ছোট রাজপুত্র : এক নিঃসঙ্গ গ্রহচারী



মাহরীন ফেরদৌস
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

যে কোনো এক সকালে কাঁধে একখানা ব্যাকপ্যাক নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রায় চলে যাওয়ার মতো বিচিত্র ইচ্ছে বোধকরি এই পৃথিবীতে অনেকেরই আছে। সে ইচ্ছে সবাই পূরণ করতে না পারলেও; বহু বছর আগে ভিনগ্রহের এক ছোট রাজপুত্র পেরেছিল ঠিকই। আর নানা গ্রহের অদ্ভুত সব অধিবাসীদের সাথে পরিচিত হয়ে উপভোগ করছিল তার ভ্রমণ। 'সোজা গেলে বেশি দূর যাওয়া যায় না' এমন এক ছোট্ট গ্রহ থেকে রাজপুত্র শুরু করে তার যাত্রা। জানা কথা, মঙ্গল, শুক্র, নেপচুন ও পৃথিবীসহ নানা চেনা গ্রহ-উপগ্রহ সৌরজগতে থাকলেও পাশাপাশি আছে শত শত বেনামী গ্রহ। এমনই এক গ্রহ থেকে এসেছিল সে। আমরা যদি বয়স্ক মানুষের মতো ভেবে দেখি; তাহলে এখন হয়তো প্রশ্ন করে বসবো, কত বড় আয়তন সেই গ্রহের, কত জনসংখ্যা, ওজন ক্যামন কিংবা নাম কী? আর যদি মন রাখতে পারি সতেজ ও শিশুসুলভ তাহলে হয়তো বলবো, সেই গ্রহে আকাশের রঙ কি নীল? প্রজাপতি উড়ে? বৃষ্টি হয় নাকি বর্ষাকালে? সেইসব প্রশ্ন একপাশে রেখে বরং এইটুকু আপাতত জেনে নেওয়া যাক, রাজপুত্রের নক্ষত্রকে ডাকা যাবে বি-৬১২ নামে।

সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া এক বৈমানিক যখন বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হন; তখন সেখানেই তার দেখা হয়ে যায় চারপাশে রহস্য ঘনিয়ে ওঠা নির্লিপ্ত এক রাজপুত্রের সাথে। মার্কিন দেশে যখন ভর দুপুর; ফরাসিতে তখন সন্ধ্যা নামে, এমন এক দোলাচলের সময়ে রাজপুত্র চায় বৈমানিককে নিয়ে সূর্য ডোবার পালাবদল দেখতে। বৈমানিক জানতে পারে রাজপুত্রের গ্রহসহ তার নানা অভিযানের কথা। আর 'থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস' এর মতো রাজপুত্র ঘুরে আসে এক বৃদ্ধ রাজার অধিবাসে, যে ভাবতো 'সকল মানুষমাত্রেই তার প্রজা'। আরেক গ্রহে সে খুঁজে পায় এক আত্মভিমানী লোক; যে হাততালির মাধ্যমে টুপি খুলে প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য শুনতে ইচ্ছুক। এরপর একে একে আসে মদ খাওয়ার লজ্জা ভুলে যেতে চাওয়া মাতাল, যোগফল নির্ভুল করতে চাওয়া ধনী ব্যবসায়ী, ল্যাম্প পোস্টের বাতি জ্বালাবার লোক। দেখা দেয়; মোটা মোটা বই লেখা এক ভৌগলিক, যে কেবল দেশাবিস্কারকের কাছ থেকে জ্ঞানটুকুই টুকে নেয় কিন্তু নিজে কোথাও যায় না। সবশেষে সে পায় নীল-সবুজ গ্রহ পৃথিবীকে। সেখানে পরিচিত হয় সাপ, ফুল, গোলাপ বাগান, একাকী পর্বতমালা ও এক খেঁকশেয়ালের সাথে। উপন্যাসের প্লট টুইস্টের মতো জানা যায়, নিজের গ্রহের প্রিয় ও একমাত্র লাল গোলাপের সাথে অভিমান করে রাজপুত্র নেমে এসেছে পৃথিবীতে। সাথে সাথেই যেন এই অভিমান, বিচ্ছেদ আর টকটকে একটি লাল গোলাপ পাঠকদের মনে করায় ১৭৪০ সালে প্রথম প্রকাশিত ফরাসি ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়াল সুজান দে ভেলনুয়েভার লেখা বিশ্ব বিখ্যাত আরেক রূপকথা 'সুন্দরী ও কদাকার' এর স্মৃতি। ফলে এক গল্প নদীর মতো বাঁক বদল করে চলে যায় অন্য গল্পে। প্রচণ্ড অমিলের সমীকরণে জেগে ওঠে কিছু মিল।

