সাভানায় শরণার্থীদের করোনাক্রান্ত ঈদ



মঈনুস সুলতান
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদ উপলক্ষে পারিবারিক পরিসরে আমি রান্নাবান্না করছি প্রায় দুই যুগের মতো, কিন্তু এ শিল্পে আমার কামিয়াবি হাসিল হয়েছে স্বল্প, খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে বিব্রত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে প্রচুর। হাল ছাড়িনি, কিন্তু আজ ভোরবিহানে সেমাই রান্না করতে গিয়ে যে হালত হয়েছে, তাকে সফলতা বলার কোনো কায়দা নেই। আজকের এ করোনাক্রান্ত ঈদে আমি সাভানা শহরের আরো দুয়েকজন সমমনা মানুষের সঙ্গে মিলেঝুলে—পৃথিবীর হরেক দেশ থেকে নানাবিধ যুদ্ধ কিংবা সামাজিক সংঘাতে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে এসে রিসেটেল্ড হওয়া কয়েকটি রেফিউজি পরিবারকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। আমার স্পেসিফিক দায়িত্ব হচ্ছে ফিস কাবাব ও সেমাই প্রস্তুত করা। টুনা মাছের কাবাবগুলো আকৃতিতে বটবৃক্ষের ঝরা-পাতার মতো দেখালেও তা স্বাদে হয়েছে উমদা। এ নিয়ে হীনমন্যতার কোনো কারণ নেই, তবে বিপত্তি ঘটেছে সেমাইকে জর্দায় রূপান্তরিত করতে গিয়ে। তা চটকে হান্ডির তলায় এমন চেরা-চ্যাপ্টা লেগে সেঁটে আছে যে, চিমটা দিয়ে টেনেও তা বর্তনে উপস্থাপন করার কোনো কুদরত থাকেনি। বিপদগ্রস্ত হয়ে টেলিফোনে কন্যা কাজরিকে মুশকিল আসান করতে এত্তেলা দিই। পরিস্থিতি যে কতটা খতরনাক—তা বোঝানোর জন্য টেক্সট্ ম্যাসেজের সাথে যুক্ত করি, হান্ডির তলদেশের ফটোগ্রাফ। মেয়ে আমোদ পেয়ে জবাবে জানায়—জকড়িমকড়ি লাগা সেমাইগুলোকে দেখাচ্ছে আরবি হরফে ক্যালিওগ্রাফি করে লেখা ঈদ মোবারকের মতো। আমি বিলা হয়ে সেলফোন সরিয়ে রাখি।

যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর হার লাখের দিকে আগাচ্ছে। বিষয়টিকে আমলে না এনে মূলত রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সক্রিয় উৎসাহে হরেক রাজ্যের গভর্নররা লকডাউন তুলে নিয়েছেন। আমাদের রাজ্য জর্জিয়ার গভর্নর আরেক কাঠি সরস, তিনি মৃত্যুর হারকে ডেটা মেনিপুলেশনের মারপ্যাঁচে কম করে দেখিয়ে চেষ্টা করছেন—মুভি থিয়েটার, স্টেডিয়াম, সমুদ্রসৈকত ও স্কুলগুলো খুলে দিতে। দোকানপাট বেশ কিছু খুলে গেছে বটে, তবে আমার মতো যে সব নাগরিক—হয় বয়সের ভারে পরিশ্রান্ত অথবা নানাবিধ রোগেশোকে আক্রান্ত, স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে তাদের গ্রোসারি শপ ইত্যাদিতে যেতে জোরেশোরে নিষেধ করা হচ্ছে। তো এ পরিস্থিতিতে চাইলেই আমি কোনো দোকানে গিয়ে সেমাইয়ের বিকল্প অন্য কোনো মিষ্টান্ন কিনে আনতে পারি না। কাজরি পরবর্তী টেক্সটে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। আমি অপেক্ষা করি, দেখা যাক কী হয়...।

ড্রাইভওয়েতে এসে থামে ফেডএক্স-এর মালামাল সরবরাহ করা গাড়ি। মাস্ক পরা ড্রাইভার একটি গিফট প্যাকেট সিঁড়িতে রেখে ফিরে যান। বুঝতে পারি, কাজরির কাছ থেকে এসেছে ঈদের উপহার। অ্যালকোহল রাব দিয়ে ঘঁষামাজা করে সাবধানে বাক্সটি খুলি। বেরিয়ে আসে গোলাপজলের সুন্দর একটি শিশি। চটজলদি তা সাবানজলে চুবিয়ে গামছা দিয়ে মুছে-টুছে অপেন করি। পুরো আঙিনা ভরে ওঠে পুষ্পের চনমনে খোশবুতে। কাজরির কাছ থেকে টেক্সট্ আসে ফের। জানতে পারি, সে জখমি সেমাইয়ের বিকল্প রাইস পুডিং নিয়ে আসছে। আমি জলদি করে খাবারের কৌটা ও তার ঈদোপহারের প্যাকেট ড্রাইভওয়েতে এনে রাখি। আমাদের মেয়ে কাছেই বসবাস করছে, তার কোনো কোনো বান্ধবী করোনার ব্যাপক বিস্তারে এক্সপোজড্ হয়েছে, তাই আমরা আজকাল সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের হাটবাজার করতে সে সহায়তা যোগাচ্ছে, তবে দৈহিকভাবে কাছে আসছে না, আমরা বাতচিত করছি কেতাবি কায়দায় ছয় ফুট দূরত্ব বহাল রেখে।

সড়কের পাশে গাড়ি পার্ক করে কাজরি ড্রাইভওয়েতে এনে রাখে রাইস পুডিংয়ের সওদা। ঈদোপহারের প্যাকেট খুলে সাবানজলে ভিজে নেতানো ফ্লোরাল হেয়ার ক্লিপের দিকে নজর দিয়ে সে চোখ কুঁচকে তাকায়। আমি উপহারটি বিশদভাবে ধোয়াপাকলা করে জীবাণুমুক্ত করার জন্য ‘স্যারি’ বলি। ‘নো প্রবলেম, বাপি, ইটস্ আ কুল ঈদ গিফট... ইট উইল ড্রাই সুন..।’ সে খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, ‘ঈদ মোবারক।’ আমি মনে মনে হিসাব কষি, আর কতদিন আমাদের পারিবারিক পরিসরে জারি থাকবে সামাজিক দূরত্ব?

বেলা পনে-এগারটা হতে চলল, মিসেস নিয়ামা ইবরিম এখনো এসে পৌঁছেননি, তাঁর দশটা পনেরতে এসে পৌঁছার কথা, তাই বিরক্ত লাগে। ওয়েস্ট আফ্রিকার ঘানা থেকে অনেক বছর আগে অভিবাসী হয়ে এসে এদেশে সেটেল্ড হওয়া মিসেস ইবরিম হাইস্কুলের ক্যাফেটেরিয়াতে কুক হিসাবে কাজ করেন। পার্টি-পর্বে তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে প্রস্তুত করে দেন আফ্রিকান ডিশ। রান্নার হাতটি তাঁর চমৎকার, তবে সময় মতো কোথাও এসে পৌঁছানোর স্বভাবটি এখনো আয়ত্ত করে উঠতে পারেননি। আজকের ঈদ-খাবারের আয়োজনে তিনি ওয়েস্ট আফ্রিকান কেতার জলোপ রাইস রান্না করে নিয়ে আসছেন। তিনি এসে না পৌঁছানো অব্দি কিছু করা যাবে না।

আমি ড্রাইভওয়েতে আগুপিছু পায়চারি করতে করতে মিসেস নিয়ামা ইবরিমের বিষয়টা নিয়ে ভাবি। সাভানা শহরকে বিষয়বস্তু করে কিছু একটা লেখার প্রয়াশে আমি মাস কয়েক আগে তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ইন্টারভিউ করি। তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা নোটবুকে ইন ডিটেইলস্ টুকে রেখেছিলাম। আমার স্টাডিতে খুঁজলে হয়তো খাতাটি পাওয়া যাবে। বাগিচার বড়সড় গাছটিতে ফুটেছে গোলাপি বর্ণের অজস্র পাউডার পাফ ফুল। একটি মকিং বার্ড পাতায় ডানা ঘষে সুরেলা কণ্ঠে ছড়াচ্ছে সুইট টিউন। নোটবুকে টুকে রাখা কিছু কিছু তথ্য ফিরে আসে আমার করোটিতে। সেপ্টেম্বর এলেভেনের ঘটনাটি ঘটার মাস খানেক আগে নববধূ হিসাবে সাভানা শহরে এসেছিলেন মিসেস ইবরিম। তাঁর স্বামী ডক্টর আবদু ইবরিম জর্জিয়া সাদার্ন ইউনিভারসিটিতে পোস্ট ডক্টরেল ফেলো হিসাবে কাজ করছিলেন। বিয়ের পর ভিসার প্রতীক্ষায় প্রায় তিন বছর নিয়ামা ইবরিম বাস করেছিলেন ঘানার রাজধানী আক্রায় তাঁর পিতা-মাতার বসতবাড়িতে। এখানে এসেই হাল ধরেছিলেন সংসারের। ঈদের পর দিন ছিল তাঁদের বিবাহবার্ষিকী।

ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে গেছে সেপ্টেম্বর এলেভেনের ট্র্যাজিডি। এর প্রতিক্রিয়ায় কোনো কোনো জায়গায় ভিন্ন গাত্রবর্ণের আমেরিকান মুসলমানদের হেরাস করার বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যাপার ঘটতে শুরু হয়েছে। ঈদের আগে চানরাতে সাভানার শহরের ইসলামিক সেন্টার নামক ছোট্ট মসজিদটিকে কে বা কারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তো স্ত্রী নিয়ামাকে ঘরে একা রেখে ডক্টর ইবরিম মসজিদ প্রাঙ্গণে গিয়ে অন্যান্য মুসলমানদের সাথে হাত লাগান জ্বলাপোড়া ছাই ইত্যাদি পয়পরিষ্কারের কাজে। ড্রাইভওয়েতে খাটানো হয় চাঁদোয়া, তার তলায় বিছানার চাদর বিছিয়ে অন্যান্যদের সঙ্গে ডক্টর ইবরিম পুলিশ প্রহরায় আদায় করেন ঈদের নামাজ। তারপর তিনি ঘরে না ফিরে ঈদের বাহারে ধড়াচূড়া ও টুপি পরে চলে যান শৌখিন শপিং সেন্টারে। ওখানে বিবাহবার্ষিকীর রাতে নববধূর জন্য একটি ব্যক্তিগত উপহার কিনে নিয়ে হেঁটে হেঁটে চেষ্টা করছিলেন ট্যাক্সি পাওয়ার। ছুটন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে ফায়ার করা গুলির আঘাতে তিনি নিহত হন।

মিসেস নিয়ামা ইবরিমের গাড়ি ঠিক এগারটা বাইশে এসে ড্রাইভওয়েতে থামে। ফুলের মোটিফ আঁকা বাহারে হেজাব পরে এসেছেন তিনি। নিজেই টেনে নামান কার্ডবোর্ডের ভারী বাক্সটি। আমাকে ঈদ মোবারক বলে হাতের ইশারায় ব্যাকসিটে রাখা গান ভায়োলেন্স বিরোধী প্লেকার্ডটি দেখিয়ে ড্রাইভিং সিটে ফিরে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেন। আমি তাঁর অপস্রিয়মাণ টেইল লাইটের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। তাঁর দিনযাপন সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। এক যুগের নববধূটি হালফিল প্রৌঢ়ত্ব অতিক্রম করে পড়েছেন বয়সের ভাটিতে। ঘানায় আর ফিরে যাননি নিয়ামা, সাভানাতেই থিতু হয়েছেন। কোনো পুরুষ পার্টনার জুটেছে কী—না জেনে বলা মুশকিল। তবে বিদেশ বিভূঁইয়ে নিহত ডক্টর ইবরিমের স্মৃতিকে তিনি জিইয়ে রেখেছেন। প্রতি ঈদে মৃত স্বামীর প্রিয় খাবার—টমেটো সচে সব্জি মেশানো জলোফ রাইস প্রচুর পরিমাণে রান্না করে মসজিদে এনে বিতরণ করেন মুসল্লিদের মধ্যে। তারপর ডক্টর ইবরিমের গুলিবিদ্ধ ফটোগ্রাফ সাঁটা একটি প্লেকার্ড নিয়ে গিয়ে দাঁড়ান বন্দুকের দোকানের সামনে, নীরবে প্রতিবাদ করেন, নিরপরাধ মানুষকে অস্ত্রাঘাতে হত্যা করার বিরুদ্ধে। সাভানা শহরে সয়ংক্রিয় অস্ত্র বিক্রি হয় প্রচুর। গান ভায়োলেন্সে প্রতিবছর মৃত্যু হয় অনেক মানুষের। মাঝেসাজে এখানে আয়োজিত হয় বন্দুক সংক্রান্ত ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এ সব অ্যাক্টিভিটির পয়লা কাতারে প্লেকার্ড হাতে দেখা যায় বিধবা নিয়ামা ইবরিমকে।

সাভানা শহরটি সরকারি উদ্যোগে খুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে, কিন্তু মুসল্লিদের ব্যাপক অংশ বয়স্ক বিধায় মসজিদে এবার ঈদের জামাত হয়নি। তাই ডক্টর ইবরিমের ইয়াদগারিতে প্রস্তুত জলোফ রাইস নাইমা রেফিউজিদের সেবার জন্য ডোনেট করে দিলেন। ক্যাটারিং সার্ভিসে কাজ করা মহিলা ইনি, স্টাইরোফোমের বক্সে জলোপ রাইস এর সঙ্গে প্লাস্টিকের চামচ, কাঁটা ও ন্যাপকিন দিয়ে সমস্ত কিছু পেশাদারি যত্নে পুরে দিয়েছেন পলিথিনের আলাদা আলাদা ব্যাগে। আমি গ্লাভস্ পরে তাতে ফিস কাবাব ও রাইস পুডিং রাখতে যাই। খাবার বিতরণে দেরি হয়ে যাচ্ছে, বড্ড অস্থির লাগে। জোসেফ মরগ্যানকে রিং করবো কিনা—ভাবি। সুহৃদ মরগ্যান আমাকে লিফট দিয়ে খাবার বিতরণে সহায়তা করার কথা দিয়েছেন। তিনি এখনো এসে পৌঁছাননি কেন? বেজায় টেনশন লাগে। আমার কব্জিতে ইনজুরির জন্য আমি ড্রাইভ করতে পারছি না। নিয়মিত পেইন কিলার নিতে হচ্ছে। প্বার্শ-প্রতিক্রিয়ায় আমার মধ্যে ধৈর্যটা কমে গেছে, সাথে সাথে বেড়েছে টেলিফোনে বেফজুল কথাবার্তা বলার প্রবণতা।

সারোকিন সেকেজির কাছ থেকে টেক্সট্ আসে। ইরানের নারী সারোকিন মরগ্যান সাহেবের সংসার করছেন অনেক দিন ধরে। বছর তিনেক হলো এ বয়স্ক নারী মারাত্মক রকমের বাত ও অন্যান্য ব্যাধিতে পঙ্গু প্রায়। চলাফেরা করেন চাকাওয়ালা ওয়াকার ঠেলে ঠেলে, তবে এখনো প্রতি ঈদে খরিদ করেন কয়েক জোড়া হাইহিল স্যান্ডেল। তাঁদের ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়ির একটি স্বতন্ত্র কামরা জুড়ে রাখা আছে শতাধিক হাইহিলের কালেকশন। টেক্সটে সারোকিন আমাকে টেলিফোন করার পার্মিশন চেয়েছেন। এ মহিলার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে ইনি অনুমতি ছাড়াই আমার ডান হাতে চুমো খেয়ে খোশআমদেদ জানান। তো এ মুহূর্তে রিং করার জন্য এত আদব-কায়দা করছেন কেন? তাঁর অনুরাগ-ঋদ্ধ স্বামী মরগ্যান সাহেবের তো আমার বাড়িতে এসে পৌঁছানোর কথা? তিনি আসেননি কেন? মেজাজ খাট্টা হয়ে ওঠে।

রোদের তাপ বাড়ছে, আমি বাগানের ছাতাটি খুলে দিয়ে তার নিচে গিয়ে বসি। মরগ্যান সাহেবের প্রচুর বয়স হলেও তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম আছেন। আমাদের ত্রাণ তৎপরতায় তিনি সাহায্য করছেন বিগতভাবে। পেশায় মানুষটি প্রকৌশলী, আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কয়েক বছর কন্সট্রাকশন ওয়ার্কের কন্টাকটারিও করেছেন। রেজা শাহ পাহলবির রাজত্বের শেষ দিকে ইনি ইরানে যান নগর নির্মাণে সহায়তা করতে। তখন বিবাহিত হয়েছিলেন সারোকিনের সঙ্গে। ফার্সি বলেন ভালোই। ধর্মে মুসলমান নন, তবে কলেমা জানেন, হাফিজ ও শেখ সাদির কিছু গজল ও কসিদা মুখস্থ করে রেখেছেন। মরগ্যান সাহেবের বিত্ত প্রচুর, পার্সিয়ান গালিচা সংগ্রহ করে চিত্ত বিনোদন করে থাকেন। তাঁর বসতবাড়ির ড্রয়িংরুমটিকে কার্পেটের দোকানের মতো দেখায়।

আমার বিরক্তি বাড়ে। টেক্সটের জবাব না দিয়ে সারোকিনকে সরাসরি রিং করি। তিনি প্রচুর সময় নিয়ে আমাকে ঈদ মোবারক জানিয়ে বলেন, কাজরির জন্য নিজ হাতে তৈরি করেছেন পার্সিয়ান রাইস ও শিসকাবাব প্রভৃতি। মহিলা কেবলই কথা বলছেন, থামেন না, ঠিক বুঝতে পারি না, তাঁর স্বামী মরগ্যান কোথায় গুম হলেন? গরমের মৌসুমে ঈদ হলে কী ধরনের আতর ইস্তেমাল করতে হয়—তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে অতঃপর সারোকিন জানান, স্বামীকে তিনি একটু আগে পাঠিয়েছেন শপিং মলে খেলনা কিনতে। গেল রাতে মরগ্যান টেলিফোনে জানতে চেয়েছিলেন রেফিউজিদের নির্দ্দিষ্ট কোনো চাহিদা আছে কিনা। আমি জবাব দিয়েছিলাম, পাঁচটি পরিবারে আছে ছোট ছোট শিশু। আমরা সপ্তাহ খানেক আগে তাদের অ্যাপার্টমেন্টে ফুড ব্যাংক থেকে জোগাড় করা খাবার-দাবার পৌঁছে দিয়েছি বটে, কিন্তু ঈদে শিশুদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। মরগ্যানের সেলফোনে চার্জ ছিল না, তাই তাঁর হয়ে সারোকিন অ্যাপোলজি চান। বুঝতে পারি শিশুদের জন্য কিছু কেনা যায়নি—এ তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় সারোকিন মরগ্যানকে শপিংমলে পাঠিয়েছেন খেলনা কিনতে। বয়সের নিরিখে মরগ্যান সাহেব আমার মতো হাই-রিস্ক ক্যাটাগরিতে পড়েন। খোদা-না-খাস্তা তাঁর কিছু হলে জগত-সংসারে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব সবচেয়ে বেশি।

আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। ড্রাইভওয়েতে এসে থামে মরগ্যানের গাড়ি। কাচের হেড-শিল্ডের সাথে পলিথিনের স্বচ্ছ সুরক্ষা গাউন পরে এসেছেন। সাথে করে খেলনা ছাড়াও তিনি নিয়ে এসেছেন প্রতিটি রেফিউজি পরিবারদের জন্য দুই রকমের কাবাব ও ফলমূলে পূর্ণ আলাদা আলাদা শপিংব্যাগ। কাজরির জন্য পার্সিয়ান রাইসের ডিশের ওপর সেলোফোনে মোড়া ফুলের তোড়াসহ আস্ত একটি বাস্কেট নামিয়ে দিয়ে আমাকে গাড়িতে উঠতে ইশারা দেন। আমরা কথাবার্তা তেমন বলি না, তবে মরগ্যানের অনুরোধে আমি টেলিফোন স্ক্রিনে তাঁর লেখা একটি ফেসবুক পোস্টিং পড়ি।

পোস্টিংয়ে তিনি নগরীর চেনা মুখ—রাজ্যসভার এক আইনপ্রণেতা সম্পর্কে নাম উল্লেখ না করে আলোচনা করেছেন। রিপাবলিকান এ রাজনীতিবিদ করোনা সংক্রমণের প্রথম থেকে তার মিডিয়া চ্যানেলে প্রচার করে আসছেন যে, ভাইরাসের বিস্তৃতি হচ্ছে আদতে বিদেশ থেকে আগত অভিবাসী—বিশেষ করে চীনাদের আমেরিকার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র বিশেষ। তিনি সামাজিক দূরত্ব যে ভ্রান্ত একটি আইডিয়া—তা নিয়ে তৈরি করেছেন প্রচার ভিডিও। সামাজিক দূরত্বের নীতিমালাকে অগ্রাহ্য করে নিজ মালিকানাধীন কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে শ্রমিকদের মাস্ক ও ডিসইনফেকশন লোশন ইত্যাদি সরবরাহ না করে কাজে বাধ্য করেছেন। আইনসভায় ইনি কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান-আমেরিকানদের শহরতলীতে ভাইরাস টেস্টিং সেন্টার স্থাপন করার বিরোধিতা করেন। দরিদ্র কর্মচারীদের বেকার ভাতা বাতিলের প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন। আইনপ্রণেতা মরগ্যান সাহেবের প্রতিবেশি হিসাবে একই পাড়ায় বাস করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সামাজিক দূরত্ব বহাল রেখে তার পরিবারকে আইসোলেশনে নিয়ে রক্ষা করছেন। এক দিকে ভাইরাস টেস্টিংয়ের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিরোধিতা করছেন, অন্য দিকে ইনি তার নিরাপত্তারক্ষী ও ব্যক্তিগত স্টাফদের প্রতি সপ্তাহে টেস্ট করাচ্ছেন। আমি পোস্টিং পড়া শেষ করে চোখ তুলে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাই। ড্রাইভ করতে করতে তিনি মুখোশটি সামান্য নামিয়ে এ আইনপ্রণেতা সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘ফার্সিতে এ ধরনের আচরণকে বলা হয় মুনাফিকি।’ লবজটির সঙ্গে আমি পরিচিত, ফেসবুকে আইনপ্রণেতার নাম উল্লেখ না করে আলোচনা করে ফায়দা কী—ঠিক বুঝতে পারি না। পাশাপাশি বসেও আমরা দুজনে কমবেশি মুখে মাস্ক বজায় রাখছি। এ হালতে গুছিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা মুশকিল। ভাবি পরে একসময় টেলিফোন করে এ ব্যাপারে ফলোআপ করতে হবে।

যাত্রাপথে ট্র্যাফিক নেই একেবারে, তবে আমরা কথাবার্তা বলছি না, তাই দীর্ঘ মনে হয়। আমরা এ মুহূর্তে রওয়ানা হয়েছি সাভানা শহর থেকে খানিকটা দূরে আইল অব হোপ নামে ব্রিজে সংযুক্ত একটি আইল্যান্ডের দিকে। ওখানকার বিশাল একটি ম্যানসনে একাকী বাস করছেন ইরাকের অভিবাসী চিত্রকর আহাদ কালাব। ছবি আঁকার হাত তাঁর দুর্দান্ত। এ দেশে সেটেল্ড হয়ে চিত্রকলা বিক্রি করে দিন গোজরান করছিলেন। সংক্রমণের সংবাদ চাউর হওয়ার সপ্তাহ দিন আগে ইনি অত্যন্ত বিত্তশালী একজন মানুষের বিরাট একটি ম্যানসনের বলরুমে দেয়াল-জোড়া ফ্রেস্কো আঁকার কমিশন পান। বিত্তবান বাস করেন লস এঞ্জেলসে। বছরে একবার ক্রিসমাসের সময় ফিরে এসে বলরুমে আয়োজন করেন নিউইয়ার্স পার্টি। তারপর পুরো বছর ম্যানসনটি খালি পড়ে থাকে। আহাদ কালাবের গাড়ি-টাড়ি নেই। প্রতিদিন সাভানা থেকে আইল অব হোপে গিয়ে ছবি আঁকার কাজ করাটা মুশকিল। তাই তাকে ম্যানসনের বাগিচায় এক কামরায় গেস্ট-কটেজে থাকতে দেওয়া হয়। মাত্র কয়েকদিন কাজ করার পর কালাবের শরীরে ফুটে ওঠে করোনার আলামত। জ্বর, কাশি ও মাথা ধরা। তাঁর হেল্থ ইনস্যুরেন্স নেই, সিম্পটনও মাইল্ড, তাই তিনি গেস্ট-কটেজে নিজেকে আইসোলেটেড করে রাখছেন।

নগরীর এখানে ওখানে আহাদ কালাবের প্রদর্শনী হয়েছে কয়েকবার। তাঁর সঙ্গে একবার অন্তরঙ্গভাবে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তাও বলেছি। কথা দিয়েছিলাম, তাঁকে নিয়ে লিখব, লিখতেও বসেছিলাম, কিন্তু শেষ করতে পারিনি। ধর্ম বিশ্বাসে কালাব ইয়াজিদি। যতটা জেনেছি, ইয়াজিদি হচ্ছে দজলা-ফোরাত অঞ্চলের অতি প্রাচীন একটি একেশ্বরবাদী ধর্মমত। এদের সাথে কারবালায় নবী (দঃ)-এর দৌহিত্রের সঙ্গে নির্মম আচরণ করা মোয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদের কোনো সম্পর্ক নেই। এদের উপাসনা পদ্ধতির সঙ্গে সুফি তরিকার রীতি-রিচ্যুয়েলের মিল আছে। এরা কথা বলেন কারমানজি ভাষায়, অনেকেই দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে আরবি জবানটাও জানেন। পালন করেন ঈদ ও শবেবরাত।

আহাদ কালাব ইরাকের নিনেভ অঞ্চলের শেখান শহরের মানুষ। সম্প্রতি ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা অত্র এলাকা দখল করে নিলে প্রায় চল্লিশ হাজার ইয়াজিদি হয়ে পড়ে বাস্তুহারা। এদের ‘কুফফার’ ফতোয়া দিয়ে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা হত্যা করে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। একই সাথে তাদের হাতে মালে গনিমত হিসাবে বন্দী হন প্রায় ৭০০০ জন নারী। এদের কাউকে কাউকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়। অনুগতদের নিকাহ প্রথার মাধ্যমে উপপত্নি হিসাবে যোদ্ধা পুরুষদের সংসার করার অনুমতি দেওয়া হয়। যারা ধর্মান্তরিত হতে আপত্তি জানায়, তাদের কাউকে কাউকে সেক্স-স্লেভ হিসাবে বিক্রি করে দেওয়া হয় সিরিয়ার হিউম্যান ট্র্যাফিকারদের কাছে।

আহাদ কালাব ও তাঁর স্ত্রী জাবিলা কালাব আরো হাজার খানেক ইয়াজিদির সঙ্গে বন্দী হয়েছিলেন ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের হাতে। তাদের মাউন্ট শিনজারের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কুর্দি গেরিলাদের আক্রমণে কিছু বন্দীকে পেছনে ফেলে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা উঠে যায় পর্বতের দুর্গম হাইড আউটে। আহাদ কালাব কুর্দি গেরিলাদের সহায়তায় লেবাননে পালিয়ে এসে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অতঃপর রেফিউজি কেটাগরিতে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার সুযোগ পান।

ইসলামি স্টেটের সঙ্গে কুর্দিদের যুদ্ধজনিত গোলযোগে আহাদ কালাব বিচ্ছিন্ন হন তাঁর স্ত্রী জাবিলা কালাবের সঙ্গে। অনেক চেষ্টা করেও জাবিলার অদৃষ্টে কী ঘটেছে—কোনো খোঁজ পাননি তিনি। কিছু দিন আগে সাভানা শহরে হয়ে গেছে তাঁর একটি একক প্রদর্শনী। তাঁর আঁকা অনেকগুলো চিত্রে আবছাভাবে ফুটে উঠেছে জাবিলার মুখচ্ছবি। পত্রিকায় ভালো রিভিউ হয়েছে, কিছু চিত্রকলা বিক্রিও হয়েছে। অন্তরঙ্গ আলাপে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর প্রতিক্রিয়া। চোখের জল মুছে বলেছিলেন, ‘আই আর্নড সাম মানি বাই সেলিং দ্য পেইনটিংস্, বাট...ইউ নো...ডিডন্ট গেট ব্যাক মাই লাভ।’

