পাঁচজন আমেরিকান কবির কবিতা



ভূমিকা ও অনুবাদ: রাজিয়া সুলতানা
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

চার্লস সিমিককে বর্তমান সময়ের এক অনন্যসাধারণ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর জন্ম সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেদে ১৯৩৮ সালে। ১৯৫৪ সালে বাবার সাথে যোগ দিতে তিনি মা এবং ভাইয়ের সাথে আমেরিকায় চলে আসেন। পরে সেখানেই নাগরিকত্ব নেন। একুশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই হোয়াট দ্য গ্রাস সেইজ। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন একাডেমিক ফেলোশিপ এবং পুলিৎজারসহ বহু পুরস্কার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলগ্রেদে নিজের শৈশব এবং কৈশোরে যুদ্ধের যে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হয় তাঁর, পরবর্তীতে সেই অভিজ্ঞতাই তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে আধুনিক জীবনের আত্মিক শূন্যতার কথা।

আংশিক ব্যাখ্যা
চার্লস সিমিক

মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ হলো
ওয়েটার আমার খাবারের অর্ডার নিয়েছে।
দুপুরের খাবারের এই রেস্তোরাঁটা খুব ছোট আর নোংরা
বাইরে বরফ পড়ছে।
মনে হচ্ছে আরো বেশি অন্ধকার হয়ে এসেছে
আমার পেছনে যখন শেষবার রান্নাঘরের দরোজার শব্দ পাই
তখন লক্ষ করি রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে।
বরফ দেওয়া একগ্লাস পানি
আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে
এই টেবিলে প্রথমে ঢুকেই জায়গাটা আমি বেছে নিয়েছি।
এরপর তৃষ্ণা জেগেছে এক
অসম্ভব এক বাসনায়
রাঁধুনেদের কথোপকথন
শোনার জন্য আড়ি পেতেছি।


মেরি কর্নিশের জন্ম ১৯৪৮ সালে। প্রধানত লেখক এবং শিশুদের বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী। তিনি তাঁর শেষজীবনে কবিতার দিকে ঝুঁকেছিলেন যখন তিনি সারাহ লরেন্স কলেজে ক্রিয়েটিভ ননফিকশনের ওপর কোর্স করতে যান।কবিতায় গৃহস্থালীজীবনের ওপর চিন্তাশীল তদন্তকার্য চালানোর জন্য তিনি সুপরিচিত। কবিতায় শিল্প, দক্ষতা এবং অতীতের মাঝে সম্পর্ক অন্বেষণে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর কবিতাসংকলনের নাম রেড স্টুডিও (ওবার্লিন কলেজ প্রেস থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত)। তিনি ওয়েস্টার্ন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন।

সংখ্যারা
মেরি কর্নিশ

সংখ্যাদের উদারতা আমার পছন্দ
যেভাবে ওরা কোনোকিছু বা কাউকে গণনা করেঃ
দুটো আচার, ঘরে যেতে একটা দোর
রাজহাঁসের পোশাকে নর্তকী আটজন।

যোগ অংকের গৃহস্থালী আমার পছন্দ—
দুইপেয়ালা দুধ যোগ করো আর নাড়ো
প্রাচুর্য্যের বোধটাই ধরোঃ মাটিতে ছয়টা বরই
গাছ থেকে পড়ছে তিনটে আরো ।

আর গুণনের বিদ্যায়
মাছ দিয়ে যদি মাছ গুণ করো,
নৌকোর ছায়ার নিচে রুপোলি শরীরে তাদের জন্ম।

এমনকি বিয়োগেও নেই ক্ষতি কোনো
অন্য কোথাও তো হচ্ছে যোগ-বাড়ন্ত
ধরো পাঁচটা চড়ুই, তাত্থেকে নিলে দুটো
অন্য কারো বাগানে এখন ওদের দিব্যি পাচ্ছ।

ভাগ অংকেও রয়েছে বিস্তার,
‘টেক আউট’ চাইনিজ খাবারের বাক্স যদি খোলো
ভাঁজ করা প্রত্যেক কুকির ভেতর
খুলে যাবে নতুন এক ভাগ্য।

বিস্মিত হই না কখনো
উপহারে যখন বেজোড় অবশিষ্ট,
এবং অবশেষে মুক্ত
সাতচল্লিশকে এগারো দিয়ে ভাগ করো
পাবে চার ভাগশেষে রবে তিনও।

তিনটে বালককে মা ফোন করে পাচ্ছে না
দু’জন ইতালীয় সমুদ্রের দিকে গেছে
একটা মোজা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না


ক্যারল স্নো কবি ও লেখক। তাঁর ছয়টি কবিতাগ্রন্থের মধ্যে প্লেসড কেউরসেন্সুই [২০০৮] উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতাকে বর্ণনা করা হয় পোস্ট-ট্রমাটিক হিসেবে—যেটি অর্ধেক দেখা, অর্ধেক স্মরণের মাঝে ঘুরপাক খায়। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন পুশকার্ট পুরস্কার।

