জৈবপদার্থ



অমিতাভ পাল
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

সেবার ভয়ানক বন্যা হয়। ভেসে যায় দেশের উত্তরাঞ্চলের ব্যাপক অংশ। ঘরে ঘরে হাহাকার, মৃত্যুযন্ত্রণা, শোক, ক্ষুধা—সব একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষকে নিঃশেষ করে দিতে। সংবাদপত্র আর টিভি প্রতিদিন ভরে ওঠে ক্ষয়ক্ষতি আর ত্রাণের বিবরণে। রাজধানী থেকে শতশত স্বেচ্ছাসেবী ঝোলাভরা ত্রাণ নিয়ে নেমে পড়ে মানুষ বাঁচানোর মিশনে।

এইরকম সময়েই এই গল্পটার শুরু। আর পাত্র উত্তরাঞ্চলের এক ছোট্ট জনপদের স্থানীয় চেয়ারম্যান। এই লোকটির নির্বাচনী এলাকাও প্লাবিত হয়েছিল প্রবল বন্যায়। আর মানুষও নিঃশেষ হচ্ছিল দিনের পর দিন।

ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলল চেয়ারম্যানকে। বন্যায় আর সবার যে ক্ষতিই হোক—তার যে একটা বিশেষ ক্ষতি হচ্ছে সবকিছুর অগোচরে, সেটা সামলাতে কোনো ত্রাণ তৎপরতাই যথেষ্ট না। এই বিশেষ ক্ষতিটা হলো—মানুষের মৃত্যু তার ভোটার সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। তার নিজের এলাকার মানুষের ভোটেই এতদিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারাত সে। এই অস্ত্র বুঝি আর তার হাতে রইল না। খাবার না থাকলে ত্রাণ দিয়ে খাবারের পরিমাণ বাড়ানো যায়। কিন্তু মানুষ—তাকে বাড়ানোর উপায় কী? এদিকে নির্বাচনেরও আর বেশি দেরি নেই।

সমস্যাটা হারাম করে দিল তার রাতের ঘুম। এদিকে এলাকার বন্যায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার বউ আর মেয়ে তৈরি করেছে ত্রাণ কমিটি। চেয়ারম্যান ভেবেছিল, এই ত্রাণ কমিটির প্রধান অতিথি হয়ে কর্তব্য পালনে এলাকায় সাড়া ফেলে দেবে সে। কিন্তু ভোটার কমে যাওয়ার সমস্যাটা তাকে তো সেই কাজ করতে দিলই না, বরং ত্রাণের নাম শুনলে এখন তার মেজাজ খারাপ হয়। বউ আর মেয়ে তাকে বারবার বোঝাল, যারা বেঁচে আছে—তাদের বাঁচিয়ে না রাখলে ভোট আরো কমে যাবে। কিন্তু তবু তার মন গলছিল না এইসব কথায়। শেষে অনেক গা মোড়ামুড়ি আর যুক্তিতর্কের লড়াইয়ের পর চেয়ারম্যান ত্রাণ কমিটির কাজে যুক্ত হলো।

কিন্তু মন থাকে না যেই কাজে, সেটা হয়ও না ভালোভাবে। চেয়ারম্যানের মনে হলো এতদিন ধরে বিভিন্ন কৌশলে পাওয়া টাকাগুলি শুধুশুধু খরচ হয়ে যাচ্ছে কিছু অহেতুক কাজে। ব্যাপারটা মেনে নিতে একটুও ভালো লাগলো না তার। তারপর একদিন এক দীর্ঘ ত্রাণ অভিযান শেষে বাড়িতে ফিরে সে ঘোষণা দিল, অনেক হয়েছে। বউ আর মেয়েকেও সে ধমকে দিল এই বলে—তার টাকায় ছাতা পড়েনি। আর যেই টাকা খরচ হয়েছে এই কয়দিনের ত্রাণ অভিযানে—বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট হিসাবে পাওয়া টাকা থেকে সেটা তুলে নেওয়ারও পরিকল্পনা করল সে।

কিন্তু কয়েকদিন পরেই এক ভয়াবহ খবর নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে হাজির হলো পরিষদের অ্যাকাউন্টেন্ট। জানাল, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে—প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় শেষ হওয়ার কারণে অসমাপ্ত প্রকল্পগুলির বাজেট বরাদ্দ ফেরত দিতে হবে।

মাথায় যেন বাজ পড়ল চেয়ারম্যানের। বাজেট বরাদ্দের অনেক টাকাই তো বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে বিভিন্ন আকাশে। এখন তাদের আবার ঘনীভবন করে ফেরত আনাটা প্রায় অসম্ভব। অবশ্য তাদের অধিকাংশ গেছে তার পকেটেই। কিন্তু তারপরও পাওয়া টাকাগুলিকে হাতছাড়া হতে দিতে কে চায়। বিকল্প একটা পথ বের করতে হবে—এই ভেবে অ্যাকাউন্টেন্টকে একটা বুদ্ধি খুঁজতে বলল চেয়ারম্যান।

