নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্ব বিষয়ক দুই বই নিয়ে টেরি ঈগলটন



অনুবাদ : রাজিয়া সুলতানা
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি প্রকাশিত দুটো বই নিয়ে করোনার এই সময়ে আলোচনা করেছেন বিশ্বখ্যাত সাহিত্যতাত্ত্বিক, সমালোচক ও বুদ্ধিজীবী টেরি ঈগলটন। প্রথম বইটির নাম, নিঃসঙ্গতার ইতিহাস—লিখেছেন ডেভিড ভিনসেন্ট। অন্যটি, একাকীত্বের জীবন-চরিত—এটি লিখেছেন ফে বাউন্ড আলবের্তি। প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আজ এপ্রিলের ২৪ তারিখে প্রকাশনা সংস্থা পলিটি থেকে। দ্বিতীয়টি ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড থেকে বেরিয়েছে। বিচ্ছিন্নতার এই সময়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ঈগলটনের এই আলোচনা এক ভালো উপায় হতে পারে। অপরদিকে তার অন্যসব সারগর্ভ আলোচনার মতো এই লেখাটিতেও ঘটেছে সাহিত্য, ইতিহাস আর সমাজ-রাষ্ট্রের নানামুখী চলকের সম্মিলন। যা পাঠকদের এক অন্য অভিজ্ঞতায় পৌঁছে দিতে পারে।

আলোচনাটি দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

টেরি ঈগলটন

নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব এক কথা নয়। একাকী মানুষ সঙ্গের প্রয়োজন অনুভব করে আর নিঃসঙ্গ ধরনের মানুষ সঙ্গ থেকে নিষ্কৃতি বা অব্যাহতি চায়। ডেভিড ভিনসেন্ট তার চমৎকার নতুন এক অধ্যয়নে একাকীত্বের অনবদ্য একটা সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি একে ‘ব্যর্থ নৈঃসঙ্গ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই দুইদল নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের মধ্যে আরেকটি পার্থক্য করে থাকেন। তারা বলেন যে তপস্বী, ধীবর, মৌনব্রত সন্ন্যাসী আর রোমান্টিক কবিরা একা থাকতে পছন্দ করেন তবে কেউই চান না লোকজন তাদের ত্যাগ বা বর্জন করুক। ‘নিজে নিজের সঙ্গী’ হবার ব্যাপারটি হচ্ছে মনে করেন আপনি সিনেমা দেখবেন বলে নিজেই নিজের হাতটি ধরে বসেছেন। হতে পারে আপনার সত্যি সত্যিই খুব একা থাকতে ইচ্ছে করছে অথবা বিচ্ছিন্ন থাকাকে যে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় তাকেই আপনি যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে চাইছেন এভাবে। তবে যাই হোক না কেন সবচে বড় পার্থক্য হচ্ছে নিঃসঙ্গতায় কেউ মারা যায় না, কিন্তু একাকীত্ব আপনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতেও পারে। করোনাভাইরাসের যে তাণ্ডব শুরু হয়েছে এতে করে আমরা কেউ কেউ শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারি।

সপ্তদশ শতাব্দীর আলোকায়নের আবহে, একা একা নিজের মতো করে থাকার ব্যাপারটি ছিল মানবিকতার প্রকৃত রূপের ব্যত্যয়। অথচ প্রকৃতিগতভাবেই মানবিকতা একটি সামাজিক বিষয়। তবে রোমান্টিকদের হাত ধরে এর পরিবর্তন এলো। সাধারণের মধ্যে বিচ্ছিন্ন থাকার ধারণাটি বেশ পরিচিতি পেল। ফ্রাংকেস্টাইনের দৈত্যটি হচ্ছে ইংরেজি সাহিত্যের প্রথমদিককার স্নেহ-ভালোবাসা বঞ্চিত একটা চরিত্র যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমানভাবে ধিকৃত ও প্রত্যাখ্যাত। তবুও আধুনিক যুগের একটা উপসর্গ হচ্ছে একাকীত্ব—নিঃসঙ্গতা হতে পারে যার সমালোচনা। এ হচ্ছে উত্তম কিছুর সংস্পর্শে আসার কয়েকটি উপায়ের মধ্যে একটি যা এভাবে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু বস্তুবাদী সমাজের ঘাটতিকে প্রকাশ করে। যখন ওয়ার্ডসওয়ার্থ লেখেন, তিনি মেঘের মতো একা একা ঘুরে বেড়ান তখন হয়তোবা তিনি শুধু বলতে চান তিনি একা আছেন অথবা তাঁর সঙ্গীর অভাব কিংবা একাকী থাকার ব্যাপারটা তাঁর নিজেকে জানার জন্য গভীর পারলৌকিক এক ধ্যানের সুযোগ এনে দিয়েছে।