ভ্রমণ
ক্যারল স্নো

জাপানে এক মন্দিরের কাছে সে পথে ঝাড়ু দিত
তারপর ক্যামেলিয়া ফুল বিছিয়ে রাখত সেখানে

অথবা—জানার কোনো উপায়ই নেই—
সে সেই পথে ঝরে পড়া ক্যামেলিয়াগুলোর মাঝখানে ঝাড়ু দিত কিনা


ট্রেসি কে. স্মিথ ম্যাসাচুসেটসে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে উঠেছেন নর্দান ক্যালিফোর্নিয়ায়। এ যাবত তাঁর চারটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বডি’স কোয়েশ্চেন [২০০৩ ] বইটির জন্য কেইভ কানেম পুরস্কার পান। যেটি আফ্রো-আমেরিকান লেখক হিসেবে তাঁর সেরা প্রথম বইয়ের জন্য দেওয়া হয় তাকে। লাইফ অন মার্স [২০১১] বইটির জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২ সালে। তিনি আমেরিকান পোয়েট লরিয়েট হিসেবে ছিলেন ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত। তাঁর কবিতায় কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের জীবনের গভীর সত্য বিশেষ করে তাদের সমাজ-সংস্কৃতি এবং টিকে থাকার যুদ্ধ বিশাল জায়গা অধিকার করে আছে। তবে নারীসত্তার গহন-মগ্ন উদ্ভাস পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়, যা তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিং পড়ান।

উত্তম জীবন
ট্রেসি কে. স্মিথ

যখন কেউ টাকাপয়সা নিয়ে কথা বলে
এবং এমনভাবে বলে যেন এগুলো কোনো রহস্যময় প্রেমিক অথবা প্রেমিকা
যারা দুধ ক্রয় করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি,
ভাবতে ভাবতে আমি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি
কতগুলো বছর যে আমি শুধু কফি আর রুটির ওপর বেঁচে ছিলাম,
পেটে খিদে থাকত সারাক্ষণ, বেতন পাবার দিন সেই স্ত্রীলোকটির মতো পায়ে হেঁটে কাজে যেতাম
গ্রামে কুয়ো না থাকায় পানি সংগ্রহের জন্য যে অন্যগ্রামে যেত
তারপর এক কি দুই রাত অন্য সবার মতন
চিকেন-রোস্ট আর রেড ওয়াইন খেয়ে বেঁচে ছিলাম।


স্টিভ কোইট নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্মগ্রহণ করেন (১৯৩৮-২০১৫)। তিনি একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, শিক্ষক ও ওয়ার্কশপের কাজে সহযোগী। তরুণ বয়সে কফিশপে নিয়মিত কবিতা পড়েছেন। ঘোর যুদ্ধবিরোধী, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিনি আমেরিকান সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি, বরং সেই যুদ্ধকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘আমেরিকা কতৃক ভিয়েতনামী মানুষদের পশুর মতো বধ করার আয়োজন’ বলে। পুশকার্ট পুরস্কারসহ পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা। কবিতার পাশাপাশি তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদকর্ম পাবলো নেরুদার, ইনসাইটমেন্ট টু নিক্সনিসাইড এন্ড প্রেইজ ফর দ্য চিলিয়ান রেভ্যুলেশন-এর ইংরেজি অনুবাদ। তাঁর তেরটি কবিতাগ্রন্থের মধ্যে চেরিশঃ নিউ এন্ড সিলেক্টেড পোয়েমস (২০১৫) অন্যতম।

কিছু মেঘ
স্টিভ কোইট

এখন যখন ফোন খুলে রেখে দিয়েছি,
কেউ আর আমাকে পাবে না—
অন্তত এই বিকেলে তো নয়
এখন আমার পরামর্শ আর মতামত ছাড়াই তাদের চলতে হবে।
এখন কেউ আর আমাকে কল করবে না
দ্বিধান্বিত কণ্ঠে শুধাবে না
একদা যে মেয়েটিকে আমি ভালোবাসতাম
তার মৃত্যুর খবর আমি শুনেছি কি না—
শহরের ওপর যে ছাইগুলো উড়ছিল যেখানে সেখানে
সেগুলোর অস্তিত্ব এখন বিলীন হয়েছে।
জ্বি, ধন্যবাদ, আমি শুনেছি।
আজ সকালটা এত সুন্দর ছিল যে
তারই আমাকে সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিল।
সূর্যটা ছোট কমলালেবুগুলোকে মাতাল করে তুলেছে
আর জ্বলজ্বলে লাল আর হলুদ ফুলগুলো যেন অযুত মোমবাতি।
আজকের এই বিকেলে আমাকে তাদের ছাড় দিতে হবে
অনেক আগের ঘটনাগুলো আবার ঘটছে সেগুলো দেখতে আমি ব্যস্ত
জোসেফিনের বাগানে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দেখছি অসম্ভব নীল আকাশ,
ভেঙে গেছে—বলা যায়—
সাদা সাদা অসম্ভব কমনীয় উত্তাল কিছু মেঘের তরঙ্গ
এক শূন্যগর্ভ থেকে আরেক অনস্তিত্বে ধাবিত হচ্ছে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;