সাধারণ মৃত্যুর জীবনচক্র

মেহেদী ধ্রুব
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

কে যায়? কারা যায়? ওটা কিসের ঘ্রাণ? কালো মুখোশের? যাই, একটু দেখে আসি, হ্যাঁ, ওই তো কালো মুখোশেরা যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে? এই জগতে কাকে নিয়ে আসবে? অন্ধকার নেমে এলে ওরা বের হয়, আলো ফোটার আগেই বাতাসে মিলিয়ে যায়; এই জায়গায় মুখোশদের সাথে আমাদের হুবুহু মিল; এই যে গাঢ় হচ্ছে অন্ধকার, এই যে ওরা বের হয়ে হচ্ছে, আমিও তবে বের হই; আহ্, কী শান্তি! এসো হে অন্ধকার, এসো, এসো; আজ আমি তন্নতন্ন করে খুঁজব, আমি আমার ঠল্লইটা খুঁজে পাচ্ছি না, গুলাইটাও খুঁজে পাচ্ছি না, কোথায় যে রেখেছিলাম; মরে যাবার এই এক অসুবিধা, কিছুই মনে থাকে না; অহ্, আপনারা ‘ঠল্লই’ চিনেন তো? ‘গুলাই’ দেখেছেন তো? বাঁশ দিয়ে ঠল্লই বানানো হয়, এটাকে বাঁশের বন্দুকও বলা যায়; ঠল্লইয়ের এক ছিদ্রে দাতই ফল বা পিছন্দি ফল বা বাজনা ফল ঢুকিয়ে কাঠি দিয়ে জোরে ঠেলা দিলেই অন্য ছিদ্র দিয়ে বুলেটের মতো বেরিয়ে যায়, আর গুলাইয়ের কথা কী বলব, এটা আপনারা কম বেশি দেখেছেন, আজ সারারাত এগুলো খুঁজব।

এই ডিসেম্বরে আমার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু একদিন আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরে কী যে হলো, আমি হয়ে গেলাম নেতা, পত্রিকায় আমার নাম, টিভিতে আমার নিউজ, টকশোতে আমি, সেসব দেখে আমি ভীষণ মজা পেতাম, তখন কত মহল থেকে যে আমার সাথে যোগাযোগ করা হতো, এই দল, সেই দল, আমিও কী এক নেশায় পড়ে গেলাম, সারাক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে থাকতাম; কী করব, কী করব করে অস্থির হয়ে কত কী যে করেছি, কত কী যে খেয়েছি; এক সময় আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলাম; কী বিস্ময়কর জীবন! লাস্ট যাকে খতম করার অর্ডার পাই, সে ছিল বিগ ফিশ, কিন্তু বিগ ফিশকে খতম করার পরে যে আমার খেইলও খতম হয়ে যাবে কে জানত।

আমি যেদিন মারা যাই সেদিন সেইফ হোমেই ছিলাম, একটার পর একটা সিগারেট টানছিলাম আর ক্রাইম-থ্রিলার দেখছিলাম, কিন্তু মিড নাইটের দিকে কে বা কারা আমার দরজায় নক করে, আমি দরজা খুলি না, তারপর দরজায় সে কী লাত্থি, আমি কে কে বলে চিৎকার করি, মেশিনটা রেডি করি, লাইট অন করি, ততক্ষণে রুমে ঢুকে গেল ওরা, দেখি কালো কালো মুখোশ, কয়েক মিনিট ধস্তাধস্তির পরে ওরা আমার হাত-মুখ-চোখ বেঁধে ফেলে, তারপর একটা কারে তোলে, সম্ভবত মাইক্রোবাস হবে, অনেকক্ষণ চলে মাইক্রোবাস, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, কোথা থেকে যেন আজানের সুর কানে আসে; হঠাৎ মাইক্রোবাস থেমে যায়, আমি বুঝতে পারি কিছু একটা হতে যাচ্ছে; আব্বা-আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে, বোনগুলোর কথাও; আব্বা কি এখনো ইটের ভাটায় কাজ করে? অথচ সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর আমার কথা-বার্তা, চাল-চলন বদলে গেল, বাড়ির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম; কত কথা যে মনে পড়ে; তখন একজন ধমক দিয়ে বলে ‘বাঁচতে চাইলে দৌড়া’, আমি দৌড় দেই না, ওদের পায়ে পড়তে যাই, কিন্তু কিছুই খুঁজে পাই না; আবারো বলে, ‘দৌড় দিবি নাকি গুলি করব?’ আমার দিনমজুর আব্বা বলতেন জান বাঁচানো ফরজ, আমি ফরজ আদায় করার জন্য দৌড়াই, আর...; একবার মাত্র ‘মাগো’ বলে চিৎকার দিতে পারি।

