কাদের স্বার্থে, মদতে শান্তি ও সম্প্রীতির পাহাড়ে চলছে সন্ত্রাসবাদ?



আবুল খায়ের মোহাম্মদ
কাদের স্বার্থে, মদতে শান্তি ও সম্প্রীতির পাহাড়ে চলছে সন্ত্রাসবাদ?

কাদের স্বার্থে, মদতে শান্তি ও সম্প্রীতির পাহাড়ে চলছে সন্ত্রাসবাদ?

  • Font increase
  • Font Decrease

দুই যুগ আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাহানির অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান হয়ে এসেছিল শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের নতুন ভোর। তারপর আলোকোজ্জ্বল হয়েছে পশ্চাৎপদ পার্বত্যাঞ্চল। নবজীবনের স্বাদ পেয়েছে পাহাড়ে বসবাসকারী উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী।

কিন্তু অকস্মাৎ বান্দরবানের গহীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাদের স্বার্থে, কাদের মদদে শুরু হলো সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নাশকতা? অভিজ্ঞরা বলেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম হলো লাভজনক সন্ত্রাসবাদের ‘দোকান’। সেখানে সন্ত্রাসের নতুন সংজ্ঞার নাম 'পাহাড় দখল'। তারপর আন্তর্জাতিক মাফিয়া গোষ্ঠীর মদতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আফিম ও গাঁজার চাষ। দেশের হেরোইন রাজধানী হয়ে উঠেছে ভারত ও মায়ানমারের সীমান্তরেখা।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশের অপর পার্শ্বের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো মাদক তৈরির কারখানা, মানুষ ফসলের চাষবাস বন্ধ করে আফিম চাষ করছেন। মায়ানমার-চট্টগ্রাম সীমান্ত জুড়ে মাদক তৈরি সংগঠিত ‘শিল্প’, যা কুকিদের ব্যবহার করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মায়ানমার ও মিজ়োরাম থেকে কুকিরা নাগাড়ে ঢুকছেন মাদক আর অস্ত্র নিয়ে। আফিম চাষের পাশাপাশি উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েও মদত দিচ্ছে,সীমান্তের ও-পারের এজেন্টরা। যার ফলে নিরাপত্তার ক্ষতি হচ্ছে শান্ত পাহাড়ের এবং বিশেষভাবে বান্দরবানের।

সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক চিত্র পেতে তাকানো দরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে। বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় এক দশমাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই এলাকাটি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, ভাষাগত বৈচিত্র, তাদের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, প্রথাগত রীতিনীতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত সাজেক পর্যটন এলাকা, আলুটিলা, রাঙামাটি ঝুলন্ত ব্রীজ, বান্দরবান এর নীলগিরি, বগালেক ও তাজিংডং পাহাড় এর মত উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান এই অঞ্চলেই অবস্থিত বিধায় এই এলাকাটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত।

আরও পড়ুন: বান্দরবানে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উত্থান নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ

শান্তিচুক্তির পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা এই অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, খাদ্য সমস্যা, মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত স্থানীয় ব্যক্তিবর্গদের চিকিৎসা সেবা, দরিদ্র ব্যক্তিবর্গদের আর্থিক অনুদান প্রদান করে স্বাবলম্বী হতে সহযোগিতা করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা, দুর্গম এলাকায় পানির সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়দের কষ্ট লাঘবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা এবং বেকার ব্যক্তিবর্গের কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র কারখানা স্থাপন করে আসছে।

এছাড়া তিন পার্বত্য জেলার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকাকে নজরদারির আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের আহবানে সাড়া দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও উপজাতি সন্ত্রাসীদের প্রতিকূল অবস্থান মোকাবেলা করে সীমান্ত সড়ক নির্মাণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দায়িত্বপালন করছে।

দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের আত্মত্যাগের বিষয়টি আজ দেশে-বিদেশে প্রশংসিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগ ও কল্যাণকর কাজে ফলে পাহাড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য। এজন্য সেনাবাহিনী কঠোর ত্যাগ স্বীকার করে চলছে। উদাহরণ স্বরূপ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল খাগড়াছড়ি জেলার আলুটিলা পুনর্বাসন এলাকায় ১৬০টি পরিবারের ৪০০ জন ব্যক্তিবর্গ দীর্ঘদিন যাবৎ পানির সমস্যায় ভূগছিল। সেখানে ছিলনা কোন সুপেয় পানির উৎস। এই খবর জানার পরপরই ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের উদ্যোগে সেনাবাহিনী কর্তৃক ১০ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়। যা ৫০০ মিটার গভীর হতে মোটর এর মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করতঃ উক্ত পানির ট্যাংকে সংরক্ষিত হয় এবং সেখান থেকে স্থানীয়রা সুপেয় পানি সংগ্রহ করে। সেখানে এই প্রকল্প চালুর পর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানির সমস্যা সমাধান হওয়ায় সেনাবাহিনীর অনন্য ভূমিকায় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।

অতি সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গোলাবাড়ী ইউনিয়নের জংলীটিলা এলাকায় স্থানীয় পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পানির সমস্যা সমাধানে মহালছড়ি সেনা জোনের মাধ্যমে একটি সুপেয় পানির হাউজ নির্মাণ করা হয়। এতে ঐ এলাকার স্থানীয় জনগণ সেনাবাহিনীর মানবিক দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্ববোধ করছে।

