স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করবার রেওয়াজ আছে; আমার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখনও রয়েছে, মাতৃসম। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আমাকে এমন স্নেহে এবং এতটা সময় ধরে শেখায় নি। সময়টাও কিন্তু বেশ দীর্ঘ। বিশ্ববিদ্যালয় এক শ’ বছরে পা রাখছে, আমার সঙ্গে এর সম্পর্ক ৬৯ বছরের। এসেছিলাম সেই ১৯৫২-তে, তার পরে প্রথম চার বছর ছাত্র এবং অনেক বছর শিক্ষক হিসেবে কাটিয়েছি; এখনও রয়ে গেছি। সবটা সময়ই কিন্তু ছিল শেখার, সে শেখার এখনও শেষ হয় নি।

শিখেছি ক্লাস রুমে, গ্রন্থাগারে, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে, এবং সহপাঠীদের সান্নিধ্যে। প্রথম বছরেই আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলাম, নির্বাচিতও হয়েছিলাম; পরের তিন বছর প্রত্যেকটি নির্বাচনে আমার অংশগ্রহণ ছিল। আবার শিক্ষক হিসেবে নয় বছর আমি ডাকসু’র কোষাধ্যক্ষ ছিলাম। সামাজিকতার শিক্ষাটা যে কত জরুরি ও উপকারি সেটা আমি বুঝেছি ছাত্রসংসদের সঙ্গে ওই সংযোগ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন কিন্তু অপূর্ণ থাকে ছাত্রসংসদ কাজ না করলে। সামাজিকতা শেখার আরেকটি জায়গা ছিল। সেটা হলো সাবসিডিয়ারি ক্লাস। অনার্স ক্লাসে আমরা ছিলাম মাত্র ১২ জন; পলিটিক্যাল সায়েন্সের সাবসিডিয়ারীতে কমপক্ষে ৬০ জন হবে। সেখানে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব। সে-বন্ধুত্ব পরের দিনগুলোতেও অক্ষুন্ন ছিল।

আমার জন্য মস্ত বড় আকর্ষণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগারটি। ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষ পর্যন্ত ছিল আমার দৌড়, তার ভেতরের জগৎটা ছিল অনধিগম্য ও অতীব আকর্ষণীয়। শিক্ষক হিসেবে গ্রন্থাগারে অবাধ বিচরণের সুযোগ আমাকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে এবং আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছি তার একটা কারণ ছিল ওই গ্রন্থাগার।

শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল দু’টি বৈশিষ্ট্য। একটি তার আবাসিক চরিত্র, অন্যটি তিন বছরের অনার্স কোর্স। আবাসিক হলগুলোকে জীবন্ত রাখতো ছাত্রসংসদের বার্ষিক নির্বাচন এবং বছর জুড়ে সংসদের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম। দ্বিতীয় বর্ষে দুটো সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিয়ে আমরা ভারমুক্ত হতাম, পরের বছর পুরোপুরি এবং কেবলই অনার্সের বইপত্র পড়া। ওই তৃতীয় বর্ষে নতুন যা পড়েছি সেসব তো বটেই, আগের দু’বছরে যা পড়েছিলাম তাও পুনর্পাঠ ঘটতো। অনার্সের পাঠ্যবিষয়টা একসঙ্গে পেতাম। সে-ব্যবস্থাটা কিন্তু এখন আর নেই। কোর্স ও সেমিস্টার সিস্টেম এসে তিন বছরের সংবদ্ধ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা তৃতীয় বর্ষে আসে প্রথম দুই বছরের বইপত্র ও কাগজখাতা দূরে সরিয়ে রেখে। অনভ্যাসে বিদ্যালয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের সময়ে টিউটরিয়ালের ব্যবস্থা ছিল। চার-পাঁচজনের গ্রুপে একজন শিক্ষকের সাথে প্রতি সপ্তাহে একবার মিলিত হতাম। সেখানে আমরা লিখতাম, বলতাম এবং শুনতাম। তিনটাই ছিল খুব উপকারী। এখন তাও গেছে চলে।

