স্কুল ইন্সপেক্টর



এম আতহার তাহির ।। অনুবাদ : জিয়া হাশান
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

লাঙল নিয়া মিস্ত্রির কাছে যাচ্ছে এমন এক কৃষকের কাছে ইন্সপেক্টর স্কুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন।
: হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখানে একটা স্কুল আছে। গ্রামের বাইরে মনে হয়।
সে তার ধুলামাখা চামড়া ফাটা খসখসে আঙুল তুলে গ্রামের বাইরে যাবার রাস্তা খায়ে দ্যাখায়ে দেয়। ইন্সপেক্টর তাকায়ে দ্যাখেন—উঁচানিচা এবড়োথেবড়ো রাস্তা। তার এখানে সেখানে পানি জমে কর্দমাক্ত। বাকিটুকু ধুলোময়। তা ক্ষেতের কাছে গিয়া শেষ হয়েছে। তিনি তাই দুই ক্ষেতের মাঝখান দিয়া চলে যাওয়া সে রাস্তা ধরে আগান। দূর থেকে এক সাইকেল আরোহীকে আসতে দ্যাখেন। ইন্সপেক্টরের কাছে এসে সে থামে এবং সাইকেল থেকে নেমে সম্ভ্রমে রাস্তার পাশে দাঁড়ায়। তার কাছে ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করেন—স্কুল কোথায়?
: স্কুল?
: হ্যাঁ
কয়েকটা মাঠের ওপারে একটা বড় গাছের দিকে ইশারা করে সে বলে—ঐ যে শিশাম গাছ দেখছেন তার নিচে।
: আমার সাথে গিয়া একটু দ্যাখিয়ে দিতে পারবে?

শহরের সাহেবকে সহায়তা করতে গ্রামের লোকটা সানন্দে রাজি হয়ে যায়। কেননা স্কুলের ছেলেমেয়েরা এবং মাস্টারসাব কিংবা পথচারীরা যদি তাকে শহরের এই সাহেবের সাথে দেখে তাহলে নিশ্চয়ই গ্রামে তার মান-সম্মান বেড়ে যাবে। এ ভাবনায় তার বুক ফুলে ওঠে। সে পথ দেখায়ে আগায়—সাহেবজি, স্কুল মাস্টার খুব ভালো। দারুণ পরিশ্রম করেন।

কিন্তু স্কুল ইন্সপেক্টর কোনো জবাব দেন না। জেলাজুড়ে এইসব স্কুলের পিছে পিছে ঘোরা অনেকটা নিষ্ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা নোংরা শহর, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং তার জিপ যেতে পারে না এমন প্রত্যন্ত গ্রামে স্কুলগুলো ছড়ানো-ছিটানো। আর তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। খুবই হতাশাজনক। গত তিন বছরে এসব তার গা-সওয়া হয়ে যাবার কথা। কিন্তু না। প্রতিটা স্কুল তাকে এখনো আহত করে। কেননা এগুলোতে সাজ-সরঞ্জামের অভাব, স্থানীয় লোকজনের অনাগ্রহ আর ছাত্রছাত্রীরা যেমন অলস তেমনি শিক্ষকরাও পরজীবী। এসব আজকাল মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে তিনি নিজে কি করতে পারেন? সুপারিশ আর সুপারিশ। আর প্রতিটা সুপারিশই পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ ছেঁটে ফ্যালে। তাদের কাজই যেন স্বল্প পরিকল্পনা আর সামান্য উন্নয়ন।

তারা ফসলের ক্ষেতের মাঝ দিয়া আগান। তার কোনোটা কেবল চাষ দেওয়া আবার কোনোটায় গমের চারা মাথা তোলা। এক জায়গায় দেখা যায় জমি খুব নিচু। ফলে সেখানে পানি জমে ছোটখাট ডোবার মতো হয়ে আছে। তার ওপর পোকামাকড়ের ওড়াউড়ি আর জলে শ্যাওলার ভেসে বেড়ানো চোখে পড়ে। তারা কাছে যেতই একটা গুঞ্জন ওঠে। স্কুল ইন্সপেক্টর হাত নেড়ে মুখের কাছে আসা পোকামাকড় তাড়ায়ে দেন।

গ্রামের লোকটা লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হাঁটে। ফলে তার সাইকেলের ঢিলা বেল ঝনঝন করতে থাকে। তবে তার বিবর্ণ জুতার এখানে সেখানে কয়েটা তালি দেওয়া ও সেলাই করা এবং হিল ভাঙা। ফলে তা পায়ে দিয়া হাঁটতে তার কষ্টই হয়।