পাহাড়ের অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে দ্রুত পৌঁছে দেন তারা। যে কোনো দুর্যোগে পাহাড়ি মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় তাদের। না এখানেই শেষ নয়, বেকার যুবকদের জন্য ব্যবস্থা করছেন কর্মসংস্থানের। রাত হলে উপজাতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কারণে ঘুমাতে পারেন না পাহাড়ি-বাঙালিরা। তাদের শান্তিতে ঘুমোনোর ব্যবস্থাও করছেন এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পাহাড়ি অঞ্চল- খাগড়াছড়ি, বান্দরবন এবং রাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর মানুষের পাশে থাকার কথা সর্বজনবিদিত। সামাজিক উন্নয়নে এই বাহিনীর ভূমিকা যেমন এখন দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত, তেমনি আস্থা অর্জন এবং সম্প্রীতি বজায়ে তিন পাহাড়ের সব ধর্মের মানুষের কাছে সেনাবাহিনী একটি নির্ভরতার প্রতীক। পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি এখন একটি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার হাজাপাড়া নামক দূর্গম পাহাড়ী এলাকায় মহামারি আকারে ডায়রিয়া আর অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিলো কিছু দিন আগে। ঐ সময়ে বেশ কিছু পাহাড়ী যুবক, বৃদ্ধা ও শিশু গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতি দ্রুত সেখানে ছুটে গিয়ে দূর্গম পাহাড়ী পথে কয়েক ঘন্টা হেটে হাতিরমাথা অতিক্রম করে হাজাপাড়া এলাকায় পৌছায়, সেখানে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প নির্মাণ করে ১৫০-১৬০ জন মহামারী আক্রান্ত রোগীদের পরম যত্নের সাথে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে। প্রখর রৌদ্র উপেক্ষা করে দূর্গম ঐ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশমাতৃকার সেবায় নিজেদের কষ্ট বিসর্জন দিয়ে বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসা সেবা এবং জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল।

করোনায় যখন সারাদেশের মানুষ নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই খাগড়াছড়ি, বান্দরবন এবং রাঙামাটির দুর্গম অঞ্চলের মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সেনাবাহিনী। কেবল তাই নয়, করোনা ছাড়াও রাত-বিরাতে অনেক মানুষ হাসপাতালে যেতে পারেন না। তাদেরকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এই বাহিনীর প্রতিটি চৌকষ সদস্য।

এই বাহিনীর আরও রয়েছে নানান ভূমিকা। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি তারা সেখানকার বসবাসরত লোকজনের জীবনমানোন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নমূলক প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ বছরে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের আওতাধীন তিন পার্বত্য জেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫০ হাজারের বেশি মানুষের ভেতর শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে। এছাড়াও অন্তত এক লাখ মানুষের মাঝে বিভিন্ন প্রকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও ২০ হাজার জনকে বিভিন্ন আর্থিক অনুদান প্রদান করেছে। নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে বিনামূল্যে চক্ষুশিবির।

এসব চক্ষুশিবিরে দুর্গম পার্বত্য এলাকার সুবিধাবঞ্চিত বয়োবৃদ্ধ পাহাড়ী ও বাঙালির চোখের ছানি অপারেশনসহ বিভিন্ন ধরনের চক্ষু সেবা প্রদান করা হয়।

ইতিপূর্বে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, রাঙামাটির সাজেক ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় হাম আক্রান্ত হয়ে বহু পাহাড়ী শিশু নিহত হবার ঘটেছে। এসব আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নিজেদের জীবন বাজি রেখে সুপেয় পানি সরবরাহ, খাবার ব্যবস্থা, অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প করে অসুস্থদের চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করে পাহাড়ে হাম আক্রান্ত পাহাড়ীদের জীবন বাঁচানোর মতো মানবিক কাজে সেনাবাহিনীর অবদানও কম নয়।

পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাস দমন, শান্তি রক্ষায় সেনাবাহিনী রয়েছে বদ্ধপরিকর। বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ের দূর্গম স্থানগুলোতে গর্ভবতী মুমূর্ষ নারীদের পাহাড়ী রাস্তায় কাঁঢ়ে করে এনে হেলিকপ্টার যোগে সিএমএইচ এ নিয়ে সন্তান প্রসবসহ সুস্থ করে তোলার নজিরও রয়েছে অহরহ।

দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় ২০২০ সালে ভাল্লুকের আক্রমণে গুরুতর আহত মঙ্গলিয় মুরং (০৬) ও তার দাদা ইয়াংসাই (৪৮) কে আশংকাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ নিয়ে চিকিৎসা সেবা ও এরপর ভাল্লুকের আক্রমনে আহত ত্রইল মুরং (৬৬) নামের আরো এক পাহাড়ীকে উদ্ধার করে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম সিএমএইচ এ নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলার একমাত্র প্রসংশার দাবীদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীই।

শিক্ষাবিস্তারে সেনাবাহিনী এর তত্ত্বাবধানে সর্বশেষ গত ৩ বছরে ২৫০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাহাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে। যেখান থেকে প্রচুর স্কুল শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায়ও এগিয়ে আছে সেনাবাহিনী। গত ৩ বছরে ২২০টির বেশি ধর্মীয় উপসনালয় গড়ে দিয়েছে তিন পাহাড়ি জেলায়। অবেহেলিত শিশুদের মানসিক বিকাশে তাদের রয়েছে সময়োপযুগী পদক্ষেপ। অনেক স্কুলে পড়ালেখার বই নেই। নেই উপকরণ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিভিন্ন প্রকার শিক্ষা উপকরণ, ছাত্রছাত্রীদের স্কুল ড্রেস ও খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ করে তারা মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের অবহেলিত মানুষদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সেনাবাহিনী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে কম্পিউটার ও সেলাই মেশিন বিতরণসহ ঐ বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রদান করছে তারা। এতে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ী-বাঙালি নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

দুর্গম পার্বত্য এলাকার জনগণের সুষ্ঠু বিনোদনের জন্য সেনাবাহিনী প্রতিবছর নানা দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। তাদের এসব কার্যক্রম মুক্তবুদ্ধি ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পথে পরিচালিত করছে। যা ইতিবাচক বলে মত দিয়েছেন দেশের আপামর জনগণ।

একসময় ভীষণ অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। ছিলনা শিক্ষার আলো। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের বা গুরুত্বর অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছিলনা। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ী সন্ত্রাসী দলগুলোর পাল্টা-পাল্টি হামলা ও খুনোখুনির কারণে ভয় নেমে আসতো সেখানকার বসবাসরত সাধারণ মানুয়ের ভেতর। সময় গড়িয়ে এখন বদলে গেছে এই পাহাড়ী জনপদ। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে হাতে নিয়েছেন নানান পরিকল্পনা।

