এত নিশ্চিন্ত হইয়া মানুষ নিজের মৃত্যুরে খায় ক্যামনে

আশরাফ জুয়েল
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

বড় বড় ধর্মগাছগুলারে চিন্তার করাত দিয়া ফালাফালা কইরা, খড়ি বানাইয়া রেশনের মতো এথেন্সের ঘরে ঘরে ছিটাইয়া দিতাছেন, এই খড়ি নাকি সাধারণ খড়ির তুলনায় তেজী, সবকিছুই রাইন্ধা ফালাইতেছে। এবং যুবসমাজনামক আয়নার দুদিকেই আলকাতরা মাখাইতেছেন তিনি, ফলত গ্রিস নামক নৌকাখানা বেউলভাবে দুলতেছে, মাইনষের চৌক্ষের তারায় সাইনবোর্ড হইয়া ঝুলতেছে কিছু ভ্রান্ত জিজ্ঞাসা।

বাটিডার মইধ্যে ডুব দিয়া চুপ মাইরা আছিলাম, আল্লার কিরা, একফোঁটা হেমলকও খাই নাই আমি, কিন্তু যা চাইছিলাম, কাম হইয়া গ্যাছে। তিনি চোখ বন্ধ কইরা খায়ছিলেন, শেষ আরকটুকুও, বাটির ভিত্রে ডুবন্ত আমি, দেখছি, কী শান্তিতে একজন মানুষ খাইতেছেন নিজের মৃত্যুরে।

ইচ্ছা হইছিল, সুযোগ হয় নাই, তাঁরে জিজ্ঞেস করতে, ‘সত্য কী? বিশ্বাস কী? ধর্ম? রাজনীতি? বা ক্ষুধা?’ তাঁরে এও জিজ্ঞেস করতে বুকটা আঁকুপাঁকু করতেছিল, ‘শইলের বিরুদ্ধে আত্মার যুদ্ধটা কী? ক্যান?’ পারি নাই। তিনি যহন হেমলকের বাডিতে ঠোঁট ঠেকাইয়া নিশ্চিন্তে ঢোক গিলতেছিলেন, তাঁরে বিরক্ত করার ইচ্ছা চইলা গেছিল আমার, অবশ্য এ কথাটাও পুরাপুরি সত্য না, আসলে আমার হাত-পা-মাথা-বুক জইমা কাঠ হইয়া যাইতেছিল, স্থির হইয়া আসতেছিল চোখের তারা, চাইলেও নড়তে পারুম না, বুইঝা গেছিলাম। কিন্তু তিনি বোঝেন নাই, বিড়বিড় কইরা কইতেছিলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমাকে আমার ঠিকানায় পৌঁছে দিচ্ছে বলে এঁদের সকলকে আন্তরিক অভিবাদন।’

২।
ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম, জীবনে এত ভয় কখনোই পাইনি। গল্পটা বলি, সেদিন সন্ধ্যায়, হ্যাঁ, সন্ধ্যা হবারই কথা, সন্ধ্যা? আচ্ছা, এই শহরে বেলা কয়টা পর্যন্ত বিকাল? কখন থেকে সন্ধ্যা আরম্ভ? কখনই বা আরম্ভ হয় রাত? সেটা কয়টা পর্যন্ত চলে? সকাল? অবশ্য আমি এই সকাল বিকাল বা রাতের হিসাব রাখি নিয়ন আলো জ্বলে ওঠা এবং নেভানোর সময়কে ধরে নিয়ে। এই শহরের সকাল বিকেল, রাত, আসলে সব কিছুই নির্ভর করে বিভিন্নজনের দখলে থাকা কিছু সুইচের ওপর। ধুর, এসব আমার জানার বিষয় না। যে গল্পটা বলতে চেয়েছিলাম, গল্প তো নয়, ঘটনা, গত সপ্তাহেই ঘটেছে, আমার সাথেই। কী ভয়ানক ঘটনা! বিশ্বাস করার কথা না, না করারই কথা, অবশ্য বিশ্বাস না করলেও কিছু যায় আসে না। আসলে বিশ্বাসের সর্বোচ্চ সীমানা হলো সেখানে, যেখানে এসে মিথ্যে শেষ হয়ে যায়। সেদিন রাতে, রাতই বলছি কারণ নিয়নবাতিগুলো জ্বলেছে বহুক্ষণ—যাচ্ছিলাম বা আসছিলাম, হ্যাঁ যাচ্ছিলাম, না আসছিলাম, আচ্ছা যাওয়া বা আসাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটানাটা, শাহবাগে কিছুক্ষণ অর্থহীন দাঁড়িয়ে থাকার পর আমার কিছু একটা মনে হয়েছিল, কাঁটাবনের দিকে এগুতে চাইছিলাম, পা দুটো অনিচ্ছাকৃতে এগুচ্ছিল। আসলে সময়টা সন্ধে ছিল না, ঘড়ির হিসাবে রাত, অনেক রাত। কিন্তু গভীর রাতকে কেন আমার সন্ধ্যে মনে হয়েছিল?