এখন আমি টাউন হলের দেয়ালের ফাটলে থাকি, এই কয়দিনে মাত্র একজনের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, যে লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে সে লোক সারারাত সিন্দুক খোঁজে; যাই, লোকটার সাথে একটু কথা বলে আসি, ফেরার সময় আব্বার হাতে বানানো ঠল্লই-গুলাইও খুঁজে দেখা যাবে, যাই :
: কেমন আছেন? কী করছেন?
: ভালা নাই, তুমি কেমন আছো?
: ভালো আছি, কী করেন?
: কী আর করুম, তুমি আমার সিন্দুকটা দেখছোনি?
: না, সিন্দুক দেখিনি তো, আপনি আমার ঠল্লই-গুলাই দেখছেন?
: সিন্দুক দেখছো নাতো কী দেখছো মিয়া? আবার ঠল্লই-মল্লইয়ের কথা জিগাও।
: আস্তে কথা বলেন, এখানে বাহাদুরি চলে না, এখানে সবাই সমান, আপনি মেজাজ ঠান্ডা করেন আগে।
: ধুর মিয়া, মেজাজ মারাইতে আইসো না, যাও, ঠল্লই না মল্লই খুঁইজ্জা বেড়াইতাছো হেইডা খুঁজো গিয়া, এইখানে বাল পাকনাকি কইরো না।
: আশ্চর্য, আপনার সমস্যা কী? আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন?
: কীভাবে কথা কইতাম তোমার লগে? সিন্দুক দেখছো নাকি কও।
: বললাম তো দেখিনি, আপনি আপনার মেজাজ ঠিক করেন আগে।
: আচ্ছা, ঠিক করুম নে, যাও চোখ্যের সামনে থেইকা মিয়া।

