দূরত্ব-বিচ্ছিন্নতার ছবি এঁকে বিখ্যাত যিনি



ফারহানা আজিম শিউলী
আত্মপ্রতিকৃতি: এডওয়ার্ড হপার / অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

আত্মপ্রতিকৃতি: এডওয়ার্ড হপার / অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা-বাস্তবতার কারণে দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা—এ বিষয়গুলো এখন মেনে চলার চেষ্টা করছেন সবাই। এডওয়ার্ড হপার নামে বিখ্যাত মার্কিন চিত্রশিল্পী বিশ শতকে দূরত্ব আর বিচ্ছিন্নতাকে উপজীব্য করে রাঙিয়ে তুলেছিলেন তাঁর ক্যানভাস। কেন তিনি এ ধরনের ছবি এঁকেছিলেন? ঘরবন্দী থাকার সময়ে এই প্রশ্নের তত্ত্ব-তালাশ।

করোনা-পরিস্থিতির কারণে আজ ‘স্যোশাল-ফিজিক্যাল ডিসটেন্সিং’ বা ‘সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব’, ‘আইসোলেশন’ বা ‘বিচ্ছিন্নতা’—শব্দগুলো খুবই পরিচিত আমাদের কাছে। আজ থেকে বহু বছর আগেই মার্কিন চিত্রশিল্পী এডওয়ার্ড হপার (২২ জুলাই ১৮৮২-১৫ মে ১৯৬৭) বিখ্যাত ছিলেন সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব-বিচ্ছিন্নতার ছবি আঁকার জন্য। বাস্তববাদী ধারার এই চিত্রকর বিশশতকের প্রথমার্ধে পরিত্যক্ত-ধ্বংসোন্মুখ-পতিত-বেওয়ারিশ নাগরিক জীবন ও সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব-বিচ্ছিন্নতার ছবি কেন এঁকেছিলেন, তার তত্ত্ব তালাশ করতে বসলে শিল্প সমালোচকেরা বহুবিধ কারণ হয়তো বের করতে পারবেন। তবে বর্তমানের এই করোনা-উদ্ভূত বাস্তবতার কারণে এই শিল্পী আবারও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। প্রবলভাবে পুনরুত্থিত হয়েছে তাঁর চিত্রকর্ম। ইন্সটাগ্রাম ও টুইটারে তাঁর চিত্রকর্মগুলো শেয়ার হয়েছে, হচ্ছে অসংখ্যবার। যদিও তিনি অর্ধ শতক আগেই মর্ত্যলোক ছেড়েছেন এবং ইতিহাসের একদম ভিন্ন সময়ে জন্মেছিলেন।

হপার পরিত্যক্ত শহুরে ল্যান্ডস্কেপ এবং আইসোলেটেড ফিগারে, একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাকে ধরেছেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই অতিমারি তাঁর শিল্পকর্মকে দিয়েছে অন্য এক দ্যোতনা, অন্য মাত্রা, অন্যরকম প্রাসঙ্গিকতা। বলা হচ্ছে, ‘আমরা সবাই এখন এডওয়ার্ড হপারের পেইন্টিং’। তিনি এখন হয়ে উঠেছেন কোয়ারেন্টাইন কালচারের ‘পোস্টার বয়’।

এই সময়ে এসে জনপরিসরে হপারের এই সাম্প্রতিক পুনরুত্থান আমাদের বর্তমান দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার দিকেই চোখ ফেরায়। আমরা যখন অবাঞ্ছিত অতিথি ‘করোনাভাইরাস’ আমাদের বাড়ি ছেড়ে যাক এমন অপেক্ষায় দিন গুনছি, ঠিক তখনই আমরা দেখছি যে, পৃথিবীটাকে অদ্ভুতুড়েভাবে তাঁর কিছু চিত্রকর্ম—যেমন ‘হাউস বাই দ্য রেইলরোড’ (১৯২৫), ‘অটোম্যাট’ (১৯২৭), ‘রুম ইন নিউইয়র্ক’ (১৯৩২), ‘নাইটহকস’ (১৯৪২), ‘কেইপ কড মর্নিং’ (১৯৫০), ‘অফিস ইন আ স্মল সিটি’ (১৯৫৩), ‘সান ইন অ্যান এম্পটি রুম’ (১৯৬৩), ‘মর্নিং সান’ (১৯৫২) কিংবা ‘ইন্টারমিশন’ (১৯৬৩)—এসব চিত্রকর্মের মতো দেখাচ্ছে। হপারের অনেক ছবিতেই যেন এখনকার আমরা; ফাঁকা সিনেমা হলে বসে থাকা একাকী এক নারী দর্শক, বেদনাবিধুর এক মানুষ তার আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে, একাকী এক দোকানদার, এক ডিনার টেবিলে একে অপরের থেকে দূরত্বে বসে থাকা মানুষ—এ তো আমাদের বর্তমানেরই প্রতিচ্ছবি।