‘আমি? ফুরকান।’

৩।
: ইউ ফাকডআপ পিপল, ডেমোক্রাসি ইজ ফাকিং ইয়োর অ্যাস অল দ্য টাইম...? ইয়েস, হেই ইয়োলা কালারড শার্ট ম্যান, ডোন্ট ইউ ফিল পেইন?

গুলশান এক থেকে দুইয়ের দিকে যাবার পথে অনিক টাওয়ার, রবি-র হেড অফিস এবং উল্টো দিকে বেঙ্গলের আর্টগ্যালারির ঠিক মাঝের আইল্যান্ডে একজন পাগল, প্রায় প্রতিদিন অফিসভাঙা টাইমে বক্তৃতা করে, বক্তৃতা তো নয় রীতিমতো চিৎকার। অদ্ভুত ভঙ্গিমায়, দুই হাত নাচিয়ে নাচিয়ে, মাঝেমাঝে সামনের জমায়েতের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। সামনের ছোট্ট জমায়েতটা মাঝেমাঝে দেহ বাঁকিয়ে গলা কাঁপিয়ে স্লোগান তোলে। জমায়েতে সাকুল্যে জনা সাতেক, যাদের বয়স চার থেকে নয় দশ, সবাই পথশিশু। এই সরু কণ্ঠের স্লোগানকে ভূমিকম্প ভেবে গুলশানের বড় বড় দালানগুলো ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে, কেঁপে যে ওঠে তা বোঝা যায় দুইদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কথা শুনতে থাকা মানুষগুলোকে দেখলে, সুড়সুড় করে তারা কেটে পড়ে সুবিধাজনক অন্ধকারে। ভীরু মানুষদের এই পালিয়ে যাওয়া দেখে আনন্দে ফেটে পড়ে ক্ষীণ দেহের দলটি। মানুষকে ভয় দেখানোর মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই, তা তারা বুঝে গেছে ইতোমধ্যে। এরকম সময়ে পাগলটি স্থির হয়, চোখ বন্ধ করে দুই হাত তুলে শান্ত হতে বলে তাঁর সম্মুখের সমাবেশটিকে।

৪।
শ্যাষ ঢোক গেলার সাথে সাথে গইলা গ্যালাম আমি, তিনিও ঢইলা পড়লেন। তিনি ভালো কইরাই জানতেন দাঁড়াইয়া থাকার মানে কী? ভালোই আছি, কিন্তু তিনি বেশিদিন থির থাকলেন না।

হঠাৎ হঠাৎ সূর্যের মতোন উদয় হন, কোনো অচেনা নগরীর আন্ধার ফুটপাতে একটানা কথা কইতে থাকেন তিনি। কে শুনল, কে শুনল না এতে তাঁর কিছুই যায় আসে না। তিনি কইতেই থাহেন নিজের মতো কইরা। তাঁর চোখ হইয়া আমি মানুষ দেহি, মানুষ দেহা আমার শখ হইয়া দাঁড়াইছে। পশুদের আলাদা আলাদা চেহারা, আলাদা আলাদা আচরণ আলাদা আলাদা হিংস্রতা, মানুষের শারীরিক গঠন একই রকম, কিন্তু আদতেও ভিন্ন ভিন্ন হিংস্রতা নিয়া নিজেদের প্রতিদিন একটু একটু কইরা হত্যা করে এরা।

