দস্তার কফিনে বন্দী ছেলেরা



সেভৎলানা আলেক্সেয়িভিচ ।। অনুবাদ: সঞ্জয় দে
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

নোবেল বিজয়ী বেলারুশিয়ান সাহিত্যিক সেভৎলানা আলেক্সেয়িভিচ রচিত ‘দস্তার কফিনে বন্দী ছেলেরা’ গ্রন্থটি কোনো প্রচলিত উপন্যাস নয়; সুইডিশ একাডেমির ভাষ্যমতে এই গ্রন্থটি বরং প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বয়ানে রচিত ইতিহাস। সে ইতিহাস আবেগের, সে ইতিহাস আত্মার। সেভৎলানা যুদ্ধে যাওয়া সৈনিক, ট্যাংকচালক, সেবিকা, সন্তানহারা মা, স্ত্রী, বোন—এমন বহু মানুষের গল্প শুনেছেন। তাদের সেই গল্পগুলোকে, না বলা কথাগুলোকে এক এক করে অক্ষমালায় সাজিয়ে যুদ্ধের এক ভিন্ন ধরনের চিত্রপট আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। অসংখ্য গল্পের মাঝ থেকে জুরালেভ নামক এক ছত্রীসেনার মায়ের গল্পটি এখানে নিবেদন করা হলো।


দস্তায় মোড়া কফিনটির পাশে বসে বিলাপ করে বলছিলাম, ‘ওখানে কে শুয়ে রে? আমার ছোট্ট সোনাটা নাকি?’ বারবার ওই একই প্রলাপ বকেই যাচ্ছিলাম—‘কে শুয়ে ওখানে? আমার মানিক, তুই কি?’ সবাই ভাবছিল, আমি বুঝি পাগল হয়ে গেছি।

তারপর সময় বয়ে যায়। একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, খুঁজে বার করব আমার পুত্রের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। সেনাবাহিনীর স্থানীয় নিয়োগ দপ্তরে গেলাম।

‘আমাকে অন্তত এটুকু বলুন, ঠিক কোথায় আর কিভাবে ছেলেটার মৃত্যু হয়েছিল’—ওদের কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বললাম, ‘ও মরে গেছে—এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমি নিশ্চিত—সেদিন একটা খালি কফিন কবর দিয়েছিলাম, আর আমার প্রাণের ধনটা হয়তো বেঁচে আছে কোনো একখানে।’

দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার আমার ওপর খুব রেগে গিয়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন। ‘এটা রাষ্ট্রীয় একান্ত গোপনীয় বিষয়। আপনি এভাবে জনে জনে গিয়ে জানাতে পারেন না যে, আপনার ছেলে যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এভাবে ঢ্যাঁড়া পেটানো যে নিষিদ্ধ, সেটা জানেন না?’

ওর জন্মের সময়টা ছিল দীর্ঘ আর বেদনাক্লিষ্ট। কিন্তু প্রসবের পর যখন ছেলের মুখ দেখলাম, আমার সমস্ত যন্ত্রণা যেন নিমেষেই উবে গেল। ওর জন্যে দুশ্চিন্তা করতাম সেই প্রথম দিন থেকেই, কারণ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ও-ই যে ছিল আমার একমাত্র অবলম্বন। আমরা একটা ছোট কুঁড়েঘরে থাকতাম। একটা মাত্র ছোট ঘর। কেবল একটা খাট, একটা প্যারামবুলেটর আর দুটো চেয়ার পাতা যায় সে ঘরে। রেলওয়েতে চাকরি করতাম। আমার কাজ ছিল রেলের পয়েন্ট বদলানো। মাসে ষাট রুবল বেতন পেতাম। ওকে জন্ম দিয়ে যেদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলাম, সেদিনই রাতের শিফটে কাজে ফিরে যেতে হয়েছিল। প্যারামবুলেটরের ভেতরে করে ওকে কাজে নিয়ে যেতাম। আমার সাথে সব সময় একটা খাবার গরম করার হটপ্লেট থাকত। ওতে করেই ওকে খাওয়াতাম, তারপর ঘুম পাড়াতাম। এর ফাঁকে ফাঁকে ট্রেনের পয়েন্ট বদলাবার কাজগুলো চলত। একটু যখন বড় হলো, তখন ওকে বাড়িতে একা রেখে আসতাম। ওর গোড়ালিটা প্যারামবুলেটরের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে আসতাম, কিন্তু... এভাবে অবহেলায় বড় হবার পরও কিন্তু একটা চমৎকার ছেলে হিসেবে ও গড়ে উঠেছিল।

