দস্তার কফিনে বন্দী ছেলেরা



সেভৎলানা আলেক্সেয়িভিচ ।। অনুবাদ: সঞ্জয় দে
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

নোবেল বিজয়ী বেলারুশিয়ান সাহিত্যিক সেভৎলানা আলেক্সেয়িভিচ রচিত ‘দস্তার কফিনে বন্দী ছেলেরা’ গ্রন্থটি কোনো প্রচলিত উপন্যাস নয়; সুইডিশ একাডেমির ভাষ্যমতে এই গ্রন্থটি বরং প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বয়ানে রচিত ইতিহাস। সে ইতিহাস আবেগের, সে ইতিহাস আত্মার। সেভৎলানা যুদ্ধে যাওয়া সৈনিক, ট্যাংকচালক, সেবিকা, সন্তানহারা মা, স্ত্রী, বোন—এমন বহু মানুষের গল্প শুনেছেন। তাদের সেই গল্পগুলোকে, না বলা কথাগুলোকে এক এক করে অক্ষমালায় সাজিয়ে যুদ্ধের এক ভিন্ন ধরনের চিত্রপট আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। অসংখ্য গল্পের মাঝ থেকে জুরালেভ নামক এক ছত্রীসেনার মায়ের গল্পটি এখানে নিবেদন করা হলো।


দস্তায় মোড়া কফিনটির পাশে বসে বিলাপ করে বলছিলাম, ‘ওখানে কে শুয়ে রে? আমার ছোট্ট সোনাটা নাকি?’ বারবার ওই একই প্রলাপ বকেই যাচ্ছিলাম—‘কে শুয়ে ওখানে? আমার মানিক, তুই কি?’ সবাই ভাবছিল, আমি বুঝি পাগল হয়ে গেছি।

তারপর সময় বয়ে যায়। একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, খুঁজে বার করব আমার পুত্রের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। সেনাবাহিনীর স্থানীয় নিয়োগ দপ্তরে গেলাম।

‘আমাকে অন্তত এটুকু বলুন, ঠিক কোথায় আর কিভাবে ছেলেটার মৃত্যু হয়েছিল’—ওদের কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বললাম, ‘ও মরে গেছে—এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমি নিশ্চিত—সেদিন একটা খালি কফিন কবর দিয়েছিলাম, আর আমার প্রাণের ধনটা হয়তো বেঁচে আছে কোনো একখানে।’

দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার আমার ওপর খুব রেগে গিয়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন। ‘এটা রাষ্ট্রীয় একান্ত গোপনীয় বিষয়। আপনি এভাবে জনে জনে গিয়ে জানাতে পারেন না যে, আপনার ছেলে যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এভাবে ঢ্যাঁড়া পেটানো যে নিষিদ্ধ, সেটা জানেন না?’

ওর জন্মের সময়টা ছিল দীর্ঘ আর বেদনাক্লিষ্ট। কিন্তু প্রসবের পর যখন ছেলের মুখ দেখলাম, আমার সমস্ত যন্ত্রণা যেন নিমেষেই উবে গেল। ওর জন্যে দুশ্চিন্তা করতাম সেই প্রথম দিন থেকেই, কারণ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ও-ই যে ছিল আমার একমাত্র অবলম্বন। আমরা একটা ছোট কুঁড়েঘরে থাকতাম। একটা মাত্র ছোট ঘর। কেবল একটা খাট, একটা প্যারামবুলেটর আর দুটো চেয়ার পাতা যায় সে ঘরে। রেলওয়েতে চাকরি করতাম। আমার কাজ ছিল রেলের পয়েন্ট বদলানো। মাসে ষাট রুবল বেতন পেতাম। ওকে জন্ম দিয়ে যেদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলাম, সেদিনই রাতের শিফটে কাজে ফিরে যেতে হয়েছিল। প্যারামবুলেটরের ভেতরে করে ওকে কাজে নিয়ে যেতাম। আমার সাথে সব সময় একটা খাবার গরম করার হটপ্লেট থাকত। ওতে করেই ওকে খাওয়াতাম, তারপর ঘুম পাড়াতাম। এর ফাঁকে ফাঁকে ট্রেনের পয়েন্ট বদলাবার কাজগুলো চলত। একটু যখন বড় হলো, তখন ওকে বাড়িতে একা রেখে আসতাম। ওর গোড়ালিটা প্যারামবুলেটরের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে আসতাম, কিন্তু... এভাবে অবহেলায় বড় হবার পরও কিন্তু একটা চমৎকার ছেলে হিসেবে ও গড়ে উঠেছিল।

