থেমে থাকা বারোটি বছর যদি হঠাৎ

রাজিয়া সুলতানা
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

জানালায়, যাপিত শার্সিতে

ঘুমোব বলেই অন্ধকার জ্বালিয়েছি
রাত্রি দ্বিপ্রহর
শুকসারি গল্প চুপ
প্রান্তরে ঝিঁ ঝিঁ, নদী খরস্রোতা
শব্দ-ধাতুমূলে ঈশ্বর-বয়াত।

ভেতরে আগুন
মুঠোয় ছড়ানো হাত
অভিমানী শ্রাবণ ঝরেনি বর্ষায়
জোৎস্নাবিহীন তারার আকাশ
উঠোনে রাজহাঁস
চোখের কোটরে সিকাডা।

এই যে
বুকের কাছে সেই মুখ
বোধের কার্নিশে
মায়াবী চিবুক
কতটা গভীরে যেয়ে দিতে হয়
নিতে হয় কতটুকু—শেখোনি।

এই যে
আঁধার জ্বালিয়ে বসে আছি
কুয়াশা-ধূসর রাতপালে হাওয়া
জানালায় দাঁড়িয়ে আঙুল ছুঁয়েছো
হাত বাড়াওনি।

ঈশ্বর অজানা

ভোর পাঁচটা
চোখ তখনও বন্ধ—কেবল ঘুম থেকে জেগেছি
বাঁ পাশে হাত দিয়ে তাকে খুঁজতেই
দেখি শূন্য সে স্থান
সবসময়ই যা হয়, ভোরের পাখি যে
কফি খেতে ‘সেভেন ইলেভেন’-এ গিয়েছে

সত্যিই কি বিছানায় নেই সে, নাকি শুধু আমার ভাবনায় তা?
মাথায় একবার কিছু ঢুকলে বের হয় না আর
কেন এই সন্দিহান?
পৃথিবীর ইতিহাসেরও পরিবর্তন হয় না কোনো
হোক সে কোনো শক্তি, কোনো প্রাণি অথবা শূন্য কোনো স্বর আর শূন্যগর্ভ কিছু দিয়ে
পূর্ণ হলে একবার
শান্তির নামে আমাদের মাথাগুলো চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যায়

আমি উঠে পড়ি, স্যান্ডেল পায়ে দিতে দিতে মাথায় আবার সেই একই চিন্তা।
যে বাতাস আমি পূর্ণ করে তুলি আর যেভাবে আমার জুতোর তল ভারী হয়ে ওঠে আবার
ভাবি—পৃথিবীর সবকিছুই পুনর্ঘটনের আগে শুধু কি থেমে থাকা নয়?
আমার প্রতিবেশী তার কুকুরগুলোকে নিয়ে হাঁটতে বের হলেন
গলার ফিতেগুলো তার হাতের মধ্যে ধরা
চালাকি! আহা!
নাকি জগতপ্রেম?
যেহেতু ওদের উনি খেতে দেন—যত্নাদি করেন—নেতাদের মতো ওনার হাতেই তো
ওগুলোর স্বাধীনতা তবে
ভারি চমৎকার
এখন ভোর সাড়ে পাঁচটা
সামান্য ব্যায়াম করার চেষ্টা করছি
পিঠের ব্যথা হালকা করার জন্য হাত দুটো নড়াচড়া করছি
শুধু অনুভব করা ছাড়া ব্যথার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই আমার
অথচ আমার দাবি ব্যথাটা আমার।
কী ছেলেমানুষি!
ভাবি, ঈশ্বরও কি আমার মতো ভাবতে ভাবতে অবশেষে বুঝতে পারেন
আঙুলগুলো প্রদত্তই শুধু—এর বেশি কিছু নয়

ঘুমের মধ্যে

ঘুমের মধ্যে
আরো একটা পাতা হলুদ হলো সবুজের নিচে
উত্তরে শীতের ঘুড়ি
ইচ্ছের লাটাই হাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি প্রান্তরের মাঠে

মাঞ্জা নেই—ভোঁকাট্টা—পা ফেলছি খলসে মাছের ভেতর
খালুইয়ের আঁশটে গন্ধে আবারও ঘুম পাচ্ছে...

