জুঁই



তানিম কবির
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

দশ বছর আগের চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে আমি পৌঁছাই ঠিকই, তবে তা কোনোভাবেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নয় যে, সত্যিই জুঁইও সেখানে, এমনকি আমার আগে থেকেই উপস্থিত থাকবে। আর, আবারও সত্যিই ওকে আমি দেখতে পাব। বরং এরকম যে হতে পারে, অন্তত পাঁচ বছর ধরে সেই সম্ভাবনাটাকে নাকচ করতে করতেই আমি বড় হচ্ছিলাম। ফলে বিমানবন্দর রেলস্টেশনের ওভারব্রিজের নির্ধারিত কোনায় ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল আমার বড় হতে থাকা।

জুঁইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৫ সালে। হঠাৎই একদম হুট করে। তখন কত বয়স আমার, সবেমাত্র কলেজে যাই, সতের, বা তারও কম? অবশ্য জুঁই বয়সে আমার বড় ছিল, তিন বছরের। ফোনে পরিচয়। লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ। হুট করে একগাদা মোবাইলফোন কোম্পানি এসে পাড়া-মহল্লার ছাদেই, কলেজ যাবার রাস্তার মোড়েই ঘটতে পারত প্রেমগুলোকে বেশ একটা জাতীয় মানের রাত জেগে কথা বলা প্রেমে রূপান্তর করে দিল তো? বলতে গেলে পরিবর্তিত বা নবগঠিত ওই সংস্কৃতির প্রথম জেনারেশনের প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলাম আমরা। ডিজুস টু ডিজুস দুই টাকায় সারারাত কথা বলার একটা অফার ছাড়ে গ্রামীণফোন। মূলত ওই সময়ই একটা ফালতু নাম্বার পাজলিং থেকে জুঁইয়ের সঙ্গে আমার প্রেম হয়ে যায়।

আমরা তখন সারারাত জেগে ফোনে কথা বলতাম। এমনও হয়েছে, ভোর হয়ে গেছে জন্য এখন আর সারাক্ষণ ফোনে ‘লাইনে’ থাকতে পারব না ভেবে শেষরাত থেকেই আমাদের কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে। এতই রাতজাগা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলাম আমরা। সত্যি বলতে, আমাদের তুলনা ছিল না। আমার, এবং জুঁইয়েরও, পরিচিত এমন একজন কেউ ছিল না, যে অন্তত আমাদের সিকি পরিমাণ প্রেমও ওইসময় করতে পারত। আমরা জানতাম যে, আমরাই সেরা।

তবে আমরা কেউ কাউকে দেখিনি কখনো। শুধু কথা বলে প্রেম করি। একদিন তাই ভয় হলো, মনে হলো, আমাকে দেখে যদি ওর পছন্দ না হয়। কিংবা আমারই যদি পছন্দ না হয় ওকে! কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে জিভ কামড়ে আমি অনুতপ্ত হই। ছিঃ এ আমি কী ভাবছি। জুঁই দেখতে যেমনই হোক না কেন, ও তো জুঁই। আমি ওকে কখনোই ছেড়ে যেতে পারি না, কারণ সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের একবার দেখা তো হোক? দুজনেই রাজি। আমি আমার আশঙ্কার বিষয়ে ওকে বললাম, ‘আমি তো দেখতে অতো ভালো না, তোমার যদি পছন্দ না হয়!’ তুড়ি মেরে আশঙ্কাটাকে উড়িয়ে দেয় জুঁই। উল্টো ওকে এরকম অগভীর আর চেহারা দেখে প্রেমে পড়া টাইপ থার্ডক্লাস ভাবার কারণে রাগ করে ওই রাতে আর কথাই বলল না আমার সাথে।

এমনিতে কথা না হওয়া রাত, ওই সময় আমার জন্য ভয়াবহ যন্ত্রণার বিষয় ছিল। কিন্তু ওকে ‘চেহারা দেখে প্রেমে পড়া’দের কাতারে ফেলবার শাস্তি হিসেবে পাওয়া ওই কথা না বলা রাতটা আমার জন্য বলতে গেলে স্বর্গসম ছিল। বরং আমি চাইছিলাম, এ রাগ আরো দীর্ঘ, আরো গাঢ় হোক। কেননা তাতেই আমার নিরাপত্তার বোধটা আরো বলিষ্ঠ হয়।

পরদিন গর্ব করে ক্লাসের বন্ধুদের, জুঁইয়ের এমন উদার মন-মানসিকতার গল্প শোনাতে গিয়ে এক ব্যাখ্যাতীত বিবমিষায় আক্রান্ত হই। গল্প শুনে মোস্তফা বলে, “দেখ গিয়ে পাতিলের কালির মতো কালো আর কঙ্কালসাড় হাড়গোরসর্বস্ব এক পেত্নী হবে সে। তার তো একটা পেনিস হলেই হয়। ফলে নিজের উদারতার বাড়াবাড়ি প্রদর্শন করে সে আসলে তাকে দেখার পর তোর উদারতাটাকে কনফার্ম করতে চাইছে।” উপস্থিত বাকিরা হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। এত বিশ্রী লাগল দৃশ্যটা যে আমি উঠে এলাম। বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছি যখন, জানালা দিয়ে শুনতে পেলাম জিকু বলছে, “এ জীবনে আমি জুঁই নামের কাউকে সুন্দরী হতে দেখিনি। সবগুলোকেই দেখেছি দুঃস্বপ্নের মতো ভয়ঙ্কর হতে।” আর এতেও অন্যরা সশব্দে হেসে উঠল। আমি দৌড়ে পালালাম। জুঁইকে এমন বাজারী আলোচনার বিষয় করে দেওয়ায় খুব রাগ হলো নিজের ওপর। দোষটা তো আমারই।

কিন্তু যা হলো, সে রাতেই ভয়ঙ্করদর্শন এক জুঁইকে স্বপ্ন দেখলাম। ড্রাকুলা মার্কা দাঁত, নোংরা চুল আর আশি বছরের কোনো ডাইনি বুড়ির এক বিকট প্রতিকৃতি। এটাই ছিল স্বপ্নের জুঁই, আমি থরোথরো ভয়ে যার খসখসে হাত ধরে পার্কে হেঁটে বেড়াচ্ছি। লাফ দিয়ে ঘুম ভাঙে আমার। মনে পড়ে, মাইগ্রেনের ব্যথার জন্য জুঁই রাত দুটোর দিকেই শুয়ে পড়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, ভোরের স্বপ্ন কি সত্যি হয়? মুহূর্তেই আবার মনে হলো, এ কথা ভাবছি কেন! তার মানে সত্যি হলে, অর্থাৎ জুঁই দেখতে সত্যিই ওরকম হলে আমার তবে আপত্তি? এই তবে ভেতরকার আমি! নিজের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সবচেয়ে গোড়ার দিকের আমার স্বরূপ তবে এই! প্রতিটা রক্ত কণিকায় আত্মধিক্কারের তীব্র আলোড়ন আমাকে পাগল করে ছাড়ল। নিজেকে শাস্তি দিতে ছুরি দিয়ে আমি হাত কাটতে লাগলাম। কিন্তু কিছুই টের পেলাম না। কেননা, কী করে আমার এত সাহস হয় যে, এমনকি ভয়ঙ্কর দেখতে হলেও জুঁইকে আমি ফিরিয়ে দেবার কথা ভাবি!

ঢাকায় গেলাম। আমাদের দেখা হলো। একটা ভোরের ট্রেন আমাকে বিমানবন্দর স্টেশনে নামিয়ে দিল। আর তরতর সিঁড়ি ভেঙে আমি উঠে গেলাম ওভারব্রিজে। কেননা ওখানে নির্ধারিত একটা কোনে দাঁড়িয়ে জুঁই দাঁত মাজছে। এটাই ওকে চিনবার কোড। সারারাত আমরা ‘লাইনে’ই ছিলাম। আমি ট্রেন থেকে আর জুঁই ওর বাসা থেকে। ভোর পাঁচটায় ফোন রেখে ও চেঞ্জ করল। আর আবার কথা বলতে বলতে বেরিয়ে পড়ল বাসা থেকে। ও যখন সিএনজিতে উঠল, আমার ট্রেন তখন ঘোড়াশাল ব্রিজ পার হচ্ছে। কিন্তু ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে এ কাকে আমি দাঁত মাজতে দেখছি! পরী বললেও ভুল হবে। পরীর চেয়েও পরী দেখতে ও। হা হয়ে গেলাম। ঠোঁটের কোণে মোস্তফা জিকুদের জন্য একটা তাচ্ছিল্যের হাসি না চাইতেও ফুটে উঠল। আর নিজের জন্য হলো করুণা। এই তো, ট্রেন থেকে নামার ঠিক আগেও বাথরুমে ঢুকে নিজের চেহারার মুখোমুখি হলাম। একে কি চেহারা বলা যায় কিনা কে বলবে! আর এই বেহেশতী হুর, বলা চলে, বিভ্রান্ত হয়ে আমার মতো এক চামারের জন্য এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। একবার ভাবলাম, আমাকে চিনতে পারার তো কোনো কোড নেই, পালিয়ে যাব নাকি! কিন্তু হতবিহ্বল দাঁড়িয়ে পড়া আমার কাছে এসে জুঁই-ই প্রথম কথাটা বলল, “দাঁত মাজবে?”

একবারের জন্য মনে হলো, যাক! আমি দেখতে অন্তত আমারই মতো তাহলে। নয়তো জুঁই আমাকে চিনতে পারল কিভাবে? ওভারব্রিজে আরো তো মানুষজন ছিল। আমার বয়সীই আরো দুয়েকজন ছিল, নিজের চোখে দেখা। নিশ্চয়ই এমন হয়নি যে, সেকেন্ড কিংবা থার্ড অফারে ও সত্যিকারের আমাকে খুঁজে পেয়েছে! সেরকম হলে আমার দেখা আমার বয়সীগুলোর কারো মুখে ঠিকই টুথপেস্টের ফেনা লেগে থাকত। যেমন আমি ওর মাজতে থাকা ফেনাসুদ্ধই ব্রাশটা নিজের মুখে পুরে নিলাম। ও বলল, “ওয়াক থু!” পরবর্তী এক বছর নিয়মিত আমি কোলগেট টুথপেস্টটাই ব্যবহার করতাম, ওর মুখের ফেনার স্মৃতি জাগিয়ে রাখার জন্য।

ও বলল, “জেগে থাকতে সমস্যা হবে না? সারারাত তো একটুও ঘুমাওনি।” কী জানি, ভাবিনি এ বিষয়ে। সাধারণ অর্থে তো সমস্যা একটু হবারই কথা। কিন্তু সঙ্গে জুঁই থাকা সত্ত্বেও এটা নিশ্চয়ই ভালো দেখাবে না যে, পাশেই নাক ডেকে আমি ঘুমাচ্ছি! জুঁই বলল, “চলো কোথাও গিয়ে দু-মুহূর্ত একটু ঘুমাই।” স্বপ্নের মতো লাগল কথাটা। বিশেষত ‘দু-মুহূর্ত’ ঘুমানোর ব্যাপারটা। অবশ্য ওর মধ্যে আগে থেকেই ব্যাপারটা ছিল, খানিকটা কবি কবি ভাব! এই তো সেদিন আকাশে একটু মেঘ করল বলে মেসেজ পাঠিয়েছিল ‘আজকে আমার মেঘলা দিন, আজকে আমার একলা দিন।’ বুঝলাম ওই ঔদাসীন্যই এখানে দু-মুহূর্তের ঘুম হিসেবে হাজির হয়েছে। বললাম, “আমার তো চেনা কেউ নেই ঢাকায়। কোথায় ঘুমাব? আর তুমিই বা কোথাও আমাকে নিয়ে ঘুমাতে যাবে কী করে!” দু-মুহূর্ত ভেবে ও বলল, “চলো আমরা একটা ইয়োলো ক্যাব ভাড়া করে ফেলি, তারপর ক্যাবের ভেতর ঘুমাই।” আইডিয়া খারাপ না। নয়টা দশটার দিকে জেগে উঠে ফ্রেশ একটা দিন শুরু করা যাবে। ভাবলাম আমি।

