থুতুসমগ্র



সরওয়ার মোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্ভবত ২০০৬ সালের ঘটনা। পূর্ব লন্ডনের কোনো এক জায়গা থেকে লুইশামের দিকে যাওয়ার জন্য বাস স্টপের দিকে যাচ্ছিলাম। টের পেলাম আচম্বিতে এক দলা শ্লেষা-মিসাইল আমার হেড অফিসের টার্ফের ওপর এসে অবতরণ করেছে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ার স্বতঃস্ফুর্ততায় পিছন ফিরে দেখলাম, এক শ্বেতকায় লোক জগৎ সংসারকে থোড়াই কেয়ার করে আপনমনে আমার পিছন পিছন হাঁটছে। চলন্ত অবস্থাতেই শুভ্র বর্ণের কিন্তু কৃষ্ণ মনের দ্বিপদীর সুরত পড়ে বুঝলাম, এ বান্দা ‘সরি’ বলার চিজ নয়। ক্রুর চেহারায় তার লিখিত আছে কদর্য এশীয়র প্রতি তামাম জাহানের সমস্ত তাচ্ছিল্য বা ঘৃণা। জন্তুটার রক্তহিম করা চাহনি-তাড়িত হয়ে জোর কদমে হাঁটতে শুরু করলাম। শরীরগুলানো অনুভূতি আর বিবমিষাভাব নিয়ে হাঁটার মধ্যেই একরাশ স্বস্তির হিমেল হাওয়া হয়ে সামনে হাজির হলো লন্ডনের আইকনিক ডাবল ডেকার রেড বাস। ‘মাবুদ তুমি সহায়’ জাতীয় বিশ্বাস-জারিত আনন্দ নিয়ে নিজেকে শকটোদরে নিক্ষেপ করে ককেশীয়র ক্রোধ-সুনামি হতে রক্ষা পেলাম।

২.
মুখের তূন থেকে লালা-তীর নিক্ষেপ করে ঘৃণা বা তাচ্ছিল্য প্রকাশ করার এই Paralinguistic habit উত্তর-দক্ষিণ, পুব-পশ্চিম, ঈশান-নৈঋত সর্বত্র বর্তমান। করোনার এই দহনকালে শ্লেষা-শর নিক্ষেপের বেশ কিছু ঘটনা সম্প্রতি গণমাধ্যমে এসেছে। যেমন, প্যালেস্টাইনিরা জানাচ্ছে, হালে ইজরাইলিরা তাদের ঘরের দরজার নব বা গাড়ির দরজায় পরিকল্পিতভাবে থুতু লেপন করে আরবদেরকে করোনায় কুপোকাত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। আহা! কী ভয়ঙ্কর চরিত্র-বৈপরীত্য! যে জাতি দেখা সাক্ষাতে একে অপরকে Shalom (শান্তি) বলে কথাবার্তা শুরু করে, তাদের দ্বারা অশান্তির এমন সযত্ন চাষবাস সত্যিই পীড়াদায়ক। ইসহাক-সূতদের প্যালেস্টাইনের জলপাই বাগানে এই ঘৃণা-বিষবৃক্ষের সযত্ন পরিচর্যা সম্পর্কে নবনীতা দেবসেন তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে কিছুটা আলোকপাত করেছেন। নবনীতা তাঁর ‘ডেমাস্কাস গেট’ শীর্ষক রচনায় জেরুজালেমের জনৈক আরবের বাড়িতে কফি খেতে গিয়ে দেখেছেন আরবদের বাড়ির দেয়ালে আর দরজায় উৎকীর্ণ ঘৃণা-শব্দ (Hate words)। ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা রাতের বেলা সদলবলে এসে আরব পাড়ায় এই গ্রাফিতি-মাস্তানি করে বেড়ায়। তার সাথে এখন যোগ হয়েছে করোনা ছড়ানোর মহৎ মিশন! অন্যদিকে, ভারতে উগ্রবাদী শিবির অভিযোগ করেছে, মুসলমানরা ফলমূল, দুধ ইত্যাদিতে থুতু ছিটিয়ে বিক্রি করে হিন্দু নির্মূল অভিযানে নেমেছে! ইসলামোফোবিক গোষ্ঠী একে ‘করোনা জিহাদ’ আখ্যায়িত করে টুইটারে বেশ শোরগোল পাকিয়েছে। নিজামুদ্দীনের ঘটনার প্রেক্ষিতে এই অভিযোগ ভারতের সাধারণ্যেও কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