বেকুব একটা, ধমকের লগে লগে কেমনে চইল্যা গেল; অবশ্য আরেকটা লোকের সাথে আমার পরিচয় হইছে, ওরেও বইল্যা রাখছি, সিন্দুক পাইলে যেন খবর দেয়, ওর সাথে পরিচয় করায়া দিমু নে, তার আগে অবশ্য আমার পরিচয়টা দেওয়া দরকার, মরার পরে আমি থাকি একটা আন্ধার টয়লেটে, ওই দিকে কেউ যায় না; আর গেলেও লাভ নাই, আমি কাউরে ডরাই না, কোনোকালে কাউরে ডরাই নাই, এই অক্টোবরে আমার মৃত্যু হইলেও কত জনরে যে মারছি নিজেও জানি না; ওহ্, যা কইতেছিলাম আমি যেইদিন মারা যাই সেইদিন জনগণের মইধ্যে যাকাতের কাপড় বিলি করতেছিলাম, শালার কপাল এত খারাপ, আধা ঘণ্টার মইধ্যেই ফুটুস, যদিও আমার পাশে ছিল গানম্যান, পুলিশ-টুলিশেরও অভাব ছিল না, সকাল বেলা ডক স্কোয়াডও পরীক্ষা কইরা গেছে, সবি ঠিক ছিল, কোত্থে যে এত মানুষ আইলো, বাঁশের বেড়া ভাইঙ্গা হুমড়ি খায়া পড়ল, মারামারি লাইজ্ঞা গেল, এই সুযোগে ফুটুস, এক্কেবারে কপাল বরাবর, মানুষের পায়ের তলায় পইড়া একুইশ জন মানুষ মইরা গেল, কিন্তু এই কাজটা কে করাইল? নিজের লোকেরা? নাকি বিরোধীরা? নাকি জঙ্গি-টঙ্গিরা? আজও কোনো কূল-কিনারা করতে পারল না কেউ, শুনছি মামলা চলতাছে, বন্দুক যুদ্ধে কয়েকজন মইরাও গেছে, কিন্তু রহস্য আর উদঘাটন হইল না, এইসব কথা মনে হইলে কইলজ্যাটা ফালা ফালা হইয়া যায়, এই হাতের ইশারায় কত শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, কত ফেউ-টেউ শেষ কইরা দিলাম, গত মে মাসেও ঘাঘু মালটারে খায়া দিছি, আমার চেয়ারের দিকে লোভ হইছিল শালার, তুই বেটা এইটা সেইটা কইরা কোটি কোটি টেকা কামাই করছোস, আরো কর, না করছে ক্যাডা; তুই লোভ করলি ক্যায়া শালা? তাই দিছি ভইরা; কিন্তু এর পরে আমি নিজেই কিনা নাই হইয়া গেলাম; উফ, আর ভাল্লাগতাছে না, যাই, সিন্দুকটা খুইজ্জা দেখি, আর ওই লোকটার সাথে আলাপও কইরা আসি—
: এইভাবে উল্টা হইয়া গাছে ঝুইল্লা আছেন যে, কী ব্যাপার?
: কে কথা বলে? কে আপনি?
: আমারে চিনতে পারতাছেন না? উল্টা হইয়া ঝুইল্লা আছেন তো, তাই চিনতে পারতাছেন না, একটু সোজা হন, চিনতে পারবেন, আমার সিন্দুকটা দেখছেন?
: এই সোজা হলাম, ওহ আপনি? সিন্দুক খুঁজছেন নাকি?
: হ, আমার সিন্দুকটা দেখছেন?
: সবখানেই তো সিন্দুক, কেউ দেখতে পায়, কেউ পায় না, আপনি আগে দেখতে পেতেন, এখন পান না।
: আপনের কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারি না, তা আপনি এইভাবে উল্টা হইয়া ঝুইল্লা ছিলেন ক্যান?
: আমার জিনিসগুলো খুঁজে পাচ্ছি না, কোথায় রেখেছি তা মনে করার চেষ্টা করছিলাম।
: তা তো বুঝলাম, কিন্তু আপনের ঝুইল্লা থাকার কারণ কী? উল্টা হইয়া ঝুইল্লা কী খুঁজতাছেন?
: সব উল্টো মানুষ, উল্টো মানুষকে বোঝার জন্যই উল্টো হয়েই ঝুলে ছিলাম, আর উল্টো হয়ে জিনিস খোঁজা যায় না, স্মরণ করা যায়।
: আপনে কী খুঁজেন? ওইগুলা খুঁজার সময় আমার সিন্দুকটাও একটু দেইখেন।
: আমি খুঁজি চেয়ার, সাইন পেন, বই; কোথায় যে রেখেছি কিছুই মনে পড়ে না।
: এইগুলা কি খুঁজার জিনিস হইল? আমার সিন্দুকটা দেখছেন?
: বললাম তো আপনার সিন্দুক আপনার আশেপাশেই আছে।
: ধুর মিয়া, পাগলামি ছাড়েন, আজাইরা কথা, আপনি ঝুইল্লা থাকেন, বালের বই না চেয়ার খুঁজতাছেন, ওইটা খুঁজতে থাকেন, আমি গেলাম।

