ব্রানসউইক শহরে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ আহমুদ আরবারি (শেষ পর্ব)



মঈনুস সুলতান
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[পূর্ব প্রকাশের পর] পেছনের সিটে ধড়মড় করে জেগে ওঠেন মিসেস মেলবো। পিচ্যুত করে তিনি আইসটির ক্যানটি খুলে বিড়বিড়িয়ে বলেন, ‘হিয়ার উই আর.. এগেইন হোয়াইটম্যান মার্ডারড্ অ্যান আন-আর্মড ব্ল্যাক মেইল।’ হলেণ লো-স্পিডের লেইনের দিকে সরে যেতে যেতে অনুরোধ করে, ‘কুড ইউ টক আবাউট দিস ইস্যু এগেইন, আই মিন দ্যা কনটেক্সট্ অব দিস কিলিং, মিসেস মেলবো?’ একটু বিরক্ত হয়ে তিনি জবাব দেন, ‘সেইম ওল্ড স্টোরি অব আমেরিকান সাউথ।’ আমরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর বিররণ শুনি।

তরুণ আহমুদ আরবারি ভালোবাসত শরীরচর্চা। সে জগ করতে বেরিয়ে সাটিলা শৌরস এলাকার একটি বৃক্ষছায়াময় সরণি ধরে দৌড়াচ্ছিল। পথে একটি কন্সট্রাকশন সাইটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সে কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়া বাড়িটি খুঁটিয়ে নিরিখ করে। সিসিটিভি তাঁর উপস্থিতি রেকর্ড করে রেখেছে। না, সে কন্সট্রাকশন সাইট থেকে কিছু চুরি করেনি। আহমুদ ফের দৌড়াতে শুরু করলে তাঁকে ব্রাগলার বা ছিঁচকে চোর সন্দেহ করে শ্বেতাঙ্গ পিতাপুত্র গ্রেগরি ও ট্রেবিস ম্যাকমাইকেল হ্যান্ডগান হাতে পিকাপ ট্রাকে করে অনুসরণ করে। এক পর্যায়ে দৌড়রত আহমুদের গায়ে পিকাপের ধাক্কা লাগিয়ে তারা তাঁকে থামিয়ে ফেলে। প্রাক্তন পুলিশ অফিসার গ্রেগরি আহমুদ আরবারিকে সিটিজেন অ্যারেস্ট করতে যায়। সিটিজেন অ্যারেস্ট হচ্ছে কোথাও কোনো অপরাধ সংঘঠিত হলে, পুলিশের অপেক্ষা না করে নাগরিকদের উদ্যোগে অপরাধীকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করা। ঔপনিবেশিক জামানায় যখন জার্জিয়া অঙ্গরাজ্যে কেবলমাত্র হোয়াইটম্যানরা ছিল নাগরিক, তখন থেকে সিটিজেন অ্যারেস্ট প্রথা প্রচলিত আছে। ঐতিহাসিকভাবে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে অজস্রবার—ক্রীতদাস হওয়ার কারণে যাদের নাগরিক অধিকার ছিল না, সেসব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের গ্রেফতার করার কাজে। তো গ্রেগরি ও ট্রাবিস আহমুদ আরবারিকে গ্রেফতার করতে গেলে সে বাঁধা দেয়, দস্তাদস্তি বাঁধে। এক পর্যায়ে ট্রাবিস আরবারিকে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের চারমাস পরও স্থানীয় পুলিশ খুনি পিতা-পুত্রকে গ্রেফতার করেনি।

আরবারি পরিবারের উকিল এ নিয়ে প্রশাসনে দেনদরবার করেন। ডিসট্রিক্ট অ্যার্টোনির অফিস থেকে তাঁকে জানানো হয় যে, ম্যাকমাইকেলরা অ্যারেস্টের সময় দৈহিক প্রতিরোধের মুখে আত্মরক্ষার তাগিদে গুলি ছুড়েছেন। আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার তাদের আছে। তাই এ হত্যাকাণ্ডে লংঘিত হয়নি বিশেষ কোনো আইন। তারপর এ ঘটনার ভিডিওসহ নিউইয়র্ক টাইমস্ সংবাদটি প্রকাশ করে। শুরুয়াত হয় প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড। বর্ণবাদ-বিরোধী মানুষদের চাপে জর্জিয়ার ব্যুরো অব ইনভেশটিগেশন অতঃপর তদন্তের দায়িত্ব নেয়। ততদিনে তামাম রাজ্য জুড়ে আন্দোলনের বিস্তৃতি হয়েছে, পিতা-পুত্রও গ্রেফতার হয়েছে তীব্র প্রতিবাদের চাপে, কিন্তু এখনো আদালতের রায় বেরোয়নি। ঘটনাটি যাতে জনবিস্মৃতির আড়ালে না যায়, সে লক্ষ্যে সংঘঠিত হয়েছে আজকের ক্রুশ-কাঠ পুষ্পমণ্ডিত করার প্রতিবাদী অনুষ্ঠান।

মিসেস মেলবো হঠাৎ করে চুপ হয়ে ঘন ঘন হাই তোলেন, তাতে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে কাচের ফেসশিল্ড। ‘দিস ড্যাম থিং জাস্ট ক্লাউডেড মাই ভিশন’ বলে তিনি খুলে ফেলেন কাচের রক্ষাকবচ। চলমান সড়কের দুপাশে লোনাজলে জারিত ওয়েটল্যান্ডকে আশ্চর্য সুন্দর দেখায়। হলেণ সে দৃশ্যপট থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘আই নো ইউ লুক আপ ইন্টারন্যাট আর্লি ইন দ্যা মনিং, ডিড ইউ ফাইন্ডআউট অ্যানি থিংক আবাউট দিস ব্রানসউইক টাউন?’ আমি জবাব দিই, ‘আই ওয়াজ অ্যাকচুয়েলি লুকিং অ্যাট দি ব্যাকগ্রাউন্ড অব রেস রিলেশন ইন দিস টাউন।’ বলে আমি নোটবুক খুলে তাতে টুকে রাখা কিছু তথ্য পড়ে শোনাই। ১৯৬৪ অব্দি ব্রানসউইক শহরে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জন্য চালু ছিল সম্পূর্ণ আলাদা মুভি থিয়েটার, পার্ক ও আইসক্রিম পার্লার। এ শহরকে কোনো কোনো নিবন্ধে মোস্ট ‘সেগ্রিগেটেড পার্ট অব দি আমেরিকান সাউথ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদের সঙ্গে একই স্কুলে যাওয়ার অধিকার ছিল না কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেমেয়েদের। পৌরসভা পরিচালিত খেলার মাঠ ও জিমনেশিয়ামে চালু ছিল একই রকমের বিভাজন রীতি। ১৯৬৫ সালে বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে সিভিল রাইটস্ অ্যাক্ট অনুমোদিত হয়, তখন আইনিভাবে বর্ণভিত্তিক সেপারেশনের বিলোপ ঘটে। এ পরিবর্তনের পর উদারনৈতিক এক মেয়র নগরীতে কালো ও ধলো উভয় সম্প্রদায়ের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেন একটি বারোায়ারি সুইমিং পুল। প্রথমে শ্বেতাঙ্গরা পুলে যাওয়া বয়কট করে, তারপর রাতের অন্ধকারে তারা ট্রাকভর্তি মাটি ও আবর্জনা দিয়ে সুইমিং পুলটি ভরাট করে দেয়।