স্কুল শেষে ছেলেটা ভর্তি হয়েছিল পেত্রযাভদস্ক-এর একটা স্থাপত্য কলেজে। কারেলিয়া অঞ্চলে। ফিনিস সীমান্তের কাছে। একবারই মাত্র দেখতে গিয়েছিলাম ওকে। ছুটে এসে আমাকে চুমু খেল, তারপর দৌড়ে কোথায় যেন পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই হাসতে হাসতে ফিরে এসে বলল, ‘মেয়েরা আসছে’।

‘কোন মেয়েরা?’—অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

ও আসলে তখন ছুটে গিয়েছিল বান্ধবীদের খবর দিতে—মা এসেছে। সেই মা, যার অসংখ্য গল্প এতকাল এই মেয়েরা ওর মুখ থেকে শুনে এসেছে।

আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ কোনো উপহার দেয়নি। একবার মা দিবসে ও বাড়ি এলে স্টেশন থেকে আনতে গেলাম।

‘তোর ব্যাগটা আমি ধরছি।’—ওকে বললাম।

‘এটা অনেক ভারী, মা। তুমি বরং আমার পোর্টফলিও কেইসটা নাও। তবে সাবধানে ধোরো।’

আমি ওটা সাবধানেই ধরলাম। নিশ্চয়ই কোনো দরকারি ড্রয়িং আছে ভেতরে—ভাবলাম। বাড়ি ফেরার পর ও কাপড় বদলাতে গেল, আর আমি ব্যস্তসমস্ত হয়ে গেলাম রান্নাঘরে—পাইকেক বানাতে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, ছেলে আমার হাতে তিনটে তাজা রক্তিম টিউলিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায় ঈশ্বর! এই মার্চ মাসে কোথা থেকে এই টিউলিপ জোগাড় করল? পরে বুঝলাম, সেই পোর্টফোলিও বাক্সে আসলে কাপড় দিয়ে ভালো করে মুড়ে আমার জন্যে এই টিউলিপগুলো নিয়ে এসেছিল, যাতে ঠান্ডায় জমে না যায়! সেই প্রথম কেউ আমাকে ফুল উপহার দিল।

সে বছর গ্রীষ্মে ও ভবন নির্মাণের একটা স্পেশাল প্রজেক্টে কাজ করছিল। আমার জন্মদিনের ঠিক আগে আগে বাড়িতে এল। ‘আমি খুব দুঃখিত মা, আর কটা দিন আগে আসতে পারলাম না। তবে তোমার জন্যে ছোট্ট একটা জিনিস এনেছি’—বলে আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল। চোখ বুলিয়ে দেখি—একটা মানি অর্ডার। বারো রুবল, পঞ্চাশ কোপেকের।

‘মা, তুমি মনে হয় দশমিক গুলিয়ে ফেলছো। ওটা আসলে বারশ পঞ্চাশ রুবলের।’

ইহজন্মে এত টাকা হাতের মুঠোয় দেখিনি। আমি কী করে জানব কোথাকার দশমিক কোথায়?

ওর মনটা বড্ড মায়াভরা ছিল। প্রায়ই বলত, ‘মা তুমি তো রিটায়ার করছো, ওদিকে সামনে আমিও মেলা টাকা কামাব। আমাদের দুজনের ও-দিয়ে ভালোভাবেই হয়ে যাবে। তোমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমি তোমাকে বলতাম, বড় হয়ে আমি তোমাকে কোলে করে ঘুরব?’