এ ভাঙচুরটা কিন্তু শিক্ষাগত বিবেচনায় ঘটে নি, ঘটেছে রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল দু’বছর পেরিয়ে সাবসিডিয়ারী এবং তিন বছরের শেষে অনার্সের পরীক্ষার বদলে ছয় মাস পর পর পরীক্ষা নেওয়া হবে, ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় অস্থির থাকবে, ঘাড় তুলবার সময় পাবে না; তারা রাজনীতি ছাড়বে। ওই একই কারণে ছাত্রসংসদের নির্বাচনও এক সময়ে বন্ধ হয়ে গেল। ফলটা শুভ হয় নি। শিক্ষার জন্য নয়, সমাজের জন্যও নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বার বার ঘটেছে। বড় আকারে ঘটে ১৯৫২-তে, অবিশ্বাস্য রকমের ভয়াবহ মাত্রায় ঘটেছে ১৯৭১-এ। দু’টি ঘটনারই আমি প্রত্যক্ষদর্শী। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুরাতন কলাভবনের আমতলার জমায়েতে আমিও ছিলাম; কাঁদানে গ্যাসের মোকাবিলায় সেটিই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। আবার একাত্তরে পঁচিশে মার্চের রাতেও আমি উপস্থিত, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা হিসেবে। রাষ্ট্র অস্ত্রহাতে আক্রমণ করলো, রক্তপাত ঘটালো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলো। পরাজয় দুইবারই। এবং বিশ্ববিদ্যালয় যে শক্তির প্রতিভূ তার কাছেই।

টিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বায়ান্নর শেষ দিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন নতুন স্বাধীনতার এবং পাকিস্তানবাদিতার আবহাওয়াটা যে একেবারে কেটে গেছে তা নয়। রাষ্ট্রকে ভাঙার কথাও ওঠে নি। দাবিটা ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করবার। ঘটনার কয়েক বছর পরে আমাদের শিক্ষক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন একটি প্রবন্ধে ভাষা আন্দোলনকে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ রায়ট’ বলেছিলেন।  এই মনোভাবটি তাঁর একার নয়, অন্য কারো কারো মধ্যেও ছিল। আবার যে জায়গাটাতে পুলিশের গুলিতে বরকত শহীদ হলেন তার কাছেই, দশ বছর আগে নাজির আহমদ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র প্রাণ হারিয়েছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্রদের ছুরিকাঘাতে। সেই স্মৃতি যে একেবারে মুছে গিয়েছিল তাও নয়; কিন্তু বাঙালী জাতীয়তাবাদ দ্রুত এগুচ্ছিল।

মুনীর চৌধুরী আমাদের বিভাগের শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু ক্লাসরুমে তাঁকে আমরা পেলাম না, কারণ তখন তিনি জেলে। তাঁর অপরাধ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলা সাহিত্যে এম এ পরীক্ষা দিয়ে খুব ভালো ফল করলেন এবং যখন বের হয়ে এলেন তখন আর ইংরেজী বিভাগে রইলেনই না, বাংলা বিভাগে চলে গেলেন। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে বাঙালী জাতীয়তাবাদই মূল ধারায় পরিণত হবে। আমাদের শিক্ষক খান সারওয়ার মুর্শিদ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইংল্যান্ডে যাবার; তাঁর সঙ্গে ড. সাজ্জাদ হোসায়েনের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল; ইংল্যান্ডে তাঁরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট করেছেন।

দু’জনেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী ছিলেন, এক সময়ে যেটা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা গেল তাঁরা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন; কারণ ড. হোসায়েন পাকিস্তানপন্থীই রয়ে গেলেন, ড. মুর্শিদ এগিয়ে গেলেন বাঙালী জাতীয়তাবাদের দিকে। শেষ পর্যন্ত দু’জনের ভেতর কথাবার্তাই বন্ধ হয়ে গেল। একই ঘটনা ঘটেছিল ড. হোসায়েনের সঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সম্পর্কের বেলাতেও। অধ্যাপক রাজ্জাক যখন শিক্ষক, ড. হোসায়েন তখন ছাত্র। এক সময়ে দু’জনেই ছিলেন পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদী, তাঁদের সম্পর্কটাও ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ; কিন্তু ১৯৬৫-এর যুদ্ধের পর সে সম্পর্কটা আর রইলো না, ওই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই।

আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদকে পোক্ত করবার চেষ্টা নিরন্তর চলছিল। এ কাজে রাষ্ট্রক্ষমতা যত তৎপর হয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদের শক্তি ততোই বেড়েছে। আইয়ুব খান আরেক কাণ্ড করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি সরকারী দপ্তরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সামরিক শাসনের শুরুতেই ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি হামুদুর রহমানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করে বসিয়ে দিয়েছিলেন। এই উপাচার্য হুকুম জারি করেছিলেন ক্লাস থাকুক না-থাকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে দশটা পাঁচটা অফিস করতে হবে।

