সাধারণ মৃত্যুর জীবনচক্র



মেহেদী ধ্রুব
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

কে যায়? কারা যায়? ওটা কিসের ঘ্রাণ? কালো মুখোশের? যাই, একটু দেখে আসি, হ্যাঁ, ওই তো কালো মুখোশেরা যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে? এই জগতে কাকে নিয়ে আসবে? অন্ধকার নেমে এলে ওরা বের হয়, আলো ফোটার আগেই বাতাসে মিলিয়ে যায়; এই জায়গায় মুখোশদের সাথে আমাদের হুবুহু মিল; এই যে গাঢ় হচ্ছে অন্ধকার, এই যে ওরা বের হয়ে হচ্ছে, আমিও তবে বের হই; আহ্, কী শান্তি! এসো হে অন্ধকার, এসো, এসো; আজ আমি তন্নতন্ন করে খুঁজব, আমি আমার ঠল্লইটা খুঁজে পাচ্ছি না, গুলাইটাও খুঁজে পাচ্ছি না, কোথায় যে রেখেছিলাম; মরে যাবার এই এক অসুবিধা, কিছুই মনে থাকে না; অহ্, আপনারা ‘ঠল্লই’ চিনেন তো? ‘গুলাই’ দেখেছেন তো? বাঁশ দিয়ে ঠল্লই বানানো হয়, এটাকে বাঁশের বন্দুকও বলা যায়; ঠল্লইয়ের এক ছিদ্রে দাতই ফল বা পিছন্দি ফল বা বাজনা ফল ঢুকিয়ে কাঠি দিয়ে জোরে ঠেলা দিলেই অন্য ছিদ্র দিয়ে বুলেটের মতো বেরিয়ে যায়, আর গুলাইয়ের কথা কী বলব, এটা আপনারা কম বেশি দেখেছেন, আজ সারারাত এগুলো খুঁজব।

এই ডিসেম্বরে আমার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু একদিন আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরে কী যে হলো, আমি হয়ে গেলাম নেতা, পত্রিকায় আমার নাম, টিভিতে আমার নিউজ, টকশোতে আমি, সেসব দেখে আমি ভীষণ মজা পেতাম, তখন কত মহল থেকে যে আমার সাথে যোগাযোগ করা হতো, এই দল, সেই দল, আমিও কী এক নেশায় পড়ে গেলাম, সারাক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে থাকতাম; কী করব, কী করব করে অস্থির হয়ে কত কী যে করেছি, কত কী যে খেয়েছি; এক সময় আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলাম; কী বিস্ময়কর জীবন! লাস্ট যাকে খতম করার অর্ডার পাই, সে ছিল বিগ ফিশ, কিন্তু বিগ ফিশকে খতম করার পরে যে আমার খেইলও খতম হয়ে যাবে কে জানত।

আমি যেদিন মারা যাই সেদিন সেইফ হোমেই ছিলাম, একটার পর একটা সিগারেট টানছিলাম আর ক্রাইম-থ্রিলার দেখছিলাম, কিন্তু মিড নাইটের দিকে কে বা কারা আমার দরজায় নক করে, আমি দরজা খুলি না, তারপর দরজায় সে কী লাত্থি, আমি কে কে বলে চিৎকার করি, মেশিনটা রেডি করি, লাইট অন করি, ততক্ষণে রুমে ঢুকে গেল ওরা, দেখি কালো কালো মুখোশ, কয়েক মিনিট ধস্তাধস্তির পরে ওরা আমার হাত-মুখ-চোখ বেঁধে ফেলে, তারপর একটা কারে তোলে, সম্ভবত মাইক্রোবাস হবে, অনেকক্ষণ চলে মাইক্রোবাস, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, কোথা থেকে যেন আজানের সুর কানে আসে; হঠাৎ মাইক্রোবাস থেমে যায়, আমি বুঝতে পারি কিছু একটা হতে যাচ্ছে; আব্বা-আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে, বোনগুলোর কথাও; আব্বা কি এখনো ইটের ভাটায় কাজ করে? অথচ সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর আমার কথা-বার্তা, চাল-চলন বদলে গেল, বাড়ির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম; কত কথা যে মনে পড়ে; তখন একজন ধমক দিয়ে বলে ‘বাঁচতে চাইলে দৌড়া’, আমি দৌড় দেই না, ওদের পায়ে পড়তে যাই, কিন্তু কিছুই খুঁজে পাই না; আবারো বলে, ‘দৌড় দিবি নাকি গুলি করব?’ আমার দিনমজুর আব্বা বলতেন জান বাঁচানো ফরজ, আমি ফরজ আদায় করার জন্য দৌড়াই, আর...; একবার মাত্র ‘মাগো’ বলে চিৎকার দিতে পারি।

