সন্ত কবীরের দোহা



অনুবাদ: জাভেদ হুসেন
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ নদী। এর উৎস এক জায়গায় থাকে না। সে যেখানে যেতে চায়, সেখানে পৌঁছতে পারার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে সে ইতিহাসে কোনো স্থান করছে বা করবে বলে মনে করেই অনুবাদ করা হয়। কবীর ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। লেখা-পড়া জানা লোকের মাঝে তাঁকে প্রথম নিয়ে আসেন ক্ষিতিমোহন সেন, বাংলা ভাষায়। এর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। এই দুইয়ের পাশাপাশি হিন্দি ভাষায় নাগরি লিপিতে সন্ত কবীর দাসকে নিয়ে অনেক আকরগ্রন্থ রচিত হয়েছে, লেখা হয়েছে একাডেমিক পুস্তক।

কবীর জন্মেছেন, জীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন বেনারসে। এই বেনারস ছিল তখন ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক এক কেন্দ্র। সারা দেশের বুদ্ধি চর্চার মানুষেরা আসতেন সেখানে। কবীরের ভাষায় তাই অনেক ভাবনা আর শব্দ যোগ হয়েছে, তাঁর ভাবনা পৌঁছে গেছে অনেক জায়গায়। ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর শিক্ষিত ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী গরীব মানুষদের লোক কবীরের কবিতা ছড়িয়েছে মুখে মুখে দ্রুত গতিতে, কদাচিৎ লেখা হয়েছে। কবীর গত হওয়ার একশ বছর হতেই তিন কেন্দ্রে কবীরের কবিতা সংরক্ষিত হলো। তাঁর জন্মভূমি বেনারস, রাজস্থান আর পাঞ্জাবে। প্রত্যেক জায়গাতেই সেই সব অঞ্চলের শব্দ যুক্ত হয়েছে কবীরের কবিতাতে। তাঁর ভাষা ছিল আজকের আওধি, ব্রজ আর ভোজপুরির মিশ্রণ, এগুলো আজকে প্রত্যেকটি আলাদা ভাষা। ফলে তাঁর ভাষা পণ্ডিতদেরও ঝামেলায় ফেলে।

কবীরের কবিতা তিন ধরনের ভিন্ন ছন্দ ও দোলা পাওয়া যায়:

১. দোহা (দুই লাইন) বা সাখি (সাক্ষী হওয়া), কখনো শ্লোক বলা হয়। প্রায়ই শ্লেষাত্মক এই কবিতা আবৃত্তি করা যায়, গাওয়াও হয়।
২. রামনি দোলার চোয়পায়ি ছন্দের গান, এটা শেষ হয় একটি দোহা দিয়ে।
৩. পদ বা শবদ—গানের কম্পোজিশন, যা চার পদ হতে বারো বা আরো বেশি হতে পারে।

এই সঙ্কলনে কবীরের দোহা থেকে চয়ন করা কবিতা নেওয়া হয়েছে। এর জন্য মূল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রধানত ডক্টর শ্যামসুন্দর দাসের লখনৌ থেকে প্রকাশিত ‘কবীর গ্রন্থাবলী’, প্রকাশকাল অনুল্লেখিত। - অনুবাদক


***
জগত জানায়ো জিহি সাকাল সো জাগ জানিয়ো নাহি
জিয়ো আঁখি সব দেখিয়ে আঁখি না দেখি জাহি

জগতের সকল কৃপার আধার যিনি জগত জানে না তাঁকে
যেমন চোখ দিয়ে সব দেখেও নিজ চোখকে দেখতে পাও না তুমি

***
লালি মেরে লাল কি জিত দেখো তিত লাল
লালি দেখন ম্যায় গ্যায়ি ম্যায় ভি হো গ্যায়ি লাল

আমার প্রিয়র লাল রঙ, যে দিকে তাকাই সব লাল
আমিও তার রঙে রাঙা হলাম সেই রঙ দেখতে গিয়ে

