প্লাটফরম নাম্বার চার

জোহরা শিউলী
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘটনা কী? ট্যাহা দিতাইন না?
দিব না কেন? টাকা ছাড়া কবে তোর কাছে আইছি?
আজকেরটা দিয়া যাইন। ঘরে চাইল নাই।
ফুলবাবুর পেছন পেছন হাঁটে পরী। প্লাটফরম ৪ নম্বারে।
ফুলবাবুর নাম জানা নাই পরীর। পরীর সঠিক নামও জানে না ফুলবাবু। কিন্তু মাঝে মাঝে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। এই চার নাম্বার প্লাটফরমেই। যেখানে শুধু মালগাড়ি আর মালগাড়ি। মাঝে মাঝে কিছু পরিত্যক্ত ইঞ্জিন কিংবা বগিরও সাময়িক আস্তানা হয়। কিন্তু মেরামতের পর আর এই প্লাটফরমে থাকে না।

জংশন রেলস্টেশন। কত গাড়ির আনাগোনা। নষ্ট বগি। নেড়েচেড়ে দেখে মেরামতকারী। ইঞ্জিনের খুঁটিনাটিও হয় মেরামত। কিন্তুর পরীর জীবনের মেরামত আর হয় না। পরিত্যক্ত অবস্থায় বছরের পর বছর এই স্টেশনেই। নদীর ওইপাড়ে যদিও তার বাড়ি। কিন্তু বাড়িতে যাওয়া তার নিষেধ। নষ্ট শরীরের গল্প এই স্টেশনেই ছড়াক। চার নাম্বার প্লাটফরমে। ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত মালগাড়িতে।

মাঝেমাঝে স্টেশনের এক ও দুই নাম্বার প্লাটফরমে তার কিছু আত্মীয়-স্বজনরে দেখে সে। যেখানে নিয়মিত গাড়িরা এসে দাঁড়ায়। গা ভর্তি যাত্রী নামিয়ে যায়। নতুনদের তুলে নেয়। সেখানে পরীর আত্মীয়রা পিলপিল করা অন্য যাত্রীদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। পরী দূর থেকে দেখে।কাছে যেয়ে দু-দণ্ড কথা বলার সুযোগ নেই। প্রথম দিকে যে সে সুযোগ খুঁজত না তা কিন্তু না। কাউরে দেখলেই তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠত। কাছে যাইয়া মুখখানি দেখতে ইচ্ছে করত। একটু ছুঁইয়া দেখতে ইচ্ছে করত রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলারে। কিন্তু পরীরে দেখলে সবাই ক্যামন যেন চমকে উঠে। চিনেও না চেনার ভান করে। ইচ্ছে করেই তার কাছ থেকে দশ হাত দূরে চলে যায়। এমনকি পরীর ভাই। পরীর প্রিয় বোন। বাবা। এমনকি পরীর মা। নাড়িছেঁড়া ধনের জন্যও ওর মায়ের মায়া লাগে না? ভাবে পরী। মনে হয় না।

অথচ পরীর তো মায়া লাগে।

ঠিক নাড়িছেঁড়া ধন না। পেটের মইধ্যে আতারে-পাতারে চইলা আসা ছোট্ট একটা আটার দলার মতো জিনিসের লাইগ্যাও পরীর মায়া লাগে। বুকডা খালি খালি লাগে। একটুখানি অসতর্কতা কিংবা কনডম ব্যবহার করতে চান না যে পুরুষেরা। তাগো লাইগা মাঝে মাঝেই পরীর শরীরে জেগে উঠে নতুন প্রাণ। সেই প্রাণকে তিনমাসের মইধ্যে যেমনি হোক ফালাইয়া দিতে হয়। পরীর মায়া লাগে। পরীর চিক্কুর পাইরা কান্দা আসে। সেই ছোট্ট প্রাণডার লাইগ্যা। আডার দলার লাহান ছোট্ট শরীরডার লাইগ্যা। রাইতের বেলা যহন পরিত্যক্ত ৫ নাম্বার প্লাটফরম নীরব হয়ে যায় আর শেয়ালগুলো ফিরে আসে। হুক্কাহুয়া স্বরতুলে তীব্র ডেকে উঠে। তাদের সাথে গলা মেলায় ২২ বছরের পরী। হুক্কাহুয়া ডাক আর তার কান্নার শব্দ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। কেউ আসে না। ঘুমচোখে বস্তার থাইক্কা মাথা বাইর কইরা দুই একজন দেখে। আগে সান্ত্বনা দিত। এখন কারো পাশে আইসা বসার টাইম নাই। সবার জীবন কালিমাখা। সবার জীবনেই কলঙ্কের সমুদ্র। টুনিডা খালি পাশে আইসা বইসা থাকে। টুনি তার কুত্তা। সারাদিন সে যেখানেই থাকুক রাত হতেই পরীর গায়ের গন্ধে টুনি চলে আসে। মানুষে-কুকুরে মায়ায় জড়াজড়ি হয়ে ঘুমায়।