সেই রূপকথায় এক বৃদ্ধ সওদাগর ঝড়ের কবলে পড়ে আশ্রয় নেয় জনশূন্য, রহস্যময় এক প্রাসাদে। রাজ্যের মুখরোচক খাওয়া, আরামদায়ক ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ সুবিধা নিয়ে পরদিন বৃদ্ধ যখন মনে মনে প্রাসাদের মালিককে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির পথ ধরতে যায়, তখনই তার চোখ পড়ে এক ফুল বাগানের দিকে। আর তার মনে পড়ে; সব সন্তানেরা তার কাছে দামী পোশাক, গহনা, উপহার সামগ্রী চাইলেও সবচেয়ে ছোট কন্যা, বইপড়ুয়া বেলা চেয়েছে একটি টকটকে লাল গোলাপ। যে ফুলটি তাদের গ্রামে পাওয়াই যায় না। তাই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর গোলাপটি ছিঁড়ে নেয় সে, আর তখনই বজ্রের মতো প্রাসাদের ভেতর থেকে জান্তব হুঙ্কার দিয়ে ওঠে কেউ। এক কিম্ভূতকিমাকার কুৎসিত চেহারার জন্তুর হাতে আটকা পড়ে সওদাগর। ক্ষমা প্রার্থনার পরেও কুৎসিত জন্তুটি তাকে ছাড় দেয় না। বরং জানায় এক শর্তে সে পাবে মুক্তি; যদি বৃদ্ধের কোনো সন্তান এসে তার বদলে জিম্মি থাকে প্রাসাদে। আর এমন বিচিত্র শর্তের পরিণতি হিসেবে নিজের পিতাকে বাঁচাতে রাজপ্রাসাদে এসে ধরা দেয় বেলা। সুনসান প্রাসাদে কুৎসিত জন্তুটির পাশাপাশি আতংকিত হয়ে বসবাস করার সময়ে কেবল একটি স্থানই থাকে; যেখানে বেলা খুঁজে পায় নিজের শান্তি ও ভালোলাগা। তা হলো, প্রাসাদের বিশাল বড় লাইব্রেরি। যেখানে আছে শত শত বই। আর এভাবেই দিন পার করতে করতে বেলা ও কুৎসিত জন্তুটি কৌতূহলী হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতি। হয়ে যায় বন্ধু। প্রকৃতপক্ষে জন্তুটি ছিল এক অভিশপ্ত রাজপুত্র; যে হারিয়েছিল নিজের আসল রূপ, আত্ম-অহমের কারণে। কুৎসিত অবয়বের আচ্ছাদন পেরিয়ে কেবলমাত্র সত্যিকারের ভালোবাসা পেলেই সে ফিরতে পারবে স্বরূপে। নয়তো রাজপুত্রের জীবনের সময়ঘড়ি থেমে যাবে, একটি লাল গোলাপের মুষড়ে পড়ার সাথে সাথেই। সেই গোলাপের সাথে জুড়ে থাকা দু'জনের রূপকথা তখন আমাদের চোখে যেন হয়ে ওঠে সময়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত গল্প। মনে হয় আসলে এখানে কোনো মিথ, ম্যাজিক কিংবা কল্পনা নেই। যুগে যুগে মানুষের মাঝেই লুকিয়ে থেকেছে অমানুষ, অমানবিকতার বেশে সেঁটে থেকেছে নানা মুখোশ ঠিক কুৎসিত জন্তুটির মতোই। যার ফলে তারা ভুলেছে অন্যকে ভালোবাসতে। উপকার করতে। মানবিক হতে। রূপকথার এই জন্তুটি যেন প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থা ও সৃষ্টির সেরা জীবের আত্মকেন্দ্রিকতার প্রতীক। যেখানে দরকার বেলার মতো আলোকিত, উদার কেউ। যে ছড়াতে পারে জ্ঞান ও ধৈর্য্যের সুবাতাস, যে চায় বাইরের রূপটুকু এক নিমিষে সরিয়ে অন্তরের ভেতরে আলো ফেলতে। যে বই পড়ে, যার প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নতুন করে তাজা হয়ে ওঠে কুৎসিত জন্তুর মন থেকে শুরু করে মুষড়ে পড়া গোলাপ ফুলটিও।