***
সবয় রাসায়ন ম্যায় কিয়া প্রেম সমান না কোয়
রতি ইক তান মে সনচারে সব তন কাঞ্চন হোয়

সব রসায়ন চেখে দেখেছি, প্রেমের সমান কিছু নেই
রতি পরিমাণ শরীরে গেলে পুরো শরীর স্বর্ণ হয়

***
পোথি পঢ় পঢ় জগ মুয়া পণ্ডিত ভায়া না কোয়
ঢাই অকশর প্রেম কা পঢ়ে সো পণ্ডিত হোয়

পুঁথি পড়ে পড়ে মরলো জগত, পণ্ডিত হলো না কেউ
আড়াই অক্ষর প্রেমের পড়ে যে পণ্ডিত হলো সে-ই

***
নয়না অন্তর আও তু তিউহি ন্যায়ন ঝাপেউঁ
না হউ দেখুঁ অওর কু না তুঝে দেখন দেউঁ

আমার চোখের মাঝে এসো, চোখ বুজে নেই তার পর
আর দেখব না কাউকে, না কাউকে দেখতে দেব তোমায়

***
দস দুয়ারে কা পিনজরা তা মে পনছি পওন
রহিবে কো আচরজ হ্যায় জায়ে তো আচরজ কওন

দশ দুয়ারের এই পিঞ্জরায় থাকে পবনের পাখি
থাকলেই বড় আশ্চর্য কথা, চলে গেলে আশ্চর্য কিসের

***
বিরহা ভুজঙ্গম প্যায়ঠি কারি কিয়া কলেজা ঘাও
সাধু অংগ না মোড়হি জিউ ভাওয়ে তিও খাও

বিরহের বিষধর সাপ শরীরে ঢুকে হৃদয় করেছে ঘা
সাধু তাতে তিলমাত্র অঙ্গ নাড়ে না, যা খুশি সে করুক

***
সব রংগ তন্ত রাবাব তান বিরহা বাজাওয়ে নিত
অওর কোয় না সুন সাকে কায়ি সাই কায়ি চিত

সব রঙের বীণা এই শরীর, প্রিয়র বিরহ বাজায় তাকে রাত দিন
কেউ শোনে না সেই বীণার সুর, শোনে আমার হৃদয় আর প্রিয়

***
আয়ে সাকুঁ না তুঝ পে সাকুঁ না তুঝ বুলায়ে
জিয়ারা য়ুঁহি লেহুংগে বিরহা তাপায়ে তাপায়ে

না পারি যেতে তোমার মাঝে, না পারি ডাকতে আমার মাঝে
নিরুপায় আমাকে এমন করেই বিরহ আগুনে পুড়ে মরতে দেবে !

***
বিরহা জলন্তি ম্যায় ফিরুঁ মো বিরহন কো দুখ
ছা না ব্যায়ঠু দারপতি মাটি জ্বল উঠে ভুক

বিরহ আগুনে জ্বলে দ্বারে দ্বারে ঘুরে মরি এই আমি
তরুর ছায়ায় বসতে পারি না, আমার আগুনে তরুও জ্বলে উঠে

***
বিরহা জলন্তি ম্যায় ফিরুঁ জলত জলহারি জাউঁ
মো দেখয়া জলহারি জ্বলে সন্তোঁ কাহাঁ বুঝাউঁ

বিরহে জ্বলে ঘুরে মরি, নেভাতে যাই নদীর কাছে
আমায় দেখে নদীই জ্বলে, সন্ত, বলো এ আগুন কোথায় নেভাই?

