চাঁদের থালা ও পেটকাটা ষ সংক্রান্ত গল্প

খান রকিব
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

একটি অতিক্রান্ত সন্ধ্যাকে পেছনে ফেলা যাক। তুলে আনা যাক একটি দৃশ্যপট। রমনা কালী মন্দির। খোলা আকাশের নিচে ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান। কিছু লোক তাদের যাপিত সন্ধ্যায় গ্লানি মোচনের চেষ্টায় স্বচ্ছ চায়ের কাপে তুমুল দ্বন্দ্ব জুড়ে দেয়। রমনা কালী মন্দিরে কেন গরুর দুধের চা-ই পাওয়া যায়? কেন লঙ ও আদার পরিমিত মিশ্রণের রঙ চা নয়? কারণ এখানে থালার মতো চ্যাপ্টা বন রুটি পাওয়া যায়। বন রুটির ক্রিমের সাথে গরুর দুধের চা; খুচরো খাবার হিসেবে জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত পাহাড় ডিঙিয়ে প্রায় আকাশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। খুচরো আলাপের সাথে তুমুল দ্বন্দ্ব হয়; চিনির কৌটা ও চায়ের কাপের অন্তমিলে বাজে টুং টাং সঙ্গীত। তারপর একটি দৌড় প্রতিযোগিতার অলস খরগোশের মতো ঐ যে অতিক্রান্ত সন্ধ্যা যখন ক্রমে রাতের দিকে যাত্রা শুরু করে তখন রমনা কালী মন্দিরের আকাশে উদিত হয় ঝলমলে থালার মতো গোটা চাঁদ। মন্দিরের পুকুর, পাকা ঘাট। ঘাটের সিঁড়ির কয়েক ধাপ নিচে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকা বিপুল। ভাতের সন্ধানে এসেছিল ঢাকায়।

ভাতের বদলে সে শুয়ে থাকে রাস্তায়, ফুটপাতে, পুকুর ঘাটে। সন্ধ্যার আগে কাছাকাছি কোথাও ঝড় হয়েছে, সাথে বৃষ্টিও। এখন পরিষ্কার আকাশ। পূর্ণিমা চাঁদ আর শীতল বাতাস। সেই বাতাসের ঝাঁকুনিতে বিপুলের দেহ থেকে থেকে কেঁপে ওঠে। পূর্ণিমা চাঁদের আলো তার ম্লান মুখচ্ছবিকে কপট স্পষ্টতা এনে দেয়। দূরে কোথাও হাসনাহেনার মাতাল করা ঘ্রাণ যখন অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে বিপুলের নাকে লাগে তখন সে চোখ তুলে তাকায়। উপরে আকাশ, থালার মতো চাঁদ। নিচে বিপুল, পেটে ক্ষুধা। তারপর সেই থালা আরো নিচে নেমে আসে। একদম বিপুলের হাতের কাছে। ঝনঝনিয়ে বেজে ওঠে। অবিরাম অবিশ্রামে বাজতে থাকা থালার উচ্চস্বর হারিয়ে যায় দূরের পথে অগুনিত যানবাহনের কর্কষ হুইসেলে। কিন্তু ঐ যে আকাশে চাঁদের থালা, সেই থালায় ভাত নেই। চাঁদের থালায় কেন ভাত থাকে না? কারণ এ শহরে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নেই। পাবলিক টয়লেট কেন নেই? কারণ এই শহরে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত থালা নেই। এইসব ভাবতে থাকে বিপুল। ভাবনার অবকাশ পায় কিছু। যেহেতু বাহারি আহারে সময় ব্যয় করার ফুরসত নেই তাদের। যেন ছিল না কখনো! একটি বাদামওয়ালার এলোমেলো পায়চারি, উথালপাতাল ঘুরঘুর। কালী মন্দিরের চায়ের দোকানে সূক্ষ্ম, সুচালো তারে ঝুলছে রুটি। আর বিপুলের পেটে কুই কুই শব্দতরঙ্গ সঞ্চারিত করে ক্ষুধার পোকা। দূরের আকাশে ঐ প্রাগৈতিহাসিক স্বচ্ছ, উজ্জ্বল, পরিপুষ্ট শূন্য থালা অথবা মন্দিরের তারে ঝুলে ঝুলে, ফুলে ফেঁপে ওঠা থালার মতো রুটির সাথে বিপুল নিজের কোনো নৈকট্য খুঁজে পায় না।

ফলে সে পুকুরের সিঁড়ি থেকে উঠে আসে। গাঝাড়া দেয়। পেছনে পড়ে থাকে জ্যোৎস্নায় সুরভিত হাসনাহেনার পাশে থলথলে পুকুর। উপরে বাঁশের কঞ্চিতে বসে থাকা বুভুক্ষু মাছরাঙা। ঘাটে জমে থাকা উচ্ছিষ্ট সিগারেট; যেন বিপুলের জীবনের যাবতীয় ক্লেদাক্ত অনুসন্ধি।