আহ্, কী শান্তি, লোকটা তবে চলে গেছে, ওহ্, আমি যেন কোন বইটা খুঁজছি? Das Kapital? না, না, আমি এই বই খুঁজতে যাব কেন? আমি যেটা লিখেছি সেটা খুঁজছি, সেটার নাম কি ‘মাইক্রো ব্যাংক’? এমন কিছুই হবে, আমি নিশ্চিত ‘মাইক্রো’ শব্দটা ছিল; এই বইটা আমি নিজেই লিখেছি, যদিও বাকিগুলো নিজে লিখিনি, কাকে দিয়ে যেন লিখিয়েছি, অবশ্য মোটা অংকের অর্থ নিয়েছে লোকটা, আমার বইয়ের কোন লাইনটা যেন বিখ্যাত হয়েছে? Dream is not that which you see while sleeping, it is something that does not let you sleep, এটা? না, না, এই স্বপ্ন-টপ্ন না; আমার কোটেশনে poverty, poor এই শব্দগুলো ছিল; থাক, কষ্ট করে আর মনে করতে চাচ্ছি না, আমি বরং সাইন পেন ও চেয়ার খুঁজতে বের হই, যদিও রাস্তাঘাট তেমন চিনি না, এই অগাস্টে আমার মৃত্যু হয়েছে; অবশ্য আমিও কম কী, এই জুনে একটা ফেউকে যমের ঘরে পাঠিয়েছি, কিন্তু কাজটা আমার করতে হয়নি, বেটা আমার বিরুদ্ধে নিউজ করে, আমার বইয়ের আসল লেখক কে, দেশি-বিদেশি কোন কোন সংস্থার সাথে আমার যোগাযোগ আছে, আমি কার হয়ে কাজ করি; কে কার এজেন্ট, ঋণ খেলাপি, রিজার্ভ চুরি, শেয়ার বাজার, অর্থ পাচার, এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, কিন্তু আমার এই সুখ-স্বাছন্দ্য, এই ভালোমানুষি, এই জনপ্রিয়তাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারি না; তাই বেটাকে উচিত শিক্ষা দিয়েছি; কিন্তু আমিও টিকতে পারিনি; ওই দিনের ব্যাপারটা আজও বুঝতে পারি না; লেট নাইট পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরছি; রাস্তায় লোকজন নেই, পাঁচ নম্বর রোডের মোড়ে আমার গাড়ি থেমে গেল, একটা মাইক্রোবাস রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে, আমার ড্রাইভার একটা হর্ন দিয়েছে কী দেয়নি, অমনি দৌড়ে এলো ওরা, আমি শুধু কালো কালো মুখোশ দেখতে পেয়েছি, সে কী কোপ, আমার ঘাড় থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত...;

উফ, আর মনে করতে চাই না, আর ভালো লাগছে না, এই ম্যানহোলে থাকতে থাকতে মনটা কেমন হয়ে যাচ্ছে; যাই, বাহির থেকে ঘুরে আসি; দেখি জিনিসগুলো খুঁজে পাই কিনা; ফেরার পথে পুরনো জাদুঘরে যে লোকটা থাকে তার সাথে আলাপ করে আসব নে; লোকটা সারাদিন লেখালেখি করে; যাই, দেখি আসি একটু—
: কেমন আছেন আপনি?
: ওহ্, আপনি, আমি ভালো আছি, আপনি?
: ভালো আছি, কিন্তু জিনিসগুলো খুঁজে পাচ্ছি না, বইয়ের নামটাও মনে করতে পারছি না।
: আমিও লিখতে পারছি না, সাদা মেঘের সাক্ষাৎ পাচ্ছি না, কালো মেঘে লিস্ট করে লাভ নেই, কারো চোখে পড়ে না।
: কেন চোখে পড়ে না? কেন?
: খুব সোজা, কালো কালোকে খেয়ে ফেলে, তাই কেউ দেখতে পায় না, আপনারা সাদা মেঘে যা দেখেন তা কালো মেঘের তুলনায় এক আনাও না।
: কী বলেন, সাংঘাতিক ব্যাপার, আচ্ছা আর বিরক্ত না করি, আপনি সাদা মেঘ খুঁজতে থাকেন, আমি তবে চলি।