সমগ্র বিশ্ব থেকে নিজেকে এভাবে সরিয়ে রেখে তবেই স্বরূপকে জানা—অন্তত প্রথমদিকে এ ছিল মরুভূমি অঞ্চলের খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের একটা বিশ্বাস। কিন্তু এই বইয়ে দেখানো হয়েছে যে, দিনে দিনে আধুনিক সমাজ আরো জনাকীর্ণ হওয়াতে আত্মকথনের প্রয়োজনও বেশি হয়ে পড়েছে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাটা ব্যয়সাপেক্ষও বটে। ভার্জিনিয়া উলফ এ ব্যাপারে জোর দিয়ে বলেছেন—এজন্য প্রত্যেকের আলাদা একটি কক্ষ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সময়ে শুধু উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষেই এই ব্যয় সংকুলান সম্ভব ছিল। বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ এভাবে আলাদা হয়ে একা একা থাকত। দু হাজার এগার সালে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে একত্রিশ শতাংশ বা আট লক্ষে পৌঁছে। এরপর নগরায়ন আর বড় বড় পরিবারগুলো বহুসংখ্যক মানুষকে এক জায়গায় এনে নিক্ষেপ করে; শিল্প ও পুঁজিবাদের বেনামি দুনিয়াও এদের বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দেয়। গ্রামীণজীবন কঠিন হলেও আমরা জানতাম কারা আমাদের প্রতিবেশি। তাই একা থাকার বাসনা তীব্র হলেও একইসঙ্গে ভেতরে ভেতরে পরিত্যক্ত হবার ভয়ও কাজ করত।

নিঃসঙ্গতার ইতিহাস গ্রন্থটির দাবি এটি একটি ‘ব্রিটিশ সমাজের নিশ্চল ইতিহাস’ অথবা ‘অকর্মণ্য বসে থাকার ইতিহাস’। জন ক্লেয়ারের কবিতা থেকে শুরু করে ‘ইন্টারনেটের নিঃসঙ্গতা’ ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি একনিষ্ঠতা—সবকিছু মিলিয়ে উল্লেখ করার মতো এটি একটি বহুমুখী অধ্যয়ন। একাকী হাঁটার ওপর চমৎকার একটা অধ্যায় আছে বইটিতে। আধ্যাত্মিক বিনোদনের জন্য বিংশ শতাব্দীর মধ্যবিত্তশ্রেণি একা একা হাঁটায় মন দিয়েছিল। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর সমগ্রজীবনে ১৮০,০০০ মাইল হেঁটেছিলেন বলে জানা যায়। শ্রমিকশ্রেণীও কাজের অন্বেষণে হেঁটেছে বহুপথ। নিয়মিত একটানা এই হাঁটার বিষয়টি কৃষক আর অভিজাত শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

চাইলে যে কেউ একাকীত্বকে সঙ্গ হিসেবে বেছে নিতে পারে। মনস্তত্ত্ববিদ ডোনাল্ড উইনিকট মনে করেন কেবল বিশ্বস্ত একজন পূর্ণ বয়স্ক কারো উপস্থিতিতে একটা শিশু একলা থাকা শিখতে পারে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে দেখা যায় নতুন এক ধরনের আশ্রমের ধারণায় মানুষ ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ হয় এবং বলা চলে এ ব্যাপারে বেপোরোয়া হয়ে ওঠে যেখানে স্ত্রীলোকেরা দলবেঁধে আলাদা থাকতে পারত। কারা-ব্যবস্থায় এরকম অপেক্ষাকৃত উচ্চ-মানের একাকী বন্দিত্বের ব্যবস্থা করা হতো। ইয়টসম্যান, রবিন নো জনসন মনে করতেন মানুষকে জেলবন্দী না করে যদি শাস্তি হিসেবে সমুদ্রপথে বিশ্বের সবজায়গায় একাকী পাঠানো হতো, তবে অপরাধ সংঘটিত হতো কম। পাথরের ওপর খোদাই করা একটা মণিযুক্ত মূর্তিতে দেখা যায় যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ধূমপানের অভ্যেসে গির্জায় যাওয়ার চেয়ে নানান রকম প্রার্থনায় ভেতরের অস্থিরতাকে শান্ত করাকেই প্রাধান্য দিয়েছে মানুষ।