আর সেই পরিকল্পনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে খাগড়াছড়ি, বান্দরবন ও রাঙামাটি জেলায়। যার ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে গুইমারা সেনা রিজিয়নের উদ্যোগে গুইমারা রিজিয়নের পুরাতন কমান্ডার বাংলোতে একটি কম্বল ও ব্যাগ ফ্যাক্টরি উদ্বোধন করা হয়। এতে ঐ এলাকার স্থানীয় জনগণের ক্ষুদ্র কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় বেশ কিছু বাঙালি ও পাহাড়ী ব্যক্তিবর্গ শ্রমিক হিসাবে নিয়োগ লাভ করায় তাদের পারিবারিক ভরণপোষণ ক্ষমতা ও স্বচ্ছলতা বৃদ্দি পেয়েছে। অনেকেই ভাবেননি এসব অঞ্চলে পানি আসবে, থাকবেনা বিদ্যুৎ সমস্যা। দুর্গম পাহাড়ী পথে ঘটবে উন্নয়ন, প্রান্তিক চাষিগণ প্রত্যন্ত এলাকা হতে বিভিন্ন উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও ফলফলাদি পরিবহণে সুবিধা প্রাপ্তি হয়ে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নে অবদান রাখবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুর্গম পাহাড়ে এখন জ্বলছে বিদ্যুতের আলো। রাস্তা করা হয়েছে প্রশস্ত। কোথাও পাকা সড়ক। বেড়েছে কৃষিকাজ। বেড়েছে চাষাবাদ। পর্যটন খাতেও উন্নতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেখানে বাড়ছে বিনিয়োগ। তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এখন চলছে উন্নয়নযজ্ঞ।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য তিন জেলাতে যোগাযোগের উপযোগী রাস্তা ছিল ২ হাজার ৮০৩ কিলোমিটার, বর্তমানে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত সড়ক যোগাযোগের পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৪৯ কিলোমিটার।

শান্তিচুক্তির পূর্বে তিন জেলায় হাসপাতাল-ক্লিনিক ছিল মাত্র ২৪টি, এখন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে ২৭০টির বেশি। যাত্রী ছাউনি ও ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে ২০টি। সীমান্তসড়ক নির্মাণেও ভূমিকা রয়েছে তাদের। এর সবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং বাঙালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকাগুলো ছিলো একসময় অরক্ষিত। বলা যায়, সন্ত্রাসী আর উগ্রবাদীদের অভয়ারণ্য। গোষ্ঠীগুলোর পরস্পরবিরোধী কার্যকলাপে প্রায়ই ঘটতো মৃত্যুর ঘটনা। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসে।

এরপরই সেখানে শান্তি ফেরানোর উদ্যোগ নেন তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয়েক দফা সংলাপের পর অনুষ্ঠিত হয় পার্বত্য শান্তিচুক্তি। যা ইতিহাসে ঠাঁই করে নেয় সফলতার সঙ্গে।

এই চুক্তির পরপরই কমে আসে পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। স্থানীয় সূত্র মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশের বসবাস তিন পার্বত্য জেলায়। সেনাবাহিনী দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই যেন এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেছে। তবে শান্তিচুক্তির পরও এখনও পাহাড়ে উগ্র উপজাতি গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে তৎপর রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি চার ভাগ হয়ে এখন প্রতিদিনই ঘটাচ্ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। তবে সেনাবাহিনীর কারণে সেখানে অনেক কমে আসছে এই ধরণের ঘটনা।

পাহাড়ে অনেক স্থান ছিলো অনুন্নত। পায়ে হেঁটে যাওয়ার কথা তো ভাবাই যায় না। অথচ সেনাবাহিনীর সদস্যরা পার্বত্যাঞ্চলে দিনরাত পরিশ্রম করে রাতারাতি সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন।

পাহাড়ে শান্তিকামী মানুষকে প্রায়শই বিচলিত দেখা যায়। উপজাতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। লুটপাট করে। পর্যটক অপহরণ করে নিয়ে যায়। চাঁদাবাজি তো আছেই। এসব অপকর্ম থেকে পাহাড়ের মানুষকে শান্তিতে রাখতে দিনরাত অতন্দ্র প্রহরী হয়ে কাজ করছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

স্থানীয় সূত্রমতে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানে একাধিক উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন রয়েছে। যাদের হাতে জিম্মি রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ।

শান্তিচুক্তির পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং ওয়ান এলিভেন সরকারের পর এ দুইটি সংগঠন থেকে আরও দুইটি উপজাতি সশস্ত্র সংগঠন সৃষ্টি হয়ে তারা বিভিন্ন নাশকতা ও সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে চাঁদাবাজি, অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়, হামলা ও পাল্টা হামলার মাধ্যমে নিজেদের এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। অথচ এসব উপজাতিগোষ্ঠী সেখানে উন্নয়ন কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট নামক উপজাতি সংগঠন মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা যখনই কোন ঘটনা ঘটার খবর পাচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে যাচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে নানা অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে রকেট লঞ্চার, ১৪-এমএম, এম-১৬, এসকে-৩২, সেনেভা-৮১, এম-৪ এবং এম-১ এর মতো ভয়াবহ অস্ত্র।

পার্বত্য এলাকা থেকে সেনাক্যাম্প অপসারণ না করার দাবি সেখানকার লাখো বাঙালির। এই দাবিতে একমত স্বয়ং পাহাড়িরাও। তারা বলেছেন, সেনাবাহিনীর তৎপরতার কারণে পাহাড়ের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুখী। কেননা পাহাড়ী-বাঙালি সবার জন্যই এই বাহিনীর সদস্যরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন খাত থেকে বছরে এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের আয় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। খাগড়াছড়িতে গত ২০ বছরে এমন সংঘাতে ৭শ’র বেশি খুন হয়েছে। এছাড়া রাঙামাটিতে গত ৫ বছরে মারা গেছে অন্তত ৪৫ জন।

২০১৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখ সোমবার রাত ১৩ তারিখ মঙ্গলবার ভোরে অতিবৃষ্টির ফলে রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে, সেখানে ব্যাপক প্রানহানি ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এদিন জেলার মানিকছড়িতে পাহাড় ধসে মাটি ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে রাঙ্গামাটি জোন সদরের নির্দেশে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর ১৬ জনের একটি দল ওই সড়কে চলাচল স্বাভাবিক করতে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।

উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালীন আনুমানিক বেলা ১১টায় পাশেই পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারীদলের সদস্যদের ওপর ধসে পড়ে। পাহাড় ধসের ফলে সেনবাহিনী সদস্যরা প্রায় ৩০ ফুট নিচে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক ও ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম শান্ত নিহত হয়েছেন। পরে এ ঘটনায় আরো ৩ সেনা সদস্যের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং ১০ সেনা সদস্য গুরুতর আহত হন।

বাকি নিহতরা হলেন কর্পোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক ও সৈনিক মো. শাহিন আলম ও সৈনিক মোঃ আজিজুর রহমান। পাহাড় ধসে উদ্ধারের বিষয়ে হয়তো তাদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না, কিন্তু দেশের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে নিজেদের কর্তব্য মনে করেই ওরা সেদিন এগিয়ে গিয়েছিল।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরাতে এসে আজ অবধি বহু সেনা সদস্য মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়ে, সাপের কামড়ে কিংবা বন্য জন্তুর আক্রমনে নিহত হয়েছেন। কেউ কেউ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর বেশকিছু সদস্য পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সশস্ত্র আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। বহু সেনা সদস্য আহত হয়েছেন।

সর্বোপরি, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষ তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের আপদে/বিপদে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে কোন না কোনভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে, এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে।

তারপরেও কাদের স্বার্থে, কাদের মদতে পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদ চলছে? এই প্রশ্নে সঠিক উত্তর পাহাড়ে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষকে জানতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদের নেপথ্য কারণ। এবং সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসের মূলোৎপাটন করে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে আর সুদৃঢ় করতে হবে জাতীয় নিরাপত্তা।

আবুল খায়ের মোহাম্মদ, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম

   

স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত

স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের শহিদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। আমাদের জন্যে দিবসটি আনন্দের নয়। আমাদের জন্যে দিবসটি উৎসব আর হৈচৈ-এর নয়। আমাদের জন্যে এ তারিখ শহিদদের স্মরণের মাধ্যমে অর্জনের পথনির্দেশকের। ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। আমরা যা রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছিলাম, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি, তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি ভালোবাসার এক নিদর্শন। আমরা এ তারিখকে ঘিরে উৎসব করতে পারি না, কিন্তু বাংলাদেশের বাংলাভাষী ছাড়া অন্যেরা সেটা হয়ত পারে, কারণ এর মাধ্যমে মায়ের ভাষার স্বীকৃতি বিশ্বজনীন হয়েছে। তারা স্মরণের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতে পারলেও আমাদের এ প্রকাশে সীমাবদ্ধতা আছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) স্বীকৃতিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে সারাবিশ্বে উদযাপনের প্রপঞ্চ, কিন্তু আমাদের কাছে এটা পরিপূর্ণভাবে উদযাপনের নয়। ধারাবাহিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ভাষার অধিকার আদায়ের দিন এটা। বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়ে আমরা কি তবে ভুলে যাব রক্তের কথা? রক্ত ভুলে স্রেফ বৈশ্বিক স্বীকৃতিতে চোখ কেন থাকবে আমাদের? সালাম, বরকতের রক্ত শুকিয়ে কি তবে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়? না, এটা হওয়ার কথা নয়!

এদিকে, বৈশ্বিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গও পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত হবে না আমাদের। রক্তে অর্জিত বিশ্ববাসীর মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের স্বীকৃতি-স্মারক এই একুশে ফেব্রুয়ারি—এই ভেবে আমরা গৌরবের অংশীদার হতে পারি কিন্তু ভুলে যেতে পারি না রক্তের কথা, আত্মত্যাগের ইতিহাস। অন্য ভাষাভাষীদের কাছে উদযাপনের হলেও, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে উৎসবের নয়। অন্যেরা উৎসব করতে পারে এখানে, কারণ তাদের মায়ের ভাষার অধিকারের স্বীকৃতি মিলেছে; তবে আমাদের কাছে স্মরণের, বিনত শ্রদ্ধার। আমরা রক্তের মাধ্যমে নিজেদের জন্যে অর্জন করেছি ভাষার অধিকার, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার; নিজের জন্যে, অন্য সকল ভাষাভাষীর জন্যে।

আমাদের বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি মাতৃভাষার স্মারকমূল্য পেয়েছে। ভাষা ও অধিকার এই দুয়ের সম্মিলনে বাংলা হয়েছে নেতৃত্বস্থানীয়। প্রচলন আর অনুশীলনে বাংলা ভাষা পৃথিবীর নেতৃত্বস্থানীয় ভাষা না হলেও মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে বাংলা ভাষা হয়েছে অগ্রগণ্য, এটা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে। বাংলা ভাষার সম্মানের এই স্বীকৃতি কেবলই বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে থাকেনি, এর বিস্তৃতি ঘটেছে সকল ভাষাভাষী মানুষদের মাঝেও।

বৈশ্বিক উপযোগিতা কিংবা ব্যবহারের প্রসঙ্গ এখানে না থাকলেও অনাগত দিনে পৃথিবীর একজন মানুষও কোনো একটা ভাষায় কথা বলতে চাইলে বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি তার জন্যে বর্ম হয়ে আছে। দুনিয়ার সকল দেশের সকল শাসক অন্তত একজন মানুষের হলেও স্বতন্ত্র সে মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইলে একুশের এই রক্ত, মাতৃভাষা দিবসের এই স্বীকৃতি জোরপূর্বক ভাষা-হরণের যেকোনো অপচেষ্টাকে রুখে দেবে।

ইউনেস্কোর মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির দিনটি এই সংস্থাভুক্ত সকল দেশ পালন করে থাকে। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায় করেছি সেই পাকিস্তানকেও বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারির অমর দিনটিকে পালন করতে হয়। পাকিস্তান তাদের মত করে দিনটি পালন করলেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপট, আন্দোলন, রক্ত আর আত্মদানের ইতিহাসকে অস্বীকারের উপায় নাই তাদেরও। এটা আমাদের অনন্য অর্জন।

ভাষাশহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—এ দুইকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়েও আমরা শহিদদের রক্ত, তাদের আত্মত্যাগ আর ভাষাসংগ্রামীদের স্মরণ করতে পারি। একুশের অমর গানেও আছে সে বার্তা; ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’।

বাঙালির কাছে একুশ অধিকার আদায়ের রক্তস্নাত দিন, বিশ্ববাসীর কাছে একুশ নিজের ভাষায় কথা বলতে পারার স্বীকৃতির দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষার স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি সে শিক্ষাই দেয় আমাদের।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। স্বীকৃতির উদযাপনে এখানে যেন রক্ত আড়ালে না পড়ে!

