ভাইরাস-কালের ভাইরাল কবিতা : মহামারির সময়ে



কিটি ও’মিয়ারা ।। ভূমিকা ও ভাষান্তর: সৈয়দ তারিক
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

এত কিছু চিন্তা করেননি তিনি মোটেও। কখনো নিজেকে এমিলি ডিকিনসন কিংবা সিলভিয়া প্লাথ হিসাবে ভুলেও ভাবেননি। এমনকি আদৌ কোনো কবিতাও লিখতে চাননি তিনি। বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর ভয়ানক আগ্রাসনে আর পাঁচজন সামাজিক মানুষের মতোই কোয়ারেন্টাইনে আবদ্ধ হয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিটি ও’মিয়ারা একজন অবসরপ্রাপ্ত চ্যাপলেন (ধর্মীয় নির্দেশক) ও সাবেক শিক্ষিকা। তিনি বসবাস করেন আমেরিকার উইসকনসিন স্টেটের ম্যাডিসনের কাছে। তার সহবাসী হলেন তার স্বামী ফিলিপ ও’মিয়ারা আর পাঁচটি কুকুর।

তবে হ্যাঁ, ফেসবুক আইডি আছে তার, লেখেন যখন যা খুশি স্টেটাস—যেমন আজকাল প্রায় সবাই ব্যবহার করে এই সামাজিক মাধ্যম। আর তিনি ব্লগে লেখেন।

যখন জানা গেল যে মহামারি ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে এবং সেটাকে ঠেকাবার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই তখন তিনি উদ্বিগ্ন, ক্রুদ্ধ ও বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। তিনি তো আগে হাসপাতালে রোগীদের আধ্যাত্মিক পরামর্শ দিতেন, তার বন্ধুরা অনেকেই সেখানে কর্মরত ছিলেন তখনও। সেই বন্ধুরা কেমনভাবে সময় কাটাচ্ছেন, তাদের সাথে আর কখনো দেখা হবে কিনা এইসব তাকে দুঃশ্চিন্তায় ফেলেছিল। তখন তার স্বামী তাকে পরামর্শ দেন যে কিটি যেন তার ভাব ও ভাবনাগুলো লিখে ফেলেন।

ফিলিপের এই প্রণোদনাতেই কাজ হয়েছিল। মিনিট বিশেকের মধ্যে গদ্যছন্দে শিরোনামহীন একটা রচনা তৈরি হয়ে গেল। রচনাটি তিনি নির্মাণ করলেন, নাকি তার মধ্য দিয়ে নাজেল হলো—এ নিয়ে কাব্যতাত্ত্বিকেরা বরাররের মতোই বিতর্কে লিপ্ত হতে পারেন। কিন্তু এটি যে কোনো কবিতা ম্যানুফেকচারিং কোম্পানির নিছক উৎপাদন নয়, বরং কিটির অন্তর হতে একটি স্বতোৎসারণ, তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না লেখাটি পাঠ করলে : ওয়ার্ডসওয়ার্থ যাকে বলেন, ‘spontaneous overflowing of powerful feelings’। আর আধ্যাত্মিক উপদেষ্টার ধ্যানী ও কল্যাণকামী মনের পরিচয়টাও পেয়ে যাই আমরা কবিতাটি পড়ে।

করোনাকালে কী কী করে সময় কাটানো যেতে পারে তা বলবার পর করোনাকালের পরবর্তী কেমন পৃথিবী আমরা চাই তারও একটা সম্ভাব্যতা আঁকা হয়েছে কবিতাটিতে। এই বিপর্যয়ের কালে, এই বিষণ্ণতার যুগে স্বেচ্ছায় গৃহে অন্তরীণ থেকে কী কী করে আমরা শারীরিক-মানসিক-আত্মিকভাবে ভালো থাকতে পারি আর কাটিয়ে দিতে পারি এই করোনাগ্রস্ত সময়, তার একটি সহজসরল তালিকা রয়েছে কবিতাটিতে। অথচ কোনো হিতোপদেশের ভঙ্গিমায় নয়, নিছক সহজ সরল বর্ণনায়, ছোট-ছোট বাক্য ও বাক্যাংশে উল্লিখিত হয়েছে সব কিছুই। বলতে পারি এটি একটি মহান স্তোত্র ও দেশনা।

তিনি এটা তার ফেসবুক দেয়ালে পোস্ট করলেন। কবেকার কথা? তার ব্লগ “The Daily Round”-এ ১৬ মার্চ ২০২০ তারিখে কবিতাটি রয়েছে। সেই সময়ের দিকেই কবিতাটি লেখা, ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ফেসবুকে প্রকাশ হবার পর অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল কিটির জীবনে।

প্রথমে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল ফেসবুকে। তারপর এটি পড়লেন ধ্যানগুরু দীপক চোপড়া। তিনি এর সবিশেষ প্রশংসা করলেন একটি পত্রিকায়। এর ফলে তারপর এটি ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি তাবৎ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ল। কেউ এটায় সুরারোপ করতে চাইল, কেউ চাইল গ্রন্থভুক্ত করতে। পত্রপত্রিকায় কবিতাটি নিয়ে লেখালেখি শুরু হলো। তার সাক্ষাৎকার ছাপাতে লাগল বিভিন্ন গণমাধ্যম।

তখন উল্টোস্রোত বইতে শুরু করল। তা তো করবেই, নইলে কাহিনী জমবে কী করে? পাশ্চাত্য সংগীতে পয়েন্টের পর কাউন্টার পয়েন্ট আসে। ভারতীয় সংগীতে বাদী স্বরের বিপরীতে আছে বিবাদী স্বর।

তো, কী ঘটল?

সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন জন পোস্ট দিয়ে দাবি করতে থাকলেন, এই কবিতাটি আগের কারো রচিত। কেউ বললেন, এটা ১৮৬৯ সালে রচিত। ঊনিশ শতকের ফরাশি-আইরিশ ঔপন্যাসিক ও জীবনীকার ক্যাথলিন ও’মিয়েরা (এটা তার কলমি নাম, আসল নাম গ্রেইস র‍্যামসে) কবিতাটির রচয়িতা বলে দাবি তুললেন তারা। আবার অন্য কেউ-কেউ বললেন, এটি ১৯১৯ সালে লিখিত কিংবা পুনর্মুদ্রিত কবিতা। তারা বললেন ১৯১৮ থেকে শুরু হওয়া স্প্যানিশ ফ্লুর পটভূমিতে এটা রচিত। কিন্তু সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এটা ১৮৬৯ বা ১৯১৯ সালের রচনা নয়, ২০২০ সালের মার্চ মাসে ক্যাথারিন (কিটি) ও’মিয়ারা এটা রচনা করেন।

এই কবিতা রচনায় তার কৃতিত্ব বিষয়ে কিটি বলেন, “এই কবিতার জন্য আমি কোনো কৃতিত্ব দাবি করি না। কারণ আমি জানি, যে-সামর্থ্য দিয়ে আমি শব্দগুলো গ্রথিত করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বড় শক্তি আমার আত্মা, আর ওই মুহূর্তটিতে সে-ই ওইসব কথা ঢেলে দিয়েছিল। আমি আসলেই কোনো কৃতিত্ব নিই না কেবল এইটুকু ছাড়া যে, আমি গ্রাহক হয়ে উঠেছিলাম, লিখেছিলাম ও পোস্ট করেছিলাম। আমি জেরার্ড ম্যানলি হপকিন্স বা ডিলান টমাস বা টি এস এলিয়ট বা ম্যারি অলিভার নই। আমি কেবল ওটা পোস্ট করেছিলাম আর ওটা চলে গিয়েছিল।”

এই কবিতার জন্য অনেকে কিটিকে ‘পোয়েট লরিয়েট অব প্যান্ডেমিক’ অর্থাৎ ‘মহামারির মুখ্য কবি’ অভিধায় ডাকতে শুরু করেছেন। সমকালীন প্রবল বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রেখে, দুঃসময়ের অন্ধকারে আশাব্যঞ্জক ভাবের আলো-ফেলা ও ধ্যানমগ্ন উচ্চারণের এই কবিতা সঙ্গত কারণেই সাড়া জাগাতে পেরেছে।

শুধু একটি কথাই রয়ে গেল। পৃথিবীর অসুখ পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে হলে মানুষের আগে নিজেদেরকে সারিয়ে তুলতে হবে। শুধু শারীরিকভাবেই নয়, বুদ্ধিগতভাবে, অনুভূতিগতভাবে, আত্মিকভাবেও। তবেই আমরা সুস্থ-সুন্দর পৃথিবীকে পাব। এই কথাটি একটু নিভৃত ভঙ্গিতে ইশারায় বলে গেছেন কবি।


মহামারির সময়ে
কিটি ও’মিয়ারা

এবং লোকেরা সব ঘরেই থেকেছে।

এবং শুনেছে তারা, পড়েছে গ্রন্থরাজি, নিয়েছে বিশ্রাম আর ব্যায়াম করেছে আর শিল্প বানিয়েছে আর মেতেছে খেলায় এবং শিখেছে তারা হয়ে উঠবার নানা পথ এবং থেকেছে স্থির।

এবং শুনেছে তারা আরো বেশি গভীরতা নিয়ে। কেউ-বা থেকেছে ধ্যানে, প্রার্থনায় মগ্ন রয়েছে কেউ, কেউ-বা নেচেছে। কেউ-কেউ আপন ছায়ার সাথে করেছে সাক্ষাৎ। এবং লোকেরা সবে ভাবতে থেকেছে খুব ভিন্ন রকম।

এবং লোকেরা সেরে গেছে।

এবং যখন সেই মানুষেরা উপস্থিতিহীন ছিল—যারা বাঁচে মূর্খতায়, বিপদজনকভাবে, নির্দয়তায়—পৃথিবীও ক্রমে সেরে উঠতে লাগল।

এবং যখন নিল আপদ বিদায়, লোকেরা মিলল ফের পরস্পর, দুঃখ করল ক্ষয়ক্ষতির জন্য, নতুন-নতুনভাবে বেছে-বেছে নিল, দেখল নতুন স্বপ্ন, আর বেঁচে থাকবার নতুন নতুন পথ তৈরি করল, আর পৃথিবীকে তারা পুরোপুরি সারিয়ে তুলল—যেহেতু নিজেরা তারা উঠেছে সেরে।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;