স্কুল শেষে ছেলেটা ভর্তি হয়েছিল পেত্রযাভদস্ক-এর একটা স্থাপত্য কলেজে। কারেলিয়া অঞ্চলে। ফিনিস সীমান্তের কাছে। একবারই মাত্র দেখতে গিয়েছিলাম ওকে। ছুটে এসে আমাকে চুমু খেল, তারপর দৌড়ে কোথায় যেন পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই হাসতে হাসতে ফিরে এসে বলল, ‘মেয়েরা আসছে’।

‘কোন মেয়েরা?’—অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

ও আসলে তখন ছুটে গিয়েছিল বান্ধবীদের খবর দিতে—মা এসেছে। সেই মা, যার অসংখ্য গল্প এতকাল এই মেয়েরা ওর মুখ থেকে শুনে এসেছে।

আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ কোনো উপহার দেয়নি। একবার মা দিবসে ও বাড়ি এলে স্টেশন থেকে আনতে গেলাম।

‘তোর ব্যাগটা আমি ধরছি।’—ওকে বললাম।

‘এটা অনেক ভারী, মা। তুমি বরং আমার পোর্টফলিও কেইসটা নাও। তবে সাবধানে ধোরো।’

আমি ওটা সাবধানেই ধরলাম। নিশ্চয়ই কোনো দরকারি ড্রয়িং আছে ভেতরে—ভাবলাম। বাড়ি ফেরার পর ও কাপড় বদলাতে গেল, আর আমি ব্যস্তসমস্ত হয়ে গেলাম রান্নাঘরে—পাইকেক বানাতে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, ছেলে আমার হাতে তিনটে তাজা রক্তিম টিউলিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায় ঈশ্বর! এই মার্চ মাসে কোথা থেকে এই টিউলিপ জোগাড় করল? পরে বুঝলাম, সেই পোর্টফোলিও বাক্সে আসলে কাপড় দিয়ে ভালো করে মুড়ে আমার জন্যে এই টিউলিপগুলো নিয়ে এসেছিল, যাতে ঠান্ডায় জমে না যায়! সেই প্রথম কেউ আমাকে ফুল উপহার দিল।

সে বছর গ্রীষ্মে ও ভবন নির্মাণের একটা স্পেশাল প্রজেক্টে কাজ করছিল। আমার জন্মদিনের ঠিক আগে আগে বাড়িতে এল। ‘আমি খুব দুঃখিত মা, আর কটা দিন আগে আসতে পারলাম না। তবে তোমার জন্যে ছোট্ট একটা জিনিস এনেছি’—বলে আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল। চোখ বুলিয়ে দেখি—একটা মানি অর্ডার। বারো রুবল, পঞ্চাশ কোপেকের।

‘মা, তুমি মনে হয় দশমিক গুলিয়ে ফেলছো। ওটা আসলে বারশ পঞ্চাশ রুবলের।’

ইহজন্মে এত টাকা হাতের মুঠোয় দেখিনি। আমি কী করে জানব কোথাকার দশমিক কোথায়?

ওর মনটা বড্ড মায়াভরা ছিল। প্রায়ই বলত, ‘মা তুমি তো রিটায়ার করছো, ওদিকে সামনে আমিও মেলা টাকা কামাব। আমাদের দুজনের ও-দিয়ে ভালোভাবেই হয়ে যাবে। তোমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমি তোমাকে বলতাম, বড় হয়ে আমি তোমাকে কোলে করে ঘুরব?’

