ভাদ্রপদী



মাহমুদ মেনন
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

এমন ঠ্যালা দরজা নাটক সিনেমায় অনেকবার দেখেছে সে। থানার ভিতরে ধর্ষণের দৃশ্যেই বেশি দেখেছে। থানার বড়কর্তা ধরে আনা মেয়েটিকে নিয়ে ভেতরে যান। এর কিছুক্ষণ পর দরজাটি ঠেলে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বাইরে বের হয়ে আসেন। তখন তার চোখে মুখে থাকে লালসা মেটানোর অভিব্যক্তি। এরকম দরজার কপাটদুটো একটার সাথে অন্যটা লটকে যায় না। ধাক্কায় ক্যাচ শব্দে খোলে বটে, কিন্তু পরক্ষণেই দুটি কপাট নিজে নিজেই একটা অন্যটার সমান হয়ে থেমে থাকে। ওপাশটাকে আড়াল করে দেয়। তেমনই আড়াল করা ওপাশটা সামনে রেখে বসে আছে ভাদু।

সাহেদ তাকে নিয়ে এসেছে এখানে। লিফট থেকে নেমে লম্বা একটা করিডোর। সাহেদের বাহুবন্দি সে। একটি ভারী পাল্লার দরজার সামনে থামে তারা। পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে দরজায় কার্ড পাঞ্চ করে সাহেদ। ভেতরে ঢুকেই একটি বড় কামরা। যার চারিদিকটা ঘিরে ভারী সোফা বসানো। সোফার বটলগ্রিন রঙটা চোখ জুড়িয়ে দেয়। তারই একটিতে তাকে বসিয়ে সাহেদ বললো,‘দু-দণ্ড বসো। আমি জাস্ট একটা কাজ সেরে ফিরছি।’ বলেই ঠ্যালা দরজাটি ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। খানিকটা ঝাপটা-ঝাপটি করে তার সামনে ওপাশটাকে আড়াল করে থেমে থাকল দুটি কপাট।

দু-দণ্ড বলে সাহেদ এরই মধ্যে ঠিক ৪১ মিনিট কাটিয়ে দিয়েছে। তার ফেরার নাম নেই। এই সময়ে দরজাটি ঠেলে আরো একজন ভেতরে ঢুকেছে, দুই জন বের হয়ে গেছে। এদের সকলেরই পরিপাটি সাজ। ভেতরে যে লোকটি গেল তার চেহারাটি খেয়াল করতে পারেনি, তবে পেছন থেকে দেখে বেশভুশায় চোস্ত মনে হলো। দরজা ঠেলে ওপাশে ঢুকে যখন যাচ্ছিলেন, তখনই চোখে পড়ল শার্টের ওপর সাসপেন্ডার পরেছে লোকটি। তবে এদের কাউকে নিয়ে আজ ভাবতে চায় না সে। বরং ঘুরেফিরে দরজাটিই তার ভাবনার কেন্দ্রে এসে ঠেকছে। আচ্ছা, এমন দরজার নাম কী? এই দরজাও ঠেললে খোলে। তবে অন্য দরজাগুলো থেকে আলাদা। অন্য দরজা খোলার পর আবার ঠেলে কিংবা চাপ দিয়ে লাগাতে হয়। এই দরজাটিতে তা লাগে না। কী একটা ব্যাপার—দু হাতের ধাক্কায় খুলে ফেলো। ঢুকে পড়ো। আর লাগানোর বালাই নেই। স্প্রিংয়ের কব্জাই টেনে নিয়ে যাবে। বার কয়েক এদিক ওদিক করে দুটি কপাট থেমে যাবে নিজে নিজে। এরপর অন্য কেউ এসে একইরকম ধাক্কা দিয়ে খুলবে, অবলীলায় ঢুকে যাবে কিংবা বের হয়ে আসবে।

ভাদু। যার আসল নাম ভাদ্রপদী। তার এবার মনে হতে লাগল—তার নিজের জীবনটা এই দরজাটারই মতো। খুব সহজেই খুলে ফেলা যায়। চাইলেই চিচিং-ফাঁক। অসংখ্যবার খোলা হয় সে দরজা। কিন্তু কেউ আর সে দরজা আটকে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। মনে মনে ভাবে দরজাটির একটা নাম সে দিতে পারে। কী হবে সে নাম—সহজ দরজা।

