ব্রানসউইক শহরে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ আহমুদ আরবারি (শেষ পর্ব)



মঈনুস সুলতান
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[পূর্ব প্রকাশের পর] পেছনের সিটে ধড়মড় করে জেগে ওঠেন মিসেস মেলবো। পিচ্যুত করে তিনি আইসটির ক্যানটি খুলে বিড়বিড়িয়ে বলেন, ‘হিয়ার উই আর.. এগেইন হোয়াইটম্যান মার্ডারড্ অ্যান আন-আর্মড ব্ল্যাক মেইল।’ হলেণ লো-স্পিডের লেইনের দিকে সরে যেতে যেতে অনুরোধ করে, ‘কুড ইউ টক আবাউট দিস ইস্যু এগেইন, আই মিন দ্যা কনটেক্সট্ অব দিস কিলিং, মিসেস মেলবো?’ একটু বিরক্ত হয়ে তিনি জবাব দেন, ‘সেইম ওল্ড স্টোরি অব আমেরিকান সাউথ।’ আমরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর বিররণ শুনি।

তরুণ আহমুদ আরবারি ভালোবাসত শরীরচর্চা। সে জগ করতে বেরিয়ে সাটিলা শৌরস এলাকার একটি বৃক্ষছায়াময় সরণি ধরে দৌড়াচ্ছিল। পথে একটি কন্সট্রাকশন সাইটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সে কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়া বাড়িটি খুঁটিয়ে নিরিখ করে। সিসিটিভি তাঁর উপস্থিতি রেকর্ড করে রেখেছে। না, সে কন্সট্রাকশন সাইট থেকে কিছু চুরি করেনি। আহমুদ ফের দৌড়াতে শুরু করলে তাঁকে ব্রাগলার বা ছিঁচকে চোর সন্দেহ করে শ্বেতাঙ্গ পিতাপুত্র গ্রেগরি ও ট্রেবিস ম্যাকমাইকেল হ্যান্ডগান হাতে পিকাপ ট্রাকে করে অনুসরণ করে। এক পর্যায়ে দৌড়রত আহমুদের গায়ে পিকাপের ধাক্কা লাগিয়ে তারা তাঁকে থামিয়ে ফেলে। প্রাক্তন পুলিশ অফিসার গ্রেগরি আহমুদ আরবারিকে সিটিজেন অ্যারেস্ট করতে যায়। সিটিজেন অ্যারেস্ট হচ্ছে কোথাও কোনো অপরাধ সংঘঠিত হলে, পুলিশের অপেক্ষা না করে নাগরিকদের উদ্যোগে অপরাধীকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করা। ঔপনিবেশিক জামানায় যখন জার্জিয়া অঙ্গরাজ্যে কেবলমাত্র হোয়াইটম্যানরা ছিল নাগরিক, তখন থেকে সিটিজেন অ্যারেস্ট প্রথা প্রচলিত আছে। ঐতিহাসিকভাবে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে অজস্রবার—ক্রীতদাস হওয়ার কারণে যাদের নাগরিক অধিকার ছিল না, সেসব কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের গ্রেফতার করার কাজে। তো গ্রেগরি ও ট্রাবিস আহমুদ আরবারিকে গ্রেফতার করতে গেলে সে বাঁধা দেয়, দস্তাদস্তি বাঁধে। এক পর্যায়ে ট্রাবিস আরবারিকে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের চারমাস পরও স্থানীয় পুলিশ খুনি পিতা-পুত্রকে গ্রেফতার করেনি।

