মানষ্যেরা মইরা যায়



আবু মুস্তাফিজ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশার মা মরল বিষ খাইয়া আর হাফিজার আব্বা মরল নাড়ে প্যাঁছ নাইগা।

তখন চৈত মাস, আসি আসি করিতেছে। পুলাপান পাকড়া গুটার গুয়ায় খড়ছি গাঁইতা আর খড়ছির গুয়ায় মুরগের ফৈড় গাঁইতা আকাশে জোরে ঢেল দেয়। হুঁশ কইরা পাকড়া গুটা আকাশের এত উঁচায় উড়িয়া যায় যে তারে আর দেখা যায় না।

মুরগির বাচ্চার ন্যায় জুড়ায় জুড়ায় চোখ মেলিয়া আকাশ পানে চাইয়া থাকে পুলাপানরা। একটু পরেই মুরগের ফৈড় চড়কির ন্যায় ঘুরিতে ঘুরিতে নিচে নাইমা আসে। বড় মনোহর ভঙ্গিতে।

গোড়ান গ্রামের দুয়ারে দুয়ারে তখন এই খেলা চলে। বাতাসে সইষ্যার ঝাঁঝ, বাড়ি দেয় মাইনষ্যের নাকে মুখে। গিরস্ত বাড়ির দুয়ারভরা ধুবরি আর মাঘী সইষ্যার পালা। হুকা দেওয়া সইষ্যার জ্বালায় খালি পাওয়ে হাঁটন দায়। পুলাপানের নরোম পায়ে বিন্দা পড়ে।

উহঃ কইরা চিক্যার দেয় আজিজ মাস্টরের পুলা রানা। এহনো দুধ ছাড়ে নাই, কিন্তু ছাড়ার কথা আছিল আরো দুই বচ্ছর আগে। কিন্তু মাস্টরের বউর বছর ঘুরতেই আরেক গেদি অওয়ায় লাভ হইছে ড্যাকরার। বইনেরে কেনি মাইরা নিজেই ঝাঁপিয়া পড়ে মাওয়ের নধর বুনিতে।

এতক্ষণ ঘুমিয়াই আছিল, গাড়ি বারিন্দায় ফালিয়া রাখা জলচকিতে। পুলাপানের উলাউলিতে ঘুম ভাঙছে। চোকে দুই ডলা মাইরা দেকে তাগো দুয়ারে পুলাপানের মেলা।

জলচকিথন নাইমা নৈড় দিয়া দুয়ারে নামে। হইষ্যা কাঁটা নরোম পাওর পাতায় ঘাঁই মারে। উহঃ কইরা চিক্যার দেয় ছ্যাড়া। কিন্তু পুলাপানের উলাউলিতে সে চিক্যার হারিয়া যায়।

মাস্টরের পুলাও ট্যাটন কম না, খাড়াইতে নিজেরে সামলিয়া নেয়। ন্যাটা দিয়া বইয়্যা ডাইন পাওডারে বাঁও পাওয়ের উপরে তুইলা বরই কাঁটার ন্যায় সইষ্যার কাঁটা ঝাইড়া ফালাইতে ফালাইতে ফোত ফোত কইরা কাঁন্দে, নাকে হিদ জইম্যা থাকায়।

পুলাপানের উলাউলি কী নইয়া ঠাহর করিতে এট্টু টাইম লাগে রানার। সবার চোখ আকাশমুখী থাকায় সেও চোখ মেলিয়া আকাশ দেখে। একটা না, দুইডা না, ঝাঁকে ঝাঁকে মুরগের ফৈড় চড়কির ন্যায় ঘুরিতে ঘুরিতে নিচে নামিয়া আসিতেছে।

মাস্টরের পুলার জল টলমলা চোকে মুরগের ফৈড়ালা পাকড়া গুটার ছবি আয়নার ন্যায় ফুটিয়া উঠে।