যে ম্যানসনের গেস্ট-কটেজে এ মুহূর্তে আইসোলেশনে আছেন কালাব, ওখানে স্থলপথে যেতে পড়ে একটি ট্রেইলার পার্ক, যেখানে ক্যারিবিয়ান ক্রুজে গিয়ে যে কয়েকজন মানুষ সংক্রমিত হয়েছিলেন কোভিড-১৯-এ, তাঁরা আইসোলেশনে বাস করছেন। অন্য উপায় হচ্ছে, নোনা জলবাহী লেগুনে নৌকা বেয়ে গিয়ে ওঠা ম্যানসনের পেছন দিকে জেটিতে। মরগ্যান আইল অব হোপের বোট ডক করার জেটির দিকে ড্রাইভ করতে করতে কালাবের সঙ্গে সেলফোনে কথা বলে নেন। গাড়িটি পার্ক করে খাবারের ব্যাগ হাতে আমরা জেটিতে আসি। ওখানে বাঁধা নানা আকারের অনেকগুলো বোট। খানিক খুঁজে আমরা চারজন বসার উপযোগী একটি ছোট্ট নৌকা লকেট করি। মরগ্যান কালাবের দেওয়া কোড ব্যবহার করে খুলে ফেলেন লক। লেগুনের জলে ভাসছে ম্যালার্ড জাতীয় হাঁস। চতুর্দিক এমন সুনশান হয়ে আছে যে, ইঞ্জিন স্টার্ট করতে ইচ্ছা হয় না। মরগ্যান ঢিমেতালে বৈঠা ফেলেন। যেতে যেতে দেখি দুপাশে নলখাগড়ার মতো দীর্ঘ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে শ্বেতশুভ্র সারস।

জেটিতে বোট ভিড়িয়ে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠি। বাগান পেরিয়ে ম্যানসনটির চকমিলান আকার-আয়তন দেখে আমার চোখ দুটি ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। জেটির লাগোয়া বোট-হাউসে নোঙর করে রাখা একটি শৌখিন ত্রিমারান বোট, পাশেই ঢেউয়ে মৃদু মৃদু দুলছে বর্ণাঢ্য সিপ্লেন। দেখতে পাই, সেলফোন কানে লাগিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন কালাব। আমরা বোট-হাউসের বারান্দায় খাবারের ব্যাগটি রাখি। বেশ দূরে দাঁড়িয়ে তিনি হাত নেড়ে সেলফোনে ঈদ মোবারক বলেন। মরগ্যান লাউড স্পিকার অন করেন। জানতে পারি, তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন, চলাফেরা করতে পারেন, তবে সারাক্ষণ বড় দুর্বল লাগে। যে বলরুমের দেয়ালে তিনি ফ্রেস্কো আঁকতে শুরু করেছিলেন—তা আকারে এত বড় যে, পার্টি-পর্বে ওখানে শত খানেক গেস্ট এন্টারটেন করা যায়। বিশাল পরিসরের ফ্রেস্কোটি শেষ করতে সময় লাগবে। অসুবিধা কিছু নেই। ম্যানসনের কেয়ার টেকার তাঁকে প্রায়োজনে আরো মাস-দেড়মাস গেস্ট-কটেজে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। ডিপ ফ্রিজে খাবার-দাবারও আছে যথেষ্ট। আমাদের দেখতে পেয়ে কালাব এত খুশি হয়েছেন যে, ইশারায় আলিঙ্গনের ভঙ্গি করে গেয়ে ওঠেন ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের পালা-পার্বণে গীত একটি জনপ্রিয় গানের দুটি কলি।

আইল অব হোপ থেকে সাভানা শহরে ফিরে ডাউন টাউনের দিকে ড্রাইভ করতে গিয়ে কী ভেবে মরগ্যান ঢুকে পড়েন একটি গলিতে। দুটি ব্লক পেরিয়ে আমরা চলে আসি ছোট্ট একটি শপিং কমপ্লেক্সের কাছে। মারণাস্ত্র বিক্রির দোকান ‘গান স্মিত’র সামনের পেভমেন্ট তিনি গাড়িটি দাঁড় করান। বন্দুকের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনে একসাথে মাত্র দুজন ক্রেতাকে দোকানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা সারি দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছেন তাদের পালা আসার। খানিক দূরে পার্কিংলটে মারণাস্ত্র ব্যবহার বিরোধী প্লেকার্ড হাতে একাকী দাঁড়িয়ে মাস্কে মুখ ঢাকা হেজাব পরা মিসেস নিয়ামা ইবরিম। আমরা তাঁর সমর্থনে নিরাপদ দূরে দাঁড়িয়ে রুমাল নাড়ি। কয়েকজন বন্দুক খরিদ করনেওয়ালা যুবক ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের দিকে তাকান। দুজন আঙুল নিচু করে অশ্লীলভাবে ইশারা করেন। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে ভাবি অত্র এলাকায় যেভাবে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে—আমার জীবদ্দশায় কি এ প্রবণতার অবসান ঘটবে?

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হয় জর্জিয়া সাদার্ন ইউনিভারসিটির পেছন দিককার দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুসিত পল্লীতে। ওখানে বাস করছেন কেম্বোডিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে আগত বয়োবৃদ্ধ চাম দম্পতি। সপ্তাখানেক আগে মিসেস লেবু-কে চাম তাঁর পক্ষাঘাতে স্থবির স্বামী মি. ফাটেল সান চামকে ঘরে একা রেখে উবার চড়ে গ্রোসারি শপিংয়ে গিয়েছিলেন। বাজার সওদা নিয়ে দোকান থেকে বেরোতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি আঁকা টিশার্ট পরা এক শ্বেতাঙ্গ মুণ্ডিত মস্তক যুবক ‘এক্সকিউজ মি...’ বলে তাঁকে থামায়। তারপর কেশে তাঁর শরীরে থুতু ফেলে চিৎকার করে বলে, ‘ইউ ফাকেন চায়নিজ, ইউ ব্রট করোনা ভাইরাস হিয়ার...গো ব্যাক টু ইয়োর আগলি হোম।’ আমি নিরীহ এ বৃদ্ধার হেরাসমেন্টের কাহিনী বর্ণনা করে স্থানীয় পত্রিকায় চিঠি লিখেছিলাম, পত্রটি ছাপেনি। মরগ্যান সাহেব পত্রিকার অ্যাডভাইজারি বোর্ডে আছেন, আমি তাঁকে গতকাল বিষয়টি অবহিত করি। তিনি ড্রাইভ করতে করতে ঘটনাটি ফের ব্যাখ্যা করতে বলেন। বিরক্ত হয়ে আমি বলি, মহিলা প্রথমত চায়নিজ নন। আর চায়নিজরা যে আমেরিকাতে ভাইরাস পাঠিয়েছে, তারও কোনো প্রমাণ নেই। গবেষকরা নিউইয়র্কে আক্রান্তদের শরীর থেকে নেওয়া জীবাণু পরীক্ষা করে বলছেন এগুলো এসেছে ইউরোপ থেকে। তো ভাইরাসের বিষয়-আশয় যাই হোক চাম পরিবার অভিবাসী হয়ে এদেশে এসেছে মূলত আমেরিকার যুদ্ধনীতির কারণে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের জামানায় যুক্তরাষ্ট্রের কার্পেট বম্বিংয়ে কেম্বেডিয়ার কমপঙচনঙ এলাকায় অবস্থিত তাঁদের পুরো গ্রামটি জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে বাস্তুহারা হয়ে পুরো এগারো বছর চাম পরিবার কাটান থাইল্যান্ডের শরণার্থী ক্যাম্পে। তারপর কপালগুণে রেফিউজি ক্যাটাগরিতে অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকেন।

মরগ্যান এবার জানতে চান, ‘ডু ইউ নো এনিথিং আবাউট দিস কাপোলস্ কালচারেল ব্যাকগ্রাউন্ড? সম্পাদক ঠিক বুঝতে পারেননি চাম শব্দটি, কেম্বোডিয়ার মানুষজনকে খেমার বলে না? আমি জবাব দিই, কেম্বোডিয়ার মূলধারার মানুষজনের নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি হচ্ছে খেমার। এরা বৌদ্ধ, অনুশীলন করে তারাবাদা সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস। চামরা মুসলমান, সংখ্যালঘু, এরা খেমার মুসলিম বলেও পরিচিত।’

মরগ্যানের পরবর্তী প্রশ্ন হয়, ‘দেশে এসে অভিবাসী হওয়ার আগে এঁনারা কী ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া?’ কেন জানি আমার বিরক্তি আরেক দফা বাড়ে, তবে জবাব দেই, ‘মিসেস লেবু-কে চাম তারুণ্যে ছিলেন নৃত্যশিল্পী। নমপেনের রাজদরবারে তিনি একবার নৃত্য উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর স্বামী মি. ফাটেল সান চাম ছিলেন হাইস্কুলের শিক্ষক। এঁরা খেমার ভাষায় কথা বলেন বটে, তবে এঁদের নিজস্ব ভাষার নাম হচ্ছে খা-খা। এ ভাষার লিখনশৈলী আজকাল আর কেউ ব্যবহার করে না, ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফাটেল সান চাম হচ্ছেন খা-খা ভাষার একজন বিশেষজ্ঞ।’ মরগ্যান এবার আসল কথায় এসে বলেন, ‘আমাদের ছোট্ট শহরের নাগরিক বৈচিত্রে এরা যুক্ত করছেন নতুন একটি এলিমেন্ট। সম্পাদক এদের সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চান। চিঠি নয়, তুমি এঁদের নিয়ে একটি ফিচার-স্টোরি করতে পারবে কি? ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড...দু-তিনটি ছবি লাগবে কিন্তু।’ গাড়ি এসে থামে চাম দম্পতির ঘরের সামনে। ইঞ্জিন অফ করে দিয়ে মরগ্যান প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকান, আমি জবাব দিই, ‘আই উইল থিংক আবাউট দিস...আজ থাক, এ নিয়ে পরে কথা বলব। ও-কে।’