ইন্টারমিশন, ১৯৬৩

হপারের সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘নাইটহকস’-এ দেখা যায়, রাতে আলোকিত এক ডিনারে চার খাবারক্রেতা ও একজন ওয়েটার। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে আঁকা। ওয়েটার এবং বাইরের জগতের সঙ্গে মানুষগুলোর বিচ্ছিন্নতা-সংযোগহীনতা ওই যুদ্ধকালীন সময়ে সৃষ্ট মানুষের অন্তর্গত বোধেরই এক বহিঃপ্রকাশ। করোনাকালীন সময়ে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে ‘নাইটহকস’ যেন তাই একীভূত হয়ে গেছে। একীভূত হয়ে গেছে কফি হাতে একাকী বসে থাকা নারীর ‘অটোম্যাট’ চিত্রকর্মটিও।

নাইটহকস, ১৯৪২

হপারের অসম্ভব ভক্ত ছিলেন বিশ্বনন্দিত ইংরেজ চলচ্চিত্রকার আলফ্রেড হিচকক। ১৯২৫ সালে হপারের আঁকা ‘দ্য হাউস বাই দ্য রেইলরোড’ ছবিটি দ্বারা অনুপ্রাণিত হন তিনি। হপার এ ছবিতে রেলের রাস্তা দিয়ে বিচ্ছিন্ন এক অদ্ভুত পুরনো বাড়ি এঁকেছেন। এতে তখনকার প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হতে যাওয়া আমেরিকা প্রতিফলিত হয়েছে। সেখানে পুরনো বাড়িগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে, আর প্রবেশ করছে রেললাইন। উন্নয়ন নাটকীয়ভাবে বদলে দিচ্ছে আশপাশ। ছবিতে দেখা যায়, আঁকা বাড়িটি বিচ্ছিন্ন ও নির্জন।

অটোম্যাট, ১৯২৭

এই ছবির অনুপ্রেরণায় হিচকক তাঁর ১৯৬০ সালের পৃথিবীবিখ্যাত হরর ক্ল্যাসিক ‘সাইকো’ চলচ্চিত্রে স্থান দেন ‘বেইটস ম্যানসন’কে। বলা দরকার, হপারের ছবিটি আঁকার সময়ের যে ধারণা—উন্নয়ন আসলে বিচ্ছিন্নতার একটি উপাদান—সেটি হিচককের ‘সাইকো’র সময়েও প্রাসঙ্গিক ছিল, যেখানে বিচ্ছিন্ন-নিঃসঙ্গ-নিভৃত নির্জনতায় একজন মানুষের উন্মাদনা সুতীব্র হয়ে ওঠে। আর এখন এই অতিমারির স্বেচ্ছা কিংবা মেনে নেওয়া বন্দীত্বে বিষয়টি তো আরো বেশি মূর্তমান।

হাউস বাই দ্য রেইলরোড, ১৯২৫

হপারের এই মনস্তাত্ত্বিক চিত্রকর্মগুলোর সময়কাল ১৯২০-৫০ এর দশক জুড়ে। ছবিগুলো একরকম অস্বস্তির শিহরণ জাগায় এবং ‘একটি জাতির আর্ট তখনই মহত্তম হয়ে ওঠে যখন তাতে তার মানুষের চরিত্রের প্রতিফলন থাকে’—শিল্পীর এই দর্শনকে মূর্তমান করে তোলে।

হপার তাঁর সময়ের সামষ্টিক বোধকে ধারণ করার পাশাপাশি কিন্তু নিজের অজান্তেই বর্তমানের বৈশ্বিক অতিমারির অন্তর্নিহিত বোধকেও ধারণ করেছেন।