অচেনা ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোয়, কখনো জ্যামে আটকে, কখনো ফাঁকা রাস্তার দ্রুতটানে, টানা সাতদিন এক নাগাড়ে হালচষে ক্লান্ত মহিষের মতো গায়ের জোরে আমি ঘুমালাম। ঠিকই সেই ওর পাশে বসে! কিন্তু ফাঁকে ফাঁকে সেই ঘুমও ভাঙল। চোখ খুলে, কিছুই বুঝে উঠতে না পারা দৃষ্টিতে ক্যাবের জানালা দিয়ে আড়াআড়িভাবে কত যে সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। একবার দেখলাম আজাদ প্রোডাক্টসের সাইনবোর্ড। এরা কী কারণে যেন বিখ্যাত? ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। দেখলাম তোতা পাখি কাঁধে নিয়ে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে। ক্যাবল লাইনের জঞ্জালে কাকেদের পুরনো হাগু। জুঁইও ঘুমাচ্ছে আমার পাশে। আমাদের দূরে কোথাও পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে। পৌঁছে ড্রাইভার আমাদের ডেকে দেবে। দূরে কোথাও পৌঁছাতে সত্যিই অনেক দেরি হয় আমাদের।

শহরের প্রায় আরেকটা কোনো প্রান্তে, নাকি শহর ছাড়িয়ে, কোথায়, তা আমার মনে নেই। এরমধ্যে আমরা প্রায় তিন ঘণ্টার কাছাকাছি সময় ধরে ঘুমিয়েছি। ভাবলে এখনো অবাক লাগে, এর আগে যে আমার কোনো যোগ্যতাই ছিল না, কোনো একটা এমনকি মাঝারি মানের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে বসেও কথা বলবার, সেখানে পরীরও পরীর মতো একটা মেয়ের পাশে আধশোয়া হয়ে, বিশ্রীভাবে হা করে আমি ঘুমাতে পারলাম কী করে। কিন্তু আজ বুঝি, ক্লান্তিই সেই মহান মনোযোগের যথার্থ দাবিদার, যার দাবি না মেটালে আদতে আর কোনো দাবিই মেটানো সম্ভব হয় না। ‘আজকে বুঝি’র ভারিক্কি চালটার ব্যাপারে একটু ব্যাখা দেওয়া প্রয়োজন, জানানো প্রয়োজন, সেদিনের সেই বেকার ও নির্ভার লোকটা, আমার মধ্যে কোথাও আজ আর বেঁচে নেই। পারিবারিক দারিদ্র্য আর বাস্তবতার অনিবার্য ঘাঁয়ে লোকটার গলিত অবয়বটিও এখন বাষ্পাতীত। গত চার বছর ধরে একটা পত্রিকা অফিসে কম্পোজিটরের চাকরি করি আমি। টোলারবাগে সরকারি কোয়ার্টারগুলোর একটায় ছোট একটা রুম ভাড়া করে থাকি। সে যাই হোক, নিজের দরিদ্রতার বর্ণনা দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা আগের মতো নিশ্চিন্ত নির্ভার জীবনটা আর নেই।

আমরা যেখানে গেলাম, দেখতে অনেকটা গ্রামের মতো। ব্যস্ততম দালানগুলোর ফাঁক ফোকর দিয়েও পেছনের ধানক্ষেত উঁকি দিচ্ছে। আমরা একটা ধানক্ষেতের মধ্যদিয়ে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যেই আরো অসংখ্য ধানক্ষেত পার হতে থাকি। সিনেমার দৃশ্যের মতো জুঁই আমাকে টেনে নিয়ে যায়। যেন এক গোপন সংকেত মান্য করে করে একটা আঁল থেকে পরবর্তী দুটো আঁলের একটাকে বাছাই করতে করতে এগোয় ও। যেন একেবারে শেষে, সবচেয়ে অবাক করে দেওয়ার মতো ঘটনাটা ঘটবে। আর হলোও তাই, একমাঠ সমান ঝকঝকে মেঝের একটা ধানের কলে গিয়ে আমরা উঠলাম। এখানে ওখানে টুকরো টুকরো মেঘের মতো শুকোতে দেওয়া ধান।

জুঁই জানাল, সেদ্ধ ধানের গন্ধ ওর খুব পছন্দ। আমার মনে হলো, এ পছন্দের কথা তো ফোনে কখনো বলেনি আগে! কিন্তু আবার ভাবলাম, হয়তো সব পছন্দের কথা ফোনে বলতে হয় না। জুঁই যেমন কবি স্বভাবের, এমন আলাদা কোনো সিদ্ধান্তও যদি সত্যিই ওর থেকে থাকে, মোটেই অবাক হব না।

সারাটাদিন আমরা সেদ্ধ ধানের গন্ধ শুঁকে শুঁকে কাটিয়ে দিলাম। আর যা মনে পড়ে, ধানের কলের পাশেই একটা পুকুর ছিল, আর কবুতরের বিষ্ঠায় ভরে থাকা একটা ঘাট। কবুতরগুলোকে ধানের কলের সবটা জুড়েই সহাস্যে চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছিল। দুপুরে ধানের কলের ম্যানেজার তার অফিসরুমে ডেকে নিয়ে আমাদের ডিমের সালুন দিয়ে ভাত খাওয়াল। তারপর বিস্তীর্ণ মেঝের ছায়া ঢাকা একটা অংশে গিয়ে বসবার পর জুঁই বলল, দুপুরের পর নাকি কবুতর এমনভাবে ডাকে, যাতে করে মানুষের ঘুম পায়। ও বলার কারণেই কিনা কে জানে, কবুতরগুলোর নিরবচ্ছিন্ন বাক্ক্-বাকুম্ম শব্দে সত্যিই একটা ধান ভাঙানোর হাত-মেশিনের কাছে গিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। একদমই ঘুমিয়ে পড়বার মুহূর্তে মেশিনটাকে আমি সাব্যস্ত করলাম ‘ঘুরন্ত কোলবালিশ’ বলে।

যখন উঠলাম, পরিপূর্ণ বিকেল। টের পেলাম এবং স্বচক্ষেও দেখলাম যে, আমার মাথার নিচে জুঁইয়ের কোল। ঈষদুষ্ণ, খুব পুরনো নয় একটা রঙের গন্ধভরা ওর কোলটাকে আমার এক টুকরো মাতৃগর্ভের মতো লাগল।

কিন্তু এবার ফিরতে হবে। সন্ধ্যার পর আমার ট্রেন। দুটো বাসে চড়ে আমাদের ফিরতে হলো। প্রথম ফাঁকা বাসটার একদম পেছনের কোনায় বসে জীবনে প্রথম কাউকে ঠোঁটচুমু খেলাম। সমস্ত শরীর, পরিস্থিতির তুলনায় অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে ঠাঁ ঠাঁ করে কাঁপল। জীবনে প্রথম যখন কারো জিভ চাটছি, নুন ছিটানো কাঁচা ঝিনুকের স্বাদে আলোড়িত হচ্ছে মগজ। ফলে চুমুর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতেও পরবর্তীতে নুন ছিটানো কাঁচা ঝিনুক খেতে হয়, তবে, ব্যাপারটা চূড়ান্ত রকমের হতাশাজনক, অর্থাৎ চুমুর স্মৃতির তাতে কানাকড়িও ফিরে আসে না। মনে পড়ছে ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইয়ে মার্গারেটকেসহ বা ছাড়া সুনীলের কাঁচা ঝিনুক খাওয়ার বর্ণনা। আমরা আরো পাগল হয়ে উঠি এবং একপর্যায়ে অন্য যাত্রীদের আপত্তি সাপেক্ষে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে মাঝপথে আমাদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বাসের প্রয়োজন পড়ে মূলত এ কারণে। নেমে দেখি সূর্য ডুবছে। তারপর হাইওয়ের অল্প দূরে একটা গির্জা পেয়ে ওটায় ঢুকে পড়ি। আর দুজনে মিলে অসহ্য সব চুমু খাই।

যখন ট্রেন ছাড়ল, আমার জানালা ঘেঁষে প্লাটফর্ম ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথাটা ও বলল। “যদি আর খোঁজ না থাকে, ঠিক দশ বছর পর এই তারিখে এই স্টেশনের ওভারব্রিজে থেকো, বিকেল পাঁচটায়।” সত্যি বলতে, তখন পর্যন্ত বাক্যটাকে যে আবার আমাকে সাজিয়ে মনে করতে হবে কখনো, বুঝতেই পারিনি। উল্টো বোকার মতো হাসি হাসি মুখে হাত নাড়তে থাকি। বলতে গেলে, তার কিছুক্ষণ পর থেকেই দশ বছরের জন্য ও হারিয়ে গেল। ট্রেন যখন টঙ্গী স্টেশন পার হচ্ছে তখনই ফেরার কিছু পেল কিনা জানতে ওকে কল দেই, আর নাম্বার বন্ধ পাই।

অবশ্য তাতেই যে আমি বুঝে ফেলি, অন্তত দশ বছরের জন্য ও হারিয়ে গেছে, তা নয়। প্রথমত ভাবি, হয়তো ফোনের চার্জ শেষ। আর সেটা স্বাভাবিকও ছিল, কারণ সারারাত কথা বলার পর দিনে আর ফোন চার্জে দেওয়ার সুযোগ হয়নি। এ ধারণা আরো মজবুত হয়, যখন ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমার নিজের ফোনটাও বন্ধ হয়ে গেল।

এরপর ট্রেনের মধ্যে, জানালায় মাথা এলিয়ে সারাটা পথ আমি একটা খামচে থাকা ঘুমের সঙ্গে লেপ্টে রইলাম। পরবর্তী দুয়েকদিনেও যখন ফোনটা আর অন হলো না, তখন, জানালার পাশে প্লাটফর্মে হাঁটতে হাঁটতে ওর বলা, প্রায় ভুলে যাওয়া কথাটা মনে পড়ল। যেন অনেক ঘুমের নিচে চাপা পড়ে ছিল কথাটা। কিন্তু তাই বলে এরকম ছেলেমানুষি একটা কথাকে ও সত্যিই বাস্তবায়িত করতে চাইবে, এটাই বা মেনে নিই কী করে! তার মানে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? আমি আর কিছুই ভাবতে পারলাম না।

মোস্তফা বলল, ওর আসলে আমাকে পছন্দই হয়নি, সরাসরি কথাটা বলতে না পেরে এখন ফোন অফ রেখে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাহলে বাসের মধ্যে, হাইওয়ের পাশের গির্জায় আমাদের যে মুহূর্তগুলি, ওগুলোর কী ব্যাখ্যা? জিকু বলল, ঢাকায় ওরকম পার্টি নাকি অনেক আছে। মূলত বেশ্যা, মাঝেমাঝে একটু রিলেশনশিপের ওম লাগে, এরকম আরো অনেকের কথাই নাকি সে জানে। ঘুষি মেরে আমি জিকুর নাক ফাটিয়ে দিলাম। বুঝতে পারিনি, এতটা রক্তারক্তি হবে। সবাই ওকে ধারেকাছের কোনো একটা ফার্মেসিতে নিয়ে গেল। আমি আগ বাড়িয়ে ওর বাসায় চলে গেলাম, বাসায় গিয়ে ওর মাকে বলে আসলাম, “এটা কী করে সম্ভব যে, আপনার ছেলে ঢাকার অনেক বেশ্যাদের সম্পর্কে হুবহু অনেক কিছুই জানে!” বলেই বেরিয়ে এসে রিকশা ভাড়া করে শহরের বাইরের একটা মাঠে নিয়ে নিজেকে শুইয়ে দিলাম।

আসলে ওই সময়টায়, পরবর্তী একটা বছর পর্যন্ত, কখন কোথায় আমি জেগে ছিলাম বা ঘুমাচ্ছিলাম, তার কোনো হিসেব আমার কাছে ছিল না। আমাদের প্রেম ছিল মাস কয়েকের, তাই সবাই ভেবেছিল, পরবর্তী মাস কয়েকেই ব্যাপারটা চুকে যাবে। কিন্তু আমি সবার সংঘবদ্ধ ধারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে এক জুঁইয়ের ব্যাপারেই নিজেকে আরো আরো পাগল করে তুললাম। আর উঠতে বসতে, কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারলাম না এজন্য যে, একজন অন্তত কোনো বন্ধুবান্ধব অথবা পরিচিত কারো ফোন নাম্বারও কখনো আমি চাইনি জুঁইয়ের কাছে! আমি শুধু জানতাম ও ঢাকায় মাটিকাটা নামের একটা জায়গায় থাকে। মা-বাবা আর একটা বোনসহ ও থাকে, ও বলেছিল।

কোন একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে যেন পড়ত। আশ্চর্য যে, ইউনিভার্সিটির নামটাও কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। জুঁইয়ের সম্পর্কে আমার বাহ্যিক জানাশোনা যে এত কম, আমি নিশ্চিত, ও হারিয়ে যাওয়ার আগেই কখনো যদি এটা আমি টের পেতাম, তখনও এ নিয়ে আমাকে লজ্জিত হতে হতো।

