তারা গুনতির দেশে



অহ নওরোজ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

চরিত্র :
নিরি (ছয় বছরের বালিকা, চঞ্চল)
মা (বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, মধ্যবিত্ত মুখ),
বাবা (বয়স চল্লিশ প্রায়, কাঁচাপাকা চুল আর চেহারায় আভিজাত্য)
বৃক্ষ (মাঝারি সবুজ নারিকেল গাছ, চিরল-বিরল পাতা তার)
ব্যাঙ (বেশ বড়সড় কোলাব্যাঙ)

কথক :
বহুদিন আগে,
পাতালের অন্ধকারে অন্য এক জগৎ ছিল
কেবল যেখানে শুধু উন্মুক্ত প্রান্তর, আর শীতল রাতের গন্ধ
সারাদিন ওম ধরা ম্লান রোদে সব যেন হৃদয়ের কাছে নুয়ে আছে।

ওইখানে মানুষের মনে কোনো ব্যথা নেই;
দিনে কোনো তাড়া নেই।
সব ছিল সুনশান—পরমায়ু উৎসব—

কিন্তু একদিন রাতে অজানা কারণে,
কিংবা হয়তো কারণ নেই কোনো—
কৌতূহলী শরীরে কেবল
গোলাপের ভাঁজে উড়ে, জোছনায় নিঝুম লুকিয়ে
চিহ্নহীন হয়ে গেল এক পাতালকুমারী।

বাইরে প্রথম...
পৃথিবীর আলো তাকে অন্ধ করে দেয়—
উড়ে যায় স্মৃতিগুলো।
দুইদিন পর তাকে মরে যেতে হয়।
তবু তার পিতা বিশ্বাস করত
একদিন সে আবার ফিরে আসবে কোথাও
সম্ভবত অন্য কোনো দেহে,
অন্য কোনোখানে,
অন্য কোনো ইতিহাসে।

..................

দৃশ্য : ০১
[গাড়ি চলছে, মায়ের সঙ্গে
বালিকা একটা মেয়ে।
পুরাতন গাড়ি—মাটির সরল পথ,
গাড়ি দোলার অভ্যাসে মনে হয়
নিচে যেন জলাভূমি।
পথের দুধার ঘেঁষে ঘন বনভূমি]
—মা, আমরা কোনখানে যাচ্ছি? শহর ছাড়ছি কেন?
—আমরা চলেছি তারা গুনতির দেশে, সেখানে মেঘের পরে মেঘ
আর সবুজের ঘ্রাণ মহাকায় মেলে আছে।
—রূপকথার মতন কোনো কিছু আছে?
—তুমি সারাদিন এসব আজব ভাবো কেন? এসব শুধুই গল্প ভেবো।
বলো যেন গাড়ি থামে—আমাকে নামতে হবে—কিছুটা হাঁটতে হবে।
ঝাঁকুনিতে বাড়ছে ব্যথাটা—কিছুদিন বাদে আসবে তোমার ভাইটা।

[গাড়ি থামে, থেমে থেমে হেঁটে হেঁটে, কুসুম নরম স্বস্তি আসে।
পেটে ব্যথা কমে,
নিরি এ সময়ে বনের ভেতর গিয়ে
যেন কিছু দ্যাখে]
—নিরি, আর যেও না ওদিকে, ফিরে এসো। আমরা এখন যাত্রা শুরু করবো আবার।
—মা, একটা পরী দেখেছি ওখানে।
—এসব চোখের ভুল। মন দিয়ে শোনো—আমরা একটু পরে যেখানে তোমার বাবা থাকে, সেখানে পৌঁছাব।
তাকে বাবা ডাকবে, বুঝেছো? আমি চাই তুমি বাবা ডাকো। সেটা তোমার জন্যই ভালো। এটা কেবল একটা শব্দ।
—তিনি আমার বাবা নন। আমার বাবার এরকম ধনী নন। তিনি মারা গেছেন অনেক আগে।
—যা বলেছি সেটা শোনো মা আমার।