কিছুদিন আগেও আমরা অনেকেই অত্যন্ত দ্রুতগতির এক খ্যাপাটে পৃথিবীতে কাজকর্ম করেছি, দিনযাপন করেছি, যেখানে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অত্যধিক ক্যাফেইন, অনিঃশেষ সুযোগসুবিধা, জনসমাগম, গণপরিবহন ইত্যাদি। আর আজ আমরা অনেকেই হয়তো একাকী, সোফায়-বিছানায় শুয়ে-বসে অফিস করছি। এটি আক্ষরিক অর্থেই হপারের ৭০ বছর বয়সে আঁকা ছবি ‘মর্নিং সান’-এর নারীটির মতো। করোনাকালের সময়টা আমরা যে কতটা নগণ্য ও ক্ষুদ্র, পদে পদে তা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এখন দুনিয়াজুড়ে শুধু পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ এবং ‘বিগ ড্যাটা’র রমরমা, মানুষের জীবনকে যা কিছু সংখ্যায় রূপান্তরিত করেছে। বৈশ্বিক মহামারিতে ‘মর্নিং সান’ ছবির বিছানায় স্থির হয়ে বসে থাকা নারীটির মতো কিংবা ‘কেইপ কড মর্নিং’-এর বে-উইন্ডো দিয়ে সকালের সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় বাইরে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকা নারীর মতোই আমরা যেন জালে আটকা পড়েছি ছোট্ট এক মাছের মতো, প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে, যাতে আমাদের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ নেই।

মর্নিং সান, ১৯৫২

হপারের ছবিতে পাই প্রশান্তি, কোলাহলশূন্যতা ও স্তব্ধতা। বিষণ্ণতার জন্য তাঁর অধিকাংশ আলোচিত চিত্রকর্ম মানসিক রোগাক্রান্তদের অন্তর্জগতের কথাও বলে। আর এই মানসিক অসুস্থতা এই করোনাকালের অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটা বিষয়। আমরা এখন ভীত, আতঙ্কিত, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় মানসিকভাবে অনেকটা পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো দিন পার করছি। এমন এক সময়ে বাস করছি, যাকে বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা ‘বার্ন আউট’ সংস্কৃতি নাম দিয়েছে এবং এই সংস্থাটি গত বছর দাবি করেছিল, এটি বৈশ্বিক মহামারির জন্ম দেবে, এবং সেটিই সত্যি হয়েছে। অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই আমরা অতি আগ্রাসী এবং গোপনে অনিষ্টকর এক অতি ছোঁয়াচে ভাইরাসের কারণে ঘরে ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছি, বাধ্য হয়েছি নিজেদেরকে শান্ত ও স্থিত করতে।

কেইপ কড মর্নিং, ১৯৫০

কাকতালীয়ভাবে আমাদের ইতিহাসের যুগ শিল্পী হপারের পার করা সময়ের প্রতিধ্বনি তুলতে শুরু করেছে। তিনি পেয়েছিলেন ১৯১৮-এর স্প্যানিশ ফ্লু, ১৯৩০-এর ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’জনিত তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, আর দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। হপার একটা ভয়ের ও অনিশ্চিত পৃথিবীতে বাস করছিলেন, যা তাঁকে বাধ্য করেছিল অশান্ত পরিবেশে একাকী চরিত্র আঁকতে। আমরাও এখন প্রতিনিয়ত এক ভীতিকর-আতঙ্কিত সময় পার করছি। ইতিহাসের এক বিপজ্জনক সংকটের সাক্ষী হতে চলেছি আমরা।

হপারের কাছে আধুনিক জীবন অবন্ধুজনোচিতের চূড়ান্ত। তাঁর চরিত্রগুলোর দূরত্ব-বিচ্ছিন্নতা-একাকিত্বের জন্য কোনো অতিমারির দরকার পড়েনি। কাচের বড় জানালা ঘেরা, উঁচু নাগরিক দালানের স্বয়ংসম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে বাস করা মানুষজন, নির্জন এলাকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাস-স্টেশন—মোটকথা, আধুনিক নগর ও ল্যান্ডস্কেপের নির্মাণই তাঁর কাছে অসম্ভব নিঃসঙ্গতা তৈরির যন্ত্রের মতো। তাঁর চরিত্রগুলোর নিজেদের মধ্যে বিনিময়ের যেন তেমন কিছু নেই। বিচ্ছিন্ন, একাকী, স্বপছন্দের-স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষদের নিয়ে হপারের যে ভয়ংকর কল্পনা-দর্শন, তা আমরা সবাই হয়তো একরকম এড়িয়ে যেতে পারি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তা এখন আমাদের করতে হবে একে-অন্যের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে। এবং আমরা এও জানি, সবাই নিজ বাড়িতে একদম ঠিকঠাক আছে—এটি বর্তমান ভাইরাস অতিমারির একদম শূন্যগর্ভ এক প্রোপাগান্ডা।

