প্লাটফরম নাম্বার চার



জোহরা শিউলী
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘটনা কী? ট্যাহা দিতাইন না?
দিব না কেন? টাকা ছাড়া কবে তোর কাছে আইছি?
আজকেরটা দিয়া যাইন। ঘরে চাইল নাই।
ফুলবাবুর পেছন পেছন হাঁটে পরী। প্লাটফরম ৪ নম্বারে।
ফুলবাবুর নাম জানা নাই পরীর। পরীর সঠিক নামও জানে না ফুলবাবু। কিন্তু মাঝে মাঝে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। এই চার নাম্বার প্লাটফরমেই। যেখানে শুধু মালগাড়ি আর মালগাড়ি। মাঝে মাঝে কিছু পরিত্যক্ত ইঞ্জিন কিংবা বগিরও সাময়িক আস্তানা হয়। কিন্তু মেরামতের পর আর এই প্লাটফরমে থাকে না।

জংশন রেলস্টেশন। কত গাড়ির আনাগোনা। নষ্ট বগি। নেড়েচেড়ে দেখে মেরামতকারী। ইঞ্জিনের খুঁটিনাটিও হয় মেরামত। কিন্তুর পরীর জীবনের মেরামত আর হয় না। পরিত্যক্ত অবস্থায় বছরের পর বছর এই স্টেশনেই। নদীর ওইপাড়ে যদিও তার বাড়ি। কিন্তু বাড়িতে যাওয়া তার নিষেধ। নষ্ট শরীরের গল্প এই স্টেশনেই ছড়াক। চার নাম্বার প্লাটফরমে। ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত মালগাড়িতে।

মাঝেমাঝে স্টেশনের এক ও দুই নাম্বার প্লাটফরমে তার কিছু আত্মীয়-স্বজনরে দেখে সে। যেখানে নিয়মিত গাড়িরা এসে দাঁড়ায়। গা ভর্তি যাত্রী নামিয়ে যায়। নতুনদের তুলে নেয়। সেখানে পরীর আত্মীয়রা পিলপিল করা অন্য যাত্রীদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। পরী দূর থেকে দেখে।কাছে যেয়ে দু-দণ্ড কথা বলার সুযোগ নেই। প্রথম দিকে যে সে সুযোগ খুঁজত না তা কিন্তু না। কাউরে দেখলেই তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠত। কাছে যাইয়া মুখখানি দেখতে ইচ্ছে করত। একটু ছুঁইয়া দেখতে ইচ্ছে করত রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলারে। কিন্তু পরীরে দেখলে সবাই ক্যামন যেন চমকে উঠে। চিনেও না চেনার ভান করে। ইচ্ছে করেই তার কাছ থেকে দশ হাত দূরে চলে যায়। এমনকি পরীর ভাই। পরীর প্রিয় বোন। বাবা। এমনকি পরীর মা। নাড়িছেঁড়া ধনের জন্যও ওর মায়ের মায়া লাগে না? ভাবে পরী। মনে হয় না।

অথচ পরীর তো মায়া লাগে।

ঠিক নাড়িছেঁড়া ধন না। পেটের মইধ্যে আতারে-পাতারে চইলা আসা ছোট্ট একটা আটার দলার মতো জিনিসের লাইগ্যাও পরীর মায়া লাগে। বুকডা খালি খালি লাগে। একটুখানি অসতর্কতা কিংবা কনডম ব্যবহার করতে চান না যে পুরুষেরা। তাগো লাইগা মাঝে মাঝেই পরীর শরীরে জেগে উঠে নতুন প্রাণ। সেই প্রাণকে তিনমাসের মইধ্যে যেমনি হোক ফালাইয়া দিতে হয়। পরীর মায়া লাগে। পরীর চিক্কুর পাইরা কান্দা আসে। সেই ছোট্ট প্রাণডার লাইগ্যা। আডার দলার লাহান ছোট্ট শরীরডার লাইগ্যা। রাইতের বেলা যহন পরিত্যক্ত ৫ নাম্বার প্লাটফরম নীরব হয়ে যায় আর শেয়ালগুলো ফিরে আসে। হুক্কাহুয়া স্বরতুলে তীব্র ডেকে উঠে। তাদের সাথে গলা মেলায় ২২ বছরের পরী। হুক্কাহুয়া ডাক আর তার কান্নার শব্দ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। কেউ আসে না। ঘুমচোখে বস্তার থাইক্কা মাথা বাইর কইরা দুই একজন দেখে। আগে সান্ত্বনা দিত। এখন কারো পাশে আইসা বসার টাইম নাই। সবার জীবন কালিমাখা। সবার জীবনেই কলঙ্কের সমুদ্র। টুনিডা খালি পাশে আইসা বইসা থাকে। টুনি তার কুত্তা। সারাদিন সে যেখানেই থাকুক রাত হতেই পরীর গায়ের গন্ধে টুনি চলে আসে। মানুষে-কুকুরে মায়ায় জড়াজড়ি হয়ে ঘুমায়।

