দুইটা ফিঙে



তানভীর মোহাম্মদ
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

আকাশে বড় লেজ দুইটা পিচ্চি পিচ্চি পাখি উড়তেছে। মনে হইতেছে ওরা দুইজন পরস্পর দুষ্টুমি করতে করতে—উড়ার নানান তাল ভাঙতে ভাঙতে, হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাইতেছে বাতাসে। ডানা ঝাঁপটায়ে একে অপরকে ঢাইকা ফেলতে চাইতেছে। তারপর ফুড়ুৎ করে একটু নিচে নাইমা গিয়া শাঁই কইরা উড়াল দিতেছে অনেক উপরে। ওদের এইটুকু মাথার ঠিক এইটুকুই প্রকাশ। আমি দেখতে পাই না তাদের ইঙ্গিত। যেন পৃথিবীর সব প্রেম সব কামনা ছোট্ট ছোট্ট দুইটা চোখে একাকার হইয়া মোলায়েম পালকগুলাতে ছড়ায়ে পড়তেছে।

আশপাশ দেখতে দেখতে হঠাৎই চোখ পড়ল দূরের আরেকটা ছাদে। একটা বড়সড় চিলও আমার সাথে দেখতেছে এই দৃশ্য। পরপর আরো দুইটা চিল আইসা বসল। আমি ওদের মনোযোগের কোথাও নাই। বড় বড় চিলগুলাকে দেইখা হিচককের দ্য বার্ডস-এর কথা মনে পড়ল আমার। ওইখানেও চিলেরা এমন নিঃস্পৃহ ভাব নিয়া এদিক ওদিক বইসা থাকে। প্রথমে একটা দুইটা, তারপর কয়েকটা, তারপর অগণিত। আর তার পরই বিপর্যয়। পাখিরা হঠাৎ মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করে। ভয়ানক সেই দুর্যোগ। সিনেমা দেখতে দেখতে আমাদের সাজানো গোছানো প্রিয় সবকিছুর কথা মনে পরে তখন। কাছের মানুষদের বুকের কাছে টের পাই। দুর্যোগে তাদের কষ্ট হবার ভয় জাপটায়ে ধরে। অন্যদের যেন কেউ নাই। কিচ্ছু নাই। বাঁচতে বাঁচতে কতকিছুর সাথেই তো রাইখা যাইতেছি কতরকম দুর্ব্যবহারের ছাপ। কে যে কখন আসতে পারবে তার অনেক অনেক পুরানো পাওনা বুইঝা নিতে, সেইটার সময় নিশ্চয়ই আমরা ঠিক করব না। নাকি করব তাও?

আমার সকাল সকাল এইরকম ছাদে আইসা নানান ভাবনার অভ্যাস কোনো কিছুর ওপরই নির্ভর করতেছে না আজকাল। আমি ঘুমাইলাম কি না ঘুমাইলাম ব্যপারই না যেন। এমন দুর্বার দুর্জয় কামনা আমি কী কইরা হেলাফেলা করি। সূর্য ওঠে-ওঠে-ওঠে আর আমার কপালে ঘুমের পর্দা নামতে থাকে। কতদিন স্বপ্নের মতন ভাবলাম ‘সারাটি রাত ঘুমিয়ে তবে’ ভোরে এইখানে আইসা দাঁড়াব। কফি খাব। তারপর হালকা নাশতা সাইড়া গভীরতর চিন্তাভাবনা করতে করতে লেইখা যাব আবার ঘুম না আসা পর্যন্ত। কিন্তু আমার রাত আমার বাতাস আমার সিনেমা আর গুটিকয় মশাকেন্দ্রিক ব্যস্ততা সারতে সারতে আবারও সেই সকাল। এমন সকাল।

অন্যান্য সময় ভোর হইতে থাকলে চারদিকে নির্মাণ শ্রমিকদের জাইগা ওঠার শব্দ পাই। একজন একজন কইরা হাজিরা দিতে থাকে। আর বিভিন্ন রকম টুংটাং ঠাশটুশ চলতেই থাকে। ফলে সকাল মানে যে কেবলি সকাল তারও কোনো সুযোগ থাকে না। অদ্ভুত ব্যক্তিস্বাধীনতার কবলে পইড়া হাঁসফাঁস করতে থাকি ঘুম ঘুম চোখে। জমিদাররা সব একসাথে বাড়ি বানাইলেই মনে হয় পৃথিবীটা কত শান্তির হইতো। অনুগত মনুষ্যের এই সময়ে আমাদের কেন এত শব্দ পোহাইতে হয়?

