ছবির কবিতা—কবিতার ছবি

তানিয়া চক্রবর্তী
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

চিত্রশিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেলের যে ছবিগুলো আমার গোচরে এসেছে প্রত্যেকটি ভিন্ন মাত্রার রূপকে সুন্দর। আমি প্রথমপর্বে চারটি ছবিকে বেছে নিয়েছি। কেন বেছেছি তা একাধারে খুব সহজ অন্যধারে একটু জটিল! লেখনীর ও ছবির যে ভাষ্যকে ব্যক্তিবোধে পছন্দ করি তা একই অঙ্গে বহু রূপের...

ফলত বলা যায় এই চারটি ছবি থেকে এত এত মাত্রায় ভাব এসেছিল যে তা আকর্ষণের কারণ হয়ে গেল। আসলে কবিতাও তো তাই সে তো মুক্ত প্রকৃতি সে যেন ভিন্ন ভিন্ন রূপে ভিন্ন জীবের মায়ার কারণ হয়ে বসে আছে। ছবিগুলো বিশ্লেষণী ধাপ পেরিয়ে হৃদয়ে বসে লিপি ঝরাল ফলে ভাষ্য এলো—“মেলোডি অফ কারনেজ”-এর ৩ ও ১ নং নির্বাচন করে লিখেছি রক্তে বাজে ঝুমুর ১ ও ২। এই দুটি ছবির একটা ছন্দ আছে এবং তা নেতিবাচক... সেই নেতির ইতিউতি পথ ধরে লেখা আপন মনে এসেছে...

ফলে মননশীল পাঠক ও দর্শক নিজের চেতনায় এর মাত্রা খুঁজে নেবেন। অপর দুটি ছবি “ক্যামোফ্লেজ” তিন ও এক যাকে ধরে লেখা হয়েছে “আলাপে গোপন করি আত্মা ১ ও ২”। এই ক্যামোফ্লেজ... তার যে অনুকৃতিতে বেঁচে থাকার কৌশল তা আসলে আত্মগোপন অথচ এটাই আত্মরক্ষা আর এটাই আত্মপ্রকাশের এক বিশেষ ভিত্তি যেন পস্পরবিরোধী কথালাপ... ফলে সচেতনতা অব্যক্ত অনুভূতির পারস্পরিক ক্রিয়ায় এই রচনা এসেছে।


রক্তে বাজে ঝুমুর ১


[Melody of caranage-3 (series work).
Water color on paper. 12 inch X 16 inch.]

ওরা এসেছিল—ওরা চারিদিকে গুলি চালালো—দেখলাম ওদের দুটো হাত, দুটো পা একটা মাথার মতো কিছু—হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে নল—কালো পোশাকে ওরা এসেছিল স্বপ্ন থেকে বাস্তবে—ঘরে আমরা ম্যাজেন্টা রঙ করেছিলাম, দুটো পাশাপাশি দেয়াল সবুজ ছিল,—প্রথমে সব লাল, তারপর কালো করে দিল ওরা—চলে যাওয়ার পর আজানের সুর শুনেছিলাম—আসার আগে চার্চের ঘণ্টা বেজেছিল, আর এই সমস্ত গোলাগুলি ভুলে রেডিওটা তখনও বাজছিল—রাগটার নাম পিলু—

বারুদের গন্ধ মিশেছে আতরের সঙ্গে
বিবাহবাসরে সে হাতে সিগারেট নিয়েছিল
আর তারপর খাট জুড়ে আগুন
এভাবেই হয়, এভাবেই হতে থাকে
খুনের যে করুণ সুর তাতে খুনি রোজ কাঁদে—
এত এত প্রেম নিয়ে খুনির প্রেমিকা
বন্দুকে রাখে ফুল,আর ঝলসে যায় কুঁড়ি
তবু ফুল তো, বলে তুমি প্রেম
“ধংসে যদি বাঁচো, থাকো তবে বেঁচে”
ধোঁয়া ওঠে, বারুদের সুর তাল দেয়
এ যুদ্ধের সুরে প্রেম করে কারা?
এ যুদ্ধের রক্তে স্নান করে কারা?
তারা কি সুরের পাখি!
উড়ে উড়ে আসে, ঝাপটায় ডানা
আর অজস্র তারে বেজে ওঠে বোমা

রক্তে বাজে ঝুমুর ২

[Melody of caranage-1 (series work)
Water color on paper. 12 inch X 16 inch.]

এ বহুতল বাড়ির আঁশখসা জানালা
যেন মাছের গায়ে মাছ লেগেছে মাংস ছাড়া,
মাংস আমার রজ্জু দেখে সর্পভ্রম
মাংস আমার চিতা হয়ে কবর হয়ে
কোথায় যেন ঘুরে ফিরে এইখানেতেই আসে,
দেহ দেব দেহ নেব
দেহের ভেতর দাঁড়ি, কমা, রক্তহীনের প্রেম
এ প্রেম ঘরের মধ্যে ছাদ হয়ে
মেঝের বুকে নামে—
যেন মরণকালে বীণার তারে সুর বেঁধেছি
বুকের ওপর বুক লেগে যায়
বুক তো নয় শ্বাসের সঙ্গে শ্বাস
সুরের জন্য সুর জেগেছে
ঘুমের ঘোর ভুল বকেছি
তবু দেখি মাংস ছাড়া স্বাধীন শরীর
হাড়ের তখন বাজনা বাজায়
আত্মা তবে যায় কোথায়?
এত এত ফাঁক নিয়ে দেহ নামের ঘুষ খেয়েছি
পাপের সুর পুণ্য মেলে নিলামিতে
হাড়ের মধ্যে ডুগডুগিরা বেজেই চলে, বেজেই চলে

আলাপে গোপন করি আত্মা ১

[Camuflage-3. Water color on paper
48 inch X 60 inch]

এ নীল দেহে অভিষিক্ত সে লুকিয়ে থাকা।
আমি গল্প বলি, সে গল্প হয়।
পাতার শরীরে মোড়া আত্মগোপনে
এসে লুকোচুরি খেলি—
এ মস্তিষ্ক হলো সেই সম্পদ ও পাপ
যা বাঁচিয়ে খাবে নিজেকেই
দেহ মেশে দেহে, দেহ মেশে পাতায়
মিশে মিশে এ প্রাণ বেঁচে যায় খুব
এসো, দেখো, পুষেছি মথের দল
আমাকে খেয়ালে রেখে উড়ে গেছে তারা
এ কাস্তে জীবন সানকি থেকে
শুষে নেয় স্বপ্ন স্বপ্ন খেলা—

আলাপে গোপন করি আত্মা ২

[Camuflage-1. Water color on paper
48 inch X 60 inch]

নেভাও তুমি
নিভিয়ে নিভিয়ে জ্বালিয়ে দাও
এই একক দেহে শত দেহ
দেহের ভেতর খিদের বাস
খাদ্য হয়েই খাদ্য বাঁচে
আমার ভেতর আমায় ধরো
তোমার ভেতর আমার খেলা
আমায় তুমি আমি করে
তোমায় তুমি আমি করে
যে মরণখোলস বাঁচাও
তা ধাঁধার শরীর, কেউ চেনে না প্রিয়!
এসো লুকোও তবে
জাপটে ধরে যুত করে লুকিয়ে রাখো
এই আত্মগোপন আত্মা খেলা—
সবাই যখন বাঁচবে বলে ভাবে
মৃত্যু তখন লুকিয়ে লুকিয়ে আসে

আপনার মতামত লিখুন :