মাঝেসাঝে গাছেদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে হাজির থাকি, আবার উড়তে উড়তে মাঝেমইধ্যে চইলা যাই, পাখিদের এসাইল্যামে। তিনিও কই থিকা জানি চইলা আসেন। চুপ কইরা দূরে খাড়াইয়া থাকেন। আমি তখন বিস্কুটগুঁড়া, আমি তখন ক্ষুধার্ত পাখিদের ঠোঁটে ঠোঁটে, আমি তখন নিঃশ্বাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড।

‘জীবনকে পরীক্ষার মুখোমুখি ফেলবে, বারবার।’ ভাইবা ভাইবা ব্যাকুল হইয়া যাই, এই লাইগাই কি তিনি নিজেরে সঁইপা দিছিলেন মৃত্যুর ডেরায়? অথচ বাঁইচা আছেন তিনিই, এথেন্সের সেই নৌকা শুকনা মাটিতে ভাস্তাছে।

৫।
জাদুঘরের ফুটপাত দিয়ে হাঁটছি, বিপরীতে সাবেক পিজি, রাস্তা ফাঁকা, রাত পৌনে একটা। হাঁটতে হাঁটতে বাম দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বুকে দুধ না থাকা মায়ের মতো শুকিয়ে যাওয়া পুকুরটাকে দেখছিলাম। এই পুকুরে কাউকে কোনোদিন মাছ ধরতে দেখা যায়নি, অবশ্য এমন নয় যে, সারাক্ষণ পুকুরের পাশে বসে থেকেছি, তবে বসে থাকতে পারলে মন্দ হতো না, বদ্ধ পানির নিজস্ব একটা ভাষা আছে।

হঠাৎ কুত্তার কু কুউউ কুউউ চিৎকার পুকুরভাবনা থেকে তুলে এনে আমাকে ছিটকে ফেলে মাঝরাস্তায়, ফুটপাতে শুয়ে থাকা কুকুরের পেটে পা পড়ায় এই দৃশ্যের অবতারণা, দর্শকহীন ফুটপাতের এই দৃশ্য অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। একটা ট্রাক সজোরে চুমো দিল আমাকে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড...

কুত্তাটা ছাড়া কেউই ছিল না আশপাশে, সে আমার দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া শরীরের দিকে তাকাচ্ছে, তাঁর শরীরে সামান্য পা পড়ার খেসারত আমাকে এভাবে দিতে হবে, বুঝতে পারেনি সেও। অবশ্য এ নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না। তাঁরই বা দোষ কী? আমাকে মেরেছে ‘সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন’।

দুইদিক থেকে পাঠকসমাবেশ রাস্তার যে অংশটুকুর গলা চেপে রেখেছে ঠিক সেইখানে ধোয়াকাপড়ের মতো পড়ে আছি, শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আমার তেইশ বছরের অতীত, রক্তের প্রবাহটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে কোনদিকে যাবে, তবে রেডব্লাডসেলগুলোর শরীরে এখনো জীবন আছে।

শিক্ষিত কুত্তাটা রেডসেলগুলোকে চেটেপুটে খেয়ে আমাকে রেখে চলে গেল পরীবাগের দিকের সুনশান রাস্তা ধরে, বার দুয়েক পেছন ফিরে তাকাল, কে জানে কী চলছে তাঁর মনে।

‘আমি? ফুরকান।’