ঘনবসতির শহরে বড় হইতে হইতে, শব্দের কী এক অদ্ভুত অভ্যস্ততায় আমাদের জীবন স্বাভাবিক হইতে বাধ্য হইল। চক্রাকারে লাখ লাখ মানুষের আবর্তিত হওয়ার শব্দ ঘুরপাক খায়। অগণিত প্রাণ চারপাশকে অত্যধিক জীবন্ত কইরা তুলতে তুলতে, একইসাথে মৃত্যুর দিকেও ঠেইলা দিতে থাকে যেন। যানবাহনের ধোঁয়া আর হর্নের প্রাচুর্যে আমাদের বোধ প্রতিনিয়ত মাটির সাথে মিশে যেতে থাকে। পিষে যেতে থাকে। এরই মধ্যে আমাদের শিল্প, আমাদের সাহিত্য, আমাদের প্রেম-দাম্পত্য সব অ্যাবসার্ড হইতে হইতে ঝাপসা হইয়া যায়। খুব দ্রুত চশমা লাগে। এমনই নিরুপায় বাঁইচা থাকায় যখন ঘুম ভাঙে, দেখি, বেলা উইঠা গিয়া আবার পড়তেও শুরু করছে। আর ওইদিকে আন্ডার কনস্ট্রাকশন থেকা শ্রমের কেমন যেন ক্লান্তি ভাইসা আসতেছে ম্রিয়মাণ শব্দে ভর কইরা।

সেই লেজ বড় পাখিরা গিয়া একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের প্রথম ছাদে বসছে দেখলাম। একটু দূর দূর ভাব। আমাদের দেইখা সোশ্যাল ডিসটেন্সিং খেলা খেলতেছে মনে হয়। অবশ্য বাইরে থেকা দেখা দূরত্বের এই সত্য ওদের সত্যের থেকে কতটা পৃথক তারও আঁচ পাইতেছি কিছুটা। এই যে জুটিটা দূরত্ব বজায়ে রাইখা বইসা আছে আর একটু একটু কইরা দুইজনই আগাইতেছে-সরতেছে, তাতেই বোঝা যায় দৃশ্যমান দূরত্ব এইখানে অনেক ফেলনা ব্যাপার। তার চেয়ে বরং অনেক বেশি কাছাকাছি ওরা নিজেদেরকে পাইতেছে। হয়তো হার্টবিটও শুনতে পাইতেছে পরস্পর। হঠাৎ হঠাৎ ডানা ঝাপটাইতেছে না উইড়াই, আবার ঠিকঠাক তা ছাঁচে না বসায় হালকা নাড়াচাড়া দিয়া ঠিক কইরা নিতেছে। একজন আগায়ে আসলে অপরজনও মৃদু লাফে সইরা যাইতেছে দূরে। যেহেতু তাদের যখন যেখানে খুশি উইড়া যাইতে কোনোই মানা নাই, সেজন্যই হয়তো এক দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হবারও কিছু নাই। প্রচুর মাথা নাড়তেছে দুইজনই। মিথ্যা পলায়নরত পাখিটা টাশ কইরা দেখলাম দুইতলার ছাদে চইলা গেল। তারপর ক্ষণকাল। এবং পরেরটাও পিছু নিল মাথা নাড়তে নাড়তে।

যেই ছাদে ওরা দুইজন লুকোচুরি খেলতেছে, সেইটা আটতলা দেহের বিশাল এক বিল্ডিং। সারি সারি পিলার ছাদগুলাকে মাথায় তুইলা রাখছে। এর প্রতিটা নির্মাণে আমার শ্রবণেন্দ্রীয় পুরাপুরি বাধ্য হইয়াই অংশ গ্রহণ কইরা আসছে শুরু থেকা। ফলে ইচ্ছার অভাবের কারণে হবু ভবনটা দেখলেই ঘুমভাঙা দাবির কথা মনে পড়ে। কিন্তু এক সন্ধ্যার ঘটনায় তা ক্ষীণ হইয়া আসাতে, আমি যেমন মারাত্মক মর্মাহত হইলাম। একইসাথে জমিদারদের ওপর থাকা হররেকরকম পুরানো ক্ষোভ রক্তকণিকায় আবারও বেশ পীড়া দিয়া গেল।