নাম ভাবতে ভাবতে কেটে গেল আরো ১৯মিনিট। কব্জি উল্টে সময় দেখে নিল ঘড়িতে। এখন ঠিক ৪টা ২৭ বাজে। তার দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়িটি সময় দেয় ঠিক ঠিক। সময়টা তার মেপেও চলতে হয়। তার মতো মেয়েদের জন্য সময় মেপে চলাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। সাহেদ যখন ‘দু-দণ্ড বসো’ বলে ভেতরে চলে গেল, তখন সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিল ৩টা ২৭। এবার একটু উদ্বিগ্ন বোধ করছে। কিছুটা মেজাজ খারাপও। রাতে ক্লায়েন্ট আছে। সূর্য ডোবার পর তার কাজ বাড়ে। সন্ধ্যা অবধি সাহেদের সাথে কাটাবে এই প্ল্যানটাই পাকা ছিল। একান্ত কিছুটা সময় কাটাবে বলেও ঠিক করে রেখেছে সে। ভেবে রেখেছে, বিকেলের দিকটা সাহেদের। ওকে নিয়ে যাবে নিজের ছোট্ট ভাড়া করা ফ্লাটে। নিজেকে উজার করে দিয়ে ভালোবাসবে ভালোমানুষ ছেলেটিরে। আহা! কী একটা শান্ত চেহারা! বুদ্ধিদীপ্তও! ভাবে সে।

সাহেদের সাথে যেদিন প্রথম দেখা হয় সেদিনটার কথা মনে করে ফিক করে হেসে ফেলে ভাদু। ভাদু মানে ভাদ্রপদী। তবে তাকে ভাদু নামে আর কেউ ডাকে না। সে নিজেই শুধু কখনো কখনো নিজেকে ভাদু ডাকে। বাবা যতদিন বেঁচেছিলেন, একমাত্র বাবাই তাকে ভাদু ডাকতেন। মা ডাকতেন সোনাটা। বাবার দেওয়া নামটি মায়ের পছন্দ ছিল না। মা আধুনিকা। মেয়ের একটা আধুনিক নাম চাই। ফলে ভরা ভাদরের পূর্ণিমা তিথিতে জন্ম নেওয়ায় বাবার দেওয়া ভাদ্রপদী নামটি মায়ের দেওয়া সোনাটায় চাপা পড়তে সময় নেয়নি। ফলে সোনাটাই তার নাম। এই নামেই পরিচয়। সোনাটা ইসলাম।

সেই সোনাটা নাম ধরেই সাহেদের সাথে তার পরিচয়। সেটি ছিল থার্টিফার্স্ট নাইট। নাইটক্লাবে পার্টিটা কেবল জমে উঠেছে। সোনাটা-লারা-ডেইজিরা পুরো ফ্লোর মাতিয়ে তুলেছে উদ্দাম নৃত্যানন্দে। স্বল্পবসনা ত্রয়ী বেশ যৌনাবেদন ছড়াচ্ছিল। এমন সময়েই কথা উঠল ফ্লোরে নামের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে পুরুষ-নারী নাচবে। যে যারটা মিলিয়ে নিল। নাচের ফ্লোরে ঢেউ তুলল। কিন্তু সোনাটা তার নামের আদ্যাক্ষরের সাথে মিল হয় এমন কাউকে পাচ্ছিল না। বেশ খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে বারের এককোনে নিজেকে আড়াল করে বসেছিল যে ছেলেটি, তার কাছে নাম জানতে চাইলে জানা গেল সে সাহেদ। ব্যাস আর যায় কোথা হৈহৈ করে কয়েকজন ছুটে গেল। আর অনেকটা চ্যাংদোলা করে তাকে নিয়ে এলো ড্যান্সফ্লোরে। সোনাটার তর সইছিল না। ছেলেটিকে বাহুতে জড়াল। কিন্তু তার মুখ ততক্ষণে পাংশু হয়ে আছে। আর প্রচণ্ড ঘেমে গেছে। একটু পরেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। ব্যাস পুরো পার্টি পণ্ড। হৈচৈ পড়ে গেল। একপাশে সরিয়ে নেওয়া হলো সাহেদকে। চোখে মুখে পানি ছেটানো হলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পার্টি তো আর থেমে থাকবে না। সুতরাং তাকে পাশের একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। ব্যাস সবাই আবার ডান্সফ্লোরে উদ্দাম নৃত্যে মেতেছে। সোনাটা দেখল তার নাচের পার্টনার নেই। সে আস্তে করে পাশের রুমটিতে ঢুকে পড়ল। দেখল সাহেদ নামের ছেলেটি তখনও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার খুব মায়া হলো। সোনাটার আড়ালে যে ভাদ্রপদী, তারই আড়ালে যে মায়াভরা মন, এই মায়া সেজন্য কি? নাকি স্রেফ নাচের ফ্লোরে সে নেই। এ নিয়ে কথা হবে। এখানে তারা এসেছে নাচের বিনিময়ে পয়সা পাবে। তো, সে যদি না নাচে! আর ওরা যদি তাকে পয়সা না দেয়! সুতরাং এই ছেলেকে জাগাতেই হবে! এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কাণ্ড করে বসল সে। কাজটি সে কেন করেছিল আজও ভেবে পায় না। প্রথম দিকে এমন একটা কাজ করার জন্য নিজেকে ধিক্কারও দিত সে। বিশেষ করে যখন তার মধ্য থেকে সোনাটা বিদায় নেয়, ভাদু দখল করে নেয় তার পুরোটা, তখন।