সেই অনেক আগে থেকেই ছবিতে ছবিতে হপার যে বার্তা দিয়েছেন তা হলো আধুনিক জীবন হতে পারে ভীষণরকম একাকিত্বের। তাঁর চরিত্রগুলো ডিনার টেবিলে কিংবা রেস্টুরেন্টে যেমন বিচ্ছিন্ন, তেমনি তাদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালায়ও। এই ব্যাপারে তিনি আধুনিকতাবাদী শিল্পকলার প্রতিনিধিত্ব করেন। বিশ্বখ্যাত নরওয়ের এক্সপ্রেশনিস্ট বা অভিব্যক্তিবাদী চিত্রশিল্পী এডওয়ার্ড মুঙ্কও তাঁর বিকট নিশাস্বপ্নের মতো ‘ইভিনিং অন কার্ল জোহান স্ট্রিট’ নামে ১৮৯২ সালে আঁকা ছবিতে দেখিয়েছেন, একটা জটলাও কী ভীষণরকম নিঃসঙ্গ জায়গা হতে পারে।

ইভিনিং অন কার্ল জোহান স্ট্রিট, ১৮৯২

সত্যি বলতে, একাকিত্ব সমসাময়িক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষত ব্যক্তি যখন বড় শহরের বাসিন্দা। এই কারণেই আমাদের সবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি এত আসক্তি। এটি অন্যের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনের একটা মাধ্যম যেমন, তেমনি ভেতরের আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ মুখোশে লুকিয়ে রাখবার অন্তর্জালিক আবরণও বটে।

আমরা এখন নিজেদের বিচ্ছিন্নতা আড়াল করে একরকম ভালোই আছি। হপারের মতো শিল্পীরা এই বিচ্ছিন্নতাকেই আধুনিক অবস্থার নির্ণায়ক বলেছেন। স্বাভাবিক সময়ে আমরা ক্যাফেতেও একা বসি, পার্থক্য এটুকুই; যদিও এখন হাতে থাকে আমাদের ‘সামাজিক’ সত্তার প্রতীক সেলফোন। বাস্তবতা হলো, আধুনিকতা জনসাধারণকে নাগরিক জীবনযাত্রার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা একসময়কার প্রথা ‘যূথবদ্ধতা’কে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা মুক্তি-স্বাধীনতা চেয়েছি বলেই নিঃসঙ্গতাকে বেছে নিয়েছি। কিন্তু হপারের চিত্রকর্ম একটা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে আমাদের—আধুনিক জীবনের স্বাধীনতাই যদি চলে যায় তবে একাকিত্ব ছাড়া আর কী বাকি রইল?

করোনা-বাস্তবতায় আশঙ্কা-উদ্বেগের প্রতীক হয়ে ওঠা হপারের চিত্রকর্ম আবার একইসঙ্গে কিছুটা হয়তো স্বস্তির বাতাসও বইয়ে দিতে পারছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যত বেশি তাঁর ছবিগুলো ভাগাভাগি হচ্ছে, ততই আমরা মনে করতে পারছি, এই করোনাকালে আমরা সবাই একই তরণীর যাত্রী, সবাই ফেসবুক-টুইটার ঘেঁটে চলছি, মানব অস্তিত্বের ভবিতব্য নিয়ে আলোড়িত হচ্ছি সবাই আমরা কমবেশি।

   

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: পূর্ণ স্বীকৃতি কতদূর?