সেইদিন সন্ধ্যায়, বের হবার পর মনে হইল আজকের সন্ধ্যাটা একদমই অন্যান্য দিনের মতন লাগতেছে না। লক ডাউনের আতঙ্কে সবার দিশাহারা অবস্থা। বড় মসজিদটায় কিছু লোক মাগরিবের নামাজ পড়তেছে। আশপাশের সব বাড়িতে হইচই হইচই। দুই হাত ভইরা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তুলতেছে ফ্যামিলিরা। চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ বাজারসুদ্ধ তুইলা আনতেছে একদম। বাজারে গিয়া তো দেখি হুলুস্থুল কাণ্ড। মানুষজনের প্রচণ্ড ভিড়। বস্তা ভইরা ভইরা জিনিসপত্র নিয়া ভ্যান রিকশায় তুলতেছে। কেউ কারো দিকে তাকাইতেই তেমন ইচ্ছুক না। সাহায্য করবার তো সুযোগই নাই। হঠাৎ পরিচিত কারো সাথে দেখা হইয়া গেলে সহানুভূতি জানায়ে রাখতেছে আগত দিনগুলার জন্য। অথবা অনিচ্ছায় পাওনাদারের মুখোমুখি হইয়া পড়লে, শুকনা একটা হাসি দিয়া বলতে চাইতেছে কয়টা দিন খায়া পইড়া বাঁচতে দেখলে রাগ কইরেন না প্লিজ।

লম্বা লম্বা সিরিয়াল প্রতিটা দোকানে। আলু পেঁয়াজ রসুন হুড়মুড় কইরা ঢুকতেছে বস্তার ভিতর। ভিড়ের মধ্যে দেখলাম এক মহিলা। ত্রিশ কেজির বিশাল এক বস্তা হেঁচড়াইতে হেঁচড়াইতে মাটিতে পইড়া গেল। আমি আগাইতে আগাইতে ভাবি, আমার নিত্যদিনের পরিচিত এই বাজার, আজকে কী হইলো তার? খুব দ্রুত আরো এক লোক আগায়ে আসলো সেই মহিলাকে তুলতে। সে এমনিই ঘোরাঘুরি করতেছিল বোধহয়। চেনা লোক। যদিও তার সাথে আমার পরিচয় খুবই অল্প। কুড়িগ্রাম বাড়ি। বাসার পাশের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের কাজ হওয়ার সময় দেখছিলাম সে অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে আটতলার ছাদে রড উঠাইতেছে। আর সেই রড তোলার পদ্ধতিও কী যে বিপদজনক। কয়েকটা রড দড়ি দিয়া বাঁইধা লম্বালম্বি একজন একজন কইরা সবাই উপরের তলার ছাদে দাঁড়ানোজনকে তুইলা দিতেছিল। এইভাবে এইভাবে আটতলা। অমানবিক! পরে একদিন তার সাথে কথা বইলা সেই শ্রমের মূল্যমান জানার পর, আর কোনোদিনই সোলাইমানের সাথে হাইসা কথা বলতে সাহস পাই নাই। আমি ভাবতাম, আমার সৌখিন হাসাহাসি আর কুশল বিনিময় তার জন্য হয়তো অনেক গভীর অপমানের কারণ হবে।

সোলাইমানকে দেইখা অসহায় হাসি দিলাম আমি। জিগেশ করল বাজার করতে আইছেন? অনেকদিনের বাজার কিন্যা ফালান। দেশ তো বন্ধ হয়া যাইব। খাবার দাবার পাইবেন না পরে। অবস্থাটা কী দেখেন। আগে দেখতাম টাকা নাই তাই খাওন নাই। কয়দিন পর তো দেখমু যাগো টাকা আছে তাগোও খাওন নাই। হরবর কইরা এইসব বলতে থাকা সোলাইমানকে থামায়ে দিয়া যখন আমি জিগেশ করলাম কেমন আছেন। সে চুপ হইয়া গেল। জাস্ট চুপ হইয়া গেল। আমারও তখন আর কী বলার থাকে।