এই সোনাটা আর ভাদুর লড়াইয়ে কখনো সোনাটা জেতে, কখনো ভাদু। সেরাতে সোনাটার জয় হয়েছিল বলেই সে কাণ্ডটি করে, তা নয়—মনের গভীর থেকে আজও উপলব্ধি করে—ভাদুই তাকে দিয়ে কাজটি করিয়েছে। আর সে কারণে যখন সে একা হতো, শুধুই ভাদু হয়ে থাকত, মরমে মরে যেত। এমন কাজ সে তো সোনাটার পক্ষেই করা সম্ভব। ভাদু হয়ে সে কী করে কাজটা করল ইত্যাদি।

এখন অবশ্য মাসদুয়েক ধরে বিষয়টি নিয়ে যখন ভাবে, এক ধরনের রোমান্সই বোধ করে। এইক্ষণে এই ঠ্যালা দরজার এপাশে বসে, ওপাশে সাহেদকে আড়াল করে রেখে ভাদু ভাবে কী শুভক্ষণে কাজটা সে করে ফেলেছিল। যা তার জীবনকে এক সুন্দরের পথই হয়তো দেখিয়েছে। কিংবা দেখাতে চলেছে। জীবনটাকে নিয়ে তার নতুন একটা ভাবনাও তৈরি হয়েছে...। থার্টিফার্স্টের সেই রাতে নাচের পেমেন্টটা সে পায়নি। সে নিয়ে এতদিন ক্ষেদ কম ছিল না সোনাটার। এক রাতের ডান্সে হাজার পাঁচেক টাকা পেত, তার পুরোটাই গচ্চা।
ভাদুর মনে পড়ছে, চুমুটাতে কাজ হয়েছিল। এক চুমুতেই জ্ঞান ফিরল ছেলেটির। চোখদুটি বড় বড় করে তাকিয়ে দেখল এক অপ্সরা তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। তার রুজমাখা গোলাপী গাল। মাসকারায় আঁকা দুটি বড় চোখ, কড়া লিপস্টিকে রাঙা দুটি ঠোঁট। সে লিপস্টিট কিছুটা ঠোঁটে লেপ্টে আছে মেয়েটির নিজেরই ঠোঁটে। তাতে তাকে আরো অপরূপ লাগছে। এবার নিজের অজান্তেই সাহেদ নিজের হাতের উল্টো দিক দিয়ে নিজের ঠোঁটের ওপর ঘষল। আর চোখের সামনে হাত এনে দেখল কড়া লাল রঙ তার কব্জির কাছে লেগে আছে। সাদা শার্টের হাতায়ও লেগেছে কিছুটা। তখনও ঘোর কাটেনি সাহেদের। তার নাসিকারন্ধ্র তখন ভরে আছে সুগন্ধির তীব্রতায়। তার ঘোরলাগা চোখদুটি গোল করে এদিক ওদিক তাকাল। স্বল্পবসনা সোনাটা তখনও সাহেদের বুকের ওপর ঝুঁকে। সুডোল বক্ষযুগলে চোখ পড়তেই আরেক দফা জ্ঞান হারাল সে।

সোনাটা বুঝে গেল ঘটনাটি কী ঘটেছে। সে দ্রুত নিজেকে তুলে নিল সাহেদের গায়ের ওপর থেকে। সে আরো বুঝে নিল এই রাতে তার আর নাচা হবে না। পয়সাও হয়তো মিলবে না। রুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত চেঞ্জ রুমে গিয়ে নিজের কাপড়গুলো পরে ফেলল। আবার ছুটে এলো সাহেদের রুমে। এবার দেখতে পেল সাহেদের চোখ খোলা। তবে চাহুনিতে তখনও ঘোর। কিছুক্ষণ পর সাদা শার্ট নেভিব্লু প্যান্ট পরা ভীষণ স্মার্ট ছেলেটিকে বগলদাবা করে ক্লাব থেকে বাইরে চলে গেল কালো রঙের হিজাব পরা একটি মেয়ে। যার নাম সোনাটা। যার অপর নাম ভাদ্রপদী। যার জন্ম হয়েছিল ভাদ্রের ভরা পূর্ণিমায়। যার বাবা তাকে ভাদু নামে ডাকতেন। আর সে নিজেও নিজেকে কখনো কখনো ভাদু নামেই ডাকে। কেউ বুঝতেই পারল না এই দ্রুতপায়ে ছেলেটির হাত ধরে সোনাটা নয় ভাদুই বের হয়ে গেল।

বটলগ্রিন রঙের নরম গদির সোফায় শরীরটা গলিয়ে দেওয়া একটা আরাম আরাম ভাব নিয়ে বসে থাকা ভাদু সে রাতের কথাগুলো ভেবে সত্যিই ফিক করে হেসে দিল। মনের কথাটাই মুখে উচ্চারিত হলো—আহা বেচারা!