আধুনিক জীবনে একাকীত্বের যে তথাকথিত মহামারি, ভিনসেন্ট সে বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি দেখান যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্ভবপর ছিল বলেই নারী ও পুরুষ ক্রমে আরো ব্যাপকভাবে একা একা থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। তবে যাই-ই হোক না কেন ব্যাপক এই একাকীত্বের ধারণা নতুন কিছু নয়। কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিকের মতে এই ধারণাটা যে আর প্রচার বা প্রসার পাচ্ছে না—এর সপক্ষে প্রমাণ খুব কমই রয়েছে। অন্যদিকে ফে বাউন্ড আলবের্তির একাকীত্বের জীবন-চরিত এ এই বিষয়টি আরো গভীর ও মূর্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। ভিনসেন্ট সামাজিক ইতিহাসবিদ হলে ফে বাউন্ড হবেন আবেগের ইতিহাসবিদ যিনি বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছেন, মানবিক আবেগ বা অনুভূতি মোটেও নিরন্তর ও সার্বজনীন নয়, চিন্তা ও কাজের মতোই সেগুলো ঐতিহাসিকভাবে যেমন নির্ধারিত হয় তেমনি এর সবকিছুই আবার পরিবর্তনশীল। এই গ্রন্থে একটা বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে তা হচ্ছে—আমরা যেভাবে অনুভূতির প্রকাশ করি, আমাদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি তার রূপ দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রিয় কাউকে হারানোর শোকে অথবা ধূসর রঙের কোনো ভল্লুক জড়িয়ে ধরার কারণে আতঙ্কিত হলে আপনি ক্যানসাস নাকি ক্যাম্বোডিয়া থেকে এসেছেন এটা বিবেচ্য নয়। আবেগের মুহূর্তে যে মানসিক অবস্থা তা লিঙ্গভিত্তিক—এরকম বললে সন্দেহের উদ্রেক হবেই। এই বইয়ে সেটাই দেখানো হয়েছে। পাহাড় থেকে পড়ে গেলে একজন নারী কি সত্যিই একজন পুরুষের থেকে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়? আলবের্তি জোর দিয়ে বলেছেন—“সব আবেগ-অনুভূতিই রাজনৈতিক”। কিন্তু “সবকিছুই রাজনৈতিক”—এভাবে বললে ‘রাজনীতি’ শব্দটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। যারা মনে করেন লর্ড চ্যান্সেলরের পদটি রাজনৈতিক নয় বরং স্বাভাবিক, সেক্ষেত্রে আলবের্তির এই যুক্তিটি ধোপে টেকে না।

এরপরও অনেক যত্ন নিয়ে লেখা বিস্তর এই অধ্যয়নে জোরেশোরে দাবি করা হয় যে একাকীত্ব আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৮০০ সালের দিকে। রবিনসন ক্রুশো একদা দ্বীপান্তরিত হয়েও কেন একাকী জীবনের জন্য তার কোনো অভিযোগ ছিল না এত্থেকে সেই কারণটা বোঝা সহজ হতে পারে। যখন ভিনসেন্ট বলেন ‘একাকীত্ব’কে নেতিবাচক আবেগ হিসেবে দেখা হয়েছিল শুধু এই সময়টাতে, তখন আলবের্তিও সেই সুরে সুর মেলান। কেউ একা একা থাকছে এই ব্যাপারটি এখন আর আগের মতো করে দেখা হয় না বরং নেতিবাচক অর্থে বোঝানো হয়, উপায়হীনভাবে জীবন এখন এভাবেই, বায়রনের বিষণ্ন নায়কেরা যেমন। আলবের্তি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, যারা বেশি একাকী, তাদের অপেক্ষাকৃত কমবয়সে মৃত্যুর সম্ভাবনা যারা কম একাকী তাদের চেয়ে ৩০% বেশি। দরিদ্ররা ধনীদের চেয়ে বেশি একা, অপেক্ষাকৃত কমবয়সী তরুণ তরুণীরা আরো বেশি একা। একা হওয়ার অর্থ হচ্ছে “অর্থপূর্ণ উপায়ে অন্যদের থেকে দূরে সরে থাকা”।

বিবিসির ড্রামা সিরিয়ালে মিস হ্যাভিশাম চরিত্রে গিলিয়ান অ্যান্ডারসন/ ছবি: বিবিসি

চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাস গ্রেট এক্সপেক্টেশন্স অবলম্বনে বিবিসি যে ড্রামা সিরিয়াল তৈরি করেছে তাতে প্রিন্স আলবার্টের মৃত্যুতে রানী ভিক্টোরিয়ার অতিরিক্ত শোক প্রদর্শনকে রাজতন্ত্র দ্বারা আক্রান্ত মিস হ্যাভিশাম—এই পরাবাস্তব চরিত্রটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ একটি গ্রন্থ এটি। ভিনসেন্টের দৃষ্টিতে যা ‘নিঃসঙ্গতা’, এই বইয়ে সেটাকে ‘একাকীত্ব’ হিসেবে দেখানো হয়েছে—হতে পারে, সৃজনশীল কাজের জন্য মূল্য দিয়ে যেটিকে পেতে হয়। একাকীত্ব হচ্ছে নিজের কাছে প্রত্যার্পণ অথবা ধ্বংসের দিকে গমন কিন্তু কেবল তখনই যখন কেউ তা স্বেচ্ছায় বেছে নেয়। ঐতিহাসিকভাবে, নিজেকে নিজের ও সমাজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা থেকেই এর প্রসূন। কিন্তু এর শুরু হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীরও অনেক আগে, হ্যামলেট বা ওথেলো এর সাক্ষ্য দেয়। এই গ্রন্থটি ঊনবিংশ শতাব্দীকে আদর্শিকভাবে একটা “অপেক্ষাকৃত সমষ্টিগত বিশ্ব” হিসেবে দেখাতে চেষ্টা করে—কর্মহীন আর ভবঘুরেদের কাছে যা আশ্চর্যের একটি বিষয়।