আমি ফিঙে পাখি দুইটাকে লক্ষ্য করতে করতে দেখতেছি ওরা সোলাইমানের হাড় ভাইঙ্গা বসানো ছাদগুলাতে এখনো দুষ্টুমি করতেছে। যেইটা হালকা লজ্জা পাওয়ার মতো কইরা একফুট দুইফুট পলায়ে যাইতেছে ওইটাকে মেয়ে ধইরা নেওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করলাম। মেয়ে ফিঙেটা হঠাৎই একটা ছাদ স্কিপ কইরা উইঠা গেল উপরের ছাদে। ছেলেটা ওর তাল অনুযায়ী প্রথমে এক ছাদই উঠল। কিন্তু সাথেই সাথেই দেখল, একি। পাজিটা তো উইঠা গেছে উপরেরটায়। সে হুশ কইরা উইড়া গিয়া একদম মেয়েটার সাথে ঘেঁইষা বসতে চেষ্টা করল। উহু উহু। মেয়েটা সইরা বসছে।

ওরা এখন পাঁচতলার ছাদে। কোনো তলারই দেয়াল পুরাপুরি উঠে নাই। নিচের দিকে একটু একটু উইঠা আছে। আর উপরের দিক তো শুধুই ছাদ আর পিলার। এইপাশে ওদিকের আকাশ দেখা যায়, ওইপাশেও নিশ্চয় এদিকের আকাশ আর আমাকে দেখা যাইতেছে। এর মধ্যে দিয়া বাতাসের অবারিত পথ। কোনো ঘর নাই, দেয়াল নাই। কত স্বচ্ছ। আমাদের আসলে কিছুদিন এমন বসতি বানায়েই থাকা উচিত। তখন বোঝা যাবে আমাদের পারস্পরিক কূটনীতি জটিলতার কোনো উপযুক্ত আবাসনের খোঁজ পাইছে কিনা। নাকি তার অন্ধকারের দিকে আগাইবার আরো অনেক পথ বাকি। আমার সাথে আমরা এবং অন্যদের সাথে আমি, আবার তাহাদের সাথে সে ও অন্যরা। এমন কইরা আরো কত। সম্পর্কের এইরকম নানান স্তরের লুকোচুরি কী একটা সভ্য দেয়াল তুইলা দিয়া আড়াল কইরা ফেলি নিমেষেই। অবিশ্বস্ততা, নোংরামি, রাগ, হিংসা, অভিমান, ক্ষুধা সব ঢাইকা দিয়া কোমল শান্তির ছড়াছড়ি আমাদের চোখে মুখে। ওইদিকে পাখিরা আরো একতলা উঠল। ওদের ভাবার দরকার নাই কিছুদিন পর এইখানে কত্তগুলা আড়াল গইড়া উঠবে। যেইগুলার ভিতরের রূপ রস গন্ধ কিছুই টের পাওয়া যাবে না এইদিক থেকা।

আমাদের তো এখন শহরই সবকিছু। যাদের কিছু কিছু গ্রামে রাইখা আসছে তারা সবাই বাড়িতে চইলা যাইতেছে। আমাদের কোথাও যাওয়ারই তেমন দরকার নাই। তাই বাসায় বইসা বইসা খাদ্য মজুদ করতেছি, আর যারা ক্ষুধা ও মৃত্যুর মাঝামাঝি পইড়া এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতেছে, ওদের গালাগাল দিতেছি। এইসবে কিছুটা ক্ষোভ ঝইড়া গিয়া ক্ষুধার ব্যাপারে আমাদের জানার ঘাটতিও কিছুটা ঢাকা পড়তেছে বৈকি। সোলাইমান কথায় কথায় জানাইল বাড়ির মালিক যেই পাওনা পরিশোধ করছে ওতে কইরা বাড়ি যাবার মতন সাহস তার হইতেছে না। অযথাই অনেকগুলা ক্ষুধার্ত মুখ দেইখা দেইখা মরতে হবে। এদিকে কাজ বন্ধ হইল অনির্দিষ্টকালের জন্য। খাওয়ানোর আশ্বাসও তো দিতে পারবে না। এইখানে থাকলে আবার নিজের খাবারেরই যোগান আসবে কই থেকা সেইটা ভাবতে ভাবতে বাড়িতে ফিরতে পারার সময়গুলা শেষ হইয়া যাইতেছে। কী থাকতেছে আর। আজকালকের মধ্যে আবার গাড়িও বন্ধ হইয়া যাবে। আজকে দেখা হওয়ার পর কথাবার্তার শুরুর দিকে, একটু বেশিই হাসতেছিল মনে হইল। সেই অতিরিক্ত হাসি হাসি মুখ মনে পড়তে থাকল আমার। ফলে বিজ্ঞানসম্মত কর্তব্য ভুইলা গিয়া সোলাইমানকে বলতে হইল যে তার দ্রুতই বাড়িতে যাওয়া দরকার। বুঝায়ে বললাম দেখেন, আমাদের কিন্তু মাঝেমধ্যে কিছুই থাকে না। সেই সময় ওই মানুষগুলাই থাকে শুধু। যেমনেই থাকুক। আপনে বাড়িতে যানগা তাড়াতাড়ি। আল্লাহর ওপরে ভরসা রাখেন। খাইতে কিছু না কিছু তো পাইবেন অবশ্যই। ওইটা দিয়া চালাইয়া নেন। আমরা বাঁইচা থাকলে আবার মাছ-মাংশ খাবোনে।