ও কিন্তু সেটাই করেছিল। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির ছেলে আমার। আমি তখন ওর কাছে ছোট্ট খুকি। আমাদের দুজনেরই তো দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না, সেজন্যেই হয়তো নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে আমরা মা-ছেলে একে অপরকে ভালোবাসতাম। ওর ঘরে বৌ এলে কী হতো, কে জানে! মাঝে মাঝে ভাবতাম, বৌ না এলেই হয়তো ভালো হয়।

একদিন বাধ্যতামূলক সামরিক ট্রেনিংয়ের সমন এলো। ছেলেটার আগে থেকেই ইচ্ছে ছিল—ছত্রীসেনা হবে। ‘মা, ওরা ছত্রীসেনা দলে লোক নিচ্ছে। কিন্তু আমায় নেবে কিনা কে জানে! আমি তো যে লম্বা! ওরা তো বলছে, আমার উচ্চতার কারণে নাকি প্যারাসুটের দড়ি ছিঁড়ে যাবে। আমার অবশ্য এই দলটিতেই যোগ দেবার বেশি ইচ্ছে।’

তো সেভাবেই একদিন ভিতেবস্ক ছত্রীসেনা ডিভিশনে নাম লেখাল। শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে আমি গেলাম। যখন শপথ বাক্য পাঠ করছে, তখন দেখলাম, ছেলেটা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখমণ্ডল—উচ্চতা-সংক্রান্ত সংকোচ-বিহীন।

‘মা, তুমি এত ছোট কেন বল তো?’—ও জিজ্ঞেস করেছিল।

‘তোর জন্যে আমার যে শূন্যতাবোধ, সেটি আমায় বাড়তে দেয়নি। ছোট করে রেখে দিয়েছে।’—একটু ঠাট্টা করে বললাম।

‘আমাদের দলকে আফগানিস্তানে পাঠাচ্ছে, মা। তবে আমি হয়তো যাচ্ছি না। তোমার একমাত্র সন্তান আমি। কী করে যাই! আচ্ছা আমি হবার পর আরেকটা মেয়ে হওয়ালে না কেন বলো তো?’

সেই শপথ অনুষ্ঠানে বহু মা-বাবা এসেছিল। হঠাৎ শুনি, মঞ্চ থেকে কে যেন ঘোষণা করছে, ‘শ্রীমতী জুরালেভা কোথায়? জুরালেভা, এদিকে আসুন। আপনার ছেলেকে অভিনন্দন জানান।’ আমি উঠে গেলাম ওকে চুমু খাবার জন্যে। কিন্তু এই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি ছেলের কপাল কী করে ছুঁই?

‘প্রাইভেট জুরালেভ, একটু ঝুঁকে দাঁড়াও, যাতে তোমার মা চুমু খেতে পারেন।’—কমান্ডেন্ট আদেশ করলেন জুরালেভকে। ওর কপালে চুমু খাবার মুহূর্তে একজন ফটোগ্রাফার পাশ থেকে ছবি তুলল, উর্দি পরা অবস্থায় ওর সাথে আমার একমাত্র ছবি।

সেদিন অনুষ্ঠান শেষে ওদেরকে কয়েক ঘণ্টা ফ্রি টাইম দেওয়া হলো। কাছেই একটা পার্কে গেলাম। ঘাসের ওপর বসার সময়ে ও যখন বুটজোড়া খুলে ফেলল, লক্ষ করলাম—ওর গোড়ালিতে রক্ত। ওদেরকে নাকি প্রতিদিন প্রায় ৩০ মাইল দৌড়ুতে হয়। পায়ের মাপ ১১ হলেও ওকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে নয়ের বুট। ছেলেটা প্রতিবাদ করেনি; বরং বাকিরা যেখানে পিঠে বেঁধে রাখা ব্যাগ থেকে কৌশলে আদ্দেক বালি ফেলে দিয়ে দৌড়ুত, সেখানে ও দৌড়ুত পুরো ওজন নিয়েই।

ভাবছিলাম ওর জন্যে বিশেষ কিছু একটা করব। তাই জিজ্ঞেস করলাম—‘কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাবি বাবা? আমরা দুজনে তো কখনো রেস্টুরেন্টে খাইনি।’

‘তুমি বরং আমাকে কয়েক পাউনড মিষ্টি কিনে দাও, মা। মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে।’

