দিকে দিকে এইসব নকশিকাঁথা-হাসি-যৌনরংধনু

রথো রাফি
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ক্ষুধা

আর্ত শিশুর চোখের জল এই ক্ষুধা
দেখো মাথার ওপর
নক্ষত্রনীলিমা হয়ে জ্বলছে রোজ

আর মাছের অজ্ঞাতে জাল পেতে বসে থাকা
এই দীর্ঘ রাত
টের পাচ্ছে প্রাণের টানেই চারদিকে
প্রাণঘাতী এক নকশিকাঁথা বুনে চলেছে সময়

মাকড়শার জালের চেয়েও সূক্ষ্ণসফল এই ফাঁদ
দিকে দিকে এইসব নকশিকাঁথা-হাসি-যৌনরংধনু
শিকার করে চলে আমাদের চিরকাল
একেবারেই চেতনানাশকবিহীন

আর ওই বুনোরং উৎসবের খুব নিচে
পাপড়িতে পাপড়িতে
ওঁৎ পেতে থাকে ওই অতল উন্মাদ ডিম্বাশয়গুলো
এবং পরাগপোড়া শুষ্ক হাওয়ালাগা
মৃত্যুমগ্ন নদীতে নদীতে
লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসে
ওই নিরপরাধ শিকারি শিশুগুলি
আর গান গায় অস্ত্রস্নাতভালোবাসা
আর রক্তসফলতার
আর শত্রুর মতো মাঠদগ্ধসূর্য জ্বলে দাউদাউ

শুনেছি সূর্যের ঐ বুক থেকে নাকি
ঝাঁক ঝাঁক উর্ধ্বশ্বাসহিংস্রশুক্রাণুগুলো
প্রান্তরে নেমে আসে
কাঠফাটাপ্রাণ গান গায় জল স্থল ও আকাশে

শ্রমের ভেতর নাকি আমাদের ক্ষুধাই
নিখুঁত অনূদিত হয় দিনরাত
অভিজ্ঞতাই আমাদের সাথে নাকি
বিস্মরণহীন বহুদূর যাবে
আর পথে পথে চিন্তারীতিভীতিস্বপ্নশিখা
গিরগিটির মতো বহুবার রঙ বদলাবে
আর অবিচ্ছেদ্যমোমের মতোন
আমাকেও ফুরিয়ে ফেলবে
আমারই অনিচ্ছায়—এই উদ্বেগবিষাদবিষ
আমাকে বরং ফাঁদনির্মাতা করেছে কিনা
আমি তাও ভাবি নাই

ময়ূরের নক্ষত্রময় পেখম
প্রজাপতির ডানার এই সাজ নাকি
লক্ষ বছরের জমাটবাঁধা শ্রম
কারা যেন আমাকে এসব শেখাতে চায়
আমি কিছু শিখি নাই

ক্ষুধায় এখানে জাল পেতে বসে আছি আজীবন
বসে আছি মাছের বিরুদ্ধে মাছ
আর জীবনের বিরুদ্ধে জীবন

পাখির আবহমান গান আদৌ মিষ্টি কিনা
কিংবা আমাকে লক্ষ্য করেই তারা ঝরে কিনা
লক্ষও করিনি আমি
তারও জন্মইতিহাস আততায়ীসফলতার কিনা
তা-ও ভাবি নাই
মাছ শিকারের পর শুধু টের পাই
নীরবতা ভেঙে আমারও প্রাণ
নগ্ন নীলিমার নিচে
কেমন স্বতঃস্ফূর্ত শিস দিয়ে ওঠে

আরো কারা যেন আমারই মতোন
মাছের অজ্ঞাতে জাল পেতে সারারাত
ছেঁকে চলে আবিশ্বঅন্ধকারজল
এ যেন নিজেরই রক্ত বিশোধন
নিজের শ্রমেঘামে
নিজের অজ্ঞাতে
এই পৃথিবীর পিঠে প্রাণের প্রজ্ঞায়
যেন নিজেকেই ধুলো করা ফের
আমি আর চিনে উঠতে পারি না তাদের

আর এই নক্ষত্রঘোর একদিন কেটে গেলে
সকলেই নাকি দেখতে পায়
সামনে পড়ে আছে
নিজেরই ভাঙাচোরাহাড়ের ঠাঠা হাসি
এই হাসাহাসির দিকে ভ্রুক্ষেপহীন আপন শিশুদের
আবারও নাকি দেখা যায়
মাছের অজ্ঞাতে জাল পেতে বসে আছে
ক্ষুধা আর স্বপ্নের সংঘর্ষে জ্বলছে দিনরাত
পিতৃপুরুষেরই প্রতিধ্বনি যেন

ক্ষুধারক্তমাংসময়জীবনেরফাঁদে আটকে গিয়ে
জীবন ও মৃত্যু দিয়ে বোনা
ওই অপূর্ব ও চিরকালীন জালের দিকে
চোখ রেখে এ জীবনে সুযোগ হলো না আর
অন্যকারোগল্পেজীবনেনীরবস্রোতে ঠিকঠাককানখাড়াকরা
কিংবা এইসবএইসববিশুদ্ধভাবাভাবির

উদ্বেগ

১.
বিশাল একটা চাঁদের নিচে
মাঠ কি মাঠ অগণন শূন্য হাঁড়ি উথলে
শিশুদের কান্নাধ্বনি গড়িয়ে যাচ্ছে দশদিকে
ডেকে আনছে চির গর্জনশীল সমুদ্রকে

শূন্য হাঁড়ি ভরে উঠবে যেন পাথরেই
যেন পাথরেই!

২.
বিশাল সেই আকাশের নিচে
ঢাকনাহীন শত শত শূন্য হাঁড়ির ওপর দিয়ে
লাফিয়ে চলে গেল
অন্ধকারকে ভীতিকর করে গেল আরো
ঘাস ফড়িঙের মতো চাঁদ পলকে

ভরে উঠবে সব পাথরেই তবু পাথরেই!

করিমের টমেটো

করিমের টমেটো কত সুন্দর
এসব টমেটোর গায়ে
ওর দুঃখের কোনো দাগ নাই
ওর ঘামের গন্ধেরও
ছিটেফোঁটা নাই
এমনকি বাজারের দালাল
যখন দাম দিতে চায় না
তখন করিমের
যে মলিন মুখ ফুটে ওঠে
সেই অসুন্দর মুখটাও
এসব টমেটো গায়ে মাখে নাই
বাজারের অলিগলি পার হয়ে
আমাদের রান্নাঘরে ওই কুৎসিত মুখ
ভুলেও বয়ে আনে নাই
এমনকি তারও আগে করিম নিজে
দর বাড়াতে অন্তত একবার
জল ছিটিয়ে
এসব টমেটোর গা ধুয়ে নেয়
শেষবারের মতো
মুক্ত করে নেয় তার স্পর্শ থেকে

এমনকি তারও আগে ক্ষেতের মধ্যে
ও যখন মেয়ের গায়ে
জামাইয়ের লাথির কথা
ভাবতে ভাবতে ফুঁসতে ফুঁসতে
এসব টমেটো বোঁটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে
ছালার ভেতরে রাখছিল
তখনও এই হারামি টমেটোগুলা
সেদিনকার তেজি সূর্যের নিচে
আর করিমের ঠিক চোখের উপরে
কম চক চক করে নাই

তবু করিমের টমেটো কত সুন্দর
করিমের ইতিহাস
দেখো ভুলেও ওরা গায়ে মাখে না!