ঘরের বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন মিসেস লেবু-কে চাম। আমি হাত নাড়ি, তিনি চোখ তুলে তাকান, কিন্তু কিছু বলেন না। আঙিনায় ঘাস ও আগাছা বেড়ে জংলা হয়ে ওঠছে। ট্র্যাশ বিনের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা বর্জ বোঝাই আবর্জনার একাধিক ব্যাগ। মিসেস লেবু-কে চাম উঠে দাঁড়ান, তিনি কোমর সিধে করতে প্রচুর সময় নেন, টিপয় থেকে তুলে চশমাটিও চোখে লাগান। আমি কুঁজো ভঙ্গিতে এক-পা, দু-পা করে এগিয়ে আসা বৃদ্ধার দিকে তাকাই। মাস তিনকে আগে আমি একবার তাঁদের খোঁজ নিতে এ বাড়িতে এসেছিলাম। তখন মিসেস লেবু-কে চাম আমাকে তাঁদের ফ্যামিলি অ্যালবামটি দেখিয়ে ছিলেন, ওখানে আমি সটিন-রেশম ও ব্রোকেডে ঝলমলে নৃত্যের ট্র্যাডিশন্যাল পোশাক পরা যে তরুণীর ফটোগ্রাফ দেখেছি, তার সঙ্গে আমার দিকে এগিয়ে আসা কুঁচকানো ত্বক কুঁজো বৃদ্ধার কোনো মিল দেখতে পাই না।

মিসেস লেবু-কে চাম আমার কাছে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দেন। সচেতন হই যে, এ মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখা সম্ভব হবে না। দ্বিধা ঝেড়ে আমি তাঁর হাত স্পর্শ করি। মৃদু হেসে জানতে চান, কী ধরনের খাবার নিয়ে এসেছি? কাবাবে হাড়গোড় কিছু নেই জানতে পেরে খুশি হন, বলেন, ‘মাই হাজবেন্ড লাভ মিট, কিন্তু চামরা মৎস্যজীবী, অনেকে বাস করে নদী বা দারিয়ার কিনারায়, ঈদে আমরা নারকেলের দুধ দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করি।’ মরগ্যান এগিয়ে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে বাঁও করে পরিচিত হন। তিনি আবর্জনার ব্যাগগুলো তুলে ট্র্যাশ বিনে রাখার অনুমতি চান। মিসেস লেবু-কে মাথা হেলিয়ে সম্মতি দিয়ে তাঁর কোমরের দিকে ইঙ্গিত করেন। বুঝতে পারি, এ বৃদ্ধাও বাত-ব্যাধির আরেক ভিকটিম। আমি খাবারের ব্যাগটি নিয়ে সিঁড়ির উপর রাখি। মিসেস লেবু-কে আফসোস করে বলেন, ‘গ্রোসারিতে চিংড়ি মাছ ছিল প্রচুর, কিন্তু যে ব্যাগের দাম মাস খানেক আগে ছিল নয় ডলার, তা বেড়ে হয়েছে সাতাইশ ডলার, এত দাম দিয়ে কিছু কেনা যায় নাকি?’ অতঃপর তিনি জানান যে, তাঁরা অপেক্ষা করে আছেন সরকারের পাঠানো স্টিমুলাস চেকটি পাওয়ার। করোনা সংক্রমণজনিত মন্দায় অর্থনীতিকে জিইয়ে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নাগরিকদের জন-প্রতি ১,২০০ ডলারের চেক পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অব্যবস্থাপনায় অনেকে চেক পেয়েছেন, অনেকে পাননি। অনেক বছরের পুরানো অভিবাসী চাম দম্পতি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। চেক পাওয়ার হক তাঁদের আছে। চেক আমি নিজেও পাইনি, আমার জানাশোনা আরো অনেকেও পাননি। পরিস্থিতি যেভাবে চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনার দিকে আগাচ্ছে, কী বলব, বৃদ্ধাকে কোনো ভরসা দিতে পারি না। খিন্ন মনে বিদায় নিয়ে ফিরে আসি গাড়িতে।

মরগ্যান ডিসইনফেকশনের শিশিটি বাড়িয়ে দেন। আমি লোশন দিয়ে হাত পরিষ্কার করে গাড়িতে উঠি। তিনি স্টার্ট দিতে দিতে বলেন, ‘লেটস্ কাম ব্যাক টু দিস হাউস টুমরো। আমি পর্টেবল লনমোয়ার নিয়ে আসব। তুমি বৃদ্ধাকে রিং করে পার্মিশন নিয়ে রাখো। আমি তাঁর অঙিনার আগাছাময় ঘাসগুলো কেটে দিতে চাই।’

মাথায় একটি আইডিয়া খেলে যায়। চাম দম্পতির ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখা আছে খা-খা ভাষায় লেখা তালপাতার কয়েকটি পুঁথিপত্র। মিসেস লেবু-কের নৃত্যের পোশাক পরা যুবতী বয়সের একটি ছবির কপির সাথে তালপাতার পুঁথিপত্রের দুটি ছবি তুলে নিতে পারলে—স্থানীয় পত্রিকার জন্য অনায়াসে একটি ফিচার দাঁড় করানো যায়। আমি সম্ভাবনা নিয়ে ভাবি, কিন্তু ভেতর থেকে সায় পাই না। ত্রাণকাজের হিল্লা ধরে আমার একটি লেখার প্রয়োজনে এ দম্পতির ব্যক্তিগত সম্পদকে ব্যবহার করব, কাজটা কি নৈতিকভাবে সঠিক হবে?

আমরা যে রেফিউজি পরিবারদের খাবার দিতে যাচ্ছি, তাঁরা বাস করছেন শহর থেকে সামান্য দূরে—সস্তা হাউজিং ফেসিলিটিতে। মরগ্যান অই দিকে টার্ন নেন। সিগনালের লাল বাতিতে থামতেই মি. ইদ্রিসা বেনী ইসামের কাছ থেকে টেলিফোন আসে। তাঁরা অপেক্ষা করছেন। মরোক্ক থেকে অনেক বছর আগে অভিবাসী হয়ে এদেশে আসা মি. ইদ্রিসার ছেলে আবদেল বেনী ইসামের মৃত্যু হয়েছে সম্প্রতি কারাগারে, সম্ভবত করোনাক্রান্ত হয়ে। মরগ্যান ড্রাইভ করতে করতে মি. ইদ্রিসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। মরোক্কর তানজিয়ার্স অঞ্চলের মানুষ ইনি। রাজবন্দী হয়ে সাত বছর কাটিয়েছেন ওই দেশের একটি কুখ্যাত কারাগারে। তারপর রাজা পঞ্চম মোহাম্মদের সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে কিভাবে যেন ইমিগ্রেশন নিয়ে এদেশে আসেন। এক সময়ে ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে সাভানা নগরীতে আগত পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতেন—মরোক্কর কুটিরশিল্পজাত পণ্য। বয়সের কারণে আজকাল আর দোকানটি ম্যানেজ করতে পারেন না। গেল ঈদেও মসজিদ-ভিত্তিক পার্টিতে তিনি নিয়ে এসেছিলেন সবচেয়ে মজাদার কুসকুস। এবারকার দুর্বিপাকে খাবারের অনটনে ভুগছেন মি. ইদ্রিসার পরিবার। তাঁরা স্টিমুলাস চেকও পাননি। তাঁর ছেলে আবদেল বেনী ইসাম কাজ করত একটি শপিংমলে। ওখানকার একটি দোকানের কিছু সৌখিন পণ্য খোয়া গেলে সিসি টিভির সূত্র ধরে গ্রেফতার হয় আবদেলসহ আরো দুটি শ্বেতাঙ্গ তরুণ। মামলায় লইয়ারের আইনি মারপ্যাঁচে শ্বেতাঙ্গ ছেলে দুটি ছাড়া পায়। কিন্তু লইয়ার জোগাড় করার মতো আর্থিক সঙ্গতি মি. ইদ্রিসার ছিল না। তাই, সম্ভবত মিথ্যা মামলায় তাঁর সন্তান আবদেল চার বছর মেয়াদের সাজা পায়। কারাগার থেকে টেলিফোন করে সে জ্বর-কফ-কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগার সংবাদ তাঁর পিতাকে জানায়। কারাগারে এ সময় আরো অনেক কয়েদির শরীরে ফুটে উঠেছিল এ ধরনের রোগলক্ষণ। বেশ কয়েক জন কয়েদির মৃত্যু হয় অবশেষে। টেস্টিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই নিশ্চিত করে বলার কোনো উপায় নেই যে, এরা মারা গেছেন করোনা সংক্রমণে। আবদেলের মৃত্যুর আগে মি. ইদ্রিসা সন্তানের সঙ্গে দেখা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কারাগারের ভিজিট আওয়ার বাতিল করা হয়েছিল। অতঃপর মি. ইদ্রিসা কারা-কতৃপক্ষের অনুমতি চেয়েছিলেন, যাতে ছেলেকে টেলিফোনে তওবা পড়াতে পারেন। তাঁকে এ ধর্মীয় অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়।

আমরা এসে পৌঁছি সস্তা হাউজিং ফেসিলিটিতে। পেভমেন্টের পাশে একটি বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছেন মি. ইদ্রিসা। আমাদের সালামের আলেক দেন তিনি, হাসেন, হাত নাড়েন, কিন্তু কিছু বলেন না। লাঠি হাতে অন্যমনস্ক হালতে বসা মরোক্কান কেতার অজানুলম্বিত সফেদ পোশাকপরা মানুষটিকে চিন্তামগ্ন সুফি-দরবেশের মতো দেখায়। আমরা খাবারের প্যাকেটগুলো পাশের আরেকটি বেঞ্চে রাখি। তিনি হাত তুলে আমাদের আশ্বস্ত করে বলেন, রেফিউজিদের অ্যাপার্টমেন্টগুলোর দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সোমালিয়ার শরণার্থী আহমদ গুদ একটু পর এসে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে খাবার ক্যারি করে পৌঁছে দেবে।