পরীর রাতের কাস্টমার কম। দিনের বেলায়ই বেশি। পরিত্যক্ত মালগাড়ির ৫২০৩ নাম্বার যে বগিটা আছে সেটাই তার আস্তানা। তার নিয়মিত কাস্টমাররা জানে। তারা ওইটার আশেপাশে আসলেই পরীরে পেয়ে যায়। স্টেশনের ছোডখাটো চাকরিজীবীরাই তার বান্ধা কাস্টমার। ডিউটি শেষে তারা পরীর ডিউটির ভাগীদার হয়। কেউ কেউ নিয়মিত টাকা দেয়। কেউবা আবার কাজ শেষে চোখ রাঙানি দেয়। টাকা চাবি তো স্টেশন থাইক্কা কয়েক ঘাঁ লাগিয়ে বিদায়।

এই স্টেশনটায় পরীর আবাস। মাঝে মাঝেই অতর্কিত আক্রমণ। রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্মীরা লাঠি-সাঠি হাতে নিয়ে গর্জে উঠে—ভাগ এখান থেকে।

শুধু পরী নয়। পরীর মতো এমন আরো অনেকে। চার আর পাঁচ নাম্বার প্লাটফরমের পরিত্যাক্ত মালগাড়ির মাঝে যে ব্যবসা হয় তার দেখাশোনা করেন জোৎস্না খালা। এমনকি মাঝে মাঝে বাড়ি পড়ত জোৎস্না খালার কোমরেও।

‘এইখানে মাগীগর আস্তানা বানাইয়া রাখছোস। মাগীগরে দিয়া ব্যবসা করস। এই ব্যবসা এইবার তোর বন্ধ।’—নিরাপত্তাকর্মীদের খাকি পোশাকে বাজখাঁই গলা। কুঁকড়ে উঠে জোৎস্না খালা। এখন বয়স হইছে। এই নিরাপত্তা কর্মীগর বাপেরে সেবা দিয়া আইছে একসময় খালা। এখনো সময়-অসময় মাইয়াগরে পাডাইতে অয় নিরাপত্ত কর্মীগর অফিসে। শুধু মাত্র শরীরের সুখ দিয়া এহন আর কাজ অইতেছে না। জিহবা আরো লকলকায় নিরাপত্তা কর্মীগর। এখন দরকার কাগজের নোট।

রাতভর হম্বি-তম্বি। মধ্যরাতে ফয়সালা। নিয়মিত মাসোহারা। আর কচি মাইয়া।
সকালে জোৎস্না খালা এক চোখ ফোলা আর পিঠে লাঠির কালসিটে দাগ নিয়ে সবাইরে জানায়। পেটের দায়ে অমান্য করে না কেউ। নিজেদের আয়- উপাজর্নের ভাগ পাবে এবার নিরাপত্তা কর্মীরাও।

তাই সই।

মাথার উপর ছাদ না হোক। প্লাটফরমের টিনের চাল তো আছে। মেঘ-ঝড়ে এই লম্বা টিনের চালে সারি সারি মাথা গোঁজা হয়ে যায় তাদের। সারি সারি মাথারই একমাথা পরী। পরী আসলে তার নিজের দেওয়া নাম। নাম আছিল খাদিজা। সবাই ডাকত খুদু। স্কুলে মাস্টাররা খাদিজা-ই ডাকত। সিক্স পর্যন্ত পড়ছিল সে। সেভেনে পড়ার সময় লগের গ্রামের নুরুর সাথে ভাইগা যায় সে। বিয়ে করবে বলে নদীর এই পাড়ে নিয়ে আসে নুরু। কোনো এক বস্তির চিপা-ঘিঞ্জি এক ঘরে আটকে রাখে তারে দিনের পর দিন। আটকানো অবস্থায় নুরু এবং তার কিছু সঙ্গী-সাথী নিয়মিত শরীরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ত। খোদেজা কাঁদে। পায়ে পড়ে মাফ চায়। কোনোরকমে ছাড়া পাবার জন্য। বাড়ির জন্য মন ছটফট করে। মায়ের জন্য আকুল কান্দা আসে। কিন্তু বন্দী জীবন। মাসখানেক পরে পুলিশের হাত ধরেই তার মুক্তি। ঘর থেকে মুক্তি মিলে। পেশা থেকে না। একই মনের,একই শরীরের খোদেজা পরী হয়ে যায়। স্টেশনের প্লাটফরম হয় হয় বসতবাড়ি।