৩.
রাজনৈতিক বলয়ের বাইরেও থুতুর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি রয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ফুটবলে, লালার রয়েছে দর্শনীয় দাপট। শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের উন্মাতাল ভিডিওতে আমরা ক্রোয়েশীয় এক জাঁদরেল খেলোয়াড়কে মাঠে থুতু ফেলতে দেখি। বাস্তবেও ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের থুতু ফেলা একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার। খেলাটির সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই মহাতারকা মেসি আর রোনালদোও প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে থুতু মারার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। আর্সেনালের প্যাট্রিক ভিয়ারাতো ওয়েস্টহ্যামের নেইল রুডককে থুতুসিক্ত করে প্রায় ৬০০০০ ডলার জরিমানা গুনেছিলেন। তবে ফুটবলে সবচেয়ে উর্বর থুতু উৎপাদকের স্বীকৃতি আর রেকর্ডটা এখনো সাবেক লিভারপুল ফরোয়ার্ড, সেনেগালের খেলোয়াড় এল হাজি দিউফের দখলে। আর ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তেজনাময় থুতু ছিটানোর ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপে জার্মানি বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচে। হাই প্রোফাইল এই খেলায় নেদারল্যান্ডসের ফ্রান্ক রাইকার্ড জার্মানির রুডি ভয়েলারকে থুতু মেরে শাস্তি পেয়েছিলেন। পদগোল্লা ক্রীড়ার বাইরে, বেসবলেও আমরা খেলোয়াড়দের থুতু-তাড়িত হতে দেখি। আবার, তুলনামূলকভাবে অভিজাত বা ধ্রুপদী-ঘরানার খেলা, যেমন গলফ এবং টেনিসে থুতুবাজির কোনস্থান সচরাচর দৃষ্ট হয় না। তাহলে কিছু খেলায়, বিশেষ করে, গতিময়, শারীরিক পরিশ্রম প্রধান খেলায় লালা-লীলার শানে নুজুল কী? খেলার মাঠে থুতুকর্ম কি কেবলই রুচি, সামাজিক মর্যাদা বা শ্রেণীর প্রশ্ন? গবেষকরা বলছেন, যেসব খেলায় প্রচুর দৌড়াদৌড়ির ব্যাপার রয়েছে, সেখানে কোনো খেলোয়াড় হঠাৎ পড়ে গেলে বা ট্যাকলের শিকার হলে শারীরবৃত্তীয় কারণে তারা মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়। এসময় মুখের ভিতর মিউকাস বা লালা জমে বা অনেক সময় মুখের অভ্যন্তরে শুকিয়ে যাওয়া ভাব হয়। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা বেশির ভাগ সময় থুতু ফেলে। এর অন্যথাও অবশ্য হয়। সেক্ষেত্রে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হয়, যেমনটি আমরা ভিয়েরা বা রাইকার্ডের ব্যাপারে দেখেছি।

৪.
ধর্মীয় বা জাতীয়তাভিত্তিক পরিচিতি, মূলধারার ক্রীড়াঙ্গন, জাতিতাত্ত্বিক পরিচিতি, সর্বোপরি রাজনীতি এসব জায়গায় থুতুর সিরিয়াস প্রয়োগ যেমন আছে, ঠিক তেমনি থুতু নিয়ে আছে বেশ কিছু হালকা বিনোদনধর্মী টুর্নামেন্টও। যেমন, মার্কিন মুলুকের মিশিগানে অনুষ্ঠিত হয় ‘Cherry Pit Spitting Competition’। এতে একটি পাত্র থেকে চেরিফল মুখে পুরে নিয়ে নির্দিষ্ট দিকে ছুঁড়ে দিতে হয়। যার চেরি লালা-সান্দ্র হয়ে যত দূরে যাবে, তার পয়েন্ট তত বেশি। এই ট্রাম্পচাচার দেশের দক্ষিণাঞ্চলেই আয়োজিত হয় থুতুভিত্তিক আরেকটি চ্যাম্পিয়নশিপ যার নাম ‘Watermelon Seed Spitting Competition’। নামেই বোঝা যাচ্ছে মুখগহ্বর থেকে সজোরে লালাসিক্ত তরমুজ বিচি উদ্গীরণ ক্রীড়া এটি। আরেকটি বিখ্যাত থুতুক্রীড়া অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায় যার নাম ‘Kudu Dung Spitting Tournament’। এটি আফ্রিকার নাটাল আর ইস্টার্ন কেপ অঞ্চলে রীতিমতো এক পর্যটন আকর্ষণ! কুডু নামের একধরনের এন্টিলোপের শুষ্ক বিষ্ঠাগোল্লা মুখের অভ্যন্তরে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারাই হচ্ছে এই খেলাটির মূল বিষয়।