ছয় মাস পর আবারও একটা রাতের ট্রেনে চেপে আমি ঢাকায় চলে যাই। আগেরই মতো খুব ভোরে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে নেমে, দৌড়ে গিয়ে ওভারব্রিজে উঠে আগেরবারের মতো ওকে আর কোথাও না পেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে আমি কাঁদতে থাকি। চারপাশে লোক জমে যায়। জিজ্ঞেস করে, আমার সমস্যা কী। আমি কিছুই না বলে দৌড়ে পালাই, আর স্টেশনের বাইরে গিয়ে একটা ইয়োলো ক্যাব দাঁড় করিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি, এখান থেকে এখন রওনা দিলে তিনঘণ্টা পর ঢাকার অন্য কোন কোন প্রান্তে গিয়ে পৌঁছানো সম্ভব? ড্রাইভার ক্যাবের গতি বাড়িয়ে দেয়। দিনভর মাটিকাটা এলাকায় ঘুরে বেড়াই। বিকেলে খেতে বসে মাটিকাটারই একটা খাবার হোটেলের ক্যাবিনে ঘুমিয়ে পড়ি। কেউ ডিস্টার্ব করে না। যখন জেগে উঠি, রাত হয়ে গেছে। বের হয়ে সিএনজি নিয়ে আবার স্টেশন এবং সেখান থেকে আবার ট্রেন।


বার্তা২৪.কম-এর শিল্প-সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা
[email protected]


প্রথম এক বছরের মধ্যে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। সবচেয়ে বড় কথা, এক পর্যায়ে বুঝতে পারলাম যে, ব্যাপারটা আমার দ্বারা কিছুতেই সম্ভব নয় ঘটানো। আর তাতেও নিজের ওপর বিরক্তি বাড়ে। আমি তো জানতাম, কখনো জুঁই না থাকলে, আমিও আর বাঁচব না। কিন্তু সত্যিই যখন নেই, মরতে গিয়েও মরতে পারা যাচ্ছে না। এ সময় মোস্তফার একটা একদমই হাসিচ্ছলে বলা কথাকে আমি আকড়ে ধরি। ও বলেছিল, “আরে মরবিই যদি, দশ বছর পর ওইদিন ওভারব্রিজে যাবে কে, আমি? গিয়ে বলব, বহু আগে, অন্তত নয় বছর আগেই তুই মরে ভূত?” তাই তো। দশ বছর পর তো ও থাকবে। একই তারিখ, বিকেল পাঁচটায়। কিন্তু এত দীর্ঘ অপেক্ষার ভার নিয়ে কিভাবে একজন মানুষ তার স্বাভাবিক জীবন যাপন চালিয়ে যেতে পারে, যে জীবনের প্রতিটা ফাঁক ফোকরেই আসলে ওই এক অপেক্ষাই নাক গলিয়ে থাকে!

এত আয়োজন সত্ত্বেও পরবর্তী একবছরে জুঁইকে আমি পুরোপুরি ভুলে যাই। এই ভুলতে পারার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে, বাবার মৃত্যু। আর সেই সূত্রে হঠাৎই আমার একটু তাড়াহুড়ো করে বড় হয়ে যাওয়া। এরমধ্যে নতুন আরেকটা প্রেমও হয় আমার। একই শহরের, সংস্কৃতিকর্মী টাইপের একটা মেয়ের সঙ্গে। বাংলা বর্ষবরণ, রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তীর মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোয় একক ও দলীয়ভাবে গান গাইত। নাম, শোভা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে আমাদের শহরে থাকত। সত্যি বলতে, এ প্রেমটাও খুব জমে যায়। আর একপর্যায়ে তো এমনও মনে হয় যে, কোথাকার কোন জুঁইয়ের জন্য কিনা মরতে বসেছিলাম!

শোভা একদিন জানতে চাইল, এখনো আমি জুঁইকে মনে রেখেছি কিনা। চমকে উঠি প্রশ্ন শুনে। আর জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টা ও জানল কিভাবে। বলল, এ ব্যাপারে জানে না, এমন লোক নাকি খুব কমই আছে। ব্যাপারটাকে একটা ফালতু প্রসঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করে আমি শোভার হাত ধরি। ওকেসহ রিকশায় শহর ঘুরে বেড়াই। সন্ধ্যার পর চুমুও খাই। এভাবে বছর খানেকের মধ্যে আমরাই আমাদের সবচেয়ে মেইনস্ট্রিম প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে উঠি। ফলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে চাপা পড়ে যায় একদিনের জুঁই।

বছর খানেকের শোভাও অবশ্য অনিবার্যভাবেই একদিন নিজের বিয়ের কথা জানিয়ে যায়। আর খুব অনুরোধ করে, এ ব্যাপারে আমি যেন কোনো পাগলামি না করি। আসলে সব মিলে আমি খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই শোভার এমন প্রতারণার জবাবে আমি প্রায় কিছুই করলাম না। শুধু মাসখানেকের জন্য দূরসম্পর্কের এক খালার বাড়িতে, অন্য আরেকটা শহরে গিয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকলাম।

তারপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমভাবে ছিলাম। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে গত চার বছর ধরে ঢাকায়। এরমধ্যে জুঁইয়ের কথা খুব একটা আর মনে পড়েনি। আবার একেবারেই যে পড়েনি, তাও নয়। কিন্তু আমি ধরে নিয়েছিলাম, জুঁইয়ের ব্যাপারে জিকুর করা মন্তব্যটাই হয়তো ঠিক। মনে হয়েছে, হয়তো এমন হয়ে থাকবে, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে, প্রেম করিয়ে মফস্বল থেকে কাউকে ঢাকায় নিয়ে আনতে পারা না-পারা বিষয়ে ধরা কোনো বাজির অংশ ছিলাম আমি। অবশ্য সেসব নিয়েও আলাদা কোনো দুঃখের অনুভূতি এতদিনের ব্যবধানে আমার মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না।

তবে একদমই অভ্যেসবশত এ দশ বছরের পুরোটা সময় জুড়েই ওর নাম্বারে আমি মাঝেমাঝেই ডায়াল করে গেছি। কিন্তু তা কোনোভাবেই ওকে ফিরে পেতে চেয়ে নয়, বা এমনকি আবার কোনো যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হোক, সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেও নয়। আগাগোড়াই অভ্যেসবশত। এমনও হয়েছে, দিনের পর দিন আমি ওই নাম্বারে ডায়াল করেছি, অন্তত এই ব্যাপারেও সতর্ক না থেকে যে, মূলত এ নাম্বারটা কার। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এরমধ্যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম দশ বছর পর, কোন মাসের ঠিক কত তারিখে আবার আমাদের দেখা হবার কথা! মোটকথা এটা একটা পরিত্যাক্ত প্রসঙ্গ হিসেবে জীবনের কোনো এক কোনে পড়ে ছিল।

তবু চুক্তি অনুযায়ী দশ বছর পরের নির্ধারিত দিনে আমি যে ওভারব্রিজে এসে হাজির হতে পারি, এটা সম্ভব হয় শুধু এ কারণে যে, ঠিক একদিন আগেই লন্ডন থেকে ফোন করে মোস্তফা আমাকে, কালকে ওভারব্রিজে যাচ্ছি কিনা জিজ্ঞেস করে। ওকে অবশ্য বিশ্বাস করানো যায়নি, নিজে আমি তারিখটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু বেশ অবাকই হতে হলো, এতদিন ধরে তারিখটা ওর মনে রেখে দেওয়ার ঘটনায়। এমনকি তারপরও বিকেল পাঁচটায় বিমানবন্দর স্টেশনের ওভারব্রিজে আমি যাব কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যাতীত একধরনের কৌতূহল আমাকে গ্রাস করে ফেলল। বিকেল তিনটার দিকে জরুরি ছুটি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ি। আর জ্যামেধরা শহরের এক মাথা থেকে রওনা দিয়ে আরেক মাথার বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছাতে সোয়া পাঁচটা বেজে যায়। ওভারব্রিজে উঠে, দশ বছর আগেকার সেদিনের মতোই জুঁইকে আমি দেখতে পাই আবার। ওই যে বললাম, হঠাৎই থমকে দাঁড়ায় আমার বড় হতে থাকা? আসলেই ব্যাপারটা তাই। জুঁই এগিয়ে এসে বলল, “এখন বোধহয় এ শহরেই থাকো?” আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। ওকে ঘিরে সেই আবেগ, সেই উত্তেজনা তো আর নেই, উল্টো দশ বছর পর ওর এমন উপস্থিতি খানিকটা ভূতুড়েই ঠেকল।

যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে আমি বললাম, “তুমি তো একটুও বদলাওনি! ঊনিশ বছরের তুমিই রয়ে গেছো।” ও হাসল, বলল, “আমি তো একই রকম থেকে যাই!” আমিও হাসলাম, কবি স্বভাবটা আর গেল না ওর। ওকে বলি, “আমি জানি, তুমি কারো সঙ্গে বাজি ধরেছিলে।”

“যেমন?” জানতে চায় ও। সব ওকে খুলে বলি, ওর জন্য আমার প্রথম এক বছরের পাগলপ্রায় দশার কথা, ছয় মাস পর ঢাকায় এসে ওকে খুঁজে বেড়ানোর কথা, ওকে নিয়ে জিকুর মন্তব্য, আর এক পর্যায়ে ওই মন্তব্যেই নিজের বিশ্বাস স্থাপনের কথা। সব শুনে বিস্ময়করভাবে ও কাঁদতে শুরু করল। বুঝলাম আমার করুণ দশা শুনেই এ কান্না। সুতরাং ঔদার্যে আমি হৈ হৈ করে উঠি, “আরে! কাঁদছো কেন? ওসব ফিলিংস এখন তো আর নেই। কত আগের কথা সেসব!” আর এও জানাই যে, মোস্তফা ফোন না করলে আমার যে আজকে আসাই হতো না।

“বরং এবার বলো, কী ধরনের বাজি ছিল সেটা, এখন কোথায় আছো, বিয়ে করেছো?” জানতে চাই আমি। হতভম্ব মুখে ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। একবার নিজেকেই শুনিয়ে বলে, “তার মানে”... তার মানে? কী তার মানে? “তারমানে তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না? চাও না এখন আর?” সত্যি না রসিকতা বোঝার চেষ্টা করি। বুঝতে না পেরে বলি, “মানে এটা কী ধরনের রসিকতা হচ্ছে, তুমি নিশ্চয়ই বলবে না যে, সত্যিই তুমি আমার সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় কাটাতে এখানে এসে হাজির হয়েছো? দশ বছর পর!” জুঁই কাঁদল, সে কান্না থামাতেও পারল। বলল, “আমি তো সত্যিই তোমার কাছেই এসেছি। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে না?” দিশেহারা হয়ে আমি ওর দুই বাহু ধরে ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় ছিলে এতদিন!”

