মহামারি প্লেগ যেভাবে শেক্সপিয়ারকে প্রভাবিত করেছিল

পল ইয়ানেন
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

“মহামারি প্লেগের মধ্য দিয়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ভাবতে চেয়েছেন এমন একটা পৃথিবীর কথা, যেখানে বিষ-পয়জন নেই, মিথ্যা অপবাদ নেই, এবং নেই অশুভ দৃষ্টি।”

মহামারি প্লেগের সময়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার পৃথিবীতে ছিলেন। শেক্সপিয়ারের জন্ম ১৫৬৪ সালের এপ্রিল মাসে। তার জন্মের কয়েক মাস পরেই সমস্ত ইংল্যান্ডে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে, এবং শেক্সপিয়ারের নিজের বসবাসকৃত শহরের এক চতুর্থাংশ লোক তাতে মৃত্যুবরণ করে।

প্লেগে আক্রান্ত মৃত্যু ছিল দুঃসহ যন্ত্রণার। আর সেটা সচক্ষে দেখা ছিল আরো ভয়াবহ ব্যাপার। প্লেগ মহামারি নিয়ে তখন মানুষের মাঝে যথেষ্ট অজ্ঞতা থাকার কারণে সংক্রমণটি এরকমভাবে ছড়িয়েছিল যেন এটি একজন রাগত ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা কোনো শাস্তি। প্রতীয়মান হয়েছিল, পৃথিবী হয়তো এর মধ্যদিয়েই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

শেক্সপিয়ারের লেখক-নাট্যকার হিসেবে জীবন শুরুর পরে প্লেগ বারবার ইংল্যান্ডে আঘাত হেনেছে, বিশেষত ইংল্যান্ডের রাজধানীতে—একবার ১৫৯২ সালে, তারপরে ১৬০৩ সালে, তারপরে আবারও ১৬০৯ সালে। ওই সময়ে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা যখনই সপ্তাহে তিরিশের ঊর্ধ্বে চলে যেত, লন্ডন-কর্তৃপক্ষ তখনই শহরের সব রঙমহল বন্ধ করে দিত। ১৬ শতকের প্রথম দশকে লন্ডনের রঙমহলগুলো যতদিন না খোলা ছিল, তারচেয়ে বেশি সময় সেগুলোকে বন্ধই রাখতে হয়েছে।

শিল্পীর তুলিতে ১৫৯২ সালের প্লেগ মহামারি

মহামারি প্লেগ শেক্সপিয়ারের জীবনে একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। প্লেগের ভয়াবহ সংক্রমণ এবং এর ফলে উদ্ভূত সামাজিক অচলতার মুখে মানুষের জীবন কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, এবিষয়টি সতর্কতা তৈরির ভঙ্গিতে শেক্সপিয়ারের বেশ কয়েকটি নাটকে উঠে এসেছে।

জুলিয়েটের বার্তাবাহক কোয়ারেন্টিনে
‘রোমিও জুলিয়েট’ নাটকের কথা বাদ দিলে শেক্সপিয়ারের কাজে কিভাবে প্লেগের উপস্তিতি আছে, তা বোঝা একটু মুশকিল। কেননা ‘রোমিও জুলিয়েট’-এর সম্পূর্ণ আদল বা ভাষার মধ্যেই, এর পুরো চিত্রনাট্য জুড়েই জীবন-সম্বন্ধীয় গভীর চিন্তাভাবনাগুলো প্রোথিত হয়েছে। ‘টুয়েল্ফথ নাইট’ নাটকটিতে অলিভিয়ার একদা মনে হয়েছে, ভালোবাসা তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটা যেন প্লেগের সংক্রমণের মতোই। এক জায়গায় সে বলেছে, “এরকম দ্রুতই হয়তো কেউ প্লেগে আক্রান্ত হয়।”