তবে যতই বেচারা হোক, সাহেদের ওপর এবার রাগই লাগছে ভাদুর। আজকের দিনটিতে সে সোনাটা হতে মোটেই চায়নি। আজ সে ভাদুই থাকতে চেয়েছে। ভোর থেকে তার ভাদুময় দিনটি যেভাবে শুরু হয়েছিল এবং এগুচ্ছিল তাতে সে ভীষণ খুশি। বিকেলটাও সে ভাদুময় করেই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখানে এসে সাহেদ সেই যে ঠ্যালা দরজা ঠেলে ঢুকল। আর তো বেরুনোর নাম নেই। কত দেরি হবে তার? বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা যে ঘনিয়ে এলো।

দরজাটির দিকে দৃষ্টি ঘন করে তাকায় ভাদু। ভাবে এই বুঝি খুলে যাবে। বের হয়ে আসবে সাহেদ। তাকে বাহুবন্দী করে বলবে—চলো। নিচে সাহেদের মোটরবাইকটি রয়েছে। সেটিতে তারা দ্রুতই পৌঁছে যাবে শান্তিনগরের ফ্লাটে।

নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটটি সুন্দর করে সাজিয়েছে সে। এক বেডরুমের ফ্ল্যাটটি ভাড়ায় নেওয়া। কিন্তু নিজের মতো করেই সাজিয়ে নিয়েছে। সে সাজে আধুনিকতা নয়, আছে সৌন্দর্যের ধ্রুপদী বিন্যাস। বাবার পুরোনো হারমোনিয়ামটিই একমাত্র, যা সে মায়ের কাছ থেকে চেয়ে এনেছে। সেটি রাখা থাকে এককোনে। মাঝে মাঝে যখন কোনো কাজ থাকে না, মানে ক্লায়েন্ট থাকে না, ভাদ্রপদী ঘরেই কাটায়। টুকটাক রান্না করে খেয়ে নেয়। আর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গায়। আপনমনে সে গাইতে থাকে নিজের পছন্দের গান—আজ জোসনা রাতে সবাই গেছে বনে। বেছে বেছে জোসনার গান গাইতেই তার ভালো লাগে। জোসনা তিথিতেই যে তার জন্ম। সে যে ভাদ্রপদী।

ভাদু ভাবে এসব গানেই সে আসলে নিজেকে খুঁজে পায়। আসলেই কি পায়? এই প্রশ্ন যেন সে নিজেকেই নিজে করে। এসব প্রশ্ন সোনাটার কাছে ভাদুর কিংবা ভাদুর কাছে সোনাটার চলতেই থাকে। কখনো কখনো যখন একা একা বসে থাকে, ভাবে, তখন এই সোনাটা আর ভাদুর লড়াইটা চলতে থাকে। সোনাটার স্বপ্নে গিয়ে ভাদু বাধা দিতে চায়। আবার ভাদুর স্বপ্নে এসে ধরা দিতে চায় সোনাটা। তবে এখন তার মনের মনিকোঠায় কেবল সোনাটা আর ভাদু এই দুইয়ের নয় তৃতীয় একটি নাম... সাহেদ উঁকি ঝুঁকি মারছে। ভেবে রেখেছিল আর আজ বিকেলে তৃতীয় এই ব্যক্তিটিকে পাকাপোক্ত করে দলে ভিড়িয়ে নেবে। আর সময় সুযোগ মতো সোনাটাকে বিদায় করে দিয়ে সে ভাদু হয়ে যাবে। শুধুই ভাদু। ভাদ্রপদী। সে যদি হয় ভরা পূর্ণিমার তিথি, সাহেদ হবে সেই তিথিতে পূর্ণিমার চাঁদ।

ভাবনায় আবারও আসে সেই রাতটি। সেই যে রাত ১০টার দিকে কালো হিজাবে নিজেকে আড়াল করে, সাদা শার্ট, নেভি ব্লু প্যান্ট পরা—টল ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম ছেলেটিকে অনেকটা বগলদাবা করে টেনে-হিচড়ে উবারে চেপে ছুটেছিল, সে রাতেও তার ইচ্ছা হয়েছিল—নিয়ে যাবে ছেলেটিরে নিজের ফ্লাটে। কাউকে কখনো নেয়নি, নেয়ও না। কিন্তু এই ছেলেটিকে দেখে তার কেনো যেন মনে হয়েছিল একে নেওয়া যায়। কিংবা একেই নেওয়া যায়। কিন্তু গাড়ি যখন মহাখালি ফ্লাইওভারে তখনই ঘোর কাটল সাহেদের। সে জানাল রাত দুটোয় তার ফ্লাইট। বাবা-মাসহ তারা রাতে আমেরিকা যাচ্ছে। তারা আমেরিকায় থাকে। ঢাকায় থার্টিফার্স্ট নাইটের অনেক গল্প শুনেছে, কেমন তা দেখতেই নিজে নিজে গুগল করে এই ক্লাবে এসে ঢুকেছিল, ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টে যাবে। বাকিরা লাগেজ নিয়ে পৌঁছুবে। তখন আর সময় নেই।

