বিলাতের কেশপ্রকৌশলীর ক্যারিশ্মা : অপ্রতিসম রম্বস থেকে মায়াবী মুখ



সরওয়ার মোরশেদ
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর অন্তত মাস ছয়েক সুপার মার্কেট, শপিংমল, টিউব স্টেশন যেখানেই গিয়েছি, কেনাকাটা করার সময় স্বতঃচালু হয়ে যেত আমার মানসিক হিসাবযন্ত্র (Mental calculator)। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম যেদিন সম্ভবত ৪০ পাউন্ড দিয়ে (স্টুডেন্ট ডিসকাউন্ট তখনও পাইনি) মান্থলি ট্র্যাভেল কার্ড কিনলাম, নিদারুণ মর্মবেদনা অনুভব করেছিলাম এই ভেবে যে, আহারে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা চলে গেল শুধু গাড়ি ভাড়ায় (তখন বাংলাদেশে একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার বেতন সাকুল্যে সাত আট হাজারের মতো)! একদিন ব্রিকলেনে হণ্টন করতে করতে চায়ের তেষ্টা পাওয়ায় বাংলা টাকায় সার্ধশতের শ্রাদ্ধ করে বারংবার নিকেশ করছিলাম এই টাকায় বাংলাদেশে কয়কাপ চা পান করা যেত! হারাম-হালাল না বুঝে KFC-তে একদিন চিকেন উইংস, ফ্রাইজ আর কোক খেয়ে ছয় পাউন্ডের মতো বিল দিয়ে (পাউন্ড-টাকা ১২০-১৩০ বিনিময় হারে প্রায় ৭৫০-৮০০ টাকা) ছয় পাউন্ডের বিরহব্যথায় ছয়দিন কাতর ছিলাম! এভাবেই পাউন্ড-টাকার অটো কনভার্শনের নাগর দোলায় দুলতে দুলতে মাস দুয়েকের শ্বেতদ্বীপবাস হয়ে গেল। মাথার চুল জানান দিচ্ছিল নরসুন্দর-সুন্দরীর কাছে দ্রুত না গেলে কদর্য এশীয়র নরাধম হতে বেশি সময় লাগবে না।

এরই মধ্যে প্রিয় বন্ধু ডা. হাসনাত যাকে আমরা ‘কবিরাজ’ বলে ডাকতাম, দেখি চুল কাটার সরঞ্জাম খরিদ করে রীতিমতো স্বনির্ভর হয়ে গেছে। কবিরাজ ইতোমধ্যে তার বিনেপয়সার সার্ভিস অফারও করেছে। কিন্তু তার ভাবসাব সুবিধের ঠেকছিল না। বন্ধুবর ছিল গোঁফের স্বঘোষিত বৈশ্বিক শত্রু। আমার গোঁফে সে এর মধ্যেই বার দুয়েক ব্যর্থ অভিযান পরিচালনা করেছে। একবার তো সে ‘মোর ঘুমঘোরে’ নাপিত-মনোহর হয়ে এসেছিল। ভাগ্যিস, ত্বরিত প্রতিবর্ত প্রতিক্রিয়ায় দোস্তের ওই গোঁফ-বিরোধী অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়েছিলাম। তদুপরি, এই অনভিজ্ঞ কৈশিক শৈল্যবিদের কাছে মুফতে ‘ছিলা মুরগি’ টাইপ কাট লাভের সমূহ আশঙ্কা ছিল। ফলে, চিকিৎসক-নরসুন্দরের ছুরির নিচে সচেতনভাবেই গেলাম না। ইয়ারকে শুধু বললাম, ‘আমি একজন Ph.D-র কাছেই চুল কাটাব, MBBS, PLAB-1-এর কাছে না।’

‘Ph.D-র হাতে চুল কাটাবা মানে?’—রাগী ভীষণ দেমাগী ভঙ্গিতে জানতে চায়।

‘Professional Hairdresser এর কাছে’, দৃপ্তকণ্ঠে জবাব দিলাম।

আমার উত্তর শুনে মুহূর্তেই কবিরাজের রক্ত-চক্ষু চাহনি প্রীতিময় অট্টহাসিতে অনূদিত হয়ে গেল।