‘সুন্দরী ও কদাকার’ এর গল্প যেমন করে আমাদের সামনে আটপৌরে রূপকথাকে করে ফেলে আধুনিক, তেমন করেই মনে হয় ভিনগ্রহের রাজপুত্র ও তার লাল গোলাপের কাহিনীরও আছে ভিন্ন আঙ্গিক। ঠিক যেন পৃথিবীতে থাকা সাপের বলা একটি হেয়ালিপূর্ণ কথার মতো সত্য, 'লোকেরা বাড়িতেও প্রত্যেকে একা'। কিংবা বয়স্ক মানুষদের মতো একপেশে দর্শন, যেখানে হৃদয়ের চেয়ে সংখ্যাই তাদের কাছে বেশি মূল্যবান। আর খোঁড়া সিস্টেমের যাঁতাকলে হাঁসফাঁস করতে থাকা পাঠক বুঝতে পারে আস্ত হাতি গিলে ফেলা বোয়া অজগরের ছবিটির মতো তাদেরকের গিলে নেবে কোনো না কোনো সিস্টেম যদি শুরুতেই 'বাওবাব' নামের ধ্বংসাত্মক ও বিষাত্মক গাছকে উপড়ে না ফেলা হয় তো। আর এই ফাঁকে আদেশ দিতে ভালোবাসা, পার্থিবতা, কৌতুক ও নিষ্ঠুরতা প্রিয় নানা গ্রহবাসীদের উদ্ভট সব নিয়ামবলীর মাঝে; একাকী সূর্যাস্ত উপভোগ করতে চাওয়া বিষণ্ণ রাজপুত্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানায় খেঁকশেয়ালটি। জানায় কেন কাউকে পোষ মানাতে হয়। কেন পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ থাকার পরেও নির্দিষ্ট কেউ আমাদের চোখে হয়ে ওঠে অনন্য। কেন তার চিন্তা ও যাপনকে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডি অথচ ইতিবাচক কেয়ার ইমোটিকনসের মতো আঁকড়ে ধরতে চাই। সাদা চোখে সে পৃথিবীর অন্যসব মানুষের মতো হবার পরেও তার গায়ের ঘ্রাণ, চলার শব্দ, তাকানো কিংবা কন্ঠ হয়ে ওঠে আমাদের পরিচিত অংশ। কারণ আর কিছুই নয় ফার্সি কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমির মতো বলা যায়, ‘যা কিছু আমরা খুঁজি তা খুঁজে নেয় আমাদেরকেও’। আমরা যাকে পোষ মানাই তার কাছে নিজেও মেনে নেই পোষ। আর এক ভিন্নতর যোগাযোগ শুরু হয়ে যায় যা, খালিচোখে দেখাই যায় না। অথচ ছোট রাজপুত্র বইটিই আমাদের জানায়, যা কিছু চোখে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায় তাই এই বিশ্বে তুমুল শক্তিশালী, সবচেয়ে খাঁটি।

ছোট রাজপুত্র ভাবে, সে তার গ্রহে গোলাপটি প্রথম দেখে ভেবেছিল এমন সুন্দর ফুল আর কোথাও নেই। ফুলটিও স্বীকার করেছিল সারাবিশ্বে তার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না, কিন্তু খেঁকশেয়ালের সাথে পোষ মানানো উত্তাল বন্ধুত্বের সময়ে রাজপুত্র পৃথিবীতে পেয়ে যায় এমন এক বাগান যেখানে আছে শুধুই গোলাপ। প্রথমে নিজেকে প্রতারিত মনে হলেও নতুন করে বুঝতে পারে আসলেই তার ফুলের কথাটি ছিল সত্য। সহস্র ফুল বাগানে থাকলেও তার ফুল ছিল কেবল একটিই। এভাবেই একের পর এক উপলব্ধির গিঁট খুলতে খুলতে রাজপুত্র এগোতে থাকে সামনে।

