রবীন্দ্রনাথ, আপনিই পারেন



আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

বাঙালির সামনে আজ সমূহ সংকট উপস্থিত। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সর্বোপরি আত্মপরিচয়ের সংকট যেন তার ক্রমশই প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে। বাঙালির রাজনীতি আজ সন্ত্রাস আর দুর্বৃত্তায়নের অপর নাম। সামাজিক শৃঙ্খলা ও সংহতি দ্রুত অপস্রিয়মাণ। শিল্প ও সংস্কৃতি আত্মবিস্মরণ আর অনুকরণসর্বস্বতায় আকণ্ঠ আকীর্ণ। এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ, সে তার প্রকৃত পরিচয়টুকু পর্যন্ত যেন হারাতে বসেছে আজ। কিংবা হয়তোবা আত্মপরিচয়ের সংকটই তাকে ক্রমে ঠেলে দিচ্ছে অবধারিত পতন ও ধ্বংসের কিনারে।

বাঙালির সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভাষা ও সংস্কৃতি, প্রায় একক প্রচেষ্টায় যার ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আপনি স্বয়ং। শুধু তা-ই নয়, তাকে জগৎসভায় পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন আপনি স্বদেশ ও স্বজনের প্রতি দুর্মর দায়বদ্ধতায়। আজ বাঙালির এই সংকটকালে পুনরায় ফিরে যেতে চাই তাই রবীন্দ্রনাথ আপনারই কাছে, কেননা আপনার হাতেই তো আমরা প্রথম বাঙালিত্বের দীক্ষা নিয়েছিলাম। আপনার জীবন ও কর্মের অনিঃশেষ ঐশ্বর্য আর অফুরান শক্তির ভেতর থেকেই আমরা আজ খুঁজে নিতে চাই আমাদের পরিত্রাণের প্রেরণা ও মুক্তির মন্ত্রণা।

প্রিয় রবীন্দ্রনাথ, আপনিই পারেন আমাদের অন্তর্গত হীনম্মন্যতা দূর করে বিশ্বসভায় পুনরায় বাঙালিত্বের গৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রেরণা যোগাতে। বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে সেই কবে আপনি নোবেল পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছিলেন আমাদের জন্য; বাঙালির নিজস্ব পোশাক পরিধান করে আপনি আবিশ্ব পরিভ্রমণ করেছেন প্রাচ্যদর্শন আর শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী প্রচারের লক্ষ্যে। নিজের বাঙালি পরিচয়টুকু আপনি যে-রকম গর্বের সঙ্গে বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শতবর্ষ আগে, সেই আত্মপরিচয়ের গৌরবটুকু আপনি আমাদের মধ্যে সঞ্চার করে দিন পুনরায়।

আপনিই পারেন রবীন্দ্রনাথ, সাহসের সঙ্গে সত্য উচ্চারণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদে আমাদের উদ্বুদ্ধ করতে। আপনি যে-অপরিসীম সাহস ও শৌর্যের সঙ্গে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করে নাইটহুড প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অন্তর্নিহিত স্ববিরোধ ও সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার প্রতিবাদে এক পর্যায়ে তা বর্জন করেছিলেন; উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের তীব্র নিন্দা করেছিলেন যুগপৎ; জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে পশ্চিমা সভ্যতার নির্মমতা, কপটতা ও অমানবিকতার কড়া সমালোচনা করেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’ ভাষণে; আপনার সেই অতুলনীয় সৎসাহসটুকু আজকের শিরদাঁড়াহীন ভীরু বাঙালির মধ্যে প্রবাহিত করে দিন কবি।

আপনিই পারেন আমাদের নিজস্ব শেকড়টুকু চিনে নিয়ে তাকে জীবনের সাথে মিলিয়ে নেবার শিক্ষা দিতে। আপনি নিজে অভিজাত পরিবারের সন্তান ও নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন সর্বদা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন ছেলেভোলানো ছড়া, পল্লীকবি জসীম উদদীনকে দিয়ে লিখিয়েছেন গ্রামজীবনের গাথা, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনকে দিয়ে সংগ্রহ করিয়েছেন ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ আর নিজে হাসন রাজা, লালন ফকিরের রচনা ও দর্শনকে শ্লাঘার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি আপনার এই অকৃত্রিম অনুরাগ ও মাটিঘেঁষা কৃষ্টিকে ভালোবাসার এই অপার ক্ষমতাটুকু আপনি ঐতিহ্যবিমুখ, শেকড়বিস্মৃত বাঙালির চেতনায় বিকশিত করুন আরেকবার।