আইজকা ঘরে চাইল নাই। কিন্তু চাইল জরুরি। প্লাটফরমে পলিথিনে ঘেরা ঘরটায় আছেন এক অতিথি। চুমকির কাছেই যায়। সুখে-দুখে সমবয়সী সাথী তার। নীল পলিথিনের চুমকির ঘর থেকে দুই পট চাইল ধার নেয়। দুইটা আলুও দেয় চুমকি। ভর্তা করলে দুইপেট ঠিকই ভরবে। আন্দাজমতো গুছিয়ে দেয় প্রিয় বান্ধবীরে।

‘কি রে ঘরে নাকি নতুন নাগর পালা শুরু করছোস? তোগো লাইগ্যা তো আমগো সমস্যা। পালবি। সেবা করবি। রাইন্ধা খাওয়াবি। এর লাইগ্যা একবেলা আমগো লগে কেউ হুততে চায় না। কাস্টমার সব তোগো।’—চুমকির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ঠেস দিয়ে বলে রাহিমা।

‘চুপ করো বুড়া মাগি।’ মুখঝমটা দিয়ে নিজের পথ করে নেয় পরী।

ঘরে বুড়া মানুষটা। সকাল থাইক্কা না খাওয়া। দেইখ্যা শুইনা ভদ্রই লাগতেছে। শুধু চেহারাটা তার বাপের লাহান। জ্বরের ঘোরে পইড়া আছিল স্টেশনে। কোনোরকমে ঘরে আইনা মাথায় পানি দেয়। দুইদিন যাবত বাপের বয়সী একজনরে সেবা করে চলছে। লোকটার জ্ঞান ফিরে। আবার হারিয়ে যায়। কোনো ঠিকানা বা ফোন নাম্বার পায়নি পকেটে। আজকে জ্বর ছাড়তেছে। ভাত কয়ডা মুখের সামনে না দিলেই নয়। না খাইয়া বুড়া মইরা যাইব। বুড়ার চেহারা দেখে। আর টপটপ পানি পড়ে। এক্কেরে বাজানের মতো চেহারা। যে বাজান তারে দেখলে অহন না চেনার ভান করে।

জ্বর ভালো হয়। বয়স্ক লোকটা মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যান। চোখের কোনে ছিল টলটল কয়েক ফোঁটা জলও। চোখের কোনে জল জমে পরীরও। হয়তো না হয় তিনি তার বাপ। পরী না হয় তার মেয়ে। বাপ মেয়ে মিইল্যা চইলা যাইত দূরের কোনো গ্রামে। আদর স্নেহে মাখামাখি থাকত না হয় তাদের সংসার।

‘আমারও না এইরহম একটা সংসারের শখ। বাপ-মা আর আমি।’—পরীর সঙ্গে গলা মেলায় চুমকিও। দুই সই চুলে সুগন্ধী তেল মেখে লাল ফিতায় কলা বেনী বান্ধে। অলস দুপুরে সইদের আড্ডা এমনই জমে।

‘খানকি মাগিরা বেডাগো গলা জড়াইয়া শুইব। আর পাপের ফল আমগো জায়গায় আইনা ফেলব।’—রতনপুরী জর্দা দিয়া মুখভর্তি পান জোৎস্না খালার। সেই মুখেই আরো খিস্তিখেউর।

‘খেপলা ক্যা খালা?’—লাল ফিতায় বেনীর শেষ ধাপ শেষ করে জানতে চায় চুমকি।

‘মালগাড়ির তিন নাম্বার বগির মইধ্যে কেডা জানি বাইচ্চা ফালাইয়া থুইয়া গেছে। পলিথিনে মুরাইয়া। দুপুর থাইক্কা টে টে কইরা কানতাছে বাইচ্চাডা।’—দুই পা ছড়ায়ে বসে জোৎস্না বেগম।

‘অহন কই?’—উৎসুক পরী।

‘আছে তুলির কাছে। হেয় রাখতে চায়। এই বাইচ্চা এইহানে পালুন যাইত না। তাইলে ব্যবসার বারোডা বাজব। ইস্টিশনে থাইক্যা এই ব্যবসা করতে অইলে বাইচ্চার মা সাজুন যাইত না। সাফ সাফ কইয়া আইছি তুলিরে।’—নখের কোনার শেষ চুনটুকু মুখে পুড়ে খালা।

‘আর খালা কেউ যদি বাচ্চাডারে লইয়া এই ব্যবসা ছাইড়া চইলা যায়? এই ইস্টিশন ছাইড়া একবারে’—পরী অস্ফুট স্বরে আওড়ায়। চোখে এক অচেনা স্বপ্ন।

মাছের চোখের মতো কেমন যেন মরা মরা হয়ে ওঠে জোৎস্না খালার চোখদুটো।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;