তারা কান পর্যন্ত উঁচু ভুট্টো গাছের এক ক্ষেত পাড়ি দিতেই দ্যাখেন শিশাম গাছ। চাষ করে বীজ রোপণের উপযোগী করা একটা ক্ষেতের পাশে ছায়াদানকারী গাছটা দাঁড়ানো। কিন্তু সেখানে তো আর কিছু নাই। গ্রামের লোকটা হতাশায় ভেঙে পড়ে—হ্যাঁ, স্কুলটা তো এখানেই ছিল। এই জমি চাষ দেওয়ার আগে এখানেই আমি দ্যাখছি।
: তাহলে?
: মনে হয় অন্য কোথাও চলে গেছে।
: কিন্তু তার ঘর?
: ঘর?
: এখানে কোনো ঘর ছিল না? স্কুল ঘর?
: না, জনাব, কোনো ঘর নাই স্কুলের। মাস্টারসাব তাঁর সাথে সাথে স্কুল নিয়া বেড়ান। তিনি যেখানে যান স্কুল সেখানে যায়।

তাহলে এখন কী করা, ইন্সপেক্টর কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না।

তখন গ্রামের লোকটা কয়েকটা ক্ষেত ওপাড়ের একটায় নিড়ানি দিতে এক লোককে দেখে তার পানে চিৎকার ছুড়ে দেয়—‘হেই মিয়া!’ ডাক শুনে নিড়ানি দেওয়া লোকটা কাজ রেখে তাদের দিকে ফেরে। ফলে তার চোখের ওপর সরাসরি সূর্যের রশ্মি পড়ে। তাই হাত দিয়া ছায়া তৈরি করে সে তাকায়।
: হেই মিয়া! স্কুল কোথায়? এই সাহেব শহর থেকে স্কুল দেখতে এসেছেন।
: স্কুল? ছেলেপেলেগুলা আখক্ষেতের দিকে আছে। সকালে তাদের ওদিকে যেতে দেখেছি।

ঘন ও পরিপুষ্ট আখে ভরা ক্ষেত। ধূসর সবুজ ও গোলাপি তাদের গায়ের রং। মাথায় ঘন সবুজ পাতা। বাতাসে তাদের মৃদু-মন্দ নড়াচড়া। তার পাশে চাষ দিয়া তৈরি করা আরো অনেক ক্ষেত। তারা তাই এদিকওদিক তাকান কিন্তু আর কিছুই চোখে পড়ে না। ফলে গ্রামের লোকটা হতবুদ্ধ হয়ে পড়ে—নিড়ানি দেওয়া লোকটা আখক্ষেতের কথাই তো বলেছিল, তাই না?
: হ্যাঁ, ইন্সপেক্টরের স্বরে বিরক্ত বাসা বাধা।
: তাহলে হয়তো ক্ষেতের ওপাশে হবে।
ভ্রু কুঁচকে ইন্সপেক্টর বলেন—শোনেন, আপনি গিয়া খুঁজে দেখেন। পেলে আমাকে এসে জানান।

গ্রামের লোকটা পাশেই সাইকেল শোয়ায়ে রেখে খুঁজতে চলে যায়। স্কুল ইন্সপেক্টর রাস্তার পাশে বসে সামনের দিগন্তজোড়া পরিষ্কার নীল আকাশ ছোঁয়া ধূসর মাঠ, উঠতি ফসল আর সবুজের নিস্তেজ ছায়ার পানে তাকান। দেখেন দূরের গাছে কয়েকটা কাক আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। আর আকাশের উঁচুতে অলস বিন্দুর মতো কয়েকটা চিল ঘোরাঘুরি করছে। আর কিছু ছোট ছোট পাখি কিচিমিচির জুড়ে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ পরে চিৎকার কানে আসে। গ্রামের লোকটা ফিরছে। নানা অঙ্গভঙ্গির সাথে সে ছুটে আসছে। তাকে দেখেই ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়ান। তার শরীরের মাংশপেশিগুলা যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। বুঝতে পারেন যে, তিনি নিজেই অচল হয়ে যাচ্ছেন। এখন তার দরকার অফিসে, জিপের সিটে কিংবা যেসব স্কুল পরিদর্শন করেন তার চেয়ারে বসে থাকা।