প্রয়োজনের তুলনায় অতি অল্প কিছু টাকা দিয়া তার সাহস যোগাইতে চেষ্টা করলাম। তারপর বাজারে ঢুইকা কেনাকাটায় হারায়ে গেলাম। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব ছিল না যে সোলাইমান গাড়ি না পাইয়া ড্রামের মালামাল সাইজা অন্ধকার হাতড়াইতে হাতড়াইতে বাড়ি যাবে।

অনিশ্চয়তার কবলে পড়া নিয়া আমার কখনোই বিশেষ ভয় কাজ করে নাই। শুধুই স্রষ্টার ওপরে বা ভাগ্যের ওপরে ভরসা কইরা বইসা থাকা না। আমার ধারণা এর পিছনে নিশ্চয়ই আব্বার গুণগত বৈশিষ্ট অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে। আমার মন যখন অনেক নরম; অনেক ছোট, তখন থেকাই প্রভাবিত হওয়াটা ঘইটা থাকতে পারে। আমাদের কত ভালো সময় গেছে, কত খারাপ সময় গেছে। অতি ভালো আর অতি খারাপের সাথেও পরিচিতি ঘটছে বিভিন্ন পর্বে। কিন্তু যতবারই কোনো সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াইতে উদ্যোগী হইছি আমার কেবলই মনে পড়ছে ক্ষুধার কথা। অথচ কোনো বেলা আমরা না খাইয়া সবাই একে অন্যের থেকা মুখ লুকাইতেছি এমন মনে পড়ে না। তবু কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই কেউ একজন খাবার পাইতেছে না এই অনুভূতির কারণেই হয়তো ক্ষুধার ভয় থেকা আমি কখনো মুক্তি লাভ করি নাই।

সোলাইমানের পিকআপ ভ্যানে ড্রামে কইরা বাড়িতে যাওয়ার কথা মনে পড়ায় খুব দমবন্ধ লাগতেছে আমার। ত্রিপল দিয়া ঢাকা অনেকগুলা ড্রামের দৃশ্য কল্পনা থেকা মুইছা ফেলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাইতেছি। বড় বড় শ্বাস নিতেছি স্বাভাবিক হইতে। চারদিকের বিস্তৃত শূন্যতায় দৃষ্টি ছড়ায়ে দিয়া পুরা সময়টা ধারণ করতে চাইলাম। আমরা সবাই মিলা কেমন একা হইয়া গেছি। করোনা আমাদের কপালে আইসা উপস্থিত হওয়ার পর, পর্যায়ক্রমে দেখা বিভিন্ন ঘটনা চেতনে আইসা জ্বালাতন শুরু করে। ফলে কিছুই সহনীয় অবস্থায় থাকতেছে না। যতটুক জায়গা আমার অস্তিত্বের জন্য বরাদ্দ ওইটুকুও শূন্যতাকে দিয়া দিতে পারলে আর কোনো অনুভূতিই থাকত না আমার। কিন্তু ওইটা কি মুক্তি? তা তো হইতে পারে না। এতটা দিন থাকলাম কোনো দায়ই কি মাখল না গায়ে? প্যাকেটবন্দী হয়া বাজার কইরা আসার সময় যখন দেখি শুনশান রাস্তার দুইপাশে অনাহারী মানুষগুলা বইসা তাকায়ে আছে আকাশের দিকে—কেন দেখাইলাম তাদেরকে, যে আমি কিছু না কিছু খাইতে পাইতেছি?