ব্যারাকে ফিরে যাবার সময় ঘনিয়ে আসছিল। বিদায়বেলায় ও আমার দিকে ফিরে হাত নাড়ল। অন্য হাতটিতে তখন আমার কিনে দেওয়া সেই মিষ্টি।

গ্যারিসন থেকে আমাদেরকে, মানে ক্যাডেটদের পরিবারের সদ্যসদেরকে রাত কাটাবার জন্যে রাখা হয়েছিল স্পোর্টস হলে। মেঝেতে মাদুর পেতে। কিন্তু সে রাতে আমাদের কেউই এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের পাতা এক করতে পারিনি। উৎকণ্ঠায় আমরা বরং হেঁটে বেড়িয়েছি ব্যারাকের চারপাশে—যেখানে আমাদের ছেলেরা ঘুমে অচেতন।

ভোরের দিকে বিউগলের শব্দে ধড়মড় করে উঠে বাইরে এলাম। ভাবলাম শরীরচর্চা কেন্দ্রের পাশ দিয়ে মার্চ করে যাবার সময়ে ওকে হয়তো দূর থেকে এক ঝলকের জন্যে হলেও দেখতে পাব। ওদেরকে দৌড়ুতে দেখলাম। কিন্তু সবার পরনেই ওই একই ডোরাকাটা জামা থাকায় কে যে আমার মানিক, সেটা ঠাহর করতে পারলাম না। ওরা সবসময় দল বেঁধে চলত। সেটা ক্যান্টিনে যাবার সময়েই হোক, কিংবা টয়লেটে যাবার সময়েই হোক। ওদেরকে একা-একা কোথাও যেতে দেওয়া হতো না। কারণ, এর আগে নাকি এমন ঘটেছে যে—যখন কোনো সৈনিক জেনেছে যে তাকে আফগানিস্তানে পাঠানো হচ্ছে, সে টয়লেটে গিয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে, নয়তো ব্লেড দিয়ে কবজির নাড়ি কেটে ফেলেছে।

বাসের ভেতরে কেবল আমি একাই কাঁদলাম। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল—ওকে আর কখনো দেখতে পাব না। মায়ের মন! কিছুদিনের মধ্যেই ওর একটা চিঠি পেলাম—‘তোমার বাসটা দেখে পেছন-পেছন দৌড়ে গিয়েছিলাম, মা। ভেবেছিলাম তোমাকে শেষবারের মতো আবারও দেখতে পাব।’

সেই শপথ গ্রহণের দিনে পার্কে যখন আমরা বসেছিলাম, তখন লাউডস্পিকারে একটা পুরনো মিষ্টি গানটা বাজাচ্ছিল—‘মা যখন আমায় বিদায় দিল।’ আজকাল আমার মাথায় এই গানের কলিটা সবসময় ঘোরে।

ওর পরের চিঠিটা শুরু হয়েছিল এইভাবে—‘কাবুল থেকে বলছি, কেমন আছো মা?’ প্রথম লাইনটুকু পড়েই আমি এত জোরে চিৎকার করে উঠেছিলাম যে, পাশের বাড়িরা পড়শিরা পর্যন্ত হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। ‘এটা পুরোপুরি আইন আর স্বাধিকার পরিপন্থী।’—টেবিলে মাথা ঠুকতে ঠুকতে ওদেরকে বলছিলাম। ‘ও আমার একমাত্র ছেলে... এমনকি সেই জারের আমলেও একমাত্র ছেলেদেরকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হতো না। আর আজ কিনা ওকে পাঠানো হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে।’ সাসার জন্মের পর সেদিনই প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছিল—এ জীবনে বিয়ে না করে হয়তো ভুলই করেছি। এখন তো আমাকে আগলে রাখার মতো আর কেউ রইল না।

সাসা কিন্তু আমাকে মাঝে মাঝেই খোঁচাত—‘মা, তুমি এখনো বিয়ে করছো না কেন বলো তো?’