গ্রামের লোকটার মুখে বিজয়ের হাসি—‘স্কুল খুঁজে পাইছি।’ তারপর ইন্সপেক্টরকে ক্ষেতের ভেতর দিয়া পথ দেখান।

ইন্সপেক্টর দ্বিধা নিয়া আগান। কেননা ঘন আখক্ষেতের ভেতরে ছিনতাই করে সবকিছু নিয়া গেলে কেউ কিছু টের পাবে না। কিন্তু আখের সবুজ পাতা তার মুখে ও হাতে আঁচড় কাটা শুরু করলে তিনি হাত দিয়া তাদের সামলে নিয়া সামনে তাকান। দেখে নেন কোথায় যাচ্ছেন। মাটি উঁচা-নিচা তাই বেশ কয়েকবার তাকে হোঁচট খেতে হয়। তারপর ক্ষেতের মাঝ বরাবর শোরগোল ও গাছের নড়াচড়া লক্ষ করে তারা আগাতে থাকেন। পৌঁছে দেখেন আখগাছ পরিষ্কার করে খোলা মতো একটা জায়গা। সেখানে মাটির ওপর গায়ে গায়ে ঘেঁষে বসা জন চল্লিশেক শিক্ষার্থী। কোনো মাদুর-ম্যাট চোখে পড়ে না। ক্ষেত ভেঙে আসার সময় শোনা শোরগোল এখানে এসে হঠাৎ থেমে যাওয়ায় কানে বাজে। তবে শিক্ষার্থীদের দেখে মনে হয়, তারা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নামতা মুখস্থ করছিল। বাকিরা ঝুঁকে পড়ে স্লেট বা বোর্ডে লিখছিল। কয়েকটা বোর্ড আবার সূর্যের দিকে মুখ করে আখগাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা। তাতে তখনো কালির দাগ তরতাজা।

শিক্ষার্থীদের মাঝখানে একটা নড়বড়ে চেয়ারে বেত হাতে এক বয়স্ক লোক বসা। দেখেই বোঝা যায় চেয়ারটাতে কয়েকবার জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। তাই জোড়ায় জোড়ায় বাড়তি পেরেক মারা। আর পিছনের মূল ফ্রেমের সাথে আরেকটা তক্তা আঁটা। তাছাড়া বসার ও হেলান দেবার কাঠের যেসব জায়গায় পচন ধরেছে সেখানে বিসদৃশ্যভাবে তক্তা লাগানো। ইন্সপেক্টরকে দেখে মাস্টারসাব উঠে দাঁড়ান। তার খালি পা জুতো খুঁজে নেয়।

মেন্টর ইংরেজিতে কমান্ড করে—‘ক্লাস স্ট্যান্ড।’ সাথে সাথে সব শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়ায় এবং তাদের জামার পেছনের ধুলো ঝেড়ে নেয়। স্কুল ইন্সপেক্টর আসায় মাস্টারসাব অস্থির হয়ে পড়েন। থির হতে কিছু সময় নেন। তারপর কাঁধের রুমালে চেয়ারের ধুলোবালি ঝেড়ে নিয়া তাতে বসার জন্য ইন্সপেক্টরকে অনুরোধ জানান। তার সাথে আসা গ্রামের লোকটা স্বস্তি বোধ করে। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইন্সপেক্টর বিদায় জানান। সাথে সাথে সে হাওয়া হয়ে যায়।

: হুজুর! হুজুর!!
ইন্সপেক্টর চারদিকে তাকান—এই তাহলে স্কুল?
মাস্টার সাব ঢোক গেলেন—জি, সাব।
: আপনি এদের কী কী পড়ান? প্রশ্ন করে তিনি আবার মাস্টারসাবের ঢোক গেলার শব্দ শুনতে পান।
: উর্দু, অঙ্ক, ইংরেজি আর হাতের লেখা শিখাই, স্যার।
: সরকার নির্ধারিত বই থেকে?
: জি স্যার, সরকার নির্ধারিত বই থেকে।
তিনি চেয়ারের পায়ার কাছ থেকে পাতা ছেঁড়া কতগুলো আস্তো বই তুলে স্কুল ইন্সপেক্টরের হাতে দেন।

ইন্সপেক্টর উর্দু টেক্সট বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা অধ্যায়ে গিয়া থামেন। একজন ছাত্রকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকে।
: স্যারজি, বইটা ক্লাস ফোরের কিন্তু ছেলেটা ক্লাস টুয়ের।
: এখানে তাহলে কয়টা ক্লাস আছে?
: ছয়টা, স্যারজি। ক্লাস ওয়ান থেকে সিক্স।