আরবারি পরিবারের উকিল এ নিয়ে প্রশাসনে দেনদরবার করেন। ডিসট্রিক্ট অ্যার্টোনির অফিস থেকে তাঁকে জানানো হয় যে, ম্যাকমাইকেলরা অ্যারেস্টের সময় দৈহিক প্রতিরোধের মুখে আত্মরক্ষার তাগিদে গুলি ছুড়েছেন। আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার তাদের আছে। তাই এ হত্যাকাণ্ডে লংঘিত হয়নি বিশেষ কোনো আইন। তারপর এ ঘটনার ভিডিওসহ নিউইয়র্ক টাইমস্ সংবাদটি প্রকাশ করে। শুরুয়াত হয় প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড। বর্ণবাদ-বিরোধী মানুষদের চাপে জর্জিয়ার ব্যুরো অব ইনভেশটিগেশন অতঃপর তদন্তের দায়িত্ব নেয়। ততদিনে তামাম রাজ্য জুড়ে আন্দোলনের বিস্তৃতি হয়েছে, পিতা-পুত্রও গ্রেফতার হয়েছে তীব্র প্রতিবাদের চাপে, কিন্তু এখনো আদালতের রায় বেরোয়নি। ঘটনাটি যাতে জনবিস্মৃতির আড়ালে না যায়, সে লক্ষ্যে সংঘঠিত হয়েছে আজকের ক্রুশ-কাঠ পুষ্পমণ্ডিত করার প্রতিবাদী অনুষ্ঠান।

মিসেস মেলবো হঠাৎ করে চুপ হয়ে ঘন ঘন হাই তোলেন, তাতে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে কাচের ফেসশিল্ড। ‘দিস ড্যাম থিং জাস্ট ক্লাউডেড মাই ভিশন’ বলে তিনি খুলে ফেলেন কাচের রক্ষাকবচ। চলমান সড়কের দুপাশে লোনাজলে জারিত ওয়েটল্যান্ডকে আশ্চর্য সুন্দর দেখায়। হলেণ সে দৃশ্যপট থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘আই নো ইউ লুক আপ ইন্টারন্যাট আর্লি ইন দ্যা মনিং, ডিড ইউ ফাইন্ডআউট অ্যানি থিংক আবাউট দিস ব্রানসউইক টাউন?’ আমি জবাব দিই, ‘আই ওয়াজ অ্যাকচুয়েলি লুকিং অ্যাট দি ব্যাকগ্রাউন্ড অব রেস রিলেশন ইন দিস টাউন।’ বলে আমি নোটবুক খুলে তাতে টুকে রাখা কিছু তথ্য পড়ে শোনাই। ১৯৬৪ অব্দি ব্রানসউইক শহরে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জন্য চালু ছিল সম্পূর্ণ আলাদা মুভি থিয়েটার, পার্ক ও আইসক্রিম পার্লার। এ শহরকে কোনো কোনো নিবন্ধে মোস্ট ‘সেগ্রিগেটেড পার্ট অব দি আমেরিকান সাউথ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদের সঙ্গে একই স্কুলে যাওয়ার অধিকার ছিল না কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেমেয়েদের। পৌরসভা পরিচালিত খেলার মাঠ ও জিমনেশিয়ামে চালু ছিল একই রকমের বিভাজন রীতি। ১৯৬৫ সালে বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে সিভিল রাইটস্ অ্যাক্ট অনুমোদিত হয়, তখন আইনিভাবে বর্ণভিত্তিক সেপারেশনের বিলোপ ঘটে। এ পরিবর্তনের পর উদারনৈতিক এক মেয়র নগরীতে কালো ও ধলো উভয় সম্প্রদায়ের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেন একটি বারোায়ারি সুইমিং পুল। প্রথমে শ্বেতাঙ্গরা পুলে যাওয়া বয়কট করে, তারপর রাতের অন্ধকারে তারা ট্রাকভর্তি মাটি ও আবর্জনা দিয়ে সুইমিং পুলটি ভরাট করে দেয়।