“নিয়ে যাবে না তোমার সঙ্গে?” বারবার একই কথা জানতে চায় ও। আমার মধ্যে কী হলো, বলে বোঝানো যাবে না। হঠাৎ করে না চাইতেই, আরো ভালোভাবে বললে, চাওয়া যে যেতে পারে, সেই ধারণারও অনেক দূরে থেকেই সব পেয়ে যাওয়ার যে আনন্দ আর উত্তেজনা, আমার মধ্যে তার সবটা এসে ভর করল। একেবারে পাগল হয়ে গেলাম আমি। প্রকাশ্যে, ব্যস্ত স্টেশনে চড় থাপ্পড় দিতে দিতে ওকে আমি চুমু খেতে লাগলাম।

সে রাতেই বিয়ে করতে আমরা কাজী অফিসে যাই। কিন্তু রেজিস্ট্রি খাতায় পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি লিখবার প্রসঙ্গ যখন আসলো, জুঁই বলল ও এসব তথ্য দিতে চায় না। কেন, জানতে চাই না। কাজীকে বলে দুটো ফেইক নাম আর একটা ফেইক স্থায়ী ঠিকানা সেখানে বসানোর ব্যবস্থা হয়। আর জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্ট কোনোটাই ওর না থাকায় সে ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে ভালো অংকের ঘুষ দিতে হয় কাজীকে। ঢাকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেসে থাকাকালে বন্ধুত্ব হওয়া রুমমেটদের ডেকে এনে কাউকে উকিলবাপ, কাউকে সাক্ষী ইত্যাদি বানিয়ে আমাদের বিয়ে হয়। হুট করে ভয়াবহ রকমের সুখী হয়ে, সুখানুভূতির ব্যাপারটাই আমার অবশ হয়ে গেল। সবকিছু যে এতটা স্বপ্নের মতো আসলেই হয়ে উঠতে পারে কারো জীবনে, বহু বইপত্র পড়েও আগে এ ব্যাপারে জানতে পারিনি। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল সবকিছু।

কিন্তু জগত্ সংসারের কিছু কমন প্রশ্ন এসে আমার মাথায়ও গুঁতো দিল, যেমন, জুঁই এ দশ বছর কোথায় ছিল, কিভাবে, কাদের সঙ্গে ছিল, এরকম নানা প্রশ্ন। কিন্তু আবার নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম, যতদিন না নিজে থেকে ও কিছু বলবে, আমিও এ ব্যাপারে কিছুই ওকে জিজ্ঞেস করব না।

করলামও না। এমনকি, ওভারব্রিজে এসে দাঁড়ানোর আগেই ও কোন এলাকা থেকে বেরিয়ে এসেছে, ওর ওই মা-বাবা আর বোন তারা কোথায় থাকে এখন, বিয়ের খবরটা তাদের দেওয়া উচিত কিনা, কিংবা কেনই বা রেজিস্ট্রি খাতায় বাবা মায়ের ফেইক নাম দিতে হলো, এসব কোনো ব্যাপারেই কিছুই ওকে জিজ্ঞেস করলাম না। যেন ও যদি একটা ধূমকেতুও হয়ে থাকে, আর ওর কাজ যদি হয় দশ বছর পর পর পৃথিবীতে এসে দুয়েক মাস আমার সঙ্গে সময় কাটিয়ে যাওয়া, তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। আর কী অবাক, কত কিছু নিয়েই আমাদের কথা হলো, কতখানেই আমরা বেড়াতে গেলাম, কিন্তু কোনোভাবেই নিজে থেকে জুঁই ওর নিজের অতীত, বা শেষ দশ বছরের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছুই বলল না। নিজের কাছেই একদিন অস্বাভাবিক লাগল বিষয়টা, তার কারণ হয়তো এই যে, ততদিনে বিয়ের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে।

“আবার কবে উধাও হচ্ছো?” আপাত অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে, কিন্তু এ প্রশ্নে ওর চেহারার স্বল্পতম পরিবর্তনটুকুও আমাকে বুঝে নিতে হবে, আগে থেকেই ঠিক করে রাখা এমন পরিকল্পনায়, ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় প্রতিবিম্বিত ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করি। ও হাসে, নিঃশব্দে। প্রতিবিম্বিত চেহারার ব্যাপারে অসচেতন বলেই কি? “বললে না?” আবারও জানতে চাই। এবার ও সশব্দে হাসে। যেন খুব ছেলেমানুষি কোনো প্রশ্ন। বলল, “কেন, যে কোনো মুহূর্তেই তো!”

“হুঁম, আমারও তাই ধারণা।” বলি আমি। জুঁই বলল, “আচ্ছা তুমি কি আমার অতীত, এ দশ বছর কোথায় ছিলাম, এসব জানতে চাচ্ছো? ভাবছো খুব অন্ধকার কোনো জগতে আমি ছিলাম কিনা?” এবার আমিই লজ্জিত হই। বলি, “অন্ধকার জগতের কথা ভাবিনি।” কিছু ভাবল ও। আর বলল, “ধরো অন্ধকার জগতেই যদি ছিলাম, ভালোবাসবে না আর, অপেক্ষা করবে না?” আমার আশঙ্কার অ্যাঙ্গেলগুলো ও বুঝে ফেলছে, আর তাই খানিকটা ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে ফেরানোর মতো করে আমি বলি, “বাদ দাও এসব। যেখানে ইচ্ছে সেখানে ছিলে, এখন আমার সঙ্গে আছো, এটাই যথেষ্ট।” মজা করতে চেয়েই মূলত, যোগ করি, “আবার হারিয়ে গেলে কোথায় খুঁজব?” ও হেসে বলল, “কেন, বিমানবন্দর স্টেশনের ওভারব্রিজ!” আর এ জবাবে দুজনেরই খুব হাসি তামাশা পায়।

তবু ও আবার চলে যাবে এ আশঙ্কাটাকে আমি তাড়াতে পারি না। করুণ চোখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর দিকে তাকিয়ে থাকি, ও চোখ নামিয়ে নেয় না, আবার কিছু জিজ্ঞেসও করে না। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকার একপর্যায়ে আমি টের পাই ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক আর স্বাভাবিক নয়। নিজেদের মধ্যে গল্প করারও কোনো বিষয় আমরা খুঁজে পাই না। জুঁই যেহেতু ওর অতীত বা গত দশ বছরের জীবনের ব্যাপারে একেবারেই মুখ খোলে না। ফলে ও যা বলে ওঠে মাঝেমাঝে, তাও এই গত চার মাসের বিবাহিত জীবন আর দশবছর আগে ফোনে বলা আমাদের কথাবার্তা এবং ওই দফার শেষদিনের বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতিচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

এমনকি ওর থুতনিতে বছর কয়েকের পুরনো একটা কাটা দাগ দেখেও এটা জানার উপায় থাকে না, কিভাবে এমনটা হয়েছিল বা ও যখন শাকিরার ওয়াকা ওয়াকা গানটা গুনগুন করে কখনো, জিজ্ঞেস করা হয় না ওই বছরের বিশ্বকাপের সময় কোথায় ও ছিল। আমি বলি, “গানটা খুব ভালো ছিল, ওই বিশ্বকাপের সময়ই আমি ঢাকায় চলে আসি।” ও উৎসাহিত হয়, বলে, “বিশ্বকাপ চলার সময়, নাকি শেষ হয়ে যাওয়ার পর?” বলি, “চলার সময়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের দিন।” জুঁই হাসে, ইনফর্মড হওয়ার ভদ্র ও মাপা হাসি। কিন্তু নিজের বিশ্বকাপের ব্যাপারে নীরব থাকে।

সে রাতে শাকিরাকে স্বপ্ন দেখি। সেদ্ধ ধানের স্যাম্পল নিয়ে শাকিরা আমার অফিসে আসে। আর নিজেকে দশ বছর আগের ওই ধানের কলের বর্তমান ম্যানেজার দাবি করে ওয়াকা ওয়াকা বলতে বলতে একটা দুইটা করে ধান ছিটাতে থাকে। রেগে গিয়ে বলি, ‘ফাইজলামি করো! আমি জানি তুমি কে।’ শাকিরা হাসে। বলে, “সবাই যা জানে তুমিও তাই জানো কেন?” আমি দাবি করি, “সবাই যা জানে আমি তা জানি না, আমি অন্যকিছু জানি।” জিজ্ঞেস করে, “কী জানো তুমি?” বলি, “তুমি শোভা, দুই পয়সার রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী”, এবং আমি ইংরেজিতেও বলি, “ইউ আর নট শাকিরা।” ঘুষি দিয়ে আমি নকল শাকিরার নাক ভেঙে দিই। আর স্বপ্নের মধ্যেই একটা রিকশা ঠিক করে আমি শোভাদের বাসায় গিয়ে শোভার মাকে বলি, “এটা কী করে সম্ভব যে দুই পয়সার দলীয়সংগীত শিল্পী নিজেকে শাকিরা বলে দাবি করে!”

পরদিন জুঁই আমাকে জিজ্ঞেস করে, “শোভা কে গো?” আমি ভালো করে ওর দিকে তাকাই। বলি, “তুমি এ দশ বছর কলকাতায় ছিলে?” চমকে ওঠে ও। কিন্তু আবার হাসে, বলে, “আমার তো পাসপোর্টই নেই।”
“সে তো আমাকে ওরকম জানানো হয়েছে বলে নেই, বাস্তবে থাকতে পারে না?” ঠান্ডা মাথায় বলার ভঙ্গিতে বলি। মুহূর্তেই কালো মেঘের মতো হয়ে যায় ও, নাটকীয়ভাবে পানি বেরোয় ওর চোখ দিয়ে। “তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না” কাঁদতে কাঁদতে বলে। আমি বোঝাতে পারি না, এখানে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের কিছু নেই। বিশ্বাস কিংবা এমনকি অবিশ্বাস করতে গেলেও ন্যূনতম ইনফর্মেশন থাকা লাগে, অর্থাৎ ব্যাপারটিকে তো থাকতে হবে, যেটাকে বিশ্বাস করব, অথবা করব না। “তোমার তো কোনো ব্যাপারই নেই!”

তারপর নিয়ম করে প্রায় প্রতিরাতে আমি শোভাকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। হঠাৎ শোভাকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করার কোনো ব্যাখ্যা আমি নিজেকে দিতে পারলাম না। শুধু টের পেলাম, জেগে ওঠার পরও ওই রেশ থেকে যায়। জুঁইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা পুরোপুরি ফর্মাল হয়ে ওঠে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কথাই আর হয় না আমাদের। বরং, জুঁইয়ের চলে যাওয়ার আশঙ্কাটাকেই কেমন যেন সম্ভাবনার মতো লাগতে শুরু করে। মনে হয়, ও এখনো যাচ্ছে না কেন? দশ বছরের জন্য ওর কি কোথাও যাওয়ার নেই আর! যেন এবার আমি শোভার ব্যাপারে একান্তে কিছু ভাববার অবসর চাই। শোভার চলে যাওয়ায় না-জাগা বিরহটাকে জাগিয়ে দেখতে চাই ওটা কেমন। যেন আমি নিশ্চিত হতে চাই, যে কখনো ফিরে আসবে বলেনি, তার চলে যাওয়া বা তার না থাকাই বেশি দামি ছিল কিনা।

অল্প সময়ের মধ্যেই এই চাওয়া এত তীব্র হলো, আর সেইসূত্রে আমার বদলে যেতে থাকাও এত স্পষ্ট হলো যে, আমি নিশ্চিত, ঘাবড়ে গিয়ে জুঁই এখন ওর অতীত এবং গত দশ বছরের সব ঘটনা আমাকে খুলে বলতে রাজি। কিংবা যে কোনো কারণেই হোক, রাজি। বিভিন্নভাবে সে এটা বোঝায় আমাকে। বোঝায় যে, আগ বাড়িয়ে প্রসঙ্গটা ও একা একা তুলতে পারবে না সত্যি, তবে আমি যদি তুলি, ও বলবে। কিন্তু কী অদ্ভুত, প্রেম বলি, থাকা বলি, কী নাটকীয়তা, বা নিদেনপক্ষে স্বাভাবিক কৌতূহল, কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই প্রসঙ্গটা আমি আর তুলতে পারি না। যেন এবার উল্টো আমিই হারিয়ে গেছি ওর থেকে, আর তা, কোথায় আবার আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, না বলেই।

   

গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ধ্রুব এষ



বার্তা২৪ ডেস্ক
শিল্পী ধ্রুব এষ

শিল্পী ধ্রুব এষ

  • Font increase
  • Font Decrease

নান্দনিক প্রচ্ছদ ও অলংকরণশিল্পী হিসেবে দেশে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন ধ্রুব এষ। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ঢাকার পান্থপথের হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এই শিল্পী।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেন, “তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।”

জ্বর সঙ্গে তীব্র কাশি নিয়ে বুধবার এ হাসপাতালে আসেন ধ্রুব এষ। পরিস্থিতি দেখে তাকে এইচডিইউতে ভর্তি করে নেওয়া হয়।

লেলিন চৌধুরী বলেন, "শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণে উনার অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে গিয়েছিল। সে কারণে অবস্থা কিছুটা অবনতির দিকে গিয়েছিল। পরে অক্সিজেন সরবারাহ করা হয়, এখন তিনি স্টেবল আছেন। আমরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি।"

সুনামগঞ্জের সন্তান ধ্রুব এষের বয়স ৫৭ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার ছাত্র থাকার সময় বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা শুরু করেন। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদ ধ্রুব এষেরই আঁকা। তার আঁকা প্রচ্ছদে প্রকাশিত হয়েছে ২৫ হাজারের বেশি বই।

দেশে প্রচ্ছদশিল্পে আধুনিকতা আনার কৃতিত্ব কেউ কেউ ধ্রুব এষকে দেন। আঁকাআঁকির সঙ্গে তিনি লেখালেখিও করেন। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান ধ্রুব এষ।

;