ও কিন্তু সেটাই করেছিল। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির ছেলে আমার। আমি তখন ওর কাছে ছোট্ট খুকি। আমাদের দুজনেরই তো দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না, সেজন্যেই হয়তো নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে আমরা মা-ছেলে একে অপরকে ভালোবাসতাম। ওর ঘরে বৌ এলে কী হতো, কে জানে! মাঝে মাঝে ভাবতাম, বৌ না এলেই হয়তো ভালো হয়।

একদিন বাধ্যতামূলক সামরিক ট্রেনিংয়ের সমন এলো। ছেলেটার আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল—ছত্রীসেনা হবে। ‘মা, ওরা ছত্রীসেনা দলে লোক নিচ্ছে। কিন্তু আমায় নেবে কিনা কে জানে! আমি তো যে লম্বা! ওরা তো বলছে, আমার উচ্চতার কারণে নাকি প্যারাসুটের দড়ি ছিঁড়ে যাবে। আমার অবশ্য এই দলটিতেই যোগ দেবার বেশি ইচ্ছে।’

তো সেভাবেই একদিন ভিতেবস্ক ছত্রীসেনা ডিভিশনে নাম লেখাল। শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে আমি গেলাম। যখন শপথ বাক্য পাঠ করছে, তখন দেখলাম, ছেলেটা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখমণ্ডল—উচ্চতা-সংক্রান্ত সংকোচ-বিহীন।

‘মা, তুমি এত ছোট কেন বল তো?’—ও জিজ্ঞেস করেছিল।

‘তোর জন্যে আমার যে শূন্যতাবোধ, সেটি আমায় বাড়তে দেয়নি। ছোট করে রেখে দিয়েছে।’—একটু ঠাট্টা করে বললাম।

‘আমাদের দলকে আফগানিস্তানে পাঠাচ্ছে, মা। তবে আমি হয়তো যাচ্ছি না। তোমার একমাত্র সন্তান আমি। কী করে যাই! আচ্ছা আমি হবার পর আরেকটা মেয়ে হওয়ালে না কেন বলো তো?’

সেই শপথ অনুষ্ঠানে বহু মা-বাবা এসেছিল। হঠাৎ শুনি, মঞ্চ থেকে কে যেন ঘোষণা করছে, ‘শ্রীমতী জুরালেভা কোথায়? জুরালেভা, এদিকে আসুন। আপনার ছেলেকে অভিনন্দন জানান।’ আমি উঠে গেলাম ওকে চুমু খাবার জন্যে। কিন্তু এই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি ছেলের কপাল কী করে ছুঁই?

‘প্রাইভেট জুরালেভ, একটু ঝুঁকে দাঁড়াও, যাতে তোমার মা চুমু খেতে পারেন।’—কমান্ডেন্ট আদেশ করলেন জুরালেভকে। ওর কপালে চুমু খাবার মুহূর্তে একজন ফটোগ্রাফার পাশ থেকে ছবি তুলল, উর্দি পরা অবস্থায় ওর সাথে আমার একমাত্র ছবি।

সেদিন অনুষ্ঠান শেষে ওদেরকে কয়েক ঘণ্টা ফ্রি টাইম দেওয়া হলো। কাছেই একটা পার্কে গেলাম। ঘাসের ওপর বসার সময়ে ও যখন বুটজোড়া খুলে ফেলল, লক্ষ করলাম—ওর গোড়ালিতে রক্ত। ওদেরকে নাকি প্রতিদিন প্রায় ৩০ মাইল দৌড়ুতে হয়। পায়ের মাপ ১১ হলেও ওকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে নয়ের বুট। ছেলেটা প্রতিবাদ করেনি; বরং বাকিরা যেখানে পিঠে বেঁধে রাখা ব্যাগ থেকে কৌশলে আদ্দেক বালি ফেলে দিয়ে দৌড়ুত, সেখানে ও দৌড়ুত পুরো ওজন নিয়েই।

ভাবছিলাম ওর জন্যে বিশেষ কিছু একটা করব। তাই জিজ্ঞেস করলাম—‘কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাবি বাবা? আমরা দুজনে তো কখনো রেস্টুরেন্টে খাইনি।’

‘তুমি বরং আমাকে কয়েক পাউনড মিষ্টি কিনে দাও, মা। মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে।’