চড়কি মাটিতে গড়াইয়া পড়িলে পুলাপান পাছড়াপাছড়ি করিয়া উহাদের কুড়াইয়া ফির‌্যা ছুঁড়িয়া মারে। উহারা উড়িয়া চলিয়া যায় আকাশে। জোড়ায় জোড়ায় চোখ উহাদের নাই হওয়া দেখে। ফের ফিরা আইলে চড়কির ঘূর্ণিতে ওগো চোকও ঘুরপাক খাইতে থাকে।

একটা চড়কি রানার সামনেই পড়ে। থাফা দিয়া সে তা ধইরা ফেলে। চড়কির মূল মালিক এট্টু দূরে খাঁড়িয়া মালিকানা হারানির আশঙ্কায় পড়ে। মাস্টরের পুলা বইলা কথা। চাইলেই কাইড়া নেওয়া যায় না। তাই দূরে খাঁড়িয়া কারবার দেখে।
চড়কি হাতে পাইয়া রানা সকল ব্যথা ব্যাদ্না ভুইলা লাফ দিয়া খাঁড়ায়। অন্যগো দেখাদেখি সেও উহা ছুঁড়িয়া মারে। কিন্তু চড়কি আকাশে না গিয়া মাথার দুই তিন হাত উপরে উঠিয়াই নামিয়া পড়ে।

ইহা দেকিয়া চড়কির মূল মালিক খিক খিক করিয়া হাসে। আইগিয়া কাছে আইসা রানার হাত থিকা চড়কি নিয়া কহে, ওমনে না, এমনে। কইয়া মূল মালিক চড়কি আকাশে ছুড়িয়া মারে।

কিন্তু মালিকানা হাতছাড়া হইয়া যাওয়ায় রানা এইবার মাটিতে গড়ান দিয়া কান্দন শুরু করে। ব্যাপারটা আগেই বুঝবার পারছিল ছ্যাড়া। তাই নৈড় দিয়া পুলাপানের ভিড়ে ঢুইকা যাইতে দেরি করে না আর।

কিন্তু মাস্টরের পুলার গৈড় পাইরা কান্দনে অন্য পুলাপানও ডরাইয়া যায়। তারা চড়কি খেলা বাদ দিয়া পুব ভাগে পলাইয়া যায়।

পুব ভাগে বিরাট খেড়ের পালা, সেইখানে তারা পাহাড়ে চড়ার আমোদ নিয়া পালার উপরে উঠিতে থাকে। উপরে উঠিয়া লাফ দিয়া নিচে নামে।

নতুন এই খেলায় আমোদ আরো বেশি। তুমুল উত্তেজনা লইয়া পুলাপান পালার উপরে ওঠে এবং লাফ দিয়া নিচে নামিয়া পড়ে।

মাস্টরের পুলার গড়াগড়ি পাইড়া কান্দনটাই সার হয়, কেউ তারে ধরেও না, চড়কিও আনিয়া দেয় না। ফলে তার কান্দনডা আর জমে না। তাই কান্দন ভুইলা এক ফাঁকে চাইয়া দেখে তাগো দুয়ারে আর কেউ নাই। পুবভাগ থিকা উলাউলির আওয়াজ ভাসিয়া আসে।

কান্দন ভুইলা সে পুবভাগে দৌড় মারে। যাইয়া দেখে পুলাপান খেড়ের পালার মাথায় উঠিয়া লাফ দিয়া নিচে নামিয়া পড়িতেছে।

এই খেলাও তার মনে ধরে। সেও খেড়ের পালার পাহাড়ে উঠতে যায়। খেড়গুলারে চুলের মুঠির মতো ধইরা ধইরা ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকতে থাকে। কিন্তু কিছু দূর উঠিয়াই চুলের মুঠি ছাড়িয়া দিলেই ছর ছর কইরা নিচে নাইমা আসে।

এ এক মজার খেলা। একবার ওঠা, আরেকবার নামা। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর রানাও পালার মাথায় উইঠা পড়ে। উইঠা তার দুনিয়াডারে কেমন ছোট ছোট লাগে। আকাশটা য্যান মাথার একটু উপরেই। এক লাফের জায়গায় দুই তিন লাফ দিলেই ধরা যাইব তারে।