একটু দোনামোনা করে অবশেষে বলেই ফেলি, ‘মি. ইদ্রিসা, আই অ্যাম সো স্যারি...সিনসিয়ার কনডোলেন্সসেস্ ফর ইয়োর সন’স ডেথ।’ বোবাদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি আমাকে তাঁর ছেলের মাগফেরাতের জন্য মোনাজাত করতে বলেন। আমি তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিই—ঘরে ফিরে প্রার্থনা করব। মরগ্যান এগিয়ে এসে বিনীতভাবে বলেন, ‘আমি ধর্মে মুসলমান নই, তবে ইসলাম ধর্মের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আপনি যদি অনুমতি দেন, আমি আপনার ছেলের জন্য প্রার্থনা করতে চাই।’ ঘাড় হেলিয়ে মি. ইদ্রিসা সম্মতি দেন। মি. মরগ্যান দুহাত তুলে প্রার্থনা করেন, আমি ও ইদ্রিসা আমিন বলে দোয়ায় শরিক হই।

সোমালিয়া থেকে আগত দীর্ঘদেহী নওজোয়ান আহমদ গুদ এসে আমাদের ঈদ মোবারক বলে। ছেলেটি শহরের একটি বারবার সেলুনে চুল কাটার কাজ করত। প্রায় দুইমাস লকডাউনের পর শহরের সেলুন ইত্যাদি খুলেছে। জানতে চাই, ‘হাউ ইজ ইয়োর জব গোয়িং? কাজে গিয়েছিলে কি?’ নেতিবাচকভাবে হাত উল্টিয়ে আহমদ জানায়, গেল কয়েকদিন ধরে সেলুন খুলেছে, তবে এখনো কাস্টমাররা সেলুনে আসতে সাহস পাচ্ছে না। সে প্রতিদিন একবার করে সেলুনে হাজিরা দিচ্ছে, কিন্তু চুল কাটার লোকজন না আসলে মাথাওয়ারি পারিশ্রমিক পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমি দূরত্ব বজায় রেখে খেলনাগুলো খাবারের সাথে কোন কোন অ্যাপর্টমেন্টে পৌঁছে দিতে হবে তা বুঝিয়ে বলি। আহমদ একটি ঝুড়িতে প্যাকেটগুলো তুলছে। আমি এক পা সামনে গিয়ে জানতে চাই, ‘হাউ ইজ ইয়োর ফাদার মি. মোহাম্মদ গুদ?’ সে ‘আই উইল আনসার ইউ ইন আ মিনিট,’ বলে ইশারায় জানায় প্যাকেটগুলো গুছিয়ে নিয়ে সে আমাকে জবাব দিচ্ছে। আমি এ সুযোগে সংক্ষিপ্তভাবে মরগ্যানকে তার বাবা মোহাম্মদ গুদের করোনাক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠার ঘটনাটি জানাই। ডাক্তাররা প্রায় আশি বছরের এ বৃদ্ধের রিকভার করার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পুরো চার সপ্তাহ যুঁজে যেন জাদুবলে তিনি রিকভার করেন। হাসপাতাল থেকে তাঁর রিলিজের দিন নার্স ও ডাক্তাররা জড়ো হয়ে হাততালি দিয়ে তাঁর সুস্থ হওয়ার বিষয়টি সেলিব্রেট করে। ঘটনাটি আমিও প্রত্যক্ষ করি স্যোশাল মিডিয়ায়। ঝুড়িতে প্যাকেটগুলো গুছিয়ে আহমদ গুদ বলে, ‘মাই ফাদার সেন্ড ইউ আ ম্যাসেজ মি. সুলতান। তুমি যে খাবার দিয়ে গিয়েছিলে, শুকনা বিস্কিটগুলো বাবার পছন্দ হয়নি। তিনি খেতে চাচ্ছেন এক পেয়ালা দুধ।’ আমি দুধ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিই। আহমদ গুদ আতরের ছোট্ট একটি শিশি বের করে তাতে তুলা গুঁজতে গুঁজতে বলে, ‘বাবা তোমাদের জন্য সামান্য আতর পাঠিয়েছেন।’ সচেতন হয়ে উঠি যে, আহমদ গুদের হাত থেকে আতর নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক দূরত্বের নীতিমালা, আমি ও মরগ্যান পরস্পরের দিকে তাকাই, কিছু বলি না, অতঃপর খোশবুদার তুলা নাকে দিতে দিতে ভাবি—ঈদের দিন না হয় সামাজিক দূরত্বের সামান্য ব্যতিক্রমই হলো।

   

কওমি মাদরাসা নিয়ে সিদ্দিকুর রহমান খানের অনবদ্য গ্রন্থ

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কওমি ঘরানা নিয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থ না থাকার আক্ষেপ ঘোচালো ‘কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা’। গ্রন্থটির লেখক সিদ্দিকুর রহমান খান। শিক্ষা সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময়ে গভীর অনুসন্ধানী একগুচ্ছ প্রতিবেদনের সঙ্গে হালনাগাদ সব এক্সক্লুসিভ তথ্য জুড়ে তিনি বইটি সাজিয়েছেন। অতি বিরল ও গোপনীয় নথির সংযোজন এই প্রকাশনাকে আরো অতুলনীয় করে তুলেছে। কওমি মাদরাসা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো বইয়ের জন্য যারা হা-পিত্যেশ করছেন, তাদের হাতে স্বস্তির বারতা হয়ে উঠতে পারে এই বই।

বইটির ফ্ল্যাপে লেখা আছে, একগুচ্ছ শঙ্কা ও প্রশ্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট জুড়ে। উইকিলিকসের তারবার্তাও বাইরে নয়। প্রশ্নগুলো প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ডালপালা গজিয়েছে সর্বত্র। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উত্থানপর্বের আগে-পরে এই চিত্রটিও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। সংসদের ভেতরেও প্রশ্ন ছিলো কওমি মাদরাসার উত্থান নিয়ে। এ ধারার শিক্ষক-শিক্ষার্থী অভিভাবকদের এন্তার প্রশ্নেরও সদুত্তর ছিলো না।

এ সংক্রান্ত সব জবাবই ছিলো ধোঁয়াশামাখা। জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়াতেও সেক্যুলার শব্দ বাতিল করিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন কওমিধারার ধারক-বাহকরা। অর্থের সন্দেহজনক উৎস, উসকানি, মৌলিক সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ --এসব প্রশ্নবোধকের জবাব খুঁজতেই একজন সিদ্দিকুর রহমান খানের অনুসন্ধান। সদরে, অন্দরে, সর্বক্ষেত্রে। কী হয়েছিল খালেদা জিয়া, ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন ও শেখ হাসিনা সরকারের জমানায়?

সাংবাদিক ও লেখক সিদ্দিকুর রহমান খানের সৃজনশীলতার শুরু কবি জীবনানন্দ দাশের আজন্মসুধা ধানসিঁড়ির প্রতিবেশী নলছিটির সুগন্ধার পাড়ে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক স্নিগ্ধ হাওয়ায় গা ভাসিয়েছেন কাগজে লেখার স্বপ্নে। তারপর তার কলম এগিয়েছে অভিজ্ঞতার অম্ল-মধুরতায়। লিখে লিখে জীবিকায়নের মাধ্যমটা সব সময়ই ছিলো ইংরেজি। দৈনিক নিউ এইজ, ইনডিপেন্ডেন্ট এবং বাংলাদেশ টুডেসহ কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিকে।

শিক্ষার বর্ষসেরা রিপোর্টার হিসেবে একাধিকবার মিলেছে ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতির সৌজন্যে’ পুরস্কার। রিপোর্টার হিসেবে পেয়েছেন আরো অনেক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। আর শিক্ষার নানা বিশ্লেষণ বাংলায় গণপাঠকের মন ও মানসে পৌঁছে দিতে নিজের সম্পাদিত দৈনিক শিক্ষাডটকম ছাড়াও বেছে নিয়েছিলেন ইত্তেফাক, প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকাল, সকালের খবরসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক।

বর্তমানে শিক্ষা বিষয়ক দেশের একমাত্র জাতীয় প্রিন্ট পত্রিকা দৈনিক আমাদের বার্তার প্রধান সম্পাদক এবং শিক্ষা বিষয়ক একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকম এর তিনি সম্পাদক ও প্রকাশক।

সিদ্দিকুর রহমান খানের লেখা ‘কওমি মাদরাসা: একটি অসমাপ্ত প্রকাশনা’ বইটি এবারের বইমেলায় পাওয়া যাবে ‘স্বদেশ শৈলীর স্টলে (স্টল নং ৫০৭)। 

;

বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অমর একুশে ও তার চেতনাবাহী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযথ মর্যাদার সাথে পালিত হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাংলাভাষী রাজ্যগুলোতে এই ঐতিহাসিক দিবসকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদ্‌যাপন করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে যেভাবে রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর ও জব্বার শহিদ হয়েছিলেন। একইভাবে রাজ্যভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে পুলিশের গুলিতে কমলা ভট্টাচার্যসহ এগারোজন শহিদ হন।

বাঙালির আত্মরক্ষা ও আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রশ্নে ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত অভিজ্ঞান, অঞ্চল নির্বিশেষে, সর্বস্তরের বাঙালির ঐক্যমন্ত্র। সর্বভারতীয় বাংলাভাষামঞ্চ ২০১৫ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পাশাপাশি ২০ ফেব্রুয়ারি ভাষা গণতন্ত্র দিবস পালন করে আসছে।

এ বছর একুশে চেতনা পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র ও সর্বভারতীয় বাংলাভাষামঞ্চের উদ্যোগে ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা ভবনের সিনেট হলে দু'দিন ব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী রাজ্যগুলোর বহু ভাষাসংগ্রামী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিশিষ্ট জনেরা।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য-তাত্ত্বিক, সমালোচক ও কবি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড.তপোধীর ভট্টাচার্য সেখানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং সম্মেলনের উদ্দেশে পূর্বেই প্রেরিত তাঁর শুভেচ্ছা বাণী 'ঐকতান গবেষণা পত্র'-এ মুদ্রিত হয়।

অধ্যাপক ভট্টাচার্যের অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর প্রজ্ঞাময় শুভেচ্ছা বাণী বার্তা২৪.কম-এ প্রকাশিত হলো।

'সমুদ্র দূরত্বে কথা বলি আমরা
আকাশ দূরত্বে কথা বলি আমরা
নক্ষত্র দূরত্বে কথা বলি আমরা
যতক্ষণ কথা বলি ততক্ষণ
পরস্পর নিবিড় আশ্রয় ...'