উপরওয়ালার নির্দেশে বুদ্ধি খুঁজতে মাথার মাঠে নেমে পড়ল অ্যাকাউন্টেন্ট। কিন্তু কোথায় কী? সব বুদ্ধি যেন এই দুঃসময়ে তার সাথে পলামুঞ্জি খেলতে শুরু করল এবং তার বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে মজাও নিতে শুরু করল একই সময়ে। অ্যাকাউন্টেন্টের এখন দিন কাটে না রাত কাটে না। এদিকে চেয়ারম্যানও ঘনঘন তাগাদা দিচ্ছে।

মন খারাপ করে এক সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে অ্যাকাউন্টেন্ট দেখল তার মেয়ে উচ্চকণ্ঠে স্কুলের পড়া মুখস্ত করছে। পড়ার বিষয় জৈবপদার্থ। হাতমুখ ধুতে ধুতে অ্যাকাউন্টেন্ট শুনল মেয়ে পড়ছে জৈবপদার্থ গলে পচে মাটিতে মিশে যায় এবং গাছপালার খাদ্য হয়। মানুষও যে একটা জৈবপদার্থ—এটাও সে জানল মেয়ের উচ্চস্বরের কারণে। সাথেসাথেই তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল একটা সুস্পষ্ট বুদ্ধি। এবং সেই বুদ্ধি তাকে দেখাল চেয়ারম্যানের সমস্যা সমাধানের পথ।

পরদিন সে চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে বলল সব ধরনের ত্রাণ তৎপরতা বন্ধ করে দিতে এবং প্রকল্পের টাকাও তহবিল ভেঙেই সরকারকে ফিরিয়ে দিতে বলল। চেয়ারম্যান এই প্রস্তাব শুনে প্রথমে অ্যাকাউন্টেন্টকে গালাগালি করল পাগল বলে। কিন্তু শেষে প্রস্তাব দুইটাই মেনে নিল অ্যাকাউন্টেন্টের অতীতের বিভিন্ন কারিশমার কথা মনে করে এবং জলে পড়ার পর আঁকড়ে ধরার মতো একটা খড়কুটাও পাচ্ছে না দেখে।

২.
বন্যা শেষ। চেয়ারম্যানের ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এদিকে বন্যার্তদের জীবন বাঁচানোর তাগিদ ঘরে ঘরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের শোকের স্তূপকে অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে এসেছে সদ্য পলি পড়া জমি চাষাবাদের জন্য। এছাড়া আর উপায়ই বা কী। মৃত্যুর চেয়ে জীবনের হা যে অনেক বড়।

ওদিকে চেয়ারম্যানের তর আর সইছে না। ভোটার কমে যাওয়ার শোক তো আছেই, প্রকল্পগুলির বাজেট ফিরিয়ে দেওয়ায় শূন্য তহবিলও তার দিকে চেয়ে হাসছে সবসময়। এদিকে অ্যাকাউন্টেন্ট খালি অপেক্ষা করতে বলছে, দেখাচ্ছে সবুরের মেওয়া খাবার লোভ। কিন্তু দুঃশ্চিন্তায় যে তার ক্ষুধাই লাগে না—মেওয়া খাবে কখন। তবে চেয়ারম্যানকে অপছন্দের অপেক্ষার মধ্যে আটকে রাখলেও অ্যাকাউন্টেন্ট নিজে কিন্তু শুধু অপেক্ষা করে কাটাচ্ছিল না তার দিনগুলি। চারদিকে লোক লাগিয়ে বন্যায় জীবন হারানো মানুষজনের মৃতদেহ সংগ্রহ করে সে পুঁতে দিচ্ছিল এলাকার জমিগুলির নিচে।

বন্যায় পড়া পলি আর অ্যাকাউন্টেন্টের পুঁতে দেওয়া মানুষজনের মৃতদেহের জৈবপদার্থের গুণে সেবার ফসল ফলল বিপুল পরিমাণে। এবং সেই ফসল ফলার খবর ছড়িয়ে পড়ল রাজধানীসহ সারাদেশে। কৃষিবিভাগ অনেক পরিসংখ্যান আর গবেষণাপত্র ঘেঁটে আবিষ্কার করল এমন ফলন নিকট অতীতে কখনো হয়নি। ফলে তারা সরকারের কাছে সুপারিশ করল সঠিক নেতৃত্ব দেবার জন্য এলাকার চেয়ারম্যানকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দিতে। আর সরকারও তো কৃতিত্ব নেবার জন্য এরকম খবরের খোঁজে থাকে সারাবছর। তাই কৃষিবিভাগের সুপারিশটা পাবার সাথেসাথে ঘোষণা করে দিল—কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়নে মূল্যবান ভূমিকা রাখার জন্য এবছর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেয়া হবে ওই এলাকার চেয়ারম্যানকে। কৃষিমন্ত্রীও যে কোনো সভা সমাবেশে একথা জানাতে ভুলল না যে, এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে তার সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণেই।

যথাসময়ে চেয়ারম্যানের গলায় ঝুলল রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এবং আরো নজির সৃষ্টির জন্য তাকে ঢালাওভাবে দেওয়া হলো বিভিন্ন প্রকল্প—যাদের বাজেটের পরিমাণ অকল্পনীয়। এসব প্রকল্পের মেয়াদও নির্দিষ্ট ছিল না।

চেয়ারম্যানও আজকাল তার যে কোনো বক্তৃতায় জৈবপদার্থের গুণাগুণ এবং সবুরের মেওয়ার স্বাদের উদাহরণ দিতে কোনো ভুল করে না।

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;