[নিরি চুপ থাকে। কিছুক্ষণ পর তারা
একটি সুন্দর খোলা, মাঠ-ঘেরা বাড়ি পৌঁছে।]
—প্রিয়তমা স্বাগতম। আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না তোমার। আমার সন্তান, ও তো ভালো আছে?
[গর্ভবতী-পেটে হাত রেখে] এইতো নড়ছে, সম্ভবত বাবাকে চিনেছে, আহা! হয়তো গাইছে।
—ভেবো না, ও ভালো আছে।
—নিরিকে কোথায় রেখে এলে?
ওকে তো দেখছি না।
[নিরিকে গাড়ির অন্য পাশ থেকে দেখা যায়]
—এই যে বালিকা কেমন আছো?
[নিরি ভ্রূক্ষেপ করে-না। মাঠের ভেতর দিয়ে বনের নিকটে দৌড় দেয়।
সেখানে পুরোনো কুঠিবাড়ি—পরিত্যাক্ত। ধীরে ধীরে সে ভেতরে ঢোকে।]

দৃশ্য ০২
[নিরি চোখ খোলে। বিছানায় শুয়ে আছে। তার দিকে মা তাকিয়ে]
—আমাকে না বলে ওদিকে গিয়েছো কেন?
—মা, একটা পরী দেখেছি ওখানে।
—চুপ করো। সেখানে অজ্ঞান পড়ে ছিলে।
তোমাকে রহিমা খালা না-দেখলে হতো কী-যে!
এখন দরজা আর আলো বন্ধ করো, যাও সোনামনি।
[নিরি মায়ের আদেশ শোনে]
—এবার আমার কাছে এসো। লেপের তলায় ঢোকো। তোমার পা জমে গিয়েছে দেখছি।
মা আমার—আমাকে না বলে, এভাবে কোথাও আর যাবে না, বুঝেছো?
তোমাকে খুঁজতে কষ্ট হয়। আমি এই দেহ নিয়ে হাঁটতে পারি-না।
তুমি কি শুনছো?
[নিরির দু’চোখ জানালার ফাঁক গলে বাইরের অন্ধকারে ওড়ে।
সেখানে চাঁদের আলো, আর সাদা কিছু নড়ে]
—ভয় পাচ্ছো তুমি?
—বাইরে কিসের শব্দ, কেউ কি ওখানে থাকে মাগো?
—কিছু না, বাতাস হবে। শহরের রাত থেকে এখানে গ্রামের রাত কিছুটা আলাদা। শহরে প্রচুর গাড়ি চলাচল করে। এখানে সেসব শব্দ নেই। এখানের বাড়িগুলো বেশ পুরাতন। হাওয়ায় টিনে শব্দ হয়। কখনো দরজা ক্যাচ-ক্যাচ করে। ঘুম দাও। সকালে অনেক কিছু নতুন দেখবে। খেলার অনেক সাথি পাবে। এখন ঘুমাও।
—মা একটা গল্প বলো—
—অনেক দূরের দেশে, বিরাট পর্বত ছিল।
সেইখানে পাথর কেবল কালো।
সূর্য অস্ত যেত ঠিক পাহাড়ের মাথার ওপরে—
সেখানে ফুলের গাছ ছিল হাজারে হাজারে—
একটা জাদুর ফুল প্রতি রাতে ছড়াত মধুর ঘ্রাণ।
সে কখনো শুকাত-না। যেন অমর হয়েছে—ম্লান
কিন্তু কেউ এর কাছে যেতে সাহস পেত না—
তার কাঁটা ছিলো বিষে ভরা।
—তারপর কী মা?
[নিরি দেখে মা ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে। সে বিছানা ছেড়ে ওঠে।
বাইরে জোছনা, জলের মতন ঘন হয়ে ঝরছে যেনবা।
সে আবার কিছু দ্যাখে, বাইরে উড়ছে। তার পিছু পিছু কুঠিবাড়ির ভেতরে চলে যায়]
—কেউ কি এখানে আছে?
[কুঠিবাড়ির ভেতরে সাদা উঠানে তখন দেখা যায় একটি মাঝারি বৃক্ষ। চিরল-বিরল পাতা তার।
পাতা দুলিয়ে দুলিয়ে সে কথা বলছে]
—ভয় পেয়ো-না-গো মেয়ে। আবার এসেছো ফিরে?
কী নাম তোমার? তাকাও, আমার দিকে।
[নিরি গাছটির দিকে দ্যাখে]
—আমি নিরি। তুমি?
—আমার অনেক নাম ছিল...অনেক পুরনো নাম। কেবল বাতাস আর গাছ সেইসব নাম উচ্চারণ করতে পেরেছে।
আমার আসল পরিচয় হলো আমি একজন দাস। তোমার বাবার দাস।
অনেক আগের কথা। সে আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে।
তুমি পৃথিবীর আলোতে মরেছো, আমি বেঁচে গেছি অলৌকিক, কিংবা গাছ হয়ে গিয়ে।
—মিথ্যা বলছো এগুলো।
আমার বাবার কোনো দাস নেই। তিনি ছিলেন গরীব লোক।
বরং দাস অভ্যাসের জীবন তারই ছিল।
—আমি মিথ্যা কখনো বলি-না।
চেয়ে দেখো তোমার বামের কাঁধ।
সেখানে রয়েছে উল্কি আঁকা চাঁদ।
এটাই প্রমাণ। তুমি পাতালপুরির রাজার প্রাণ।
—আসলেই তাই—বাম পাশে উল্কি আঁকা,
চাঁদ আর দুটো তারা।
—চলো তবে ফিরে যাই।
তুমি গেলে রাজা খুশি হবে যারপরনাই।
তোমার আসল বাবা সে-ই। চলো দ্রুত, চলো যাই।
—কিভাবে সেখানে যাব?
—সবকিছু এত সোজা নয়, কোরো-না রাতের অপচয়।
—কী এমন সে কঠিন কাজ।
—এই বই নাও।
[নিরি নেয় এবং খোলে]
—এখানে তো কিছু লেখা নেই। বইজুড়ে সাদা পাতা।
—একা থাকলে খুলবে—তোমাকে দেখাবে ভবিষ্যত।
বই খুলে বলবে সকল কিছু, যা জানতে চাও।
[বইটি জামার মধ্যে নিয়ে, নিরি হেঁটে আসে কুটির প্রান্তরে।]

