দিল্লির সুরমাওয়ালা



শিবকুমার রায় ।। অনুবাদ: আলমগীর মোহাম্মদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

তুফান এক্সপ্রেস প্রতিদিন সকালে হাবাদা স্টেশন ছেড়ে যেত। সিগনাল পোস্ট পার হতে না হতে এটা বাতাসের মতো চলতে শুরু করত। বর্ধমান, বারাকার, রাণীগঞ্জ ও আসানসোল—হকি খেলার জন্য স্কুল পালানো বালকের মতো একের পর এক স্টেশন পেছনে ফেলে আসত। যখন গতি তুলত তখন হুইসেলের আওয়াজের কারণে ঝকঝকাঝক আওয়াজটা ভালো মতো কানে আসত না।

আজকের এই দিনে খুবই কম সংখ্যক যাত্রী ছিল—সর্বমোট আট-দশজন বাঙালি। তাঁরা বর্ধমানে নেমে গেলেন। হঠাৎ করে দুইজন পাগল ট্রেনে ঝাঁপ দিয়ে উঠল এবং বাংকের ওপর শুয়ে বেঘোরে নাক ডাকতে লাগল।

কৃষ্ণবীর ও হরিভক্ত সবসময় ভাবনায় থাকত কখন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ঘাড় ধরে বের করে দিবে অথবা নিজেরাই বেরিয়ে পড়বে। এবার মনে হচ্ছে তারা নিজেরাই বেরিয়ে পড়েছিল। তারা মায়ের কানের দুল চুরি করে ও বাবার টাকার বাক্স খালি করে বেরিয়ে পড়ল লালদুর্গ ও আগ্রার তাজমহল দেখতে। যতকিছুই ঘটুক না কেন তারা নিজেদেরকে ইতিহাসের ছাত্র দাবি করতে ভালোবাসত। ‘জিঙ্গে দাও’ খেলে যে কয় পয়সা পেয়েছিল সেগুলো দিয়ে কয়েকদফা কলকাতা ঘুরে এসেছিল কৃষ্ণবীর। সে নিজেকে এজন্য খুব চালাক মনে করত। কিন্তু হরিভক্তের এটাই প্রথম ঘরের বাইরে যাওয়া, তাও আবার পালিয়ে। প্রথমবারের মতো সে বড়বড় রেলগাড়ি ও বিমানের দেখা পেল।

কৃষ্ণবীর ও হরিভক্ত জানালা দিয়ে বাইরে অপলক তাকিয়ে রইল। কৃষ্ণবীর একজন অহংকারী যুবক যে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে গর্বিত।

“বাইরে দেখ,” সে চিৎকার করে বলল, “ধানের দিকে! দেখ এদিকে, এগুলো পাটক্ষেত। রোদ থেকে বাঁচাতে তারা ফ্যাক্টরির বাগানের চারপাশে বেড়া দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারা এটা কেন করল সে সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা আছে? ঐটা পুরোটা পাটক্ষেত। পাটক্ষেত এভাবেই বেড়া দিয়ে রাখতে হয়।”
অনভিজ্ঞ হরিভক্তের কাছে সবকিছুই নতুন ও বিস্ময়কর ঠেকল।

বাটা স্টেশনে ট্রেন কিছুক্ষণের জন্য থামল। তাদের কম্পার্টমেন্টে একজন ভদ্রলোক ঢুকল। তার দুহাতে টিনের বাক্স ধরা। লোকটি তাদের পেছনে করে বসল। দুই ভাইয়ের কেউই লোকটার দিকে ফিরেও তাকাল না বা ফিরে তাকানোর গরজও অনুভব করল না। কিন্তু, ট্রেন স্টেশন ফেলে আসতে না আসতে ভদ্রলোক তাদের দুজনের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলেন এবং বারবার হাক ডাকতে লাগলেন “তানসেল পিল, তানসেন পিল” বলে।

“তানসেন পিল বানানো হয় পাঞ্জাবে”—তিনি বলতে লাগলেন। টিনের বাক্সো থেকে দুটো ছোট বোতল বের করে তিনি বললেন, “একটা মুখে দিয়ে দেখুন। আপনার ভালো লাগবে এবং শরীরের খুব উপকার হবে। বড় বোতলটার দাম মাত্র আট আনা, আর ছোটটার দাম চার আনা। নেন নেন,বাবুজি। খেয়ে দেখেন।”

কৃষ্ণবীর দুটো পিল মুখে পুরে নিল এবং হরিভক্তের জন্য দুটো চেয়ে নিল লোকটার কাছ থেকে।