ব্যারাকে ফিরে যাবার সময় ঘনিয়ে আসছিল। বিদায়বেলায় ও আমার দিকে ফিরে হাত নাড়ল। অন্য হাতটিতে তখন আমার কিনে দেওয়া সেই মিষ্টি।

গ্যারিসন থেকে আমাদেরকে, মানে ক্যাডেটদের পরিবারের সদ্যসদেরকে রাত কাটাবার জন্যে রাখা হয়েছিল স্পোর্টস হলে। মেঝেতে মাদুর পেতে। কিন্তু সে রাতে আমাদের কেউই এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের পাতা এক করতে পারিনি। উৎকণ্ঠায় আমরা বরং হেঁটে বেড়িয়েছি ব্যারাকের চারপাশে—যেখানে আমাদের ছেলেরা ঘুমে অচেতন।

ভোরের দিকে বিউগলের শব্দে ধড়মড় করে উঠে বাইরে এলাম। ভাবলাম শরীরচর্চা কেন্দ্রের পাশ দিয়ে মার্চ করে যাবার সময়ে ওকে হয়তো দূর থেকে এক ঝলকের জন্যে হলেও দেখতে পাব। ওদেরকে দৌড়ুতে দেখলাম। কিন্তু সবার পরনেই ওই একই ডোরাকাটা জামা থাকায় কে যে আমার মানিক, সেটা ঠাহর করতে পারলাম না। ওরা সবসময় দল বেঁধে চলত। সেটা ক্যান্টিনে যাবার সময়েই হোক, কিংবা টয়লেটে যাবার সময়েই হোক। ওদেরকে একা-একা কোথাও যেতে দেওয়া হতো না। কারণ, এর আগে নাকি এমন ঘটেছে যে—যখন কোনো সৈনিক জেনেছে যে তাকে আফগানিস্তানে পাঠানো হচ্ছে, সে টয়লেটে গিয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে, নয়তো ব্লেড দিয়ে কবজির নাড়ি কেটে ফেলেছে।

বাসের ভেতরে কেবল আমি একাই কাঁদলাম। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল—ওকে আর কখনো দেখতে পাব না। মায়ের মন! কিছুদিনের মধ্যেই ওর একটা চিঠি পেলাম—‘তোমার বাসটা দেখে পেছন-পেছন দৌড়ে গিয়েছিলাম, মা। ভেবেছিলাম তোমাকে শেষবারের মতো আবারও দেখতে পাব।’

সেই শপথ গ্রহণের দিনে পার্কে যখন আমরা বসেছিলাম, তখন লাউডস্পিকারে একটা পুরনো মিষ্টি গানটা বাজাচ্ছিল—‘মা যখন আমায় বিদায় দিল।’ আজকাল আমার মাথায় এই গানের কলিটা সবসময় ঘোরে।

ওর পরের চিঠিটা শুরু হয়েছিল এইভাবে—‘কাবুল থেকে বলছি, কেমন আছো মা?’ প্রথম লাইনটুকু পড়েই আমি এত জোরে চিৎকার করে উঠেছিলাম যে, পাশের বাড়িরা পড়শিরা পর্যন্ত হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। ‘এটা পুরোপুরি আইন আর স্বাধিকার পরিপন্থী।’—টেবিলে মাথা ঠুকতে ঠুকতে ওদেরকে বলছিলাম। ‘ও আমার একমাত্র ছেলে... এমনকি সেই জারের আমলেও একমাত্র ছেলেদেরকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হতো না। আর আজ কিনা ওকে পাঠানো হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে।’ সাসার জন্মের পর সেদিনই প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছিল—এ জীবনে বিয়ে না করে হয়তো ভুলই করেছি। এখন তো আমাকে আগলে রাখার মতো আর কেউ রইল না।

সাসা কিন্তু আমাকে মাঝে মাঝেই খোঁচাত—‘মা, তুমি এখনো বিয়ে করছো না কেন বলো তো?’