ভাদুর ভেতরের সোনাটা কিংবা সোনাটার ভেতরের ভাদুই তখন জানাল তারা আর কোথাও নয় এয়ারপোর্টের দিকেই যাচ্ছে। নিজের ফ্ল্যাটে নয়, মায়ের ছেলেটিকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ। ফলে উবারের ড্রাইভার জাহাঙ্গীর গেট থেকে ইউটার্ন নিয়ে ছুটল এয়ারপোর্টের দিকে। পৌঁছতে সময় নিল না। থ্যাংক ইউ বলে সাহেদ নেমে দ্রুত এগিয়ে গেল আর্চওয়ের দিকে। আর সাহেদ নামতেই ভাদুর ভেতরের সোনাটা ভীষণভাবে বিরক্ত হয়ে উঠল। রাতের কামাই মাটি। উবার ছুটল উল্টোপথে। ওয়েস্টিনের দিকটাতে এই রাতেই একবার ঢুঁ মারতে পারে। রাতেও হুটহাট দুয়েকটা কাজ পাওয়া যায়। তাতে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে।

এই সোনাটা আর ভাদুর লড়াইটা মাঝে মাঝে বেশ ভালোই উপভোগ করে সে। কে যে কাকে কখন জিতে নেয়, সেটার ওপর তার নিজেরও খুব একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। হঠাৎ দেখে ভাদুর ওপর সোনাটা ওভারপাওয়ার করছে। আবার কখনো কখনো সোনাটার ওপর ভাদু।

এই যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো আর তার ভেতর থেকে গোটা দিনের ভাদু এখন পলায়নপর। সোনাটা এসে ভর করতে শুরু করেছে। তাতে সাহেদের ওপর বিরক্তিটাই প্রকট হয়ে উঠেছে।

সাহেদ ঢাকায় এসেছে দুই সপ্তাহ হলো। বলেছে স্রেফ তার সঙ্গে দেখা করতেই পৃথিবীর অপর পিঠ থেকে উড়ে এসেছে সে। এতে ভাদু ভীষণ খুশি হয়েছে। এর আগেই তাদের মধ্যে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়েছে। সাহেদই মূলত তাকে খুঁজে নিয়েছে। জানিয়েছে ইমেজ সার্চিংয়ের মাধ্যমে সে তাকে খুঁজে বের করেছে ভার্চুয়াল জগতে।

সে রাতে উবারের গাড়িটি যখন এয়ারপোর্টের দিকে সাঁই সাঁই করে এগুচ্ছিল তখন সাহেদ যেনো তার নিজস্বতায় ফিরেছে। বারবার ধন্যবাদের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছিল সোনাটাকে। বলছিল, আজ জীবনকে সে নতুন করে চিনেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণত কারো সেলফি তোলার আহ্বানে সাড়া দেয় না সোনাটা। ভাদুও নয়। কিন্তু গাড়িটি যখন বনানী ফ্লাইওভার দিয়ে যাচ্ছিল সাহেদ তার পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে পট করে একটি সেলফি তুলে নিল। কাউকে না বলে ছবি তোলাটা অভদ্রতা। ছেলেটা নাকি আমেরিকায় থাকে। এই সামান্য বিষয়টা কী সে জানে না! বিরক্ত হয় সোনাটা। সেলফি তোলাটা তার পছন্দ নয়। তবে যা কিছুই বলল তা মনে মনে। প্রকাশ্যে কিছু বলল না। আর ভাদু, যার সেলফিতে ভীষণ অ্যালার্জিই বলা চলে, সেও কোনো আপত্তি করল না। নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখেই সাহেদ সেলফিটি তুলে নিয়েছিল। তো সেই সেলফি থেকেই সোনাটার ইমেজ সার্চ করে তার সন্ধান বের করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় সাহেদ। সোনাটা তা সহজেই গ্রহণও করে। টল-ডার্ক-হ্যান্ডসাম ছেলেটিকে না করার শক্তি তার ছিল না। বস্তুত কারোরই ছিল না। না সোনাটার, না ভাদুর। এরপর কত কী যে চলে। কথা বলাবলি, ছবি চালাচালি। কত ছাইপাশ—আবোল তাবোল। এসব নিয়েও সোনাটার সাথে ভাদুকে কম লড়তে হয়নি।