চোখের সামনে ওয়েটল্যান্ডটি ভরে ওঠে অজস্র পাখপাখালিতে। নিচু জলাভূমি থেকে যেন আসমানের দিকে রওয়ানা হয়েছে বেজায় উঁচু একটি সাসপেনশন ব্রিজ। হলেণ ড্রাইভ করতে করতে বলে, ‘আই হেইট দিস সিডনি ব্রিজ, এত উঁচু ব্রিজে ঠিকমতো রেলিং দেয়নি কেন?’ মিসেস মেলবো সিট থেকে গজ গজ করেন, ‘চার শত ছিয়াশি ফুট উঁচু এ ব্রিজের ওপর দিয়ে ড্রাইভ করতে আমার এত নার্ভাস লাগত যে.. ডু ইউ নো হোয়াই দে কল ইট সিডনি লেনিয়ার ব্রিজ, মি. লেনিয়ার ওয়াজ অ্যান একমপ্লিশড পোয়েট এন্ড মিউজিশিয়ান, তাঁর দ্যা মার্শেজ গ্লিন কবিতাটি খুবই সুন্দর, তবে একটা কথা.. মি. লেনিয়ার ক্রীতদাস মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় যুদ্ধকারী কনফেডারেট আর্মির হয়ে কাজ করেছিলেন।’ আমি তথ্যটি নোটবুকে টুকি। মিসেস মেলবো জানতে চান, ‘তুমি তো কবিতা ভালোবাসো সুলতান, তুমি চাইলে আমি মার্শেজ গ্লিন কবিতাটির কপি স্ক্যান করে পাঠাতে পারি।’ ক্রীতদাস প্রথা বহাল রাখার পক্ষে সার্ভিস দেওয়া কবির কবিতা পাঠ করার জন্য আমি তেমন একটা আগ্রহ দেখাই না। ব্রিজ অতিক্রম করে হলেণ ব্রানসউইক শহরের দিকে টার্ন নেয়।

শহরে ঢুকে পড়ে আমরা সিটি হলের পার্কিংলটে থামি। প্রতিবাদীদের এ জায়গায় জড়ো হয়ে, মিছিল করে আহমুদ আরবারি যে সরণীতে খুন হয়েছেন, ওখানে গিয়ে পুষ্পিত ক্রুশ-কাঠ স্থাপন করার কথা। সুনসান পার্কিংলটে কোনো মানুষজন দেখতে না পেয়ে আমরা অবাক হই! সিটি হলের সুদর্শন ইমারতটি ভিক্টোরীয় স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন নজির হয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ ভোরে ইন্টারন্যাটে পড়েছি, দালানটি আদিতে ছিল শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের প্রশাসনিক দফতর, ক্রীতদাস বেচাকেনার রসিদ দেওয়া হতো এখান থেকে। প্রতিবাদীদের তালাশে গাড়ি থেকে নেমে আমি ও মিসেস মেলবো হেঁটে যাই দালানটির পেছন দিকে। ওখানে ছোটখাট স্কোয়ারের মতো বাঁধানো পরিসরে জড়ো হয়েছেন জনা কয়েক মুণ্ডিত-মস্তক শ্বেতাঙ্গ। এদের হাতের প্লেকার্ডগুলোতে ঝলমল করছে কনফেডারেট ফ্ল্যাগ। কনফেডারেসি ছিল ক্রীতদাস মালিকদের স্বার্থ রক্ষাকারী অবৈধ রাষ্ট্র। তাদের নীতি-আর্দশ পত্র-পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, “..ইডিওলজি ইজ বেইসড্ আপঅন দ্যা গ্রেট ট্রুথ দ্যাট দ্যা নিগ্রো ইজ নট ইকুয়েল টু দি হোয়াইট ম্যান; দ্যাট স্লেভারি, সাবডিনেশন টু দ্যা সুপিরিওর রেস, ইজ হিজ নেচার‌্যাল এন্ড নরম্যাল কন্ডিশন।” যে সব শ্বেতাঙ্গ ‘নিগ্রো’ বা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের তাদের সমকক্ষ বিবেচনা করেনি, যারা বলপ্রয়োগে তাঁদের ক্রীতদাসের জীবনযাপনে বাধ্য করাটা স্বাভাবিক মনে করেছিল, তাদের অধঃস্থন পুরুষরা আজকাল হোয়াইট সুপ্রিমেসি নামক বর্ণবাদী নীতিমালার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করছে কনফেডারেট ফ্ল্যাগ। একটি বড়সড় ব্যানার ক্যারি করে দুজন মুণ্ডিত-মস্তক শ্বেতাঙ্গ আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, তাতে লেখা ‘ব্ল্যাক ইজ দ্যা কালার অব হেল।’ তারা পিপিই, মাস্ক ও ফেসশিল্ড পরা মিসেস মেলবোর দিকে ইশারা করে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলে, ‘হেই পেঙ্গুইন-লেডি, দিস ইজ আওয়ার টাউন, নো ফাকিং প্রোটেস্ট হিয়ার।’ দ্বন্দ্ব এড়ানোর প্রয়োজনে চোখ নামিয়ে, কোনো কথা না বলে আমরা চুপচাপ ফিরে আসি গাড়িতে। হলেণ পার্কিংলট থেকে বেরিয়ে আসে মেইন রোডে।