চোখের সামনে ওয়েটল্যান্ডটি ভরে ওঠে অজস্র পাখপাখালিতে। নিচু জলাভূমি থেকে যেন আসমানের দিকে রওয়ানা হয়েছে বেজায় উঁচু একটি সাসপেনশন ব্রিজ। হলেণ ড্রাইভ করতে করতে বলে, ‘আই হেইট দিস সিডনি ব্রিজ, এত উঁচু ব্রিজে ঠিকমতো রেলিং দেয়নি কেন?’ মিসেস মেলবো সিট থেকে গজ গজ করেন, ‘চার শত ছিয়াশি ফুট উঁচু এ ব্রিজের ওপর দিয়ে ড্রাইভ করতে আমার এত নার্ভাস লাগত যে.. ডু ইউ নো হোয়াই দে কল ইট সিডনি লেনিয়ার ব্রিজ, মি. লেনিয়ার ওয়াজ অ্যান একমপ্লিশড পোয়েট এন্ড মিউজিশিয়ান, তাঁর দ্যা মার্শেজ গ্লিন কবিতাটি খুবই সুন্দর, তবে একটা কথা.. মি. লেনিয়ার ক্রীতদাস মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় যুদ্ধকারী কনফেডারেট আর্মির হয়ে কাজ করেছিলেন।’ আমি তথ্যটি নোটবুকে টুকি। মিসেস মেলবো জানতে চান, ‘তুমি তো কবিতা ভালোবাসো সুলতান, তুমি চাইলে আমি মার্শেজ গ্লিন কবিতাটির কপি স্ক্যান করে পাঠাতে পারি।’ ক্রীতদাস প্রথা বহাল রাখার পক্ষে সার্ভিস দেওয়া কবির কবিতা পাঠ করার জন্য আমি তেমন একটা আগ্রহ দেখাই না। ব্রিজ অতিক্রম করে হলেণ ব্রানসউইক শহরের দিকে টার্ন নেয়।

শহরে ঢুকে পড়ে আমরা সিটি হলের পার্কিংলটে থামি। প্রতিবাদীদের এ জায়গায় জড়ো হয়ে, মিছিল করে আহমুদ আরবারি যে সরণীতে খুন হয়েছেন, ওখানে গিয়ে পুষ্পিত ক্রুশ-কাঠ স্থাপন করার কথা। সুনসান পার্কিংলটে কোনো মানুষজন দেখতে না পেয়ে আমরা অবাক হই! সিটি হলের সুদর্শন ইমারতটি ভিক্টোরীয় স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন নজির হয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ ভোরে ইন্টারন্যাটে পড়েছি, দালানটি আদিতে ছিল শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের প্রশাসনিক দফতর, ক্রীতদাস বেচাকেনার রসিদ দেওয়া হতো এখান থেকে। প্রতিবাদীদের তালাশে গাড়ি থেকে নেমে আমি ও মিসেস মেলবো হেঁটে যাই দালানটির পেছন দিকে। ওখানে ছোটখাট স্কোয়ারের মতো বাঁধানো পরিসরে জড়ো হয়েছেন জনা কয়েক মুণ্ডিত-মস্তক শ্বেতাঙ্গ। এদের হাতের প্লেকার্ডগুলোতে ঝলমল করছে কনফেডারেট ফ্ল্যাগ। কনফেডারেসি ছিল ক্রীতদাস মালিকদের স্বার্থ রক্ষাকারী অবৈধ রাষ্ট্র। তাদের নীতি-আর্দশ পত্র-পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, “..ইডিওলজি ইজ বেইসড্ আপঅন দ্যা গ্রেট ট্রুথ দ্যাট দ্যা নিগ্রো ইজ নট ইকুয়েল টু দি হোয়াইট ম্যান; দ্যাট স্লেভারি, সাবডিনেশন টু দ্যা সুপিরিওর রেস, ইজ হিজ নেচার‌্যাল এন্ড নরম্যাল কন্ডিশন।” যে সব শ্বেতাঙ্গ ‘নিগ্রো’ বা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের তাদের সমকক্ষ বিবেচনা করেনি, যারা বলপ্রয়োগে তাঁদের ক্রীতদাসের জীবনযাপনে বাধ্য করাটা স্বাভাবিক মনে করেছিল, তাদের অধঃস্থন পুরুষরা আজকাল হোয়াইট সুপ্রিমেসি নামক বর্ণবাদী নীতিমালার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করছে কনফেডারেট ফ্ল্যাগ। একটি বড়সড় ব্যানার ক্যারি করে দুজন মুণ্ডিত-মস্তক শ্বেতাঙ্গ আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, তাতে লেখা ‘ব্ল্যাক ইজ দ্যা কালার অব হেল।’ তারা পিপিই, মাস্ক ও ফেসশিল্ড পরা মিসেস মেলবোর দিকে ইশারা করে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলে, ‘হেই পেঙ্গুইন-লেডি, দিস ইজ আওয়ার টাউন, নো ফাকিং প্রোটেস্ট হিয়ার।’ দ্বন্দ্ব এড়ানোর প্রয়োজনে চোখ নামিয়ে, কোনো কথা না বলে আমরা চুপচাপ ফিরে আসি গাড়িতে। হলেণ পার্কিংলট থেকে বেরিয়ে আসে মেইন রোডে।