;

আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার স্তম্ভ হিসেবে বহুভাষিক শিক্ষার গুরুত্ব



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষা মানুষের পরিচয়ের একটি মৌলিক দিক, যা যোগাযোগ, অভিব্যক্তি এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণের বাহন হিসেবে কাজ করে। ভাষাগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং মাতৃভাষা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের জন্য একত্রিত হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সূচনা বাংলাদেশের দূরদর্শী উদ্যোগ থেকে উদ্ভূত, যা ভাষাগত বৈচিত্র্যের বৈশ্বিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো’র সাধারণ সম্মেলনে এই দিবসটি উদযাপনের অনুমোদন পায় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, প্রাথমিকভাবে ইউনেস্কো দ্বারা ঘোষিত এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত, অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অগ্রসর করার ক্ষেত্রে ভাষার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেয়। জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এ বছর (২০২৪) দিবসটির প্রতিপাদ্য বা থিম হলো, ‘বহুভাষিক শিক্ষা - শেখার এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি স্তম্ভ’ ("Multilingual education – a pillar of learning and intergenerational learning"), যা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অনুশীলনের প্রচার এবং আদিবাসী ভাষা রক্ষায় বহুভাষিক শিক্ষা নীতির সমালোচনামূলক গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শিকড় নিহিত একটি মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে যা ঘটেছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে, বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। সেদিন ছাত্ররা উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, বাংলাকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলে। বিক্ষোভ মারাত্মক রূপ নেয় যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনাটি, যা এখন ভাষা আন্দোলনের শহীদ দিবস নামে পরিচিত, ভাষাগত অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি তীব্র আন্দোলনের জন্ম দেয়।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রাম বেগবান হয়, অবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে অবদান রাখে। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে, ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে এবং বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা দেয়।

জাতিসংঘের মতে, বহুভাষিক এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজগুলো ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনগুলো প্রচার এবং সংরক্ষণে তাদের প্রাণবন্ততা এবং স্থিতিস্থাপকতার জন্য ভাষার মুখ্য ভূমিকার নিকট ঋণী। যাইহোক, ভাষাগত বৈচিত্র্যের জন্য অনেক ভাষায় এখন ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন। উদ্বেগজনক হারে অনেক ভাষায় এখন বিলুপ্তির পথে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ উদযাপনের থিমটি আজীবন শিক্ষা ও সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বহুভাষিক শিক্ষার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেয়। বহুভাষিক শিক্ষা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে একাধিক ভাষার ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই পদ্ধতিটি একটি সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মধ্যে ভাষার সমৃদ্ধ বর্ণালী স্বীকার করে এবং প্রতিটি ভাষার অন্তর্নিহিত মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়। একটি ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে, ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন করা, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

বহুভাষিক শিক্ষা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ঐতিহ্য, গল্প এবং মূল্যবোধ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রেরণের একটি বাহক হিসেবে কাজ করে। শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা কেবল একাডেমিক ধারণাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে উপলব্ধি করে না বরং ভাষার মধ্যে অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতাগুলিকেও আপ্ত করে। এটি নিশ্চিত করে যে জটিলভাবে ভাষাগত জালে বোনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অক্ষতভাবে প্রেরণ করা হয়।

গবেষণা পরামর্শ দেয় যে, বহুভাষিকতা জ্ঞানীয় বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে। বিশেষ করে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীলতার মতো ক্ষেত্রে। যখন ব্যক্তিরা একাধিক ভাষার সঙ্গে জড়িত, তখন তারা তাদের মস্তিষ্ককে অনন্য উপায়ে অনুশীলন করে, যার ফলে জ্ঞানীয় নমনীয়তা উন্নত হয়। এই জ্ঞানীয় তৎপরতা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাধনায় উপকৃত করে না বরং তাদের এমন দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করে যা একটি চির-পরিবর্তনশীল বিশ্বের জটিলতাগুলি পরিচালনা করার জন্য অমূল্য।

বহুভাষিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী অনুঘটক, এটি নিশ্চিত করে যে বিভিন্ন ভাষাগত পটভূমির ব্যক্তিদের শেখার সুযোগের সমান প্রবেশাধিকার রয়েছে। অনেক অঞ্চলে, ভাষাগত বৈচিত্র্য আর্থ-সামাজিক কারণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ এবং একাধিক ভাষায় শিক্ষা প্রদান করা শিক্ষাকে সবার জন্য প্রাপ্তিযোগ্য করে ব্যবধান পূরণ করতে সহায়তা করে। এই অন্তর্ভুক্তি আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার জন্য একটি উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে, আত্মীয়তা এবং সমতার বোধকে উৎসাহিত করে।

বহুভাষিক শিক্ষার একটি প্রাথমিক সুবিধা হল সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধান পূরণ করার ক্ষমতা। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বয়স্ক এবং তরুণ উভয় প্রজন্মের দ্বারা কথ্য ভাষাগুলিকে আলিঙ্গন করে এবং অন্তর্ভুক্ত করে, তখন তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে জ্ঞান নিরবিচ্ছিন্নভাবে বয়সের মধ্যে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এই সেতুটি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার সুবিধা দেয়, এমন বাধাগুলি ভেঙে দেয় যা জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার বিনিময়ে বাধা হতে পারে।

বহুভাষিক শিক্ষা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে, পরিবারের মধ্যে যোগাযোগকে প্রভাবিত করে। শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা কেবল তাদের সমবয়সীদের সাথে নয়, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সাথেও কার্যকর যোগাযোগকারী হয়ে ওঠে। এই ভাষাগত সংযোগ পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে, একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় কথোপকথন তৈরি করে যেখানে গল্প, ঐতিহ্য এবং জীবনের পাঠগুলি জৈবিকভাবে ভাগ করা হয়।

