ভবিষ্যতে কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব নির্ভরতা



প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাইরাস হচ্ছে আবরণ বিশিষ্ট জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালের মাইক্রোস্কপিক প্যাকেজ। জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালটি ডিএনএ বা আরএনএ (DNA or RNA) যে কোন একটি হতে পারে। করোনাভাইরাস হচ্ছে RNA (Ribonucleic acid) ভাইরাস পরিবার। করোনাভাইরাসের ভিতরের অংশে RNA থাকে ও বাহিরের আবরণে স্পাইক প্রোটিনগুলো একত্রিত হয়ে মুকুটের মত দেখায় (তথ্য সূত্রঃ এডভ্যান্সেস ইন ভাইরাস রিসার্চ জার্নাল)। করোনাভাইরাস মানুষের শ্বসনতন্ত্রে (নাক, গলা, ফুসফুস ইত্যাদি) সংক্রমণ করে।

চারটি করোনাভাইরাস, 229E, OC43, NL63 এবং HKU1, মানুষের শ্বসনতন্ত্রের উচ্চাংশে (নাক, কান, গলা) মৃদু থেকে মাঝারি সংক্রমণ করে; অন্য তিনটি করোনাভাইরাস, SARS-CoV-1, MERS-CoV ও সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির জন্য দায়ী ভাইরাস SARS-COV-2 (severe acute respiratory syndrome coronavirus-2) মানুষের মারাত্মক অসুস্থতার কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে (তথ্য সূত্র: দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন )।

ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০২-২০০৩ সালের মহামারির জন্য দায়ী ভাইরাস SARS-CoV-1 ও ২০১৯-২০২০ সালের মহামারি কোভিড-১৯ এর ভাইরাস SARS-COV-2 এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ জেনেটিক সম্পর্ক আছে। উভয় ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল বাদুড়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই দুইটি করোনাভাইরাস বাদুড় থেকে প্রথমে প্রাণীকে আক্রান্ত করে ‘‘প্রাণী মাধ্যমে’’ মানুষকে সংক্রমিত করেছে।


আরো পড়ুন ➥কোভিড-১৯ রোগীর জটিল অবস্থার সম্ভাবনা


ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্স-কোভ-১ নামক করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৫০ জনের অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং ৮ হাজারের অধিক মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর ১৮ নভেম্বর, ২০২০ তারিখ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলমান মারাত্মক সংক্রমক সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের কারণে বিশ্বে ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ কোটি ৬২ লক্ষ ৪৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা ১৩ লক্ষ ৪৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

৩০ মার্চ, ২০২০ তারিখের বিশ্বখ্যাত ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, সার্স-কোভ-১ ও সার্স-কোভ-২ উভয় ভাইরাসই তাদের রিসেপটর-বাইন্ডিং ডোমেন এর মাধ্যমে মানুষের কোষের একই রিসেপটর এনজিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম ২ (এসিই ২) তে সংযুক্ত হয়। এসিই ২-তে সংযুক্ত হওয়ার জন্য উভয় ভাইরাসের রিসেপটর-বাইন্ডিং ডোমেনে স্পাইক প্রোটিনের দুইটি হটস্পটস, হটস্পট-৩১ ও হটস্পট-৩৫৩ আছে। কিন্তু উভয় ভাইরাসের রিসেপটর-বাইন্ডিং ডোমেনের হটস্পটগুলির গঠনে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায়, সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের দুইটি হটস্পটস, সার্স-কোভ এর দুইটি হটস্পটস এর তুলনায় মানুষের শ্বাসতন্ত্রের এসিই ২ রিসেপটরের সঙ্গে বন্ধনে অধিক স্থিতিশীল ও নিবিড়। ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী সার্স-কোভ-২ করোনাভাইরাসের রিসেপটর-বাইন্ডিং ডোমেনের হটস্পটগুলোর স্পাইক প্রোটিন সার্স-কোভ-১ এর থেকে ভিন্ন গাঠনিক বৈশিস্টের কারণে সার্স-কোভ-২ মানুষের কোষের এসিই-২’কে তীব্রভাবে আকর্ষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তীব্র সংক্রমণ ও দ্রুত বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