তৃতীয় পক্ষ



ওমর শরিফ
অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এ শহরে বাড়ি আর বাড়ি। ছায়া, শান্তি দেবে এমন গাছ কোথায়? গত বারের তুলনায় এবার গরমটা একটু বেশী পড়েছে। দুপুরবেলা তাই খাঁ খাঁ করছে রাস্তাঘাট। প্রায় জনমানব শূন্য চারিদিক। মাঝে মাঝে কিছু রিক্সা, ট্যাক্সি চলছে এদিক সেদিক। ভাগ্যিস দুই রাস্তার মাঝের ডিভাইডারে সারি সারি গাছ আছে। তবু একটু সবুজ দেখা যায়, তা-না হলে কিযে হতো? কথাগুলো ভাবলো মিতু। কলেজ পড়ুয়া তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মিতু। কলেজে কোন ভাবেই মন বসছিলোনা মিতুর। একটা ঘটনা অস্থির করে রেখেছে তাকে কাল থেকে। তাই মাত্র তিনটা ক্লাস করে বেরিয়েছে ধানমন্ডি লেক যাবে বলে। ধানমন্ডি লেকে অনেক গাছ, অনেক শান্তি। সায়েলা, রবি দু’একবার জিজ্ঞেস করেছে কোথায় যাচ্ছে জানার জন্য। সায়েলা, রবি মিতুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মিতু ওদের মিথ্যে বলেছে।

-বলেছে ‘বড় চাচার বাড়ি যাচ্ছি, চাচা একটু অসুস্থ তাই দেখা করে ওখান থেকেই বাসা চলে যাবো’।     

‘ক্লাস শেষে বন্ধুদের আড্ডা জমে উঠেছিলো খুব তবু ছাড়তে হয়েছে। এই খাঁ খাঁ রোদে কার দায় পড়েছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসার? কল দিলে কল ধরো না, কেটে দাও আবার ব্যাকও করনা! এটা কি ধরনের কথা’? রিক্সার ভাড়া দিতে দিতে বলল মিতু। মিতুর রাগ দেখে সামনে দাঁড়ানো স্বপন মিটমিট হাসছে। ছয় ফিটের মতো লম্বা, ট্রিম করা দাড়ি, মাথার চুল এলোমেলো, একটা হাওয়াই শার্ট সঙ্গে জিন্স পড়া। পায়ে স্যান্ডেলের বদলে স্নিকার পড়েছে আজ। একটু আগোছাল যাকে বলে ‘স্বযত্নে অবহেলা’। স্বপনের এই ব্যাপারটাই দারুণ টানে মিতুকে। ওর মধ্যে কোথায় একটা ব্যাপার আছে। কি নেই, আবার আছে। ঠিক পূর্ণ নয় আবার খালিও নয়। স্বপন মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে। দেশের নামকরা একটা পত্রিকা অফিসে কাজ করে। কথা কম বলে। যা কথা বলে তা ওর গিটার বলে। খুব ভালো গিটার বাজায় স্বপন।      

রিক্সা থেকে নেমে তেড়ে এলো মিতু। ‘কি কানে শোন না। হাসছো আবার, লজ্জা নেই’? রাগে বলল মিতু।

‘আচ্ছা বাবা রাগ পরে হবে। আগে চলো লেকের ভেতরটায় যাই, এখানে অনেক রোদ’। বলল স্বপন। লেকের পার ধরে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাশে থাকা রেস্টুরেন্ট ‘জলসিরি’তে গিয়ে বসলো। রেস্টুরেন্টে লোকজন কম। দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারকে এসিটা অন করে দিতে বলল স্বপন। মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো কি হয়েছে, এতো জরুরি তলব কেন?’

মিতু প্রতিত্তরে বলল, ‘আগে বলো এতক্ষণ ধরে তুমি আমার ফোন ধরছিলে না কেন’? কতোবার ট্রাই করার পর তোমাকে পেয়েছি, তোমার হিসাব আছে? এতো কথার পরও স্বপনকে শান্ত দেখে মিতু আরও খানিকটা রেগে গেলো। বলল, ‘তুমি কি অনুভূতিহীন, তোমার কি জানতে ইচ্ছে করেনা, আমি কেন এতবার ফোন দিয়েছি’?

স্বপন একটু সিরিয়াস হয়ে গলা খাকিয়ে বলল, ‘আসার পর থেকে আমাকে বলার সুযোগ দিয়েছ তুমি? শুধু নিজেই বলে যাচ্ছ’।

এতক্ষণে নিজেকে যেন খুঁজে পেলো মিতু, একটু লজ্জাও পেলো। কিছুটা নমনীয় হয়ে বলল, ‘আচ্ছা বলো কেন ফোন ধরতে এত সময় নিলে’?

স্বপনের সরল উত্তর, ‘খুব জরুরি মিটিং এ ছিলাম তাই তোমার ফোন আসার সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরতে পারেনি। মিটিং শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছি। তারপর সব কাজ ফেলে এইতো তোমার সামনে আমি’।

মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বোঝা গেলো উত্তরে মিতু সন্তুষ্ট হয়েছে। কিন্তু কিসের যেন উদ্বেগ স্পষ্ট। ব্যাপারটা দৃষ্টি এড়ায়নি স্বপনের।  সে বলল, ‘কি হয়েছে? কোন সমস্যা? আমাকে খুলে বলো’।

মিতু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘স্বপন আমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে বাসা থেকে। পাত্র পক্ষ জানিয়েছে আমাকে খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। আগামীকাল আসবে ডেট ফাইনাল করতে। আমি এখন কি করবো স্বপন? আমাকে বলে দাও’।

স্বপন বলল, ‘বিয়ে করে ফেল। বাবা মা যা চাই তাই করো এতে সবার মঙ্গল’।

মিতু অবাক হয়ে স্বপনের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। বলল, ‘মানে কি? তাহলে এতদিন আমারা কি করলাম। তুমি একটা প্রতারক। তুমি একটা হিপোক্রেট। এখন দায়িত্ব নেয়ার সময় পালাচ্ছো। কাপুরুষ কোথাকার’। তখনও স্বপনের ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখে অবাক হয়ে গেলো মিতু।

স্বপন মিতুর দুহাত টেনে কাছে নিয়ে বলল, ‘এতো দিনেও চিনতে পারলেনা আমাকে। তুমি যা ভাবো আমি তার থেকে অনেক অনেক বেশী ভালোবাসি তোমাকে’। বলে উঠে দাঁড়িয়ে স্বপন বলল,‘চলো’। মিতু বললো,

- ‘চলো’। মিতু বললো,
- ‘কোথায়’?
- চলোই না।
- আগে বলো কোথায়?
- কাজী অফিসে।
- মানে?!
- আমরা আজই এক্ষুনি বিয়ে করছি।
- কি বলো এসব?
- যা বলছি ঠিক বলছি। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোন পথ নেই।
- তোমার বাসা?
- আমি ম্যানেজ করবো।
- আমার বাসা?
- ওটা পরে ম্যানেজ হয়ে যাবে।

 

দরজা খুলতেই নাসরিন স্বপনের সঙ্গে একটি মেয়েকে দেখতে পেলো। দুজনেই পা ছুঁয়ে সালাম করতেই নাসরিন অবাক হয়ে পা সরিয়ে নিলো। কিছুটা সংকোচেও। নাসরিন স্বপনের মা। নাসরিন কিছুটা হতভম্ব হয়ে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন। সোফায় বসতে দিলেন। সোফাতে বসে মাকে উদ্দেশ্য করে স্বপন বলল, ‘মা আমরা বিয়ে করে ফেলেছি। তোমাকে  পরিচয় করিয়ে দিই। এ হচ্ছে মিতু। মিতু, ‘ইনি তোমার শাশুড়ি’।

নাসরিন ছেলের দিকে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘এসব কি বলছিস স্বপন, কাউকে না জানিয়ে এতবড় কাজ তুই কিভাবে করলি? তোর বাবাকে আমি কি উত্তর দিবো। আর চিনি না জানি না একটা মেয়েকে এনে ঘরে তুললি?

স্বপন পাত্তা না দিয়ে উত্তর দিলো, ‘মিতু ভালো ঘরের মেয়ে। বাবা মা শিক্ষিত। সে নিজেও শিক্ষিত অনার্স করছে। দেখতে ভালো, স্বভাব চরিত্রেও ভালো। তোমার সামনেই আছে দেখে নাও’। বলে হাসতে লাগলো।

নাসরিন আর বেশী কথা না বাড়িয়ে মিতুর দিকে তাকালেন। প্রথমিক কিছু কথা বার্তা জিজ্ঞেস করলেন।

বললেন, ‘বিয়েটা কি কোন ভাবে থামানো যাচ্ছিল না বা বাবা মা কে বুঝিয়ে শুনিয়ে অনার্স শেষ করে তারপর বিয়েটা হলে বোধহয় ভালো ছিল’। মিতু মাথা নিচু করে শুধু শুনে যাচ্ছে।

শুধু বলল, ‘আন্টি আমি বাবাকে খুব ভয় পাই আর বাবা সরকারি চাকরি ছাড়া বিয়ে দিবেন না। বললে আরও ঝামেলা বাড়বে’। 

নাসরিন মিতুকে থামিয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে যেতে বললো।

স্বপন দু’জনের উদ্দেশ্যে বললো, ‘অফিসে বিশেষ কাজ আছে, আমাকে একবার এক্ষুনি অফিস যেতে হবে। এর মধ্যে আশা করি তোমাদের চেনা জানা হয়ে যাবে’।

স্বপনের কথা শুনে মা ও মিতু দুজনেই বেশ অবাক হয়ে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

নিজের রুমে বসে বসে মিতু ল্যাপটপে হানিমুনের ছবি দেখছিল। কাশ্মীর যে কি সুন্দর ভাবাই যায় না। পাহেলগাম, সোনমার্গ, গুলমার্গ জায়গাগুলো ভোলার মতো না। সেবারই জীবনের প্রথম বরফ পড়া দেখেছিলো মিতু। কিছু ছবি দেখেতো মিতু রীতিমত না হেসে পারল না। সে সময় ওরা দুজনেই কেমন বাচ্চা বাচ্চা ছিল। ‘দেখতে দেখতে বিয়ের প্রায় চার বছর হতে চললো’ ভাবল মিতু। একটু কি দীর্ঘশ্বাসের মতো বয়ে গেলো বুকের ভিতরটায়? হানিমুনের ছবি দেখা শেষে পুরনো কিছু ছবিতে চোখ গেলো মিতুর। বাবা মা’র ছবি। বাবা মা পাশাপাশি বসা। বাবার কোলে মিতু। মিতুর বয়স তখন ছয় কি সাত হবে। কি দারুন একটা ছবি। মনের অগোচরেই চোখটা ভিজে এলো মিতুর। এখনও বাবার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক হয়নি।

মিতুর বাবা মিতুর বিয়ের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘মিতু নামে আমার মেয়ে ছিল আমি ভুলে গেছি। বাবার অপমান করতে যে মেয়ের বিন্দুমাত্র বাঁধে না; সে আমার মেয়ে হতে পারে না। মিতুর মুখ আমি দেখতে চায়না’।

মাস্টার্স পাস করে মিতু চাকরির কথা ভাবেনি, যদিও স্বপন ওকে বার বার বলেছে বাসায় একা একা বোর লাগবে, তবুও। মিতুর শাশুড়িও একই কথা বলেছে, কিন্তু মন থেকে সায় দেয়নি মিতু। বাচ্চা পালন করবে আর সংসার সামলাবে এটিই ছিল তার চিন্তা।

মিতুর বাচ্চার খুব শখ কিন্তু স্বপন এখন বাচ্চা নিতে নারাজ। বললেই বলে, ‘আরে বাচ্চার জন্য এতো তাড়া কিসের, অঢেল সময় পড়ে আছে, আগে নিজেদের মতো করে সময় পার করি’।

স্বপন সকাল সকাল বেরিয়ে যায় ফেরার কোন সময় নির্দিষ্ট নেই। কখনও আটটা কখনও দশটা পেরিয়ে যায়। আবার কখনও কাজের এতো চাপ থাকে যে কোন কোন রাতে বাসা ফেরা হয়না। কাজ নিয়ে খুব সিরিয়াস স্বপন। খুব তাড়াতাড়ি কয়েকটা প্রমশনও পেয়েছে সে। এই বছর প্রমোশন নিয়ে গাড়ি কিনেছে ওরা। মিতুর পছন্দতেই কেনা। লাল রঙের গাড়ি। লাল রঙের গাড়ি মিতুর খুব পছন্দ। স্বপনের উন্নতিতে মিতুর গর্বের শেষ ছিলনা। মিতুর কেবলই মনে হতো স্বপনের যত সাফল্য সবই তার নিজের। সে নিজে অনুভব করতো আর আনন্দ নিয়ে সেলেব্রেট করতো। মিতুর বন্ধু বান্ধবী পাড়া পরশি যার সঙ্গেই কথা হোক না কেন, ইনিয়ে বিনিয়ে স্বপনের সাফল্যের কথা বলবেই। সে কথায় কথায় স্বপন যে তার ক্যারিয়ারে খুব ভালো করছে, সে হাসবান্ড হিসেবে খুব কেয়ারিং, পরিবারের ব্যাপারে যত্নবান সেগুলো অন্যকে বলে আত্মতৃপ্তি পায়। সেদিন পাশের বাসার ভাবি বললেন, ‘মিতু ভাবি কি যে করি বলেন তো? আমার হাসবান্ড তো আমার হাতের রান্না একেবারেই খেতে পারেনা। আপনি কিভাবে যে ম্যানেজ করেন’?