সিটিহল : ভিক্টোরীয় স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন নজির

বেশি দূর আগাতে পারি না আমরা। দেখি, সড়ক জুড়ে মার্চ করে আগাচ্ছে বর্ম পরা, সঙ্গীনে টিয়ার গ্যাসের শেল লাগানো কাচের ঢাল হাতে রায়ট পুলিশের ট্রুপ। গাড়ি সাইড করে হলেণ তাদের পাস দেয়। আমাদের কাছাকাছি সড়ক ছেড়ে ঘাসের ওপর সাইড করে থেমেছে আরো কয়েকটি মোটরকার। তারা রায়ট পুলিশের সমর্থনে হর্ন বাজায়। জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে কাছে সাইড করা একটি গাড়ির বাম্পার স্টিকারটি আমি পড়ি, তাতে বড় বড় হরফে লেখা লেখা, বি প্যাট্রিয়ট এন্ড সার্পোট আওয়ার হোয়াইট পুলিশ অফিসারস্।’ গেল রাতে টেলিভিশনের টকশোতে শোনা পুলিশি হত্যার একটি উপাত্ত মনে ফিরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে গেল এক বছরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এক হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশ ছিলেন তরুণ বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। টকশো হোস্ট ইউরোপের আরো দুটি দেশের সাথে তুলনা দিয়ে জানিয়েছেন, একই সময় জার্মানিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন মাত্র তিন জন ও গ্রেট ব্রিটেনে পাঁচজন মানুষ। মিসেস মেলবো সেলফোনে ব্রাউজ করে আজকের জমায়েত সংক্রান্ত তথ্য বের করেন। প্রতিবাদীরা সিটি হলের সামনেই জড়ো হয়েছিলেন, কিন্তু কয়েকজন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট সশস্ত্রভাবে ওখানে চলে আসলে, সংঘর্ষ এড়াতে তারা সিটি হল ত্যাগ করে চলে গেছেন লাভারর্স ঔকের দিকে। জমায়েতের আয়োজকরা প্রতিবাদীদের সম্পূর্ণরূপে অহিংস থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।

আমরা গড়ি ঘুরিয়ে রওয়ানা হই লাভারর্স ঔকের দিকে। পথে দেখি দুটি বাড়ির বিশাল আঙিনায় স্ট্যান্ডে আটকানো পেল্লায় সাইজের প্লেকার্ড, তাতে লেখা, ‘ইউজিং মাস্ক ইজ আন আমেরিকান, ইট সার্পোটস্ চায়নিজ ইকোনমি,’ ও ‘করোনাভাইরাস ইজ অভার, লেটস্ রিস্টার্ট আওয়ার ইকোনমি।’ প্লেকার্ড দুটিতে যথারীতি সাঁটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আলোকচিত্র। লাভাস্ ঔকে পৌঁছার সরণীর মুখে পড়ে লো-ইনকাম হাউজিং এর রঙচটা একটি বিল্ডিং। তার ফেনসিংয়ে আটকানো ব্যানারে লাভ সাইনের পাশে আহমুদের সঙ্গে লেখা শ্বেতাঙ্গ পুলিশের গুলিতে সম্প্রতি নিহত ব্রিয়ানা ও জর্জ ফ্লয়েডের নাম, তার তলায় টানা হাতে ‘ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার’ স্লোগানটি।

পরস্পরের সাথে সংযুক্ত যুগল বৃক্ষ লাভার্স ঔক

লাভার্স ঔকের কাছে এসে আমাদের ফের অবাক হওয়ার পালা! না, ঔকগাছের থানটিতে প্রতিবাদী মানুষজন দূরে থাক, কোনো পোক-পরিন্দাও আমরা দেখতে পাই না। বিভ্রান্ত হয়ে আমরা গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি, শত বছরের পুরানো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত যুগল বৃক্ষের দিকে। গেল বার আমরা যখন ব্রানসউইকে আসি, তখন লাভার্স ঔকের এ গাছতলা ছিল প্রেমিক যুগলে নন্দিত, বৃক্ষের গোঁড়ায় হেলান দিয়ে বসে যুবক-যুবতীরা চুমো খাচ্ছিল, কোনো কোনো দম্পতি আধশোয়া হয়ে স্পর্শ করছিল পরস্পরের শরীর। আমরা সিদ্ধান্ত নিই সাটিলা শৌরস—যে সরণীতে নিহত হয়েছেন আহমুদ আরবারি ওখানে যাওয়ার।

হলেণ আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে ড্রাইভ করে। শহরটি দাবার ছকের মতো কালো ও ধলো মানুষের ঘরবাড়িতে বিভক্ত। শেতাঙ্গরা বাস করছে দেড়-দুই একরের প্লটে, আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে নির্মিত ভিলা টাইপের—ঘোড়ার গাড়ি রাখার ক্যারেজ হাউসসহ কাঠে তৈরি দোতালা দালানে। স্প্রিংক্লার থেকে উৎসারিত ঝিরিঝিরি জলধারা সয়ংক্রিয়ভাবে ভিজিয়ে স্নিগ্ধ করে তুলছে তাদের অঙিনা। কোনো কোনো বাড়ির সুইমিংপুলে টমমল করছে নীলাভ জল। ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে গল্ফকার্ট ও ঝকঝকে কোয়াডবাইক। পাশেই কালো মানুষদের টিনে তৈরি ট্রেইলার কেবিন। উঠানের রোপলাইনে শুকাচ্ছে কাপড়চোপড়। বজরা গোছের রঙচটা রিকন্ডিশনড্ গাড়িগুলোর বাম্পার স্টিকারে লেখা, ‘বিয়িং ব্ল্যাক ইজ নট অ্যা থ্রেট’ কিংবা ‘হ্যান্ডস্ আপ, ডোন্ট শুট।’ কোনো কোনো অপরিসর আঙিনায় ট্র্যাশবিন উপচে পড়ছে আবর্জনা। আমরা চলে আসি আরেকটি লো-ইনকাম হাউজিং কমপ্লেক্সের কাছাকাছি। ট্র্যাশবিনের কাছে দাঁড়িয়ে মাস্ক পরা তিনটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। প্রতিক্রিয়ায় হলেণ হর্নে সমর্থন-সূচক আওয়াজ তোলে।

মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে মাস্ক পরা তিনটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু

আমরা চলে আসি বৃক্ষশোভিত সাটিলা শৌরস সরণীতে। যে জায়গায় শ্বেতাঙ্গ পিতাপুত্রের হাতে খুন হয়েছিলেন আহমুদ আরবারি, ওখানে প্রতিবাদীরা একটি পুষ্পিত ক্রুশ-কাঠ স্থাপন করেছেন বটে, কিন্তু তাদের কাউকে কোথাও দেখতে পাই না। মোবাইল ঘেঁটে মিসেস মেলবো ফের তথ্য বের করেন। প্রতিবাদীরা পুষ্পিত ক্রুশ পুঁতে দিয়ে মিছিল করে চলে গেছেন শহরের সিগনেচার স্কোয়ারের দিকে। ওদিকে আগ বাড়ার আগে মিসেস মেলবো দুই মিনিটের জন্য আহমুদ আরবারির বসতবাড়িতে থেমে শ্রদ্ধা জানাতে চান। তিনি প্লাস্টিকের কৌটায় করে নিয়ে এসেছেন গামবো নামে এক ধরেনর খাবার। পশ্চিম আফ্রিকার সংস্কৃতিতে—প্রয়াত মানুষের পরিবারের প্রতি সহমর্মীতার নিদর্শনস্বরূপ তার বসতবাড়িতে রান্না করা খাবার নীরবে রেখে আসার চল আছে। বিষয়টি ইন্টারন্যাট থেকে জানতে পেরে মিসেস মেলবো বেশ রাত অব্দি খেটেখুঁটে গামবো তৈরি করেছেন। হলেণও পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজ হাতে তৈরি করেছে একখানা চিত্রিত কার্ড। তো আমরা আরো মিনিট কয়েক ড্রাইভ করে চলে আসি আরবারির বাড়িতে।

বাড়িটি সাদামাটা। আঙিনায় সহানুভূতিশীল মানুষজন রেখে গেছেন কিছু ফুল ও বেলুন। হলেণ ওখানে হাতে লেখা কার্ডটি রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আমি মিসেস মেলবোর সঙ্গে কয়েক কদম হেঁটে বাড়িটির দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়াই। এ বাড়িতে মায়ের সাথে বসবাস করত, আমার মেয়ের সমবয়সী পচিশ বছরের আহমুদ আরবারি। বাড়িতে কেউ নেই। কিছু মানুষ দোরগোড়ায় একটি বাস্কেটে চকোলেট, কুকি ও কোকাকোলার ক্যান প্রভৃতি রেখে গেছেন। মিসেস মেলবো ওখানে তাঁর খাবারের কৌটাটি রেখে ফিরে আসেন গাড়িতে। যেতে যেতে ভাবি আরবারির মা কি স্কোয়ারে গিয়ে যোগ দিয়েছেন প্রতিবাদীদের জমায়েতে?

আরো কয়েকটি ব্লক পাড়ি দিয়ে অবশেষ আমরা এসে পৌঁছি সিগনেচার স্কোয়ারে। ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত ইংলিশ গার্ডেনটির ফোয়ারা চত্বরে কোনো মানুষজন নেই। তবে পামগাছগুলোর তলায় ঘাসে শুয়ে সূর্যস্নান করছে দুটি শ্বেতকায় তরুণী। পাশেই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে পিকনিকে মেতেছে আরেকটি হোয়াইট পরিবার, চড়ানো হয়েছে বার্বিকিউ, পরিবারের কর্তা-গিন্নি দুজনের হাতে ওয়াইন গ্লাস। স্কোয়ারের পার্কটি আকারে বিশাল। ঘাসপাতা মাড়িয়ে আমরা চলে আসি স্কোয়ারের এক প্রান্তে—গাছপালায় নিবিড় কৃত্রিম উদ্যানে। এখানে প্রতিবাদীদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষজন এদিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। ভিড়ভাট্টা তেমন হয়নি। এদের অনেকেই মাস্ক পরে এসেছেন, তাতে স্বস্তিবোধ করে দূরত্ব রেখে আমরাও প্লেকার্ড হাতে দাঁড়াই। স্কোয়ারের পেছন দিকে পুরো সরণী ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে রায়ট পুলিশের জোয়ানরা। একজন কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাক্টিভিস্ট মেগাফোন হাতে কথা বলেন, তাঁর বক্তব্য হচ্ছে—এ আন্দোলন তাবৎ শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, প্রতিবাদীরা শুধু মুষ্টিমেয় হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের বর্ণবাদী আচরণের নিন্দা জানাচ্ছে। তিনি জমায়েতে আংশগ্রহণকারীদের যে কোনো উস্কানির মুখে ভায়োলেন্ট কিছু করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। অ্যাক্টিভিস্ট কথা শেষ করতে পারেন না। পুলিশের কয়েকজন অফিসার এগিয়ে এসে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন, এটা পার্ক, এখানে মানুষজন নিরিবিলিতে রিল্যাক্স করতে আসে, এখানে সাউন্ড পলিউশন সৃষ্টি করা যাবে না। জোরে আওয়াজ করতে হলে পার্ক অথরিটির পারমিশন নিতে হবে। তারা মেগাফোন ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন। অ্যাক্টিভিস্ট মেগাফোন মাটিতে রেখে চেঁচিয়ে কিছু বলেন। দূরত্বের জন্য আমরা কী বলছেন—কিছু শুনতে পাই না।

সিগনেচার স্কোয়ারের জনহীন ফোয়ারা

বেশ কিছুক্ষণ প্রায়-নীরব জমায়েতে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। অতঃপর সচেতন হয়ে উঠি যে, সন্ধ্যা গাঢ় হওয়ার আগে আমাদের ফিরতে হবে সাভানা শহরে, কারণ দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার জন্য অন্ধকারে ড্রাইভ করা হলেণের জন্য মুশকিল। গাড়িতে ফেরার পথে দেখি রাজপথে পা দিয়ে বাইসাইকেল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছেন একজন শ্বেতাঙ্গ প্রতিবাদী। ক্যারিয়ারের সাথে আটকানো তাঁর প্লেকার্ডে লেখা ‘হোয়াইট পিপুল, দিস ইজ আওয়ার ফাইট টু।’