একইভাবে, আলবের্তিও সঠিকভাবে একাকীত্বের রাজনীতিকীকরণ করেন, স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এত্থেকে মুক্তি পাবার জন্য ঔষধের বড়ি আবিষ্কারের দিকে ছুটছেন। নিজেকে দিয়ে কিছু হচ্ছে না—এই অনুভূতি আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের দাসত্বের ইতিহাস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যায় না। এই ইতিহাস পেছনের দিকে টেনে যতই লম্বা করা হোক না কেন, এমনকি লেখকের কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেলেও তা সম্ভব নয়। তিনি দেখান, “একবিংশ শতাব্দীতে অর্থ ব্যয় না করে কেউ কারো সঙ্গে সুবিধাজনক কোনো স্থানে গিয়ে দেখা করবে, এ রকম জায়গা খুব কম”। এর বড় কারণ হচ্ছে নব্য-উদারনীতিবাদের নীতি এর কোনো প্রয়োজন দেখে না। এভাবে এই বইয়ে আছে এক খলনায়ক; অন্যদিকে ভিনসেন্টকে তার অনুধ্যানে বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে দেখা যায়। তবে আরো বেশ কিছু বিষয় এসেছে বইটিতে যেমন—বৃদ্ধ বয়সের ওপর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, গৃহহীনতা, উদ্বাস্তু, আদর্শ জীবনসঙ্গী, ক্ষুধা নিয়ে যেসব শিল্পী কাজ করেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো উত্তেজনা, মেদবহুল শরীর হওয়ার কারণে যে একাকীত্বের অনুভূতি—এইসব নানান জল্পনা-কল্পনা, সন্দেহ, ওয়াদারিং হাইটস উপন্যাসটিতে দেখানো হয়েছে হিথক্লিফ গাড়ি চালিয়ে বাড়ি আসতে ব্যর্থ হয়—এইসব মাথামুণ্ডুহীন অবান্তর বিষয়েরও অবতারণা হয়েছে।

এইসব ছাড়াও আরো নানান বিষয় আনা হয়েছে বইটিতে। এই অধ্যয়ন দুটোর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এদের গবেষণামূলক অনুসন্ধান ও সাধারণ ব্যাখ্যার মিশ্রণ। নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্ব নিয়ে বিভিন্ন শতাব্দীতে যা যা ঘটেছে সেসবের লম্বা লম্বা আখ্যানের বর্ণনা রয়েছে তবে বিস্তর প্রমাণ-দলিলও দেওয়া হয়েছে সেগুলোর সপক্ষে। বইদুটোতে পাণ্ডিত্য ও সহানুভূতি, কবিতা ও মনস্তত্ত্ব এসবের যে সমন্বয় ঘটেছে তা সাধারণ পাঠক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে সমানভাবে আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম। একাকীত্ব ঘোচানোর একটা উপায় হচ্ছে নিঃসঙ্গতা। একাকী থাকাটা উপভোগ করা অথবা অন্তত একে সহ্য করাটা বেড়ে ওঠারই একটা অংশ। কিন্তু ভিনসেন্ট আর আলবের্তি উভয়েই কিভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কবিদের জন্য একাকীত্বকে ইতিবাচক করে তোলা সম্ভব, সেই বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে সচেষ্ট থেকেছেন, অন্যদিকে বাচ্চাদের লালনপালনে সময় কাটে যেসব নিঃস্ব, দরিদ্র গৃহিণীর, সামাজিক বিধি-বিধান যেখানে এর শাঁসটুকু পর্যন্ত খেয়ে ফেলেছে—সমাজের সেই শ্রেণীর কথা আদৌ বলা প্রয়োজন মনে করেননি তারা।

   