দৃশ্য ০৩
[চারদিকে ঝলমলে আলো।
গ্রামের সবুজ দিন। শীতের আভাস নেই যেন।
শান বাঁধানো পুকুর—স্বচ্ছ টলোমলো।]
—আজ ভালো করে স্নান সেরে নাও নিরি। তারপর এই জামা পরো
[নিরি দ্যাখে একটি সবুজ জামা—দারুণ মখমলের]
—মা, এখানে স্নান করব না। পুকুরে আমার ভয়। তাছাড়া এখানে শীত।
—আচ্ছা। ঘরে যাও। গরম পানির আয়োজন করতে বলি।

দৃশ্য ০৩ (০১)
[গোসলের ঘর—
গরম পানির ধোঁয়া সারাঘরে—
নিরি গোসল করে না
কিংবা দেরি করে—
এক কোণে লুকিয়ে বইটি খোলে—
তার চারপাশে ঝুঁকে যেন কুয়াশারা
যেন বকুল গাছের নিচে কেউ একা
মুখ নামিয়ে গুনছে ফুল।]
—আমাকে জানাও পাতালপুরিতে ফিরে যাবার উপায়।

[ধূসর পাতায় আঁকা লাল দীর্ঘ পথ
হয়ে উঠছে সতেজ—
সেই পথে আহ্নিকের ভিড়
আর হলুদ হাওয়া চলে গেছে
সবুজ বনের ধার ঘেঁষে।
সে দেখতে পায় সবকিছু
জেনে যায় বহুকিছু।
এই বাড়ির অদূরে, বনের ভেতর গিয়ে
মরা পথটির প্রান্তদেশে, নিঝুম গহিনে
আছে এক গাড় সবুজ পানা-পুকুর,
তার কাছে বাদামী একটি গাছ আছে
তাতে কয়েকটা সজনে হয়েছে।
সেই গাছের গোড়ায় জল ছেড়ে উড়ুক্কু মাছের মতো
মাঝে মাঝে শ্বাস নেয় একটি গোলাপি ব্যাঙ
তার গলার ভেতরে চাবিটি বাঁকানো।
ওই চাবি নিতে হবে
কুটিরের ভেতরের ঘরটি খুলতে হবে
তারপর পাতালপুরে যাওয়া যাবে।]
—নিরি স্নান করা হলো?
—এইতো হয়েছে প্রায়।
[বই বন্ধ করে, স্নান সারে নিরি। তার চোখে এক অজানা ভাবনা দেখা দেয়]

দৃশ্য ০৪
[আবছায়া অন্ধকার
জনশূন্য যেন গোলাঘর
সেখানে একাকী এক কোণে বসে আছে নিরি
বাইরে নেমেছে সন্ধ্যা, হালকা ঝরছে বৃষ্টি।
নিরি আবার বইটি খোলে]
—পাব কিভাবে ওই কুটিরের চাবি?