মিতু হাসতে হাসতে বলন, ‘আপনার ভাইতো আমার হাতের রান্না ছাড়া খেতেই পারেনা। আসলে এ হচ্ছে ভালোবাসা, বুঝেছেন ভাবি ভালবাসা থাকলে বিষও মধু মনে হয়’।

মিতুর সেদিনের সেই আত্মতৃপ্তি ভোলার মতো না। কথা যখন বলছিলো তখন দু চোখ চকচক করে উঠছিল যেন। 

কিছুক্ষণ ধরে মোবাইলটা বেজে চলেছে। মিতু রান্না করছিলো তাই ধরতে দেরি হলো।

হাত মুছে ফোনটা ধরে বলল, ‘হ্যালো স্লামালেকুন। কে বলছেন’?  

মোবাইল ওপাশ থেকে ভেসে এলো, ‘ভাবি আমাকে চিনতে পারছেন আমি ফারুক বলছি। ঐযে নিউ মার্কেটে দেখা। আপানারা প্লাস্টিকের কিছু জিনিস কিনছিলেন। মনে আছে’?  

মনে পড়ে গেলো মিতুর। সে বলল, ‘ও হ্যাঁ ফারুক ভাই! কেমন আছেন? বাসায় সবায় কেমন আছে? বাচ্চারা কেমন আছে’? সরি ফারুক ভাই আপনার নম্বারটা আমার মোবাইল সেভ ছিল না’।  

ফারুক উত্তরে বলল, ব্যাপার না ভাবি, হতেই পারে। আপনাদের দোয়ায় সবাই ভালো আছে। আলহামদুলিল্লাহ। ভাবি একটা কাজে একটু ফোন করেছিলাম’।

মিতু বলল, কি ব্যাপার বলুন তো?

স্বপন ভাইকে একটু দরকার ছিল। উনি কি বাসায় আছে না কোন কাজে বাইরে গেছেন?

কেন আপনি জানেন না? আপনার স্বপন ভাইতো আপনাদেরই অফিসের ট্যুরে চট্টগ্রাম গেছে।

ফারুক একটু অবাক হয়ে বলল, ‘কি বলেন ভাবি? আমার জানা মতে স্বপন ভাইতো অফিসের ট্যুরে কোথাও যাননি। বরং উনি তো বাসার কাজের কথা বলে দু’দিন ছুটি নিয়েছেন।!

মিতু আর কথা বাড়ায় না। কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, অনুমানে সে তা বুঝেছে। সে কথাটা ঘুরিয়ে ফারুককে বলল, ‘হ্যাঁ স্বপন বলছিলো বাসার কাজের সঙ্গে অফিসের কাজও সেরে আসবে। তাইতো সেদিন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলো। আমি হয়তো বুঝতে ভুল করেছি’।

ফারুক ওপাশ থেকে বলল, ‘ও আচ্ছা ঠিক আছে ভাবি, স্বপন ভাইয়ের অন্য কোন নম্বার থাকলে দিলে ভালো হয়। জরুরি আলাপ আছে’।

ফারুক ভাই স্বপনের তো একটাই নম্বার। ও তো আর অন্য কোন নম্বার ব্যবহার করেনা। ও কল দিলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবো’।

কথা বলার সময় যতদূর সম্ভব মাথাটাকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলো মিতু। কথা শেষ করে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লো সে। সে কিছু একটা গড়বড় আছে অনুমান করছে। কিন্তু আবার এও চিন্তা করছে অনুমান নির্ভর কিছু ভেবে বসা ঠিক না। সে মনে মনে চিন্তা করলো, ‘স্বপন এলে কথা বলবে’।

স্বপন দুই দিন পর অফিসের কাজ করে বাসায় ফিরে এলো। এসেই মিতুকে জরিয়ে ধরে চুমু খেল। গভীর আদরে বুকের মধ্যে নিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘আহা কি শান্তি। তোমাকে বুকে নিলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এই কি আছে তোমার মধ্যে? তোমাকে বুকে নিলেই আমার কেন এতো শান্তি শান্তি লাগে?

মিতু শুধু হুম হলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। বেশী কথা বাড়ালো না। স্বপন মিতুর এই ব্যবহারে কিছুটা অবাক হল। বলল, কি ব্যাপার শরীর খারাপ নাকি? কিছু হয়েছে? মন খারাপ?

মিতু উত্তরে বলল, ‘রান্না করতে করতে একটু টায়ার্ড হয়ে গেছি মনে হয়। ঠিক হয়ে যাবে। তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি’। বলে মিতু রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। স্বপনও ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।

মিতুর স্বপনের এরকম ব্যবহার দেখে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো। মন থেকে কালো মেঘ যা এতক্ষণ খেলা করছিলো তা কেটে গেলো। নিজেকে খুব হাল্কা হাল্কা বোধ করছে এখন। দুজনে একসঙ্গে বসে খেল। ডাইনিং টেবিলে স্বপন অনেক গল্প করলো মিতুর সঙ্গে। মনে হল এই দুইদিনে অনেক গল্প জমা ছিল। মিতুকে পেয়ে সব বাধা সরে গিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে লাগলো সব।

এতো কিছুর পরও মিতু লক্ষ্য করলো, ‘আগে কথায় কথায় স্বপন মিতুর গায়ে হাত দিত। ট্যুর থেকে এলে বেডে অনেক আদর করতো। কিন্তু এবার টায়ার্ড বলে পাশ ফিরে শুয়ে গেলো। মিতুর শরীরটাকে কাছে টেনে পর্যন্ত নিলো না। স্বপনের ব্যবহার মিতুর কাছে কিছুটা আলাদা মনে হল। শুয়ে শুয়ে মিতুর কেবলই মনে হতে লাগলো অফিস থেকে দেরিতে ফেরা, হুটহাট ট্যুরের নামে বাইরে যাওয়া। মোবাইল চ্যাট করা আর মোবাইল বেজে উঠলে খুব সন্তর্পণে অন্য রুমে গিয়ে কথা বলা, কেমন যেন আলগা একটা অনুভূতির সৃষ্টি করলো মিতুর কাছে। মিতু ঠিক বুঝতে পারছে কিছু তো একটা আছে যা মোটেও স্বাভাবিক নয়। কোথায় যেন কি নেই। মিতু মনে মনে ছটপট করে উঠলো। এতদিন তাহলে কেন বুঝতে পারেনি সে? নাকি এ সবই তার ভুল, দুর্বল মনের বিকার মাত্র।

শুক্রবার ছুটির দিন। এই দিনটিতে স্বপন কিছুটা বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। মিতু সকালের রান্না করতে ব্যাস্ত সময় পার করছে। আজ পরোটা, ডিমভাজা আর আলুর দম রান্না হচ্ছে। স্বপনের ফেভারিট। নাস্তা প্রায় রেডি। স্বপনকে উঠাতে ঘরে ঢোকা মাত্র স্বপনের মোবাইল মেসাজের শব্দ কানে ভেসে এলো মিতুর। স্বপন তখনও ঘুমে অচেতন। ‘কোন জরুরি মেসেজ নাকি’? ভাবলো মিতু। মিতু কাছে গিয়ে মোবাইল তুলতেই আরেকটি মেসেজ ভেসে উঠলো। রিয়া নামে কেউ লিখেছে, ‘তোমাকে খুব মিস করছি’। মেসেজ দেখে মিতুর কেমন যেন বাজে অনুভূতি হল। সে সম্পূর্ণ মেসেজ পড়ার জন্য মোবাইল আনলক করতেই একগাদা হার্ট ইমজি ভেসে উঠলো। মিতুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে স্ক্রল করতে শুরু করলো। সে যতই পড়ছে ততই অবাক হচ্ছে। স্বপন লিখেছে চট্টগ্রামের ট্যুরটা অতুলনীয় ছিল। রিয়ার উত্তর, ‘না মোটেও না। আমার মতে গুলশান হোটেলে আমাদের সময়টা ছিল বেস্ট। তবে কক্সবাজার ট্যুরটাও বেশ উপভোগ্য ছিল। বেডে যে তুমি কি পাগলের মতো করো না। তোমাকে সামলানোই যায় না। ইউ আর আ রিয়েল ওয়াইল্ড টাইগার। আই লাভ ইউ’।

উত্তরে স্বপন লিখেছে, ‘তোমার কোন তুলনা হয় না। তুমি বেস্ট। আই লাভ ইউ ঠু’।

সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপছে যেন। নিজেকে দিশেহারা মনে হচ্ছে। পাগল পাগল লাগছে সব। পড়ছে আর মিতুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ওদের দুজনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি দেখা যাচ্ছে। এসব দেখে মিতুর কেবলই মনে হচ্ছে কেউ যেন ওর হৃৎপিণ্ডটাকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে দিচ্ছে। বুকের ভেতর প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছে সে। কষ্টে কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যেন। 

হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে মিতুকে তার মোবাইল হাতে কি যেন করছে দেখতে পেলো স্বপন। এমন সময় উঠে এসে পেছন থেকে মিতুর কাছ থকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বললো, ‘হাউ ডেয়াড় ইউ। তুমি আমার মোবাইলে হাত দিয়েছো কেন? মেসাজ কেন পড়ছো? মানুষের প্রাইভেসি বলে একটা কথা আছে। আনশিভিলাইসড কোথাকার’।

মিতু কিছুই বললোনা শুধু ফ্যালফ্যাল করে স্বপনের দিকে চেয়ে থাকলো। স্বপনের উদ্ধতপূর্ণ কথাবার্তা  নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না সে। এ ধরনের অন্যায় করার পর কোন মানুষ যে এতো নির্বিকার হতে পারে মিতুর চিন্তার বাইরে ছিল। শান্ত থাকতে থাকতে হঠাৎ মিতু চিৎকার করে উঠলো। বলল, চরিত্রহীন, লম্পট কোথাকার? অফিসের ট্যুরের নাম করে বান্ধবী কে নিয়ে ঘুরে বেড়াও। ছি ছি তোমার লজ্জা করেনা?

স্বপন মিতুকে থামাতে এগিয়ে আসতেই মিতু একরকম পাগলের মতো চড়, থাপ্পড় দিতে শুরু করে দিলো। আক্রোশে স্বপনের রাতে পড়া জামাটা একটানে ছিঁড়ে ফেললো মিতু। মুখে বলল কুত্তার বাচ্চা তুই আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আমার জীবন নিয়ে খেলেছিস। বাস্টার্ড।

স্বপন মিতুকে থামাতে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। মুখে বলল, ‘আর একটা কথা বললে তোকে এখানেই মেরে ফেলবো। কি প্রমাণ আছে তোর কাছে যে আমি লম্পট। ... উল্টাপাল্টা কথা বললে তোকে আমি খুন করে ফেলবো’।

মিতু তখনও স্বপনের জামার কলার ধরে আছে। বলল, ‘ফারুক ভাই কল করেছিলো উনি বলেছেন তুমি অফিসের ট্যুরে যাওনি। তুমি তোমার লাভারের সঙ্গে হানিমুনে গিয়েছ চট্টগ্রামে। তারও আগে কক্সবাজারে আর গুলশানে একসঙ্গে রাত কাটিয়েছ। সবই পড়েছই আমি। তোমাদের একসঙ্গে ইন্টিমেট সব ছবিও দেখেছি। ছি তোমার ঘেন্না করেনা। চরিত্রহীন, লম্পট কোথাকার?

