স্কুল ইন্সপেক্টর



এম আতহার তাহির ।। অনুবাদ : জিয়া হাশান
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

লাঙল নিয়া মিস্ত্রির কাছে যাচ্ছে এমন এক কৃষকের কাছে ইন্সপেক্টর স্কুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন।
: হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখানে একটা স্কুল আছে। গ্রামের বাইরে মনে হয়।
সে তার ধুলামাখা চামড়া ফাটা খসখসে আঙুল তুলে গ্রামের বাইরে যাবার রাস্তা খায়ে দ্যাখায়ে দেয়। ইন্সপেক্টর তাকায়ে দ্যাখেন—উঁচানিচা এবড়োথেবড়ো রাস্তা। তার এখানে সেখানে পানি জমে কর্দমাক্ত। বাকিটুকু ধুলোময়। তা ক্ষেতের কাছে গিয়া শেষ হয়েছে। তিনি তাই দুই ক্ষেতের মাঝখান দিয়া চলে যাওয়া সে রাস্তা ধরে আগান। দূর থেকে এক সাইকেল আরোহীকে আসতে দ্যাখেন। ইন্সপেক্টরের কাছে এসে সে থামে এবং সাইকেল থেকে নেমে সম্ভ্রমে রাস্তার পাশে দাঁড়ায়। তার কাছে ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করেন—স্কুল কোথায়?
: স্কুল?
: হ্যাঁ
কয়েকটা মাঠের ওপারে একটা বড় গাছের দিকে ইশারা করে সে বলে—ঐ যে শিশাম গাছ দেখছেন তার নিচে।
: আমার সাথে গিয়া একটু দ্যাখিয়ে দিতে পারবে?

শহরের সাহেবকে সহায়তা করতে গ্রামের লোকটা সানন্দে রাজি হয়ে যায়। কেননা স্কুলের ছেলেমেয়েরা এবং মাস্টারসাব কিংবা পথচারীরা যদি তাকে শহরের এই সাহেবের সাথে দেখে তাহলে নিশ্চয়ই গ্রামে তার মান-সম্মান বেড়ে যাবে। এ ভাবনায় তার বুক ফুলে ওঠে। সে পথ দেখায়ে আগায়—সাহেবজি, স্কুল মাস্টার খুব ভালো। দারুণ পরিশ্রম করেন।

কিন্তু স্কুল ইন্সপেক্টর কোনো জবাব দেন না। জেলাজুড়ে এইসব স্কুলের পিছে পিছে ঘোরা অনেকটা নিষ্ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা নোংরা শহর, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং তার জিপ যেতে পারে না এমন প্রত্যন্ত গ্রামে স্কুলগুলো ছড়ানো-ছিটানো। আর তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। খুবই হতাশাজনক। গত তিন বছরে এসব তার গা-সওয়া হয়ে যাবার কথা। কিন্তু না। প্রতিটা স্কুল তাকে এখনো আহত করে। কেননা এগুলোতে সাজ-সরঞ্জামের অভাব, স্থানীয় লোকজনের অনাগ্রহ আর ছাত্রছাত্রীরা যেমন অলস তেমনি শিক্ষকরাও পরজীবী। এসব আজকাল মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে তিনি নিজে কি করতে পারেন? সুপারিশ আর সুপারিশ। আর প্রতিটা সুপারিশই পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ ছেঁটে ফ্যালে। তাদের কাজই যেন স্বল্প পরিকল্পনা আর সামান্য উন্নয়ন।

তারা ফসলের ক্ষেতের মাঝ দিয়া আগান। তার কোনোটা কেবল চাষ দেওয়া আবার কোনোটায় গমের চারা মাথা তোলা। এক জায়গায় দেখা যায় জমি খুব নিচু। ফলে সেখানে পানি জমে ছোটখাট ডোবার মতো হয়ে আছে। তার ওপর পোকামাকড়ের ওড়াউড়ি আর জলে শ্যাওলার ভেসে বেড়ানো চোখে পড়ে। তারা কাছে যেতই একটা গুঞ্জন ওঠে। স্কুল ইন্সপেক্টর হাত নেড়ে মুখের কাছে আসা পোকামাকড় তাড়ায়ে দেন।

গ্রামের লোকটা লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হাঁটে। ফলে তার সাইকেলের ঢিলা বেল ঝনঝন করতে থাকে। তবে তার বিবর্ণ জুতার এখানে সেখানে কয়েটা তালি দেওয়া ও সেলাই করা এবং হিল ভাঙা। ফলে তা পায়ে দিয়া হাঁটতে তার কষ্টই হয়।