‘রোমিও জুলিয়েট’ নাটকে জুলিয়েটের ভুয়া মৃত্যুর যে চিঠি রোমিওর কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেই চিঠি রোমিওর কাছে গিয়ে পৌঁছায়নি, কারণ চিঠিটি যথাস্থানে পৌঁছাবার আগেই প্লেগ সন্দেহে বার্তাবাহককে কোয়ারেন্টিনে চলে যেতে হয়েছিল। ফলস্বরূপ, ‘রোমিও জুলয়েট’ নাটকটিও শেষ হয়েছিল একটি মারাত্মক পটপরিবর্তনের মধ্যদিয়ে। জুলিয়েট যে জায়গায় মরার মতো পড়েছিল, সেখানে পৌঁছানোর পরে রোমিও তার প্রেমিকাকে মৃত দেখে আত্মহত্যা করল। আর জুলিয়েট যখন উঠল, সেও তার প্রেমিককে মৃত দেখতে পেল, তখন সেও আত্মহত্যা করল।

শেক্সপিয়ারের সবচাইতে কঠিনতম ট্রাজেডি ‘কিং লেয়ার’ নাটকের শেষ দিনগুলোতে এক চূড়ান্ত অসুস্থ পৃথিবীর চিত্রায়ণ করা হয়েছিল। সেখানে লেয়ার তার মেয়ে গনেরিলকে গালি দিয়েছিল “তুই একটা ফোঁড়া” বলে (ফোঁড়া প্লেগের সিন্ড্রম)। সে বলেছিল, “শেষ পর্যন্ত আমার দূষিত রক্তেও প্লেগ পৌঁছে গেছে!”

‘কিং লেয়ার’ নাটকের শেষদিকে একটি ভগ্নদশা পৃথিবীতে অল্প কিছু মানুষ টিকে ছিল। করোনাভাইরাসের এই মহামারির সময়ে আমরা টিকে-থাকারা যেরকমটা ভাবছি, অনেকটা সেরকমই সেই অবস্থা। আমাদের এই তুলনা এমন ভুল কোনো কিছু না।

এটা জানা থাকা ভালো যে, সময়ের হাত ধরে পেছনে ফিরে গেলে আমরা মানুষেরা নিজেদেরকে উদ্ধার করব কখনো “গভীর কাদার মধ্যে, যেখানে দাঁড়াবার কোনো অবস্থা ছিল না”, অথবা কখনো “গভীর জলে, যেখানে বন্যা আমাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল।” বাইবেলের প্রার্থনাগীতে মানুষের এই দুটি করুণ অবস্থার উল্লেখ রয়েছে।

দূষিত দৃষ্টি
তবে, শেক্সপিয়ার আমাদেরকে অন্য একটি ইতিবাচক পন্থাতেও বিষয়গুলো দেখিয়েছেন। ১৬০৯ সালের প্লেগের পরবর্তীকালে শেক্সপিয়ার তার দর্শকদেরকে সঞ্জীবনীমূলক একটি বিস্ময়কর সুন্দর নাটক উপহার দিয়েছিলেন। নাটকটির নাম ‘সিমবেলিন’। ইউনিভার্সিটি অব নিউ ব্রাউন্সিক-এ রেন্ডাল মার্টিন পরিচালিত ‘সিমবেলিন এন্থ্রপসিন প্রজেক্ট’সহ, অস্ট্রেলিয়া থেকে কাজাখিস্তান পর্যন্ত পৃথিবীর সব থিয়েটার কোম্পানিই মনে করে ‘সিমবেলিন’ নাটকটি আমাদের এই বর্তমান সময়কে কার্যকরী দৃষ্টিতে দেখবার পক্ষে একটি বিবেচনাযোগ্য পন্থা হতে পারে।

‘সিমবেলিন’ শেক্সপিয়ারের দর্শকদেরকে একটি প্লেগমুক্ত পৃথিবীতে নিয়ে গিয়েছিল বটে, তবে সেটাও, ‘সংক্রমণ’ বা দূষণের বিপদগুলোকে নিয়েই গঠিত একটি নাটক। ‘সিমবেলিন’-এর প্রধান অসৎ চরিত্র, অর্থাৎ রাজপ্রাসাদের রানী, সে কুকুর-বিড়ালদের ওপর বিষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাত। এমনকি, তার সৎ মেয়ে আইমোজেনকে সে বিষ দিয়ে হত্যা করবার পরিকল্পনা করেছিল।