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বলতেই বুঝি বৃটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া এবং বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি দিক নির্দেশক দিন। সেই আন্দোলনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দানা বাঁধে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট আর সমুদ্রসম আত্মত্যাগ এবং অসীম বীরত্বের ফলশ্রুতিতে আমরা পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর বহু পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বাংলাদেশী কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এর নেতৃত্বে পৃথবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের নিয়ে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় দিনটি বিশ্বসভায় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনের জাতিসংঘ ঘোষিত অঙ্গিকার বিশ্বের প্রতিটি ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিদ্যমান প্রায় ৭০০০ ভাষার একটিকে ও আর হারিয়ে যেতে না দেয়া। ইতিমধ্যে আধিপত্যবাদের কারণে ও সচেতন মহলের সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা, সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে।

কাজেই আমাদের বুঝতে হবে, ভাষা আন্দোলনের স্বর্ণখচিত ইতিহাস ও সাফল্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের ((তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য সংগ্রাম করা ও প্রাণ দেয়া একমাত্র জাতিগোষ্ঠী নই। অর্ধ সহস্রাব্দের আগে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ আমেরিকার মায়া,আজটেক,ইনকা নামের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার জাতিসমূহকে জেনোসাইডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে।প্রতি মায়া লোকালয়ে একটি করে পাঠাগার ছিল। এইরকম দশ হাজার লোকালয়ের পাঠাগারের সব বই তারা ধ্বংস করে দেয়। আজকের দিনে মাত্র আদি মায়া ভাষার তিনখানা বই (মেক্সিকো সিটি,মাদ্রিদ ও ড্রেসডেনে) সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধ করেও মায়ানরা পাঠাগারগুলো বাঁচাতে পারেন নি। সাথ সাথে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা।

বাংলাভাষী জনগণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় উল্লেখ্যোগ্য অবদান রয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত মানভূমের বাঙ্গালীদের। বহু বছর সংগ্রাম,রক্ত ও জীবনের মূল্যে তাঁরা তাঁদের দাবি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনের সূচনা আসামের কাছাড়ে।বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ এগার তরুন প্রাণ ঝড়ে পড়েছে এই আন্দোলনে।

১৯৬১-তে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে শামিল হয়। যদিও বরাকের সিংহভাগ জনগণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,তবুও ১৯৬১-তে অহমিয়াকে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ফুসে ওঠেন বরাকের বাঙ্গালীরা।বাংলাভাষা বরাক উপত্যকার অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। সাঁওতাল পরগণার মানভূম জেলা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও তা দীর্ঘকাল বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর সেখানে হিন্দি প্রচলনের কড়াকড়িতে বাংলা ভাষাভাষীরা চাপের মুখে পড়েন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ১৯৪৮ থেকে দীর্ঘ আট বছর চলা এই আন্দোলনের সাফল্যে ১৯৫৬ এর ১ নভেম্বর মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। বিহার থেকে নিয়ে পুরুলিয়াকে যুক্ত করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাথে। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাঁদের সামনে।

এবারে আবার ফিরি ১৯ মে'র ইতিহাসে। আসামের বরাক উপত্যকা আদিকাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। একসময় এই এলাকার অধিকাংশ ডিমাসা জনগোষ্ঠীর কাছাড় রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিমাসা রাজন্যবর্গ ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কালক্রমে ব্রিটিশরা ভারত বিভাগ করে চলে গেলে আসাম প্রদেশের একাংশ সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। সিলেটের একাংশ ও ডিমাসা পার্বত্য ও সমতল অঞ্চল নিয়ে কাছাড় জেলা গঠিত হয়। এই জেলা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (ডিমা হাসাও)এই চার নতুন জেলায় রূপ নিয়েছে।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর থেকেই বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার অধিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকেন। আসাম অহমিয়াদের জন্য এবং বাঙ্গালীরা সেখানে বহিরাগত এমন বক্তব্য ও ওঠে। এখনও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরাও গা ভাসান। বঙ্গাল খেদা আন্দোলনও গড়ে ওঠে একসময়ে। সরকারিভাবে সেসব আন্দোলন ও সহিংসতা দমন হলেও পরবর্তী কালে সময়ে সময়ে এই জাতীয় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।

আসাম রাজ্য বিধান সভায় ভারতের স্বাধীনতার পর পর সদস্যরা বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন।প্রথম আঘাত এলো ভাষার উপর। অহমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা ঘোষণা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর চেষ্টা এবং বিধানসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে আইন চালুর বিরুদ্ধে আসামের বাঙ্গালী জনগণ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আসাম রাজ্য সরকার কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে গেলেন না। তাঁরা অহমিয়া জাতীয়তাবাদ এর সংকীর্ণ মানসিকতার নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বাঙ্গালীরাও সংগঠিত হতে থাকেন।