সিটিহল : ভিক্টোরীয় স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন নজির

বেশি দূর আগাতে পারি না আমরা। দেখি, সড়ক জুড়ে মার্চ করে আগাচ্ছে বর্ম পরা, সঙ্গীনে টিয়ার গ্যাসের শেল লাগানো কাচের ঢাল হাতে রায়ট পুলিশের ট্রুপ। গাড়ি সাইড করে হলেণ তাদের পাস দেয়। আমাদের কাছাকাছি সড়ক ছেড়ে ঘাসের ওপর সাইড করে থেমেছে আরো কয়েকটি মোটরকার। তারা রায়ট পুলিশের সমর্থনে হর্ন বাজায়। জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে কাছে সাইড করা একটি গাড়ির বাম্পার স্টিকারটি আমি পড়ি, তাতে বড় বড় হরফে লেখা লেখা, বি প্যাট্রিয়ট এন্ড সার্পোট আওয়ার হোয়াইট পুলিশ অফিসারস্।’ গেল রাতে টেলিভিশনের টকশোতে শোনা পুলিশি হত্যার একটি উপাত্ত মনে ফিরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে গেল এক বছরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এক হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশ ছিলেন তরুণ বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। টকশো হোস্ট ইউরোপের আরো দুটি দেশের সাথে তুলনা দিয়ে জানিয়েছেন, একই সময় জার্মানিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন মাত্র তিন জন ও গ্রেট ব্রিটেনে পাঁচজন মানুষ। মিসেস মেলবো সেলফোনে ব্রাউজ করে আজকের জমায়েত সংক্রান্ত তথ্য বের করেন। প্রতিবাদীরা সিটি হলের সামনেই জড়ো হয়েছিলেন, কিন্তু কয়েকজন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট সশস্ত্রভাবে ওখানে চলে আসলে, সংঘর্ষ এড়াতে তারা সিটি হল ত্যাগ করে চলে গেছেন লাভারর্স ঔকের দিকে। জমায়েতের আয়োজকরা প্রতিবাদীদের সম্পূর্ণরূপে অহিংস থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।

আমরা গড়ি ঘুরিয়ে রওয়ানা হই লাভারর্স ঔকের দিকে। পথে দেখি দুটি বাড়ির বিশাল আঙিনায় স্ট্যান্ডে আটকানো পেল্লায় সাইজের প্লেকার্ড, তাতে লেখা, ‘ইউজিং মাস্ক ইজ আন আমেরিকান, ইট সার্পোটস্ চায়নিজ ইকোনমি,’ ও ‘করোনাভাইরাস ইজ অভার, লেটস্ রিস্টার্ট আওয়ার ইকোনমি।’ প্লেকার্ড দুটিতে যথারীতি সাঁটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আলোকচিত্র। লাভাস্ ঔকে পৌঁছার সরণীর মুখে পড়ে লো-ইনকাম হাউজিং এর রঙচটা একটি বিল্ডিং। তার ফেনসিংয়ে আটকানো ব্যানারে লাভ সাইনের পাশে আহমুদের সঙ্গে লেখা শ্বেতাঙ্গ পুলিশের গুলিতে সম্প্রতি নিহত ব্রিয়ানা ও জর্জ ফ্লয়েডের নাম, তার তলায় টানা হাতে ‘ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার’ স্লোগানটি।