এখন আমি টাউন হলের দেয়ালের ফাটলে থাকি, এই কয়দিনে মাত্র একজনের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, যে লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে সে লোক সারারাত সিন্দুক খোঁজে; যাই, লোকটার সাথে একটু কথা বলে আসি, ফেরার সময় আব্বার হাতে বানানো ঠল্লই-গুলাইও খুঁজে দেখা যাবে, যাই :
: কেমন আছেন? কী করছেন?
: ভালা নাই, তুমি কেমন আছো?
: ভালো আছি, কী করেন?
: কী আর করুম, তুমি আমার সিন্দুকটা দেখছোনি?
: না, সিন্দুক দেখিনি তো, আপনি আমার ঠল্লই-গুলাই দেখছেন?
: সিন্দুক দেখছো নাতো কী দেখছো মিয়া? আবার ঠল্লই-মল্লইয়ের কথা জিগাও।
: আস্তে কথা বলেন, এখানে বাহাদুরি চলে না, এখানে সবাই সমান, আপনি মেজাজ ঠান্ডা করেন আগে।
: ধুর মিয়া, মেজাজ মারাইতে আইসো না, যাও, ঠল্লই না মল্লই খুঁইজ্জা বেড়াইতাছো হেইডা খুঁজো গিয়া, এইখানে বাল পাকনাকি কইরো না।
: আশ্চর্য, আপনার সমস্যা কী? আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন?
: কীভাবে কথা কইতাম তোমার লগে? সিন্দুক দেখছো নাকি কও।
: বললাম তো দেখিনি, আপনি আপনার মেজাজ ঠিক করেন আগে।
: আচ্ছা, ঠিক করুম নে, যাও চোখ্যের সামনে থেইকা মিয়া।