পরীর রাতের কাস্টমার কম। দিনের বেলায়ই বেশি। পরিত্যক্ত মালগাড়ির ৫২০৩ নাম্বার যে বগিটা আছে সেটাই তার আস্তানা। তার নিয়মিত কাস্টমাররা জানে। তারা ওইটার আশেপাশে আসলেই পরীরে পেয়ে যায়। স্টেশনের ছোডখাটো চাকরিজীবীরাই তার বান্ধা কাস্টমার। ডিউটি শেষে তারা পরীর ডিউটির ভাগীদার হয়। কেউ কেউ নিয়মিত টাকা দেয়। কেউবা আবার কাজ শেষে চোখ রাঙানি দেয়। টাকা চাবি তো স্টেশন থাইক্কা কয়েক ঘাঁ লাগিয়ে বিদায়।

এই স্টেশনটায় পরীর আবাস। মাঝে মাঝেই অতর্কিত আক্রমণ। রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্মীরা লাঠি-সাঠি হাতে নিয়ে গর্জে উঠে—ভাগ এখান থেকে।

শুধু পরী নয়। পরীর মতো এমন আরো অনেকে। চার আর পাঁচ নাম্বার প্লাটফরমের পরিত্যাক্ত মালগাড়ির মাঝে যে ব্যবসা হয় তার দেখাশোনা করেন জোৎস্না খালা। এমনকি মাঝে মাঝে বাড়ি পড়ত জোৎস্না খালার কোমরেও।

‘এইখানে মাগীগর আস্তানা বানাইয়া রাখছোস। মাগীগরে দিয়া ব্যবসা করস। এই ব্যবসা এইবার তোর বন্ধ।’—নিরাপত্তাকর্মীদের খাকি পোশাকে বাজখাঁই গলা। কুঁকড়ে উঠে জোৎস্না খালা। এখন বয়স হইছে। এই নিরাপত্তা কর্মীগর বাপেরে সেবা দিয়া আইছে একসময় খালা। এখনো সময়-অসময় মাইয়াগরে পাডাইতে অয় নিরাপত্ত কর্মীগর অফিসে। শুধু মাত্র শরীরের সুখ দিয়া এহন আর কাজ অইতেছে না। জিহবা আরো লকলকায় নিরাপত্তা কর্মীগর। এখন দরকার কাগজের নোট।

রাতভর হম্বি-তম্বি। মধ্যরাতে ফয়সালা। নিয়মিত মাসোহারা। আর কচি মাইয়া।
সকালে জোৎস্না খালা এক চোখ ফোলা আর পিঠে লাঠির কালসিটে দাগ নিয়ে সবাইরে জানায়। পেটের দায়ে অমান্য করে না কেউ। নিজেদের আয়- উপাজর্নের ভাগ পাবে এবার নিরাপত্তা কর্মীরাও।

তাই সই।

মাথার উপর ছাদ না হোক। প্লাটফরমের টিনের চাল তো আছে। মেঘ-ঝড়ে এই লম্বা টিনের চালে সারি সারি মাথা গোঁজা হয়ে যায় তাদের। সারি সারি মাথারই একমাথা পরী। পরী আসলে তার নিজের দেওয়া নাম। নাম আছিল খাদিজা। সবাই ডাকত খুদু। স্কুলে মাস্টাররা খাদিজা-ই ডাকত। সিক্স পর্যন্ত পড়ছিল সে। সেভেনে পড়ার সময় লগের গ্রামের নুরুর সাথে ভাইগা যায় সে। বিয়ে করবে বলে নদীর এই পাড়ে নিয়ে আসে নুরু। কোনো এক বস্তির চিপা-ঘিঞ্জি এক ঘরে আটকে রাখে তারে দিনের পর দিন। আটকানো অবস্থায় নুরু এবং তার কিছু সঙ্গী-সাথী নিয়মিত শরীরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ত। খোদেজা কাঁদে। পায়ে পড়ে মাফ চায়। কোনোরকমে ছাড়া পাবার জন্য। বাড়ির জন্য মন ছটফট করে। মায়ের জন্য আকুল কান্দা আসে। কিন্তু বন্দী জীবন। মাসখানেক পরে পুলিশের হাত ধরেই তার মুক্তি। ঘর থেকে মুক্তি মিলে। পেশা থেকে না। একই মনের,একই শরীরের খোদেজা পরী হয়ে যায়। স্টেশনের প্লাটফরম হয় হয় বসতবাড়ি।