অখণ্ড আকাশ



শরীফুল আলম
অখণ্ড আকাশ

অখণ্ড আকাশ

  • Font increase
  • Font Decrease

একদিন তোমার সব অবহেলা আমি দ্বিগুণ করে
তোমাকেই ফিরিয়ে দেব,
তোমার সাবলীল ভঙ্গির ঘাতক সময় গুলো
আমাকে এখনও হানা দেয় ঘুমের ঘোরে ,
এ কেমন তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতি ?
লতার মত তুমি জড়িয়ে থাকো সময়ের শূন্যতায়
প্রবল বাতাসে হৃদয় কেঁপে উঠে ,
আমার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কোথায় , আমি তা জানিনা
হয়ত ভুলে যেতে হবে একদিন স্বপ্নের গল্প গুলো
তোমার ছবির ভাষা
রৌদ্রের গন্ধে ভরা বেবাক আকাশ ।

সংঘাত সরালে চেনা যায় অন্য আরেকটি সংঘাত
ভালোবাসার নিপুণ প্রতিশ্রতি , অবিনশ্বর আগামী ,
বৈপরিত্ব যেটুকু ছিল
তা তোমার বিভ্রমে ভরা নিগূঢ় রহস্য
আলতো ছাপ যেটুকু তুমি দিয়েছ আমায় তা লুকোবে কি করে ?
দায়সারা , চেনাশোনা , আধাচেনা , অচেনা রয়েই গেলে তুমি
শূন্য এ বুকে বিশাল আঁধার ঢেলে
মৃদু জল ঢেলে তুমি চলে গেলে ।

ফ্যাকাশে মুহূর্ত গুলো
প্রত্যহিক নিয়মেই এখন চলে ,
তবুও মাঝে মধ্যে উঁকি দেয় জীবনানন্দ , রবীন্দ্রনাথ
পদ্মা , মেঘনা , যমুনা ।

তুমি নিরুদ্দেশ হবে হও
ষোড়শী চাঁদের আলো এখনও আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়
তাই জলের অতলে এখন আর খুঁজিনা সুখের মুক্তা ,
এ বুকের তলায় এখনও এক অখন্ড আকাশ ,
পূর্ণিমা নিয়ে আমি কোন কথা বলবো না
অমবস্যার দুভাগ নিয়েও কোন কথা হবেনা
তবুও তুমি শচীন , মান্না হয়ে থেকো আমার ,
একদিন সকল অভিমান ভুলে
নিশ্চয় তুমি হাঁটু গেড়ে বসবে আমার সম্মুখে
জমানো কৃষ্ণচূড়া হাতে নিয়ে ।

-

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

;

বার্তা২৪.কম’র বর্ষপূর্তি বিশেষ সাময়িকী

‘সপ্তবর্ণ’-এ অভিভূত মুহম্মদ জাফর ইকবাল যা বললেন



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

৭ম বর্ষপূর্তি ও ঈদ উপলক্ষ্যে দেশের শীর্ষ মাল্টিমিডিয়া নিউজপোর্টাল বার্তা২৪.কম প্রকাশ করেছে বিশেষ সাময়িকী ‘সপ্তবর্ণ’। এতে লিখেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতিমান লেখকরা। সপ্তবর্ণে স্থান পেয়েছে শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের নিবন্ধও।

মুদ্রিত সংবাদপত্রের ঐতিহ্যিক পরম্পরাকে বজায় রাখতে ২৪ ঘণ্টার নিউজপোর্টালবার্তা২৪.কম’র বিশেষ সাময়িকীর কপি হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত মুহম্মদ জাফর ইকবাল ডিজিটাল এই সংবাদমাধ্যমটির ভূয়শী প্রশংসা করেছেন। সপ্তবর্ণ সম্পাদক ও বার্তা২৪.কম এর পরিকল্পনা সম্পাদক আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসময় তিনি সমকালীন সংবাদপত্রের বিবর্তন নিয়েও কথা বলেন।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘বার্তা২৪.কম সপ্তমে পৌছেছে। আমার হিসেবে প্রথম পাঁচ বছর হচ্ছে ক্রুশিয়াল। কেউ যদি প্রথম পাঁচ বছর অতিক্রম করতে পারে, তখন ধরে নেওয়া যায়, হ্যা-পরবর্তী সময়টিতে তারা সাকসেসফুললি এগিয়ে যাবে।’

খ্যাতিমান এই কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘বার্তা২৪.কম এর বিশেষ সাময়িকী সপ্তবর্ণ আমার হাতে। আমি চোখ বুলিয়ে দেখেছি, এতে কারা লিখেছেন। আমি খুবই অবাক হয়েছি এজন্য যে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এত লেখকের এতগুলি লেখা তারা সুন্দর করে যত্ন নিয়ে একত্র করেছে। শুধু তাই না, আমার মত যে কোন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে-পুরো বিষয়টি আসলে ফোর কালার।’