‘কারণ, তুই হিংসা করবি, তাই।’—ওকে বলতাম। ও হাসত শুনে। তারপর আর কিছু বলত না। চুপ হয়ে যেত। আমরা দুজনেই ভাবতাম—এভাবেই বুঝি জীবনটা একসাথে কেটে যাবে অনন্তকাল।

ও এরপরও আমাকে বেশ কয়েকটা চিঠি পাঠিয়েছিল। নিয়মিতভাবে নয়। বেশ কিছুটা সময় বাদে বাদে। একবার তো এমন হলো যে, ওর চিঠি না পেয়ে ওর কমান্ডিং অফিসারকে চিঠি লিখে বসলাম। তার ঠিক পরপরই সাসা-র কাছ থেকে চিঠি পেলাম। খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে লিখেছে—‘মা, তুমি আমার কমান্ডিং অফিসারকে চিঠি লিখো না। তোমার শেষ চিঠিটার জন্যে আমাকে বেশ ভুগতে হয়েছে। শেষেরবার চিঠি লিখতে দেরি হয়েছিল—কারণ, আমার হাতে মৌমাছি কামড়েছিল। আমি হয়তো অন্য কাউকে দিয়ে চিঠি লিখিয়ে তোমাকে পাঠাতে পারতাম, কিন্তু অচেনা হাতের লেখা চিঠি পেয়ে তোমার দুশ্চিন্তা বাড়ত বই কমত না।’

আমার উৎকণ্ঠা আঁচ করতে পেরে ও হয়তো গপ্পোটা বানিয়ে বলেছে। কিন্তু এদিকে আমি তো প্রতিদিনই টিভি দেখি। বেশ বুঝতে পারি—ছেলেটা হয়তো যুদ্ধে আহত হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিদিনই একটা করে চিঠি না পেলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারতাম না। আতঙ্কে। আমাকে প্রবোধ দেবার জন্যে ও লিখত—‘মা, তুমি কী করে প্রতিদিনই একটা করে চিঠি আশা করো, যেখানে কিনা আমরা খাবার বিশুদ্ধ জলই পাই দশ দিনে একবার করে?’

একদিন চিঠিতে ওর আনন্দ ঝরে পড়ল—‘হুররে, আজ আমরা একটা গাড়ি বহরকে পাহারা দিয়ে সোভিয়েত সীমান্ত অবধি পৌঁছে দিয়েছি। যদিও সীমান্ত পার হইনি, তবুও দূর থেকে মাতৃভূমির দেখা তো পেলাম! এই সোভিয়েত দেশটাই পৃথিবীর সেরা দেশ!’

শেষ চিঠিটায় ও লিখেছিল—‘এই গ্রীষ্মটা পার করতে পারলেই ঘরে ফিরব আমি।’

সে বছর আগস্টের ২৯ তারিখে ভাবলাম, গ্রীষ্ম তো শেষ হয়ে এলো। সাসা-র জন্যে বরং একটা স্যুট আর কিছু জুতো কিনে রাখি। ছেলেটা বাড়ি ফিরে পরবে। ওগুলো আজও দেরাজে তোলা আছে...।

ত্রিশ তারিখে কাজে যাবার আগে হঠাৎ কী মনে হলো। কানের দুল আর হাতের আংটি খুলে ফেললাম। কেন যেন ওগুলো আর পরতে মন চাইছিল না।

পরে জেনেছি, ওই বিশেষ দিনটাতেই ও মারা গিয়েছিল।

ওর মৃত্যুর পর এই যে আজও বেঁচে আছি, সে আমার ভাইয়ের বদৌলতে। সাসা-র মৃত্যু সংবাদ পাবার পর পুরো একটা সপ্তাহ ও আমার বিছানার পাশে মেঝেতে শুয়ে থেকেছে। মনিবকে সঙ্গ দেওয়া কুকুরের মতো। ভাই হয়তো অনুমান করেছিল, যে কোনো মুহূর্তে আমি দৌড়ে আমাদের সাত তলার ফ্ল্যাটটির ব্যালকনিতে যেয়ে নিচে ঝাঁপ দিতে পারি।