অথরিটি তাদের সাথে কী সম্পর্ক রাখছে সেইটা তাদের অভিযোগের মোটামুটি চূড়ান্ত মাত্রা হইলেও আমার মতন মুখচেনা মানুষগুলার প্রতি ওদের চাহনির যৌক্তিকতা খুব ভালোভাবেই টের পাই তখন। সেইটা সহ্য করবার জন্য কত সবল চিত্তের হইতে হবে তার সম্পর্কেও যখন আমার কোনো ধারণা নাই, আমি কই গিয়া মুখ লুকাব।

লকডাউন শুরু হইল পরে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের নির্দেশনা আসার পর সবার যখন রোজগারের পথ বন্ধ হইল, বাসাবাড়ি থেকাও বাইর হওয়া মানা। তখন সঞ্চয়বিহীন ঋণের বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত এই মানুষগুলার তো বাইর হইতেই হয়। রাষ্ট্রের অধীনে থাইকা যেইভাবে এতদিন নিজেদের খাবারটুকু যোগাড় কইরা আসছে; এবং পদে পদে সরকারি কর্তৃত্বের জানা-অজানা নানান অধিকারকে অবধারিত কর্তব্য হিসাবে সন্তুষ্ট কইরা আসছে। তবে কেন এখন ওরা—যাদেরও আছে মৃত্যুর ভয়, ক্ষুধার মুখোমুখি দাঁড়ায়া আপনাকে বিশ্বাস করতে পারল না হে মহামতি ঠাকুর? চিরদিনই তো খালি পুলিশ খালি পুলিশ। ওরা আর আপনার মতো বুদ্ধিমান মানুষ হইতে পারল কই। তার ওপর মুখ ফসকায়ে বোকাবোকা কিছু বললেই আপনার জমাট মাখনের মতো দুগ্ধ অভিমান। যেন কত আপন; যেন বাবা মা!

সামনের বিল্ডিং গাছপালা সব কুয়াশায় আচ্ছন্ন হইয়া আছে। যেইখানটাতে গাছও নাই বিল্ডিংও নাই, সেইখানটায়ও নিশ্চয়ই এমন। হালকা কুয়াশা। একটু একটু শীতল বাতাস বইতেছে। আমি আবার মনোযোগ দিলাম ফিঙে দুষ্টুগুলার দিকে। মন খারাপে কাজ নাই। দেখি ওরা কী করতেছে। মেয়ে ফিঙেটা এখন সাততলায় বইসা নিচে উঁকিঝুঁকি মারতেছে একটু একটু। আগ্রহ বেশি প্রকাশ পাইতে নিলে আবার এলোপাথাড়ি মাথা নাড়তেছে এদিক ওদিক। হাহা, কোনো উদ্দেশ্যই নাই তার এই পলায়নের। কাউকেই কিন্তু তার দরকার নাই। নিজেই নিজের কাজ সাইরা নিতে পারবে, হুম। ছেলেটা ছয়তলায় বইসা বইসা একদমই উপরে কেন তাকাইতেছে না সেইটাও একটু ভাইবা নিতেছে হয়তো। ওইটা তো না তাকানোর চেষ্টায় একদম বুকের সাথে মুখ মিশায়ে রাখছে। ওর যে যাইতেই হবে উপরে! বুকটা আকুপাকু করতেছে। ফুড়ুৎ কইরা হয়তো উইড়া গিয়া একদম গায়ে পইড়া যাবে, ছেলেদের মতন।

চারদিকে কোনো সাড়াশব্দ নাই। গুমোট কান্নার মতন লাগতেছে। সবাই ঘুম। জানালা বন্ধ। অথচ এইসময় সব বাসার রান্নাঘর সচকিত হয়া ওঠার কথা। যারা রান্না করবার, পুনর্ঘুমের একটা ফ্রেশনেসের কামনা যাদের কপালকে জর্জরিত কইরা রাখছে, তারা সজাগ হইতে হইতে এইটা ওইটা বসাবে চুলায়। তারপর একে একে সবাই উঠবে। খাবে দাবে এবং বাইর হবে। কিন্তু আজকে তো কারো বাইর হওয়ার কথা নাই। কোনদিন থেকা বাইর হবে তাও ধারণার অতীত। কিংবা আর কখনো বাইর হওয়া হবে কিনা! এভিনিউ দুইয়ের বড় মসজিদ থেকা কয়েকজনকে নামাজ পইড়া পৃথিবীতে বাইর হইতে দেখা গেল। মাস্ক পরতেছে।