হাইওয়েতে ওঠার মুখে খিদা তীব্রভাবে জানান দেয়। কিছু মুখে না দিয়ে এতটা পথ ড্রাইভ করা কঠিন। হলেণ ওয়াটারফ্রন্ট পার্কে গাড়ি থামায়। বেশ কয়েকটি সিসাইড রেস্টুরেন্টে বেচাকেনা চলছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গ্রিল করা চিংড়ি ও ফেঞ্চফ্রাইয়ের মুখরোচক গন্ধ। একটি রেস্তোরাঁর আউটডোর সিটিংয়ে আমারা বসতে যাই, কিন্তু মেনু হাতে ওয়েটার এসে বলেন, ‘স্যারি, উই ডু নট এলাও কাস্টমারস্ ওয়ারিং মাস্কস্ ইন দিস সিটিং এরিয়া।’ তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে হলেণ ফিস এন্ড চিপসের অর্ডার করে। খাবার না হয় গড়িতে বসে গিলে ফেলা যাবে। নোনা বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। চিংড়িমাছ ধরার ছোট ছোট নৌকায় বিকালের সমুদ্রটি চিত্রপট হয়ে উঠেছে। চোখের কোণ দিয়ে দেখি, বোটর‌্যাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে জটলা করছে চারটি শ্বেতাঙ্গ মুণ্ডিত-মস্তক তরুণ। এদের সকলের কোমরে গোঁজা হ্যান্ডগান। আগ্নেয়াস্ত্র জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে আইনিভাবে বহন করা যায়। তবে ছেলেগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে কী একটা বলাবলি করছে। আমি হলেণের কব্জি স্পর্শ করে নীরবে তাকে সতর্ক করি। বিষয়টা মিসেস মেলবোও নজর করেছেন, তিনি ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘লেটস্ ট্রাই টু অ্যাভোয়েড দ্যা ট্রাবোল।’ ওয়েটার ফিরে এসে হলেণের হাতে তুলে দেয় রিসিটসহ ক্রেডিটকার্ড। সে তা অ্যালকোহল-রাব দিয়ে মুছে পার্সে পুরে।

আধ-উদলা গতরের পেশিতে রঙচঙে উল্কি করা একটি সশস্ত্র যুবক এসে আমার দিকে তর্জনী তুলে জানতে চায়, ‘ম্যাম, ইজ দিস ম্যান ট্র্যাভেলিং উইথ ইউ?’ পেশাদারী ভঙ্গিতে সে জবাব দেয়, ‘ইয়েস, উই আর রিলেটেড?’ চোখমুখ লাল করে যুবকটি যেন তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণে আনছে, সে চিবিয়ে চিবিয়ে ফের বলে, ‘ম্যাম, ইউ আর ডিসগ্রেইসিং আওয়ার কালচার।’ জবাবে হলেণ নিরুত্তর থাকে, ছেলেটি ফের ‘প্লিজ থিং আবাউট দিস,’ বলে হেঁটে ফিরে যায়। আমরা চোখেচোখে বার্তা বিনিময় করি। ট্রাবোলে জড়ানোর কোনো আগ্রহ আমাদের নেই, ভয়োলেন্স এভোয়েড করাই আমাদের স্ট্র্যাটেজি। তাই চুপচাপ কোনো দিকে না তাকিয়ে ফিরি পার্কিংলটে। হলেণ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ব্যাক করে। দেখি, ওয়েটার খাবারের টেকআউট প্যাকেট তিনটি নিয়ে ছুটে আসছেন। আমি জানালা নামাই, আমার হাতে প্যাকেটগুলো তুলে দিতে দিতে তিনি বলেন, ‘স্যারি আবাউট দ্যা ট্রাবোল।’ কোনো কথা না বলে হলেণ একসেলেটারে পা দেয়।

আমরা চুপচাপ ফিস এন্ড চিপস্ চিবাই। স্পিড তুলে হলেণ হাইওয়ে হিট করে। বেলা পড়ে আসছে, বিকালের মায়াবী আলোয় সিডনি ব্রিজকে পর্যটনী ভিউকার্ডের চিত্রটির মতো দেখায়। আমি আহমুদ আরবারির কথা ভাবি, পঁচিশ বছরের সদর্শন যুবকটি ছিল আমাদের কন্যা কাজরির সমবয়স্ক। হাইস্কুলের স্টার ফুটবলার সে, ভালোবাসত ব্যায়াম ও জগ করা। তাঁর ক্লাসমেটরা স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্টিং দিয়ে জানাচ্ছে, আরবারি ছিল অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, সতীর্থ ছেলেমেয়েদের দিনযাপনে কোনো সংকট উপস্থিত হলে টেলিফোন করত, কোনো দ্বন্দ্ব-বিবাদ বাঁধলে নিজে উদ্যোগ নিয়ে চেষ্টা করত তা নিরসনের। চারিত্রিক এ বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে আমাদের মেয়ে কাজরির আচার আচরণের মিল আছে প্রভূত। গাত্রবর্ণে সেও শ্যাম বর্ণের, যা কালোর কাছাকাছি। শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের আগ্রাসনের মুখে সে নিরাপদ কি?

পেছনের সিট থেকে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস মেলেবো অস্থিরতা ছড়ান। অতঃপর ফেসশিল্ড এডজাস্ট করতে করতে ম্রিয়মান স্বরে অনুরোধ করেন, ‘ইফ ইউ গাইজ ডোন্ট মাইন্ড, কুড ইউ টার্ন অন দ্যা টেইপ?’ আমরা সুফি-দরবেশ নিয়াজ আর মিসরির ক্যাসেটটি ফের বাজাই। উদ্ধৃত চরণ দুটি গাড়ির বাতাবরণে তৈরি করে মোহ ছাড়ানো আবেশ—

শিরিন ই মি ভারমাসা
হার কানিবিম হল ওলডু

সাথে সাথে ভাবতর্জমাটিও ফিরে আসে স্মৃতিতে:

পৌঁছতে চাই প্রেমাষ্পদের মঞ্জিলে
যে দিকে তাকাই তৈরি হয় পথরেখা
আশা জাগে মনে হয় পাব তাঁর দেখা
চরাচর ভরে ওঠে সঠিক সড়কের মিছিলে..

আমি প্রেমাষ্পদ শব্দটির মানবিক ব্যঞ্জনা নিয়ে তর্পণ করি। একটি কৌতূহল আমার করোটিতে ঘুরপাক করে, আন্দাজ করি, আহমুদ আরবারি হয়তো কোনো সতীর্থ মেয়ের সঙ্গে ডেট করত, তাঁর খুন হওয়াতে তাঁর গার্লফ্রেন্ড নিঃসঙ্গ হয়েছে নিশ্চয়ই, সে কি ব্রানসউইক শহরের এ বিঁধুর বিকালে শোকে বিষণ্ণ হয়ে আছে?

