আমিষ



দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

সিতেশ বাবুর একটা মুদির দোকান। দোকানে নিত্যকার দরকারি কিছু জিনিস আছে; খুব বেশি না। সাথে এক কোনায় কয়টা মিষ্টি রাখা থাকে। মুদির দোকানে এরকম মিষ্টির আয়োজন খুব একটা দেখা যায় না।

প্রতি বুধবার দুপুর বেলা সিতেশ বাবুর সাথে আমার দেখা হয়। আমি তিনটে সাঁকো পার হয়ে ধানসাগর ইউনিয়নে যাই কিস্তি আদায় করতে। আমার অফিস রায়েন্দাতে; শরনখোলা উপজেলা। রায়েন্দা থেকে ধানসাগর এক বিরাট ঝক্কির পথ। পাকা রাস্তা খুব একটা নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ মাটির ঢেলা ওঠা মাটির রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালানো এই যুদ্ধ করার নামান্তর।

তিন নম্বর সাঁকো পার হয়ে সিতেশ বাবুর দোকান। দোকানটা দেখলে স্বস্তি হয়—চলে এসেছি। কিস্তি আদায় করতে ঢোকার সময় দোকানে বসি না। শুধু একটা হাক দেই, ‘কেমন আছেন, সিতেশদা?’

দাদা মিনমিনে গলায় জবাব দেয়, ‘আছি আর কী? আপনি চললেন?’
‘হ। আসি ঘুরে।’

একটা সমিতির কিস্তি আদায় করে যখন এই দোকান অবধি আবার ফিরে আসি, তখন শরীর আর চলে না। খিদেয় পেটের মধ্যে হইচই শুরু হয়। এই সময়টা সিতেশ বাবুর দোকানে একটু বসি। দুটো মিষ্টি খাই, এক গ্লাস পানি খাই। সিতেশ বাবুর সাথে সুখ-দুঃখের কিছু আলাপ হয়।

সিতেশ বাবুর তিন কূলে কেউ নেই। ছেলে মেয়ে কখনোই ছিল না। স্ত্রী মারা গেছেন, তাও অনেকদিন হলো। ভাই-বন্ধু কিছু নেই। এই দোকানের পেছনেই একটা দোচালা টিনের ঘরে তার বসত। নিরামিষাশী ও একাহারি মানুষ। সকালে চিড়ে, রাতে ফলমুল এবং দুপুরে নিজের রান্না করা ভাত ও শাকশবজি।

সকাল বেলা এসে দোকান খুলে বসেন। পনের দিনে একবার রায়েন্দা গিয়ে কিছু জিনিসপত্র কিনে আনেন দোকানের জন্য। মতি ময়রা রোজ সকালে রায়েন্দা যাওয়ার সময় কয়টা মিষ্টি দিয়ে যায়। সারাদিন বেচাকেনা খুব একটা হয় না। আজকাল লোকেরা এরকম মোড়ের মুদি দোকান থেকে খুব একটা কেনাকাটা করে না। রায়েন্দা বাজারে গেলেই সারি সারি বড় দোকান; সেখান থেকেই লোকেরা কেনাকাটা করে আসে। তারপরও সিতেশ বাবুর পৈত্রিক দোকান তাকে খোলা রাখতে হয়। অন্তত নিজের প্রয়োজনটা এই দোকান থেকে মিটে যায়।

সিতেশদার একটার সঙ্গী হলো নবা পাগলা। নবা পাগলা কোথাকার মানুষ কেউ জানে না। সারাদিন একটা ময়লা কাপড় পড়ে রায়েন্দা বাজারে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধে হলে সিতেশন বাবুর বারান্দায় এসে ঘুমায়। সিতেশ বাবুও ওকে রাতে টুকটাক খেতে দেন। লোকে বলে, দু জনে নাকি গল্প গুজবও করে।

এর মধ্যে আমি সিতেশ বাবুর মনে হয় ব্যতিক্রমী কাস্টমার। আমাকে মাঝে মাঝেই একটু বেশী যত্ন করেন। আজ যেমন মিষ্টি খাওয়া শেষ হতে বললেন, ‘আরেকটা মিষ্টি খান, দাদা।’
‘নাহ। দুটোতেই পেট ভরে গেছে।’
‘খান। এটার দাম দিতে হবে না।’
‘কেন, কোনো উপলক্ষ আছে?’
‘আজ চড়ক ষষ্ঠী তো। বাবা বেচে থাকতে লোকজন খাওয়াতেন। আমি তো পারি না। এই আপনাকে একটা মিষ্টি খাইয়ে ব্রাহ্মণসেবা করি।’