এই লোকটা সারাদিন উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে, সাইন পেন খুঁজে, চেয়ার খুঁজে, কী এক বই খুঁজে, কিন্তু বইয়ের নাম জানে না; পাগল ছাগল সব, অবশ্য এই লোকটা জানে না যে, এখানে আমার বউও থাকে; আমরা বউ-জামাই ভালোই আছি; অহ্, আমাদের পরিচয় তো দেওয়া হয়নি; এই জুনে আমাদের মৃত্যু হয়েছে, যদিও অন্য একজনের মৃত্যুর সাথে আমি জড়িত ছিলাম; অবশ্য আমি নিজে কিছুই করিনি, ওপর থেকে আমাকে মোটা অংক দিয়ে বলে, ‘আমরা যেইভাবে বলি সেইভাবে শুধু রিপোর্টটা করবেন।’ আমিও বুদ্ধি-পরামর্শ দেই আর রিপোর্ট করি অনেক দিন; থাক, এসব আর মনে করে লাভ নেই; যা বলছিলাম, সেদিন গভীর রাতে...; না, আর মনে করতে চাই না, বউ পারলে বাকিটুকু তুমি বলো, দেখি সাদা মেঘের সন্ধান পাই কিনা।
: তুমি যে কিনা, এসব রক্তারক্তির কথা বলতে আমারও ভালো লাগে না।
: আরে বলো, তুমি আমার চেয়ে সাহসী, আমি তো মুরগি কাটা দেখলেও ভয় পেতাম।
: কী যে বলো, তোমার চেয়ে সাহসী কে ছিল শুনি?
: আমি যাচ্ছি কিন্তু।
: আচ্ছা যাও।

আমার জামাই বড্ড ছেলে মানুষ, উন্মাদও বলতে পারেন; যে কথা বলছিলাম, সেদিন রাতে কী হয়েছিল ঠিকঠাক বলতে পারব না; শুধু এটুকু মনে পড়ে, আমার চোখের সামনে আমার জামাইকে জবাই করে ফেলে; সে কী রক্ত, রক্তের সমুদ্র, ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে ল্যাপটপ কোথায়; ওই ল্যাপটপেই ছিল মুখোশ আর ছায়াদের লিস্ট, তারপর আমার গলায়ও; উফ, কালো কালো মুখোশ, আর বলতে পারব না, কিন্তু আমাদের চার বছরের বাবুটা কোথায়? যাই, একটু খুঁজে আসি, ফেরার পথে ওই মহিলার বাবুর গল্প শুনে আসব, ওই মহিলার বাবুও নাকি হারিয়ে গেছে, যাই তবে।
: আপা, কেমন আছেন? আপনার বাবুকে খুঁজে পেয়েছেন?
: খুঁজে পাইলে তো দেখতেনই, আপনে পাইছেন সাদা মেঘ? আপনার বাবুরে পাইছেন?
: মেঘ খুঁজে পেলে কি আপনার কাছে এসেছি, এতক্ষণে লিস্ট করতে বসে যেতাম।
: এইসব বাদ দিয়া ভালো করে বাবুরে খুঁজেন, এইসব মেঘটেক খুঁজে লাভ নাই।
: এই কারণেই আপনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, আপনি থাকেন, আমি গেলাম।
: এত গরম দেখায়েন না, বাবুরে খুঁজতাছি, আপনার বাবুরে পাইলে জানাব নে।
: তার আর দরকার নেই, আপনি নিজেরটাকে খুঁজেন, যত্তসব।