বেকুব একটা, ধমকের লগে লগে কেমনে চইল্যা গেল; অবশ্য আরেকটা লোকের সাথে আমার পরিচয় হইছে, ওরেও বইল্যা রাখছি, সিন্দুক পাইলে যেন খবর দেয়, ওর সাথে পরিচয় করায়া দিমু নে, তার আগে অবশ্য আমার পরিচয়টা দেওয়া দরকার, মরার পরে আমি থাকি একটা আন্ধার টয়লেটে, ওই দিকে কেউ যায় না; আর গেলেও লাভ নাই, আমি কাউরে ডরাই না, কোনোকালে কাউরে ডরাই নাই, এই অক্টোবরে আমার মৃত্যু হইলেও কত জনরে যে মারছি নিজেও জানি না; ওহ্, যা কইতেছিলাম আমি যেইদিন মারা যাই সেইদিন জনগণের মইধ্যে যাকাতের কাপড় বিলি করতেছিলাম, শালার কপাল এত খারাপ, আধা ঘণ্টার মইধ্যেই ফুটুস, যদিও আমার পাশে ছিল গানম্যান, পুলিশ-টুলিশেরও অভাব ছিল না, সকাল বেলা ডক স্কোয়াডও পরীক্ষা কইরা গেছে, সবি ঠিক ছিল, কোত্থে যে এত মানুষ আইলো, বাঁশের বেড়া ভাইঙ্গা হুমড়ি খায়া পড়ল, মারামারি লাইজ্ঞা গেল, এই সুযোগে ফুটুস, এক্কেবারে কপাল বরাবর, মানুষের পায়ের তলায় পইড়া একুইশ জন মানুষ মইরা গেল, কিন্তু এই কাজটা কে করাইল? নিজের লোকেরা? নাকি বিরোধীরা? নাকি জঙ্গি-টঙ্গিরা? আজও কোনো কূল-কিনারা করতে পারল না কেউ, শুনছি মামলা চলতাছে, বন্দুক যুদ্ধে কয়েকজন মইরাও গেছে, কিন্তু রহস্য আর উদঘাটন হইল না, এইসব কথা মনে হইলে কইলজ্যাটা ফালা ফালা হইয়া যায়, এই হাতের ইশারায় কত শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, কত ফেউ-টেউ শেষ কইরা দিলাম, গত মে মাসেও ঘাঘু মালটারে খায়া দিছি, আমার চেয়ারের দিকে লোভ হইছিল শালার, তুই বেটা এইটা সেইটা কইরা কোটি কোটি টেকা কামাই করছোস, আরো কর, না করছে ক্যাডা; তুই লোভ করলি ক্যায়া শালা? তাই দিছি ভইরা; কিন্তু এর পরে আমি নিজেই কিনা নাই হইয়া গেলাম; উফ, আর ভাল্লাগতাছে না, যাই, সিন্দুকটা খুইজ্জা দেখি, আর ওই লোকটার সাথে আলাপও কইরা আসি—
: এইভাবে উল্টা হইয়া গাছে ঝুইল্লা আছেন যে, কী ব্যাপার?
: কে কথা বলে? কে আপনি?
: আমারে চিনতে পারতাছেন না? উল্টা হইয়া ঝুইল্লা আছেন তো, তাই চিনতে পারতাছেন না, একটু সোজা হন, চিনতে পারবেন, আমার সিন্দুকটা দেখছেন?
: এই সোজা হলাম, ওহ আপনি? সিন্দুক খুঁজছেন নাকি?
: হ, আমার সিন্দুকটা দেখছেন?
: সবখানেই তো সিন্দুক, কেউ দেখতে পায়, কেউ পায় না, আপনি আগে দেখতে পেতেন, এখন পান না।
: আপনের কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারি না, তা আপনি এইভাবে উল্টা হইয়া ঝুইল্লা ছিলেন ক্যান?
: আমার জিনিসগুলো খুঁজে পাচ্ছি না, কোথায় রেখেছি তা মনে করার চেষ্টা করছিলাম।
: তা তো বুঝলাম, কিন্তু আপনের ঝুইল্লা থাকার কারণ কী? উল্টা হইয়া ঝুইল্লা কী খুঁজতাছেন?
: সব উল্টো মানুষ, উল্টো মানুষকে বোঝার জন্যই উল্টো হয়েই ঝুলে ছিলাম, আর উল্টো হয়ে জিনিস খোঁজা যায় না, স্মরণ করা যায়।
: আপনে কী খুঁজেন? ওইগুলা খুঁজার সময় আমার সিন্দুকটাও একটু দেইখেন।
: আমি খুঁজি চেয়ার, সাইন পেন, বই; কোথায় যে রেখেছি কিছুই মনে পড়ে না।
: এইগুলা কি খুঁজার জিনিস হইল? আমার সিন্দুকটা দেখছেন?
: বললাম তো আপনার সিন্দুক আপনার আশেপাশেই আছে।
: ধুর মিয়া, পাগলামি ছাড়েন, আজাইরা কথা, আপনি ঝুইল্লা থাকেন, বালের বই না চেয়ার খুঁজতাছেন, ওইটা খুঁজতে থাকেন, আমি গেলাম।