আগেই নিয়ত করে ফেলেছিলাম শ্বেতদ্বীপে এসে শ্বেতকায় নরসুন্দরের কাছেই কেশকর্তন করাব। জানতাম, টাকা হয়তো একটু বেশি যাবে। শখের তোলা আশি টাকা! ফলে ভাবটা ছিল ‘কুচ পরোয়া নেহি’। মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনীতে পড়েছিলাম, বিলেতে এসে ভদ্দরনোক হবার নেশায় তিনি অনেক দাম দিয়ে স্যুট-কোট বানিয়েছিলেন, রীতিমতো টিউটর রেখে পিয়ানো-নাচা-গানা শেখার কোশেশ করেছিলেন। আমি তো আর গাঁধীর পথ মারাচ্ছি না—সামান্য চুল কাটাই তো! তাছাড়া, ‘আমরা সবাই রাজা’ ঘোষণানুসারে আমিও একজন রাজা। চুলই হচ্ছে আমার ‘কোহিনূর’—অমূল্য মুকুট! মহাজনেরা উমদা কথাই বলেছেন, ‘Invest in your hair. It is the crown you never take off.’

পরিকল্পনামতোই পরেরদিন এক সফেদ নরসুন্দরের সেলুনে গেলাম। খালি চেয়ার পেয়ে বসে পড়লাম। শ্বেতাঙ্গ নাপিত তার ঢাল-তলোয়ার নিয়ে রণপ্রস্তুতি সেরে ফেলল। ভদ্রলোকের ছুরত আর বয়স দেখে আশ্বস্ত হলাম। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের কথাটা এক্ষেত্রে স্মর্তব্য—Beware of the young doctor and old barber. যাক বাবা, কোনো বুড়ো নাপিতের পাল্লায় তাহলে পড়িনি!


বার্তা২৪.কম-এর শিল্প-সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা
[email protected]


শুভ্র নাপিত দ্রুত রণদামামা বাজিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। কথা বলে জানলাম, ভদ্রলোক পোলিশ, নাক উঁচা ইংরেজ নন। একটা ‘হালকা হইতে মাঝারি’ মাত্রার ধাক্কা খেলাম। বিশ্বব্যাপীই নাপিতরা Verbal diarrhoea-য় ভোগেন। এ মহাজন দেখি নাপিতকূলের প্রবাদপ্রতিম বাচালতার উল্টো দিকে অবস্থান করছেন। হয়তোবা ভাষাগত কারণেই তার এই অ-নাপিতসুলভ বাকসংযম। Let English barbers in Thames melt—এই ভেবে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলাম যে লেসওয়ালেসার এই দিশি কমরেডও হয়তো ভাবেন—‘I speak hair. English is my second language.’ সত্যিই তো, তামাম জাহানের সব কেশশিল্পীর প্রথম ভাষা হচ্ছে ‘চুল’। সে জবানে এ কেশযোদ্ধা আমার সাথে মিনিট বিশেক ‘ঘ্যাচাঙ ঘ্যাচাঙ’ বাতচিত করলেন। আমিও ছোট্ট বেলায় বিনা প্রশ্নে সোনাইয়া নাপিতের কাছে মাথা সঁপে দেওয়া একান্ত বাধ্যগত বালক হয়ে বেজঙ্গম, লা-জবান থাকলাম। কর্ম সম্পাদন হলে আমি ‘Leave me mother, let me cry’ ভাব নিয়ে বেরিয়ে আসলাম। ‘I am glad, it’s over!’ তবে ভদ্রলোক ছয় পাউন্ডের বিনিময়ে এমন হেয়ারকাট দিয়েছিলেন, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সপ্তাহখানেক ঊন-কোয়ারেন্টিনব্রত পালন করেছিলাম। মানবমুখে রীতিমতো জ্যামিতিক অসৌন্দর্য—কুরিদের দেশের ক্ষৌরকারের করকারিকুরিতে আমার চেহারা মোবারক অনেকটা অপ্রতিসম রম্বসের আকার ধারণ করেছিল!

এই এক পোলিশ কাট আমার কেশকর্তন ভাবনায় কোপার্নিকান বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল। আর ইউরোপীয় নাপিতের বেলতলায়? নৈব নৈব চ। এক কাটে মাস তিনেক কাটিয়ে দেওয়ার পর আরশিতে নিজের দিকে তাকিয়ে বারবার আমার নবতিপর পিতামহীকে মনে পড়ছিল। চুল একটু বড় হলেই দাদি বলতেন, ‘অ মুন্সি (আদর করে নাতিদের তিনি মুন্সি ডাকতেন) চুল তোর ফাঁস (সার বা পুষ্টি) টানি ফেলার। ক্ষেমাইশ্যাততুন চুল হাডি আগৈ (অনুবাদ: ও মুন্সি, চুল তোর শরীরের পুষ্টি শুষে নিচ্ছে। ক্ষেমাইশ্যা নাপিতের কাছে গিয়ে চুল কেটে আয়)।’ পরে জেনে অবাক হয়েছি, আমার দাদির তরিকায় অনেক মহাত্মাও চিন্তা করেছেন।