তারা কান পর্যন্ত উঁচু ভুট্টো গাছের এক ক্ষেত পাড়ি দিতেই দ্যাখেন শিশাম গাছ। চাষ করে বীজ রোপণের উপযোগী করা একটা ক্ষেতের পাশে ছায়াদানকারী গাছটা দাঁড়ানো। কিন্তু সেখানে তো আর কিছু নাই। গ্রামের লোকটা হতাশায় ভেঙে পড়ে—হ্যাঁ, স্কুলটা তো এখানেই ছিল। এই জমি চাষ দেওয়ার আগে এখানেই আমি দ্যাখছি।
: তাহলে?
: মনে হয় অন্য কোথাও চলে গেছে।
: কিন্তু তার ঘর?
: ঘর?
: এখানে কোনো ঘর ছিল না? স্কুল ঘর?
: না, জনাব, কোনো ঘর নাই স্কুলের। মাস্টারসাব তাঁর সাথে সাথে স্কুল নিয়া বেড়ান। তিনি যেখানে যান স্কুল সেখানে যায়।

তাহলে এখন কী করা, ইন্সপেক্টর কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না।

তখন গ্রামের লোকটা কয়েকটা ক্ষেত ওপাড়ের একটায় নিড়ানি দিতে এক লোককে দেখে তার পানে চিৎকার ছুড়ে দেয়—‘হেই মিয়া!’ ডাক শুনে নিড়ানি দেওয়া লোকটা কাজ রেখে তাদের দিকে ফেরে। ফলে তার চোখের ওপর সরাসরি সূর্যের রশ্মি পড়ে। তাই হাত দিয়া ছায়া তৈরি করে সে তাকায়।
: হেই মিয়া! স্কুল কোথায়? এই সাহেব শহর থেকে স্কুল দেখতে এসেছেন।
: স্কুল? ছেলেপেলেগুলা আখক্ষেতের দিকে আছে। সকালে তাদের ওদিকে যেতে দেখেছি।

ঘন ও পরিপুষ্ট আখে ভরা ক্ষেত। ধূসর সবুজ ও গোলাপি তাদের গায়ের রং। মাথায় ঘন সবুজ পাতা। বাতাসে তাদের মৃদু-মন্দ নড়াচড়া। তার পাশে চাষ দিয়া তৈরি করা আরো অনেক ক্ষেত। তারা তাই এদিকওদিক তাকান কিন্তু আর কিছুই চোখে পড়ে না। ফলে গ্রামের লোকটা হতবুদ্ধ হয়ে পড়ে—নিড়ানি দেওয়া লোকটা আখক্ষেতের কথাই তো বলেছিল, তাই না?
: হ্যাঁ, ইন্সপেক্টরের স্বরে বিরক্ত বাসা বাধা।
: তাহলে হয়তো ক্ষেতের ওপাশে হবে।
ভ্রু কুঁচকে ইন্সপেক্টর বলেন—শোনেন, আপনি গিয়া খুঁজে দেখেন। পেলে আমাকে এসে জানান।

গ্রামের লোকটা পাশেই সাইকেল শোয়ায়ে রেখে খুঁজতে চলে যায়। স্কুল ইন্সপেক্টর রাস্তার পাশে বসে সামনের দিগন্তজোড়া পরিষ্কার নীল আকাশ ছোঁয়া ধূসর মাঠ, উঠতি ফসল আর সবুজের নিস্তেজ ছায়ার পানে তাকান। দেখেন দূরের গাছে কয়েকটা কাক আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। আর আকাশের উঁচুতে অলস বিন্দুর মতো কয়েকটা চিল ঘোরাঘুরি করছে। আর কিছু ছোট ছোট পাখি কিচিমিচির জুড়ে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ পরে চিৎকার কানে আসে। গ্রামের লোকটা ফিরছে। নানা অঙ্গভঙ্গির সাথে সে ছুটে আসছে। তাকে দেখেই ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়ান। তার শরীরের মাংশপেশিগুলা যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। বুঝতে পারেন যে, তিনি নিজেই অচল হয়ে যাচ্ছেন। এখন তার দরকার অফিসে, জিপের সিটে কিংবা যেসব স্কুল পরিদর্শন করেন তার চেয়ারে বসে থাকা।