আহ্, কী শান্তি, লোকটা তবে চলে গেছে, ওহ্, আমি যেন কোন বইটা খুঁজছি? Das Kapital? না, না, আমি এই বই খুঁজতে যাব কেন? আমি যেটা লিখেছি সেটা খুঁজছি, সেটার নাম কি ‘মাইক্রো ব্যাংক’? এমন কিছুই হবে, আমি নিশ্চিত ‘মাইক্রো’ শব্দটা ছিল; এই বইটা আমি নিজেই লিখেছি, যদিও বাকিগুলো নিজে লিখিনি, কাকে দিয়ে যেন লিখিয়েছি, অবশ্য মোটা অংকের অর্থ নিয়েছে লোকটা, আমার বইয়ের কোন লাইনটা যেন বিখ্যাত হয়েছে? Dream is not that which you see while sleeping, it is something that does not let you sleep, এটা? না, না, এই স্বপ্ন-টপ্ন না; আমার কোটেশনে poverty, poor এই শব্দগুলো ছিল; থাক, কষ্ট করে আর মনে করতে চাচ্ছি না, আমি বরং সাইন পেন ও চেয়ার খুঁজতে বের হই, যদিও রাস্তাঘাট তেমন চিনি না, এই অগাস্টে আমার মৃত্যু হয়েছে; অবশ্য আমিও কম কী, এই জুনে একটা ফেউকে যমের ঘরে পাঠিয়েছি, কিন্তু কাজটা আমার করতে হয়নি, বেটা আমার বিরুদ্ধে নিউজ করে, আমার বইয়ের আসল লেখক কে, দেশি-বিদেশি কোন কোন সংস্থার সাথে আমার যোগাযোগ আছে, আমি কার হয়ে কাজ করি; কে কার এজেন্ট, ঋণ খেলাপি, রিজার্ভ চুরি, শেয়ার বাজার, অর্থ পাচার, এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে, কিন্তু আমার এই সুখ-স্বাছন্দ্য, এই ভালোমানুষি, এই জনপ্রিয়তাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারি না; তাই বেটাকে উচিত শিক্ষা দিয়েছি; কিন্তু আমিও টিকতে পারিনি; ওই দিনের ব্যাপারটা আজও বুঝতে পারি না; লেট নাইট পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরছি; রাস্তায় লোকজন নেই, পাঁচ নম্বর রোডের মোড়ে আমার গাড়ি থেমে গেল, একটা মাইক্রোবাস রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে, আমার ড্রাইভার একটা হর্ন দিয়েছে কী দেয়নি, অমনি দৌড়ে এলো ওরা, আমি শুধু কালো কালো মুখোশ দেখতে পেয়েছি, সে কী কোপ, আমার ঘাড় থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত...;

উফ, আর মনে করতে চাই না, আর ভালো লাগছে না, এই ম্যানহোলে থাকতে থাকতে মনটা কেমন হয়ে যাচ্ছে; যাই, বাহির থেকে ঘুরে আসি; দেখি জিনিসগুলো খুঁজে পাই কিনা; ফেরার পথে পুরনো জাদুঘরে যে লোকটা থাকে তার সাথে আলাপ করে আসব নে; লোকটা সারাদিন লেখালেখি করে; যাই, দেখি আসি একটু—
: কেমন আছেন আপনি?
: ওহ্, আপনি, আমি ভালো আছি, আপনি?
: ভালো আছি, কিন্তু জিনিসগুলো খুঁজে পাচ্ছি না, বইয়ের নামটাও মনে করতে পারছি না।
: আমিও লিখতে পারছি না, সাদা মেঘের সাক্ষাৎ পাচ্ছি না, কালো মেঘে লিস্ট করে লাভ নেই, কারো চোখে পড়ে না।
: কেন চোখে পড়ে না? কেন?
: খুব সোজা, কালো কালোকে খেয়ে ফেলে, তাই কেউ দেখতে পায় না, আপনারা সাদা মেঘে যা দেখেন তা কালো মেঘের তুলনায় এক আনাও না।
: কী বলেন, সাংঘাতিক ব্যাপার, আচ্ছা আর বিরক্ত না করি, আপনি সাদা মেঘ খুঁজতে থাকেন, আমি তবে চলি।