এইভাবে সরাসরি দূষিত করে হত্যার বিষয়টি এক পর্যায়ে মিথ্যা-অপবাদে রূপ নেয়। যা কিনা ভাইরাসের মতোই মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে যেতে পারে। এই অপবাদের টার্গেটও ছিল ওই আইমোজেন। আইকামো নামের এক লোক আইমোজোনের সতীত্ব নষ্ট হওয়ার একটা দুর্বল মিথ্যা গল্প ফাঁদে। যা আইমোজেনের দেশান্তরিত স্বামী পসথুমাসও শুনতে পায়। পসথুমাস ইতালি থেকে চিঠি মারফত এক ভৃত্যকে নির্দেশ দেয় তার স্ত্রী আইমোজেনকে হত্যা করতে।

এই নাটকের পুরো জগৎটাই অশুভ-দৃষ্টির দ্বারা কলুষিত হয়ে যায়। যেখানে একথাও পরিষ্কার হয় যে, ন্যাক্কারজনক কিছুর চর্চা মানুষকে অসুস্থ করে দিতে পারে। কল্যাণকামী ডাক্তার করনিলিয়াস রানীকে বলে, “এই বিষ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আপনার অন্তরজগতকে কঠিন করে তুলবে। এই বিষের পীড়া ও সংক্রমণ—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই।”

আরো একটি বিষয় এই নাটক অবহিত করে। তা হলো, শত্রুভাবাপন্ন লোকেদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকাও বিষে আক্রান্ত হওয়ার যন্ত্রণা দিতে পারে। আইমোজেন যখন তার স্বামীকে বিদায় জানাচ্ছিল, তখন সে চারিপার্শ্বের লোকেদের অশুভ দৃষ্টিকে নির্দেশ করে বলেছিল—“তোমাকে অবশ্যই যেতে হবে, আর আমাকে এখানে প্রতিটি মূহূর্ত উপেক্ষা করতে হবে—ওইসব অশুভ রক্তচক্ষু!”

যাত্রীদল এবং কল্যাণকামী চিকিৎসকেরা
শেক্সপিয়ার আমাদেরকে এই ভগ্নদশা পৃথিবী থেকে একটি সুন্দর পৃথিবীর দিকে পথ দেখিয়েছেন। তবে এটা একটা কঠিনতম যাত্রা। আইমোজেন রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যায়, এবং ওয়েলসের সুপ্রাচীন পাহাড়গুলোর দিকে যাত্রা করে। ব্রিটেনের উল্লেখযোগ্য পৌরাণিক চরিত্র আর্থার কিং এই ওয়েলসেরই বাসিন্দা ছিলেন। তো, আইমোজেন সেই প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়, যেখানে তার পরিবার, এমনকি তার জাতিসত্তারও গোড়াপত্তন হয়েছিল।

বিষয় হলো, আইমোজেনের হারিয়ে যাওয়া দুই ভাই ওয়েলসের ওই জঙ্গলের থাকত। আইমোজেন তাদের সঙ্গে গিয়ে পুনর্মিলিত হলো। যদিও তারা তিনজনের কেউই জানত না, এই দুই ভাই রাজপ্রাসাদ থেকে হারিয়ে যাওয়া দুই রাজপুত্র।

নাটকটি এই পর্যন্ত আসবার পরে সকল সংকটের অবসান হয়ে যেতে লাগল বৈকি, কিন্তু ঘটনা তখনও অনেকখানি বাকি ছিল। আইমোজেনকে প্রথমে বেঁচে থাকতে হলো, এবং বেঁচে থাকার ফলেই সে কথা বলতে পারল তার নিজের এবং তার স্বামীর [সম্ভাব্য] মৃত্যু নিয়ে।

সে একদিন ওষুধের শিশিটা খুলে ওষুধটা খেয়ে নিল। না জেনে যে, এটা আসলে ছিল রানীর দেওয়া বিষের শিশি। দুই ভাই বাইরে থেকে এসে আইমোজেনকে মৃত অবস্থায় পেল। এবং তারা তাকে নাটকের ভিলেন চরিত্র ক্লোটেনের মুণ্ডুহীন মৃতদেহের পাশে শুইয়ে দিল।

ডাক্তারের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সে রানীর বিষের শিশিকে একটা ঘুমের ওষুধ দিয়ে বদলে দিয়েছিল। ফলে আইমোজেন মারা গেল না। সে ঘুম থেকে উঠে তার পাশে একটি মুণ্ডুহীন মৃতদেহ দেখতে পেল, এবং ভেবে নিল এটা তার স্বামী পসথুমাসের দেহ।