‘খুবই সুন্দর, চমৎকার ঝকঝকে। চমৎকার সব ছবি। আমি যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি লেখাগুলো পড়ার জন্য। আমি তাদের অভিনন্দন জানাই, এত চমৎকার প্রকাশনা করার জন্য। নিঃসন্দেহে এটা বলে দেওয়া যায়, যখন কোন একটা চমৎকার কিছু কেউ দেখে, তখন মনে করতে হবে এটা এমনি এমনি হয় নাই। ধরেই নিতে হবে এর পেছনে অনেক মানুষের অনেক শ্রম আছে। আমি অভিনন্দন জানাই তাদের, যারা এমন একটি সুন্দর প্রকাশনা করতে অনেক পরিশ্রম করতে রাজি আছেন, যখন যখন মানুষদের কাগজের কিছু দেখার আর সময় নাই’-বলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

আগামীতে বার্তা২৪.কম-কে এই দায়িত্ব আরও সুন্দরভাবে পালনের আহ্বানও জানান নন্দিত এই লেখক।

বার্তা২৪.কম টিমের সঙ্গে কথা বলছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল

যে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমরা যেখাবে বড় হয়েছি, এখন সময়টা আসলেই পাল্টে গেছে। আমরা কাগজের খবর দেখে অভ্যস্ত। সবকিছু আমরা কাগজে পড়তাম। এখন যেটুকু কাগজে আসে তার চেয়ে অনেক বেশি আসে ইন্টারনেটে-ডিজিটাললি। সেটা অনেক বড় একটা পরিবর্তন। এবং আমরা যারা কাগজে অভ্যস্ত তাদের জন্য এই জিনিসটি গ্রহণ করতে এখনও সময় লাগছে। যেহেতু বেশির ভাগ তথ্যই ডিজিটাললি আসছে, এর ভেতরে কিন্তু গ্রহণযোগ্যতার একটা ব্যাপার আছে।’

‘মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় অনেকটা অশিক্ষিতি মানুষের মতো। যেহেতু আমরা কাগজে পড়ে অভ্যস্ত, যখন ডিজিটাললি কিছু দেখি-প্রশ্ন আসে এটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? কারণ যারা এটা তৈরি করছে, প্রকাশ করছে তারা কতটুকু দায়িত্ব নিতে পারবে? সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য কিনা? আমি দেখছি, আজকাল বেশিরভাগ মানুষ সংবাদপত্র থেকে যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করে তার থেকে অনেক বেশি নেয় বিভিন্ন স্যোশাল নেটওয়ার্ক থেকে। এখানে একজন আরেক জনের সঙ্গে তথ্যের আদান-প্রদান করে, এবং যে যে ধরণের তথ্য চায়, তাকে সে ধরণের তথ্যই দেওয়া হয়। ঘুরে ফিরে সে ওই ধরণের চক্রের ভেতরে পড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কাজেই একজন সম্পূর্ণ ইন্ডিপেন্ডেন্ট তথ্য পেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য আমরা যদি, ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাদের প্রথম দায়িত্ব হবে-এটা যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়। যে জিনিসটা খুবই উত্তেজনার সৃষ্টি করে, পপুলার-সেই জিনিসই যদি প্রচার করি তাহলে কিন্তু হবে না। নির্মোহভাবে আমাকে এমন তথ্য দিতে হবে যেটা বিশ্বাস করতে পারি। আমি অপেক্ষা করছি সেজন্য। আমি বিভিন্ন জায়গায় দেখি আর নিজেকে প্রশ্ন করি এটি কতটুকু বিশ্বাস করতে পারব।’

;

ভারতে যুগল সম্মননা প্রাপ্তিতে গোলাম কুদ্দুসকে সংবর্ধনা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভারত থেকে যুগল সম্মাননা লাভ করায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিজন গোলাম কুদ্দুসকে সংবর্ধনা প্রদান করল শীর্ষ নাট্যদল ঢাকা পদাতিক।

রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলে ইফতার ও সংবর্ধনায় ঢাকা পদাতিকসহ বিভিন্ন নাট্যদলের কর্মী ছাড়াও সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা অংশ নেন। 

ইফতারের পর গোলাম কুদ্দুসকে উত্তরীয় ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেন ঢাকা পদাতিকের সদস্যরা। তাকে নিবেদন করে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। পরে ঢাকা পদাতিকের সভাপতি মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত অতিথি গোলাম কুদ্দুস ছাড়াও বক্তব্য রাখেন-বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব ঝুনা চৌধুরী, নাট্যজন নাদের চৌধুরী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও আবৃত্তি শিল্পী আহকাম উল্লাহসহ অন্যরা। 

বক্তারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে গোলাম কুদ্দুসের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে তাঁর এই যুগল পদ প্রাপ্তিতে অভিনন্দন জানান। আগামী দিনেও বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যে তাঁর সরব উপস্থিতি প্রত্যাশা করেন অনুষ্ঠানের বক্তারা।  

