঁর যে অনুভূতি সেটুকুতে আবন্ধ থাকেনি। দেখা যায় কবিতার দুটা লাইন ধরে চলে এসেছে সে শহরের ইতিহাস, অথবা শহরটির চরিত্র, বেদনা, আনন্দ—এইসব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে কবিতার শেষে হয়তো। একইসঙ্গে কবিরসঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া, বা শহরের সঙ্গে কোনো একটা সময় কবি যে ভাগাভাগি করেছে, সেটুকু চলে এসেছে এসব কবিতায়। দুটা উদাহরণ দিই, প্রথমত, ‘মাদ্রিদ’ শিরোনামে কবিতার চারটি লাইন—“ধাতব ঝংকারে মূর্তিমতী স্পেনীয় কামনা/তার কণ্ঠে তার ওষ্ঠে তার স্তনে মাদকতার মোহর/তার যোনি মেলে ধরে যামিনীর তৃতীয় প্রহর/তার যোনিলোমে লেগে থাকে আরবীয় ভোগের বিলাস।” কখনো যদি মাদ্রিত যাওয়া হয়, তাহলে আগে থেকে জানা থাকলো মাদ্রিক কখন তার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করে। আরেকটি কবিতা, যে শহর ধরে রেখেছে কবির শৈশবের সময়—“প্রথম সিগারেট তুমি, ফেনী/প্রথম চুমু/প্রথম অনুভব প্রেম প্রেম/প্রথম চোখ মেলে দেখতে চাওয়া বয়সের গোপন কুঠুরি”... ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব তাঁর কবিতার কর্মের খণ্ডিত অংশ। এসব কোনোমতেই তাঁর কবিতার প্রতিনিধিত্বও করে না; তাঁর একাধিক কবিতা পাঠই অনুভব করা সম্ভব কবিতার স্বাদ।

আরেকটি ব্যাপার, এই কবির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। একটি কবিতায় অনেকগুলো পথ থাকে। ফলে পাঠক অনেকসময় বিভ্রান্ত হতে পারে, কবিতার মূল কোথায়। অন্য সমসাময়িক কবি থেকে আল মাহমুদকে যে জায়গায় আলাদা করা যায়, তা হলো দুই বা তারো বেশি পথ/সুর তিনি একই কবিতায় যুক্ত করেছেন। একভাবে হয়তো শুরু হলো, অন্য প্যারায় অন্য এক দৃশ্য, সেসব ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য শেষে গিয়ে মিলে যাচ্ছে। অথবা যাচ্ছে না, কিন্তু শেষে একটি দারুণ অনুভূতি বা ঘটনার দ্যোতনা পাওয়া যায়। এই ব্যাপারটা মারুফুল ইসলামের কবিতা মুহূর্মুহ আছে। এত যে, মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হতে হয়, এত পথ এতটুকু জায়গায়, মাত্র কয়েকটি লাইনে ঢুকে গেলে কবিতার পাঠক বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক উৎসমুখ বা পরিসমাপ্তি কোথায় ঘটল। আমাদের কবিতার পাঠক ততদূর যাবে সেই জায়গা এখনো তৈরি হয় নাই। অথবা আমরা সেরকম অনেক কবি এখনো পাই নাই যা হোক, এসব বাদ দিয়ে যদি একটি অভাবনীয় চিত্রকল্প পাই, তবে থামতে হয়। সেটা এই কবির কবিতায় দেখতে পাওয়া যায়। আর নতুন কবিতা, নির্দয়রকম নতুন কবিতার ঘ্রাণ তাঁর কবিতা পাঠে পাই। পাঠক হিসেবে আমি এরকম কবিতাপাঠেই আগ্রহ বোধ করি।

আপনার মতামত লিখুন :