সব শুনে স্বপন একটা ধাক্কা খেল যেন। একটু বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। সে আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে বসলো। কোন উপায় না পেয়ে মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ভুল হয়েছে মিতু, আমাকে তুমি ক্ষমা করো। এবারের মতো মাফ করে দাও, প্লিজ’।

অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছিলো স্বপনের। ক্ষণিকের আনন্দের জন্য এ কোন ভুল করে বসলো স্বপন। সে চাইলেও নিজেকে আর ক্ষমা করতে পারবেনা।  

এতক্ষণে মিতুও কিছুটা ধাতস্ত হয়ে এসেছে। স্বপনের দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলো, ‘স্বপন আমার কি দোষ ছিল? আমিতো তোমাকে নিজেকে উজাড় করে চেয়েছি। এতো বড় কষ্ট তুমি আমাকে দিতে পারলে? তুমি আমার পৃথিবী ধ্বংস করে দিয়েছ। আমাকে শেষ করে দিয়েছ। কিভাবে পারলে? এসব জানার আগে আমার মৃত্যু হলনা কেন? স্বপন আমি যে তোমাকে খুব খুব ভালোবেসে ছিলাম। এত বড় প্রতারণা তুমি কেন করলে? আমাকে বললে আমিই তোমার জীবন থেকে চলে যেতাম। তাই বলে এতবড় আঘাত তুমি আমাকে দিতে পারলে’?

 

সময় যেন থেমে গেলো। মিতু আর আগের মতো উচ্ছ্বসিত হয়না। স্বপন বিরাট ভুল করেছে এবং তা সে বারবার স্বীকার করেছে। মিতু স্বপনকে মন থেকে ক্ষমাও করেছে। কিন্তু দিন শেষে যখন মুখোমুখি হয় তখন নিজের মূল্য নিয়ে সংশয় দেখা দেয় মিতুর। বড্ড সস্তা লাগে নিজেকে। পরিপূর্ণভাবে কিছু দিতে না পারার বেদনা নিজেকে কুড়ে কুড়ে খায়। মিতু বুঝতে চেষ্টা করে তাদের মাঝে কি ছিলনা যে স্বপনকে অন্য মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। সম্মানবোধ? মিতুর মতে, ‘স্বপন মিতুকে ভালোবাসতো ঠিক কিন্তু তার মধ্যে গভীরতা ছিলনা, সম্মান ছিলনা। যা ছিল তা প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যেস। মাপ করে চুমু দেয়া, বাহির থেকে এসে জড়িয়ে ধরা, সাংসারিক কথা বলা, রুটিন করে মিলিত হওয়া। এর মধ্যে নতুনত্ব কি আছে? যা আছে তা সবই অভ্যেস। মিতু স্বপনকে রিয়ার কাছে কেন যাচ্ছে না জানতে চাইলে বলে, ‘রিয়াকে আমি সেভাবে কখনই দেখিনি। এটা একটা মোহ’।

মিতু বুঝতে পারে রিয়া স্বপনের পাঞ্চ লাইন। অনেকটা সারাদিনের ক্লান্তির পর এক পেগ মদ যেমন তেমন। স্বপনের কাছে ঘরটা থাকলো ঠিকই, মাঝে মাঝে একটু বাম্পার রাইডিং ও থাকলো, যা জীবনে স্পাইস যুক্ত করবে। এই সমীকরণ যা বোঝায় তা হচ্ছে। স্বপনের লয়াল থাকা প্রায় অসম্ভব, মিতুও সেটি বোঝে।

আগে দুজনার অনেক কথা হতো এখন সত্তুর শতাংশ কথা কমে গেছে দুজনার মধ্যে। প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না। একে ওপরের দিকে ঠিক ভাবে তাকাতে পর্যন্ত পারে না। অনুশোচনায় আর অপমানে দুজনেই শুধু হারিয়ে থাকে। দুজনেই অনুভব করে, কোন কিছুই আর আগের মতো নেই। ঘটনা প্রবাহে সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। স্বপন মিতুকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট সাহায্য চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মিতু নিজের সামনে নিজেই দাঁড়াতে পারছেনা। দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিতু ভাবছে সে আর কি করলে এমন ঘটনা ঘটতো না? কি করলে স্বপনকে আগলে রাখতে পারতো? বার বার একই উত্তর পেলো। অভ্যেস! টানটা আর আগের মতো নেই।

পরের দিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মিতু বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের আকাশ দেখছে। আনমনে কি যেন ভাবছে। স্বপন মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, ‘অফিসে যাচ্ছি’ বলে বের হয়ে গেলো। মিতু একবার সকালের নাস্তার কথা জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না। বারান্দায় বসে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে  কাঁদতে শুরু করলো।

রাতে স্বপন অফিস থেকে ফিরে এসে কলিং বেল দিলো। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না দেখে একটু ভয় পেয়ে গেলো সে। ব্যাগে রাখা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল স্বপন। রাতে লাইট জ্বালায়নি মিতু। পুরো বাসা চুপচাপ। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো স্বপনের। হঠাৎ ভয় পেয়ে মিতু মিতু বলে ডাকতে শুরু করে দিলো স্বপন। বেডরুমে ঢুকে দেখল মিতু সেখানে নেই। লাইটের সুইচ অন করলো স্বপন। বাথরুম, পাশের রুম, বেলকণি ঘুরে ঘুরে দেখল, কয়েকবার ডাকলো মিতু নাম ধরে কিন্তু কোন সাড়া নেই। বেড রুমে ফিরে এসে বিছানায় বসে পড়লো স্বপন। দুই হাতের তালুতে মুখ লুকাল সে। ভয়ে টেনশনে ঘেমে নেয়ে গেছে একেবারে। হাত থেকে মুখ তুলতেই লক্ষ্য করলো এস্ট্রের নিচে চিঠির মতো কি যেন চাপা দেয়া আছে টেবিলের উপর। স্বপন উঠে এসে দেখল হ্যাঁ মিতুর লেখা চিঠি একটা।

চিঠিতে লেখা,

স্বপন, আমরা পছন্দ করে পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে সংসার পেতে ছিলাম। সুখে দুখে আমরা সব সময় এক ছিলাম। পাশাপাশি ছিলাম। ভেবেছিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সঙ্গে পাড়ি দিবো। তা আর হলনা। এই ৮ বছরের সম্পর্কে কোনদিন বুঝিনি তুমি আমার কেউ নও। আজকের পর থেকে শুধুই মনে হচ্ছে তুমি আমার কেউ নও, তুমি আর পাঁচটা মানুষের মতো। তুমি নিশ্চয় জানো একটা সম্পর্ক টিকে থাকে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর সম্মান বোধ থেকে। একটা সম্পর্কের আয়ু বেড়ে যায় একে অপরকে বোঝা পড়ার মাধ্যমে। জানিনা কি পাপ করেছিলাম যে আল্লাহ আমাকে এতো বড় শাস্তি দিলেন। হ্যাঁ, শাস্তিই বটে। সম্পর্কে প্রতারণার কোন জায়গা থাকতে পারে না। আমি জানি আমাকে তুমি ঠিক ভালোবাসতে পারোনি। যা তুমি ভালবাসা বলছো তা আমার প্রতি নিছক ইনফাচুয়েসন। পুরনো অভ্যেস। কেন? সেটির উত্তর তুমিই ভালো দিতে পারবে। তুমি আজ আমাকে যে অসম্মান করেছ তার কোন তুলনা হয় না। আয়নার সামনে কোনদিন দাঁড়াতে পারবো এ বিশ্বাস আমার মরে গেছে। তোমার প্রতি রাগ বা ঘৃণা কোনটিই নেই আমার। তুমি আমার কাছে এখন যে কোন পুরুষ। তবু আমি তোমার ভালো চাইবো। তুমি ভালো থেকো। অনেক ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিয়ো। শুধু জেন মিতু নামের একটি মেয়ে তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল। তোমাকে খুব খুব চেয়েছিলো। তার দাম সে পায়নি বলে চলে যাচ্ছে। আমাকে খুঁজনা।-মিতু

চিঠিটা পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বুকের মাঝে ধরে, ‘মিতু আমাকে মাফ করে দাও, আমাকে ক্ষমা করে দাও’ বলে বিলাপ করতে লাগলো স্বপন। কেমন পাগলের মতো মিতু মিতু বলে ডাকতে লাগলো সে। কিছুক্ষণ পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনটাকে অসম্ভব ভারি বলে মনে হতে লাগলো স্বপনের। বিস্তীর্ণ আকাশে জীবনের অসীম অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু।      

;

নৃত্য-গীতে জীবন্ত হল রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কালজয়ী আখ্যান



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্ব পরিভ্রমণের সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আর্জেন্টিনায় ল্যাটিন আমেরিকার কালজয়ী সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক ও নারীবাদী লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ঐতিহাসিক সাক্ষাতের শতবর্ষ এ বছর।

১৯২৪ সালে এই দুই কালজয়ী লেখকের সাক্ষাত অক্ষয় হয়ে আছে দু’জনের জীবনস্মৃতিতে, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদান-প্রদানে আর ভিক্টোরিয়াকে রবীন্দ্রনাথের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করার মতো বহু ঘটনাবহুল আখ্যানকে ঘিরে। দু’জনের এই মধুর এ আখ্যানকে ঢাকার সাহিত্য ও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে তুলে ধরলো ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার (আইজিসিসি)।

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে ‘TAGORE AND VICTORIA OCAMPO-VIJAYA the victorious: 100 years on’ শীর্ষক নৃত্য-গীতে সেই অবিস্মরণীয় আখ্যানকেই ফুটিয়ে তুললেন যুক্তরাজ্য থেকে আগত বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও শিল্পী ডা. অনন্ত গুপ্ত এবং তাঁর সহশিল্পীরা।

বক্তব্য রাখছেন ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারসেলো সি. চেসা

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার (আইজিসিসি) এর পরিচালক ড. মৃন্ময় চক্রবর্তী আয়োজনের পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে অতিথি ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারসেলো সি. চেসার লাতিন আমেরিকার জনগণের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কথা তুলে ধরে তাকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন রচনকারী মহান লেখক হিসেবে বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনায় অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ রচিত বিভিন্ন কালজয়ী গান নৃত্যসহযোগে পরিবেশন করেন শিল্পীরা। একইসঙ্গে সেইসব গানের প্রেক্ষিত তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯২৪ সালে পেরু সরকারের আমন্ত্রণে দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবর্ষ উদযাপনে যোগ দিতে গিয়ে তেষট্টি বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ সমুদ্রপথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এসময় তিনি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে থামেন এবং ওঠেন সান ইসিদ্রো শহরের এক হোটেলে। সেখানে কবির ভীষণ অনুরাগী আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নারীবাদী লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (যিনি কবির গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদ পড়ে তাঁর কবিতার সঙ্গে কবিরও অনুরাগী হয়ে উঠেন)। রবীন্দ্রনাথের আগমনের খবরে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ছুটে যান কবির কাছে। তিনি কবিকে সুস্থ করার জন্য হোটেল থেকে নদী তীরে বাগানবাড়িতে নিয়ে আসেন।

অনুষ্ঠান মঞ্চে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন আইজিসিসি পরিচালক ড. মৃন্ময় চক্রবর্তী

এরপর এই দুই লেখকের সম্পর্ক গভীর আত্মিক সম্পর্কে পর্যবসিত হয়। কবি তাঁকে বিজয়া বলে সম্বোধন করতেন। কবির বিভিন্ন গানেও ভিক্টোরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। তাকে উৎসর্গ করেন কাব্যগ্রন্থ ‘পূরবী’। রবীন্দ্রনাথকে চিত্রকর্মে প্রাণিত করেন ওকাম্পো। ব্যবস্থা করেন প্রদর্শনীরও। দুই কালজয়ী সাহিত্যিকের মাঝে যেসব পত্র বিনিময় হয় তা সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদে পরিণত হয়েছে।

;

বর্ষবিদায় - বর্ষবরণ

  ‘এসো হে বৈশাখ’



প্রদীপ কুমার দত্ত
মঙ্গল শোভাযাত্রা/ ছবি: নূর এ আলম

মঙ্গল শোভাযাত্রা/ ছবি: নূর এ আলম

  • Font increase
  • Font Decrease

আবারও বছর ঘুরে এসেছে বৈশাখের পয়লা দিন। আমাদের জাতীয় উৎসব নববর্ষ। গত বেশ কয়েক বছর ধরে দেখতে পাই এই উৎসব নিকটবর্তী হলেই মঙ্গল,আনন্দ,আশার প্রতীক দিনটিকে বিতর্কিত করে একে বানচাল করার এক অশুভ প্রচেষ্টা দানা বাঁধানোর উদ্দেশ্যে একশ্রেণির লোক মাঠে নামে। পহেলা বৈশাখ উৎযাপন উপলক্ষে যে উৎসবমুখরতা, তা আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়,আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এই জাতীয় নানা বিষয়ের অবতারণা করে দিনটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।