মেজাজটা ক্রমেই খিঁচড়ে যাচ্ছে। অনেক্ষণ ধরে ঠ্যালা দরজাটির দিকে তাকিয়ে সে। দরজাটির মাঝের অংশ দিয়েই ওপাশটা আড়াল করা। নিচের দিক থেকে ওদিকটার মেঝেতে অনেকটা দেখা যায়। কড়া নীল রঙের কার্পেট বিছানো। একটি দুটো আসবাবের খানিকটা অংশ চোখে পড়ে। উপরের ফাঁকা থেকেও চোখে পড়ে একটি ঝাড়বাতির কিছুটা অংশ। ব্যাস এই। মাঝে দুই দিক থেকে আসা দুটি কপাট। ঠিক সমান হয়ে এমনভাবে লেগে আছে যে ফাঁক গলিয়ে কিছু দেখা যায় না। ভাদু জানে, সামান্য ধাক্কাতেই দরজাটি খুলে যাবে। একটি অতি সহজ দরজা, যা চাইলেই খুলে ফেলা যায়। কিন্তু সেই দরজাটিই তার থেকে আড়াল করে রেখেছে সাহেদকে। হঠাৎ মনে হলো এই দুটি সামান্য কপাট যেন তার কাছ থেকে একটা পৃথিবীকে আড়াল করে রেখেছে। যে পৃথিবীটি গত কিছুদিন ধরে সে সাজিয়েছে। যে পৃথিবীটি হয়ে উঠেছিল ভাদুর। কিংবা বলা চলে, ভাদু ও সাহেদের।

দু সপ্তাহ আগে সাহেদ যখন তাকে জানাল সে দেশে আসছে। এবং শুধু তারই জন্য। তখন থেকেই সে তাদের জন্য এই নতুন পৃথিবীটি সাজাতে শুরু করেছে। আর এই দুই সপ্তাহে পৃথিবীটা অনেকটা সাজিয়েও ফেলেছে। এখনো তার নিজের পেশা সে ছাড়েনি বটে, তবে আজ বিকেলেই সে সিদ্ধান্তটিও পাকাপাকি নিয়ে নেবে বলেই মনোস্থির করে রেখেছে। এখন কেন যেন তার মনে হচ্ছে দুই সপ্তাহ ধরে যে পৃথিবীটা সে সাজিয়েছে ওই সহজ দরজাটির ওপারে সেটিই ঢাকা পড়ে আছে।

আচ্ছা! করছেটা কী সাহেদ, ওপাশে? প্রশ্ন তার মনে। গত প্রায় দেড়ঘণ্টায় রুমটি থেকে আর কেউ বের হয়নি, কেউ ঢোকেওনি। যে ভবনটিতে তারা উঠেছে তাতে লিফটে ঠিক কততলায় উঠেছে তাও সে মনে করতে পারছে না। মনে করবে কী করে? আসলে সে দেখেওনি সাহেদ ঠিক কততলার বাটনটি চাপ দিয়েছিল। মাথাটা ক্রমেই ফাঁকা হয়ে আসছে।

ঠিক তখনই দরজাটি খুলে গেল এক ধাক্কায়। একটা রোগা পাতলা কিশোর বয়সী ছেলে তার কাছে এগিয়ে এসে অদ্ভুত একটা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, আপনারে ভিত্রে ডাহে।

সাহেদ কোথায়?

ক্যাডায় সাহেদ?

যার সাথে আমি এসেছি।

সবাই ভিত্রেই আছে। আপনারে যাইতে কইছে। তয় সাহেদ নামে কেউ নাই। আপনারে যে নিয়া আইছে হের নাম জিম।

মানে কী?

ছেলেটির ফ্যাসফ্যাসে স্বর, আর তাকানো ভঙ্গি তার ভালো লাগল না। এক নিমিষে মাথা ঝিম ধরে গেল ভাদুর। তবে সে কেবল ভাদুই নয়। সে সোনাটাও। যে সোনাটা সাহসী। কিছুটা বিপদের আচ করলেও ভাবল এমন বিপদে কম পড়তে হয়নি তাকে। কত মন্ত্রী-এমপি দেখে এলো, কী আর হবে। মনে মনে একটু হাসলও সে। ভাবল বাহ! বেশতো তার নিজের মতো এই ছেলেটারও দুটো নাম। সাহেদ আর জিম।

ভাবতে ভাবতে সামনে এগুলো। সহজ দরজা ঠেলে আগে আগে ঢুকল ছেলেটি। আর তার নাকের ডগায় ঝপাট করে কপাটদুটো আটকে গেল। এ এমন এক দরজা ভেতরে যেতে হলে নিজেকেই ঠেলে যেতে হবে। ভাদুও ঢুকল, সহজ দরজার আলগা কপাট ঠেলে।

কে ঢুকল? ভাদু নাকি সোনাটা? সে নিজেও বুঝতে পারল না। তবে কিশোর ছেলেটি তার লিকলিকে পা ফেলে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছে। নীল মোটা কার্পেটে তার খালি পা অনেকটা দেবে দেবে যাচ্ছে। হিল পরে থাকলেও সেই কার্পেটে নিঃশব্দেই এগুচ্ছে সোনাটাও। বড় হলঘরে নিচে কার্পেট আর উপরে একটার পর একটা বড় ঝাড়বাতি ছাড়া আর কিছু তেমন নেই। ঠিক সামনে একটি টেবিল পাতা। তাতে গোটা তিনেক চেয়ার। বাকিটা ফাঁকা। হলওয়ে পার করে একটি কাচের দরজা ঠেলে ছেলেটি বলল, যান।

যাব?