আরেকটা মিষ্টি খাই। হাত ধুতে ধুতে প্রশ্ন করি, ‘সিতেশ দা, দোকানে মিষ্টি রাখেন কেন? আপনার তো মিষ্টির দোকান না?’
‘মিষ্টি হলো দোকানের লক্ষ্মী। আবার বাবা তো ময়রা ছিলেন। এখানে ছিল ওনার মিষ্টির দোকান। আমি তো ছোটবেলা থেকেই উচ্ছনে যাওয়া। ময়রার কাজ শিখিনি। তারপরও বাবার লক্ষ্মীটা ধরে রেখেছি।’

বেশিক্ষণ বসে সিতেশ বাবুর গল্প শোনা হয় না। তাড়াতাড়ি প্যাডেল চালিয়ে রায়েন্দা যেতে হবে। অফিসে গিয়ে হিসেব মেলাতে হবে। কিছু টাকার ঝামেলা হলে সেটা পকেট থেকে দিতে হবে। এরপর আজকে আবার আমার বাজার করার কথা। আমি এই সপ্তাহে মেস ম্যানেজার।

আমাদের অফিস আর মেস একসাথেই। একটা দোতলা বাড়ির পুরো একতলাটা আমাদের ভাড়া নেওয়া। ঢুকেই প্রশস্ত জায়গাটা অফিস। আর তার পাশের দুটো রুমে আমরা ৬ জন কর্মী থাকি। রান্নাঘর আছে। খালা এসে দুই বেলা রান্না করে দিয়ে যায়। ম্যানেজার স্যার একটু দূরে একটা বাসা ভাড়া করে থাকেন। তার বৌ-বাচ্চাও এখানে থাকে।

অফিসে ঢুকতে হয় ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায়। আটটার মধ্যে ফিল্ডে বের হয়ে যেতে হয়। প্রতিদিন ৩-৪টে সমিতির কালেকশন করে ফিরতে ফিরতে চারটে বাজে। এরপর দুটো খেয়ে বসতে হয় হিসেব নিয়ে। হিসেব শেষ করতে করতে রাত ৮টা। তারপর শরীরে আর কিছু শক্তি থাকে না। রাতে খাওয়ার পর বিনোদন বলতে টুয়েন্টি নাইন খেলা। আমার রুমেই বসে আড্ডা। শরিফ আর প্রশান্ত ঘুমকাতুরে। ওরা তাস খেলায় বসতে চায় না। আমরা বাকি চারজন রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত চালিয়ে যাই।

আজ অবশ্য আমার রুটিন একটু আলাদা। অফিসে গিয়ে খেয়েই ছুটতে হবে বাজারে। মেস ম্যানেজারের রোজকার কাজ এটা। সেখান থেকে ফিরে তবে হিসাব মিলানো। কিন্তু আজ অফিসে ফিরতেই কাদির ভাই বলল, ‘আজ আর বাজারে যেতে হবে না।’

কাদির ভাই আমাদের সিনিয়র ক্রেডিট অফিসার। আমাদের তো বটেই, আমাদের ম্যানেজার স্যারের চেয়েও সিনিয়র। চাকরিতে আছে অনেকদিন হলো। কিন্তু কিছুতেই হিসেব নিকেশের খেলায় পেরে ওঠে না। তাই এখন পর্যন্ত প্রমোশন পায়নি। ওই ক্রেডিট অফিসার হয়েই আটকে আছে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাজার যেতে হবে না কেনো? রান্না ঘরে মাছ মাংস কিছু নাই।’
‘আছে আছে। রাতা মোরগ আছে।’
‘মোরগ এলো কোত্থেকে?’
‘শরীফ নিয়ে এসেছে।’