[তুষার গায়েন॥ অয়ি তরঙ্গমালা-১]

এসময় পরস্পরকে নিবিড় আশ্রয় দেওয়ার, আসুন বাঙালি ভাইয়েরা, নিজেদের মধ্যে কথা বলুন, আশ্রয় খুঁজে নিন আমাদের ভাই ও বোনের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আর উনিশে মে : আমরা কি ভুলিতে পারি বলেও আদৌ মনে রেখেছি কি? আসুন,বাংলাভাষী ভাই ও বোনেরা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জাতির বিক্ষত মুখাবয়ব অবলোকন করি !

পুণ্যলাভের ফাঁদে কীটাণু পতঙ্গ—ধারালো কৃপাণ
প্রতিদিন ধড়হীন দেহ ফেলে যায় রাস্তায়!

[তুষার গায়েন॥ অয়ি তরঙ্গমালা-৫]

এই ভয়াবহ দৃশ্য তৈরি করে চলেছে সময়। রাহুগ্রস্ত পৃথিবীতে যত হলাহল উগরে দিক,আসুন বাংলাভাষী ভাই ও বোনেরা, আমরা আত্মপ্রতারক অন্ধকার মুছে দিয়ে নিজেদের পুনরাবিষ্কার করি।

আসুন, বাংলাভাষী ভাই ও বোনেরা,
আমরা পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসার পুনর্জাগরণ ঘটাই। কারণ,
'অন্তর গভীরে তবু বয়ে যায় প্রেমনদী
স্তরীভূত শিলার অতলে বিশুদ্ধ পানীয় জল
নিজেকে নিঃশব্দে বহমান রেখে দিতে জানে ...'

[তুষার গায়েন॥ অয়ি তরঙ্গমালা-৭]

আসুন, জাতিসত্তার দুর্নিবার পিপাসা মেটাতে প্রেমনদী বইয়ে দিন। খুঁজে নিন অস্তিত্বের গভীরে বহমান বিশুদ্ধ পানীয় জল। জয় হোক বাঙালির, কলুষিত বিভাজনপন্থা পর্যুদস্ত হোক॥

'সবাই যখন জীবন্মৃত অন্ধকারে', বাঙালি জাতির প্রতি বিদ্বিষ্ট স্বৈরতন্ত্রী শক্তি যখন আতঙ্ক ছড়াতে গিয়ে নিজেই কাঁপছে ভয়ে থরথর, বাঙালির ঘরে ঘরে চতুর্দশীরা একাই লড়ছে চেতন ভরে। চোখ মেলে আসুন, দেখি, 'ওষ্ঠ জুড়ে দারুণ ফোটা কথকতা'! সবাই মিলে যেন নতুন ভোরের সূচনা করতে পারি!

বাঙালি জাতির চিরকালীন অভিভাবক রবীন্দ্রনাথ কেন লিখেছিলেন 'কালান্তর'-এর এই দিগদর্শক বাণী, আসুন নতুন করে আবার বুঝে নিই:

'বঙ্গবিচ্ছেদ ব্যাপারটা আমাদের অন্নবস্ত্রে হাত দেয় নাই, আমাদের হৃদয়ে আঘাত করিয়াছিল। সেই হৃদয়টা যতদূর পর্যন্ত অখণ্ড ততদূর পর্যন্ত তাহার বেদনা অপরিচ্ছিন্ন ছিল। আসুন, নিজেদেরই প্রশ্ন করি: আমরা কি সেই হৃদয়কে টুকরো করিনি? ধর্মান্ধতার বিষবাষ্পে আমাদের চেতনাকে কি আমরাই আচ্ছন্ন হতে দিইনি?

বাঙালির জাতিসত্তার নিয়ামক তার ভাষা, তার বর্ণমালা, তার ভাষাশীলিত সংস্কৃতি। ধর্ম যার যার, সংস্কৃতি ও ভাষা সবার। তাই বাঙালি শুধুই বাঙালি। হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রিষ্টীয় নয়; প্রাগার্য-অনার্য-আর্য রক্তধারার বহু সহস্রাব্দ ব্যাপ্ত সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতির বর্ণভেদ মিথ্যা; কেউ বড়ো নয়, কেউ ছোট নয়। সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে আমাদের বাংলামায়ের অভিষেক চিরদিন হয়েছে, চিরদিন হবে। আমাদের পথ বিভেদের অন্ধকারে নয়, আলোকিত সম্মিলনের।

যারা বাঙালির ঐক্য ভাঙতে মরিয়া, তারাই আমাদের হিন্দু-মুসলমান আর উঁচুজাত-নিচুজাতে বিভক্ত করতে চক্রান্ত জারি রেখেছে। বাঙালির শত্রুদের চিনে নিন, সংহতি দিয়ে পরাস্ত করুন।

বাঙালি জাতিসত্তার বহু সহস্রাব্দ ব্যাপ্ত ইতিহাসকে বিকৃত করার ও মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন। বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাসী বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত করাই হোক এসময় আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

'যে আপনাকে পর করে সে পরকে আপনার করে না, যে আপন ঘরকে অস্বীকার করে কখনোই বিশ্ব তাহার ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করিতে আসে না।' (রবীন্দ্রনাথ: 'পরিচয়')।

তাই সর্বভারতীয় বাংলাভাষামঞ্চ বিপন্ন ছিন্নবিচ্ছিন্ন আত্মবিস্মৃত স্বজাতিকে আপন ঘরের নিকট আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করার রীতিকে সর্বজনীন করে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।

;

ভাষার লড়াই কালে কালে



সায়েম খান
ভাষার লড়াই কালে কালে

ভাষার লড়াই কালে কালে

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাচীন ডেনমার্কের ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে একটি সুপ্রাচীন, সুমিষ্ট ভাষার প্রচলন ছিল। ভাষাটির নাম ফ্যারোইজ। ড্যানিশ জাতি আজ থেকে ৫০০ বছর আগে সেই দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের উপর ভাষাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের উপর ড্যানিশ ভাষা চাপিয়ে দিল। তাদের গির্জা, উপাসনালয় কিংবা পাঠশালাগুলোতে ফ্যারোইজ ভাষা বাদ দিয়ে ড্যানিশ ভাষা ব্যবহার আইন বলে বিবেচিত হল। শুরু হল ফ্যারোইজদের সাথে ড্যানিশদের ভাষাগত বিবাদ। সেই থেকে আজ অবধি ফ্যারোইজরা তাদের এই ভাষাকে আলাদা করে চর্চা ও লালন করে আসছে। ফ্যারোইজ ভাষার রয়েছে নিজস্ব শব্দ। এখনও সংযোজিত হচ্ছে নতুন শব্দগুচ্ছ। গল্প, গান আর নাচে সমৃদ্ধ একটি ভাষা ফ্যারোইজ। ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা তাদের প্রাণের ভাষাকে আজও মিশ্রিত হতে দেয়নি অন্য ভাষার সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে। একবিংশ শতাব্দীতেও লড়াই করে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পরিচিত করতে ফ্যারোইজ ভাষার মাধ্যমে।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, আর্য সংস্কৃতির বিস্তার এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের সময়ে সংস্কৃত ভাষা ছিল শক্তিশালী মাধ্যম। আজ থেকে ৪০০০ থেকে ৫০০০ বছর আগে ইন্দো-আর্য গোষ্ঠী থেকে সংস্কৃত ও আবেস্তীয় ভাষার উৎপত্তি। এই দুটি ভাষা কালের পরিক্রমায় দুই ভাগে বিভক্ত হতে থাকে কিছু শাব্দিক অর্থের বিভেদের কারণে। উদাহরণস্বরুপ, সংস্কৃতে "দেবা" শব্দের অর্থ যেখানে দেবতা, সেখানে আবেস্তীয় ভাষায় "দেবা" শব্দের অর্থ দাড়ায় "শয়তান"। যা দুই জাতের মধ্যে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব একটি বড় কারণ হয়ে দাড়ায়। ইন্দো ও আর্যদের ভাষাগত ও জাতিগত উৎপত্তির এক ও অভিন্ন সংযোগ থাকার পরেও শুধুমাত্র ভাষাগত সমস্যার কারণে ইন্দো ও আর্য নামক দুটি স্বাতন্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। ঠিক একই ধারায়, ভারতীয় উপমহাদেশে মোঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন যখন হয়, তখন থেকেই সামাজিকভাবে গুরুত্ব হারিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে ভারতবর্ষের আদিমতম "সংস্কৃত"ভাষা। এখন পর্যন্ত এই ভাষাটি পূরাণ, বেদ, উপনিষদ ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্রের ভাষা হিসাবে "সংস্কৃত" বিবেচিত। মোঘলরা যখন ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু করতে থাকল, তখন থেকেই সংস্কৃত ভাষার সামাজিক প্রচলনের আবেদন কমতে থাকে। ঠিক একই ভাবে, বৃটিশরা যখন মোঘলদের হটিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের শাষনামল শুরু করল তারাও শুরুর দিকে তাদের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে প্রচলন থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষাগত জটিলতার কারণে ফার্সীকে বাদ দিয়ে ইংরেজীর প্রচলন শুরু করেছিল এবং তখন থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মোঘলদের সম্ভ্রান্ত ফার্সী ভাষা বিলুপ্তি ঘটতে থাকে।