[এখন সে দ্যাখে অফুরন্ত মাঠ—
আর জেনে যায়—
অনেক বছর আগে পৃথিবীর ফুলগুলো আরো সাদা ছিল।
এই বন তখন অনেক ছোট,
এখানে অদ্ভুত সব প্রাণী বসত করত
তারা একে অপরের জীবন বাঁচাত
আর ঘুমাত বিশাল এক বট গাছের ছায়ায়।
সেই বট গাছ এখনো রয়েছে
শুধু শাখাগুলো শুকিয়ে গিয়েছে—
গাছটির ডানদিকে—সূর্য যেদিকে সন্ধ্যায় হেলে
শিকড়ের পাশে পোতা আছে জাদুর দুইটি মুক্তাদানা
ওই দানা তুলে নিলে গাছ আবার সবুজ হবে।
বাসা বাঁধবে পাখিরা। লাল লাল ফল হবে।
আর যদি মুক্তদুটো হাতে করে যাও
সেই পানা পুকুরের সজনে গোড়ায়—
ব্যাঙটাকে খুঁজে পাও
তার সামনে রাখবে
দেখবে সে খেয়ে নেবে মুক্তদুটো
তারপর গলগল করে বমিতে ভাসাবে
বেরিয়ে আসবে চাবি]
—এসব কি আসলেই সত্যি? কিভাবে বুঝব সব সত্যি?
[নিজ মনে ভেবে ভেবে, বইয়ের অন্য পাতা খোলে]
—বলো আমার মা, কী করছে এখন?

[বইয়ের পাতাগুলো ধূসরতার নিকটে চলে যায়।
মাঠ ছাপানো বৃষ্টিতে চাঁদ ঢেকে গেছে
লণ্ঠনের চারপাশে লাফাচ্ছে কাদুলে পোকা
একটি কেবল ছায়া একা, যেন আরো ঘোলা হয়ে যায়।
নিরির মা কাতরাচ্ছে পেটের ব্যথায়।
আরও জানতে পারা যায়—
পূর্ণিমার আগে মারা যাবে সন্তানসম্ভাবা
যদি তাকে বাঁচাতেই হয়,
যেতে হবে কুটিরের পাশটায়
জমে ওঠা অন্ধকার কিংবা দিনের সবুজে
বেঁচে রয়েছে সেখানে—বুনো হলুদের শটিবন
গোলাপের কাঁটার অভ্যাস রয়েছে তাদের—
তবু
দিনে কিশোর পাখিরা ওইখানে পোকা খুটে খায়
আর রাতে ঝুঁকে পড়া অন্ধকারে
নীল পাখনার ফসফরাসের আলোতে জোনাকি জ্বলে।
যে কোনো সন্ধ্যায় সবথেকে রোদে-পোড়া শটিগাছ তুলে ফেলে
তার মূল যদি, দুধে ভিজিয়ে খাটের নিচে, রাখা যায়
গর্ভব্যথা হবে উপশম, পাবে পরমায়ু।]

দৃশ্য : ০৫
[বিছানার চারপাশে মহিলারা। সন্তানের অপেক্ষায় বাইরে পুরুষ।
চাদর ভিজছে রক্তে। তবু কোনো সমাধান নেই। বেড়ে যাচ্ছে ব্যথা
লুকিয়ে ভেতরে ঢোকে নিরি।
বিছানার নিচে রাখে দুধভরা বাটি।
তাতে হাসছে শেকড়। যেন সহসা থিতিয়ে যায় কান্নার চিৎকার।
...
নিরি বেরিয়ে আসছে। কে বলছে যেন, ভাই এলো তার।]

দৃশ্য : ০৬
[আজ আলোর আঘাত নেই কোনো
মধ্যদিনে বনের ভেতরে সন্ধ্যা উঁকি মারে যেন।
পানাপুকুরের ‘পরেও আলোর দেখা নেই
চারপাশের গাছেরা জড়ো হয়ে
অনাবৃষ্টি আর অতিবৃষ্টির ফারাক
ভুলিয়ে দিয়েছে।
সজনে গাছের গোড়াতেই
ভুস করে ভেসে ওঠে বিশাল কোলাব্যাঙ]