ইন্সপেক্টর যাদের একটা দল বলে ভেবেছিলেন এতক্ষণে তাদের ভাগটা বুঝতে পারেন। মাস্টারসাব তার হাতের বেত দিয়া ইঙ্গিত করে বলেন—স্যারজি, ও ক্লাস ফোরে।
তাকে ইন্সপেক্টর নির্দেশ দেন—তুমি পড়ো।

ছেলেটা উঠে দাঁড়ায়ে পড়া শুরু করে। স্পষ্ট উচ্চারণে জোরালো কণ্ঠে সে পড়ে যায়। কোনো ভুল নাই, এতটুকু তোতলামি নাই। ফলে মাস্টারসাবের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। তিনি অনুরোধ করেন—স্যারজি, অন্য ক্লাসের একজনরে ধরেন।

স্কুল ইন্সপেক্টর ক্লাস টুয়ের শিক্ষার্থীদের একটা অংক কষতে দেন। তা অধিকাংশেরই সঠিক হয়। ক্লাস ওয়ানের একজোড়া ছাত্র মুখস্থ রাখতে সুবিধা হয় সেরকমভাবে গানের সুরে সুরে ছন্দের তালে তালে আগে-পিছে মাথা দুলিয়ে ইংরেজি অক্ষরগুলো নির্ভুলভাবে আবৃত্তি করে। একই সুরে সুরে বা বা ব্লাক শিপ ছড়াটা পড়ে শোনায় ক্লাস সিক্সের একটা ছেলে। যদি সে অন্তর থেকে তা করে থাকে তাহলে বলতে হবে চমৎকার হয়েছে। আর যদি বই থেকে পড়ে থাকে তাহলে উত্তম হয়েছে বলে ইন্সপেক্টরের মনে হয়। তাই স্বীকার করতেই হয় যে, তার আওতাধীন প্রাথমিক স্কুলগুলোর তুলনায়, যে কোনো বিচারেই হোক, এটার মান অনেক উঁচুতে। সুতরাং এই স্কুল মাস্টারের সুখ্যাতি অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য। শিক্ষার্থীদের পারফমেন্সে সন্তোষ প্রকাশ করে ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়ান। ফলে চেয়ারটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে ওঠে। তবে মাস্টারসাবকে উদ্দীপ্ত দেখায়।

মেন্টর চিৎকার করে ওঠে—‘ক্লাস স্ট্যান্ড।’ আগেরবারের তুলনায় এবারেরটা অনেক জোরালো। ইন্সপেক্টর চলে যাবার পথ ধরেন। বেত হাতে মাস্টারসাব তার পিছু নেন। তাদের গ্রামের হালহাকিকত ও আরো অনেক বিষয় নিয়া কথা বলতে থাকেন। ক্ষেতের বাইরে বের হয়ে তবেই ইন্সপেক্টর স্বস্তি বোধ করেন। তখন জিজ্ঞাস করেন—আপনি স্কুলের স্থান বদল করেন কেন? এখানে ভাড়ায় ঘর পাওয়া যায় না?
: ভাড়ায়, স্যারজি?
: তাহলে তো ভালো হয় ।
: না, না, সাবজি। কেউ-ই আমাদের ঘর দিতে চায় না। তারা চায় না এখানে স্কুল হোক। সে কথা তারা বহুবার বলেছে। তারা মনে করে তাদের সন্তানদের সময় অপচয় হচ্ছে। কোথাও কাজ করা, বাবাকে ক্ষেতখামারে সহায়তা করা কিংবা গরু-বাছুর চড়ানোর বদলে এখানে এসে তারা দুষ্টুমি করছে। গ্রাম-প্রধান চৌধুরী আলী মোহম্মদই একমাত্র আমাদের প্রতি দয়া দেখিয়েছেন, স্যারজি। তিনি মনে করেন শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনিও আমাদের ঘর দেননি। কিংবা এক খণ্ড জমি। কিন্তু ক্ষেতে চাষবাস শুরু করার আগ পর্যন্ত গত মৌসুমের পুরোটা সময় তিনি আমাদের শিশাম গাছের ছায়াটা দিয়েছিলেন। আর এই মৌসুমে আমরা তার এই আখক্ষেত ব্যবহার করছি।
: আপনাদের জন্য আখক্ষেতের মাঝখানটা খালি করে দিয়া তিনি ভালোই করেছেন।
: হ্যাঁ, সাবজি। মাঝখানটা খালি করে দিয়া তিনি ভালো করেছেন। স্কুলের ছেলেরা ও আমি মিলে তার এ জায়গার আখ কেটে দিয়েছি, স্যারজি। তার জন্য আমার তিন দিন কাজ করেছি। এমনকি ক্লাস ওয়ানের ছেলেরাও। সকাল আটটা থেকে মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত। শেষে ঘন অন্ধকার নেমে এলে আমরা আঁটি বেঁধে বেঁধে চৌধুরীর গরুর গাড়িতে তুলে দিয়েছি। চৌধুরী বলেন, আমাদের অবশ্যই শিক্ষার মূল্য দিতে হবে। তাই এইভাবে আমাদের তা দিতে হয়েছে বলে মাস্টারসাব মাথা থেকে তাঁর সাদা পাগড়ি খুলে দেখান। সেখানে তাঁর মেহেদিরঙা চুলের মাঝখানে এক ফালি টাক। তাঁর চোখে পানি চলে আসে। কিছুক্ষণের জন্য কণ্ঠ ফুঁপিয়ে ওঠে। শেষে পাগড়ি আবার মাথায় দিয়া অন্য দিকে তাকায়ে বলেন—আঁটিগুলো বয়ে নিয়া যেতে গিয়া আমার মাথার চুল পড়ে গেছে।