আরেকটা বোতল বের করে লোকটা বলতে লাগলেন, “টাইগার বাম, বেঙ্গল কেমিক্যাল টাইগার বাম। তোমাদের যদি মাথাব্যথা বা কাশি থাকে তাইলে এটা লাগাবে নিমিষেই ব্যথা উপশম হবে। ব্রণ, ফোঁড়া—এসবের জন্যেও ভালো। সাপ অথবা বিছার কামড়েও। আহত স্থানে অল্প একটুকু বাম লাগিয়ে দাও, মুহূর্তেই ব্যথা উধাও! দাম মাত্র আট আনা। প্রতিটি ঘরে একটা করে থাকা উচিত।”

বোতলের ঢাকনা খুলে হাতে বাম নিয়ে তিনি যাত্রীদের কপালে ও কপালের দুই দিকের রগে লাগানো শুরু করলেন। কৃষ্ণবীর মনে করল যে কোনো কিছুর বিনিময়ে এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। সে তার মাথা বাড়িয়ে দিল লোকটার দিকে।

“হরিভক্ত, তুইও একটু মাখিয়ে নে। ওষুধটা খুবই শীতল।” হরিভক্ত অসম্মতি জানাল।

যাত্রাপথে অনেক হকার ফ্লাশলাইট, টুথ পাউডার, চকোলেট, এবং আরো টুকটাক অনেক কিছু বিক্রি করতে ট্রেনে উঠল এবং বিক্রি শেষে নেমে পড়ল। ট্রেন দ্রুতগতিতে চলতে লাগল।

“হরিভক্ত শোন,”, কৃষ্ণবীর শুরু করল, “বড় ট্রেনে আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। এটা আমাদের ঘরে ফেরার ডিইএচ আর নয়। তুই পুতুলের মতো জানালা দিয়ে সবসময় হা করে আছিস কেন, আমাদের তল্পিতল্পার দিকেও নজর দিতে হবে বিশেষ করে যখন বেশি মানুষ ওঠানামা করে। এখানে হাজার হাজার মানুষ—এবং ওদের কেউ কিছু একটা নিয়ে গা ঢাকা দিতে পারে। আমাদেরকে সাবধানে থাকতে হবে।”

সে উপরের বাংকের দিকে তাকাতে বলল।

“ওখানে লোহার চেইনটা দেখছিস?” সে বলল, “এটা কি মনে হয় তোর? কোনো বিপদ বা দুর্ঘটনা ঘটলে এটা ধরে টান দিলে ট্রেন থামবে। কিন্তু তুই যদি অকারণে চেইনে টান দিস, তাইলে তোকে পঞ্চাশ রুপি জরিমানা গুনতে হবে। সুতরাং উপরের ঘুমানোর সময় খেয়াল রাখবি যাতে ওটাতে তোর হাত না লাগে।”

ট্রেন এগোতে লাগল নিজস্ব ধ্যানে।

“এভাবে বাইরে মাথা বের করে রাখবি না। হঠাৎ জানালা ধক করে পড়লে তোর মাথায় ব্যথা পাবি। অনেক সময় হয় কি দরোজা খোলা ট্রেন অন্য দিক থেকে চলে আসলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

বেচারা হরিভক্ত এখন আর বাইরেও তাকাতে পারছে না।

“আমি ঘুমাব এখন,” সে ক্লান্ত স্বরে এটা বলে উপরের বাংকে ঘুমুতে গেল।
“ঠিক আছে, ঘুমা,” কৃষ্ণবীর বলল, “তবে আমাদের পালা করে ঘুমুতে হবে। আমরা দুইজন একসাথে ঘুমিয়ে পড়লে আমাদের অগোচরে কেউ জিনিসপত্র নিয়ে পালাতে পারে।”

হরিভক্ত এক পলকও ঘুমাতে পারল না। রাতভর নানা ধরনের মানুষ ওঠানামা করছে। সে যাহোক, কৃষ্ণবীর আরামসে ঘুমিয়েছিল সারারাত।

এখন দিল্লি মাত্র দুই তিন ঘণ্টার পথ বাকি। লাল দুর্গ ও কুতুব মিনারের চিন্তা বারেবারে তাদের নাড়া দিচ্ছিল। ট্রেন তুনদালা জংশনে এসে থামল।

“দেখ,” রেলওয়ের সময়সূচির দিকে তাকিয়ে দেখ কৃষ্ণবীর বলল, “মাত্র দুই কি তিনটা স্টেশন বাকি। ভেবে দেখ আর মাত্র দুই ঘণ্টা পর আমরা বীরলা মন্দির অথবা কনাটে অথবা ইন্ডিয়া গেইটে।”

দুজন মুসলিম ছেলে ট্রেনে উঠল, তাদের পরনে নোংরা কাপড়চোপড়। তারা হরিভক্ত ও কৃষ্ণবীরের দিকে তাকিয়ে কী কী যেন মুখের ভিতর করে বলল এবং তাদের পেছনে গিয়ে বসল। তাদের দিকে ভালো করে থাকিয়ে কৃষ্ণবীর হরিভক্তকে বলল, “এদের দিকে নজর রাখতে হহবে। গুণ্ডার মতো লাগছে এদের...”