এই মহিলার কথার ধরন ভালো না, একটু যে আলাপ করব সেই সুযোগ নাই, খালি সাদা মেঘ খুঁজে; বাবুরে খুঁজলেও তো পারে, আমার বাবুটা যে কোথায় আছে, এই এপ্রিলে আমরা জামাই-বউ মারা যাই, সেই দিনের কথা মনে হলে... না, আমি বলতে পারব না, কলিজা ফেটে যায়; এই যে জামাই, পারলে আপনি বলেন।
: বউ, তুমিই কও, আমি বস্তাগুলা খুঁইজা পাইতাছি না।
: সারাদিন বস্তা খুঁজার দরকার নাই।
: তাইলে কী তোমার গহনার বাক্স খুঁজতাম?
: সব খুঁজবা, আমার গহনার বাক্স খুঁজবা, তোমার বস্তা খুঁজবা, আমাদের বাবুরেও খুঁজবা।

আমার বউ পাগল কিসিমের হইলেও দিলটা সাচ্চা, সে যেহেতু কইতাছে তাইলে ওই দিনের ঘটনাটা কই; তার আগে আমাদের পরিচয়টা দিয়া লই; আমি তরুণ চেয়ারম্যান, প্রথম ইলেকশনেই বিপুল ভোটে পাস করছি, আর আমার বউ হেড মাস্টারনি; আমাদের কথা শোনার আগে আমি যে কাজটা করছি তার কথা একটু কই; এই কথাটা কেউ জানে না, আমার বাড়িতে যে মেয়েটা কাজ করত, একদিন...; থাক, কইয়া কী লাভ, জীবনে ইট-বালু-টিন-চাইল-গম কম খাই নাই; যা কইতেছিলাম, ওইদিন রাতের বেলা আমার দরজায় আইসা কে জানি ফিসফিস কইরা কয়, ‘চেয়ারম্যান সাব, ও চেয়ারম্যান সাব, দরজাটা খুলেন, কথা আছে, দরজাটা খুলেন।’ বউ না করে, কিন্তু আমি যন্ত্রটা হাতে নিয়া দরজাটা খুলি; সাথে সাথে আমারে জাপ্টায়া ধরে, খালি কালা কালা মুখোশ; ওরা ঘরের চালে, ঘরের ভিতরে, আমগোর গায়ে, বিছানায় কেরোসিন ঢাইল্যা দেয়, তারপর...
: বউ, আর পারতেছি না, বাকিটুকু তুমি কও।

এই জামাই নিয়া আর পারতেছি না, তারপর আমাদের হাত-পাও-মুখ বেঁধে আগুন লাগায়া দেয়, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে, আমরা পুড়ে কয়লা হয়ে যাই; পরে মামলা হয়, কিন্তু সবচেয়ে বড় পত্রিকায় খবর আসতে থাকে, এটা নাকি দুর্ঘটনা।

এখন আমরা চুঙ্গির ভিতরে থাকি, অন্ধকার হলে বাবুরে খুঁজি, আগুন লাগার সময় বাবুর কথা মনে ছিল না, কোথায় যে আছে বাবুটা; অবশ্য এখানেও একটা মেয়ে আছে, ওকে দেখলে মনটা ভালো হয়ে যায়, মেয়েটা সারাদিন ‘বাবু, বাবু’ করে, যাই, ওকে দেখে আসি।
: এই যে, এই মেয়ে, কী করতেছো?
: আপনে, এই অসময়ে, একটু পরেই তো আজান দিয়া দিব, রাইত তো বেশি নাই।
: তুমি চিন্তা করো না, এখনো কিছুটা সময় বাকি আছে, তুমি কী করছিলা?
: জানেন কী হইছে; এইদিক দিয়া একটা বাবু গেছে, আপনে যুদি দেখতাইন, সাদা ফকফকা, তুলতুলা।
: কী বলো, আমার বাবু নাতো?
: না, আপনের বাবু আইবো কইথ্যে; মনে হইছে এইটা আমার বাবু।
: কী বলো, তোমার বাবু হবে কেমনে? তোমার তো বিয়েই হয় নাই, বিয়ে না হলে বাবু হয় না।
: হ, মইরা গিয়া কী যে বিপদে পড়ছি, বাবুর সখ আর মিটল না।
: সবই কপাল, বুঝছো; আচ্ছা বাদ দেও, এখন তোমার কথা বলো, তুমি না তোমার কথা বলতে চাইছিলা।
: কিন্তু আইজকা তো সময় নাই, এট্টু পরেই তো আজান দিয়া দিব।
: তুমি তাড়াতাড়ি বলবা, এখনো সময় বাকি আছে।
: আইচ্ছা, তাইলে হুনেন, ছুডু কইরা কইতাছি।