'বয়স্কমাত্রই তো একদিন ছোট ছিল' এ কথাটা মনে রাখে না অনেকে, চোখের আড়ালেই আসল চোখটা থাকে লুকিয়ে তাও সময়ের সাথে ভুলে যায় সকলে। রাজপুত্রের অভিযান যেমন তাকে দেয় মনোরম নানা বোধ, মরুভূমিতে আটকে থাকা বৈমানিকও যেন এক পর্যায়ে পেতে থাকে নতুন জীবন দর্শন। যেন বস্তুবাদী দুনিয়ার দেয়াল শুরু করে ভাঙতে। আর গমখেতের ওপর দিয়ে তীব্র বাতাস বয়ে চলা সময়ে স্মৃতিচিহ্ন রেখে বিদায় নেয় খেঁকশেয়াল। প্রায় একইভাবে বিদায় নেয় বৈমানিকের কাছ থেকে রাজপুত্রও। লম্বা সময় পেরিয়ে বৈমানিক ফিরে আসে নিজ দেশে, কিন্তু জানতে পারে না কী হলো এরপর সেই ছোট রাজপুত্রের। হয়তো সে চলে গিয়েছে তার অচেনা গ্রহে, হয়তো হারিয়েছে পথ। সাপে কেটেছে কিংবা তার গোলাপ ফুলটিকে আর অক্ষত পায়নি বলে সে তলিয়েছে মেঘের আড়ালে। পাঠকের আর পরিণতিটুকু জানা হয় না। তবে এক্সপ্রেস ট্রেন রাতের অন্ধকার চিরে যেভাবে চলে যায় আলো ছড়িয়ে, কিংবা কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশে যেভাবে পথশিশুদের মুখে ফুটে ওঠে বিকেলের রোদ, যেভাবে আত্মহত্যা প্রবণ জাপানী লোকগুলো অকিগহরা জংগলে যায় মিলিয়ে, সেভাবেই পাঠকের মনে ভালো-মন্দ উভয় আশংকা কাজ করতে থাকে। পাঠক যেন বাস্তব, অবাস্তব, পরবাস্তবতাকে গেঁথে ফেলে একই সূতায়। ছোট ও বড়ো মানুষের মাঝের দেয়াল গুঁড়িয়ে; সেতু বানিয়ে, জনপদ থেকে জনপদ ঘুরে বেড়াতে থাকে বি-৬১২ গ্রহের এক নিঃসঙ্গ গ্রহচারীর মতো।

তবে আশার কথা, গভীর রাতে আকাশে পৃথিবীর সুন্দরতম, বিষণ্ণতম যে দৃশ্য জেগে ওঠে তাতে পাঠক রাজপুত্রকে খুঁজে না পেলেও তার আবছায়া যেন পরবর্তীতে বইয়ের দোকান কিংবা অন্তর্জালে বিল ওয়াটারসনের কমিক বুক 'কেলভিন এ্যান্ড হবস' -এ পেয়ে যায়। ছয় বছর বয়সী কেলভিনকে মনে হয় বৈমানিকের শৈশব আর তার কাল্পনিক বন্ধু হবসকে মনে হয় সোনালি চুলের রাজপুত্র। তিব্বতের টিনটিন, চাচা চৌধুরী যতই রাঙিয়ে দিয়ে যাক; ফেলে আসা ছেলেবেলার ঝোলা কাঁধে পুরানো শহরে হেঁটে যাওয়া কোনো এক চিরতরুণ গল্পবুড়োর মতো 'দ্য লিটল প্রিন্স' বা ছোট রাজপুত্রকে জীবনে চেনা যায় বার বার। বন্ধ চোখে বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় তার প্রাণোচ্ছল হাসি। সংখ্যাতত্ত্বে জর্জরিত পুঁজিবাদের জীবনে আজও এক পলক থমকালে; যুক্তির মেঘগুলোকে ঠেলে পেছনে ফেলে একটু দাঁড়িয়ে অনুভব করা যায়, ভেতরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা আর একটি লাল গোলাপের জন্য খাঁটি ভালোবাসা বাদে হয়তো বেঁচে থাকার কোন দীর্ঘ অর্থ নেই এই পৃথিবীতে।

গল্প 'ব্রহ্মপুত্রের ঘাট': মাহফুজ পারভেজ



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

খুব দূরেও নয়, আবার কাছেও বলা যাবে না। যাত্রাপথ সাকুল্যে পয়তাল্লিশ মিনিটের। কোনও বিভ্রাট হলে প্লাস-মাইনাস পাঁচ থেকে দশ মিনিট। যাত্রার সময়ের মতো পথের রেখাও ঝকঝকে, স্পষ্ট। কিশোরগঞ্জ থেকে নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে ডানে গৌরীপুর, নেত্রকোনা, ফুলপুর, হালুয়াঘাট রেখে শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট। ট্রেনে এলেও মোটামুটি একই সময় লাগে আর অভিন্ন জনপদগুলো পেরিয়ে আসতে হয়। পূর্ব ময়মনসিংহের এই চিরায়ত ভূগোলে সড়ক আর রেলপথ বলতে গেছে সমান্তরালে চলেছে। 

শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুরের ঘাটের চিত্রটিও আদি আর অকৃত্রিম গুদারা ঘাটের বর্ধিত সংস্করণ মাত্র। পারস্যের বহু ফারসি শব্দের মতো গুদারা শব্দটিও দিব্যি টিকে আছে বাংলা অভিধানে। ঘাটে গিজগিজ করছে পূর্ব ও উত্তর ময়মনসিংহের বাসগুলো। গুদারা নৌকায় অপর পাড়ে ময়মনসিংহ শহর। সেখানেও অনেকগুলো ঘাট: থানা ঘাট, এসকে হাসপাতাল ঘাট, পাটগুদাম ঘাট। যার যেদিকে কাজ, সেদিকের গুদারা নৌকায় যাচ্ছে। নদীর অবিরাম স্রোতের মতো নৌকা ও মানুষের ছুটে চলা যেন চলছেই অনাদিকাল থেকে। মূক ব্রহ্মপুত্র যার সাক্ষী।   

কনক বাস থেকে নেমে নদী ও ওপারের ল্যান্ডস্কেপে আবছা শহরের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয়। প্রলম্বিত গ্রীষ্মের তেজি ভাব নেই নদী তীরের জলমগ্ন পরিবেশে। বাতাসে হাল্কা সুখের পরশ ভাদুরে গুমোট গরমকে  কিছুটা পরাজিত করেছে। নদী যে কতটা স্বস্তি ও আরামের, তীরে এলে টের পাওয়া যায়।

কনকের ভাগ্যে প্রাকৃতিক মোলায়েম পরশ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আসা-যাওয়ার বাসগুলোর মধ্যে ঢুকছে আরও নানা রকমের যানবাহন, যাত্রী ও পথচারী। থেমে থেমে শুরু হয়েছে যন্ত্রদানবের পৈশাচিক হর্নের মর্মন্তুদ উল্লাস। কালো ধূম্রকুণ্ডলী পাগলা মোঘের মতো খোলা আকাশ ও মুক্ত বাতাসকে হনন করছে। ঘাটের কুখ্যাত যানজট, শব্দ ও বায়ু দূষণ, বিশৃঙ্খলার উৎপাত থেকে কিছুটা দূরে সরে কনক একটা অস্থায়ী গোছের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে।

একমুখ হাসিতে মাঝবয়েসী দোকানি আমন্ত্রণের গলায় বলল, ‘চা আর একটু হাওয়া খেয়ে নৌকায় উঠে পড়ুন। এখনও রোদ কড়া হয় নি, আরামে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছে যেতে পারবেন।’

দোকানির কথায় কনক সৌজন্যে মাথা ঝাঁকিয়ে একই সঙ্গে সম্মতি ও চায়ের অর্ডার দেয়।

ঘাটের এদিকে বিশেষ ভিড় নেই। জন কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, হর্ন ও ভিড়ের প্রকোপ অপেক্ষাকৃত কম। অদূরে ধনুকের মতো উত্তর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে যেতে। চোখে পড়লো, নদীতে ব্রিজের কাজ চলছে। পিলার বসছে মাঝ বরাবর।

কনক ব্রিজের চলমান কাজকর্মের দিকে অনেকক্ষণ স্থির চোখ আকিয়ে আছে দেখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে দোকানি কথা বলে, ‘ব্রিজ হলে তো ঘাট থাকবে না। গুদারা, মাঝি, আমাদের মতো দোকানদারদের বিপদ হবে।’

কথাগুলো ঠিক কনককে উদ্দেশ্য করে বলা হয় নি। স্বগতোক্তির মতো উচ্চারিত। কনক চুপ করে শোনে। কোনও উত্তর দেয় না। চা শেষ করে ঘড়ি দেখে কনক। প্রায়-আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে এখনও জ্যোতি আসে নি। অথচ আজকে জ্যোতির আসাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইচ্ছে করলেই সে নৌকা ধরে ময়মনসিংহ শহরে চলে যেতে পারে। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটবে না। তাদের মধ্যে ঠিক করা আছে, এক সপ্তাহে কনক ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে শহরে আসবে। পরের সপ্তাহে জ্যোতি আসবে নদী পেরিয়ে শম্ভুগঞ্জে। মফস্বল শহরের ছোট্ট পরিসরে সবাই মুখচেনা লোক। নিয়মিত এক জায়গায় দেখা-সাক্ষাত হলে লোকমুখে সেটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।