বিশ্বায়ন এবং আন্তঃসংযোগ দ্বারা চিহ্নিত বিশ্বে, বহুভাষিক শিক্ষা ব্যক্তিদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে অভিযোজিত এবং বিশ্ব নাগরিক হতে প্রস্তুত করে। একাধিক ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি পরিচালনা করার ক্ষমতা দিয়ে সজ্জিত করে, অন্যদের প্রতি সহানুভূতি এবং বোঝার বোধ তৈরি করে। এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রজন্মের মধ্যে সেতু নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত সীমানা জুড়ে ধারণা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়কে উৎসাহিত করে।

বহুভাষিক শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীর মাতৃভাষায় শিক্ষামূলক নির্দেশনা শুরু করা এবং ধীরে ধীরে অতিরিক্ত ভাষা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে ছাত্রদের বাড়ির পরিবেশ এবং স্কুলের পরিবেশের মধ্যে ব্যবধান পূরণ করে, যার ফলে আরও দক্ষ এবং অর্থপূর্ণ শেখার অভিজ্ঞতা সহজতর হয়।

অধিকন্তু, বহুভাষিক শিক্ষা অপ্রধান, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই ভাষাগুলিকে শিক্ষামূলক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে একীভূত করার মাধ্যমে, সমাজগুলো ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারে এবং তাদের ভাষাগত পটভূমি নির্বিশেষে সকল ব্যক্তির জন্য শিক্ষার সুযোগের সমান প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

বহুভাষিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য লালন করার জন্য একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষাগত সমৃদ্ধিকে স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন করার মাধ্যমে, শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক সংহতিকে উন্নীত করতে পারে, প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন করতে পারে এবং সবার জন্য আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার জন্য বহুভাষিক শিক্ষার সুবিধাগুলো স্পষ্ট হলেও, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, মানসম্মত পরীক্ষার অভাব এবং পরিবর্তনের প্রতি সামাজিক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। যাইহোক, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে এবং বহুভাষিক শিক্ষাকে আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি টেকসই স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মূল উপাদান।

বহুভাষিক শিক্ষা আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি শক্তিশালী এবং রূপান্তরকারী শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন করে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে, জ্ঞানীয় বিকাশ বৃদ্ধি করে এবং প্রজন্মগত ব্যবধান পূরণ করে, এটি একটি সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে যা ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের জন্য সমানভাবে উপকৃত হয়। ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বহুভাষিক শিক্ষা গ্রহণ ও প্রচারের মাধ্যমেই আমরা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার ভিত্তি নিশ্চিত করতে পারি।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

একুশে ফেব্রুয়ারি আত্মপরিচয়ের দিন



তোফায়েল আহমেদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রতি বছর অমর একুশের শহীদ দিবসে মহান ভাষা আন্দোলনের সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তস্রোতের সাথে মিশে আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গৌরবগাঁথা। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলার ছাত্রসমাজ আত্মদান করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল।

রক্তরাঙা অমর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তের প্লাবনের মধ্য দিয়ে আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় আসনে আসীন। শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও মানুষের মতো বাঁচার দাবীর সংগ্রামের দুর্জয় অনুপ্রেরণা সৃষ্টির চির অনির্বাণ শিখার দীপ্তিতে দিগন্ত উদ্ভাসিত করেছে একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের মানুষকে শিখিয়েছে আত্মত্যাগের মন্ত্র, বাঙালিকে করেছে মহীয়ান। জাতি হিসেবে আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সমন্বয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেছি। মহান ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে এসেছে মহত্তর স্বাধীনতার চেতনা। এবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সগৌরবে পালিত হচ্ছে মহান ভাষা আন্দোলনের ৭২তম বার্ষিকী।

প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৪৮-এর ১১ মার্চ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল।

সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম।” (পৃষ্ঠা-৯১, ৯২)। ’৪৮-এর ১১ মার্চ অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বাংলার ছাত্রসমাজ প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। সেদিন যারা মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে সংগ্রাম করে কারাবরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জনাব শামসুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। মার্চের ১১ থেকে ১৫-এই পাঁচদিন কারারুদ্ধ ছিলেন নেতৃবৃন্দ। পাঁচদিনের কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হত না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই,’ ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’-নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না। হক সাহেব আমাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব’।” (পৃষ্ঠা-৯৩, ৯৪)। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিশ্বাস্য আত্মপ্রত্যয় ছিল! তখন কে জানতো যে, ’৪৮-এর এই ১১ মার্চের পথ ধরেই ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনায় স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে! কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতেন! কারণ তিনি দূরদর্শী নেতা ছিলেন, লক্ষ্য স্থির করে কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন। যেদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়, সেদিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি; একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। আর তাই ধাপে ধাপে সমগ্র জাতিকে প্রস্তুত করেছেন চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য।

’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন সংলগ্ন আমতলায় ছাত্রসভা। নুরুল আমীন সরকার আরোপিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি। ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১০ জন মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙবে। ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙলো। সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী গুলি ছুঁড়লে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু তখন কারারুদ্ধ। কারাগারেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি আরো লিখেছেন, ‘মাতৃভাষার অপমান কোন জাতি সহ্য করতে পারে না। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ছাপ্পান্ন জন বাংলা ভাষাভাষী হয়েও শুধুমাত্র বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বাঙালীরা করতে চায় নাই। তারা চেয়েছে বাংলার সাথে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক, তাতে আপত্তি নাই। কিন্তু বাঙালির এই উদারতাটাই অনেকে দুর্বলতা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।’ (পৃষ্ঠা-১৯৮)। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন দেশের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামে গ্রামে মিছিল হতো। সেই মিছিলে স্কুলের ছাত্রদের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মনে আছে তখনকার স্লোগান, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হউক,’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা, বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা’।

’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের সর্বব্যাপী গণবিস্ফোরণ ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সেদিনও খুলনায় পুলিশের গুলিতে ১০ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম একুশে ফেব্রুয়ারি তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুতে বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বাঁধভাঙা জোয়ারে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমাদের আহ্বানে বিগত ১৭ বছরের সমস্ত দৃষ্টান্ত ভঙ্গ করে ঢাকা নগরের অধিবাসীগণ অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের মাধ্যমে মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি প্রাণঢালা শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং প্রশাসনের সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উত্থাপন করে। একটি সুন্দর, নিষ্কলুষ, নির্যাতন-নিপীড়নহীন শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে ১১ দফার ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে এক মোহনায় শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার।