পরস্পরের সাথে সংযুক্ত যুগল বৃক্ষ লাভার্স ঔক

লাভার্স ঔকের কাছে এসে আমাদের ফের অবাক হওয়ার পালা! না, ঔকগাছের থানটিতে প্রতিবাদী মানুষজন দূরে থাক, কোনো পোক-পরিন্দাও আমরা দেখতে পাই না। বিভ্রান্ত হয়ে আমরা গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি, শত বছরের পুরানো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত যুগল বৃক্ষের দিকে। গেল বার আমরা যখন ব্রানসউইকে আসি, তখন লাভার্স ঔকের এ গাছতলা ছিল প্রেমিক যুগলে নন্দিত, বৃক্ষের গোঁড়ায় হেলান দিয়ে বসে যুবক-যুবতীরা চুমো খাচ্ছিল, কোনো কোনো দম্পতি আধশোয়া হয়ে স্পর্শ করছিল পরস্পরের শরীর। আমরা সিদ্ধান্ত নিই সাটিলা শৌরস—যে সরণীতে নিহত হয়েছেন আহমুদ আরবারি ওখানে যাওয়ার।

হলেণ আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে ড্রাইভ করে। শহরটি দাবার ছকের মতো কালো ও ধলো মানুষের ঘরবাড়িতে বিভক্ত। শেতাঙ্গরা বাস করছে দেড়-দুই একরের প্লটে, আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে নির্মিত ভিলা টাইপের—ঘোড়ার গাড়ি রাখার ক্যারেজ হাউসসহ কাঠে তৈরি দোতালা দালানে। স্প্রিংক্লার থেকে উৎসারিত ঝিরিঝিরি জলধারা সয়ংক্রিয়ভাবে ভিজিয়ে স্নিগ্ধ করে তুলছে তাদের অঙিনা। কোনো কোনো বাড়ির সুইমিংপুলে টমমল করছে নীলাভ জল। ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে গল্ফকার্ট ও ঝকঝকে কোয়াডবাইক। পাশেই কালো মানুষদের টিনে তৈরি ট্রেইলার কেবিন। উঠানের রোপলাইনে শুকাচ্ছে কাপড়চোপড়। বজরা গোছের রঙচটা রিকন্ডিশনড্ গাড়িগুলোর বাম্পার স্টিকারে লেখা, ‘বিয়িং ব্ল্যাক ইজ নট অ্যা থ্রেট’ কিংবা ‘হ্যান্ডস্ আপ, ডোন্ট শুট।’ কোনো কোনো অপরিসর আঙিনায় ট্র্যাশবিন উপচে পড়ছে আবর্জনা। আমরা চলে আসি আরেকটি লো-ইনকাম হাউজিং কমপ্লেক্সের কাছাকাছি। ট্র্যাশবিনের কাছে দাঁড়িয়ে মাস্ক পরা তিনটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। প্রতিক্রিয়ায় হলেণ হর্নে সমর্থন-সূচক আওয়াজ তোলে।

মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে মাস্ক পরা তিনটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু

আমরা চলে আসি বৃক্ষশোভিত সাটিলা শৌরস সরণীতে। যে জায়গায় শ্বেতাঙ্গ পিতাপুত্রের হাতে খুন হয়েছিলেন আহমুদ আরবারি, ওখানে প্রতিবাদীরা একটি পুষ্পিত ক্রুশ-কাঠ স্থাপন করেছেন বটে, কিন্তু তাদের কাউকে কোথাও দেখতে পাই না। মোবাইল ঘেঁটে মিসেস মেলবো ফের তথ্য বের করেন। প্রতিবাদীরা পুষ্পিত ক্রুশ পুঁতে দিয়ে মিছিল করে চলে গেছেন শহরের সিগনেচার স্কোয়ারের দিকে। ওদিকে আগ বাড়ার আগে মিসেস মেলবো দুই মিনিটের জন্য আহমুদ আরবারির বসতবাড়িতে থেমে শ্রদ্ধা জানাতে চান। তিনি প্লাস্টিকের কৌটায় করে নিয়ে এসেছেন গামবো নামে এক ধরেনর খাবার। পশ্চিম আফ্রিকার সংস্কৃতিতে—প্রয়াত মানুষের পরিবারের প্রতি সহমর্মীতার নিদর্শনস্বরূপ তার বসতবাড়িতে রান্না করা খাবার নীরবে রেখে আসার চল আছে। বিষয়টি ইন্টারন্যাট থেকে জানতে পেরে মিসেস মেলবো বেশ রাত অব্দি খেটেখুঁটে গামবো তৈরি করেছেন। হলেণও পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজ হাতে তৈরি করেছে একখানা চিত্রিত কার্ড। তো আমরা আরো মিনিট কয়েক ড্রাইভ করে চলে আসি আরবারির বাড়িতে।