গ্রামের লোকটার মুখে বিজয়ের হাসি—‘স্কুল খুঁজে পাইছি।’ তারপর ইন্সপেক্টরকে ক্ষেতের ভেতর দিয়া পথ দেখান।

ইন্সপেক্টর দ্বিধা নিয়া আগান। কেননা ঘন আখক্ষেতের ভেতরে ছিনতাই করে সবকিছু নিয়া গেলে কেউ কিছু টের পাবে না। কিন্তু আখের সবুজ পাতা তার মুখে ও হাতে আঁচড় কাটা শুরু করলে তিনি হাত দিয়া তাদের সামলে নিয়া সামনে তাকান। দেখে নেন কোথায় যাচ্ছেন। মাটি উঁচা-নিচা তাই বেশ কয়েকবার তাকে হোঁচট খেতে হয়। তারপর ক্ষেতের মাঝ বরাবর শোরগোল ও গাছের নড়াচড়া লক্ষ করে তারা আগাতে থাকেন। পৌঁছে দেখেন আখগাছ পরিষ্কার করে খোলা মতো একটা জায়গা। সেখানে মাটির ওপর গায়ে গায়ে ঘেঁষে বসা জন চল্লিশেক শিক্ষার্থী। কোনো মাদুর-ম্যাট চোখে পড়ে না। ক্ষেত ভেঙে আসার সময় শোনা শোরগোল এখানে এসে হঠাৎ থেমে যাওয়ায় কানে বাজে। তবে শিক্ষার্থীদের দেখে মনে হয়, তারা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নামতা মুখস্থ করছিল। বাকিরা ঝুঁকে পড়ে স্লেট বা বোর্ডে লিখছিল। কয়েকটা বোর্ড আবার সূর্যের দিকে মুখ করে আখগাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা। তাতে তখনো কালির দাগ তরতাজা।

শিক্ষার্থীদের মাঝখানে একটা নড়বড়ে চেয়ারে বেত হাতে এক বয়স্ক লোক বসা। দেখেই বোঝা যায় চেয়ারটাতে কয়েকবার জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। তাই জোড়ায় জোড়ায় বাড়তি পেরেক মারা। আর পিছনের মূল ফ্রেমের সাথে আরেকটা তক্তা আঁটা। তাছাড়া বসার ও হেলান দেবার কাঠের যেসব জায়গায় পচন ধরেছে সেখানে বিসদৃশ্যভাবে তক্তা লাগানো। ইন্সপেক্টরকে দেখে মাস্টারসাব উঠে দাঁড়ান। তার খালি পা জুতো খুঁজে নেয়।

মেন্টর ইংরেজিতে কমান্ড করে—‘ক্লাস স্ট্যান্ড।’ সাথে সাথে সব শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়ায় এবং তাদের জামার পেছনের ধুলো ঝেড়ে নেয়। স্কুল ইন্সপেক্টর আসায় মাস্টারসাব অস্থির হয়ে পড়েন। থির হতে কিছু সময় নেন। তারপর কাঁধের রুমালে চেয়ারের ধুলোবালি ঝেড়ে নিয়া তাতে বসার জন্য ইন্সপেক্টরকে অনুরোধ জানান। তার সাথে আসা গ্রামের লোকটা স্বস্তি বোধ করে। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইন্সপেক্টর বিদায় জানান। সাথে সাথে সে হাওয়া হয়ে যায়।

: হুজুর! হুজুর!!
ইন্সপেক্টর চারদিকে তাকান—এই তাহলে স্কুল?
মাস্টার সাব ঢোক গেলেন—জি, সাব।
: আপনি এদের কী কী পড়ান? প্রশ্ন করে তিনি আবার মাস্টারসাবের ঢোক গেলার শব্দ শুনতে পান।
: উর্দু, অঙ্ক, ইংরেজি আর হাতের লেখা শিখাই, স্যার।
: সরকার নির্ধারিত বই থেকে?
: জি স্যার, সরকার নির্ধারিত বই থেকে।
তিনি চেয়ারের পায়ার কাছ থেকে পাতা ছেঁড়া কতগুলো আস্তো বই তুলে স্কুল ইন্সপেক্টরের হাতে দেন।

ইন্সপেক্টর উর্দু টেক্সট বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা অধ্যায়ে গিয়া থামেন। একজন ছাত্রকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকে।
: স্যারজি, বইটা ক্লাস ফোরের কিন্তু ছেলেটা ক্লাস টুয়ের।
: এখানে তাহলে কয়টা ক্লাস আছে?
: ছয়টা, স্যারজি। ক্লাস ওয়ান থেকে সিক্স।