’৬৯-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে প্রথম সরকারি ছুটি আদায় করেছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা উত্তোলন, আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, প্রভাত ফেরি, শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের কর্মসূচি শুরু হয়। শহীদ দিবস উপলক্ষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শহীদ মিনারের পাদদেশে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। ’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারিকে মহান ভাষা আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য ধারা হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম আজ একনায়কত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে। ছাত্র-জনতা শ্রমিক কৃষকের জনপ্রিয় ১১ দফার সংগ্রাম আজ তাই মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য অনুসরণ করছে। ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সংগ্রাম কেবলমাত্র বাংলা ভাষার সংগ্রাম ছিল না।

এ সংগ্রাম ছিল সারা দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ও বাংলা ভাষীদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস।’ শহীদ আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীর, আনোয়ারা, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ ১১ দফা আন্দোলনের ৩৯ জন বীর শহীদ ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের সার্থক উত্তরসূরী। বিকাল ৩টায় পল্টন ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভা তো নয়, যেন জনসমুদ্র। জনসমাবেশের তুলনায় সেদিনের পল্টন ময়দানের আয়তন কম মনে হয়েছে। চতুর্দিক থেকে মানুষের ঢল নেমেছিল। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে চরমপত্র ঘোষণা করে সমস্বরে বলেছিলেন, ‘আগামী ৩রা মার্চের পূর্বে দেশবাসীর সার্বিক অধিকার কায়েম, আইয়ুব সরকারের পদত্যাগ, রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলা প্রত্যাহার, ১১ দফা দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি, সংবাদপত্র ও বাক-স্বাধীনতার উপর হতে সর্বপ্রকার বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে।’ সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় সভাপতির ভাষণে যা বলেছিলাম দৈনিক ইত্তেফাকের পাতা থেকে পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে দিচ্ছি- ‘একুশে ফেব্রুয়ারি এই দিনটি আত্মপ্রত্যয়ের দিন, আত্মপরিচয় দেওয়া ও নেওয়ার দিন। ১৭ বৎসর পূর্বে এই দিনটি ছিল শুধু মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের দিন।

আজ ১৯৬৯ সালে এই দিনটি জনগণের সার্বিক মুক্তি সংগ্রামের দিন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্র সঙ্গীত ইত্যাদি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল হতে নূতনতর যেসব বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে সেসব বিতর্ক ও এদের উত্থাপকদের সতর্ক করে বলছি, বাংলাদেশে জন্মজন্মান্তর বাস করেও যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে শিখে নাই, তাদের স্বরূপ আজ উদঘাটিত। এই শ্রেণির লোকেরা বেঈমান। বাংলায় বেঈমানের কোনো স্থান হবে না এবং স্বাধিকারের সর্বাত্মক সংগ্রাম নিয়ে যদি তারা চিরন্তন পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ঘুঁটি চালানোর প্রয়াস পান তবে আত্মরক্ষার পুরাতন প্রথা পরিত্যাগ করে প্রতি আক্রমণের পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলার অন্যতম বন্দী শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছি, এই মামলায় বন্দী আর কারো গায়ে যদি একটি আঁচড়ও লাগে তবে দেশব্যাপী দাবানল জ্বলে উঠবে। আর নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলছি, শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তাকে কেউ যেন নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার না করেন।’ স্বৈরশাসকের প্রতি চরমপত্র ঘোষণার পর সন্ধ্যায় দেশবাসীর উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে আইয়ুব খান নতি স্বীকার করে ঘোষণা করেন, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ২৩ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ চিত্তে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এরপর ’৫২ ও ’৬৯-এর রক্ত স্রোত পথ বেয়ে আসে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে আমরা বিজয়ী হয়েছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সে-সব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর (আমার হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক) বলেছিলেন, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না। চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জননী জন্মভূমির বীর শহীদদের স্মরণে শপথ নিয়ে বলছি যে, রক্ত দিয়ে হলেও বাংলার স্বাধিকার আদায় করবো। যে ষড়যন্ত্রকারী দুশমনের দল ১৯৫২ সাল হতে শুরু করে বারবার বাংলার ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিককে হত্যা করেছে। যারা ২৩ বছর ধরে বাঙালির রক্ত-মাংস শুষে খেয়েছে, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন বানচালের জন্য, বাঙালিদের চিরতরে গোলাম করে রাখার জন্য তারা আজও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। শহীদের আত্মা আজ বাংলার ঘরে ঘরে ফরিয়াদ করে ফিরছে, বলছে, বাঙালি তুমি কাপুরুষ হইও না। স্বাধিকার আদায় করো। আমিও আজ এই শহীদ বেদী হতে বাংলার জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রস্তুত হও, দরকার হয় রক্ত দিবো। কিন্তু স্বাধিকারের দাবির প্রশ্নে কোন আপোষ নাই।’ অমর একুশে পালনে শহীদ মিনারে ব্যক্ত করা জাতির জনকের এই অঙ্গীকার আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি।

একুশে ফেব্রুয়ারি যুগে যুগে আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। বিশেষ করে ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় আসীন।একুশের চেতনার পতাকা হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুন্দরভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে একের পর এক লক্ষ্যপূরণ করছে। সবধরণের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জনহিতকর এসব সাফল্য বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। মহান একুশের চেতনায় জাগ্রত বাংলার মানুষ অতীতের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের আর্থসামাজিক বিকাশ আরও বেগবান করবে-এই হোক এবারের একুশের অঙ্গীকার।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।

;

বঙ্গবন্ধুর ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন’ আইন বাস্তবায়ন কতদূর!