৬।
সেই একই জায়গা, গুলশান এক থেকে দুই নাম্বারের দিকে যাবার পথে—অনিক টাওয়ার, রবি-র হেড অফিস এবং উল্টো দিকে বেঙ্গলের আর্টগ্যালারির ঠিক মাঝের আইল্যান্ডে সেই পাগল, আজ তাঁর পরনে হালকা বাদামী কালারের একটা ফুলহাতা শার্ট, নিচে ব্লাক কালারের গ্যাবাডিন, পায়ে স্লিপার। সেই পরিচিত ভঙ্গি, আজ এখন পর্যন্ত তাঁর নিয়মিত অডিয়েন্স এসে পৌঁছায়নি। তাতে তার সামান্য অসুবিধা হচ্ছে না। আজও রাস্তার দুইদিকের ফুটপাতে জমে গেছে কাজ ভুলে যাওয়া কিছু মানুষ, পাগলটি মানুষের দৃষ্টিতে পাগল, হয়তো পাগলটির দৃষ্টিতে বাকি সবাই পাগল। আজও সেই পরিচিত ভঙ্গি;
‘আই অ্যাম চার্চিল, আই রিপিট, আই অ্যাম উইন্সোটোন চার্চিল, ডু ইউ নো মি?’ বোকাচোদার পাবলিক, আমারেও চেনে না। সরি, সরি, নো স্ল্যাং নো স্ল্যাং। লেটস স্টার্ট,’—এই বলে জোরে জোরে তালি দেয় সে, কিন্তু এ তালি দেওয়ার মধ্যে দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণের কোনো চেষ্টা পরিলক্ষিত হয় না। তিনি কথা বলা আরম্ভ করেন, ‘নো ওয়ান প্রিটেন্ডস দ্যাট ডেমোক্রাসি ইজ পারফেক্ট অর অল-ওয়াইজ। ইনডিড ইট হ্যাজ বিন সেইড দ্যাট ডেমোক্রেসি ইস দ্য ও’স্ট ফর্ম অফ গভর্নমেন্ট একসেপ্ট অল দোস আদার ফরম’স দ্যাট হ্যাভ বিন ট্রাইড ফর্ম ঠাইম ঠু ঠাইম...’

নির্ভুল ইংরেজিতে বক্তব্য চলল আরো কিছুক্ষণ। ততক্ষণে মানুষের পেটে ঘরে ফেরার সাইরেন বাজতে আরম্ভ করেছে। ইতোমধ্যে পাগলটির পোষা অডিয়েন্স এসে গেছে, আজ সংখ্যায় একটু বেশিই, জনা দশেক তো হবেই। ক্ষুধার্ত মানুষের কণ্ঠ থেকেই সর্বোচ্চ শব্দের চিৎকার বের হয়, কেন?

আবারও স্লোগান, আবারও ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের পলায়ন। পলায়নপর মানুষের এই চেহারাটা দেখতে খুব ভালো লাগে যুবকটির, যাকে সবাই পাগল বলে।

অবশ্য বক্তব্য শেষ হলেই প্রত্যেকের জন্য একশো টাকার একটা করে চকচকে নোট পথশিশুদের এখানে আসতে বাধ্য করে, যতবার বক্তব্য ততবার একশ টাকার কড়কড়ে একটা করে নোট।

৭।
নিজেরে বেকুব লাগতেছে। বুঝি নাই, কোন স্কুলে ভর্তি হইয়া গেছি! নিজেরে দুই মাড়ির ফাঁকের মাংস মনে হইতেছে, মনে হইতেছে নিজেই নিজেরে চাবাইতেছি অনবরত। আমি কি চাইছিলাম এমন জীবনস্কুলের প্রোডাক্ট হইতে! শইলে এই ‘মানুষ মানুষ’ গন্ধ আর সহ্য হইতেছে না।

শান্তি বলতে গাছেদের শেষকৃত্যানুষ্ঠান—যখন এক নিঃশব্দ প্রার্থনায় ঘুমাইয়া থাকে গাছেরা, যখন অন্যরে বাঁচাইতে নির্দ্বিধায় নিজেরে ঠেইলা দ্যায় করাতের দাঁতে, বার্নিশের পালিশে। আর শান্তি পাই আর যখন পাখিদের এস্যাইলামে গিয়া গুঁড়া বিস্কুট হইয়া তাদের ঠোঁটে ঠোঁটে ঘুরি।

স্বেচ্ছায় এই জীবন বাইছা নেই নাই আমি, কোনো অপশন কেউ দ্যায় নাই আমারে, আমি পাখি হইতে চাই নাকি গাছ? নাকি সামান্য ঘাসফুল নাকি নিমফল?

এও জিজ্ঞাসা করে নাই, আদৌ আমি এই দুইনাই আসতে চাইছিলাম নাকি? মাঠে নামাই দিয়া, খেলার নিয়মকানুন না শিখাইয়া খেলতে কইয়া, গোল দিতে না পারলে প্লেয়ারের দোষ ধরলে আমি কী করতাম?

