বসফোরাসের সোনালি কোমর জড়িয়ে সুফির চক্রনৃত্য



সরওয়ার মোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ হচ্ছে, লিসা সেন্ট অবিন যুতসই বলেছেন, জীবনের সাথে ছিনালী করা (To flirt with life)। আবার আমাদের অনেকের অত্যন্ত প্রিয় লেখিকা নবনীতা দেবসেন মনে করেন, পর্যটন অনেকটা কৃষ্ণপ্রেম বা মাদকের মতো যার আকর্ষণ উপেক্ষা করা ভক্ত বা আসক্তের পক্ষে অনেকটাই দুঃসাধ্য। পর্যটন বিষয়ে আরেকটা উক্তি মনে পড়ছে—একজন ব্যক্তি যখন বুঝতে পারেন যে, তার জীবন মূল্যহীন, তখন তিনি হয় আত্মহত্যা করেন অথবা দেশভ্রমণ করেন। জীবনের সাথে শেষ ভৌগোলিক ফ্লার্ট করেছিলাম বছরখানেক আগে সিঙ্গাপুর আর ইন্দোনেশিয়া ঘুরে। বছরও ঘোরেনি অথচ এর মধ্যেই গালিভার সিন্ড্রোম মনের ওপর চেপে বসেছে আরব্য রজনীর দৈত্যের মতো—মন-মাঝি আঁকুপাঁকু করছে আবার বৈঠা ধরার। সিদ্ধান্ত নিলাম আত্মহত্যা করব, ঘাবড়াবেন না। অর্থনৈতিক হারাকিরি বা Lucrecide (Financial suicide) করে জগৎ সংসার দেখতে বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছার কথা বলছি।

খেয়াল করলাম, ভ্রমণ পৌনঃপুনিকতায় আমার ট্রাভেল প্রোফাইলে গত কয়েক বছরে প্রাচ্য বেশ এগিয়ে গেছে—যদিও ভূ-পর্যটন শুরু করেছিলাম পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ দর্শন দিয়ে। প্রাচ্যতম দেশ অর্থাৎ জাপানও যখন দেখা হয়ে গেছে, এবার তাই নতুন প্যারামিটার এক্সপ্লোর করতে পছন্দের দেশ প্রতীচ্যের পড়শি তুরস্ক। তুরস্কের বাৎসরিক সেমিনার সিম্পোজিয়ামের লিস্ট দেখে গবেষণা প্রবন্ধের প্রতিপাদ্যসার পাঠালাম সেলজুক (তুর্কিরা উচ্চারণ করে ‘সেলচুক’) ইউনিভার্সিটিতে। সেলচুক বেছে নেওয়ার কারণ হলো এটা আল্লামা রুমীর শহর কোনিয়াতে অবস্থিত। আর বাড়তি পাওনা হলো গুরু-শিষ্যের (রুমী আর শেমসে তেবরিজ) শহর ইস্তাম্বুল থেকে প্রায় সাতশত কিলোমিটার দূরে। ফলে, চৌদ্দশত কিলোমিটার পথ আসা যাওয়াতেই তুরস্কের একটা বিশাল অংশ দেখা হয়ে যাবে। এই আসা যাওয়ার জন্য, প্রসঙ্গত বলা অসঙ্গত হবে না, বাষ্পীয় রথ বা হাওয়াই রথ নয়, আমার পক্ষপাত সরাসরি স্থল শকট অর্থাৎ বাসের দিকে। যুগপৎ রথদর্শন আর রম্ভা ফেরির চেষ্টা আর কি!

সেলচুক ইউনিভার্সিটি

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সেলচুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণপত্র আসলো। আমার কর্মস্থল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিও, এনওসি ইত্যাদি নিয়ে এজেন্সির মাধ্যমে তুর্কি ভিসার জন্য আবেদন করলাম। হাতে সময় একদম কম। এর মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী আটক হওয়ায়, যারা তুরস্ককে তাদের রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে, ঢাকাস্থ তুর্কি দূতাবাস আগের মতো আর বৈধ কাগজপত্র থাকলেই ভিসা ইস্যু করছেনা। তারা রয়ে-সয়ে ভিসা ইস্যু করাতে যাত্রার নির্ধারিত দিনের মাত্র দিন চারেক আগে ভিসা পেলাম। এই ফাঁকে তুর্কি দূতাবাসের ওয়েবসাইটে ঢু মেরে দেখলাম বাংলাদেশি অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীরা বিনা ভিসায় (অর্থাৎ ভিসা অন এরাইভাল) দেশটি সফর করতে পারেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ দীর্ঘদিন ধরে অফিসিয়াল পাসপোর্ট দাবি করে আসছেন। এ সুবিধাটা থাকলে আমাদের শিক্ষক-গবেষকগণ কত হয়রানি আর অহেতুক বাড়তি খরচ থেকে বেঁচে যেতেন! যেমন, একেবারে শেষ সময়ে পাসপোর্ট হাতে পাওয়াতে শুধু বিমান ভাড়া বাবদ আমার বাড়তি খরচ হয়েছে ত্রিশ হাজার টাকা। ভিসা ফিস, এজেন্সি খরচ, হোটেল রিজার্ভেশন ইত্যাদিসহ অহেতুক পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা! অথচ আমার সরকারি পাসপোর্ট থাকলে এই টাকাটা দেশেই থেকে যেত। অবশ্য, সুইস ব্যাংকে যে গরিব দেশের অবৈধ ধনীরা মিলিয়ন-বিলিয়ন পাচার করে, সে দেশের জন্য এ আর এমন কী অর্থ!