***
অগিনি আঁচ সাহনা সুগম সুগম খড়গ কি ধার
নেহ নিবাহান একরস মাহা কঠিন ব্যওহার

আগুনে হাঁটা সহজ, সহজ খড়গের ধার
কঠিন সমান ভালোবাসা, ভালোবেসে যাওয়া একইভাবে

***
দিপক দিয়া তেল ভরি বাতি দেয়ি আঘাত
পুরা কিয়া বিসাহুনা বহুরি না আউঁ হাট

সে দিয়েছে তেলভর্তি দীপ আর সলতে অনিঃশেষ
জগতের কারবার শেষ আমার, আর আসব না এই হাটে

***
মায়া তো ঠগিনে বানি ঠগত ফিরে সব দেস
জা ঠগ য়া ঠগিনে ঠগি তা ঠগ কো আদেস

এই মায়া বড় প্রবঞ্চক, ভোলায় পুরো জগত
এই মায়াকেও যে ভোলায় ধন্য সেই প্রবঞ্চক

***
মায়া গ্যায়ি তো কেয়া হুয়া মান ত্যাজা নাহি জায়ে
মান বড়ে মুনিবর গিলে মান সবন কো খায়ে

মায়া গেল তো কী! মান তো ত্যাগ সহজ নয়
বহু মুনি ঋষিকে খেল এই মান, মান সবাইকে খায়

***
হাম নে মরে মরিহে সনসারা
হাম কো মিলে জিবনহারা

জগত মরলেও আমি মরি না
আমি পেয়েছি সেই অমর জীবনদাতা

***
হদ গ্যায়ি অনহদ গ্যায়া রাহা কবিরা হোয়
বেহদি ম্যায়দান মে রাহা কবিরা সোয়

সীমা আর অসীমের সীমা পার হয়ে কবীর হয়ে উঠেছে
দেখ অসীমের ময়দানে কবীর শুয়ে আছে

***
কয়ি বিরহান কো মিচ দে কয়ি আপ দিখলায়ে
আঠ পেহের কা দঝনা মোপে সাহা না জায়ে

হয় বিরহিকে মৃত্যু দাও, নয়তো দেখা দাও
অষ্ট প্রহরের এই দহন আর সহ্য হবার নয়

***
হাঁসি হাঁ কান্ত না পাইয়া জিন পায়া তিন রোয়
হাসেঁ খেলে হরি মিলে কওন সুহাগন হোয়

হেসে কেউ পায়নি প্রিয়, পেয়েছে চোখের জলে
হেঁসে খেলে পাওয়া গেলে কে আর চাইতো তাকে

***
হিরদে ভিতর দও জ্বলে ধুয়াঁ না পরগট হোয়
জাকে লাগি সোয় লখে কয়ি জিন লাজ সোয়

হৃদয়ের ভেতর দাবানল ধোঁয়া যায় না দেখা
যার জ্বলে সে দেখে নয়তো দেখে যে জ্বালায় আগুন

***
চাকাই বিছুড়ি র‌্যায়ন কি আই মিলি পরবকাতি
জে জান বিছুড়ে রাম তে তে দিন মিলে না রাতি

রাতের বিরহের অভিশাপ পার হয়ে পাখি ভোরে দেখা পায় সঙ্গীর
কিন্তু যে বিরহ পেল রামের, সে পায় না দেখা তার দিন রাত্রি

***
মুয়ে পিছে মাত মিলো কহে কবিরা রাম
লোহা মাটি মিল গ্যায়া তব পারস কেহি কাম

মৃত্যুর পর প্রভুর দেখা পাওয়ার কথা ভেবে কী হবে
কবীর বলে—লোহা মাটিতে মিশলে পরশপাথর দিয়ে কী হবে?

***
কবিরা ব্যায়দ বুলাইয়া পাকড়ি কে দেখি বাঁহি
ব্যায়দ না বেদন জানায়ি কড়ক কলিজে মাহি

বৈদ্য ডাকা হলে সে দেখে ধরে কবীরের নাড়ি
বৈদ্য কী জানবে, আমার বেদনা যে হৃদয়ের অনেক গভীরে

***
মন পরতিত না প্রেমরস না ইস তন মে ঢংগ
না জানো উস পিও সু ক্যায়সে রাহাসি সংগ

না আছে নিজ হৃদয়ে আস্থা না জানি প্রেম কারে কয়
না জানি প্রেমের প্রথা, কী করে রইবো প্রিয়র সাথে

***
তুম তো সমর্থ সাইয়াঁ দৃঢ় কর পাকড়ো বাঁহি
ধুরাহি লে পহুঁচাইয়ো মার্গ মে ছোড়ো নাহি

ওগো সাঁই! তুমি তো সব পারো, শক্ত করে ধরো আমার হাত
নিয়ে যাও পরমধামে, ছেড়ো না মাঝ পথে

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;