কেউ আমার দিকে হেমলক আগাইয়া দিতাছে না ক্যান? এই প্রশ্ন করছিলাম বসরে। স্বভাবসুলভ গম্ভীর, কইছেন আমি য্যান গাছেদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে বেশি বেশ উপস্থিত থাকি, বলছেন, যাদের কারণে অরণ্য কাঁন্তাছে হেগোর নামের লিস্টি বানাইতে।
‘সুন্দরবন?’
‘মৃত্যুর মতো মহান আর কী আছে?’ তিনি কইছিলেন।
‘রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট?’
‘কাউকেই কিছু শেখাতে পারব না আমি, বরং তাঁদের মনে ভাবনার উদ্রেক ঘটাতে পারি মাত্র।’

৮।
ভেবেছিলাম মরে পড়ে আছি, কেউ না কেউ কিম্বা ফজর থেকে সদ্যমুক্ত ভোরে এ পথ দিয়ে রমনা পার্কে মর্নিংওয়াকে যাবার সময় কারো রিবোক কেডস বাঁচাতে যদি পুলিশকে খবর দেয়?
না তেমন কিছু লাগেনি, আমার ভাবনাকে অবাক করে দিয়ে, ছিন্নভিন্ন দেহটা আবার আমার শার্ট-প্যান্টের ভেতরে আশ্রয় নিল। ভীষণ সন্দেহ উড়িয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম, পারছি, পারছি!

চিৎকার করে উঠলাম, বেঁচে আছি, বেঁচে আছি, হুররে বেঁচে আছি তো!

মুখে, বুকে, পেটে, মাথায়, পাছায়, থাইয়ে, পায়ে সব, সব জায়গায় হাত দিয়ে দেখলাম, সবই আছে, আমি বেঁচে গেছি, তবে খুব তৃষ্ণা অনুভূত হচ্ছে। আশপাশে পানি নাই, যেটুকু আছে, জাদুঘরের পেছনের পুকুরটায়, কিন্তু গেইটে তো তালা!

হঠাৎ তৃষ্ণা অনুভূত হবার কারণ খুঁজতে গিয়ে মনে পড়ল, সেই কুকুরটার কথা, যে আমার রক্ত চেটে পরীবাগের দিকে চলে গেছিল।

এতই তৃষ্ণা, পানি পাই কোথায়? না কাউকে দেখাও যাচ্ছে না। দেখা গেলেই বা কী!

পানিতে বাঁধ দিয়ে রেখেছে ফারাক্কা, যা আসছে সব চুয়ানি। হঠাৎ ফারাক্কার কথা মনে আসতেই মহানন্দার কথা মনে পড়ে গেল, মহানন্দার কথা ভাবলেই আমার সকল তৃষ্ণা মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যাবার কথা, কিন্তু তা আর হলো না, কারণ ফারাক্কা অনেক আগেই তাঁকেও ডায়রিয়া রোগীর চামড়া বানিয়ে রেখেছে।

হঠাৎ দেখলাম পরীবাগের সন্দেহ ফুঁড়ে ধীর পায়ে সেই কুকুরটা এগিয়ে আসছে আমার দিকে, যে আমার রক্ত খেয়ে নিঃসংশয়ে চলে গেছিল।

তৃষ্ণায় ছটফট করছি, কিন্তু কেন আসছে কুকুরটা?

আমি? ফুরকান।

৯।
: ‘ইফ ইউ ডু নট টেক এন ইন্টারেস্ট ইন দ্য এফেয়ার্স অফ ইয়োর গভর্নোমেন্ট, দেন ইউ আরে ডুমড ঠু লাইভ আণ্ডার দ্য রুল অফ ফুলস।’
: ‘পোভার্টি ইস দ্য পারেন্ট ওফ রেভ্যুলেশন এন্ড ক্রাইম।’
: ‘দ্য প্রাইস অব অ্যাপ্যাথি টুওয়ার্ডস পাবলিক এফেয়ার্স ইস টু বি রুলড বাই এভিল মেন।’
: ‘দ্য ফারস্ট এসেনশিয়াল রেস্পনসিবিলিটি অফ দ্য স্টেট ইজ কন্ট্রোল অফ দ্য মার্কেটপ্লেস, দেয়ার মাস্ট বি সাম অফিসিয়াল চার্জড উইথ দ্য ডিউটি অব সিইং দ্যাট হোনেস্ট দ্যাট ডিলিং এন্ড গুড অর্ডার প্রিভেইল…’
: ‘দোস হু আর টু স্মার্ট টু এনগেইজ ইন পলিটিক্স আরে পানিশড বাই বিং গভর্নড বাই দোস হু আর ডাম্বার...’
: ‘ইভিল ব্রিংস মেন ঠুগেদার...’