আপনিই পারেন আমাদের যাবতীয় কূপমণ্ডুকতা, অন্ধ সংস্কার, জাতিবিদ্বেষ, পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণা বিসর্জন দিয়ে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদিতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, আধুনিকতা ও মানবতান্ত্রিক প্রগতিশীলতার দীক্ষা দিতে। আপনি নিজে কবি হয়েও বিজ্ঞানের অনুরাগী ছিলেন, এতটাই যে, আপনি আইনস্টাইনের সঙ্গে আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে আলোচনা করেছেন সমানে সমানে; বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন আপনার প্রিয়তম বান্ধব। নিজেও আপনি রচনা করেছেন ‘বিশ্ব পরিচয়’ এর মতো মূল্যবান বিজ্ঞানগ্রন্থ। আপনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন ‘বিসর্জন’, ‘অচলায়তন’, ‘রবিবার’ এর মতো সাহসী সব রচনায়। নারীস্বাধীনতার পক্ষে কলম ধরেছেন ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘যোগাযোগ’ ও আরো অনেক লেখায়। নিজের পুত্রকে বিধবা বিবাহ করায় উৎসাহ দিয়েছেন। জাতপ্রথা ও অস্পৃশ্যতার সরব প্রতিবাদ করেছেন ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যে। বিহারের ভূমিকম্পকে ‘ঈশ্বরের অভিশাপ’ আখ্যা দেওয়ায় মহাত্মা গান্ধীর সমালোচনা করতে আপনি পিছপা হননি। হিটলার, মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের সমালোচনা করেছেন, আবার সমালোচনা করেও আস্থা রেখেছেন সোভিয়েত রাশিয়ার সাম্যতন্ত্রে। শিলাইদহে মুসলিম প্রজাদের বসতে দিয়েছেন হিন্দু রায়তদের সঙ্গে একাসনে। আপনার এই অগ্রসর চিন্তা, আধুনিক মানসিকতা আর উদার, সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ভাবনার আলোকে অনগ্রসরতার অন্ধকারে ক্রমনিমজ্জমান আমাদেরকে উদ্ভাসিত করুন আরবার।

আপনিই পারেন আমাদের সব আলস্য আর নিষ্ক্রিয়তা দূর করে দিয়ে কর্মের স্পৃহা আর সৃষ্টির উদ্দীপনায় উজ্জীবিত করতে। আপনি নিজে কবি ও শিল্পী বলে গজদন্তমিনারবাসী হয়ে থাকেননি কখনো। সাগ্রহে হাত লাগিয়েছেন নানান সাংগঠনিক কাজে। পূর্ববাংলার শাহজাদপুর আর পতিসর গ্রামের কৃষকদের সাহায্যার্থে স্থাপন করেছেন এই অঞ্চলের প্রথম কৃষি ব্যাংক, শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বিশ্বভারতী’র মতো অগ্রসর ও ব্যতিক্রমী বিশ্ববিদ্যালয়। তার পাশেই শ্রীনিকেতনে গ্রামোন্নয়নের বিবিধ কর্মযজ্ঞের আয়োজন করেছেন। চাঁদপুরের কালীমোহন ঘোষকে দিয়ে সমবায় প্রথা চালু করেছেন আপনার পৈতৃক জমিদারিতে। আপন পুত্র ও জামাতাকে কৃষি ও উদ্যানবিদ্যা শিখতে পাঠিয়েছেন সুদূর আমেরিকায়। পরিবেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চালু করেছেন বৃক্ষরোপণ আর হলকর্ষণ উৎসব। ইন্দোনেশিয়া থেকে দেখে এসে বাটিকশিল্পের প্রচলন করেছেন শান্তিনিকেতনে, সেখানকার মেয়েদের জুজুৎসু শিখিয়েছেন আত্মরক্ষার উপায়স্বরূপ।

আপনার সেই অদম্য, অনিঃশেষ কর্মস্পৃহা আর প্রাণশক্তির যে-বিচিত্র ও বহুমুখী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জীবনভর, তার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হবে কেবল। তাই সে প্রচেষ্টায় আপাতত ক্ষান্তি দিয়ে শুধু এটুকুই বলি, নিছক দিনযাপনের আর প্রাণধারণের গ্লানিতে প্রায় জীবন্মৃত আমাদেরকে আপনি আপনার সঞ্জীবনী মন্ত্রে জাগিয়ে তুলুন রবীন্দ্রনাথ, আর একটিবার। নইলে যে এই অতলস্পর্শী পতনের পথ থেকে আমাদের ফিরে আসার কোনো পথই খোলা রইবে না আর।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;