সম্প্রতি ভারতের কলকাতা ও হাওড়ায় দুটি সম্মাননায় ভূষিত হন লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গোলাম কুদ্দুছ। গত ১৮ মার্চ (২০২৪) কলকাতার বাংলা একাডেমি সভাঘরে আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকা ‘চোখ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে গোলাম কুদ্দুছের হাতে বঙ্গবন্ধু পদক তুলে দেন কলকাতার প্রবীণ কবি ও লেখক, বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা পাওয়া শ্রী পংকজ সাহা ও কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের প্রথম সচিব রঞ্জণ সেন।

অন্যদিকে, ১৯ মার্চ(২০২৪) পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় কবি সাতকোর্নী ঘোষ সম্পাদিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘কলকাতার যীশু’র পক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য গোলাম কুদ্দুছকে ‘একুশে স্মারক সম্মাননা’ দেওয়া হয়। তার হাতে সম্মাননা তুলে দেন পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা বিশিষ্ট শিক্ষাবিধ অধ্যাপক পবিত্র সরকার। 

;

জামাই



হানিফ ওয়াহিদ, রম্য লেখক
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ইফতার শেষ করে নামাজ শেষে হালকা একটা ঘুম দিয়েছিল রাকিব। হঠাৎ সুন্দরী শালী রিয়ার ভিডিও কল- কী করেন দুলাভাই?

রাকিব বিরক্তি চেপে একটা হাই তুলে বললো- ঘুমাই।

রিয়া খলবল করে বললো, ঘুম ভাঙছে?

- না, এখনো ভাঙে নাই।

ঠিক আছে। আমি আপনার ধরে হাত ধরে টান দিলাম- হেঁইয়ো! এইবার ভাঙছে!

- হ্যাঁ। কয়মাস?

রিয়া অবাক হয়ে বললো- কী, কয়মাস?

- পোলা না মাইয়া?

কী আবোলতাবোল বকেন দুলাভাই! গাঁজা দিয়ে ইফতার খাইছেন! নাকি শরবতের পরিবর্তে বোতল টানছেন!

রাকিব বিশাল হাই তুলতে তুলতে বললো, তোমার পেট উঁচা দেখা যায়!

রিয়া এবার হেসে ফেললো। আরে ভাই, এগুলো ইফতারি!

- ওরে সর্বনাশ! এক গ্রামের ইফতার তুমি একাই সাবাড় করেছো! এইটা পেট না কলসি! বাদ দেও, অসময়ে ফোন। কাহিনী কী?

আপা কই?

- আমার শত্রুর কথা বলছো! সে বাচ্চাদের অন্য রুমে পড়াতে বসেছে।

আপা যেন না জানে। আমাকে কিছু টাকা লোন দিতে হবে। আর্জেন্ট দরকার!

- লোন যে নিবা, বন্ধক কী রাখবা?

আপাতত আমার বোনকে বন্ধক রাখেন।

বন্ধকি পছন্দ হয় নাই। শোনো রিয়া, তুমি এ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে কত টাকা লোন নিছো জানো? আমি কি বিশ্বব্যাংক? কখনো কোনো টাকা ফেরত দিছো? তুমি তো আমার কাছে ঋণখেলাপি হয়ে গেলা…

বাজে আলাপ বন্ধ করেন তো‍! লোকজন সরকারি ব্যাংক থেকে লোন নিয়েই ফেরত দেয় না! আর আপনি তো আমার দুলাভাই। দুলাভাইয়ের টাকায় শালীদের হক আছে। আপনার কাছে সারাজীবন ঋণখেলাপি হয়ে থাকতে চাই।

- টাকা পাবে না।

কেন?

- কারণ, আমি চাই না, তুমি সারাজীবন আমার কাছে ঋণখেলাপিদের একজন হয়ে থাকো। তোমার একটা ইজ্জত আছে নাহ!

আমার ইজ্জত নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। আর টাকা কি মাগনা দেন! বিনিময় পান না!

রাকিব অবাক হলো- কী বিনিময়?

এই যে কথায় কথায় গালি দেন!

রাকিব যেন আকাশ থেকে পড়লো। হায় আল্লাহ! আমি তোমাকে কখন গালি দিলাম?

এই যে কথায় কথায় শালী বলেন, এটা গালি নাহ!

এইবার রাকিব হো হো করে হেসে ফেললো। মেয়েরা উল্টাপাল্টা কথা বলবে, এটাই নিয়ম। বাম পাঁজরের হাড় যেমন বাঁকা, মেয়েদের কথাবার্তাও তেমনি বাঁকা। এদের কথার ঠিক-ঠিকানা নাই।

- শোনো রিয়া, এবার মোবাইল রাখি। মশা আমাকে নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করে কচকচ করে কামড়িয়ে খাচ্ছে।

মশা আপনাকে কচকচ করে খাবে কেন! আপনি কি শসা? বাসায় মশার কয়েল নাই?