চেয়ারম্যান সাবের লগে কাম করতে গিয়া আব্বা গেছে মইরা, ইটের ভাটায় পুইড়া কয়লা হইয়া গেছে; ছুডু ভাইডাও শহরে যাওনের এক বছরের মইধ্যে উধাও হইয়া গেছে; বাজারের মাইনষে কয়, পত্রিকায়, টিভিতে নাকি ভাইরে দেখাইছে; সোনার টুকরার ভাই আমার কী জানি করছে, এর কয়দিন পর থেইকা ভাইডার কুনু খবর পাই নাই; আব্বা কত কষ্ট কইরা বাজার থেইকা চান্দা তুইল্লা ভাইডারে এঞ্জিনেয়ার বানানোর লাইগ্যা...; বা, আর কইতে পারতাম না গো; কইল্যাডা পুইড়া যা; আব্বা মরার পরে আমরা তিন বোইন রোগা মারে লইয়া ভরা গাঙে পইড়া গেলাম, আমি সবার বড়, ছুডু বোইনগুলা খালি কান্দে, ঘরে খাওন-পানি কিচ্ছু নাই, না খায়া মইরা যাবার অবস্থা, তহন চেয়ারম্যান সাব আমারে তার বাড়িতে কামের ব্যবস্থা কইরা দিল, সুখে-শান্তিতে যাইতাছিল, চেয়ারম্যান সাব ও তার বউ আমারে ভাত-কাপড়ের কষ্ট দেয় নাই কুনুদিন; তাগোর একটা বাবু, চাইর বছর বয়স, হেরে নিয়াই আমার সময় চইল্লা যাইত, একদিন চেয়ারম্যান সাবের বউ বাসায় নাই, হেড মাস্টারনি আছিল তো, টেডিং করতে নাকি বাপের বাড়ি গেছিল মনে নাই; ম্যাডাম আমারে সব বোঝায়া দিয়া গেছে, আমি ঘরদোর পরিষ্কার করি, রান্নাবান্না করি, বাবুরে গোসল করাই, খাওয়াই, চেয়ারম্যান সাবও তাড়াতাড়ি বাড়িতে আইয়ে; কুনু অসুবিধা হয় না, আমি এটা-সেটা করে দেই, চা বানায়া দেই, লোকজন আইলে সমাদর করি, চেয়ারম্যান সাব আমারে কয় মাংস ভুনা কর, আমি বাটা মরিচ দিয়া ঝাল ঝাল কইরা মাংস ভুনা করি, কী যে মজা, জীবনে এত মাংস খাই নাই, কিন্তু শরমের কথা কী কইতাম, আর এখন তো আমার লাজ-সরম কিচ্ছু নাই, ওইদিন রাতের বেলা বাবু ঘুমাইয়া গেলে চেয়ারম্যান সাব আমারে কয় ‘আমার মাথা ব্যথা করতাছে, একটু টিইপ্পা দে;’ চেয়ারম্যান সাবেরে আমি পিরের মতো মানি, উনি কত কী কিইন্না দেয় আমারে, পরে ওনার মাথা টিইপ্পা দেই, পরে, চেয়ারম্যান সাব...;
: এই মেয়ে তোমার গল্প বন্ধ করো, ভালো লাগতাছে না আমার।
: ক্যান? কী হইছে? আর শুনবেন না? আপনেই তো শুনতে চাইলেন।
: না, আজ আর না, আজান দিয়ে দিবে, আমি এখন যাই।