এই লোকটা সারাদিন উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে, সাইন পেন খুঁজে, চেয়ার খুঁজে, কী এক বই খুঁজে, কিন্তু বইয়ের নাম জানে না; পাগল ছাগল সব, অবশ্য এই লোকটা জানে না যে, এখানে আমার বউও থাকে; আমরা বউ-জামাই ভালোই আছি; অহ্, আমাদের পরিচয় তো দেওয়া হয়নি; এই জুনে আমাদের মৃত্যু হয়েছে, যদিও অন্য একজনের মৃত্যুর সাথে আমি জড়িত ছিলাম; অবশ্য আমি নিজে কিছুই করিনি, ওপর থেকে আমাকে মোটা অংক দিয়ে বলে, ‘আমরা যেইভাবে বলি সেইভাবে শুধু রিপোর্টটা করবেন।’ আমিও বুদ্ধি-পরামর্শ দেই আর রিপোর্ট করি অনেক দিন; থাক, এসব আর মনে করে লাভ নেই; যা বলছিলাম, সেদিন গভীর রাতে...; না, আর মনে করতে চাই না, বউ পারলে বাকিটুকু তুমি বলো, দেখি সাদা মেঘের সন্ধান পাই কিনা।
: তুমি যে কিনা, এসব রক্তারক্তির কথা বলতে আমারও ভালো লাগে না।
: আরে বলো, তুমি আমার চেয়ে সাহসী, আমি তো মুরগি কাটা দেখলেও ভয় পেতাম।
: কী যে বলো, তোমার চেয়ে সাহসী কে ছিল শুনি?
: আমি যাচ্ছি কিন্তু।
: আচ্ছা যাও।

আমার জামাই বড্ড ছেলে মানুষ, উন্মাদও বলতে পারেন; যে কথা বলছিলাম, সেদিন রাতে কী হয়েছিল ঠিকঠাক বলতে পারব না; শুধু এটুকু মনে পড়ে, আমার চোখের সামনে আমার জামাইকে জবাই করে ফেলে; সে কী রক্ত, রক্তের সমুদ্র, ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে ল্যাপটপ কোথায়; ওই ল্যাপটপেই ছিল মুখোশ আর ছায়াদের লিস্ট, তারপর আমার গলায়ও; উফ, কালো কালো মুখোশ, আর বলতে পারব না, কিন্তু আমাদের চার বছরের বাবুটা কোথায়? যাই, একটু খুঁজে আসি, ফেরার পথে ওই মহিলার বাবুর গল্প শুনে আসব, ওই মহিলার বাবুও নাকি হারিয়ে গেছে, যাই তবে।
: আপা, কেমন আছেন? আপনার বাবুকে খুঁজে পেয়েছেন?
: খুঁজে পাইলে তো দেখতেনই, আপনে পাইছেন সাদা মেঘ? আপনার বাবুরে পাইছেন?
: মেঘ খুঁজে পেলে কি আপনার কাছে এসেছি, এতক্ষণে লিস্ট করতে বসে যেতাম।
: এইসব বাদ দিয়া ভালো করে বাবুরে খুঁজেন, এইসব মেঘটেক খুঁজে লাভ নাই।
: এই কারণেই আপনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, আপনি থাকেন, আমি গেলাম।
: এত গরম দেখায়েন না, বাবুরে খুঁজতাছি, আপনার বাবুরে পাইলে জানাব নে।
: তার আর দরকার নেই, আপনি নিজেরটাকে খুঁজেন, যত্তসব।

