মৃতের সাথে প্রেমের এক অমর কাহিনী



আন্দালিব রাশদী
কার্ল ট্যাঞ্জলার ও মারিয়া এলেনা মিলাগ্রো

কার্ল ট্যাঞ্জলার ও মারিয়া এলেনা মিলাগ্রো

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৫২ সালে কার্ল ট্যাঞ্জলার যখন মৃত্যুবরণ করেন, তিনি ততদিনে অন্য ধরনের এক ভালোবাসার জীবন্ত কিংবদন্তি। তাকে নিয়ে তখন গান বাঁধা শুরু হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে বের হয়েছে গানের অ্যালবাম—‘দ্য ব্ল্যাক ডালিয়া মার্ডার’, ‘অ্যান্ড ইউ উইল নো আস বাই দ্য ট্রেইল অব ডেড’, ‘স্লিপ স্টেশন’, ‘কাউন্ট কাসেল’স অবসেশন’।

কার্ল ট্যাঞ্জলারের জন্ম ১৮৭৭ সালে জার্মানির ড্রেসডেনে। নিজ নামের বাইরেও তিনি কাউন্ট কার্ল ফন কসেল নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। অভিবাসী হয়ে ১৯২৭ সালে ফ্লোরিডায় চলে আসেন। কিছুদিন পর তার সঙ্গে এসে যোগ দেন স্ত্রী ও দুই কন্যা। সেখানে ইউনাইটেড স্টেট মেরিন হাসপাতালে রেডিওলজিস্ট হিসাবে কাজ শুরু করেন।

তার দায়িত্ব হাসপাতালের যক্ষ্মা ওয়ার্ডে। যক্ষ্মা তখন ভয়াবহ রোগ। ডাক্তারের আপ্রাণ চেষ্টার পরও রোগী বাঁচিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তখনও ভালো কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি।

কার্ল ট্যাঞ্জলার

কার্লের পরিচিতজন বলতে রোগীরাই। একজনের পর একজন অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ করছে। এই অবস্থায় একজন ডাক্তারের পক্ষেও মাথা ঠান্ডা রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু কার্ল ঠান্ডা মাথায় রোগী দেখে যাচ্ছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার দখল ও অভিজ্ঞতার কথা বলে যাচ্ছেন। নিজেই রোগীদের ওপর নতুন নতুন পরীক্ষা চালাচ্ছেন। শৈশবে তিনি বিশ্বাস করতেন বহু আগে মৃত তার এক আত্মীয় কাউন্টেস আনা কন্সট্যান্টিনা ফন কসেল (নিজের কাউন্ট পদবি আর ফন কসেল নাম তার কাছ থেকেই নিয়েছেন) তাকে দেখতে আসেন। তার সঙ্গে কথা বলেন এবং তাকে জানিয়ে যান কালো চুলের একটি মেয়ের সঙ্গেই হবে তার সত্যিকারের প্রেম। ফ্লোরিডায় আসার পরও কার্ল বলতেন যে, কাউন্টেস আনা তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ অব্যাহত রেখেছেন।

কাউন্টেস আনা কোনো কল্পিত চরিত্র নন, তিনি পোল্যান্ডের রাজা অষ্টম অগাস্টাসের রক্ষিতা ছিলেন, কিন্তু তার একগুঁয়েমি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য রাজা তাকে খোরাকিসহ নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। ৪৯ বছর নির্বাসিত জীবনযাপনের পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দুর্ভাগ্য এই কসেল পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

কাউন্টেস আনা

কার্ল অভিজ্ঞ মানুষ, ভারত, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, কিউবা এবং নেদারল্যান্ডস সফর করেছেন, তিনি প্রথম মহাযুদ্ধেও সময় অস্ট্রেলিয়ান ইনটার্ন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসেন। তিনি নিজের নামের সাথে কাউন্ট ব্যাবহার করতে পছন্দ করতেন, বহু সংখ্যক ডিগ্রিধারী বলে গর্বও করতেন।