অনুমান করা যায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।১৯৬০ সালের শেষে আসাম বিধান সভায় ভাষা বিল পাশ হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেলো। বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠলেন। লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকলো।সত্যাগ্রহ,অসহযোগ, হরতাল, রেল রোখো,সংকল্প দিবস, ইত্যাকার অহিংস আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল বরাক উপত্যকা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালের ১৯মে তারিখে বরাকের কেন্দ্রবিন্দু শিলচরের রেলস্টেশনে ভোর থেকে আন্দোলনকারী সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। হাজার হাজার ছাত্র যুবা জনতা রেলস্টেশন প্রাঙ্গন ও রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। তাঁদের সরাতে না পেরে সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। পুলিশ বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। নিহত হন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ মোট ১১ জন ছাত্র যুবা। তাঁরাই একাদশ ভাষা শহীদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা দ্বিতীয় রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়। শিলচর রেলস্টেশনের সামনে স্থাপিত হয় শহীদদের প্রতিকৃতি সম্বলিত শহীদ মিনার। যার পথ ধরে পরবর্তী কালে ছড়িয়ে পড়ে একই আকৃতির শহীদ মিনার সমগ্র বরাক উপত্যকায়। শিলচর রেলস্টেশনের নাম পাল্টে জনতা ভাষা শহীদ রেল স্টশন নাম রেখেছেন। যদিও পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি এখনও তার মেলেনি।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একাদশ শহীদ সহ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সব এলাকার বাঙ্গালিরা কি এই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন? উত্তরটি ‘না’ সূচক। আমাদের কর্তব্য তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী সকলকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হতে শেখে। বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহীদ অমর রহে। বাংলা সহ সকল মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকুক।

এখনও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন নেতৃত্ব দেয়াদের মধ্যে অনেকে। সাথে সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের ও সন্ধান পাওয়া এখনও কষ্টকর নয়। তবে সামনের সিকি শতাব্দীর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। এখনই প্রকৃষ্ট সময় তাঁদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখার। পর্যাপ্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন সেই আন্দোলন,তার কুশীলব এবং শহীদ পরিবার সমূহের বিষয়ে। বীরের সন্মান উপযুক্ত ভাবে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরও অনেক বীরের আমাদের প্রয়োজন। যে মাটিতে বীরের যথাযোগ্য সন্মান নেই, সে মাটিতে বীর জন্মায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ কবি-সাহিত্যিক



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার’ ২০২২ ও ২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন কবি ও সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য কবি আসাদ মান্নান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে কবিতায় পুরস্কার পেয়েছেন- শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক ও রিশাদ হুদা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে মালিক মো. রাজ্জাক। এছাড়া প্রবন্ধে বিলু কবীর, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, অনুবাদে ইউসুফ রেজা এবং কথাসাহিত্য জুলফিয়া ইসলাম।

আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে, কবি খুরশীদ আনোয়ারকে।

কবি আসাদ মান্নান জানান, ২০২৩ সালে কবিতায় মিনার মনসুর ও মারুফুল ইসলাম পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রবন্ধে আসাদুল্লাহ, কথাসাহিত্যে জয়শ্রী দাশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে নাজমা বেগম নাজু, শিশুসাহিত্য আমীরুল ইসলাম এবং অনুবাদে মেক্সিকো প্রবাসী আনিসুজ্জামান।

আগামী ১৯ মে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। পুরস্কার ঘোষণা কমিটির প্রধান ছিলেন কবি শ্যামসুন্দর শিকদার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।

;

ঢাকার মিলনায়তনেই আটকে ফেলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে! 