একবার শহরের জনবহুল গাঙিনার পাড়ে কনক ও জ্যোতিকে একসঙ্গে দেখে পাড়ার এক বড় ভাই কটমটে চোখে তাকিয়ে ছিল। ভাগ্য ভালো থাকায় জেরা-জিজ্ঞাসাবাদের আগেই তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে হারিয়ে যায়। আরেক বার রেল স্টেশেনের কাছে তাজমহল রেস্টুরেন্টে চা খেতে গিয়ে প্রায় হাতেনাতে ধরাই পড়ে গিয়েছিল কলেজের মহেশ স্যারের কাছে। সেবারও ভাগ্যের জোরে সটকে পড়েছিল দুজনে। তারপর থেকে পরিকল্পনা বদলে ফেলে তারা। এক সপ্তাহে কনক শহরে গিয়ে দেখা করে। দেখার জায়গাও তারা বদল করে নিয়মিত। কখনও ছায়াবাণী, পূবরী বা অলকা সিনেমা হলের সামনে। কখনও সার্কিট হাউসের আশোপাশে। কখনও নদীর তীর-ঘেঁষা পার্ক ও রাস্তায় সন্তর্পণে কিছুটা সময় কাটায় তারা।

জ্যোতি শহরের বাইরে এলে শম্ভুগঞ্জের আশেপাশে নদীর তীর ধরে নির্বিঘ্নে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় দুজনে।

এই সপ্তাহে হিসাব মতো জ্যোতি আসবে শম্ভুগঞ্জে। সে রকমই কথা হয়ে আছে। জ্যোতি জরুরি কিছু কথা বলার বিষয়েও আগাম জানিয়ে রেখেছে  । কনকেরও বলার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা জমে আছে। শুধু কথা নয়, দুজনের ভাগ্যও পাশের ব্রহ্মপুত্রের মতো বাঁক বদল করতে চলেছে। কনক পড়তে চলে যাবে পাহাড় ও সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্যোতি চান্স পেয়েছে উত্তরের মতিহার ক্যাম্পাসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রকে সাক্ষী রেখে তাদের আসা-যাওয়া আর মেলামেশাও ইতি ঘটতে চলেছে। তাদের হৃদয়ে মিলনের আকুতি সুতীব্র হলেও দুজনের জীবনগতির সামনেই অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চিত টান। এই সপ্তাহে দুজনের দেখা হওয়া তাই খুবই জরুরি। এ কথা কনক যেমন জানে, জ্যোতিও জানে।

কনক যথারীতি উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু জ্যোতিকে না দেখে সে চিন্তিত এবং কিছুটা বিস্মিত ও শঙ্কিত। জ্যোতি তো কথার হেরফের করার মেয়ে নয়। তাহলে কেন এই বিলম্ব? মাথায় এই আস্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে কনক চা দোকানের বেঞ্চিতে অপেক্ষায় থাকে।

কোন ফাঁকে অপেক্ষার মাঝ দিয়ে কয়েক কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে, কনক টের পায় না। টের পেলো যখন প্রতীক্ষার টেনশনে ও কয়েক কাপ চায়ের দ্রব্য গুণে পেটে অম্বলের চাপ তৈরি হলো, তখন। প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে তবু জ্যোতি আসে নি। আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না। কনক আলতো পায়ে মন খারাপ করে নদীর দিকে পা বাড়ায়। ওপার থেকে আসা নৌকাগুলোর দিকে চোখ রেখে রেখে সে তীরে পায়চারি করতে থাকে।

কনক দেখে কত রঙ-বেরঙের মানুষ নৌকায় ব্রহ্মপুত্রের এপার-ওপার করছে। বিচিত্র তাদের বয়স, পেশা, ব্যক্তিত্ব। ছাত্র, ব্যবসায়ী, অসুস্থ, বৃদ্ধ, কুলি, কামলা, হকার রোগি, নারী, পুরুষের অভাবনীয় এক জগৎ তৈরি হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট ঘিরে। এখানেই একদিন জ্যোতির সঙ্গে কনকেরও দেখা হয়ে গিয়েছিল। এক অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে কনক নেমেছিল শম্ভুগঞ্জের ঘাটে। গুদারা নৌকায় চেপে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে অস্থির ও ব্যাকুল কনককে দেখছিল সহযাত্রীরা। কনক আগে ময়মনসিংহ শহরে আসে নি। সে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিচ্ছে জীবনে প্রথম বারের মতো। তা-ও একা এবং একজন সঙ্কটাপন্ন মানুষকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে সে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। পাশের কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চেয়ে বিশেষ লাভ হয় নি তার।

অকস্ম্যাৎ উদ্বিগ্ন কনক অবাক হয় একটি তরুণীর কণ্ঠস্বরে, ‘চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেবো।’

‘আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমাকে পথঘাট বলে দিলেই আমি পারবো।’

`আমার কষ্ট হবে না। আমি ওদিকেই থাকি।’