গল্প 'ব্রহ্মপুত্রের ঘাট': মাহফুজ পারভেজ



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

খুব দূরেও নয়, আবার কাছেও বলা যাবে না। যাত্রাপথ সাকুল্যে পয়তাল্লিশ মিনিটের। কোনও বিভ্রাট হলে প্লাস-মাইনাস পাঁচ থেকে দশ মিনিট। যাত্রার সময়ের মতো পথের রেখাও ঝকঝকে, স্পষ্ট। কিশোরগঞ্জ থেকে নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে ডানে গৌরীপুর, নেত্রকোনা, ফুলপুর, হালুয়াঘাট রেখে শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট। ট্রেনে এলেও মোটামুটি একই সময় লাগে আর অভিন্ন জনপদগুলো পেরিয়ে আসতে হয়। পূর্ব ময়মনসিংহের এই চিরায়ত ভূগোলে সড়ক আর রেলপথ বলতে গেছে সমান্তরালে চলেছে। 

শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুরের ঘাটের চিত্রটিও আদি আর অকৃত্রিম গুদারা ঘাটের বর্ধিত সংস্করণ মাত্র। পারস্যের বহু ফারসি শব্দের মতো গুদারা শব্দটিও দিব্যি টিকে আছে বাংলা অভিধানে। ঘাটে গিজগিজ করছে পূর্ব ও উত্তর ময়মনসিংহের বাসগুলো। গুদারা নৌকায় অপর পাড়ে ময়মনসিংহ শহর। সেখানেও অনেকগুলো ঘাট: থানা ঘাট, এসকে হাসপাতাল ঘাট, পাটগুদাম ঘাট। যার যেদিকে কাজ, সেদিকের গুদারা নৌকায় যাচ্ছে। নদীর অবিরাম স্রোতের মতো নৌকা ও মানুষের ছুটে চলা যেন চলছেই অনাদিকাল থেকে। মূক ব্রহ্মপুত্র যার সাক্ষী।   

কনক বাস থেকে নেমে নদী ও ওপারের ল্যান্ডস্কেপে আবছা শহরের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয়। প্রলম্বিত গ্রীষ্মের তেজি ভাব নেই নদী তীরের জলমগ্ন পরিবেশে। বাতাসে হাল্কা সুখের পরশ ভাদুরে গুমোট গরমকে  কিছুটা পরাজিত করেছে। নদী যে কতটা স্বস্তি ও আরামের, তীরে এলে টের পাওয়া যায়।

কনকের ভাগ্যে প্রাকৃতিক মোলায়েম পরশ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আসা-যাওয়ার বাসগুলোর মধ্যে ঢুকছে আরও নানা রকমের যানবাহন, যাত্রী ও পথচারী। থেমে থেমে শুরু হয়েছে যন্ত্রদানবের পৈশাচিক হর্নের মর্মন্তুদ উল্লাস। কালো ধূম্রকুণ্ডলী পাগলা মোঘের মতো খোলা আকাশ ও মুক্ত বাতাসকে হনন করছে। ঘাটের কুখ্যাত যানজট, শব্দ ও বায়ু দূষণ, বিশৃঙ্খলার উৎপাত থেকে কিছুটা দূরে সরে কনক একটা অস্থায়ী গোছের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে।

একমুখ হাসিতে মাঝবয়েসী দোকানি আমন্ত্রণের গলায় বলল, ‘চা আর একটু হাওয়া খেয়ে নৌকায় উঠে পড়ুন। এখনও রোদ কড়া হয় নি, আরামে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছে যেতে পারবেন।’

দোকানির কথায় কনক সৌজন্যে মাথা ঝাঁকিয়ে একই সঙ্গে সম্মতি ও চায়ের অর্ডার দেয়।

ঘাটের এদিকে বিশেষ ভিড় নেই। জন কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, হর্ন ও ভিড়ের প্রকোপ অপেক্ষাকৃত কম। অদূরে ধনুকের মতো উত্তর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে যেতে। চোখে পড়লো, নদীতে ব্রিজের কাজ চলছে। পিলার বসছে মাঝ বরাবর।

কনক ব্রিজের চলমান কাজকর্মের দিকে অনেকক্ষণ স্থির চোখ আকিয়ে আছে দেখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে দোকানি কথা বলে, ‘ব্রিজ হলে তো ঘাট থাকবে না। গুদারা, মাঝি, আমাদের মতো দোকানদারদের বিপদ হবে।’

কথাগুলো ঠিক কনককে উদ্দেশ্য করে বলা হয় নি। স্বগতোক্তির মতো উচ্চারিত। কনক চুপ করে শোনে। কোনও উত্তর দেয় না। চা শেষ করে ঘড়ি দেখে কনক। প্রায়-আধ ঘণ্টা হয়ে গেছে এখনও জ্যোতি আসে নি। অথচ আজকে জ্যোতির আসাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইচ্ছে করলেই সে নৌকা ধরে ময়মনসিংহ শহরে চলে যেতে পারে। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটবে না। তাদের মধ্যে ঠিক করা আছে, এক সপ্তাহে কনক ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে শহরে আসবে। পরের সপ্তাহে জ্যোতি আসবে নদী পেরিয়ে শম্ভুগঞ্জে। মফস্বল শহরের ছোট্ট পরিসরে সবাই মুখচেনা লোক। নিয়মিত এক জায়গায় দেখা-সাক্ষাত হলে লোকমুখে সেটি ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।

একবার শহরের জনবহুল গাঙিনার পাড়ে কনক ও জ্যোতিকে একসঙ্গে দেখে পাড়ার এক বড় ভাই কটমটে চোখে তাকিয়ে ছিল। ভাগ্য ভালো থাকায় জেরা-জিজ্ঞাসাবাদের আগেই তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে হারিয়ে যায়। আরেক বার রেল স্টেশেনের কাছে তাজমহল রেস্টুরেন্টে চা খেতে গিয়ে প্রায় হাতেনাতে ধরাই পড়ে গিয়েছিল কলেজের মহেশ স্যারের কাছে। সেবারও ভাগ্যের জোরে সটকে পড়েছিল দুজনে। তারপর থেকে পরিকল্পনা বদলে ফেলে তারা। এক সপ্তাহে কনক শহরে গিয়ে দেখা করে। দেখার জায়গাও তারা বদল করে নিয়মিত। কখনও ছায়াবাণী, পূবরী বা অলকা সিনেমা হলের সামনে। কখনও সার্কিট হাউসের আশোপাশে। কখনও নদীর তীর-ঘেঁষা পার্ক ও রাস্তায় সন্তর্পণে কিছুটা সময় কাটায় তারা।