‘কারণ, তুই হিংসা করবি, তাই।’—ওকে বলতাম। ও হাসত শুনে। তারপর আর কিছু বলত না। চুপ হয়ে যেত। আমরা দুজনেই ভাবতাম—এভাবেই বুঝি জীবনটা একসাথে কেটে যাবে অনন্তকাল।

ও এরপরও আমাকে বেশ কয়েকটা চিঠি পাঠিয়েছিল। নিয়মিতভাবে নয়। বেশ কিছুটা সময় বাদে বাদে। একবার তো এমন হলো যে, ওর চিঠি না পেয়ে ওর কমান্ডিং অফিসারকে চিঠি লিখে বসলাম। তার ঠিক পরপরই সাসা-র কাছ থেকে চিঠি পেলাম। খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে লিখেছে—‘মা, তুমি আমার কমান্ডিং অফিসারকে চিঠি লিখো না। তোমার শেষ চিঠিটার জন্যে আমাকে বেশ ভুগতে হয়েছে। শেষেরবার চিঠি লিখতে দেরি হয়েছিল—কারণ, আমার হাতে মৌমাছি কামড়েছিল। আমি হয়তো অন্য কাউকে দিয়ে চিঠি লিখিয়ে তোমাকে পাঠাতে পারতাম, কিন্তু অচেনা হাতের লেখা চিঠি পেয়ে তোমার দুশ্চিন্তা বাড়ত বই কমত না।’

আমার উৎকণ্ঠা আঁচ করতে পেরে ও হয়তো গপ্পোটা বানিয়ে বলেছে। কিন্তু এদিকে আমি তো প্রতিদিনই টিভি দেখি। বেশ বুঝতে পারি—ছেলেটা হয়তো যুদ্ধে আহত হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিদিনই একটা করে চিঠি না পেলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারতাম না। আতঙ্কে। আমাকে প্রবোধ দেবার জন্যে ও লিখত—‘মা, তুমি কী করে প্রতিদিনই একটা করে চিঠি আশা করো, যেখানে কিনা আমরা খাবার বিশুদ্ধ জলই পাই দশ দিনে একবার করে?’

একদিন চিঠিতে ওর আনন্দ ঝরে পড়ল—‘হুররে, আজ আমরা একটা গাড়ি বহরকে পাহারা দিয়ে সোভিয়েত সীমান্ত অবধি পৌঁছে দিয়েছি। যদিও সীমান্ত পার হইনি, তবুও দূর থেকে মাতৃভূমির দেখা তো পেলাম! এই সোভিয়েত দেশটাই পৃথিবীর সেরা দেশ!’

শেষ চিঠিটায় ও লিখেছিল—‘এই গ্রীষ্মটা পার করতে পারলেই ঘরে ফিরব আমি।’

সে বছর আগস্টের ২৯ তারিখে ভাবলাম, গ্রীষ্ম তো শেষ হয়ে এলো। সাসা-র জন্যে বরং একটা স্যুট আর কিছু জুতো কিনে রাখি। ছেলেটা বাড়ি ফিরে পরবে। ওগুলো আজও দেরাজে তোলা আছে...।

ত্রিশ তারিখে কাজে যাবার আগে হঠাৎ কী মনে হলো। কানের দুল আর হাতের আংটি খুলে ফেললাম। কেন যেন ওগুলো আর পরতে মন চাইছিল না।

পরে জেনেছি, ওই বিশেষ দিনটাতেই ও মারা গিয়েছিল।

ওর মৃত্যুর পর এই যে আজও বেঁচে আছি, সে আমার ভাইয়ের বদৌলতে। সাসা-র মৃত্যু সংবাদ পাবার পর পুরো একটা সপ্তাহ ও আমার বিছানার পাশে মেঝেতে শুয়ে থেকেছে। মনিবকে সঙ্গ দেওয়া কুকুরের মতো। ভাই হয়তো অনুমান করেছিল, যে কোনো মুহূর্তে আমি দৌড়ে আমাদের সাত তলার ফ্ল্যাটটির ব্যালকনিতে যেয়ে নিচে ঝাঁপ দিতে পারি।