এমন সময়ই তার জীবনে মারিয়ার আবির্ভাব ঘটে।

কিউবান এক সিগার প্রস্তুতকারীর কন্যা মারিয়ার জীবনটা ভালো যাচ্ছিল না। কালো চুলের সুন্দরী এই তরুণীর বয়স যখন ১৬ বছর লুই মেসা নামের এক যুবকের সাথে বিয়ে হয়, একটি গর্ভপাতের পর মারিয়া অসুস্থ হয়ে পড়লে লুই তাকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। তাদের মধ্যে আর যোগাযোগ না থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের সমাপ্তি ঘটেনি।

২১ বছরের মেয়ে মারিয়া এলেনা মিলাগ্রো (১৯৩০ সালে) ভয়াবহ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। সে সময় আমেরিকাতে যক্ষ্মায় বছরে গড়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার রোগীর মৃত্যু হতো, যক্ষা থেকে সেরে ওঠার ঘটনা বিরল। যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীকে পরিবারের সদস্যরা খরচের খাতায় তুলে রাখত, তারা জানত বড় জোর আর ক’দিন।

১৯৩০ সালের এপ্রিলে তাকে মেরিন হসপিটালে মরণাপন্ন অবস্থায় ভর্তি করা হলো। পরিবার তার আশা ছেড়ে দিয়েছে। আশা ছাড়েননি সে হাসপাতালের ডাক্তার কেবল কার্ল। তার দিন ও রাত্রি কেটে যায় এলেনাকে যন্ত্রণা থেকে একটুখানি উপশম দিতে, তাকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনতে। কার্ল নিশ্চিত কাউন্টেস আনা তাকে যে মেয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, এলেনাই সে মেয়ে।

মারিয়া এলেনা মিলাগ্রো

পরিবার যেখানে তার নিশ্চিত মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে, কার্ল জোর দিয়ে বললেন, তাকে বাঁচিয়ে তুলবেনই। বনজ চিকিৎসা থেকে শুরু করে এক্সরে—সব প্রয়োগ করলেন। তিনি বিশ্বাস করলেন, এলেনা সুস্থ হয়ে তার ভালোবাসার জবাব দেবে। তিনি তার ডায়েরিতে লিখলেন, আশা ছিল তার শরীরের এত ক্ষয়ক্ষতির পরও এলেনা বিপদ কাটিয়ে উঠবে এবং আমরা একদিন বিয়ে করব, যতদিন তার প্রাণ ছিল আমি এ আশা ত্যাগ করিনি।

তিনি মরণাপন্ন মারিয়া এলেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন কিন্তু কোনো সাড়া পাননি, তিনি ভালো সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।

দেড় বছর ভোগান্তির ২৫ অক্টোবর ১৯৩১ সালে এলেনা মৃত্যুবরণ করল। তার পরিবারের সম্মতি নিয়ে কার্ল নিজ খরচে এলেনার কবরে একটি সৌধ নির্মাণ করলেন; প্রতিদিনই কবরে আসতে থাকলেন, তার এই অদ্ভুত পাগলামি মেনে নিল এলেনার পরিবার। আসলে এই আসা-যাওয়ার মাঝে তিনি কবরের মাটি সরিয়ে কফিনের ডালা খুলে এলেনার মৃতদেহে ফরমালিন ঢেলে এটাকে সজীব রাখতেন।

কার্ল নিজ খরচে এলেনার কবরে একটি সৌধ নির্মাণ করেন

প্রায় দু বছর তিনি সঙ্গোপনে এই কাজটি করে গেলেন। মৃতদেহ যখন আর অটুট রাখা যাচ্ছে না, তিনি চুরি করে দেহ উঠিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ১৯৩৩ সালের এক শীতের রাতে টয় ওয়াগান নিয়ে কবরস্থানে ঢোকেন এবং সকলের অজান্তে সাফল্যের সঙ্গে মৃতদেহ উঠিয়ে নিলেন।