বাড়িটি সাদামাটা। আঙিনায় সহানুভূতিশীল মানুষজন রেখে গেছেন কিছু ফুল ও বেলুন। হলেণ ওখানে হাতে লেখা কার্ডটি রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আমি মিসেস মেলবোর সঙ্গে কয়েক কদম হেঁটে বাড়িটির দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়াই। এ বাড়িতে মায়ের সাথে বসবাস করত, আমার মেয়ের সমবয়সী পচিশ বছরের আহমুদ আরবারি। বাড়িতে কেউ নেই। কিছু মানুষ দোরগোড়ায় একটি বাস্কেটে চকোলেট, কুকি ও কোকাকোলার ক্যান প্রভৃতি রেখে গেছেন। মিসেস মেলবো ওখানে তাঁর খাবারের কৌটাটি রেখে ফিরে আসেন গাড়িতে। যেতে যেতে ভাবি আরবারির মা কি স্কোয়ারে গিয়ে যোগ দিয়েছেন প্রতিবাদীদের জমায়েতে?

আরো কয়েকটি ব্লক পাড়ি দিয়ে অবশেষ আমরা এসে পৌঁছি সিগনেচার স্কোয়ারে। ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত ইংলিশ গার্ডেনটির ফোয়ারা চত্বরে কোনো মানুষজন নেই। তবে পামগাছগুলোর তলায় ঘাসে শুয়ে সূর্যস্নান করছে দুটি শ্বেতকায় তরুণী। পাশেই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে পিকনিকে মেতেছে আরেকটি হোয়াইট পরিবার, চড়ানো হয়েছে বার্বিকিউ, পরিবারের কর্তা-গিন্নি দুজনের হাতে ওয়াইন গ্লাস। স্কোয়ারের পার্কটি আকারে বিশাল। ঘাসপাতা মাড়িয়ে আমরা চলে আসি স্কোয়ারের এক প্রান্তে—গাছপালায় নিবিড় কৃত্রিম উদ্যানে। এখানে প্রতিবাদীদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষজন এদিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। ভিড়ভাট্টা তেমন হয়নি। এদের অনেকেই মাস্ক পরে এসেছেন, তাতে স্বস্তিবোধ করে দূরত্ব রেখে আমরাও প্লেকার্ড হাতে দাঁড়াই। স্কোয়ারের পেছন দিকে পুরো সরণী ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে রায়ট পুলিশের জোয়ানরা। একজন কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাক্টিভিস্ট মেগাফোন হাতে কথা বলেন, তাঁর বক্তব্য হচ্ছে—এ আন্দোলন তাবৎ শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, প্রতিবাদীরা শুধু মুষ্টিমেয় হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের বর্ণবাদী আচরণের নিন্দা জানাচ্ছে। তিনি জমায়েতে আংশগ্রহণকারীদের যে কোনো উস্কানির মুখে ভায়োলেন্ট কিছু করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। অ্যাক্টিভিস্ট কথা শেষ করতে পারেন না। পুলিশের কয়েকজন অফিসার এগিয়ে এসে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন, এটা পার্ক, এখানে মানুষজন নিরিবিলিতে রিল্যাক্স করতে আসে, এখানে সাউন্ড পলিউশন সৃষ্টি করা যাবে না। জোরে আওয়াজ করতে হলে পার্ক অথরিটির পারমিশন নিতে হবে। তারা মেগাফোন ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন। অ্যাক্টিভিস্ট মেগাফোন মাটিতে রেখে চেঁচিয়ে কিছু বলেন। দূরত্বের জন্য আমরা কী বলছেন—কিছু শুনতে পাই না।