গুলশান থানার হাজতখানায় এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। হুলুস্থুল ব্যাপার। থানা এখন দুই দলে বিভক্ত। এক দলে দশ জন অন্য দলে সেই পাগল, গতকাল যে নিজেকে চার্চিল দাবি করেছিল।

পাগলকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা চলছিলই। হাজতের গরাদের ভেতর সে একা। কখনো সে নিজেকে প্লেটো দাবি করছে, কখনো এরিস্টটল, চমৎকার ইংরেজিতে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। হাজতের ঘরকে সে স্টেজ বানিয়েছে, একবার ডানে যাচ্ছে, একবার বামে—কখনো সে এরিস্টটল, কখনো প্লেটো।

থানার গরাদে এরিস্টটল বা প্লেটো ব্রাত্য, এরা একথা জানবে কিভাবে? প্রথম প্রথম কথাগুলো খুবই উপভোগ করছিল সবাই। পাগলটি তখন মহা উৎসাহে আবার নতুন করে আরম্ভ করছে। মাঝে মাঝে চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো চিৎকার। মনে হচ্ছে কোনো নাটকের মহড়া।

এক পর্যায়ে বিরক্তির উদ্রেক হলে খেঁকিয়ে উঠে ওসি, ‘এই পাগলা চুপ কর তো! এই বালটাকে কে ধইরা আনছে?’

পাগল হঠাৎ বলতে আরম্ভ করে—
‘মরুর দারুণ দুর্গ হতে; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে;/ সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে/ শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায়,/ দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়/ বিজয়-আখ্যানলিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরে/ ধূলিরে করিয়া মু্‌গ্ধ, চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরে।’

‘দ্যাখো বালে আবার কবিতাও লেখছে, পাগলাচোদা... অই চোপ, কাম করতে দে... এই এই এই বালডার একটা ব্যবস্থা করত? শুয়োরের বাচ্চা...’

‘হা হা হা, ইটস আ পোয়েম অব টেগর... আপনাদের ঠাকুর, রবি... মনে নেই?’

‘চুপ করবি শালা... পাগলা।’

‘জয় বাংলা, জয়...’ মুষ্ঠিবদ্ধ করে শ্লোগান তুলল পাগল, কাজ হলো। কাজে মন দিল থানা, নিজ ভাবনায় মন দিল সেও, ‘কই আমি তো কাউকে পাগল বলি না, যে নিজে পাগল সে শুধু অন্যকে পাগল বলে। সত্যিকারের পাগল চেনা এতই সহজ?’

১০।
‘কিন্তু পৃথিবীর ফুসফুস, অ্যামাজন? অস্ট্রেলিয়ার আগুন? সবখানেই তো পুড়তাছে অরণ্য? এগিলার কী হইব?’ আমি হাহাকারের ঢোক গিইলা নিয়া কইলাম।

তিনি মেঘথমথম মুখে পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘কাউকেই কিছু শেখাতে পারব না আমি, বরং তাঁদের মনে ভাবনার উদ্রেক ঘটাতে পারি মাত্র।’

‘বালের দুনিয়া ভাল্লাগে না, চ্যাট। রোজ রোজ নিজের রক্ত খাইতে খাইতে না একটু একটু কইরা না মইরা এক্কেরে গেলেই তো হয়? আর টানতে পারতাছি না। কই যামু, কার কাছে? কে আমারে দিব ছুটি। উস্তাদ তো হেমলক খাইয়া এমুন এক্ষান চড় মাইরা গেছিলেন সেই সময়রে!