ট্রেন থামল। হাতে লেদারসুট নিয়ে তৃতীয় একজন ব্যক্তি প্রবেশ করলেন তাদের কম্পার্টমেন্টে। সে ব্যাগ থেকে একটা রীড আর দুটো বোতল বের করে তাদের দিকে যাদুকরের ন্যায় ইশারা করল।

“বন্ধুরা,” সে বলতে শুরু করলো, “মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আপনার চোখ দিয়ে যদি পানি পড়ে, যদি চোখ রক্তলাল হয় এবং ভালো করে না দেখেন, তাইলে বোতল থেকে হাল্কা সুরমা নিয়ে আপনার সুন্দর চোখে মেখে নিন। এটা চোখের সৌন্দর্য বাড়াবে ও সুস্থ করে তুলবে।”

এই বলে সে মুসলমান ছেলে দুটোর চোখে অল্প সুরমা লাগিয়ে দিল।

সে আবারো বলল, “বন্ধুরা চোখে একটু সুরমা লাগিয়ে দেখুন। রাস্তায় হাঁটার সময় চোখে ধুলা পড়লে, ট্রেনে যাত্রার সময় ধোঁয়া ও বালিতে যদি আপনার চোখ জ্বলাতন করে এই সুরমা আপনার চোখকে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করবে। জনাব, আপনাদের কারো লাগলে হাত তুলুন।”

লেকচারটা অনেক লম্বা ছিল এমনকি তাঁদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও এরকম লম্বা লেকচার কখনো দেননি। কৃষ্ণবীরের পক্ষে বিশ্বাস না করার কোনো যুক্তি ছিল না আর। সবচেয়ে বড় কথা হলো সে নিজেকে বোকা ভাবে না। এটা ঠিক যে তাকে এক ক্লাসে তিন বছর থাকতে হয়েছিল, সেটা অবশ্যই পড়ালেখায় অমনোযোগের কারণে।

“দয়া করে আমাকে একটু দিন,” সে বলল।

“আপনার সুন্দর চোখে সুরমা দিন,” কৃষ্ণবীরের চোখে সুরমা লাগাতে লাগাতে লোকটি বলে যাচ্ছিল।

হরিভক্ত বেকুবের মতো চেয়ে রইল।

রীডটি হরিভক্তের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বিক্রেতা ভদ্রলোক বলল, “তুমিও তোমার সুন্দর চোখে সুরমা লাগাও।”

হরিভক্ত না করতে পারল না তাই সে চুপ করে রইল। বিক্রেতা তার দুই চোখে সুরমা লাগিয়ে দিল। আচম্বিত দুইজনই মাথা ঘুরে পেছন দিকে পড়ে গেল। তারা চোখে দশ হাজার তারা ও দশটি চাঁদ একসাথে দেখতে পেল। মনে হচ্ছিল যেন তাদের দুই চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দিয়েছিল কেউ। নাকমুখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। দুজনই পায়ের ওপর ভর দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ল।

পনের মিনিট পর আস্তে আস্তে তাদের চোখের জ্বালা কমতে লাগল। মাথা তুলে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল তারা। তুফান এক্সপ্রেস দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে কিন্তু কী এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল তাদের সাথে।

সুরমাওয়ালা ও মুসলমান ছেলে দুটো কেটে পড়েছিল আগেই। তাদের ব্যাগ-বিছানাপত্র সবই নিয়ে গেল। জাদুমন্ত্রের ন্যায় সবকিছু চোখের পলকে ঘটে গেল৷ এমনকি গায়ের কোট দুটোও হারাতে হলো তাদেরকে।

চোখ পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে তারা চারদিকে তাকাল। কৃষ্ণবীর মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে লাগল কলকাতার এত এত বদমাইশ তাকে ফাঁকি দিতে পারেনি কখনো আর দিল্লি এসে সামান্য সুরমাওয়ালা তার চোখে ধুলা দিল!

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;