সিগনেচার স্কোয়ারের জনহীন ফোয়ারা

বেশ কিছুক্ষণ প্রায়-নীরব জমায়েতে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। অতঃপর সচেতন হয়ে উঠি যে, সন্ধ্যা গাঢ় হওয়ার আগে আমাদের ফিরতে হবে সাভানা শহরে, কারণ দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার জন্য অন্ধকারে ড্রাইভ করা হলেণের জন্য মুশকিল। গাড়িতে ফেরার পথে দেখি রাজপথে পা দিয়ে বাইসাইকেল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছেন একজন শ্বেতাঙ্গ প্রতিবাদী। ক্যারিয়ারের সাথে আটকানো তাঁর প্লেকার্ডে লেখা ‘হোয়াইট পিপুল, দিস ইজ আওয়ার ফাইট টু।’

হাইওয়েতে ওঠার মুখে খিদা তীব্রভাবে জানান দেয়। কিছু মুখে না দিয়ে এতটা পথ ড্রাইভ করা কঠিন। হলেণ ওয়াটারফ্রন্ট পার্কে গাড়ি থামায়। বেশ কয়েকটি সিসাইড রেস্টুরেন্টে বেচাকেনা চলছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গ্রিল করা চিংড়ি ও ফেঞ্চফ্রাইয়ের মুখরোচক গন্ধ। একটি রেস্তোরাঁর আউটডোর সিটিংয়ে আমারা বসতে যাই, কিন্তু মেনু হাতে ওয়েটার এসে বলেন, ‘স্যারি, উই ডু নট এলাও কাস্টমারস্ ওয়ারিং মাস্কস্ ইন দিস সিটিং এরিয়া।’ তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে হলেণ ফিস এন্ড চিপসের অর্ডার করে। খাবার না হয় গড়িতে বসে গিলে ফেলা যাবে। নোনা বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। চিংড়িমাছ ধরার ছোট ছোট নৌকায় বিকালের সমুদ্রটি চিত্রপট হয়ে উঠেছে। চোখের কোণ দিয়ে দেখি, বোটর‌্যাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে জটলা করছে চারটি শ্বেতাঙ্গ মুণ্ডিত-মস্তক তরুণ। এদের সকলের কোমরে গোঁজা হ্যান্ডগান। আগ্নেয়াস্ত্র জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে আইনিভাবে বহন করা যায়। তবে ছেলেগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে কী একটা বলাবলি করছে। আমি হলেণের কব্জি স্পর্শ করে নীরবে তাকে সতর্ক করি। বিষয়টা মিসেস মেলবোও নজর করেছেন, তিনি ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘লেটস্ ট্রাই টু অ্যাভোয়েড দ্যা ট্রাবোল।’ ওয়েটার ফিরে এসে হলেণের হাতে তুলে দেয় রিসিটসহ ক্রেডিটকার্ড। সে তা অ্যালকোহল-রাব দিয়ে মুছে পার্সে পুরে।