রাগে দুঃখে নিজেরে কাইট্টা কুইট্টা দুইন্ন্যার মাইনষের মুখে ছিটাইয়া দিতে ইচ্ছা করে, এই শালারা করতাছে কী? আমার শইলেও মাইনষের মাংস, হালারা খাইব ভালা।’

আমিও অরণ্য আর পাখিদের ভালোবাইসা ফেলেছি, এগোর স্থায়ী কোনো ঠিকানা নাই, আমারও নাই। বাস্তুচ্যুত আমরা ভাসতে থাকি, এখানে সেখানে। ‘যাইতে আমারে হইবই, আর না। ম্যালা হইছে। কিন্তু যামুটা কই? যদিও আমার কুনু ঠিকানা নাই, তাই উচ্ছেদ হওনের ভয়ও নাই। অবশ্য গোটা দুনিয়াই ভাস্তাছে, আমি বাল কোন হোগার হোগা...’

১১।
যতটুকু পিপাসার্ত হলে একজন মানুষ মারা যায়, আমি প্রায় তার কাছাকাছি অবস্থায়, সদ্য লটারিরে পাওয়া জীবন, আর হারাতে চাই না। পানির খোঁজে দুই পা শাহবাগের দিকে এগোয় তো তিন পা দৌড়ায় কাঁটাবনের দিকে।

কুত্তাটা আমার একেবারেই নিকটে এসে দাঁড়ায়, আমাকে ইশারা করলে চিত হয়ে শুয়ে পড়ি আমি, সে ডান পা তুলে আমার মুখ বরাবর প্রস্রাব করতে থাকে, আমি চুক চুক করে তার প্রস্রাব খাই, জীবনের কাছে এসব প্রস্রাব ট্রস্রাব কিছু না, কুত্তাটা ঠিক ততখানি প্রস্রাব করে যতটুকু পরিমাণ রক্ত সে চেটেছিল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে পরীবাগের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, এবার পেছন ফিরে তাকনোর কোনো তাগিদ তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না, সে ঋণ শোধ করল?

এ ঘটনার পরপরই আরো কয়েকটা ঘটনা ঘটল; আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের কাছে, সন্ধ্যায়, ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাত। মৃত ভেবে তারা আমাকে ফেলে চলে যায়, আমিও ভেবেছিলাম মরে গেছি, কিন্তু না ফিরে এসেছি। এরপরের ব্যাপারটা আরো ভয়ানক, আমার মাদ্রাসাপড়ুয়া ছোটভাইকে দেখে ফিরছিলাম, যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডের কাছেই—তিনজন পাগল আমার পথ আগলে ধরল, তাদের দুইজন দুই দিক থেকে ধরে রাখল আমাকে আর বাকিজন একটা ধারালো দা দিয়ে ইচ্ছেমত কুপালো, তারপর তাদের সুবিধামতো দিকে দৌড়ে চলে গেল। সবাই দেখল, এবং যার যার কাজে আবার মনোনিবেশ করল।

ঘাড়ের বাম দিকের কোপটা ছিল মারাত্মক, হাতটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল, বাম হাতকে বাঁচাতে ডান হাত এগিয়ে দিয়েছিলাম, তিনটা আঙুলের অর্ধকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। সেগুলোকে কুড়িয়ে এনে যত্ন করে যার যার জায়গায় বসিয়েছিলাম, না কোনো সমস্যা হয় নাই।

এর পরের ঘটনা? সেদিন অনেক রাত করে ঘুমিয়েছিলাম। মেসে কেউ ছিল না, দরজা নক করতে ঘুমের ঘোরেই খুলে দিয়েছিলাম। তারপর চোখ বেঁধে, সারারাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আফতাবনগর আবাসিক এলাকা পেরিয়ে প্রজেক্টের কাশবনে নিয়ে ঠিসুম, ঠিসুম...। প্রতিবারই ওরা নিশ্চিত করে, কিন্তু মরে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছি আমি, এ ব্যাপারগুলো আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে, মনে হচ্ছে আমাকে কেউই মারতে পারবে না, আমি অমর।

কুত্তাটার কথা প্রায়শই মনে পড়ে আমার, সে যদি সে রাতে আমার মুখে প্রস্রাব না করত তাহলে এই অমরত্ব!

