সে ছাইয়ে শেলির আগুনের ফুলকি নিই

হাসেমুজ্জামান হাশিম
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঠকতে আমার বেশ লাগে

আমি বড্ড ভালোবাসি কাদার নিখাদ গন্ধ
আতরের গন্ধ নাকে কড়া
ধক লাগে—
চকচকে খোলের ভেতর যে আঁধার আছে
তাকে আমি ঢের ডরাই...
একদম ভেতরে যে বিষ আছে
সে বিষ পান করে আমি আধমরা ধেড়ে ইঁদুরের
মতো লেজ নাড়াই
নয়নে যে নরকের আগুন আছে
সে আগুনে জ্বলন্ত সিগারেটের মতো পুড়ে পুড়ে
আমি এক ছাইদানি ঝুরঝুরে ছাই হয়ে যাই—সে ছাইয়ে
শেলির আগুনের ফুলকি নিই—যা সবকিছু জ্বালিয়ে দেবে;
আমি বরং—
কালো আবরণের ভেতর হীরের যে ঝলক আছে
তাকেই ভালোবাসি অন্তঃকরণে...
তোমরা যাদেরকে “জারজ” সন্তান বলো
তাদের বিরাট দিল, অদম্য সাহস আর অকৃত্রিম
চাহনি আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে,
দমবন্ধ দামি ফ্ল্যাটের ভেতর যে নিষ্ঠুর ককানোর
আওয়াজ শোনা যায়, তা নিষিদ্ধপল্লীর ভাঙা ঘরের
ভাঙা জানাল দিয়ে প্রবেশ করা
দখিনা পাগলা হাওয়ার আলতো ছোঁয়ায়
কখনো কখনো শান্ত হয়ে যায়,
মনে হয়, এখানকার বাসিন্দাদের ভেতরটা
এমনিতেই পবিত্র—
গঙ্গা স্নানের প্রয়োজন পড়ে না;
তোমরা যাদেরকে “তৃতীয়” লিঙ্গের মানুষ বলো
আমি তাদেরকে বলি মানুষ—খাঁটি মাটির মানুষ
তাদের সাথে সময় কাটাতে আমার খারাপ লাগে না—
তোমরা কোকিলকে ভালোবাসো—ভালোবাসো
তার কুহু কুহু গান
আমি ভালোবাসি কাককে—বলতে পারো তার
করুণ কা-কা সঙ্গীতকেও
কারণ, সে ছলচাতুরী করে না,
কাউকে ঠকায়ও না—বরং নিরন্তর ঠকে ঠকে যায়,
ঠকে ঠকে তোমাদের জিতিয়ে দিতে
আমার বেশ আরাম লাগে;

আমি ব্রাহ্মণ নই—আমি নমঃশূদ্র
আমি আশরাফ নই—আমি আতরাফ
আমাকে তোমরা কোল অথবা কৈবর্তও বলতে পারো,
আমি প্রাশ্চাত্য নই—আমি নিরন্তর ঠকে ঠকে যাওয়া প্রাচ্য...

জীবন ও জীবিকা

মৃত্যু যেন নিপুণ এক নর্তকীর
মতো নৃত্য করছে—
চতুর্দিকে বিষাদ আর বিষাদ
অলিগলিতে লাশ আর লাশ—
বিমর্ষ অসহায় মানুষ ছুটছে আর ছুটছে...
ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো ছুটছে
আরেক জনও—নাম তার শিমুল
খুশির ঝিলিক যেন চিকচিক
করছে কপালে তার—
বিড়বিড় করে বলছে সে—
“হে মহামারি, তুমি দীর্ঘজীবী হও,
টার্গেটটা এবার পূরণ হবে,”
দারুণ কাটতি তার কোম্পানির ঔষধ—
খুশিতে গদগদ-চাকরিটা তার
এবার বুঝি স্থায়ী হবে...
নিরন্তর দুশ্চিন্তা তাকে
আর তাড়া করবে না;

গভীর রাতে ক্লান্ত শরীরে টিভির
খবর দ্যাখে সে—
মৃত্যুর মিছিল যেন থামে না—জোয়ারের
পানির মতো বাড়ছে—
ধনী খদ্দের দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়লে
যেমন করে কদর্য কশবী এক হাসে—
ঠিক তেমন করে সে হাসে—
ছোট বাচ্চাকে চুমু খায়—আদর করে...
মহামারির প্রকোপ একটু একটু করে
কমে যায়—
মুখখানি তার লাগাতার দরপড়া শেয়ারের
মালিকের মতো বিবর্ণ হয়ে যায়—
তার কাছে জীবন যেন এক
নড়বড়ে শেয়ার বাজার—
এই ওঠে—এই পড়ে...
পৃথিবীর একেকটি মানুষ যেন
একাধিক বাজে শেয়ারের
মালিক—অস্থির-অতন্দ্র এক আজব প্রাণী;
চিৎকার করে বলে সে—
“হে প্রিয় মহামারি অবিরাম চলতে থাকো,”

সহসা শীতল হাওয়া তার পরিপাটি করে
আঁচড়ানো চুলে চুমু দিয়ে যায়—
ভেসে ওঠে মনের আয়নায় তার
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্ষুধার্ত পথশিশুদের
পেট ভরে খাওয়ানোর এক টুকরো ছবি
শরম লাগে তার-চমকে ওঠে সে—
ছোট বাবুটিকে জড়িয়ে ধরে
বুকে-গায়ে প্রচণ্ড জ্বর—
খুস খুস করে কাশছে সে
“বেঁচে নেই”—দুঃখিত ডাক্তার বলে
বজ্রাহতের মতো চিৎকার করে ওঠে সে—
“হে নিষ্ঠুর দানব মহামারি,
তুমি দূর হলে না কেন?”