বিপুল হাটে। সাথে সাথে চাঁদও হাটে। চাঁদের কি পাখা গজিয়েছে? নাহ তাহলে তো চাঁদ উড়ে উড়ে দূরান্তরে হারিয়ে যেত! এই চাঁদ হারায় না। তবে আড়াল হয়। এইসব নাগরিক নিয়নের শিয়রের পাশে দাঁড়ালে পূর্ণিমা তার পুঁজি করা আলো নিয়ে আড়াল হয়ে যায়। পুঁজির কেস সালা দারুণ চক্কর। মানুষের ক্ষুধা ভুলিয়ে দেয়। থাকে কেবল পিপাসা। বাড়ে শুধু পানির চাহিদা। এই শহরে এমন কোনো টিউবওয়েল নেই যা বিপুলের পিপাসা মেটায়। তথাপি পানি তো কেনাই লাগে। কিন্তু ঐ যে সেই একই রকম টাকার অসুখ!

রাত ক্রমশ গতিশীল। সারি সারি গাড়ি ছুটে চলছে ভাবনাহীন। ছুটছে মানুষ, ঝুলছে ভিক্ষুক মুক্ত এলাকায় ভিখিরির মূর্তি। হাঁটছে তারা, চাঁদ-থালা ও বিপুল। টিএসসি, শাহবাগ, বাংলামোটর ফার্মগেট। মানুষের এইসব আধাকৃত্রিম ছুটে চলায় বিপুলের বুকের ভেতরটা হুহু হাওয়া জাগানিয়া গান গেয়ে নেচে ওঠে। চাঁদের পায়ের সাথে তার চটিজোড়ার সংঘর্ষ বাঁধে। থমকে যায়। আর এমন একটা নরমাল রাত নিয়ে ভাবে, যা সে গত তিনদিন ধরে কাটিয়ে যাচ্ছে। উষ্কখুষ্ক চুল, আস্তিন গোটানো গায়ের জামায় ঘামের বিদঘুটে গন্ধ, পরনের জিন্সে জমা ধুলোবালির স্তর, ধূলি ছাড়া এই শহরে বিপুলের খাবার মতো কোনো আহার নেই। গ্রামীণ জনপদ ছেড়ে সে যখন ঢাকায় আসে, এই তো তিনদিন আগে, তারপর ইন্টারভিউ, চাকরি, স্বপ্ন, নিশ্চয়তা কতকিছু। পূর্ণ হলো কই? এখানে এসে বিপুলের স্বপ্ন হয়েছে ধূলিস্মাৎ। তার বদলে পথের যাবতীয় ধুলোবালি মাথায় নিয়ে ছুটছে সে।

গন্তব্যহীন মানুষের থাকে কেবল হাঁটার মতো রাত। কিন্তু তার দুটি ক্ষুধার্ত দুপুরও গড়িয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। তারপর আর তো যেতে চায় না সময়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মতো থমকে আছে। উদ্যানের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছে ফুটপাতের সস্তা ভাত। শাহবাগের বুড়ি মহিলার ডেকচিতে সরিষা ফুলের মতো ফুটে থাকা খিচুড়ি।

বিপুলের পেট মোচড় দিয়ে ওঠে। ফার্মগেটের ফুটওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে খ্যাকখ্যাক করে হাসে। গলার কাছে আটকে থাকা জীর্ণতা বমির সাথে বের করে দিতে চায়। কিন্ত বিপুল বাস্তব জীবন ও রূপকথার পার্থক্য অনুধাবন করে। ফলে রূঢ় বাস্তবতা বিপুলের গলা টিপে ধরে। সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাতে চায়। ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি, ছুটতে ছুটতে মহাখালী রেলক্রসিংয়ে এসে থামে। এখন মধ্য রাত। রেলক্রসিংয়ের আশপাশ প্রায় জনশূন্য। একটি চায়ের স্টল খোলা পড়ে আছে নীরবে। কোলাহল নেই, মানুষের চনমনে আমেজ ঢেকে গেছে নিদ্রার আবেশে। কেবল কিছু নিশিশ্রমিক কাজের ফাঁকে জিরিয়ে নেওয়ার অবকাশ হিসেবে বন রুটির সাথে কলা খাওয়ার কৌশলে ঝাঁপ দিয়েছে চা স্টলে। রাজধানীর ঐতিহাসিক জ্যাম হটিয়ে কিছু দূরপাল্লার বাস তেড়েফুঁড়ে ছুটছে গন্তব্যের দিকে। রেলক্রসিংয়ের ঐপাশে সোডিয়াম আলোর ঝলকানিতে ম্লান পূর্ণিমা রাত। এইপাশে রেললাইন, নিচে অন্ধকার। সমান্তরাল রেললাইনের ওপর দাঁড়ানো বিপুল। আর ঠিক ঐ মুহূর্তে চলমান দৃশ্যপটের সমাপনী বার্তা হিসেবে আকাশে উদিত ভাতহীন চাঁদের থালা মেঘের পাহাড়ে আঘাত হানে। বিচূর্ণ চাঁদের থালায় ধ্বস নামে; লীন হয়ে থাকে কালো ঘেমের চূড়ায়।

