পাপড়িগুলো স্পর্শ করেও দেখিনি



সোহেল হাসান গালিব
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
ধূর্ত সে আরব লোকটির কথা ভাবো একবার—
যে এসে আলাদিনের নগরীতে রাষ্ট্র করে দিল :
‘নতুন প্রদীপ পাবে, দাও যদি ঘরের পুরানো
দীপখানা।’ কাঙ্ক্ষিত বস্তু সে তবু পেয়েও হারালো।
একটি সফল পঙ্‌ক্তি—সকল জ্ঞানের বিনিময়ে
চায় কবি। গায় গান নিখিলের খিন্ন ফেরিঅলা।
নিজে জ্বলে না-উঠে যে কেবলই জ্বালায় মানুষের
অন্তর্গত তুশবাক্য, পাষণ্ডের অট্টহাসি-দেয়া
দৈত্য যার বুকে-পোষা ঘুমন্ত নিশ্বাস, সে প্রদীপ
আয়ত্ত হবে না কোনোদিনও। শকুন্তলা নাম্নী এক
খণ্ডিতার মতো, খুলে পড়ে-যাওয়া আংটির পেছনে
এ জীবন যাবে ডুবসাঁতারেই; দুষ্মন্ত যদিও
অন্ত্যমিল। সেও প্রাপ্তি বটে। এও কি বাঞ্ছিত তবু?
বুঝে দ্যাখো, ফলত পর্যবসিত হলো প্রত্যেকেই—
ধূর্ত বা সরল! কোন পথে যাব আমি? একদিন
শুধু প্রদীপের জন্য এসেছিলাম তোমার কাছে,
এ সত্য, হে প্রাসাদ-নন্দিনী; সত্য যে এসেছিলাম
অঙ্গুরীয় পেতে, জল-কুমারী হে, মৎস্য-পলাতকা!

২.
দুঃসময় কেটে গেলে পরাজিত বোধ জেগে ওঠে
অশথের চারার মতন—প্রাচীরের হাহাকার
ভেদ করে—শেকড়ে শেকড়ে তার যন্ত্রণার টান—
দেয়াল ভাঙার গুপ্তপণ। দুতিনটে শিশু-পাতা
নেচে যায় সারাক্ষণ রোদের ভেল্কিতে। যে তাড়নে
অমন উল্লাস জীবনের—যে কারণে নির্জীবের
বুকের ওপর অট্টহাসি—সেই জাদুটুকু তুমি
আমাকে দেখাও—চূর্ণ করি আজ একটি পাথর—
দ্বিধায় কাতর হয়ে পড়ে থাকা অশ্রুঝর্নাতলে—
যেখানে জলের ঘায়ে একে একে ফুটেছে ফুলের
পাপড়িগুলো—ফুল ফোটে নাই। আমার তো অস্ত্র নাই;
যদিও তোমারই হাতে রয়েছে কুঠার-কোপানল।
বনের ভেতরে এসে একদিন জাগিয়েছো তুমি
বৃক্ষনিধনের পাশে নিপুণ নিক্কণ। তারই সুর
বাতাসে আঁচড় কাটে—তারই স্মৃতি—গীতিচিত্ররঙ
একটি বাকলপত্রে—সমস্ত পেয়েছি বটে আমি—
তোমারই অন্তিম উচ্চারণ। বলো হে দাহিকা তবে
রোদ্দুরে আশ্রয় নিয়ে ছায়া তার গুটাবে কি ডানা?

৩.
গন্ধের উড়াল দিয়ে এক ফুল, বাগানের থেকে
আমাদের দুটি ঘরে আসে। আমি ও আমার ভাই
তাকে কাছে পাই আর ভাবি, এটা কার? বুঝি না যে
একই ফুল একই সাথে কী করে দুহাতে চলে যায়,
কেন যায়? হাতেরে সন্দেহ করি, করি ফুলেরেও।
আরো মনোরম হয়ে কেঁপে ওঠে সে গন্ধকেশর।
শেষে দুই ভাই, হুমকির বাজি পুড়িয়ে নীরবে,
ভুলে গিয়ে ক্ষুব্ধ রেষারেশি, জানলাম, ওই ফুল
আমাদের দুজনের কারো ঘরে নাই। এই কথা
বলি না কাউকে, ছোট চাচিকেও, দূর জানালায়
শুনি যার গান, যার সবুজ আলোর রাত্রি থেকে
আসে সেই গন্ধ, দ্বিধানিম্নস্বরে; বাগানের পথ
থাকে যার পায়ের তলায়। দেখি তাকে, কখনোবা
ফুল তুলে ছড়ায় পাপড়িগুলো ঘাসের চিকন
আঙুলের ফাঁকে। আমি তা কুড়াই দেখে বাবা হাসে।
মা বিরক্ত খুব : ‘মালি কোথাকার!’ কিছুই বলি না,
কিছুতে ছাড়ি না পাগলামি, পাপড়ির ভেতরেই
খুঁজি আমি, জগতের না-পাওয়া সে ফুলের আকার।

৪.
পাপড়িগুলো আজও স্পর্শ করেও দেখিনি, পুষ্প জানে।
জ্ঞাতি-বোনেদের মৃদু শ্বাস ও শাসনে ডুবে থেকে
ঘ্রাণসিন্ধু কাকে বলে, এই প্রশ্ন কেবল তুলেছি।
পল্লবের কাছে গিয়ে কুসুমচয়ন না করেই
যারা ফিরে এসেছে, তাদেরই দলে আমি। ভুল কিছু
করেছি কি? তারা-মাছ হাতে নিয়ে জলেই দিয়েছি
ছেড়ে—দেখেছি সে সমুদ্রের প্রত্যাবর্ত-ঢেউ নিয়ে
ভেসে গেছে। এতদিন ধরে শুধু ফুল তোলা হলো
কাপড়ের গায়। অর্থহীন অর্থে। নন্দন-প্রয়াসে।
এইবার দর্জির নিপুণ হাতে কেটে-ছেটে-নেয়া
পোশাকের কথা ভাবা যাক—অন্য কারো প্রয়োজনে।
আরো দিন আরো রাত্রি পার করে তবে, অনুমান,
সংগীত-মধুর হবে পানোৎসব—প্রত্যাশার চেয়ে
বেশি মিষ্টতার। কিছু গান শিখেছি যে। বৃষ্টি যদি
না আসে, না এলো—আছে ফুলের ফোয়ারা। খরতাপে
কখনো আঠালো ফাঁদ নিয়ে তাই ছোট্ট ভাঙা ডালে,
ঘুরি নাই ডানাঅলাদের পিছে, হে ফড়িং তুমি
বিকেলের রোদে নম্র হয়ে সেধে ধরা দেবে ব’লে।