মাঝ নদীতে কনক যে মেয়েটির কথায় আশার দ্বীপ খুঁজে পায়, তার নাম জ্যোতি। জ্যোতির কারণে নতুন শহরে আগন্তুকের মতো একেলা ও অসহায় কনক স্বচ্ছন্দ্যে সব কাজ করতে পারে। রোগি ভর্তি থেকে চিকিৎসার যাবতীয় কাজে না বললেও জ্যোতি পাশে থাকে। রুটিন করে দিনে দুইবার হাসপাতালে চলে আসে জ্যোতি। বারণ করলে   বলে, ‘ঐ যে আমাদের বাসা দেখা যায়। দুই মিনিটের পথ। বার বার এলেও আমার কোনও অসুবিধা হবে না।’

হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেওয়ার দিন জ্যোতি সারাক্ষণ পাশে থাকে। শহরের প্রান্তস্পর্শী ব্রহ্মপুত্রের ঘাট পর্যন্ত সঙ্গে আসে। নৌকায় বসে কনক দেখে পাড়ে তখনও দাঁড়িয়ে জ্যোতি। হঠাৎ নিজের ভেতরে অকস্ম্যাৎ পরিচিতি মেয়েটির জন্য অজানা-অচেনা কেমন একটা টান অনুভব করে কনক। মনে হয় ব্রহ্মপুত্রের  সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে সে একটি স্বল্প পরিচিত তরুণী সঙ্গে যৌথ সাঁতারে। নৌকা ছাড়ার আগে কনক হঠাৎ চিৎকার করে বলে, ‘শুক্রবার আমি আবার আসবো তোমার কাছে।’ হাল্কা মাথা নাড়িয়ে সলাজ মুখ লুকায় তীরে দাঁড়ানো জ্যোতি।

সেই শুরু। তারপর দেখতে দেখতে দুই বছর হয়ে গেছে। বিশেষ কারণ ছাড়া কোনও সপ্তাহেই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাদ যায় নি। আজকে জ্যোতির দেখা না পেয়ে পুরনো কথাগুলো মনে হয় তার। জ্যোতির দেখা না-পেয়ে কনকের মনে হলো, উত্তরের গারো পাহাড় কাছে চলে এসে বেদনার প্রচণ্ড ভারে তাকে চেপে ধরেছে।

কনক ঠিক বুঝতে পারে না, কেন জ্যোতি আসে নি? এমন তো কখনও হয় নি। বিশেষ করে, এবারের দেখাটা অনেক জরুরি। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তাদের মধ্যে হওয়া দরকার।

কনক দেখে দুপুরের সূর্য মাথার উপর গনগন করছে। ব্রহ্মপুত্রের জলজ বুকে রুদ্রদিনের দাবদাহে বাষ্পের আবছা ছায়া দৃষ্টিতে বিভ্রম ছড়াচ্ছে। সে নিজেও কম বিভ্রান্ত নয়। তার বুকেও চলছে আগুনের হল্কা। কনক স্থির করতে পারে না, তার কি চলে যাওয়া উচিত? নাকি ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে যাওয়া দরকার জ্যোতির কাছে?

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে নৌকা ধরে শহরে চলে আসে কনক। বেশ খিদেও পেয়েছে তার। তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে সে চলে আসে সেহরা, আকুয়া পেরিয়ে জ্যোতির বাসার কাছাকাছি। জ্যোতির বাসা চিনলেও কোনও দিন সেখানে তার যাওয়া হয় নি। একবার শুধু বড় রাস্তা থেকে জ্যোতি দেখিয়েছিল তাদের হলুদ বাড়িটি। আন্দাজে খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক সময় কাটিয়ে বিকেলের মুখে কনক জ্যোতিদের বাড়ির ঠিক সামনে পৌঁছে যায়। পুরো আবাসিক এলাকায় সারিবদ্ধ বাড়িগুলো দেখতে পায় সে। কোন দোকান-পাট নেই যে দাঁড়িয়ে দেখবে বা কিছু খোঁজ-খবর করবে। জ্যোতির বাসার পাশে তার চোখে পড়ে গেটের ভেতরে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়ানো। লোকজনও চলাচল করছে। অন্য বাড়িগুলোর মতো নিশ্চুপ ঝিমুচ্ছে না জ্যোতিদের বাসা। বাসার আরেক পাশে একটি ল্যাম্পপোস্টের তলায় তিনটি ছেলে জটলা করছে। কনক ধীর পায়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। সে স্পষ্ট শুনতে পায় তাদের কথোকথন, ‘খুব ভালো বিয়ে হয়েছে জ্যোতির। যদিও কাজটা হয়েছে ওর অসম্মতিতে জোর-জবরদস্তি করে।’