বিতার্কিকদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এর মধ্যে ধর্মাচরণকেও টেনে আনেন। গত বছর তো আইনগত ব্যবস্থা নেয়াও শুরু হয়েছিল। সেই প্রচেষ্টা অবশ্য হালে পানি পায় নি। এবারেও দন্ত-নখর বের করা শুরু করেছিল আমাদের বাংলার আদি সংস্কৃতির বিরোধীরা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় সরকার ক্ষমতায় থাকায় অংকুরেই সেই চেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়ে থেমে গেছে। অবশ্য সরকার উভয়পক্ষকে খুশি রাখার চেষ্টা করে উৎসব পালনের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করে নির্দেশনা জারি করেছেন। এই রকম আপোষ করে সেই কুৎসিত শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা সরকারের উপযুক্ত মহলের উচিৎ।

উৎসব পালনের কোনও নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। সময়ের সাথে সাথে এবং অঞ্চলভেদে বিভিন্ন অনুষঙ্গ ও ধরন পাল্টায়। সংস্কৃতি ও কৃষ্টি গতিশীল। সমাজে গ্রহণযোগ্য এবং শালীনতার মাত্রা অতিক্রম না করা আনন্দে মেতে ওঠার বিভিন্ন কার্যক্রমের সমষ্টিই উৎসব। আদিকাল থেকেই বৈশাখী মেলা, হালখাতা, চৈত্র সংক্রান্তি, গাজন, নীলপূজা, চড়ক, বিভিন্ন প্রকৃতির লোকজ সংস্কৃতির ও খেলাধুলার আয়োজন,সাধ্যমত নতুন পোষাক ও ভালো খাবারের আয়োজন,অতিথি আপ্যায়ন, ইত্যাদি নিয়ে বাঙ্গালীরা পুরাতন বর্ষ বিদায় ও নববর্ষের আগমনকে একটি উৎসবের রূপ দিয়ে আসছে।

কালক্রমে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে বাংলা সংস্কৃতির উপর পাক সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন কতৃপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার অংশ হিসাবে ছায়ানট রমনা বটমূলের বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন শুরু করে। সেই আয়োজন আজ ডালপালা বিস্তার করে সারা দেশে এমনকি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাস স্বাক্ষী, মৌলবাদের কালো থাবা সেই আয়োজন থামিয়ে দিতে রমনা বটমূলের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করে নিরীহ সংস্কৃতি প্রেমীদের হত্যা করেও সফল হয়নি।২০০১ সালের সেই হামলার পর নিরীহ বাঙ্গালী গর্জে উঠে ২০০২ সালে আরও অধিক সংখ্যায় রমনায় হাজির হয়েছে। দেশের শহর ও গ্রামের দিকে দিকে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আরও ব্যপ্তি লাভ করেছে।

ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট বিগত শতাব্দীর আশির দশকে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু করে। এই আনন্দ উৎসব পরবর্তীতে মঙ্গল শোভাযাত্রার রূপ ধারণ করে। এই সফল আয়োজন ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। আনন্দ প্রকাশের এই বহিঃপ্রকাশ নিয়ে এক শ্রেণির লোকের প্রচন্ড গাত্রদাহ রয়েছে।ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা এই শোভাযাত্রা বন্ধ করতে চায়।দেশের প্রাগ্রসর প্রগতিশীল নাগরিকরা এই জাতীয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে চায় না। মঙ্গল শোভাযাত্রা, রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান সহ বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের সকল আয়োজন দিন দিন আরও সবল,সতেজ ও পরিশীলিতভাবে অগ্রসর হবেই।

বৈশাখী উৎসবের বিরোধিতাকারী কূপমণ্ডূকদের অনেকের জানাই নেই যে এই উৎসব একই সময়ে দুই একদিন আগে বা পরে বহু জায়গায় বিভিন্ন নামে পালিত হয়। আমাদের নববর্ষ, আসামে বিহু,পাণ্জাবে বৈসাখ,থাইল্যান্ডে সাংক্রান,বার্মায় থিংইয়ান,নেপাল ও সংলগ্ন উত্তর ভারতে বিক্রম সম্ভত,কম্বোডিয়ায় চউল চ্নাম থিমে, সিংহলে আলুথ অনুরুদ্ধা, লাওসে বা পি মেই, কেরালায় ভিষু, তামিলনাড়ুতে পুথান্ডু, এই সব উৎসবই দক্ষিণ /দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রাচীণ কাল থেকে চলে আসা বর্ষবিদায়/বর্ষবরণ। অনেক এলাকায়,এমনকি আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল বা একে অপরের শরীরে পানি ছিটানো এই উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। জল শুচি,পবিত্রতা ও শুভ্রতার প্রতীক। পুরনো বছরের ভুল, অসাফল্য, গ্লাণি সব ধুয়ে নতুন বছর আরও উন্নততর জীবনযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক এই জল ক্রীড়া।

যে সকল অন্ধকারের শক্তি এই বর্ষবিদায়/বর্ষবরণ উৎসবকে হিন্দুয়ানীর সাথে সম্পর্কিত অনুষ্ঠান বলে প্রচার করেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই যে সনাতনী ধর্মাচার ও সামাজিক আচার কিছু এই সময়ে অবশ্যই থাকে। সেগুলো সবই তাঁরা পালন করেন পণ্জিকা অনুযায়ী। সেই পঞ্জিকার সনাতনী ধর্মের পূজা বা উৎসব সমূহ নির্ধারিত হয় বিক্রম সম্ভত বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। সেই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী চন্দ্র/সূর্য/নক্ষত্র এর অবস্থান সমন্বয় করে বিভিন্ন মাস ২৯,৩০,৩১ এমনকি ৩২ দিনেও হয়।

সেই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ বেশির ভাগ বছর ১৫ এপ্রিল তারিখে হয়ে থাকে।লিপ ইয়ার সেই বর্ষপণ্জিতে না থাকার কারনে মোটামুটি চার বছরে একবার এটি ১৪ এপ্রিলে হয়। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের জন্য বহু বছর গবেষণার পর বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি চালু করেছে। সেই বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে প্রায় বছরই বাংলাদেশের সনাতনী সম্প্রদায় নববর্ষের দিন (১৪ এপ্রিল) তাঁদের সামাজিক/ধর্মীয় চৈত্র সংক্রান্তির পালনীয় ক্রিয়াকর্ম নিজেদের ঘরে পালন করেন।কিন্তু পহেলা বৈশাখের নববর্ষের সকল উৎসব ও কর্মকাণ্ডে আপামর দেশবাসীর সাথে সানন্দে অংশগ্রহণ করে থাকেন। একই কথা তাঁদের অন্য সকল পূজা পার্বণের বেলায়ও খাটে।


আমাদের পার্বত্য এলাকায় এই নববর্ষ পালন হয় জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে। এই অঞ্চলে বহু বাঙ্গালী তো আছেনই। কিন্তু বৃহৎ সংখ্যায় থাকেন ১৪টি বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার মানুষ। নৃতাত্ত্বিক,সাংস্কৃতিক,ভাষাগত এবং বিভিন্ন ভাবে তাঁরা সমতলের বাঙ্গালীদের চাইতে তো বটেই, এমনকি একে অপরের চাইতেও আলাদা। এই বিভিন্নতা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এই সৌন্দর্যের নামই বহুল প্রচলিত শব্দবন্ধ ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি বা বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য।

এখানকার বম,খিয়াং,লুসাই,পাঙ্খোয়া ও খুমিরা বৃহত্তর সংখ্যায় খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। তাঁদের বড় উৎসব বড়দিন(ক্রিসমাস)।বকি সকলের জন্য তিন দিন ব্যাপী বর্ষবিদায় /বর্ষবরণ উৎসবই বছরের সেরা পার্বণ। এই সময় সব পাহাড় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে উৎযাপনে।যোগ দেন তাঁদের খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী অন্যান্য জাতিসত্ত্বার প্রতিবেশীরা এবং পাহাড়ে থাকা বাঙ্গালীরা। আমোদে অংশ নিতে দেখা যায় সমতল থেকে এই উপলক্ষে ছুটে আসা পর্যটকদেরও।

তাঁদের উৎসব আনন্দ উৎযাপনের মধ্যে অনেক উপাদান। মঙ্গল শোভাযাত্রার আলোকে র‍্যালী হয় সবাইকে নিয়ে।আয়োজনে থাকে প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। হয় বিচিত্রানুষ্ঠান। খাওয়া দাওয়ার আয়োজন সকলে করেন সাধ্যানুযায়ী উঁচুমানের। তার মধ্যে বিশেষ একটি আয়োজন হল বিভিন্ন তরিতরকারির মিশ্রণে পাঁজন বা লাবড়া। কে কত পদের তরকারি/শাক/ওষধি দিয়ে পাঁজন রেঁধেছেন তার চলে অঘোষিত প্রতিযোগিতা। ক্ষেত্র বিশেষে এই সংখ্যা পণ্চাশ ছাড়িয়ে যায় বলে শুনেছি।


উৎসবমালা শুরু হয় দেবতা ও প্রয়াতঃ পূর্বপুরুষদের স্মৃতিতে পাহাড়ি ঝরণা বা নদীতে ফুল ও প্রদীপ ভাসিয়ে। নতুন কাপড় পরিধান নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানানোর প্রতীক।মন্দিরে চলে মহামতি বুদ্ধদেবের আরাধনা আগত বছরে সকলের মঙ্গল কামনায়। অনেক বড় মন্দিরে বহু লোক সমাগম হয় প্রথম দিন রাতে।সারা রাত উৎসবমুখর পরিবেশে পিঠা তৈরিতে সবাই হাত লাগায়। প্রত্যুষে সেই পিঠা দেবতাকে নিবেদন করা হয়। প্রথম দিন বহু মন্দিরের বুদ্ধ মূর্তি বাদ্য সহযোগে আনন্দ মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হয় নিকটবর্তী নদীর পানিতে স্নান করানোর জন্য।

পাহাড়ে নববর্ষের সবচাইতে বড় আকর্ষণ সাংগ্রাইং জলক্রীড়ার কথা আগে উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়াও থাকে পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা, কুস্তি,তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা, ইত্যাদি। সৌহার্দ্য বাড়াতে একে অপরের বাড়িতে যাওয়া,দলবদ্ধ ভাবে পান ভোজনের ব্যবস্থা করাও এই তিন দিনের কার্যক্রমের বিশেষ একটি দিক। চাকমারা বিজু, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক,মারমারা সাংগ্রাইং, ম্রো জনগণ চাক্রান নামে এই উৎসবকে অভিহিত করেন। তণ্চঙ্গাদের কাছে বিষু,অসমীয়া সম্প্রদায়ের কাছে বিহু নামে পরিচিতি এই উৎসবের।

নামে কি বা আসে যায়। যে যেই নামেই জানুক এই উৎসব আমাদের লোকজ সংস্কৃতির একটি প্রাণের উৎসব। বাঙ্গালী ক্ষুদ্রতর নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই যার যার পছন্দ ও সাধ্য অনুযায়ী উৎসব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারো যদি পছন্দ না হয় তিনি উৎসব পালনে বিরত থাকতেই পারেন। সেটা তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা। কিন্তু অন্যের উৎযাপনে বাধা সৃষ্টি করার অধিকার কারও নেই।

প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা এই নববর্ষের সাথে সাথে হিজরি সাল;চন্দ্র,সূর্য, নক্ষত্র মন্ডলীর অবস্থান;ফসল তোলা;খাজনা পরিশোধ; ইত্যাদি বিষয়ের সমণ্বয় করে জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ্ সিরাজী ও রাজা টোডরমলের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাদশাহ আকবর চালু করেন আমাদের বর্তমানে চলিত বাংলা বর্ষপঞ্জি। সেই বর্ষপঞ্জির ১৪৩১ সাল সমাগত।

আসুন আমরা ১৪৩০ কে বিদায় জানিয়ে আবাহন করে নেই ১৪৩১কে। দেশবাসী ও বিশ্ববাসী সকলকে জানাই নববর্ষের শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি সকলের। কামনা করি ক্ষুধা মুক্ত,বণ্চনা মুক্ত, প্রতারণা মুক্ত, ব্যথা মুক্ত ও যুদ্ধ মুক্ত পৃথিবী। কল্যাণ হোক সকলের।সুখী ও সমৃদ্ধ হোন সবাই।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;