মহাখালি রেলক্রসিংয়ে পুনর্বার যখন বৃষ্টি আসে, তার আগে আচমকা আকাশ গুমোট হয়ে যায়। গাঢ় রাত্রির আঁধার আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়, তুমুল বাতাসে ধূসর ধূলিঝড়ে চোখ-মুখ নিভে যায়। রেললাইনের অনতিদূরে বয়সের ভারে ন্যুব্জতার প্রতীক ডাব গাছ নড়ে ওঠে, শাখা নেই, ডাল নেই, পাতা নেই, শুধু শরীর। দৃষ্টির সীমানায় একটি কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ে উড়ছে নীল পলিথিন দুরন্ত বাতাসে। তারপর আসে বৃষ্টি, তারপর মেঘ উড়ে যায় আকাশ থেকে আকাশে। আর নিচে বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে, একাকী বিপুল। কোথাও হয়তো কোনো নাগরিক বারান্দার গ্রিলে এইসব বৃষ্টির ফোঁটা রোমাঞ্চকর সঙ্গীতের বয়ান নিয়ে আসে। কিন্তু এইখানে ভিজে যাচ্ছে ফ্লাইওভার, ভিজে যাচ্ছে নর্দমা ও প্রস্রাবাগার। ভিজে যাচ্ছে গেরেজ ভিজে যাচ্ছে রাস্তা ও কংক্রিট। ভিজে যাচ্ছে চোখ, ক্ষুধার শোক মুষলধারে বৃষ্টিস্নাত এই রাত্রি বেলায়। আর তখন একটি উড়োজাহাজ আকাশে উড়ে যাচ্ছিল ইস্পাতের রেললাইনকে আড়াআড়ি অতিক্রম করে। বিপুল অকস্মাৎ উপরে তাকায়। উড়োজাহাজের শব্দের তীব্রতায় তার মাথা ঝিমঝিম করে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে ওঠে; ক্ষুধায় অথবা ক্লান্তিতে। সে রেললাইনের ওপর লুটিয়ে পড়ে বাঁধাহীন। বিপুলের জড়োসড়ো হয়ে যাওয়া শরীর যেন অন্তস্থ য এর আকৃতি ধারণ করে। আর তখন দূরে কোনো এক স্টেশন থেকে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে আসে পুঁজি অথবা দুঃখের ট্রেন।

ট্রেন, রেললাইন আর খুব কাছের সেই চায়ের স্টল, বিপুলের জীবনের সর্বশেষ দৃশ্যপট। উজ্জীবিত হেডলাইট জ্বালিয়ে, কু ঝিকঝিক করে ট্রেন আসে, চলে যায়। বিপুল কাটা পড়ে। একটি আর্তনাদের জ্বলন্ত ধ্বনি আশপাশের বাতাসের সাথে মিশে গেলে, তন্দ্রাঘোরে আটকে থাকা স্টলের লোকটি আচমকা মাথা তুলে তাকায়। দ্যাখে, একটি দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে আছে রেললাইনের ওপর। পেট বরাবর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দেহের নিচের ভাগ নড়েচড়ে উঠছে। উপরে চোখ মিটমিট করছে। বৃষ্টির জলের স্বাভাবিক স্রোতের সাথে মিশে যাচ্ছে রক্ত। লোকটি ছাতা মাথায় ধরে এক গ্লাস পানি নিয়ে এগিয়ে গেল। দেখল যে, মরেনি, বেঁচে আছে। জিজ্ঞাসা করলো নাম, পরিচয়। বিপুল বলতে পারল না কিছুই। লোকটি পানির গ্লাস এগিয়ে ধরল মুখে। বিপুল মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। তারপর তর্জনী উঁচিয়ে ধরল ঐ চা স্টলের দিকে। লোকটি তাকাল এবং দেখল, ৬০ ওয়াট বাল্বের আলোয় চকচক করছে পলিব্যাগে মুড়ানো থালার মতো চ্যাপ্টা বন রুটি। লোকটি দৌড়ে চলে গেল। পেছনে অন্তস্থ য এর আকৃতিতে কাটা পড়ে পেটকাটা ষ হয়ে পড়ে রইল বিপুল।