পুব ভাগের চৌরি ঘরের চাল দেখা যায়। চালে শুইয়া আছে বরই গাছ, তার অসংখ্য ডাইলপালা, পাকা পাকা বরই। যা নিচ থিকা দেখা যায় না। শিমগাছ, তার বেগুনীফুলগুলা।

মাস্টরের পুলা চারপাশটা একটু একটু দেখতে থাকে, কিন্তু পারে না বেশিক্ষণ। পুলাপান হুড়াহুড়ি লাগাইয়া দেয়, তারা উপরে উইঠা জাম্প দিয়া নিচে নাইমা যায়।

দেখাদেখি মাস্টরের পোলাও জাম্পের প্রস্তুতি নেয়। ওয়ান টু থিরি। যেনবা অনন্তকাল শূন্যে থাকিয়া মুরগের ফৈড়ের ন্যায় মাটিতে গোত্তা খায়।

আর তখনই সে টের পায় তার বাঁও হাতটা বাঁইকা গেছে। কী এক অভাবিত বোধ তারে ঘিরিয়া ধরে, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া আসে।

ম্যালাক্ষণ বাদে যখন সে নিশ্বাস নিতে পারে, তখন তার আর্তচিৎকারে পুব ভাগ হইতে মেহেদীর নানী ছুটিয়া আসে। কিছুদিন আগেই সে তার মেয়ে ও নাতি নাতকোরদিগকে দেখিতে দূরপাশা হইতে গোড়ান আসিয়াছে।

মেহেদীর নানী রানার বুক দুইয়া দিতে থাকে, সুরা পড়িতে পড়িতে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হইয়া আসিলে রানার চিৎকার বাড়িয়া চলে।

নানু আমার নানু কী হইছে আপনের? বলিয়া মেহেদীর নানী রানার বাঁও হাত দেখিয়া চমক্যা উঠে। সে হাতটারে সোজা করিতে চায় কিন্তু পারে না, উপরন্তু উহা ফুলিয়া উঠিতে থাকে।

শুনিয়া আজিজ মাস্টর স্কুল হইতে ছুটিয়া আসে। আইসা দেখে পুত্রর বাঁও হাত ফুলিয়া ঢোল হইয়া গেছে। তাহারে জলচৌকিতে শুয়াইয়া মাথায় পানি ঢালিতেছে, তার চাচাত ভাই হুমায়ুনের শ্বাশুড়ি, মেহেদীর নানী। উৎসাহী পুলাপান গোল হইয়া তাহাই দেখিতেছে, কোনোরূপ গোল না করিয়া।

আজিজ মাস্টর সময় নষ্ট না করিয়া একখানা বাঁশ কাটিয়া বাতি বানাইয়া তাহা দিয়া পুত্রর হাত যথাসম্ভব শক্ত করিয়া বাঁধিয়া দেয়।

সন্ধ্যায় অফিসথন রানার আম্মা আসিয়া আরেক দাবার চিকরাচিকরি শুরু করে। আব্বা আপনের কী হইছে? কী হইছে আপনের? আমার সোনা আব্বা, আপনে কিসের নিগ্যা খেড়ের পালায় উঠছিলেন? বইলা হাউমাউ কইরা কান্দে।

আজিজ মাস্টর জলচৌকিতে বইসা থাকে, গ্রামের লোকেরা তারে ঘিরিয়া থাকে, নানা কথা জিগাশ করে। সে কিছুর জব দেয়, কিছুর দেয় না। গ্রামের লোকেরা তার থমভাব বুঝিয়া নিজেরাও থম মারিয়া থাকে। কেহবা আবার নিজেরা নিজেরা প্যাচালে মগ্ন হইয়া পড়ে।

সারা রাইত কোনোভাবে কাটতে না কাটতেই সক্কাল বেলা তিনজনে ম্যালা করে মির্জাপুরে, কুমুদিনী হাসপাতালে।

হাসপাতালে ম্যালা মানুষ, সবাই অপরিচিত। তারই মাঝে একটা লোকে আজিজ মাস্টররে ডাকে, দুলা ভাই কেমুন আছেন?