এই মহিলার কথার ধরন ভালো না, একটু যে আলাপ করব সেই সুযোগ নাই, খালি সাদা মেঘ খুঁজে; বাবুরে খুঁজলেও তো পারে, আমার বাবুটা যে কোথায় আছে, এই এপ্রিলে আমরা জামাই-বউ মারা যাই, সেই দিনের কথা মনে হলে... না, আমি বলতে পারব না, কলিজা ফেটে যায়; এই যে জামাই, পারলে আপনি বলেন।
: বউ, তুমিই কও, আমি বস্তাগুলা খুঁইজা পাইতাছি না।
: সারাদিন বস্তা খুঁজার দরকার নাই।
: তাইলে কী তোমার গহনার বাক্স খুঁজতাম?
: সব খুঁজবা, আমার গহনার বাক্স খুঁজবা, তোমার বস্তা খুঁজবা, আমাদের বাবুরেও খুঁজবা।

আমার বউ পাগল কিসিমের হইলেও দিলটা সাচ্চা, সে যেহেতু কইতাছে তাইলে ওই দিনের ঘটনাটা কই; তার আগে আমাদের পরিচয়টা দিয়া লই; আমি তরুণ চেয়ারম্যান, প্রথম ইলেকশনেই বিপুল ভোটে পাস করছি, আর আমার বউ হেড মাস্টারনি; আমাদের কথা শোনার আগে আমি যে কাজটা করছি তার কথা একটু কই; এই কথাটা কেউ জানে না, আমার বাড়িতে যে মেয়েটা কাজ করত, একদিন...; থাক, কইয়া কী লাভ, জীবনে ইট-বালু-টিন-চাইল-গম কম খাই নাই; যা কইতেছিলাম, ওইদিন রাতের বেলা আমার দরজায় আইসা কে জানি ফিসফিস কইরা কয়, ‘চেয়ারম্যান সাব, ও চেয়ারম্যান সাব, দরজাটা খুলেন, কথা আছে, দরজাটা খুলেন।’ বউ না করে, কিন্তু আমি যন্ত্রটা হাতে নিয়া দরজাটা খুলি; সাথে সাথে আমারে জাপ্টায়া ধরে, খালি কালা কালা মুখোশ; ওরা ঘরের চালে, ঘরের ভিতরে, আমগোর গায়ে, বিছানায় কেরোসিন ঢাইল্যা দেয়, তারপর...
: বউ, আর পারতেছি না, বাকিটুকু তুমি কও।

এই জামাই নিয়া আর পারতেছি না, তারপর আমাদের হাত-পাও-মুখ বেঁধে আগুন লাগায়া দেয়, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে, আমরা পুড়ে কয়লা হয়ে যাই; পরে মামলা হয়, কিন্তু সবচেয়ে বড় পত্রিকায় খবর আসতে থাকে, এটা নাকি দুর্ঘটনা।

এখন আমরা চুঙ্গির ভিতরে থাকি, অন্ধকার হলে বাবুরে খুঁজি, আগুন লাগার সময় বাবুর কথা মনে ছিল না, কোথায় যে আছে বাবুটা; অবশ্য এখানেও একটা মেয়ে আছে, ওকে দেখলে মনটা ভালো হয়ে যায়, মেয়েটা সারাদিন ‘বাবু, বাবু’ করে, যাই, ওকে দেখে আসি।
: এই যে, এই মেয়ে, কী করতেছো?
: আপনে, এই অসময়ে, একটু পরেই তো আজান দিয়া দিব, রাইত তো বেশি নাই।
: তুমি চিন্তা করো না, এখনো কিছুটা সময় বাকি আছে, তুমি কী করছিলা?
: জানেন কী হইছে; এইদিক দিয়া একটা বাবু গেছে, আপনে যুদি দেখতাইন, সাদা ফকফকা, তুলতুলা।
: কী বলো, আমার বাবু নাতো?
: না, আপনের বাবু আইবো কইথ্যে; মনে হইছে এইটা আমার বাবু।
: কী বলো, তোমার বাবু হবে কেমনে? তোমার তো বিয়েই হয় নাই, বিয়ে না হলে বাবু হয় না।
: হ, মইরা গিয়া কী যে বিপদে পড়ছি, বাবুর সখ আর মিটল না।
: সবই কপাল, বুঝছো; আচ্ছা বাদ দেও, এখন তোমার কথা বলো, তুমি না তোমার কথা বলতে চাইছিলা।
: কিন্তু আইজকা তো সময় নাই, এট্টু পরেই তো আজান দিয়া দিব।
: তুমি তাড়াতাড়ি বলবা, এখনো সময় বাকি আছে।
: আইচ্ছা, তাইলে হুনেন, ছুডু কইরা কইতাছি।