গতকাল দেখছিলাম মসজিদ পুরাটা বাঁশ দিয়া ঘেরাও দিয়া রাখা। সবাইকে বাসায় নামাজ পড়ার জন্য মাইকে আহ্বান জানানো হইতেছে সকাল বিকাল। তারপরও নামাজি ব্যক্তিরা পুলিশের গাড়ি চেক দিয়া দিয়া হাজির হয় আল্লাহর কাছে। বাঁশের বাউন্ডারির ফাঁক দিয়া এক পা ঢুকায়ে মাথা নত কইরা চুপেচাপে ঢুইকা যাইতেছে। তারপর সদর দরজা আটকায়ে নামাজ পড়তেছে মাইক ছাড়াই। জনমনে ঠাকুরের মধ্যস্ততাকারীদের এই গাড়িগুলা এতটাই অবিশ্বস্ততার প্রতীক হইয়া ভুমভুম করতে থাকে যে বিশ্বব্যাপী চলমান দুর্যোগ মানে তাদের কাছে শুধু ওই লোকগুলাই। ওদের কোনোভাবে ফাঁকি দিয়া নিজের কাজগুলা সাইরা নিতে পারলেই তো হইল।

চায়ের দোকানদার মিলিটারি ফাঁকি দিয়া শাটার ফালায়ে বইসা থাকে, কেউ টোকা দিলে ভিতর থেকা বলে দুধ চা না রঙ চা? কী অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা। তারপর শাটার অল্প উঁচা কইরা ক্রেতাকে আপন বানায়া নেয়। মাসখানেক আগে ওই দোকানদার হাসতে হাসতে বলতেছিল দেখছেননি ইহুদিগুলান মরতাছে ক্যামনে ভাইরাসে। হালাল হারাম মানে না তো। যা তা খায় একবারে। সেদিনও ওর দোকানে মসজিদকেন্দ্রিক স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন আড্ডা মারতেছিল যথারীতি। ওদের সেই খারাপমানুষির মুখোমুখি হইতে গিয়া প্রচণ্ড অস্বস্তি পোহাইছিলাম সেদিন। যুক্তির বিরুদ্ধে ধর্মের ভাবসর্বস্ব যেই লড়াইয়ের ইতিহাস, ইসলাম তাতে একটু ভিন্ন রঙই তো নিয়া আসছিল। মহামারিতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যপারে নবীজির স্পষ্ট বক্তব্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক নেতারা এমন দুর্বল ভূমিকায় নিজেদের হাজির করাটা খুব বেশিই অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। অনুসারীদের দায় তারা কিভাবে এড়াইতে পারেন।

হঠাৎ কোনো একটা দৃশ্য আমার এইসমস্ত ভাবনাচিন্তাকে পুরাপুরিভাবে অপ্রয়োজনীয় কইরা ফেলল। আমার মনোযোগ সত্যিকার অর্থে কোনদিকে আমি সেদিকে লক্ষ্য করতে চেষ্টা করলাম। পাখি দুইটা আবারও আমার মনোযোগ কাইড়া নিল লাফালাফি করতে করতে। ওরা এখন সর্বোচ্চ ছাদে। যেই ছাদটা এখনো কমপ্লিট হয় নাই। সারি সারি বাঁশের ওপর কাঠ দেওয়া। ফলে ওইখানে কলাবাগানের মতো একটা আড়াল ভাব তৈরি হইছে। ওরা দুইটা তার মধ্যে দিয়া লুকোচুরি খেলতেছে। হাসাহাসি লুকালুকির এক পর্যায়ে মেয়েটা ক্লান্ত হইয়া একখানে বইসা পড়ল। ছেলেটা খুশিতে ওর চারপাশে উড়তে উড়তে চক্কর দিয়া একদম জড়ায়া বসল। এইবার মেয়েটা আর সরতেছে না। আমি আমার মাঝেও কিঞ্চিৎ দুষ্টু দুষ্টু ভাবের আভাস পাইলাম। হার্টবিট বাড়তেছে। এইবার, হ্যাঁ, ওরা দুইজন ফাইনালি মিলিত হইল। আমি তো মানুষ, ওদের কিছুই দেখতে বাঁধা নাই। আমার কনস্ট্রাকশনে আইসা পাখিরা কী কইরা গেল তাতেও মন খারাপ নাই। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওদের প্রশান্ত উইড়া যাওয়া দেখতে দেখতে একটু মন খারাপ হইল। সবই তো আছে। আমরাও থাকি না!

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;