আজিজ মাস্টর আইগিয়া যায়, আপনে এইখানে?

রানার আম্মা রানারে কয়, হাফিজার আব্বা।

হাফিজার আব্বা কয়, আমার ওসুক, ডাক্টারেরা কইছে, নাড়ে প্যাঁচ নাগছে।

আজিজ মাস্টর আহারে কইয়া সহমর্মিতা প্রকাশ করে।

হাফিজার আব্বা আরো জিগায়, আমনে এনু কিসের নিগা আইছেন?

আর কইয়েন না, আপনের ভাইগনার হাত ভাঙছে। কইয়া আজিজ মাস্টর তাড়াহুড়া করে, আসি তাইলে? যাওয়ার সুমে দেখা করুমনে।

ঠিকাছে দুলাভাই, কইয়া হাফিজার আব্বা খালি গতরে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে বসিয়া থাকে। তার নাড়ের প্যাঁচ ছোটার আশায়।

অপারেশন থিয়েটারে আজিজ মাস্টরের পুলা কেউরে কাছে ঘেঁষপার দেয় না। প্রথমে নাত্তি মারে নার্সরে। পরে এক শিক্ষানবিস ডাক্টার তারে ধরবার আইলে তারেও নাত্তি মাইরা বসে। ডাক্টার পিছিয়া যাওয়ায় নাত্তিডা অল্পের নিগা নাগে না।

এমতাবস্থায় ডাক্টার নার্সেরা একজন আরেকজনের মুখি তাকাবুকি করে। তখন মূল সার্জন হাতে একটা ফোরসেপ তুলিয়া লয় আর মুখ দিয়া চুক চুক শব্দ করিয়া মাস্টরের পুলার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ছুরিমুখি তাকাইয়াই মাস্টরের পুলার হাতপাও ছোড়াছুড়ি বন্ধ হইয়া যায়, ডরাইয়া স্থির হইয়া পড়ে। আর এই সুযোগে কেউ একজন তার মুখে ক্লোরোফর্মের মাস্কটা লাগাইয়া দেয়।

মাস্টরের পুলা অন্য পৃথিবীতে চলিয়া যায়, যে পৃথিবীতে পাকড়া গোটা মুরগের ফৈর হইয়া উড়িয়া চলে।

রানাও মুরগের ফৈড়ের ন্যায় উড়তে উড়তে এক আকাশ হইতে আরেক আকাশে যাইতে থাহে। তারপর একটা গভীর জঙ্গলে নামিয়া পড়ে। জঙ্গলের ভিতর দিয়া যাইতে যাইতে হঠাৎ একটা সুরঙ্গ দেখিতে পায়।

এই সময় কে যানি তারে ডাকে, আব্বা ওঠেন ওঠেন... আপনের হাত ভালো হইয়া গেছে।

রানার উঠতে ইচ্ছা করে না। সে সুড়ঙ্গের ভিতরেই থাকিতে চায়। কিন্তু আজিজ মাস্টর ছাড়ে না, আব্বা দেখেন দেখেন, আপনের নিগা কতডি চলকেট আনছি।

চলকেট নাকি আজিজ মাস্টরের ধাক্কাধাক্কি রানারে সুড়ঙ্গ হইতে টানিয়া আনে। উঠিয়া দেখে সে একখানা স্ট্রেচারে শুইয়া আছে। তার বাঁও হাতে প্লাস্টার করা, খালি গা। তার শরম করে।

রানার মা তার এক হাতে জামাটা পরায়, বাঁও হাত গজ দিয়া গলার সাথে ঝুলাইনা।

রানারে কোলে লইয়া আজিজ মাস্টর হাসপাতাল থিকা বাইরয়। নিচতালায় আইসা হাফিজার আব্বার নগে ফের দেখা হয়।

দুলাভাই আমার নিগা দুয়া কইরেন। ছলছল চোখে চাইয়া থাকে হাফিজার আব্বা। তার ফর্শা শইল শুকাইয়া দড়ি হইয়া গেছে পরাই।