চেয়ারম্যান সাবের লগে কাম করতে গিয়া আব্বা গেছে মইরা, ইটের ভাটায় পুইড়া কয়লা হইয়া গেছে; ছুডু ভাইডাও শহরে যাওনের এক বছরের মইধ্যে উধাও হইয়া গেছে; বাজারের মাইনষে কয়, পত্রিকায়, টিভিতে নাকি ভাইরে দেখাইছে; সোনার টুকরার ভাই আমার কী জানি করছে, এর কয়দিন পর থেইকা ভাইডার কুনু খবর পাই নাই; আব্বা কত কষ্ট কইরা বাজার থেইকা চান্দা তুইল্লা ভাইডারে এঞ্জিনেয়ার বানানোর লাইগ্যা...; বা, আর কইতে পারতাম না গো; কইল্যাডা পুইড়া যা; আব্বা মরার পরে আমরা তিন বোইন রোগা মারে লইয়া ভরা গাঙে পইড়া গেলাম, আমি সবার বড়, ছুডু বোইনগুলা খালি কান্দে, ঘরে খাওন-পানি কিচ্ছু নাই, না খায়া মইরা যাবার অবস্থা, তহন চেয়ারম্যান সাব আমারে তার বাড়িতে কামের ব্যবস্থা কইরা দিল, সুখে-শান্তিতে যাইতাছিল, চেয়ারম্যান সাব ও তার বউ আমারে ভাত-কাপড়ের কষ্ট দেয় নাই কুনুদিন; তাগোর একটা বাবু, চাইর বছর বয়স, হেরে নিয়াই আমার সময় চইল্লা যাইত, একদিন চেয়ারম্যান সাবের বউ বাসায় নাই, হেড মাস্টারনি আছিল তো, টেডিং করতে নাকি বাপের বাড়ি গেছিল মনে নাই; ম্যাডাম আমারে সব বোঝায়া দিয়া গেছে, আমি ঘরদোর পরিষ্কার করি, রান্নাবান্না করি, বাবুরে গোসল করাই, খাওয়াই, চেয়ারম্যান সাবও তাড়াতাড়ি বাড়িতে আইয়ে; কুনু অসুবিধা হয় না, আমি এটা-সেটা করে দেই, চা বানায়া দেই, লোকজন আইলে সমাদর করি, চেয়ারম্যান সাব আমারে কয় মাংস ভুনা কর, আমি বাটা মরিচ দিয়া ঝাল ঝাল কইরা মাংস ভুনা করি, কী যে মজা, জীবনে এত মাংস খাই নাই, কিন্তু শরমের কথা কী কইতাম, আর এখন তো আমার লাজ-সরম কিচ্ছু নাই, ওইদিন রাতের বেলা বাবু ঘুমাইয়া গেলে চেয়ারম্যান সাব আমারে কয় ‘আমার মাথা ব্যথা করতাছে, একটু টিইপ্পা দে;’ চেয়ারম্যান সাবেরে আমি পিরের মতো মানি, উনি কত কী কিইন্না দেয় আমারে, পরে ওনার মাথা টিইপ্পা দেই, পরে, চেয়ারম্যান সাব...;
: এই মেয়ে তোমার গল্প বন্ধ করো, ভালো লাগতাছে না আমার।
: ক্যান? কী হইছে? আর শুনবেন না? আপনেই তো শুনতে চাইলেন।
: না, আজ আর না, আজান দিয়ে দিবে, আমি এখন যাই।