হ যান, সবাই ভিত্রে আছে!

ছেলেটির কথা বলার ভঙ্গি ভীষণ বিরক্তিকর। কষে চড় লাগিয়ে দিতে ইচ্ছা হলো তার। সেটা না করে বিরক্তি নিয়েই ভিতরে ঢুকল সে। আর ঢুকতেই দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল অটো সেন্সরে। কট করে দরজা বন্ধ হওয়ার একটি শব্দ এসে বুকে ধাক্কা দিল। সোনাটা দেখল জনা চারেক লোক একটি টেবিল ঘিরে বসে আছে। তাদের মধ্যে দুই জন সাদা চামড়ার বিদেশি। সামার ব্লেজার পরা। একজন দেশি। ভদ্রবেশি মধ্যবয়সী। চেক প্যান্ট, গোলাপি শার্টের ওপর সাসপেন্ডার পরে আছেন। সোনাটা বুঝতে পারল—একেই সে ঢুকতে দেখেছে। আর কেমন যেন চেনা চেনা মনে হলো। আর চিনেও ফেলল। থার্টিফার্স্ট নাইটে যে ব্যক্তি ডান্স ফ্লোরে নামের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে যুগলনাচ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ইনি সেই জন। অপরজন সাহেদ। সে পরে আছে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও টি-শার্ট। কিছুক্ষণ আগে যে পোশাকে ছিল সে পোশাকে নয়, একদম ঘরোয়া পোশাকে। এতে ভাদুর ঝিমধরা ভাবটি তীব্র হলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে সাসপেন্ডার পরা লোকটা এগিয়ে এসে কুৎসিতভাবে জড়িয়ে ধরল তাকে। এমন কিছুর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না সোনাটা। ভাদু তো নয়ই। আর ঘোর কাটলে, কি হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই আবিষ্কার করল টেবিলের ওপরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। শাড়িটা তার গায়ে নেই। আলোচনা হচ্ছে বাকি চার জনে।

‘নট ব্যাড,’ বলল দুই বিদেশির মধ্যে আকাশি রঙা সামারকোট পরা জন।

‘ইয়াহ! বাট উই নিড টু টেক অ্যা মেজারমেন্ট,’ বলল অপর বিদেশি।

‘রাইট!’ বলে সক্রিয় হলো সাহেদ। তার হাতে একটি মেজারিং টেপ। ঝুকে পড়ল সোনাটার দিকে। প্রথমে তার বুক মাপল। মুখে বলল, ‘থার্টি ফাইভ।’ এরপর কোমর—টুয়েন্টি সিক্স। আর নিতম্বের দিকটায় আবার থার্টি ফাইভ।

‘ওন্ট গো,’ বলল অফ হোয়াইট সামার কোট পরা বিদেশিটি।

সাসপেন্ডার টেনে ধরে কেতা দুরস্ত বাঙালিটি বলল, ‘হোয়ায়াই... হোয়াটস রং। শি ইজ ফাইন। উই হ্যাভ বিন চেজিং হার সিন্স কোয়ায়েট অ্যা লং। শি ইজ পারফেক্ট অব দ্য পারফেক্টস।’

‘ইউ নো ম্যান, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইজ থার্টি ফাইভ-টুয়েন্টি ফাইভ-থার্টি ফাইভ। ওয়ান ইঞ্চ ফ্যাটার।’

কী হচ্ছে এসব, তার কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারল সোনাটা। বুঝতে পারল কোনো ইন্টারন্যাশনাল চক্রের খপ্পরে পড়েছে সে। অন্ধকার জগতের খবরাখবর কিছুটা সে পায়। আগেও শুনেছে, ঢাকায় এমন একটি চক্র কাজ করছে। বুঝে নিল, হয়তো তার জন্য বিদেশি ক্লায়েন্ট খোঁজা হচ্ছে। নয়তো হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারেই তাকে চালান করে দেবে এরা। সাহেদকে নিয়ে গড়া নতুন স্বপ্নের পৃথিবীটা তখন আর দেখতেই পাচ্ছে না সে। ভেতরের ভাদুটা কিছুক্ষণ লড়াই করে সোনাটার সাথে পেরেই উঠল না। ফলে প্রতিবাদ কিছু হলো না। বরং সোনাটা ভাবল দেশের বাজারের চেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিকোলে তাতে মন্দ কী? সুতরাং চুপ করে থাকাই ভালো। দেখি না কী হয়!