যাক, শেষ মুহূর্তে সব প্রস্তুতি তড়িঘড়ি সম্পন্ন করে একুশে অক্টোবর ভোর ছয়টায় টার্কিশ এয়ার লাইন্সে করে ইস্তাম্বুলের উদ্দেশ্য ঢাকা ত্যাগ করি। অনেক বেশি ভাড়া সত্ত্বেও তুর্কি ন্যাশনাল ক্যারিয়ার পছন্দ করার মূল কারণ হলো এতে সরাসরি ঢাকা থেকে সাত ঘণ্টায় ইস্তাম্বুল পৌঁছা যায়। অন্য এয়ার লাইন্স যেমন সৌদি বা কুয়েত এয়ারে অনেক কম খরচে যাওয়া যায় কিন্তু তাতে জেদ্দা বা কুয়েতে ট্রানজিট নিয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে হবে যা বেশ ঝামেলাপূর্ণ আর সময় সাপেক্ষ। তুরস্কে আমার অবস্থানের মেয়াদ ছিল দশদিন। এই সময়ে অফিসিয়াল প্রোগ্রামে উপস্থিতিসহ তুরস্কের মতো একটা বিশাল দেশ দেখা প্রায় অসম্ভব। ইউরোপীয় মানদণ্ডে আন্তঃমহাদেশীয় এই প্রজাতন্ত্র কত প্রকাণ্ড তা ধারণা করতে একটি হিসাব দিয়ে রাখি—তুরস্কের আয়তন ইউরোপের পাওয়ার হাউজ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং সুইজারল্যান্ডের সমন্বিত আয়তনের চাইতেও বেশি! বিশালায়তন তুরস্ক, আহমেদ দাভোটুগ্লু যথার্থ বলেছেন, একটি ইউরোপীয় দেশ, এশীয় দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ—এটি আবার বলকান আর ককেশীয় অঞ্চলের দেশ, কৃষ্ণ আর কাস্পিয়ান সাগরেরও দেশ। এই বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যপূর্ণভূমিতে দশদিনে যতটুকু বতুতাগিরি করে দর্শনানন্দ লাভ করেছি তা সরলরৈখিকভাবে বয়ান না করে ঘটনাক্রম হিসেবে পাঠকদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়াস রাখছি।

ইস্তাম্বুল গ্র্যান্ড এয়ারপোর্টে
টার্কিশ এয়ারে বেশ আয়েশেই যথাসময়ে ইস্তাম্বুলের ঝাঁ চকচকে নুতন এয়ারপোর্টে অবতরণ করি। দিনটি ছিল রৌদ্রস্নাত। টার্মিনাল থেকে ইমিগ্রেশন, পথ দেখি শেষই হয় না। অবশ্য, বিরক্ত লাগেনি মোটেই। পরে জেনেছি, বারো বিলিয়ন ডলারের এই IGA (Istanbul Grand Airport) যার আয়তন প্রায় ঊনিশ হাজার একর (পনেরোটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সমান!) বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান বন্দর। এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান বন্দর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন বিমান বন্দর যার বাৎসরিক যাত্রী হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি ১১০ মিলিয়ন। ২০২৫ সালে IGA এর সবগুলো টার্মিনাল চালু হলে এর ক্যাপাসিটি হবে ২০০ মিলিয়ন! অবশ্য, তুরস্কের আগের প্রিমিয়ার বিমান বন্দরটিও, যার নাম আতাতুর্ক বিমান বন্দর, ৭০ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করে বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরের একটি ছিল।