৫.
থুতুর সমাজতত্ত্ব (Sociology of spitting) নিয়ে আলোচনায় শিল্প, সাহিত্য আর চলচ্চিত্রকে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। থুতু বিষয়ে লেখকদের মনোভাব কী? শেক্সপিয়ারের কথাই ধরা যাক। তার Richard II-তে থমাসকে আমরা বলতে শুনি, “I do defy him and I spit at him/ Call him a slanderous coward and a villain”। থুতুর সার্বজনীন দ্যোতনাকে ধারণ করে এভনরাজের Henry IV (Part1) নাটকে Falstaff-কে বলতে দেখি, “I tell thee what, Hal, if I tell thee a lie, spit in my face”। যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মার্কিন রাজধানীতে থুতুর থিকথিক উপস্থিতি দেখে চার্লস ডিকেন্স বলেছিলেন, “Washington can be called the headquarters of tobacco-tinctured saliva”। ইংরেজি ভাষার হালের লেখকদের মধ্যে সালমান রুশদি তার Midnight’s Children এ Spittoon-এর মাধ্যমে থুতুর প্রসঙ্গ এনেছেন। বলা প্রয়োজন, রুশদি এখানে Silver spittoon টিকে, যা আমিনার বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই রুপালী চিলমচি সালিমের করুণ বর্তমানের সাথে হৃত অতীতের সেতু বন্ধন রচনা করেছে।

শিল্প সংরক্ষণবাদীরা থুতু কীর্তনে রুশদির চাইতে বেশ কয়েক কাঠি সরেস। তারা মনে করেন, লালা অতি মূল্যবান ছবি বা বিরল শিল্পকর্মের দাগ দূরীকরণে সবচে কার্যকরী।

আর চলচ্চিত্রে তো থুতুকে Non-verbal communication-এর বেশ শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিন্দি ছবি ‘শোলে’র কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। ছবিটিতে আমরা কিংবদন্তীতুল্য চরিত্র গব্বর সিংকে দেখি বারবার থুতু ফেলে সমাজের উঁচু শ্রেণীর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে।

৬.
তাহলে, সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, থুতু কি শুধুমাত্র হিংসা, ঘৃণা বা তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে? মোটেই না। এক্ষেত্রে থুতু অন্য Non-verbal behaviour থেকে দ্যেতনায় অনেক এগিয়ে। যেমন ধরুন, আপনি ভয় পেলেন, অমনি একটু থুতু বুকে লাগিয়ে ভয় দূর করেন। অনিন্দ্য সুন্দর বাচ্চার কেউ তারিফ করল, সাথে সাথেই মাতৃদেবী বাচ্চার শরীরে প্রতীকী থুতু ছিটিয়ে দেন নজর কাটানোর জন্য। অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য তিনবার থুতু দেওয়ার রীতি প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। আর কেনিয়ার মাসাই গোষ্ঠীর লোকেরা তো খুব সম্মানিত কারো সাথে করমর্দন করতে গেলে হাতে লালা মালিশ করে নেয়। এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতি অতিরিক্ত ভক্তি বা সৌজন্যের পরিচায়ক! আবার থুতু ছিটিয়ে প্রশংসাও যে করা যায় সেটা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে Punk Movement-এর কর্মীরা। তাহলে দেখুন, সামান্য থুতু কী পরিমাণ দ্যোতনা-ধনী (Connotation-rich)!

৭.
উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ‘থুতু’ বিষয়টাকে ‘ওয়াক থু’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার বিশেষ সুযোগ নেই। থুতু, যা কিনা গাঠনিকভাবে ৯৮% পানি আর বাকি ২% মিউকাস, এনজাইম, ইলেকট্রোলাইট, ইমিউনোগ্লোবিউলিন, মানুষের অস্তিত্বের সমার্থক। কারণটা জলবৎ তরলম—লালা তৈরি না হলে মানুষ খাবার খেতে পারত না আর খেতে না পারলে মানুষের অস্তিত্ব কি থাকত?

মানব অস্তিত্বের এরকম প্রধান একটি অনুষঙ্গ অর্থাৎ থুতু এশীয়বাসীদের জন্য একটি বিশাল তোহফা নিয়ে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি Spit personality বা থুতু-ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ আমার আপনার সাথে এই মহাদেশের জল-হাওয়াতেই বসবাস করে! এ বিষয়ে আমাদের মহাদেশীয় অর্জনের আরেকটা স্বীকৃতি মুক্তমুখে দিয়েছেন বৃব্রিটিশ সমাজ বিজ্ঞানী রস কুম্বার। আমাদের সাফল্যে নুতন পালক যুক্ত করে রস সাহেব সরসভাবে বলেছেন—“China, India and Indonesia are global capitals of phlegm”। ঢাকার জন্যও এই সম্মান বয়ে আনতে, তিলোত্তমা নগরীর দেয়ালে দেয়ালে অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রের মতো থুতু-শ্লেষা-পানের পিকের ত্রয়ী শিল্পকর্মের চির-চলমান প্রদর্শনী দেখে মনে হয়, আমাদের খুব বেগ পেতে হবে না। চলুন, আমাদের আপন মহাদেশীয় থুতু-ভ্রাতৃসংঘে (Spitting fraternity) যোগদান করে থুতুতন্ত্র (Salivocracy) কায়েম করি!

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;