জ্যোতি শহরের বাইরে এলে শম্ভুগঞ্জের আশেপাশে নদীর তীর ধরে নির্বিঘ্নে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় দুজনে।

এই সপ্তাহে হিসাব মতো জ্যোতি আসবে শম্ভুগঞ্জে। সে রকমই কথা হয়ে আছে। জ্যোতি জরুরি কিছু কথা বলার বিষয়েও আগাম জানিয়ে রেখেছে  । কনকেরও বলার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা জমে আছে। শুধু কথা নয়, দুজনের ভাগ্যও পাশের ব্রহ্মপুত্রের মতো বাঁক বদল করতে চলেছে। কনক পড়তে চলে যাবে পাহাড় ও সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্যোতি চান্স পেয়েছে উত্তরের মতিহার ক্যাম্পাসের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রকে সাক্ষী রেখে তাদের আসা-যাওয়া আর মেলামেশাও ইতি ঘটতে চলেছে। তাদের হৃদয়ে মিলনের আকুতি সুতীব্র হলেও দুজনের জীবনগতির সামনেই অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চিত টান। এই সপ্তাহে দুজনের দেখা হওয়া তাই খুবই জরুরি। এ কথা কনক যেমন জানে, জ্যোতিও জানে।

কনক যথারীতি উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু জ্যোতিকে না দেখে সে চিন্তিত এবং কিছুটা বিস্মিত ও শঙ্কিত। জ্যোতি তো কথার হেরফের করার মেয়ে নয়। তাহলে কেন এই বিলম্ব? মাথায় এই আস্ত প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে কনক চা দোকানের বেঞ্চিতে অপেক্ষায় থাকে।

কোন ফাঁকে অপেক্ষার মাঝ দিয়ে কয়েক কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে, কনক টের পায় না। টের পেলো যখন প্রতীক্ষার টেনশনে ও কয়েক কাপ চায়ের দ্রব্য গুণে পেটে অম্বলের চাপ তৈরি হলো, তখন। প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে তবু জ্যোতি আসে নি। আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না। কনক আলতো পায়ে মন খারাপ করে নদীর দিকে পা বাড়ায়। ওপার থেকে আসা নৌকাগুলোর দিকে চোখ রেখে রেখে সে তীরে পায়চারি করতে থাকে।

কনক দেখে কত রঙ-বেরঙের মানুষ নৌকায় ব্রহ্মপুত্রের এপার-ওপার করছে। বিচিত্র তাদের বয়স, পেশা, ব্যক্তিত্ব। ছাত্র, ব্যবসায়ী, অসুস্থ, বৃদ্ধ, কুলি, কামলা, হকার রোগি, নারী, পুরুষের অভাবনীয় এক জগৎ তৈরি হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের ঘাট ঘিরে। এখানেই একদিন জ্যোতির সঙ্গে কনকেরও দেখা হয়ে গিয়েছিল। এক অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে কনক নেমেছিল শম্ভুগঞ্জের ঘাটে। গুদারা নৌকায় চেপে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে অস্থির ও ব্যাকুল কনককে দেখছিল সহযাত্রীরা। কনক আগে ময়মনসিংহ শহরে আসে নি। সে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিচ্ছে জীবনে প্রথম বারের মতো। তা-ও একা এবং একজন সঙ্কটাপন্ন মানুষকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে সে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। পাশের কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চেয়ে বিশেষ লাভ হয় নি তার।

অকস্ম্যাৎ উদ্বিগ্ন কনক অবাক হয় একটি তরুণীর কণ্ঠস্বরে, ‘চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেবো।’

‘আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমাকে পথঘাট বলে দিলেই আমি পারবো।’

`আমার কষ্ট হবে না। আমি ওদিকেই থাকি।’

মাঝ নদীতে কনক যে মেয়েটির কথায় আশার দ্বীপ খুঁজে পায়, তার নাম জ্যোতি। জ্যোতির কারণে নতুন শহরে আগন্তুকের মতো একেলা ও অসহায় কনক স্বচ্ছন্দ্যে সব কাজ করতে পারে। রোগি ভর্তি থেকে চিকিৎসার যাবতীয় কাজে না বললেও জ্যোতি পাশে থাকে। রুটিন করে দিনে দুইবার হাসপাতালে চলে আসে জ্যোতি। বারণ করলে   বলে, ‘ঐ যে আমাদের বাসা দেখা যায়। দুই মিনিটের পথ। বার বার এলেও আমার কোনও অসুবিধা হবে না।’

হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেওয়ার দিন জ্যোতি সারাক্ষণ পাশে থাকে। শহরের প্রান্তস্পর্শী ব্রহ্মপুত্রের ঘাট পর্যন্ত সঙ্গে আসে। নৌকায় বসে কনক দেখে পাড়ে তখনও দাঁড়িয়ে জ্যোতি। হঠাৎ নিজের ভেতরে অকস্ম্যাৎ পরিচিতি মেয়েটির জন্য অজানা-অচেনা কেমন একটা টান অনুভব করে কনক। মনে হয় ব্রহ্মপুত্রের  সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে সে একটি স্বল্প পরিচিত তরুণী সঙ্গে যৌথ সাঁতারে। নৌকা ছাড়ার আগে কনক হঠাৎ চিৎকার করে বলে, ‘শুক্রবার আমি আবার আসবো তোমার কাছে।’ হাল্কা মাথা নাড়িয়ে সলাজ মুখ লুকায় তীরে দাঁড়ানো জ্যোতি।

সেই শুরু। তারপর দেখতে দেখতে দুই বছর হয়ে গেছে। বিশেষ কারণ ছাড়া কোনও সপ্তাহেই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ বাদ যায় নি। আজকে জ্যোতির দেখা না পেয়ে পুরনো কথাগুলো মনে হয় তার। জ্যোতির দেখা না-পেয়ে কনকের মনে হলো, উত্তরের গারো পাহাড় কাছে চলে এসে বেদনার প্রচণ্ড ভারে তাকে চেপে ধরেছে।

কনক ঠিক বুঝতে পারে না, কেন জ্যোতি আসে নি? এমন তো কখনও হয় নি। বিশেষ করে, এবারের দেখাটা অনেক জরুরি। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তাদের মধ্যে হওয়া দরকার।

কনক দেখে দুপুরের সূর্য মাথার উপর গনগন করছে। ব্রহ্মপুত্রের জলজ বুকে রুদ্রদিনের দাবদাহে বাষ্পের আবছা ছায়া দৃষ্টিতে বিভ্রম ছড়াচ্ছে। সে নিজেও কম বিভ্রান্ত নয়। তার বুকেও চলছে আগুনের হল্কা। কনক স্থির করতে পারে না, তার কি চলে যাওয়া উচিত? নাকি ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে যাওয়া দরকার জ্যোতির কাছে?