দেখতে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো এবং বয়স তার ৫০ ছাড়িয়ে, মরদেহ নিয়ে আসার পর শুরু হলো কার্লের দিন-রাতের পরিশ্রম, পচন থেকে এটাকে রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু পেরে উঠছিলেন না; পচে মাংস ও চামড়া বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, চুল পড়ে যাচ্ছে, অস্থি জোড়া থেকে খসে পড়ছে; তিনি বাদ্যযন্ত্রের তার দিয়ে হাড়গুলো একত্রে রাখার চেষ্টা করছেন। অবস্থার একটু উন্নতি হয়েছে মনে হলেই এলেনাকে তার পোশাকে সাজিয়ে শুইয়ে রাখছেন। এভাবে কেটে গেল আরো কয়েক বছর।

মৃতদেহ নিয়ে কার্লের এসব কারবার দীর্ঘদিন চেপে রাখা গেল না। এলেনার মৃত্যুর নয় বছর পর ১৯৪০ সালে মারিয়ার বোন কার্লের বাড়িতে হানা দিয়ে এলেনার পোশাকের আড়ালে এই মৃতদেহটি আবিষ্কার করে।

ডাক্তার কার্লের ল্যাবরেটরি

পরের অংশে কার্ল গ্রেফতার, জেলে। তার অজ্ঞাতে অজ্ঞাত কোনো স্থানে এলেনাকে আবার সমাহিত করা হলো। পরিবারের আশঙ্কা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কার্ল আবার হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াবে এলেনার লাশ। এবারও হয়তো চুরি করবে।

তার বিরুদ্ধে লাশ চুরির মামলা হলো। কিন্তু এ ধরনের অপরাধের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় কার্লের কোনো সাজা হলো না। আদালতের অন্যতম বিবেচ্য ছিল এই অপরাধ সংগঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল? জবাব একটিই, যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক একমাত্র উদ্দেশ্য ভালোবাসা।

ভালোবাসার জন্য তো দণ্ড হতে পারে না। কার্ল নিজেকে কখনো অসুস্থ মনে করেননি। সুন্দরী কালোকেশী এলেনার পচন ধরা দেহকেও তিনি একইভাবে ভালোবেসেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও এই ভালোবাসায় এতটুকু কমতি হয়নি।

ফ্লোরিডা হাসপাতাল তার মুখের কথায় বিশ্বাস করে চাকরি দিয়েছিল এবং তিনিও নিষ্ঠার সঙ্গে দক্ষ হাতে কাজ করে গেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বের হলো তিনি কখনো কোনো মেডিকেল স্কুলে পড়েননি। তিনি চাকুরিচ্যুত হলেন।

মারিয়া এলেনা : জীবদ্দশায় ও কার্ল ট্যাঞ্জলারের ল্যাবরটরিতে

কার্ল ট্যাঞ্জলার একটি মর্মস্পর্শী আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাও লিখেছেন, যার একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশজুড়ে আছে ২৩ বছর বয়সী সেই স্বপ্নকন্যা এলেনা।

তিনি লিখেছেন: এলেনা প্রিয়তমা আমার, সমুদ্রতীরে আমরা নিঃসঙ্গ দুজন। যিনি তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, আমাদের আত্মাকে তিনি একত্রে গেঁথে রাখবেন।

ডায়েরিতে তিনি মারিয়াকে চুম্বন ও আলিঙ্গন করার কথা লিখেছেন। “মানুষের ঈর্ষপরায়ণতা আমার এলেনার দেহ আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছে, তবুও স্বর্গীয় প্রশান্তি আমার মধ্যে প্রবাহিত হয়, সে মৃত্যুকে অতিক্রম করেছে, চিরদিন সে আমার সাথেই আছে।”

ডাক্তার কার্ল নিজেকে যথেষ্ট সুস্থ মনে করেছেন, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিত্যাগ করে তিনি চলে গেলেও তার স্ত্রী ডোরিস নিয়মিত তাকে মাসোহারা পাঠাতেন। যে ডাক্তার একটি ভালোবাসার মৃতদেহ নয় বছর লালন করেছেন, সজীব রেখেছেন।

১৯৫২ সালে মৃত্যুর প্রায় তিন সপ্তাহ পরে ৭৫ বছর বয়স্ক কার্লকে গলিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। মারিয়ার দুই বোন অরোরা ও ফ্লোরিন্দাও যক্ষ্মায় মারা যায়।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;