হাসপাতালের সামনে শিশু গাছ, কৃষ্ণচূড়ারা ছায়া বিছাইয়া রাখাইয়া আছে। আজিজ মাস্টর রিকশা নেয়। তাহাদে পুলা আর বউরে লইয়া ম্যালা করে মির্জাপুর বাসট্যান্ডে। রানার বাঁও হাত ঝুইলা থাকে বুকের কাছে।

গাড়ি ঘোড়ার ন্যায় দৌড়ায়। চৈত মাসের গরমে যাত্রীরা বাসাত না থাকায় জুবজুবিয়া ঘামে। কাটবডি বাসের নগে রাস্তার গাছেরাও দৌড়ায়।

পাকুল্যা বাজারে আইসা গাড়ি থামে। আজিজ মাস্টার নাইমা পড়ে, স্ত্রী পুত্রসহ।
তাহাদে বিাজার থিক্যা এক সের গুল্লা কিনে, রসগুল্লা। বউরে কয়, খাবা?

বউ কয়, না, থাইগ্গাছে। বাইত্তে যাইয়া খামুনি।

পুত্ররে জিগাশ করে, আব্বা আমনে একটা খাবেন?

রানার সুড়ঙ্গের ধ্যান্দাটা এখনো ছাড়ে নাই, খুন খুন কইরা কান্দে।

ফলে আজিজ মাস্টর নিজেই কয়, এহ বাইত্তে তো আইসা পড়ছি, আবর কান্দন কিসের?

রানা তেমু খুন খুন কইরা কান্দে। তার আম্মা তারে কোলে নিয়া বসে। আর কানে কানে কয়, কাইলকা নানীগইত্তে যামু। কান্দে নাছে।

নানীর বাড়ি যাওনের কথা শুইনা রানার চোখের সুড়ঙ্গে ঝিলিক মারে। তার খুন খুন কান্দন বন্ধ হইতে থাকে।

নানীগইত্তে যাইয়া শোনে হাফিজার আব্বা মইরা গেছে। পরের দিন তার লাশ আসে, তালাইয়ে মোড়া।

বিশার মাও আরো সপ্তাহানি আগেই মইরা গেছে।

রানা তার আম্মার কোলে বইসা দুধ খায়, না ভাঙ্গা হাত দিয়া বুনি ছানতে ছানতে। রানার আম্মার উঁকুণ বাইছা দেয় বিশার চাচতো বোইন সালেহা।

হইছিল কী, বিষ খাইল যে? রানার আম্মা জিগাশ করে।

প্যাট বাজছিল।

এল্লা! কস কী? ওই বুইড়া বেঠির!

হ, ওইডাই তো কইতাছে মাইনষ্যে।

তা ক্যারা বাজাইছিল?

চারাবাড়ির এক ছ্যারা। কামলা দিবার আইছিল ওগো বাইত্তে। এর মধ্যেই ঘটনা ঘইটা গেছে। বিশা রাইতে উইঠা বাঁশছুফে হাগবার যাইয়া মাওরে ওই ছ্যারার নগে দেখছে।

তারবাদে?

তারবাদে আর কী? পুলায় মায়ের নগে রাগ কইরা ঘরে দিছে ঝাঁপ, আর খুলে না। বিশার মাও দুয়ারে খাড়িয়া কান্দে। কিন্তু পুলায় আর ঝাঁপ খুলে না যে খুলেই না।

হুম।

ছ্যাড়ারই বা দুষ কী? কয়দিন পরে করব বিয়া, মার এই কীত্তিকলাপ কি সইয়া পারে?

তাতো ঠিকই।

হেই রাইতেই বিষ খায় বিশার মাও। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শ্যাষ। পরে ডাক্তাররা কয়, হ্যার প্যাটে বাচ্চা আছে, এক মাসের।

আহারে।

রানা দুধ খাইতে খাইতে সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়া হাঁটতে হাঁটতে মুরগের ফৈড়ের ন্যায় আকাশে উড়িতে থাকে।

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;