এবার বোঝা গেল।

এই কাণ্ড প্রায়ই হয়। কোনো সদস্য কিস্তি দিতে না পারলে বাকি সদস্যরা মিলে তার কিছু একটা বিক্রি করে টাকা আদায় করে। এই কিছু একটার মধ্যে মুরগি থাকলে সেটা কম দামে পাওয়া যায়। মুরগির বাজারদর যাই হোক, এ কিস্তির টাকার বিনিময়ে সেটা পাওয়া যায়। মানে ৬-৭শ টাকার মুরগি দুই আড়াই শ টাকায়। আর সেক্ষেত্রে আমরা ওটাকে আবার কিনে মেসে নিয়ে আসি। অল্প খরচে একটা ভালো খাওয়া হয়ে যায়।

এই প্রায় ফ্রি পাওয়া মুরগির জোরে আজ মেসে ফিস্ট লেগে গেল। হিসাব শেষ করে প্রশান্ত আর রফিক খালার সাথে হাত লাগাল।

রাতে ভারী খাওয়া আর গভীর রাত পর্যন্ত তাস পেটাতে গিয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়ে গেল দেরি। সাড়ে সাতটায় ম্যানেজার স্যার অফিসে ঢুকে দেখেন, আমরা কেউ নেই। তাড়াহুড়ো করে ইন-টিন করে অফিসে ঢুকে দেখি স্যার জরিমানার স্লিপ হাতে নিয়ে বসে আছেন—৫০ টাকা করে জরিমানা প্রত্যেকের। দিনটা শুরুই হলো যাচ্ছেতাইভাবে।

মনে হলো, এমন মুরগি খাওয়ার চেয়ে সিতেশ বাবুর মতো নিরামিশাষী হয়ে যাওয়াও ভালো। আচ্ছা, ভালো কথা। সিতেশ বাবুকে এটা জিজ্ঞেস করতে হবে—উনি নিরামিষ কেন খান?

পরের বুধবার সমিতি শেষ করে দোকান পর্যন্ত আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ঝটপট দুটো মিষ্টি খেয়ে উঠে পড়ছিলাম। সিতেশ বাবুই যেচে বললেন, ‘একটু বসে যান। এতটা পথ সাইকেল চালায়ে যাবেন আবার।’
‘না, দাদা। আজ দেরি হয়ে গেল।
‘আরেহ। একটু দেরিতে আর কী হবে।’
ঠিক তখনই প্রশ্নটা মনে পড়ে গেল, ‘আচ্ছা, সিতেশদা, আপনি নিরামিষ খান কেন?’
‘বাবা ছোটবেলায় দীক্ষা দিয়ে দিয়েছিলেন। গুরুর নিষেধ আছে আমিষ খাওয়ায়।’
‘এর আগে খেতেন?’
‘মাছ খেতাম। মা আমার জন্য জোগাড় করতেন। কিন্তু মাংসটা সেভাবে কখনো খাওয়া হয়নি।’
‘কখনো লোভ হয়নি?’
‘নাহ। এখন তো মাছ-মাংস দেখলে খারাপ লাগে।’
‘বাজারে যে যান, হোটেলে রান্না করা মাছ মাংস দেখলে বমি আসে?’
‘নাহ। অতটা শুচিবাই নেই। আমার মনে হয়, দরকার হলে রান্নাও করতে পারব।’

আজ আর বসার সময় নেই। আকাশে মেঘ। যাওয়ার পথে বৃষ্টিতে ধরবে বলে মনে হচ্ছে।

অফিসে গিয়েই একটা সুখবর পেলাম। সুখবর বলতে সুখবর—রীতিমতো প্রমোশন! ম্যানেজার স্যার ডাকলেন, ‘আপনার চিঠি আছে।’
আমি ভাবলাম, বড় কোনো জরিমানা। এই মাসে কয়েক দিন লেট হয়েছে অফিসে ঢুকতে। জরিমানা হতেই পারে। ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘নতুন জরিমানা নাকি, স্যার।’
স্যার একটু হেসে বললেন, ‘খুলে দেখেন।’

খুলেই চোখটা বড় বড় হয়ে গেল। এই কয় মাসের চাকরিতে প্রমোশন পেয়ে যাব, এটা কল্পনা করতে পারিনি। তবে প্রমোশনের আরেকটা দিক আছে। বদলি হয়েছে। সেটাও অবশ্য আমার জন্য দারুণ হয়েছে। বাড়ির পাশের থানা মোরেলগঞ্জে পোস্টিং হয়েছে। সামনের মাসের এক তারিখ জয়েন করতে হবে।