সাসা-র কফিনটা যখন আমাদের বসার ঘরে নিয়ে এলো, সেটার ওপর আছড়ে পড়লাম। আমার হাত দিয়ে বারবার মেপে দেখলাম কফিনের দৈর্ঘ্য। তিন ফুট...ছ ফুট...সাড়ে ছ ফুট...ঠিক অতটুকুই তো ওর উচ্চতা ছিল। কফিনটা কি ওর তুলনায় ছোট ছিল? উন্মাদিনীর মতো সেই কফিনের দিকে তাকিয়ে প্রলাপ বকতে থাকলাম—‘ওখানে কে রে? আমার মানিক? আমার মানিক ওখানে?’ কফিনটাকে ওরা সিল করে এনেছিল। তাই ওকে শেষবারের মত চুমু খাওয়া হলো না। এমনকি শেষ শয্যায় ওর পরনে কী ছিল, সেটা পর্যন্ত আমি জানি না।

আমি ওদেরকে বলেছিলাম, গোরস্থানে আমি নিজে ওর জন্যে একটা জায়গা বাছাই করব। ওরা আমাকে কয়েকটা সম্ভাব্য স্থানের কথা জানাল। ভাইয়ের সাথে সেই স্থানগুলো দেখতে গেলাম। ওখানে আগে থেকেই বেশ কিছু আফগান-যুদ্ধে মৃত সৈনিকের কবর ছিল। মধ্য সারিতে।

‘ওই জায়গাটা আমি আমার সাসা-র জন্যে চাই, নিজের বন্ধুদের সাথে চিরনিদ্রায় ঘুমুতে পেরে ওর নিশ্চয় ভালোই লাগবে।’—কবর খোঁড়ার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদেরকে বললাম।

সেখানে কর্তামতো যিনি ছিলেন তিনি ঈষৎ মাথা নেড়ে বললেন, ‘দুঃখিত। ওখানে হবে না। আফগান যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের একসাথে সার বেঁধে দাফন করার অনুমতি নেই। ওদেরকে গোরস্থানের এখানে ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাফন করতে হবে।’

ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবারে। ‘সোনিয়া, এত রেগে যাস না, শান্ত হ, শান্ত হ বোন।’—ভাই আমাকে থামাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কী করে শান্ত থাকি আমি?

টিভিতে যখন কাবুলের কিছু দেখায়, ইচ্ছে হয়—একটা মেশিনগান নিয়ে ওখানে গিয়ে ওদের বহু লোককে মেরে ফেলি। টিভির সামনে বসে এভাবেই আমি দিনের পর দিন ওদেরকে গুলি করে মেরে ফেলার স্বপ্ন দেখতাম। এই বিশেষ ইচ্ছেটা অবশ্য একদিন মরে গেল, যেদিন দেখলাম—আমার মতোই একজন আফগান মা যুদ্ধে তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আহাজারি করছেন।

আজকাল ভাবছি, অনাথালয় থেকে একটা ছেলেকে দত্তক নেব। সাসা-র মতোই সোনালি চুলের কোনো বালককে। না থাক, ছেলে হলে আতঙ্কের মাঝে থাকব। আবার হয়তো যুদ্ধে গিয়ে মরে আসবে। তার চেয়ে বরং মেয়েই ভালো। তারপর আমরা মা-মেয়ে মিলে সাসা-র জন্যে অপেক্ষা করব... আমি উন্মাদ নই, কিন্তু আমি আজও সাসা-র জন্যে অপেক্ষা করি। এমনও গল্প শুনেছি, ওরা কোনো মায়ের কাছে হয়তো ছেলের কফিন পাঠিয়েছে। মা সেই দস্তায় মোড়া কফিন দাফন করেছেন। তারপর এক বছর বাদে হঠাৎ সেই ছেলে বাড়িতে উপস্থিত। যুদ্ধে আহত হয়েছিল, কিন্তু বেঁচে গেছে কোনোভাবে। সেই মায়ের তো তখন আত্মা খাঁচাছাড়া হবার দশা! তেমনটা কি আমার সাসা-র ক্ষেত্রে ঘটতে পারে না? পারে হয়তো। আমি তাই আজও ওর জন্যে অপেক্ষা করছি। ওর মৃতমুখ আমি দেখিনি। আমার কাছে তাই সাসা আজও জীবিত, আজও ওর প্রতীক্ষায় দিন গুনি আমি...

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;