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে তাদের জন্মজয়ন্তীর জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা কি তবে লুপ্ত হতে চলেছে? দীর্ঘসময় ধরে মহাসমারোহে কয়েকদিন ধরে এসব জন্মজয়ন্তী আয়োজনের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণ দেখিয়ে সেই মাত্রায় আর হচ্ছে না রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর মহাআয়োজন। ঢাকার বাইরে উন্মূক্ত স্থানের বদলে রাজধানীতেই সীমিত পরিসরে মিলনায়তনে আটকে ফেলা হচ্ছে এসব আয়োজনের পরিধিকে। 

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দুই পুরোধা পুরুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে বিশাল আয়োজনে তাদের পরিধিবহুল সৃষ্টিকর্ম ও যাপিত জীবনের আখ্যান তুলে ধরা হতো। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে কবিদের স্মৃতিধন্য স্থানসমূহে এই আয়োজনকে ঘিরে দীর্ঘসময় ধরে চলতো সাজ সাজ রব। যোগ দিতেন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু নানা অজুহাতে পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকাতেই যেমন আটকে যাচ্ছে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় আয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণও কমে এসেছে। 

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এবারও কোন ভিন্নতা থাকছে না জানিয়ে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পালিত হয়। আর মৃত্যুবার্ষিকীগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। যেমন কবি নজরুল ইনস্টিটিউট যেহেতু কবির নামে প্রতিষ্ঠিত, তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ইনস্টিটিউটই আয়োজন করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেভাবে উদযাপিত হয় এবারও সেভাবেই আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৫ মে (২০২৪) বেলা ৪টায় জাতীয় জাদুঘরে শুরু হবে। রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানগুলো কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে অনুষ্ঠিত হত। এই বারও হবে, তবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে হবে না।’

‘ঢাকার বাইরে যেসব জেলাগুলো নজরুলের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট; যেমন-ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা-এসব জেলাগুলোতে নজরুল গিয়েছেন, থেকেছেন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে। এবার জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও ঢাকায় হয়েছে, নজরুলের জন্মজয়ন্তীও ঢাকায় হবে। ঢাকার বাইরে এবার নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে সরকারের কাছে যে যুক্তি তা হচ্ছে-এই সময়ে দেশের উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে। বিশেষত জেলা প্রশাসন এইগুলো আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে থাকে। জেলা প্রশাসনগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকবে। নজরুল জয়ন্তী আয়োজনে মনযোগ হয়ত কম দেবে। যে উদ্দেশ্যে জনমানুষের কাছে পৌছানোর জন্য এই অনুষ্ঠান, তা পরিপূর্ণ সফল হবে না বিধায় এবার এই আয়োজনগুলো ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে’-বলেন সরকারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপনে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আছে। এতে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত ২ এপ্রিল (২০২৪) কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে শিল্পকলা একাডেমিতে এবং নজরুল জয়ন্তী হবে বাংলা একাডেমিতে।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমিতে কিছু রেনুভশন ওয়ার্ক চলমান থাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় মুক্তমঞ্চেও এই আয়োজন না করে জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে নজরুল জয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২৫ মে বেলা ৪টায় উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। স্মারক বক্তা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা।

২৬মে আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসান, এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান। ২৭ মে তৃতীয় দিনের আয়োজনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। শেষ দিনের স্মারক বক্তা কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে জাতীয় কমিটির একজন সদস্যের কাছে জয়ন্তী আয়োজনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যিক ধারা বজায় না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রবীন্দ্র ও নজরুল অনুরাগীরা বলেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-জীবনদর্শন আমাদের পাথেয়। তাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে মহাসমারোহে ঢাকার বাইরে কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে আয়োজনের যে ধারাবাহিকতা ছিল তা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতো। কিন্তু এই আয়োজনকে সীমিত করে রাজধানীর মিলনায়তনে আটকে ফেলা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশকে রূদ্ধ করারই অংশ। এর পেছনে সুক্ষ্ণভাবে কারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

;

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিপাসার্ত ঘোরে

প্রান্তরের মাঝে আছে নিঃস্বতার ডাক
আত্ম অনুসন্ধানের
ফিরতি ঢেউ
আছড়ে পড়ে
আশ্লেষের বালুকাবেলায়
মুমূর্ষু যেমন তীব্র পিপাসায়
জীবনের আলিঙ্গন চায়-
আর্ত রাত্রি হিমেল কামের ঘোর
নীরবে দংশায়
ঘর পোড়ে, আকাক্ষার
বাতি নিভে যায়
কোথায় প্রান্তর, শূন্যতা কোথায়
আছে সে নিকটে জানি
সুদূরের এলানো চিন্তায়
যেখানে গোধূলিদগ্ধ
সন্ধ্যা কী মায়ায়
গুটায় স্বপ্নের ডানা
দেবদারু বনে বীথিকায়
তার দিকে সতৃষ্ণ সমুদ্রঘোর
ছটফট করছি পিপাসায়।