সম্ভাব্য সবটুকু

যখন তোমায় লিখছি
আমাদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এইচ ডব্লিউ বুশ তখন সদ্য না ফেরার দেশে—
টেক্সাসে ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক এক মহিলা ‘মস্তিষ্ক-বিধ্বংসী অ্যামিবা’ রোগে আক্রান্ত হয়ে
সেও পরলোকে
আমাদের কাউন্টিতে এক শিক্ষিকা তার প্রাক্তন ছাত্রকে নিজের নগ্নছবি টেক্সট করে
পাঠানোর অপরাধে ধৃত
এদিকে প্রায় অনতিক্রম্য এক সরু ছিদ্রপথে পার হচ্ছে ছাব্বিশটি বছর
আর এই ডিসেম্বরের শীতে আমার আত্মায় বইছে ভারী বাতাসের স্রোত
কী কঠিন যে তা।

আজ তোমাদের জন্য স্মৃতিভারাক্রান্ত হৃদয়ে দুহাতে নিবেদন করছি ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ
অঞ্জলিটুকু
বলা চলে সেও আজ শতাব্দী প্রাচীন
কিন্তু একথা তো নিশ্চিত—রঙের জগতে অ্যাকোয়া মানেই জলরঙ
নিবিড় স্পর্শে যার মুখরিত হয় পিপাসার নিবৃত্তি।

আবর্ত

সবকিছু যে ছাড়িয়ে গেলে তুমি
ঘুমিয়ে এখন রাতের ধারাপাত।
দিনকে এনে মৌন-আলোক ব্রতে
এড়িয়ে গেলে সমস্ত সংঘাত?

হয় কি তা?
যার সাথে যা সঙ্গোপনে
হতেই পারে।
পুস্পধূলি উড়তে নিলে
দিন কি রাতে হতেই পারে
ঈশ্বরীও কাত।

বৃত্ত অথবা ঈশ্বর

কেন্দ্রে রেখে চারু পা
তারপর চারিদিকে যা
ঘুরে আয় নিজেকে নিয়ে
বৃত্তের পরিধি আঁকা
হলো তোর কম্পাস?
বিন্দুতে গা
অক্ষগামী ব্যাসার্ধ
অনুগামী মুহূর্ত
‘পাই’-এর গোলকে
মোড়ানো ধ্রুবক
নিয়ে আয় তা।

কেন্দ্রই ঈশ্বর
তুই আমি পরিধি প্রজা
দু’খণ্ডিত ব্যাস
বর্গ নিয়ে দ্যাখ
‘পাই’-এর গুণে
পরিধি প্রান্তরে
ক্ষেত্রফল তুই তারপর
বিপুল তরঙ্গ রে
এরপর তুই ঈশ্বর।

প্যারাডাইম

অপেক্ষার ভেতর সাঁতার খেলতে গিয়ে প্রথমে চোখ, তারপর দৃষ্টি উধাও হলো।
জানি, আজ এই মুহূর্তে
কোথাও একটা নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে
কোথাও একটা বাঘ একটা হরিণকে জব্দ করে ফেলেছে
আর একটা সাপ কবরে টেনে ধরেছে কোনো লাশের জিহ্বা।

ওরা আমাকে তত্ত্ব বোঝাতে আসে, প্যারাডাইম শেখায়
আমি বসে বসে মি-টু’র জোয়ার দেখি
দেখি সুন্দর ঝরে পড়ছে কেমন নিশ্চিন্তে
ছিপিখোলা বিয়ারের কার্নিশে তৃতীয় ব্যক্তির ঝুলে থাকা ঠোঁট
অসংলগ্ন কথাবার্তা আর বেলেল্লাপনা আজ—
আমাকে সূর্যের দিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে হঠাৎ, নির্বাক!

মেনিয়াক

যখন ব্যস্ত হয়ে পড়ো
তখন এ শহরের কাকগুলোকেও বড় অচেনা মনে হয়।
দুঃখ তো মমির রুহ
ধুলোঝাড়া ছবির ফ্রেম
কাচভাঙা আয়না
রাস্তা থেকে দূরত্ব মুছে গেলে ধৃতিময় পথের স্মৃতি
পাখিদের হল্লা করে বাড়ি ফেরা
আধখাওয়া খেজুর
শ্মশানঘাটের কদম
বরই
শিমুল
প্রান্তরে সাহাতন খালাম্মার ভেড়ার পাল
ভেড়াগুলো বেঁকে বসলে খালাম্মা বলতেন
এইগুলিরে মানুষ করতে পারলাম না
মানুষ!
মানুষ হয়েছে কবে কে কখন?
নাকি মনুষ্যবর্তী হয় কেউ কখনো?
দুঃখের জাহাজভর্তি ঝিনুক আসে লবস্টার আসে
দুঃখের বাঁশঝাড়ে লটকে থাকে প্যানোর‍্যামা ভিউ
সাইপ্রেস ট্রি দিয়ে ঘোরানো রাস্তায়
পাহাড়ের ওপর দিয়ে আহা লা ভিলা
তোমাকে ডাকে
তোমার ভ্রুক্ষেপ নেই আক্ষেপ নেই
ফিরে তাকানো নেই
থেমে থাকা বারোটি বছর যদি হঠাৎ
অভিমানে ঝরে যায়
জানি তখনও বলবে—আমার কী-ই বা করার ছিল?