বুঝলাম না কিচ্ছু, বেডি এত চেইত্তা গেল ক্যান, নিজেই হুনতে চাইলো আবার নিজেই ছ্যাং ছ্যাং শুরু করল; তয় আমিও হার মানুইন্না ছেড়ি না, আজ আমি কইয়ামই, আজান দেয়ার আগ পর্যন্ত কইয়াম; পরে, হুনেন, কী হইল, দুই তিনের মইধ্যে আমি যেন চেয়ারম্যান বাড়ির ম্যাডাম হইয়া গেলাম, ম্যাডাম যেইদিন বাসায় ফিইরা আইলো তার আগের রাইতে চেয়ারম্যান সাব আমারে কইলো, ‘কন্ডম দিয়া মজা পাই নারে, তোর মাসিক হইব কবে?’ আমি কই, ‘স্যার, কয়েকদিনের মইধ্যে হইব।’ আমার স্পষ্ট মনে আছে উনি বিরাট খুশি হইয়া কইছিলেন, ‘যা শালা, তাইলে তো সেইফ পিরিয়ড’, পরে কন্ডম ছাড়াই সব হইল, কিন্তু দুই মাস যাবত আমার মাসিক বন্ধ থাকলে একদিন সুযোগ বুইজ্জা চেয়াম্যান সাবেরে কথাটা কই, উনি কন, হাসপাতালে নিয়া যাইব, কিন্তু আমি হাসপাতালে যাইতাম ক্যায়া, আমি কান্দাকাটি করি, উনি আমার পায়ে পড়ে, কয় ‘আমারে বাঁচা, পুরা দেশের মানুষ জাইন্না যাইব’; কিন্তু গরিবের মাইয়া হইলেও আমার জেদ কম না, আমি মানতে চাই না, আমার পেটে বাচ্চা, তারে আমি খুন করতে পারি না, আমি কই ম্যাডামরে কইয়া দিমু, পরে আমার জীবনে আইলো ওইদিন; ম্যাডাম বাসায় আছিল না; খালি এইটুকুন মনে পড়ে, কালা মুখোশ, কালা, বাতরুম রক্তে জ্বলিতলি হইয়া গেল, আষাঢ় মাসের গাঙের মতো হইয়া গেল, আমার পনেরো বছরের শরীলডা হাজার হাজার টুকরো হইয়া গেল, হেই টুকরাগুলো টয়লেটে ফালায়া পানির পর পানি দিলো, পানির ধাক্কাতে এক সময় আমার ছুডু শরীরডা নাই হইয়া গেল; আরো মনে করতে পারি, কে জানি আমার নাকেমুখে বালিশ দিয়া চাপা দিয়া ধরছিল।

ওই যে আজান দিয়া দিল; কিছুক্ষণের মইধ্যে ফকফকা হইয়া যাইব সব; কিন্তু যাইবার আগে কইয়া যাই, যতটুকুন মনে পড়ে, জানুয়ারি নাকি ফেব্রুয়ারিতে আমার মৃত্যু হইছে; অহন আমি একটা ভাঙা কব্বরে থাকি, হেই কব্বরে হুইয়াও শব্দ পাই; ওই যে শব্দ হইতাছে; ক্যাডা যায়? কারা যায়? কিসের গন্ধ আইতাছে? কালা কালা মুখোশের নাকি? দেহি তো এট্টু, হ, ওই তো কালা কালা মুখোশ যাইতাছে, ওরা কারে ধইরা লইয়া যাইতাছে? আমার বাবুরে? নাকি ছুডু ভাইডারে লইয়া যাইতেছে?