সাসা-র কফিনটা যখন আমাদের বসার ঘরে নিয়ে এলো, সেটার ওপর আছড়ে পড়লাম। আমার হাত দিয়ে বারবার মেপে দেখলাম কফিনের দৈর্ঘ্য। তিন ফুট...ছ ফুট...সাড়ে ছ ফুট...ঠিক অতটুকুই তো ওর উচ্চতা ছিল। কফিনটা কি ওর তুলনায় ছোট ছিল? উন্মাদিনীর মতো সেই কফিনের দিকে তাকিয়ে প্রলাপ বকতে থাকলাম—‘ওখানে কে রে? আমার মানিক? আমার মানিক ওখানে?’ কফিনটাকে ওরা সিল করে এনেছিল। তাই ওকে শেষবারের মত চুমু খাওয়া হলো না। এমনকি শেষ শয্যায় ওর পরনে কী ছিল, সেটা পর্যন্ত আমি জানি না।

আমি ওদেরকে বলেছিলাম, গোরস্থানে আমি নিজে ওর জন্যে একটা জায়গা বাছাই করব। ওরা আমাকে কয়েকটা সম্ভাব্য স্থানের কথা জানাল। ভাইয়ের সাথে সেই স্থানগুলো দেখতে গেলাম। ওখানে আগে থেকেই বেশ কিছু আফগান-যুদ্ধে মৃত সৈনিকের কবর ছিল। মধ্য সারিতে।

‘ওই জায়গাটা আমি আমার সাসা-র জন্যে চাই, নিজের বন্ধুদের সাথে চিরনিদ্রায় ঘুমুতে পেরে ওর নিশ্চয় ভালোই লাগবে।’—কবর খোঁড়ার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদেরকে বললাম।

সেখানে কর্তামতো যিনি ছিলেন তিনি ঈষৎ মাথা নেড়ে বললেন, ‘দুঃখিত। ওখানে হবে না। আফগান যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের একসাথে সার বেঁধে দাফন করার অনুমতি নেই। ওদেরকে গোরস্থানের এখানে ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাফন করতে হবে।’

ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবারে। ‘সোনিয়া, এত রেগে যাস না, শান্ত হ, শান্ত হ বোন।’—ভাই আমাকে থামাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কী করে শান্ত থাকি আমি?

টিভিতে যখন কাবুলের কিছু দেখায়, ইচ্ছে হয়—একটা মেশিনগান নিয়ে ওখানে গিয়ে ওদের বহু লোককে মেরে ফেলি। টিভির সামনে বসে এভাবেই আমি দিনের পর দিন ওদেরকে গুলি করে মেরে ফেলার স্বপ্ন দেখতাম। এই বিশেষ ইচ্ছেটা অবশ্য একদিন মরে গেল, যেদিন দেখলাম—আমার মতোই একজন আফগান মা যুদ্ধে তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আহাজারি করছেন।

আজকাল ভাবছি, অনাথালয় থেকে একটা ছেলেকে দত্তক নেব। সাসা-র মতোই সোনালি চুলের কোনো বালককে। না থাক, ছেলে হলে আতঙ্কের মাঝে থাকব। আবার হয়তো যুদ্ধে গিয়ে মরে আসবে। তার চেয়ে বরং মেয়েই ভালো। তারপর আমরা মা-মেয়ে মিলে সাসা-র জন্যে অপেক্ষা করব... আমি উন্মাদ নই, কিন্তু আমি আজও সাসা-র জন্যে অপেক্ষা করি। এমনও গল্প শুনেছি, ওরা কোনো মায়ের কাছে হয়তো ছেলের কফিন পাঠিয়েছে। মা সেই দস্তায় মোড়া কফিন দাফন করেছেন। তারপর এক বছর বাদে হঠাৎ সেই ছেলে বাড়িতে উপস্থিত। যুদ্ধে আহত হয়েছিল, কিন্তু বেঁচে গেছে কোনোভাবে। সেই মায়ের তো তখন আত্মা খাঁচাছাড়া হবার দশা! তেমনটা কি আমার সাসা-র ক্ষেত্রে ঘটতে পারে না? পারে হয়তো। আমি তাই আজও ওর জন্যে অপেক্ষা করছি। ওর মৃতমুখ আমি দেখিনি। আমার কাছে তাই সাসা আজও জীবিত, আজও ওর প্রতীক্ষায় দিন গুনি আমি...