ইন্সপেক্টর যাদের একটা দল বলে ভেবেছিলেন এতক্ষণে তাদের ভাগটা বুঝতে পারেন। মাস্টারসাব তার হাতের বেত দিয়া ইঙ্গিত করে বলেন—স্যারজি, ও ক্লাস ফোরে।
তাকে ইন্সপেক্টর নির্দেশ দেন—তুমি পড়ো।

ছেলেটা উঠে দাঁড়ায়ে পড়া শুরু করে। স্পষ্ট উচ্চারণে জোরালো কণ্ঠে সে পড়ে যায়। কোনো ভুল নাই, এতটুকু তোতলামি নাই। ফলে মাস্টারসাবের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। তিনি অনুরোধ করেন—স্যারজি, অন্য ক্লাসের একজনরে ধরেন।

স্কুল ইন্সপেক্টর ক্লাস টুয়ের শিক্ষার্থীদের একটা অংক কষতে দেন। তা অধিকাংশেরই সঠিক হয়। ক্লাস ওয়ানের একজোড়া ছাত্র মুখস্থ রাখতে সুবিধা হয় সেরকমভাবে গানের সুরে সুরে ছন্দের তালে তালে আগে-পিছে মাথা দুলিয়ে ইংরেজি অক্ষরগুলো নির্ভুলভাবে আবৃত্তি করে। একই সুরে সুরে বা বা ব্লাক শিপ ছড়াটা পড়ে শোনায় ক্লাস সিক্সের একটা ছেলে। যদি সে অন্তর থেকে তা করে থাকে তাহলে বলতে হবে চমৎকার হয়েছে। আর যদি বই থেকে পড়ে থাকে তাহলে উত্তম হয়েছে বলে ইন্সপেক্টরের মনে হয়। তাই স্বীকার করতেই হয় যে, তার আওতাধীন প্রাথমিক স্কুলগুলোর তুলনায়, যে কোনো বিচারেই হোক, এটার মান অনেক উঁচুতে। সুতরাং এই স্কুল মাস্টারের সুখ্যাতি অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য। শিক্ষার্থীদের পারফমেন্সে সন্তোষ প্রকাশ করে ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়ান। ফলে চেয়ারটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে ওঠে। তবে মাস্টারসাবকে উদ্দীপ্ত দেখায়।

মেন্টর চিৎকার করে ওঠে—‘ক্লাস স্ট্যান্ড।’ আগেরবারের তুলনায় এবারেরটা অনেক জোরালো। ইন্সপেক্টর চলে যাবার পথ ধরেন। বেত হাতে মাস্টারসাব তার পিছু নেন। তাদের গ্রামের হালহাকিকত ও আরো অনেক বিষয় নিয়া কথা বলতে থাকেন। ক্ষেতের বাইরে বের হয়ে তবেই ইন্সপেক্টর স্বস্তি বোধ করেন। তখন জিজ্ঞাস করেন—আপনি স্কুলের স্থান বদল করেন কেন? এখানে ভাড়ায় ঘর পাওয়া যায় না?
: ভাড়ায়, স্যারজি?
: তাহলে তো ভালো হয় ।
: না, না, সাবজি। কেউ-ই আমাদের ঘর দিতে চায় না। তারা চায় না এখানে স্কুল হোক। সে কথা তারা বহুবার বলেছে। তারা মনে করে তাদের সন্তানদের সময় অপচয় হচ্ছে। কোথাও কাজ করা, বাবাকে ক্ষেতখামারে সহায়তা করা কিংবা গরু-বাছুর চড়ানোর বদলে এখানে এসে তারা দুষ্টুমি করছে। গ্রাম-প্রধান চৌধুরী আলী মোহম্মদই একমাত্র আমাদের প্রতি দয়া দেখিয়েছেন, স্যারজি। তিনি মনে করেন শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনিও আমাদের ঘর দেননি। কিংবা এক খণ্ড জমি। কিন্তু ক্ষেতে চাষবাস শুরু করার আগ পর্যন্ত গত মৌসুমের পুরোটা সময় তিনি আমাদের শিশাম গাছের ছায়াটা দিয়েছিলেন। আর এই মৌসুমে আমরা তার এই আখক্ষেত ব্যবহার করছি।
: আপনাদের জন্য আখক্ষেতের মাঝখানটা খালি করে দিয়া তিনি ভালোই করেছেন।
: হ্যাঁ, সাবজি। মাঝখানটা খালি করে দিয়া তিনি ভালো করেছেন। স্কুলের ছেলেরা ও আমি মিলে তার এ জায়গার আখ কেটে দিয়েছি, স্যারজি। তার জন্য আমার তিন দিন কাজ করেছি। এমনকি ক্লাস ওয়ানের ছেলেরাও। সকাল আটটা থেকে মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত। শেষে ঘন অন্ধকার নেমে এলে আমরা আঁটি বেঁধে বেঁধে চৌধুরীর গরুর গাড়িতে তুলে দিয়েছি। চৌধুরী বলেন, আমাদের অবশ্যই শিক্ষার মূল্য দিতে হবে। তাই এইভাবে আমাদের তা দিতে হয়েছে বলে মাস্টারসাব মাথা থেকে তাঁর সাদা পাগড়ি খুলে দেখান। সেখানে তাঁর মেহেদিরঙা চুলের মাঝখানে এক ফালি টাক। তাঁর চোখে পানি চলে আসে। কিছুক্ষণের জন্য কণ্ঠ ফুঁপিয়ে ওঠে। শেষে পাগড়ি আবার মাথায় দিয়া অন্য দিকে তাকায়ে বলেন—আঁটিগুলো বয়ে নিয়া যেতে গিয়া আমার মাথার চুল পড়ে গেছে।