আসাদুল হক খোকন
১৯৬৪ সালের অমর একুশের প্রভাতফেরীতে শেখ মুজিবুর রহমান (পরে বঙ্গবন্ধু), পেছনে তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যরা। ছবি: কনস্যুলেট জেনারেল অব বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।

১৯৬৪ সালের অমর একুশের প্রভাতফেরীতে শেখ মুজিবুর রহমান (পরে বঙ্গবন্ধু), পেছনে তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যরা। ছবি: কনস্যুলেট জেনারেল অব বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।

  • Font increase
  • Font Decrease

কিভাবে বাংলা আমাদের সকলের মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা হলো তার ইতিহাস কম বেশি সকলেরই জানা। তবে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সবার জানা নেই তা হলো- বর্তমানে মাতৃভাষাভাষি মানুষের সংখ্যা বিবেচনায় ‘বাংলা’ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের চতুর্থ ও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। আর মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা হিসেবে বাংলার অবস্থান সপ্তম। এছাড়া বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ‘২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এটিই বিশ্বের একমাত্র ভাষার আসন দখল করে নিয়েছে। যা বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের সকলের গৌরব।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ৯৮.৯% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এবং বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছরের অধিক পুরনো। গত সহস্রাব্দির সূচনালগ্নে পাল এবং সেন সাম্রাজ্যের প্রধান ভাষা ছিল বাংলা। সুলতানি আমলে অত্র অঞ্চলের অন্যতম রাজভাষা ছিল বাংলা। মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল বাংলা ভাষায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বাংলার নবজাগরণে ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রন্থনেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসকল দিক বিচার করলে সহজেই অনুমেয়, ভাষা হিসেবে বাংলা কতটা সমৃদ্ধ।

এবার বাংলা ভাষার গোড়ার দিকে কিছুটা দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়। এর ধারাবাহিকতায় পশ্চিম পাকিস্তানের বিবিধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে জীবন উৎসর্গকারীদের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত হয় ঢাকা মেডিকাল কলেজের পাশে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রবর্তিত হয় ‘বাংলা’।

১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষার সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সরকারি অফিস-আদালতের দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। সে আদেশে বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বাংলা ভাষাপ্রচলন আইন জারি করে। ওই আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিত হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’

এর দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ অনুযায়ী অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। পাশাপাশি দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, নামফলক ও গাড়ির নম্বর প্লেট, বিলবোর্ড এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন বাংলায় লেখা ও প্রচলনের নির্দেশ দেন। সব রকম নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলেন।

আদালতের আদেশের তিন মাস পর একই বছর ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলা হয়। সে আদেশ প্রায় অনেকাংশে বাস্তবায়ন হলেও অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশে রোলের নিস্পত্তি হয়নি। বিচার বিভাগ অর্থাৎ আইন ও আদালত মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। আদালতের অধিকাংশ রায় বাংলায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালত আইন এবং রেফারেন্সের দোহাই দিয়ে অধিকাংশ রায়ই ইংরেজিতে দেওয়া হচ্ছে। যদিও উচ্চ আদালতের কয়েকজন বরেণ্য বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজন ও গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে ইংরেজি ভাষা শিখতে হবে। বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী দেশ চীন, জাপান, কিউবাসহ অনেক দেশই নিজেদের ভাষার মাধ্যমেই দেশকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর বিদেশি ভাষার পত্তন।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করেননি, বরং তার রচিত বাংলা সাহিত্যকেই ইংরেজিতে অনূদিত করা হয়েছে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা বাংলাভাষী হিসেবে নিজেদের নিয়ে গর্ব করতে পারি না, বরং দু-এক বাক্য ইংরেজি জানলেই নিজেদেরকে স্মার্ট ভাবতে শুরু করি। অন্যদিকে বাংলায় পড়া বা বাংলা জানা মানুষ ইংরেজি জানা মানুষদের সামনে গেলে হীনমন্যতায় ভোগেন। নিজের মায়ের ভাষাকে কণ্ঠে ধারণ করে মাথা উচু করে বলতে পারেন না- বাংলা আমার মাতৃভাষা, নিজের ভাষাকে বাদ দিয়ে যারা অন্যের ভাষাকে অন্তরে ধারণ করেন তারা দেশদ্রোহীর তুল্য! সারা দুনিয়া বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পরও এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় আদেশ থাকা সত্বেও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যায়নি। নিশ্চিত করা যায়নি দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই ক্ষেত্র চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রযুক্তি শিক্ষায় পাঠ ও নির্দেশনা বইগুলোর বাংলা অনুবাদও!

সর্বস্তরে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গোড়াতে হাত দিতে হবে। আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো শিক্ষাক্ষেত্র। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে সমাজ, দেশ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের যদি শৈশব থেকেই ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করা যায়, তাহলে তারা পরবর্তী কর্মজীবনেও ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সক্রিয় থাকবে। আস্তে আস্তে মাতৃ ভাষানুরাগী একটি জাতি গড়ে উঠবে। ভবিষ্যতে কোনো ইংরেজি স্কুলের শিক্ষার্থী যাতে বাংলা স্কুলের শিক্ষার্থীকে ছোট করে না দেখে। না ভাবে, বাংলা একটি নিম্ন মানের ভাষা, নিম্ন মানের মানুষের ছেলে মেয়েরা বাংলায় পড়ে!

প্রশ্ন হতে পারে, সবকিছু কেন বাংলাকেন্দ্রিক হতে হবে? এর উত্তর- বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় যখন কিছু বলা হয় বা প্রচার করা হয় তখন খুব সহজেই সমাজের যেকোন প্রান্তে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়ে যায়। বিজাতীয় ভাষায় যোগাযোগ করা হলে সেখানে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ভাষার সারল্য ও বোধগম্যতা। আপনি কোনো বক্তব্য যখন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে চান তখন তার মাধ্যম যদি ওই জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষা না হয় তবে তা কখনো সফল হবে না।

এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশ সব চেয়ে নিরাপদে হেটে চলেছে। দিনের পর দিন নানা কুসংস্কার আচ্ছন্ন জাতিকে সংস্কার করে বৈশ্বিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সামিল করা হয়েছে। নানামুখি উন্নয়ন কর্মকান্ড দৃশ্যমান হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধুর সেই আদেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে আশা করি, অচিরেই বিশেষ করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল কর্মক্ষেত্রে ইংরেজির পাশাপাশি নয় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি চালুর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের অন্তরে এই কষ্ট আর থাকবে না যে, দুঃখ করে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

;