এই যেমন Weike Wang আমার পিতামহীর প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, ‘My mother has a theory about hair. It is that the longer the hair grows, the dumber a person becomes. She warns that too much hair will suck nutrients away from the head and leave it empty.’ দাদির অদৃশ্য নেত্র-রাঙানিকে প্রিয়তমার সৌন্দর্যতিলক মনে করে এবার চুল কাটাতে গেলাম ব্রিকলেনে। ট্যাকের টাকার চিন্তা না করে ঢুকলাম একটা ভদ্রদর্শন সেলুনে। কোথায় যেন দেখেছিলাম—
Cheap Haircuts
Are Not Good!
Good Haircuts
Are Not Cheap!

কথা খাসা, নিঃসন্দেহে। দেখলাম কয়েকজন Tonsorial artist শিল্পীর অভিনিবেশ নিয়ে কেশকর্তনে ব্যস্ত। আহা! এই লন্ডনের ফ্লিট স্ট্রিটেইতো একদা খুনের মচ্ছবের পুরুত হয়েছিলেন এক দানব-নাপিত (Demon barber of Fleet Street)! আমার সামনের এই ক্ষুরশিল্পীদেরই তো পেশাগত ভাই ছিলেন Sweeney Todd নামের ওই নাপিত যার রক্তপিপাসা নিয়ে বাজারে চালু আছে হাজারো গালগল্প। আমার পালা আসলে দেখলাম, নিতান্ত নিরীহ দর্শন নাপিতের ভাগে পড়েছি। সুইনিকে ভুলে নিশ্চিন্তে তার ছুরি-কাচির নিচে মাথা সোপর্দ করলাম।

মায়াবী মুখের এই ছোকরা পোলিশ নাপিতের মতো মিতবাক নয়। পাকিস্তানি এ যুবক বেশ কথাবার্তা বলল। সঙ্গত কারণেই, বাংলাদেশের চাইতেও তার আগ্রহ বেশি সিলেট নিয়ে। বেশ যত্ন করেই চুল কাটল। অভিজ্ঞ ভাষাবিদের মতো যথার্থই রায় দিল আমার কথা বলার ধরন সিলেটীদের মতো নয়। সন্তুষ্টচিত্তে বিল দিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে হলো এ নরসুন্দর আসলে Part artist, part therapist, part stylist! পরবর্তীতে এ হেয়ারকাট নিয়ে ডা. হাসনাত মন্তব্য করেছিল, ‘এই নাপিত তোমার চেহারার ছিনতাইকৃত মায়াবী ভাবটা পুনরুদ্ধার করেছে!’ যাক বাবা, পয়সা তাহলে উসুল হলো!

আশির আহমেদের ‘জাপান কাহিনী’ পড়ে জেনেছি, জাপানি ভাষায় নাপিতকে বলা হয় Riyoshi বা চুলকাটা প্রকৌশলী। আসলেই, একজন নাপিত বহুজ্ঞানকাণ্ডে বিচরণকারী এক প্রকৌশলী—তিনি একধরনের চলিষ্ণু বিদ্যাকল্পদ্রুম! একজন নাপিত জীবন্ত সংবাদপত্র, রাজনীতি বিশ্লেষক, কলাকৈবল্যবিদ, মনস্তত্ত্ববিদ, ভাষাবিদ, সর্বোপরি একজন টকারু বা বাকশিল্পী! তবে বহুজাতিক শহরে এথনিসিটি, ভাষা আর সংস্কৃতিও মনে হয় সেলুন পছন্দে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তাই তো পোলিশ নরসুন্দর আমার চেহারাকে অপ্রতিসম রম্বস বানিয়ে দিয়েছিল। বিপরীতে, ব্রিকলেনের পাকিস্তানি-বাংলাদেশী নাপিত আমার দৃষ্টিতে হয়ে উঠেছিল ভিডাল স্যাসুন কথিত কৈশিক-স্থপতি (Architect of hair)! আর সেকারণেই বিলেতবাসের প্রায় তিন বছর পরিপূর্ণভাবে পরিপাটি হতে (এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য উক্তি—You are never fully dressed without great hair) অনেক দূরের শুটার্স হিল থেকে ছুটে যেতাম দেশীভাই শুক্কুর আলিদের কাছে। আমাদের একান্ত নিজস্ব কৈশিক স্থপতিদের কাছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;