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে নৌকা ধরে শহরে চলে আসে কনক। বেশ খিদেও পেয়েছে তার। তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে সে চলে আসে সেহরা, আকুয়া পেরিয়ে জ্যোতির বাসার কাছাকাছি। জ্যোতির বাসা চিনলেও কোনও দিন সেখানে তার যাওয়া হয় নি। একবার শুধু বড় রাস্তা থেকে জ্যোতি দেখিয়েছিল তাদের হলুদ বাড়িটি। আন্দাজে খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক সময় কাটিয়ে বিকেলের মুখে কনক জ্যোতিদের বাড়ির ঠিক সামনে পৌঁছে যায়। পুরো আবাসিক এলাকায় সারিবদ্ধ বাড়িগুলো দেখতে পায় সে। কোন দোকান-পাট নেই যে দাঁড়িয়ে দেখবে বা কিছু খোঁজ-খবর করবে। জ্যোতির বাসার পাশে তার চোখে পড়ে গেটের ভেতরে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়ানো। লোকজনও চলাচল করছে। অন্য বাড়িগুলোর মতো নিশ্চুপ ঝিমুচ্ছে না জ্যোতিদের বাসা। বাসার আরেক পাশে একটি ল্যাম্পপোস্টের তলায় তিনটি ছেলে জটলা করছে। কনক ধীর পায়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। সে স্পষ্ট শুনতে পায় তাদের কথোকথন, ‘খুব ভালো বিয়ে হয়েছে জ্যোতির। যদিও কাজটা হয়েছে ওর অসম্মতিতে জোর-জবরদস্তি করে।’

চট করে এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়ায় কনক। পেছন ফিরে ছেলেগুলোর মাথার উপর দিয়ে তীর্যক দেখতে পায় জ্যোতিদের বাড়িটি যেন নিমেষে কারাগার হয়ে গেছে। সামনের দিকে ফিরে পা বাড়ানোর আগে কনক শুনতে পায় ছেলেগুলোর মধ্যে কেউ একজনের গলা, ‘জ্যোতিকে আর দেখতে পাবো না। কালই বরের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে সে।’

যন্ত্রের মতো কখন যে কনক প্রাচীন ময়মনসিংহ শহরের অলি-গলি পেরিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে চলে আসে, বুঝতেও পারে না। বোধশক্তিহীন মানুষ এখন সে। অভ্যাসের বশে সে চিনতে পারে ঘাট, গুদারা, নৌকা, ব্রহ্মপুত্র, জ্যোতির মুখের স্মৃতি। চিনলেও সে যেন কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেকে তার মনে হয় খুবই একা ও অচেনা এবং পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষের মতো সঙ্গীহীন। নদীর তীর থেকে কেউ একজন তাকে ধরে নৌকায় বসিয়ে

দেয়। চরাচর জুড়ে প্রদোষের আবির রঙা বেদনায় কনক ব্রহ্মপুত্রে জলে তাকিয়ে চমকে উঠে। কনক দেখে, ব্রহ্মপুত্র নিজের চেহারা লুকিয়ে জলের কল্লোলে তার নিজের চেহারাই বিম্বিত করেছে। নদীর দিকে তাকিয়ে কনক বুঝতে পারে, তার আর জ্যোতির জীবন প্রবাহ যেন আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

পুরনো নদীর বুকে জন্ম নেওয়া একেকটি বালুচর পেরিয়ে কনকের নৌকা শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ফিরে আসার সময় তার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এইসব বালুচরের ওপর শুয়ে স্বপ্ন দেখা তরুণ-তরুণীর কথা ব্রহ্মপুত্র মনে রাখবে? তাদের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যাগুলো মনে রাখবে শম্ভুগঞ্জের ঘাট?

কোনও এক অনিন্দ্য ভোরে হঠাৎ শম্ভুগঞ্জের ঘাটে ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসে একদিন কনক জেনে নেবে এইসব প্রশ্নের উত্তর।

পাদটীকা: ব্রহ্মপুত্র নদ প্রেমে পড়েছে। সে প্রেমে পড়েছে সুন্দরী নদী গঙ্গার। গঙ্গার রূপের গল্প শুনে সে অস্থির হয়ে পড়েছে। যে করেই হোক, গঙ্গাকে তার চাই। ব্রহ্মপুত্র সিদ্ধান্ত নিলো সে গঙ্গাকে বিয়ে করবে। যে-ই ভাবা সে-ই কাজ। গঙ্গাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রবাহিত হতে থাকলো সে। ওদিকে গঙ্গাও ব্রহ্মপুত্রকে পছন্দ করেছে। কিন্তু পছন্দ করলেই তো হবে না। ব্রহ্মপুত্র কি সত্যি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, সেটা যাচাই করে দেখাও দরকার। তাই গঙ্গা এক অভিনব বুদ্ধি বের করলো। সে তার রূপবতী অবয়বে বৃদ্ধার সাঁজ নিলো। বৃদ্ধা গঙ্গা অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা একার এগিয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্রের দিকে। ওদিকে ব্রহ্মপুত্র তার দীর্ঘ যাত্রা শেষে গঙ্গার কাছে চলে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বৃদ্ধা গঙ্গাকে চিনতেই পারলো না। চিনবেই বা কেমন করে, গঙ্গা তো তখন ছদ্মবেশী বুড়িগঙ্গা। কৌত‚হলী ব্রহ্মপুত্র বুড়িগঙ্গাকে শুধালো, ‘মা, গঙ্গা কোথায়?’ বুড়িগঙ্গা এই প্রশ্নে ক্রোধান্বিত হয়ে গেলেন। গঙ্গাকে চিনতে না পারার মাশুল দিতে হলো ব্রহ্মপুত্রকে। গঙ্গা তাকে ফিরিয়ে দিলো। ব্রহ্মপুত্র তারপর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেলো। নাম আড়াল করে গঙ্গাও মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে সাগরে হারিয়ে গেলো। একই সাগরে মিলেমিশেও কেউ আর কাউকেই চিনতে পারলো না।

'ভারত বিচিত্রা'র সৌজন্যে।

;

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;