অর্থহীন জীবনকে আলিঙ্গন
এই ঘটনার পরে, বেঁচে থাকার আর কোনো অর্থ না থাকা সত্ত্বেও আইমোজেন বেঁচে রইল, এবং সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আদতে, তার এই ‘অর্থহীন’ জীবনটাকে আলিঙ্গন করে নেওয়াই ছিল বিজ্ঞতা। যার ফলশ্রুতিতেই মূলত আইমোজেন তার নিজের এবং নাটকের অন্যান্য চরিত্রদের একটি সুখিজীবনের পুনঃসূচনা করতে পেরেছিল।

নাটকের শেষে, আইমোজেনসহ সব চরিত্ররা একস্থানে মিলিত হলো। মিথ্যাবাদী আইকামো স্বীকার করল, সে আইমোজেনের ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল। একে একে সবগুলো সত্য বের হয়ে আসলো। এই সত্যরা মিথ্যার পুরো জগৎটাকে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দিল।

আইমোজেনের স্বামী পসথুমাস, যে জানত তার নির্দেশে আইমোজেনকে হত্যা করা হয়েছে, সে তার ভুল বুঝতে পেরে নিজের মৃত্যুকামনা করল। আইমোজেন দৌড়ে গিয়ে তাকে আলিঙ্গন করল, কিন্তু হতাশায় বিদ্ধ হয়ে পসথুমাস আইমোজেনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। আবারও সেরকম অবস্থা, যখন আইমোজেনের বেঁচে থাকবার কোনো অর্থ হয় না, কিন্তু পরক্ষণেই সে সম্বিৎ ফিরে পেল, এবং বুঝতে পারল—না, এবার সে বেঁচে থাকতে পারবে। তারা স্বামী-স্ত্রী পুনর্মিলিত হলো। আইমোজেন তখন বলল, “তোমার বিবাহিত স্ত্রীকে তুমি কেন ছুঁড়ে ফেলছো? তুমি ভাবো, যে তুমি একটা টিলার উপরে দাঁড়িয়ে আছো, এবং পুনরায় আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দাও!”
পসথুমাস উত্তর দিল, “ফলের ঝুলে থাকার মতো তুমি ঝুলে থাকো যতক্ষণ না গাছটি নিজেই মারা যায়।”

পৃথিবী রক্ষা পেল
আইমোজেন আর পসথুমাস উপলব্ধি করল, একটি সুন্দর জীবনে আমরা তখনই মিলিত হতে পারি, যখন সত্যিকারের প্রাকৃতিক পৃথিবীর গভীরে আমাদের শেকড় প্রোথিত হয়, এবং যখন আমরা বুঝে উঠতে পারি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই মারা যাব।

এই বিষ-পয়জন, মিথ্যা অপবাদ আর অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া এক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে তখন সব চরিত্ররা মুক্তভাবে দৃষ্টিবিনিময় করল। আইমোজেন এখন কী দেখছে, এবং কিভাবে তাকে দেখা হচ্ছে, এই বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাজা স্বয়ং বলল, “পসথুমাস আইমোজেনের নিকট নোঙর ভিড়িয়েছে। এবং আইমোজেন, অনুজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে পসথুমাসের দিকে, তার ভাইদের দিকে, আমার দিকে, তার শিক্ষকের দিকে, আর সে উদ্ধার করে আনছে—প্রতিটি আনন্দের বিষয়!”

বর্তমানের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে আমাদের প্রতিনিয়ত ‘কল্যাণকামী চিকিৎসক’দেরই প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেইসঙ্গে আমরা আইমোজেনকেও অনুসরণ করতে পারি। তার সবকিছু হারাবার অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এই প্রচণ্ড ভয়ের অবস্থা থেকে সারিয়ে তুলতে পারে। আমরা আইমোজেনের কাছ থেকে শিখতে পারি—কিভাবে আবার একটি সুন্দর পৃথিবীর দিকে যাত্রা করতে হয়।


পল ইয়ানেন
অধ্যাপক, শেক্সপিয়ার স্টাডিজ, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি

অনুবাদ : যাকওয়ান সাঈদ

আপনার মতামত লিখুন :