তারা আরো সামনে হাঁটতে থাকেন। স্কুল ইন্সপেক্টর আলপথে আর ক্ষেতের ওপর দিয়া বিসদৃশ্যভাবে তার পাশে পাশে কিছুটা খাটো দেহের মাস্টারসাব। তিনি নরম কণ্ঠে বলেন—সাবজি, যদি আমাদের একটা ঘর থাকত, কেবল একটা ঘর, যদি ঘর নাও হয় একখণ্ড জমি। তাহলে ছেলেপেলেদের নিয়া আমি নিজেই তা বানিয়ে নিতাম। তাতে হয়তো পুরো একটা মৌসুম লেগে যেত, স্যারজি। তবু আমরা তা করে নিতে পারতাম।

স্কুল ইন্সপেক্টর নীরবে হাঁটতে থাকেন।

: আমি বুঝি, স্যারজি, একখণ্ড জমি অনেক দামি আর লোকজনও এতটুকু চায় না স্কুল। তবে যে কোনো জায়গায় জমি হলে আমার আপত্তি নাই। গ্রামের কামলা-কিষাণরা যে এলাকায় থাকে সেখানে কিছু জমি আছে। তাই সেখানে স্কুল নিয়া যেত হলেও আমরা খুশি হব, স্যারজি। একখণ্ড জমিই ভালো...

স্কুল ইন্সপেক্টর নীরব। তিনি ইতিমধ্যেই তার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হিসাবে দেখে ফেলেছেন। কেননা প্রাইমারি স্কুলের জন্য সরকার কোনো জমি বা ঘর দেয় না। স্থানীয় লোকজনকেই তা দিতে হয়। সুতরাং এখন কেন তা বদলানো হবে। আইন আইনই। এমন আইনও আছে যা শত শত বছর ধরে মেনে চলা হচ্ছে। স্বাধীনতার পরও তার কোনো বদল হয়নি। তখন যা ভালো ছিল এখনো তা-ই ভালো হয়ে আছে। সর্বোপরি আছে ব্যয় সংকোচন। সর্বত্র তিনি তা শুনতে পান। তাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। ছ্ট্টো একখণ্ড জমি—শুধু এইটুকুমাত্র চাওয়া। কিন্তু তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক কয়জন আছে। কতজনই বা এমন আন্তরিক হয়েও এরকম হতাশার মুখোমুখি। এই তিন বছরের চাকরি জীবনে তিনি আর একটি মুখও মনে করতে পারেন না।

তিনি জিপে ওঠেন। ইঙ্গিতে মাস্টারসাবের বিদায়ী সালামের জবাব দিলে গাড়ি চলতে শুরু করে। তবে মাস্টার সাবের চোখে চোখ রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব হয় না।


এম আতহার তাহির
পাকিস্তানের এই গল্পকারের জন্ম ১৯৫১ সালে। লাহোর সরকারি কলেজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় তিনি পড়াশোনা করেছেন। ১৯৮৪ সালে তিনি হুবার্ট এইচ হামফ্রে ফেলোশিপ লাভ করেন। প্রধানত ইংরেজিতেই তাঁর লেখালেখি। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;