পৃথিবীতে ঔপনিবেশিক যুগের প্রারম্ভ থেকে আমরা দেখে এসেছি, যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে ক্ষমতা ও রাজ্য দখলের পর ক্ষমতা দখলকারী শাসকশ্রেণী, পরাজিত আদি জনগোষ্ঠীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। শাষকশ্রেণীর ধারণা, ক্ষমতা ও দখল চিরস্থায়ী করার জন্য সবার আগে নিশ্চিহ্ন করতে হবে শাষিত প্রজাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার যেসব দেশ বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার ছায়াতলে ছিল, সেসব দেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার চর্চা ও প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো। যারা ইংরেজি জানত ও শিখত তাদের সামাজিক ভাবে গুরুত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। তৎকালীন বৃটিশ-বেনিয়াদের সৃষ্ট এলিট শ্রেণীর সাথে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের মেলামেশা ছিল খুব সহজ। ঠিক তেমনি, ফরাসি ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশে অদ্ধাবধি ফরাসি ভাষার আধিপত্য বিরাজমান।

প্রাচীন বুলগেরীয় ভাষার প্রাচীন যুগ বিস্তৃত ছিল ৯ম থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত। ১৬শ শতকের শুরুতে বিভিন্ন স্তরে শুরু হয় এই ভাষার আধুনিক যুগ। ইউরোপের অতি প্রাচীন এই ভাষা নিয়েও ১৮শ শতকে শুরু হয়েছিল আন্দোলন সংগ্রাম। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বুলগেরীয় জনগণের সংগ্রাম এখনও ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরুতে অসমীয় ভাষাকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করার পর শুরু হয় আন্দোলন বিক্ষোভ। ১৯৬১ সালের ১৯মে ভাষার জন্য এই বিক্ষোভে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষা বিপ্লবী। ১১ বিপ্লবী শহীদের প্রাণ উৎসর্গের কারণে এখনও ১৯ শে মে’কে আসামে ভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন ও আদি ভাষা "বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী" ভাষা যেন বিলুপ্তির প্রতিবাদে ১৯৯৬ সালে ১৬ই মার্চ শহীদ হন সুদেষ্ণা সিংহ। তাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় ভাষা শহীদ বলা হয়ে থাকে। ভারতে ভাষার জন্য এসব আত্মত্যাগের কারণে বর্তমানে ২২টি ভাষাকে সরকারি ভাষা ও ৪টি ভাষাকে ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। আসামের বরাক উপত্যকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের দীর্ঘ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সুদেষ্ণা সিংহের মহান আত্মত্যাগের কারণে ১৬ মার্চ আসাম জুড়ে একটি স্মরণীয় দিন হিসাবে পালন করা হয়।

১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির একটি ইহুদি সাহায্যকারী সংস্থা যার নাম ছিল হিলফসভেরেইন ডের ডিউচচেড জুডেন। এই সংস্থাটি তৎকালীন ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের জন্য একটি টেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সেই জার্মান সংস্থা শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইহুদি ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেয় জার্মান ভাষা। তখন ইহুদীদের শিক্ষার ভাষা কি হবে সে নিয়ে জার্মান ভাষা সমর্থনকারী ও হিব্রু ভাষাভাষী ইহুদীদের মধ্যে একটি প্রকাশ্য বিবাদ তৈরি হয়। ইসরাইলের হাইফা সিটি মিউজিয়ামে এ ঘটনা নিয়ে স্বাতলানা রেইনগোল্ড নামে এক চিত্রশিল্পী ২০১১ সালে "ভাষার যুদ্ধ" নামে একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।

ভাষার জন্য পৃথিবীতে প্রথম গুলিবর্ষণ হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহ যখন ঘোষণা করলেন উর্দুই হবে পূর্ব-বাংলার সরকারি ভাষা তখন থেকেই মুহুর্মুহু প্রতিবাদের উঠতে শুরু করল। প্রতিবাদ-সংগ্রামের এক পর্যায়ে বাংলা ভাষার জন্য শহীদ হয় সালাম, জাব্বার, রফিক, বরকতের মত তাজা প্রাণ। সেই মর্মস্পর্শী ঘটনাকে সাক্ষী রেখে এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আজও বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস"।

ভাষা এমন এক অধিকার যা কখনো হস্তক্ষেপযোগ্য নয়। ভাষা নিয়ে বিভেদ, বিবাদ, প্রতিবাদ, সংগ্রাম হয়েছে দেশে দেশে, কালে কালে। একটি সভ্যতার ক্রমবিকাশে ভাষা অপরিহার্য। ভাষা হল মানবসভ্যতার স্পন্দন। ভাষা নিয়ে লড়াই নয়। ভাষা হোক মুক্তি ও মানবতার জন্য। ভাষা হোক ভালবাসার জন্য।

;

বইমেলায় তমসা অরণ্যের বই- নাই সন্তানের জননী

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে বইমেলা-২০২৪ উপলক্ষে প্রকাশিত হলো কবি ও লেখক তমসা অরণ্যের গল্পের বই – নাই সন্তানের জননী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স ও স্নাতকোত্তর কবি ও লেখক তমসা অরণ্য আপনমনে ও নিভৃতে সাহিত্যচর্চা করেন।

তার ফেসবুক ওয়ালে ঢুকলেই দেখা যায়, নিজের মনের মগ্নতায় ডুবে আপনমনে লিখে চলেন ফাউন্টেন পেনে। তার সাহিত্য চর্চা ও শব্দচয়নে মুন্সিয়ানার ভাব। মনে হয়, রবিঠাকুর, জীবনানন্দ দাশের মতো আত্মমগ্নতায় ডুবে রয়েছেন।

রাতে নিভৃতে দিনের পর দিন লিখেছেন কালো কালির আঁচড়ে একেকটি কবিতা কিংবা মনের কোনো ভাবনা। পাঠক মাত্রই বুঝতে পারেন কবি ও লেখক তমসা অরণ্য বেখেয়ালে লিখে চলেছেন ঘাসফড়িং বা রাতের আঁধারে জ্বল জ্বল করা মাকড়শার জালে ধ্যানমগ্ন মাকড়শার মনোকথন। মানুষের ভাবনাকে ছাড়িয়ে লেখক নিয়ে চলেন এক অনাঘ্রাত পৃথিবীতে। প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষই শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠে তমসা অরণ্যের লেখার উপজীব্য!

সে রকমই সাধারণ মানুষের জীবনকথা উঠে এসেছে লেখক তমসার ‘নাই সন্তানের জননী’ গল্পগ্রন্থটিতে। বইয়ের উপজীব্য সম্পর্কে লেখক তমসা বলেন, একজন লেখকের থাকতে হয় দেখার চোখ, লেখার হাত, অনুভূতিসম্পন্ন হৃদয় ও কল্পনাশক্তির জয়ের সক্ষমতা।

তিনি বলেন, এগুলোর সূত্র ধরেই যাতে মনোযোগ দিয়েছি, তা ছিল- মানুষ ও সমাজপাঠ। তারই পথ ধরে আমার গল্পগুলোর ‘সব চরিত্র কাল্পনিক নয়’, বরং ‘নাই সন্তানের জননী’ গল্পগ্রন্থের প্রতিটা গল্পেরই কোনো না কোনো চরিত্র বাস্তব এবং কাছ থেকে কিংবা দূর থেকে দেখা। আর কিছু না হোক, অন্তত চরিত্রগুলোর সঙ্গে আড্ডা দিতে হলেও বইটি পড়া যেতেই পারে।’

‘নাই সন্তানের জননী’ গল্পগ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন আইয়ুব আল আমিন। প্রকাশ করেছে অনুপ্রাণন প্রকাশন। অমর একুশে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে স্টল নম্বর ৮৫-৮৬। ২৫% ছাড়ে বইটির দাম পড়বে ২৬২ টাকা।

তমসা অরণ্যের বই প্রকাশের পর তার এক বন্ধু ফেসবুকে মন্তব্য করে লিখেছেন- তমসা অরণ্য খুব নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ মানুষ, যার ফলে ওর বইয়ের কথা আমি নিউজফিড থেকে জানতে পারি অর্থাৎ সে আমাকেও ব্যক্তিগতভাবে জানায়নি।

এমনকি বইয়ের প্রচারণায় ও বলছে, বই হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে ভালো মনে হলে তবেই কিনতে! আমি নেক্সট টাইম মেলায় গেলে তার বইটা কিনবো। নিজের বান্ধবী বলে না। প্রচ্ছদের বেড়ালের ছবি আর বইয়ের নাম দেখে একটা গল্প অনুমান করতে পারছি, এই আগ্রহ থেকে। তমসা অরণ্যের বইয়ের জন্য অশেষ শুভ কামনা রইলো।"

তমসা অরণ্যে লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে চাইলে যে কেউ তার ফেসবুক ওয়ালে ঢুঁ মারতেই পারেন। তার লেখার পরিমিতিবোধ ও অনিন্দ্য সুন্দর হাতের লেখার সঙ্গেও পরিচয় ঘটবে পাঠকের। তমসা অরণ্যের ফেসবুক আইডি- Tomosha Aronnya (তমসা অরণ্য)

;