না, পারে না

লখিন্দর জেগে উঠবে একদিন
বেহুলার স্বপ্ন ও সাধনা
বৃথা যেতে পারে না, পারে না।

কলার মান্দাস, নদীস্রোত
সূর্যকিরণের মতো সত্য ও উত্থিত
সুপ্ত লখিন্দর শুয়ে, রোমকূপে তার
জাগৃতির বাসনা অপার
এই প্রেম ব্যর্থ হতে পারে না পারে না

মনসার হিংসা একদিন
পুড়ে টুড়ে ছাই হবে
এমন প্রতীতি নিয়ে স্বপ্নকুঁড়ি নিয়ে
প্রতীক্ষা-পিদিম জ্বেলে টিকে থাকা
এমন গভীর সৌম্য অপেক্ষা কখনো
ম্লান হয়ে নিভে যেতে পারে না পারে না

রেণু রেণু সংবেদবর্ণালি-৮

ক.
আমার না পাওয়াগুলি অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসগুলি
মুক্তি চায়, বেরোতে পারে না
কার্বনের নিঃসরণ
নতুন মাত্রিক আর বিপজ্জনক
সেও তো দূষণ বটে
বলতে পারো প্রণয়দূষণ!

খ.
আদিপ্রাণ বৃক্ষতলে
ছায়াশান্তি মাঙনের সুপ্তি বর্তমান
এসো লই বৃক্ষের শরণ
পরিবেশ প্রশান্তির সেও এক
স্বস্তিমন্ত্র, অনিন্দ্য ধরন।

গ.
নদীকে বইতে দাও নিজস্ব নিয়মে
গলা টিপে ধোরো না ধোরো না,
নদী হচ্ছে মাতৃরূপ বাৎসল্যদায়িনী
দখলে দূষণে তাকে লাঞ্ছিত পীড়িত
হে মানুষ এই ভুল কোরো না কোরো না

ঘ.
উচ্চকিত শব্দ নয় বধিরতা নয়
মৃদু শব্দ প্রকৃতির সঙ্গে কথা কও
শব্দ যদি কুঠারের ঘাতকপ্রতিম
তবে হে মানুষ তোমরা অমৃতের পুত্রকন্যা নও

ঙ.
মৃত্তিকার কাছ থেকে সহনশীলতা শিখি
মৃত্তিকাই আদি অন্ত
জীবনের অন্তিম ঠিকানা
মৃত্তিকাই দেয় শান্তি সুনিবিড়
ক্ষমা সে পরমা
শরীর মূলত মাটি
গন্তব্য যে সরল বিছানা।

ছিন্ন কথন

আমি ভুখা পিপীলিকা
চেয়েছি আলোর দেখা।
পুড়ে যদি মরি তাও
ওগো অগ্নি শান্তি দাও।
অঙ্গার হওয়ার সাধ
এসো মৃত্যু পরমাদ।
চলো ডুবি মনোযমুনায়
এসো এসো বেলা নিভে যায়!

ধ্রুব সত্য

না-পাওয়াই সত্য হয়ে ফুটে থাকে।
পুষ্পিত সে প্রতারণা, চেনা মুশকিল।
বৃতি কুঁড়ি পাপড়িতে মায়াভ্রম লেপটানো
দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা হয়। ছুঁলেই বিপদ।
সেই ফুলে সম্মোহন জড়িয়েমড়িয়ে আছে
কোমলতা লাবণ্যও পুঁজি তার, এমত বিভ্রমে
লোভী ভ্রমরের মতো প্রেমিকারা ছোটে তার কাছে
গিয়ে মোক্ষ পাওয়া দূর, অনুতাপে আহত পাথর
মাথা কুটে মরলেও স্রোতধারা জন্ম নেয় না
যা কিছু হয়েছে পাওয়া, তাও এক দম্ভ সবিশেষ
মর্মে অভ্যন্তরে পশে গতস্য শোচনা নাস্তি
এই বিষ গলাধঃকরণ করে কী যে পাওয়া হলো
হিসাবে নিকাশে মন থিতু নয় সম্মতও নয়
না-পাওয়াই ধ্রুব সত্য চিরন্তন মানুষ-জীবনে!

;