—এই যে গোলাপি ব্যাঙ। তাকাও আমার দিকে।
আমি পাতালপুরির রাজকুমারী, শুনছো?
আমি তোমাকে পাই না ভয়।
খাবার এনেছি দেখো।
[নিরি মুক্তাদুটো ছুঁড়ে দেয়,
শুকনো পাতার ’পরে ঝিকিমিকি করে মুক্তাদুটো
ব্যাঙ শুধু চেয়ে যায়—অতঃপর গিলে ফেলে—অনায়াসে।
যেন গোলমরিচ খেয়েছে খালি মুখে—
এরপর বিশাল হা করে উগরে দিয়েছে
পেটের সকল জল। তাতে বেরিয়ে-আসে সোনার-চাবি।]

দৃশ্য : ০৭
[গাড়ি চলছে, মায়ের সঙ্গে
বালিকা একটা মেয়ে।
পুরাতন গাড়ি—মাটির সরল পথ,
গাড়ি দোলার অভ্যাসে মনে হয়
নিচে যেন জলাভূমি।
পথের দুধার ঘেঁষে ঘন বনভূমি।

মায়ের কোলের মধ্যে মেয়েটির
ঘুম ভেঙে যায়। সে কেবল দেখে
তার মা’র মুখ, নীল ডালিয়ার দেশ যেন
কাছেই কোথাও আছে।

গাড়ি চলছে পুরনো অভ্যাসে
পথের দুধার ঘেঁষে ঘন বনভূমি
আরো ঘন হয়ে আসে]

মধুকবির জন্মদিন, হচ্ছে না মধু মেলা



ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, যশোর
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি)।

১৮২৪ সালের এইদিনে যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জমিদার ঘরে জন্মগ্রহণ করেও সাহিত্যকে ভালোবেসে সমাজ সংসার থেকে কবি পেয়েছেন শুধু বঞ্চনা আর যন্ত্রণা। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় মারা যান মহাকবি মাইকেল মধুসূদন। এরপর কবির ভাইয়ের মেয়ে কবি মানকুমারি বসু ১৮৯০ সালে কবির প্রথম স্মরণসভার আয়োজন করেন সাগরদাঁড়িতে। সেই থেকে শুরু হয় মধু মেলার। এরপর থেকে সাগরদাঁড়িতে কবির জন্মদিন ঘিরে সপ্তাহব্যাপি মধুমেলায় হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে।

জন্মদিন উপলক্ষে মহাকবির জন্মভূমি সাগরদাঁড়িতে প্রতিবছর সপ্তাহ ব্যাপি মধুমেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে করোনার কারণে গতবছরের মতো এবারও মধুমেলার আয়োজন বাতিল করা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংক্ষিপ্ত পরিসরে পালন করা হবে খ্যাতিমান এই কবির জন্মদিন। আজ ২৫ জানুয়ারি মহাকবির ১৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে জেলার কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে মাত্র একদিনের কর্মসূচি উদযাপিত হবে। তবে প্রথমবারের মতো এবছর জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সংবাদপত্রে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হচ্ছে।

আজ বিকাল সাড়ে ৩টায় সাগরদাঁড়িতে মধুকবির প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। যশোর থেকে স্বল্প পরিসরের একটি সাংস্কৃতিক দল উদ্বোধনী সংগীত

পরিবেশন করবে। গত ২০ জানুয়ারি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত । তার পিতার নাম রাজনারায়ণ দত্ত ও মাতা জাহ্নবী দেবী। মাইকেল মধুসূদন দত্ত সাগরদাঁড়ি পাঠশালায় শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরে সাত বছর বয়সে কলকাতার খিদিরপুর স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজের অধ্যয়নরত অবস্থায় বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি ভাষা শেখেন। ১৮৪৪ সালে তিনি বিশপস কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত ওই কলেজে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখার সুযোগ পান। এসময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তার আত্মীয় স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তার পিতা এসময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। তাই অগত্যা ১৮৪৮ সালে ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজ গমন করেন তিনি। ১৮৪৮-৫২ সাল পর্যন্ত মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এসময় সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। একই সঙ্গে হিব্রু, ফরাসি,জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষাগ্রহণ করেন। মাদ্রাজে অবস্থানকালে প্রথমে রেবেকা ও পরে হেনরিয়েটা'র সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।  ১৮৬২ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত গমন করেন এবং গ্রেজ ইন এ যোগদান করেন।