মানে, হাতে আর দুটো সপ্তাহ আছে। এই সপ্তাহে আমার সমিতিগুলোতে শেষ কালেকশন। পরের সপ্তাহে। আমার সাথে অন্য কেউ যাবে কালেকশনে। তার আগে আমার কাজ হলো সমিতিগুলো ক্লিয়ার করে ফেলা। কোথাও খেলাপি থাকতে দেওয়া যাবে না। তাতে রিপোর্ট খারাপ হবে।

প্রতিদিনই এই খেলাপির শেষ দেখে অফিসে ফিরতে দেরি হতে থাকল। কিন্তু বুধবার দেরিটা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেল। এক বিধবা মহিলা কিছুতেই তার কিস্তির টাকা দিতে পারছিল না। তার ছেলে নাকি ভ্যান নিয়ে দুদিন হয় বেরিয়েছে; আর কোনো খোঁজ নেই।

তার বাড়িতে বিক্রি করার মতো কিছুও পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটা ভাঙা খাট যতক্ষণে বিক্রি করে কিস্তি আদায় হলো, ততক্ষণে সন্ধে হয়ে গেছে। শরীরে আর এতটুকু শক্তি নেই। সিতেশ বাবুর দোকানে এসে অভ্যেসবশেই দুটো মিষ্টি খেলাম, এক গ্লাস পানি খেলাম।

সাথে সাথে ওঠার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সিতেশ বাবু বললেন, ‘একটু বসে যান। বৃষ্টি আসছে।’

অনেকক্ষণ ধরেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মেঘ ডাকলে। তারপরও বললাম, ‘দেখি, বৃষ্টির আগে চলে যেতে পারি কিনা।’
‘পারবেন না।’

বলতে বলতে ঝুম বৃষ্টি নামল। চরাচর যেন ডুবে যেতে শুরু করল। রাত আটটা বাজে, বৃষ্টি থামার লক্ষণ নেই। এই কাদা পথে এখন সাইকেল নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখন উপায়?

সিতেশ বাবু বললেন, ‘রাতটা এখানেই কাটিয়ে যান। আমার সাথে যা হয় একটু খেয়ে নেবেন।’

দোকান বন্ধ করে এক দৌড়ে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন সিতেশ বাবু; আমিও পেছন পেছন। সিতেশ বাবু রান্না চড়ালেন। খানিকটা সময় তার পাশে বসে রান্না দেখি আর গল্প করি। কাল রাতে খেয়েছি। আর এখনো পেটে ভাত পড়েনি। সিতেশ বাবু বললেন, ‘আপনার জন্য ভাত চড়িয়ে দিলাম। আপনার তো মাছ-মাংস ছাড়া কষ্ট হবে।’

আমি হাসলাম, ‘তা হবে। আমার মেসে আজ মাংস ছিল।’
‘আচ্ছা দেখি মাংস জোগাড় করা যায় কিনা। কী মাংস খাবেন?’
‘এখন আপনি মাংস পাবেন কোথায়?’
‘দেখি না। আপনি বলেন?’
‘আমার যে ক্ষুধা লেগেছে, মানুষের মাংস হলেও খেতে পারব।’
‘বুঝতে পেরেছি।’

একটু ঝিমুনি এসেছিলো। সিতেশ বাবু খাওয়ার জন্য ডাকলেন। উঠে গিয়ে দেখি আসলেই মাংসের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন ভদ্রলোক। লাল টকটকে মাংসের ঝোল। অনভ্যস্থ হাতে মশলা বেশি দিয়ে ফেলেছেন।

সৌজন্য করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাংস পেলেন কোথায়?’
‘পেলাম আর কি।’
‘কিসের মাংস।’

একটু তো তো করে সিতেশ বাবু বললেন, ‘মানুষের।’
‘মানে!’
‘ওই যে আপনি বললেন, মানুষের মাংস হলেও চলবে। তাই নবা পাগলাকে কেটে রান্না করে ফেললাম। আপনি আরো কয়েকবার খেতে পারবেন।’

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;