চট করে এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়ায় কনক। পেছন ফিরে ছেলেগুলোর মাথার উপর দিয়ে তীর্যক দেখতে পায় জ্যোতিদের বাড়িটি যেন নিমেষে কারাগার হয়ে গেছে। সামনের দিকে ফিরে পা বাড়ানোর আগে কনক শুনতে পায় ছেলেগুলোর মধ্যে কেউ একজনের গলা, ‘জ্যোতিকে আর দেখতে পাবো না। কালই বরের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে সে।’

যন্ত্রের মতো কখন যে কনক প্রাচীন ময়মনসিংহ শহরের অলি-গলি পেরিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে চলে আসে, বুঝতেও পারে না। বোধশক্তিহীন মানুষ এখন সে। অভ্যাসের বশে সে চিনতে পারে ঘাট, গুদারা, নৌকা, ব্রহ্মপুত্র, জ্যোতির মুখের স্মৃতি। চিনলেও সে যেন কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেকে তার মনে হয় খুবই একা ও অচেনা এবং পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষের মতো সঙ্গীহীন। নদীর তীর থেকে কেউ একজন তাকে ধরে নৌকায় বসিয়ে

দেয়। চরাচর জুড়ে প্রদোষের আবির রঙা বেদনায় কনক ব্রহ্মপুত্রে জলে তাকিয়ে চমকে উঠে। কনক দেখে, ব্রহ্মপুত্র নিজের চেহারা লুকিয়ে জলের কল্লোলে তার নিজের চেহারাই বিম্বিত করেছে। নদীর দিকে তাকিয়ে কনক বুঝতে পারে, তার আর জ্যোতির জীবন প্রবাহ যেন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

পুরনো নদীর বুকে জন্ম নেওয়া একেকটি বালুচর পেরিয়ে কনকের নৌকা শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ফিরে আসার সময় তার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এইসব বালুচরের ওপর শুয়ে স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীর কথা ব্রহ্মপুত্র মনে রাখবে? তাদের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যাগুলো মনে রাখবে শম্ভুগঞ্জের ঘাট?

কোনও এক অনিন্দ্য ভোরে হঠাৎ শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসে একদিন কনক জেনে নেবে এইসব প্রশ্নের উত্তর।

পাদটীকা: ব্রহ্মপুত্র নদ প্রেমে পড়েছে। সে প্রেমে পড়েছে সুন্দরী নদী গঙ্গার। গঙ্গার রূপের গল্প শুনে সে অস্থির হয়ে পড়েছে। যে করেই হোক, গঙ্গাকে তার চাই। ব্রহ্মপুত্র সিদ্ধান্ত নিলো সে গঙ্গাকে বিয়ে করবে। যে-ই ভাবা সে-ই কাজ। গঙ্গাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রবাহিত হতে থাকলো সে। ওদিকে গঙ্গাও ব্রহ্মপুত্রকে পছন্দ করেছে। কিন্তু পছন্দ করলেই তো হবে না। ব্রহ্মপুত্র কি সত্যি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, সেটা যাচাই করে দেখাও দরকার। তাই গঙ্গা এক অভিনব বুদ্ধি বের করলো। সে তার রূপবতী অবয়বে বৃদ্ধার সাঁজ নিলো। বৃদ্ধা গঙ্গা অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা একার এগিয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্রের দিকে। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র তার দীর্ঘ যাত্রা শেষে গঙ্গার কাছে চলে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বৃদ্ধা গঙ্গাকে চিনতেই পারলো না। চিনবেই বা কেমন করে, গঙ্গা তো তখন ছদ্মবেশী বুড়িগঙ্গা। কৌত‚হলী ব্রহ্মপুত্র বুড়িগঙ্গাকে শুধালো, ‘মা, গঙ্গা কোথায়?’ বুড়িগঙ্গা এই প্রশ্নে ক্রোধান্বিত হয়ে গেলেন। গঙ্গাকে চিনতে না পারার মাশুল দিতে হলো ব্রহ্মপুত্রকে। গঙ্গা তাকে ফিরিয়ে দিলো। ব্রহ্মপুত্র তারপর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেলো। নাম আড়াল করে গঙ্গাও মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে সাগরে হারিয়ে গেলো। একই সাগরে মিলেমিশেও কেউ আর কাউকেই চিনতে পারলো না।

'ভারত বিচিত্রা'র সৌজন্যে।

;

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;