১৮৬৩ সালে প্যারিস হয়ে ভার্সাই নগরীতে যান।  ১৮৬৫ সালে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। ১৮৬৬ সালে গ্রেজ ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৬৭ সালে দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৮৭০ সালে হাইকোর্টে অনুবাদ বিভাগে যোগদান করেন। ১৮৭২ সালে কিছুদিন পঞ্চকোর্টের রাজা নীলমণি সিংহ দেও এর ম্যানেজার ছিলেন। এখানে কিছুদিন কাজ করার পর পুনরায় আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত সাহিত্য কর্মের মধ্যে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ১২টি গ্রন্থ এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ৫টি গ্রন্থ রয়েছে। Timothy PenPoem ছন্দনামে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, The Captive ladie (১৮৪৮), দ্বিতীয় গ্রন্থ vissions of The past, পদ্মবতী নাটক, তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য, মেঘনাদ বধ মহাকাব্য, বীরাঙ্গনা (১৮৬২), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১), ব্রজাঞ্জনা (১৮৬১), হেক্টের বধ (১৮৭১), মায়াকানন (১৮৭৩), 'বঙ্গভাষা' 'কপোতাক্ষ নদ' ইত্যাদী সনেট। এই সনেটগুলো ১৮৬৬ সালে চতুৰ্দ্দশপদী কবিতাবলী নামে না মন্ডল প্রকাশিত হয়। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি তিনি ইংরেজি অনুবাদ করেন। Eurasion (পরে eastern Guardian), Madras Circulator and General Chronicle 3 Hindu Chronicle পত্রিকার সম্পাদনা করেন এবং Madras spec etator এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ১৮৪৮-১৮৫৬ সাল পর্যন্ত। ১৮৬২ সালে তিনি হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

;

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী আজ।

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী আজ।

  • Font increase
  • Font Decrease

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। মাইকেল মদুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোরের কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

করোনা পরিস্থিতির কারণে মধুসূদন দত্তের জন্মদিন ঘিরে মধুমেলা কিংবা বিস্তৃত পরিসরের কোনো আয়োজন থাকছে না। তবে আজ সামাজিক দূরত্ব মেনে সীমিত পরিসরে একদিনের কর্মসূচি উদযাপিত হবে। এর মধ্যে মহাকবির প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সাগরদাঁড়ির মধুমঞ্চে কবির জীবনীর ওপর আলোচনা সভা। এছাড়া রয়েছে কবিতা আবৃত্তি।

মধুসূদনের পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন জমিদার। মা ছিলেন জাহ্নবী দেবী। তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। তেরো বছর বয়সে মদুসূদন দত্ত কলকাতা যান এবং স্থানীয় একটি স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনার পর তিনি সেসময়কার হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন।

তিনি বাংলা, ফরাসি ও সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষালাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতার বিশপস কলেজে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখেন। পরবর্তীতে আইনশাস্ত্রে পড়ার জন্য তিনি ইংল্যান্ড যান।

মাইকেল মদুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক ছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যেও অসামান্য অবদান রাখায় বিশ্ববাসী এ ধীমান কবিকে মনে রেখেছে কৃতজ্ঞচিত্তে। তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত মেঘনাদবধ কাব্য নামক মহাকাব্য।

তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি হলো দ্য ক্যাপটিভ লেডি, শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী (নাটক), পদ্মাবতী (নাটক), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, একেই কি বলে সভ্যতা, তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশপদী কবিতাবলী, হেকটর বধ ইত্যাদি।

এ মহাকবির জন্মের কারণেই সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ নদ জগৎবিখ্যাত। কালের প্রবাহে কপোতাক্ষ নদের যৌবন বিলীন হলেও মাইকেলের কবিতার কপোতাক্ষ নদ যুগে যুগে বয়ে চলেছে।

১৮৭৩ সালে ২৯ জুন কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ মহাকবি। কলকাতায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

;

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;