আছে তো! ওই যে দেখছি, জ্বলন্ত কয়েলের ওপর একটা মশা রাজা-বাদশার হালে বসে আছে। অথচ দোকানদার বলেছিল, মশা না গেলে টাকা ফেরত!

রিয়া হাসতে হাসতে বললো- গিয়ে টাকা ফেরত নিয়ে আসেন।

- তবেই হয়েছে! ব্যাটা দোকানদার আমার শালীর হাজবেন্ড কি না! টাকা ফেরত চাহিবামাত্র তৎক্ষণাৎ বের করে দেবে!

রিয়া এবার দম ফাটিয়ে হাসতে লাগলো। আপনি খুবই মজার মানুষ দুলাভাই!

- বইন রে, একমাত্র তুমিই আমাকে বুঝতে পারলা! তোমার বোন তো আমাকে হাঁদারাম গাধা মনে করে। তাকে কীভাবে বোঝাই, মজার মানুষই ভালো! বেজার মানুষ কেউ পছন্দ করে না। অবশ্য তোমার বোন হচ্ছে উল্টা। তার ধারণা, বোকা মানুষরা অকারণে হা হা হি হি করে! অথচ হাসলে মানুষের মন ভালো থাকে। যাক গে, তোমার হাজবেন্ড কই?

সে শুয়ে শুয়ে তার ফিউচার নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে।

- বাহ! ভালো ছেলে। ফিউচার আছে। এখনই ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।

মোটেই ভালো ছেলে নয়, দুলাভাই। তার মোবাইল ফোন এখন চার্জে। তাই, টাইম পাস করছে। তার ভবিষ্যত অন্ধকার! বোকার হদ্দ! আপনার ধারেকাছেও সে নাই। তাকে আমি সারাক্ষণ বোঝাই- আমার দুলাভাইকে দেখেও তো কিছু শিখতে পারো। আপনি যদি হন মহারাজ, সে হবে ফকিরবাজ!

শুধু আমি বলেই তার সংসার করে গেলাম, অন্য কেউ হলে… আমি তাকে বলি, এত মোবাইল টিপে কী সুখ পাও? সে আমাকে কী বলে জানেন?

- না, কী বলে?

সে বলে, মোবাইল টেপার মতো সুখ নাকি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টা নাই!

রাকিব হাসতে লাগলো। কী বলো এসব! আর এই ডায়ালগ কীভাবে শিখলে? এটা তো তোমার আপার প্রতিদিনকার ডায়লগ!

কোনটা?

- এই যে, আমি বলেই তোমার সংসার করে গেলাম… এই কথাটা আমাকে তোমার আপা প্রতিদিন কমছেকম তিনবার করে মনে করিয়ে দেয়। তো, তুমি যে তোমার হাজবেন্ডকে পছন্দ করো না, আবার তার সব কাজই অনুসরণ করো! মাথা ঘোরায় না! বমি বমি লাগে না!

রিয়া হাসতে হাসতে বললো- আপনিও তো আপার বদনাম করতেছেন…

- তোমার আপার বদনাম করার সাহস আমার নাই রে বইন! সে মনে করে আমি বোকার হদ্দ। আমার বর্তমান ভবিষ্যত কিছুই নাই। তোমার হাজবেন্ডের ভবিষ্যত ফিলিপস বাতির মতো ফকফকা! তার দুঃখ, তোমার হাজবেন্ডের মতো একটা এত ভালো ভদ্র হাজবেন্ড কেউ পায় নাই! তার কপাল নাকি খুবই খারাপ!

রিয়া এবার খিলখিল করে হেসে উঠলো। ও মা! তাই! ওই কবিতাটা শোনেন নাই, দুলাভাই! ওই যে, নদীর এপাড় কয় ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপাড়েতে যত সুখ আমার বিশ্বাস!

রাকিব মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো- আমি তো জানতাম, তোমার হাজবেন্ড আসলেই ভালো একজন ছেলে। বেশ অমায়িক! তুমি আবার তার সাথে ঝগড়া করো নাকি! কী নিয়ে ঝগড়া করো তোমরা?

রিয়া হাসতে হাসতে বললো, মেয়েদের ঝগড়া করতে কোনো কারণ লাগে না দুলাভাই! শুধু একটা হাজবেন্ড থাকলেই চলে!

রাকিব অবাক হয়ে বললো- আরে তাই তো! তার বউও তো অকারণেই তার সাথে ঝগড়া করে!

তাহলে কি সব মেয়েই এমন!

;