আইজকা ঘরে চাইল নাই। কিন্তু চাইল জরুরি। প্লাটফরমে পলিথিনে ঘেরা ঘরটায় আছেন এক অতিথি। চুমকির কাছেই যায়। সুখে-দুখে সমবয়সী সাথী তার। নীল পলিথিনের চুমকির ঘর থেকে দুই পট চাইল ধার নেয়। দুইটা আলুও দেয় চুমকি। ভর্তা করলে দুইপেট ঠিকই ভরবে। আন্দাজমতো গুছিয়ে দেয় প্রিয় বান্ধবীরে।

‘কি রে ঘরে নাকি নতুন নাগর পালা শুরু করছোস? তোগো লাইগ্যা তো আমগো সমস্যা। পালবি। সেবা করবি। রাইন্ধা খাওয়াবি। এর লাইগ্যা একবেলা আমগো লগে কেউ হুততে চায় না। কাস্টমার সব তোগো।’—চুমকির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ঠেস দিয়ে বলে রাহিমা।

‘চুপ করো বুড়া মাগি।’ মুখঝমটা দিয়ে নিজের পথ করে নেয় পরী।

ঘরে বুড়া মানুষটা। সকাল থাইক্কা না খাওয়া। দেইখ্যা শুইনা ভদ্রই লাগতেছে। শুধু চেহারাটা তার বাপের লাহান। জ্বরের ঘোরে পইড়া আছিল স্টেশনে। কোনোরকমে ঘরে আইনা মাথায় পানি দেয়। দুইদিন যাবত বাপের বয়সী একজনরে সেবা করে চলছে। লোকটার জ্ঞান ফিরে। আবার হারিয়ে যায়। কোনো ঠিকানা বা ফোন নাম্বার পায়নি পকেটে। আজকে জ্বর ছাড়তেছে। ভাত কয়ডা মুখের সামনে না দিলেই নয়। না খাইয়া বুড়া মইরা যাইব। বুড়ার চেহারা দেখে। আর টপটপ পানি পড়ে। এক্কেরে বাজানের মতো চেহারা। যে বাজান তারে দেখলে অহন না চেনার ভান করে।

জ্বর ভালো হয়। বয়স্ক লোকটা মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যান। চোখের কোনে ছিল টলটল কয়েক ফোঁটা জলও। চোখের কোনে জল জমে পরীরও। হয়তো না হয় তিনি তার বাপ। পরী না হয় তার মেয়ে। বাপ মেয়ে মিইল্যা চইলা যাইত দূরের কোনো গ্রামে। আদর স্নেহে মাখামাখি থাকত না হয় তাদের সংসার।

‘আমারও না এইরহম একটা সংসারের শখ। বাপ-মা আর আমি।’—পরীর সঙ্গে গলা মেলায় চুমকিও। দুই সই চুলে সুগন্ধী তেল মেখে লাল ফিতায় কলা বেনী বান্ধে। অলস দুপুরে সইদের আড্ডা এমনই জমে।

‘খানকি মাগিরা বেডাগো গলা জড়াইয়া শুইব। আর পাপের ফল আমগো জায়গায় আইনা ফেলব।’—রতনপুরী জর্দা দিয়া মুখভর্তি পান জোৎস্না খালার। সেই মুখেই আরো খিস্তিখেউর।

‘খেপলা ক্যা খালা?’—লাল ফিতায় বেনীর শেষ ধাপ শেষ করে জানতে চায় চুমকি।

‘মালগাড়ির তিন নাম্বার বগির মইধ্যে কেডা জানি বাইচ্চা ফালাইয়া থুইয়া গেছে। পলিথিনে মুরাইয়া। দুপুর থাইক্কা টে টে কইরা কানতাছে বাইচ্চাডা।’—দুই পা ছড়ায়ে বসে জোৎস্না বেগম।

‘অহন কই?’—উৎসুক পরী।

‘আছে তুলির কাছে। হেয় রাখতে চায়। এই বাইচ্চা এইহানে পালুন যাইত না। তাইলে ব্যবসার বারোডা বাজব। ইস্টিশনে থাইক্যা এই ব্যবসা করতে অইলে বাইচ্চার মা সাজুন যাইত না। সাফ সাফ কইয়া আইছি তুলিরে।’—নখের কোনার শেষ চুনটুকু মুখে পুড়ে খালা।

‘আর খালা কেউ যদি বাচ্চাডারে লইয়া এই ব্যবসা ছাইড়া চইলা যায়? এই ইস্টিশন ছাইড়া একবারে’—পরী অস্ফুট স্বরে আওড়ায়। চোখে এক অচেনা স্বপ্ন।

মাছের চোখের মতো কেমন যেন মরা মরা হয়ে ওঠে জোৎস্না খালার চোখদুটো।