তারা আরো সামনে হাঁটতে থাকেন। স্কুল ইন্সপেক্টর আলপথে আর ক্ষেতের ওপর দিয়া বিসদৃশ্যভাবে তার পাশে পাশে কিছুটা খাটো দেহের মাস্টারসাব। তিনি নরম কণ্ঠে বলেন—সাবজি, যদি আমাদের একটা ঘর থাকত, কেবল একটা ঘর, যদি ঘর নাও হয় একখণ্ড জমি। তাহলে ছেলেপেলেদের নিয়া আমি নিজেই তা বানিয়ে নিতাম। তাতে হয়তো পুরো একটা মৌসুম লেগে যেত, স্যারজি। তবু আমরা তা করে নিতে পারতাম।

স্কুল ইন্সপেক্টর নীরবে হাঁটতে থাকেন।

: আমি বুঝি, স্যারজি, একখণ্ড জমি অনেক দামি আর লোকজনও এতটুকু চায় না স্কুল। তবে যে কোনো জায়গায় জমি হলে আমার আপত্তি নাই। গ্রামের কামলা-কিষাণরা যে এলাকায় থাকে সেখানে কিছু জমি আছে। তাই সেখানে স্কুল নিয়া যেত হলেও আমরা খুশি হব, স্যারজি। একখণ্ড জমিই ভালো...

স্কুল ইন্সপেক্টর নীরব। তিনি ইতিমধ্যেই তার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হিসাবে দেখে ফেলেছেন। কেননা প্রাইমারি স্কুলের জন্য সরকার কোনো জমি বা ঘর দেয় না। স্থানীয় লোকজনকেই তা দিতে হয়। সুতরাং এখন কেন তা বদলানো হবে। আইন আইনই। এমন আইনও আছে যা শত শত বছর ধরে মেনে চলা হচ্ছে। স্বাধীনতার পরও তার কোনো বদল হয়নি। তখন যা ভালো ছিল এখনো তা-ই ভালো হয়ে আছে। সর্বোপরি আছে ব্যয় সংকোচন। সর্বত্র তিনি তা শুনতে পান। তাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। ছ্ট্টো একখণ্ড জমি—শুধু এইটুকুমাত্র চাওয়া। কিন্তু তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক কয়জন আছে। কতজনই বা এমন আন্তরিক হয়েও এরকম হতাশার মুখোমুখি। এই তিন বছরের চাকরি জীবনে তিনি আর একটি মুখও মনে করতে পারেন না।

তিনি জিপে ওঠেন। ইঙ্গিতে মাস্টারসাবের বিদায়ী সালামের জবাব দিলে গাড়ি চলতে শুরু করে। তবে মাস্টার সাবের চোখে চোখ রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব হয় না।


এম আতহার তাহির
পাকিস্তানের এই গল্পকারের জন্ম ১৯৫১ সালে। লাহোর সরকারি কলেজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় তিনি পড়াশোনা করেছেন। ১৯৮৪ সালে তিনি হুবার্ট এইচ হামফ্রে ফেলোশিপ লাভ করেন। প্রধানত ইংরেজিতেই তাঁর লেখালেখি। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;