এরিয়াল ভিউ : ইস্তাম্বুল গ্র্যান্ড এয়ারপোর্ট

যাক, ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মুকুট ইস্তাম্বুলের অর্জনের নূতন পালকটির সুলতানি মাত্রার শানশওকত দেখতে দেখতে ইমিগ্রেশন শেষ করে বাইরে চলে আসি। বলে রাখি, এখানেও ‘দরিদ্রভার্যা সার্বজনীন ভ্রাতৃবধু’ নীতির প্রায়োগিক দিকটি পুনঃঅবলোকন করি। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের তুর্কি দূহিতা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখে বেশ সতর্কতার সাথে কাগজপত্র নিরীক্ষণ করে, তার সিনিয়রের সাথে কথা বলে পাসপোর্টে সিল মারে। ইতর আদম-হাওয়া ব্যাপারীরা বাংলাদেশের ভালে চিরস্থায়ী কলঙ্ক-তিলক পড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলার নবাবজাদে, ঠিকানা ফিন্দিকজাদে
আল্লাহর অশেষ রহমতে বিশ্বের যেসব দেশে গিয়েছি, প্রায় সবখানেই কিছু উন্নত-হৃদয় মানুষ পেয়ে গেছি যাদের আন্তরিকতায় আমার বিভূঁইয়ে অবস্থান স্বস্তিদায়ক আর স্মরণীয় হয়েছে। যেমন, জাপানে পেয়েছিলাম ড. সুমনকে। সুমন কানাজাওয়াকে আমার জন্য চট্টগ্রাম বানিয়ে ফেলেছিলেন। থাইল্যান্ডে দিদার ভাইয়ের সঙ্গ সফরটাকে একেবারে রমণীয় করে তুলেছিল। কুয়ালালামপুরে অবস্থানকালীন ড. শামীম হামিদী আর তার পত্নীর আতিথ্য-উষ্ণতায় মনেই হয়নি বৈদেশে আছি। আর সিঙ্গাপুরে তো একেবারে ঘরের ছেলে জয়নালের সার্বিক তদারকিতে ছিলাম। শ্বেতদ্বীপের লন্ডনে তো রীতিমতো তারকাপুন্জের (Galacticos) আলোয় উদ্ভাসিত ছিলাম। নেপাল-ভারতে গিয়েছিলাম প্রিয় শিক্ষক, সহকর্মী আর শিক্ষার্থীদের আমুদে দলের সাথে। একমাত্র ইন্দোনেশিয়াতে ঘুরেছি যাকে বলে, Alone, all alone।

তো, তুরস্কেও আসার আগে বেশ কজন দেশি তরুণ তুর্কির সাথে যোগাযোগ করে এসেছি। তাদেরই একজন চটপটে, করিৎকর্মা যুবক হেলালী। IGA থেকেই বেশ চড়া দামে Vodafone-এর দশদিনের একটি ট্যুরিস্টপ্যাকেজ কিনি ফলে যোগাযোগের কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। Havaist Bus-এ চেপে মাত্র পনেরো লিরা দিয়ে চলে আসি আক্সারাই মেট্রো স্টেশন। এত উন্নত বাস আর ততোধিক উন্নত সার্ভিস মাত্র ২৩০ টাকায় বাংলাদেশে কষ্ট-কল্পনার বিষয়। স্টেশনের নাম মনে রাখার জন্য আমার নিমোনিক কোড ছিল ‘মোগলসরাই- আকশারাই’। বেশ খোশ মেজাজে আক্সারাই এসে পেয়ে গেলাম তালেবে এলেম হেলালীকে। সেখান থেকে দৃষ্টিনন্দন একটা পার্ক পেরিয়ে ফিন্দিকজাদে—আমার ডেরা হোটেল ইলচুক আর হেলালিদের তুর্কি-মঞ্জিল।

ইস্তাম্বুলে লেখকের ডেরা হোটেল ইলচুক

হোটেলে ওঠার আগে সামনে বার্গার কিংয়ের আউটলেটে দুজনে উদরপূর্তি করলাম। সত্যিকারের মোগল হয়ে হেলালী আমাকে কার্ডে হাত দিতে দিল না। উপরন্তু, রাতের খাবারও তার বাসায় খেতে হলো। ডিনার শেষে রীতিমতো দলবলের এসকর্ট নিয়ে ইলচুক হোটেলে উঠি। নিজেকে মনে হচ্ছিল হাসান আল বলকিয়ার ক্ষুদ্র ভ্রাত! রাত এগারোটার পর নিশাচর হেলালী হোটেল লবি থেকে কল দিল—স্যার আসেন, আপনাকে রাতের ইস্তাম্বুল দেখাব। আমি যেন এই আহ্বানের ইন্তেজারই করছিলাম। ফলে উৎসাহের উত্তাপে অক্টোবরের শীত চাপা পড়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে, তুর্কি চোষ্য-চর্ব্য আস্বাদন আর বিখ্যাত ‘চায়ে’ পান করে হোটেলে ফিরে রাজসিক ঘুম। এক সুখনিদ্রায় রজনী পার! [চলবে]

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;