সাসপেন্ডারওয়ালা এবার দুই বিদেশির কাঁধে দুই হাত রেখে দুজনকে ‘কামওন মেন’ বলে একসাথে ধাক্কা মেরে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। এরপর তারা ফিসফিস করে কী যেন বলল। আর একটু পরেই হাসি হাসি মুখ করে ফিরে এলো।

‘ওহ ইটস ফ্রি!’ বলে নীলরঙা সামারকোটধারী নিমেষেই কোটটি খুলে ফেলল। আর অল্প সময়ই নিল পুরো বিবস্ত্র হতে। এমনটার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না ভাদু। তাই আলগোছে টেবিল থেকে নেমে পড়ল সে। কিন্ত সোনাটা এতে অভ্যস্ত। সুতরাং লেট ইট গো। কিউতে দ্বিতীয় ছিল সাসপেন্ডারধারী বাংলাদেশিটি। হ্যাংলাটা যতটা না আসল কাজের কাজী—তার চেয়ে নোংরামো বেশি। একবার ভাবল দেয় থুথু ছিটিয়ে লোকটির মুখে। কিন্তু না! সোনাটার সামনে তখন বিদেশ বিভূঁইয়ের স্বপ্ন। রেড লাইট জোন। পোল ডান্স। ন্যুড ক্লাব। কত কিছু শুনেছে। সেখানে নাকি সোনালি-রুপালি জীবন। শরীর নয়, স্বপ্ন নিয়েই ভাবছে সে। এদিকে চার জনের মধ্যে তৃতীয়জন হয়ে দ্বিতীয় বিদেশিটি যখন তার ওপর চড়াও হলো তখন সে জ্ঞান হারাল। জ্ঞানের তোয়াক্কাও করছিল না সোনাটা। তার কাছে রূপালি স্বপ্নটাই বড় হয়ে থাকল। কিছুক্ষণ পর যখন জ্ঞান যখন ফিরল তখন সাহেদ কিংবা সাহেদবেশী জিম তার উপরে। এবার তার মনে এলো সেই রাতটির কথা। থার্টিফার্স্টের সেই রাত। কিন্তু সে স্মৃতি ক্রমেই তার ম্লান হয়ে গেল। বরং টের পেল গত দিন সাতেক ধরে যে নতুন জগতটি সে মনে মনে সাজিয়েছে, সোনাটা থেকে পুরোপুরি ভাদু হয়ে যাওয়ার স্বপ্নভরা সেই জগত, যাতে সাহেদও ছিল, সেই পুরো জগতটিই জগদ্দলের মতো তার ওপর চেপে বসেছে। হঠাৎ এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কাকে যেন খুঁজতে লাগল। কাকে খুঁজছে সে? ভাদুকে? ভাদ্রপদী। ভাদ্রের ভরা পূর্ণিমায় যার জন্ম। ঘোলা চোখেই কাচের দরজা ভেদ করে সে দেখতে পেল সামনের সেই সহজ ঠ্যালা দরজাটি ঠেলে ভাদ্রপদী বের হয়ে গেল। এখানে পড়ে রইল শুধুই সোনাটা। এতদিন পেটের তাগিদে, নিজের ইচ্ছায় যে কাজটি সে করে এসেছে তাতে তার ক্ষেদ ছিল না। ভয়ও ছিল না। ভাদুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাখত নিজের কাছে। সুযোগ মতো ভাদু হয়ে যেত। কিন্তু আজ এই সন্ধ্যায় সোনাটার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের স্বপ্নের কাছে ভাদ্রপদীর সুন্দর স্বপ্নটার যখন চূড়ান্ত পরাজয় হয়ে গেল তখন দরজা ঠেলে চিরদিনের মতোই কী চলে গেল ভাদ্রপদী?

সে কথা ভাবতেই শিউরে উঠল সোনাটা। নিজেকে ভীষণ কলঙ্কিত বোধ করতে লাগল সে। ভাদ্রপদীকে সে আর কোনোদিনই ফিরে পাবে না। চার-চারটি পিশাচের ক্ষুধা মিটিয়ে তখনও যেটুকু বোধ ও দৃষ্টিশক্তি তার অবশিষ্ট তা দিয়ে সে আবছা দেখতে পেল, সহজ দরজার কপাট দুটো তখনও নড়ছে। বার কয়েক ঝাপটিয়ে পুরোপুরি সমান হয়ে স্থির হয়ে গেল। আর আড়াল করে দিল ওপাশটা। এপাশটায় তার জন্য পড়ে রইল নতুন এক অন্ধকার জগত। আরেকবার জ্ঞান হারাল সোনাটা। হ্যাঁ সোনাটাই।

আর ভাদ্রপদী! সে চলে গেল ভবনটির ছাদে। দেখল ভাদ্রমাসের পূর্ণিমার তিথিতে গোল একটি চাঁদ পূব আকাশে ভীষণ আলো ছড়াচ্ছে। ‘বাবা আমি আসছি’—বলে ঝাঁপ দিল সেই জোছনায়। সেই থেকে ভাদ্রপদী নামের আর কেউ থাকল না। খবর বেরুলো—কলগার্ল সোনাটার আত্মহত্যা।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;