আমি? ফুরকান।

১২।
‘বাবা, তুমি? সময় নষ্ট হলো না তোমার? আমি চাই না আমার জন্য একমুহূর্ত সময়ও নষ্ট হোক তোমার? আমি আর তুমি তো একই বাবা, পার্থক্য শুধু এই এই গরাদটা, এক পাশে তুমি, তোমরা, ঐ যে অফিসারটা, ঐ যে ওরা, ওরা ওরা ওরা সবাই, আর এ পাশে শুধু আমি, আমি, আমি, তোমার রূপ ধরে আমি, উনার রূপে আমি, ওদের রূপে, সবার রূপে আমি, বাবা আসলে সবাই পাগল, আমি স্বীকার করি, তোমরা করো না।’

চৌধুরী ফয়সাল করিম খান, লোহার শিকের অন্যপ্রান্ত থেকে দেখলে তাঁকেও কয়েদির মতো লাগবে অনায়াসে। সাকসেসফুল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, চেম্বার অব কমার্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, পত্রিকার মালিক, টিভি চ্যানেল, দুইবারের এমপি...

তাঁর পেছনেই কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেকেই। ‘স্যার রাস্তায় দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র, পলিটিক্স কী কী সব রাষ্টবিরোধী কথা বলছিল।’ ততক্ষণে তালা খুলে গেছে।

‘বাবা, আই ক্যান হোল্ড মাইসেলফ, তোমার কথা ভেবেই রেফেরেন্স দেইনি, আফটার অল তোমার রেপুইটেশনস। বাট এঁরা খুব ভালো ব্যবহার করেছে, সম্ভবত এঁরা আমার রক্তে তোমার ঘ্রাণ পেয়ে গিয়েছিল, অথচ আমার যুদ্ধ এই ঘ্রাণটার বিরুদ্ধেই।’

‘সরি স্যার’ হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়ায় যুবকটি, সেই অফিসারের দিকে।

‘ঠিক আছে, সরি, সরি।’

‘নো সরি, আই এম আ ব্লাডি শুয়োরের বাচ্চা, আপনিই তো বলছিলেন, যা বলেছেন, একদম ঠিক বলেছেন, বাবা ঠিক বলেছে না? বাবা যাও, বাবা, কান অন... আই এম এ সিম্পল প্রোডাক্ট, নাথিং এলস...’

নিয়মানুযায়ী সরকারি কাগজে স্বাক্ষর করে ছেলেকে নিয়ে বের হতে হতে পেছন ফিরে তাকালেন চৌধুরী ফয়সাল করিম খান, এই তাকানোর মধ্যে কী আছে সেটা হয়তো পরে অনুমান করতে পারবে সবাই।

থানা থেকে বের হয়ে ছেলেটি বাবার গাড়িবহরের তোয়াক্কা না করে হনহন করে ফুটপাত ধরে হাঁটতে আরম্ভ করে, কিছুদূর গিয়ে পেছন ফিরে চিৎকার করে বলল, ‘বাবা আমি বনানী কবরস্থানে যাচ্ছি, মার কোলে শুয়ে থাকব একটু... তুমি যাও, সরি, আমার জন্য তোমার অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, যাও, আই অ্যাম জাস্ট আ প্রোডাক্ট, ম্যান!’

শেষ হয় না গল্পেরা...

সময়ে সবকিছু পরিবর্তিত হয়—পাগলটির জন্য পৃথিবী যখন আত্মহত্যার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছে ঠিক তখনই হেমলকের বাটিতে ডুবে থাকা ছেলেটি পাখিদের এসাইলাম থেকে গাছেদের শেষকৃতানুষ্ঠান সেরে আত্মহত্যার মঞ্চে এসে মুক্তি দেয় পাগলটিকে, পাগলটি হয়ে যায় বারবার মৃত্যুকে লাত্থি মেরে ফিরে এসে অমর হতে যাওয়া ফুরকান, আর বারবার মৃত্যু থেকে ফিরে আসা ফুরকান অদম্য আগ্রহে ডুব দেয় সক্রেটিসের জন্য সদাপ্রস্তুত হেমলকের বাটিতে।