বুঝলাম না কিচ্ছু, বেডি এত চেইত্তা গেল ক্যান, নিজেই হুনতে চাইলো আবার নিজেই ছ্যাং ছ্যাং শুরু করল; তয় আমিও হার মানুইন্না ছেড়ি না, আজ আমি কইয়ামই, আজান দেয়ার আগ পর্যন্ত কইয়াম; পরে, হুনেন, কী হইল, দুই তিনের মইধ্যে আমি যেন চেয়ারম্যান বাড়ির ম্যাডাম হইয়া গেলাম, ম্যাডাম যেইদিন বাসায় ফিইরা আইলো তার আগের রাইতে চেয়ারম্যান সাব আমারে কইলো, ‘কন্ডম দিয়া মজা পাই নারে, তোর মাসিক হইব কবে?’ আমি কই, ‘স্যার, কয়েকদিনের মইধ্যে হইব।’ আমার স্পষ্ট মনে আছে উনি বিরাট খুশি হইয়া কইছিলেন, ‘যা শালা, তাইলে তো সেইফ পিরিয়ড’, পরে কন্ডম ছাড়াই সব হইল, কিন্তু দুই মাস যাবত আমার মাসিক বন্ধ থাকলে একদিন সুযোগ বুইজ্জা চেয়াম্যান সাবেরে কথাটা কই, উনি কন, হাসপাতালে নিয়া যাইব, কিন্তু আমি হাসপাতালে যাইতাম ক্যায়া, আমি কান্দাকাটি করি, উনি আমার পায়ে পড়ে, কয় ‘আমারে বাঁচা, পুরা দেশের মানুষ জাইন্না যাইব’; কিন্তু গরিবের মাইয়া হইলেও আমার জেদ কম না, আমি মানতে চাই না, আমার পেটে বাচ্চা, তারে আমি খুন করতে পারি না, আমি কই ম্যাডামরে কইয়া দিমু, পরে আমার জীবনে আইলো ওইদিন; ম্যাডাম বাসায় আছিল না; খালি এইটুকুন মনে পড়ে, কালা মুখোশ, কালা, বাতরুম রক্তে জ্বলিতলি হইয়া গেল, আষাঢ় মাসের গাঙের মতো হইয়া গেল, আমার পনেরো বছরের শরীলডা হাজার হাজার টুকরো হইয়া গেল, হেই টুকরাগুলো টয়লেটে ফালায়া পানির পর পানি দিলো, পানির ধাক্কাতে এক সময় আমার ছুডু শরীরডা নাই হইয়া গেল; আরো মনে করতে পারি, কে জানি আমার নাকেমুখে বালিশ দিয়া চাপা দিয়া ধরছিল।

ওই যে আজান দিয়া দিল; কিছুক্ষণের মইধ্যে ফকফকা হইয়া যাইব সব; কিন্তু যাইবার আগে কইয়া যাই, যতটুকুন মনে পড়ে, জানুয়ারি নাকি ফেব্রুয়ারিতে আমার মৃত্যু হইছে; অহন আমি একটা ভাঙা কব্বরে থাকি, হেই কব্বরে হুইয়াও শব্দ পাই; ওই যে শব্দ হইতাছে; ক্যাডা যায়? কারা যায়? কিসের গন্ধ আইতাছে? কালা কালা মুখোশের নাকি? দেহি তো এট্টু, হ, ওই তো কালা কালা মুখোশ যাইতাছে, ওরা কারে ধইরা লইয়া যাইতাছে? আমার বাবুরে? নাকি ছুডু ভাইডারে লইয়া যাইতেছে?

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;