যখন বহিরাগত আক্রমণকারী যেমন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে প্রবেশ করে, দেহের লিম্ফোসাইটস নামক ইমিউন কোষগুলো অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে সাড়া দেয়। অ্যান্টিবডি (Immunoglobulin G বা IgG) হচ্ছে প্রোটিন। এই অ্যান্টিবডি গুলো বহিরাগত আক্রমণকারীর (এন্টিজেন অর্থাৎ ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া) সাথে লড়াই করে এবং দেহকে অতিরিক্ত সংক্রমণের থেকে রক্ষার চেষ্টা করে।

করোনাভাইরাস, HCoV-OC43 ও HCoV-HKU1 এর সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি র ফলে গঠিত দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা চল্লিশ সপ্তাহ টেকসই (তথ্যসূত্রঃ এপিডিমিয়োলজি এন্ড ইনফেকশন জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ); অন্যদিকে, ইমারজিং ইংফেক্সাস ডিজিজেস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০০২-২০০৩ সালে সংগঠিত মহামারির জন্য দায়ী করোনাভাইরাস SARS-CoV-1 এর সংক্রমণের ফলে মানবদেহে গঠিত নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি উক্ত ভাইরাসের ক্ষেত্রে গড়ে দুই বছর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রেখেছিল।

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানিয়েছে, ‘কোভিড-১৯ এর মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধ রেসপন্স/সাড়ার স্থিতিকাল এখন পর্যন্ত অজানা।’ সিডিসি ব্যাখ্যা করেন, Middle East respiratory syndrome-CoV/MERS-CoV সংক্রমণ আরোগ্যলাভকারী ব্যক্তিকে শীগগির পুনঃসংক্রমিত করে নাই, কিন্তু কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে একই রোগ প্রতিরোধ সুরক্ষা দেখা যাবে কিনা তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

১৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বিশ্বখ্যাত ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী, কোভিড-১৯ রোগের সংক্রমণের ফ্যাক্টরগুলো বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে রোগের সংক্রমণের প্রোজেক্টিং করা হয়েছে। উক্ত গবেষণায় বিবেচিত মূল ফ্যাক্টরগুলো হলো— ঋতুর ভিন্নতায় সংক্রমণের মাত্রা, দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্থিতিকাল এবং সার্স-কোভ-২ ও অন্যান্ন করোনাভাইরাসের মধ্যে দেহে ক্রস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা।


আরো পড়ুন ➥কোভিড-১৯ বনাম ফ্লু


বেইজিং এর চায়না জাপান ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালের নিউমোনিয়া প্রিভেনশন এন্ড ট্রিটমেন্টের ডাইরেক্টর লি এর ভাষ্যমতে, যারা কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, তাঁদের দেহে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি উদ্দীপিত হয়েছে (সূত্র: যুক্তরাজ্য ভিত্তিক নিউজ পেপার ইনডিপেন্ডেন্ট)। ভাইরোলোজিস্ট ড. ভিনেট মেনাচেরি প্রাক্কলন করেন, কোভিড-১৯ স্পেসিফিক অ্যান্টিবডি দুই থেকে তিন বছর আরোগ্যলাভকারীর ব্যক্তির দৈহিক তন্ত্রে থাকবে। তবে তিনি বলেন, নিশ্চিত হতে আরোও সময় প্রয়োজন।

১৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বিশ্বখ্যাত ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে কোভিড-১৯ রোগ বার্ষিক (প্রতি বছর), দ্বিবার্ষিক (দুই বছরে একবার) বা বিক্ষিপ্তভাবে সংক্রমণ ঘটানোর সম্ভাবনা আছে। যদি এই ভাইরাসটি মানবদেহে HCoV-OC43 ও HCoV-HKU1 করোনাভাইরাস দুইটির মত স্বল্প সময়ের (৪০ সপ্তাহ) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে তবে প্রতি বছর কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে এবং SARS-CoV-1 করোনাভাইরাসের মত দুই বছর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে তবে দ্বিবার্ষিক ভাবে কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। ১৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বিশ্বখ্যাত ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব চূড়ান্তভাবে (crucially) নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ভাইরাসের কারণে মানবদেহে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্থিতিকালের উপর।

 

ড. মু. আলী আসগর: প্রফেসর, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়