আধ-উদলা গতরের পেশিতে রঙচঙে উল্কি করা একটি সশস্ত্র যুবক এসে আমার দিকে তর্জনী তুলে জানতে চায়, ‘ম্যাম, ইজ দিস ম্যান ট্র্যাভেলিং উইথ ইউ?’ পেশাদারী ভঙ্গিতে সে জবাব দেয়, ‘ইয়েস, উই আর রিলেটেড?’ চোখমুখ লাল করে যুবকটি যেন তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণে আনছে, সে চিবিয়ে চিবিয়ে ফের বলে, ‘ম্যাম, ইউ আর ডিসগ্রেইসিং আওয়ার কালচার।’ জবাবে হলেণ নিরুত্তর থাকে, ছেলেটি ফের ‘প্লিজ থিং আবাউট দিস,’ বলে হেঁটে ফিরে যায়। আমরা চোখেচোখে বার্তা বিনিময় করি। ট্রাবোলে জড়ানোর কোনো আগ্রহ আমাদের নেই, ভয়োলেন্স এভোয়েড করাই আমাদের স্ট্র্যাটেজি। তাই চুপচাপ কোনো দিকে না তাকিয়ে ফিরি পার্কিংলটে। হলেণ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ব্যাক করে। দেখি, ওয়েটার খাবারের টেকআউট প্যাকেট তিনটি নিয়ে ছুটে আসছেন। আমি জানালা নামাই, আমার হাতে প্যাকেটগুলো তুলে দিতে দিতে তিনি বলেন, ‘স্যারি আবাউট দ্যা ট্রাবোল।’ কোনো কথা না বলে হলেণ একসেলেটারে পা দেয়।

আমরা চুপচাপ ফিস এন্ড চিপস্ চিবাই। স্পিড তুলে হলেণ হাইওয়ে হিট করে। বেলা পড়ে আসছে, বিকালের মায়াবী আলোয় সিডনি ব্রিজকে পর্যটনী ভিউকার্ডের চিত্রটির মতো দেখায়। আমি আহমুদ আরবারির কথা ভাবি, পঁচিশ বছরের সদর্শন যুবকটি ছিল আমাদের কন্যা কাজরির সমবয়স্ক। হাইস্কুলের স্টার ফুটবলার সে, ভালোবাসত ব্যায়াম ও জগ করা। তাঁর ক্লাসমেটরা স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্টিং দিয়ে জানাচ্ছে, আরবারি ছিল অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, সতীর্থ ছেলেমেয়েদের দিনযাপনে কোনো সংকট উপস্থিত হলে টেলিফোন করত, কোনো দ্বন্দ্ব-বিবাদ বাঁধলে নিজে উদ্যোগ নিয়ে চেষ্টা করত তা নিরসনের। চারিত্রিক এ বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে আমাদের মেয়ে কাজরির আচার আচরণের মিল আছে প্রভূত। গাত্রবর্ণে সেও শ্যাম বর্ণের, যা কালোর কাছাকাছি। শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের আগ্রাসনের মুখে সে নিরাপদ কি?

পেছনের সিট থেকে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস মেলেবো অস্থিরতা ছড়ান। অতঃপর ফেসশিল্ড এডজাস্ট করতে করতে ম্রিয়মান স্বরে অনুরোধ করেন, ‘ইফ ইউ গাইজ ডোন্ট মাইন্ড, কুড ইউ টার্ন অন দ্যা টেইপ?’ আমরা সুফি-দরবেশ নিয়াজ আর মিসরির ক্যাসেটটি ফের বাজাই। উদ্ধৃত চরণ দুটি গাড়ির বাতাবরণে তৈরি করে মোহ ছাড়ানো আবেশ—

শিরিন ই মি ভারমাসা
হার কানিবিম হল ওলডু

সাথে সাথে ভাবতর্জমাটিও ফিরে আসে স্মৃতিতে:

পৌঁছতে চাই প্রেমাষ্পদের মঞ্জিলে
যে দিকে তাকাই তৈরি হয় পথরেখা
আশা জাগে মনে হয় পাব তাঁর দেখা
চরাচর ভরে ওঠে সঠিক সড়কের মিছিলে..

আমি প্রেমাষ্পদ শব্দটির মানবিক ব্যঞ্জনা নিয়ে তর্পণ করি। একটি কৌতূহল আমার করোটিতে ঘুরপাক করে, আন্দাজ করি, আহমুদ আরবারি হয়তো কোনো সতীর্থ মেয়ের সঙ্গে ডেট করত, তাঁর খুন হওয়াতে তাঁর গার্লফ্রেন্ড নিঃসঙ্গ হয়েছে নিশ্চয়ই, সে কি ব্রানসউইক শহরের এ বিঁধুর বিকালে শোকে বিষণ্ণ হয়ে আছে?

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;