সেসময়ে কলা অনুষদের ডীন ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হালিম, তিনি উপাচার্যকে গিয়ে বললেন, দশটা-পাঁচটার জোয়ালে আটক থাকলে শিক্ষকরা নিজেদের পড়াশোনা ও গবেষণা করবেন কখন? উপাচার্য তাঁকে বলেছিলেন, “পড়াশোনা করছেন বলেই তো আপনাদেরকে চাকরি দেওয়া হয়েছে, আবার কি?” উপাচার্যের ওই হুকুম প্রচুর হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিল এবং অবশ্যই তাঁর হুকুম বহাল থাকে নি; কিন্তু এর রাষ্ট্রের সামরিক শাসকরা যা করেছিল সেটা ছিল আরও মারাত্মক। তারা এমন একটি আইন জারি করলো যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলতে কোনো কিছু আর অবশিষ্ট রইলো না।

এটা শুধু যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জারি করা হয়েছিল তা নয়, পাকিস্তানের সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই একই রকম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। স্বভাবতই প্রতিবাদ হয়েছে, এবং সেটা সারা পাকিস্তান জুড়েই। তাই দেখা গেছে ছাত্ররা যখন আইয়ুব শাহীর পতন চেয়ে আন্দোলন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তখন আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার ব্যাপারে স্বাধীনতার জন্য। সেই স্বাধীনতা পাওয়া গেল বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হবার পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটা অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে। আমরা ভাবলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরী করা যাবে। উপাচার্য, ডীন, সিন্ডিকেট, সিনেট- সর্বত্রই নির্বাচনের বিধি তৈরী হলো।

কিন্তু দেশে যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমনি, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় নি। আমরা আশা করছিলাম গণতন্ত্রের চর্চার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় হবে অগ্রপথিক, সেটা ঘটলো না। অভিযোগ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বড় বেশী দলাদলি করেন। কথাটা অর্থসত্য মাত্র। নির্বাচনী ব্যবস্থা আছে, একা একা নির্বাচন করা যায় না, তাই নির্বাচনী জোট তৈরী হয়েছে; ভিত্তিটা ছিল মতাদর্শগত ভিন্নতা। সেটা কোনো খারাপ ব্যাপার নয়। শিক্ষকতা কখনোই তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ছাত্রদের মধ্যে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হন নি। নির্বাচন ব্যবস্থার ফলে দু’টি ভালো জিনিস পাওয়া গিয়েছিল, একটি হলো শিক্ষকদের ভেতর পরিচিতি গড়ে তোলা। দ্বিতীয়টি এই বোধ তৈরী হচ্ছিল যে, শিক্ষকদের ভেতর জ্ঞান ও বয়সের পার্থক্য অবশ্যই সত্য কিন্তু এটাও সত্য যে শিক্ষক হিসেবে তাঁরা একই সমতলে রয়েছেন।

এক কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অধ্যাদেশ আমাদেরকে সামন্তবাদী সংস্কৃতির বলয় থেকে বের হয়ে গণতন্ত্রের প্রশস্ত ক্ষেত্রে আসবার সুযোগ করে দিয়েছিল। গণতন্ত্রের সুফল যে পুরোপুরি পাওয়া যায় নি তার দায় গণতন্ত্রের নয়, দায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের। ঘটনাটা আমরা ঘটতে দেখলাম, কিন্তু থামাতে পারলাম না। এক সময়ে দেখা গেলো সাদা ও নীল উভয় গোষ্ঠীর কিছু শিক্ষক বড় দুই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। রাজনৈতিক নেতাদেরও আগ্রহ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে সমর্থক জোগাড় করার। এভাবেই বাইরের দলীয় রাজনীতিটা চলে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে। ক্ষুন্ন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দেওয়া ‘কনশেসন’ হিসেবে; শাসক বদল হয়েছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন হয় নি।

রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আরেক ভাবে ঘটছিল। সেটা হলো মেধাবান তরুণদেরকে সরকারী চাকরীতে টেনে নিয়ে যাওয়া। সরকারী চাকরীতে ক্ষমতা, উন্নতি ও অর্থ, তিনটিরই প্রাপ্তির যে সুযোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় তা ছিল না। যে তরুণরা শিক্ষক হলে তাঁদের নিজেদের জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য ভালো হতো তাঁরা অনেকেই সরকারী চাকরীতেই চলে গেছেন। এটা ব্রিটিশ আমলে ঘটেছে, পাকিস্তান আমলে তো কমেই নি, বরং বেড়েছে। দেখা যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যারা ভালো ফল করেছেন তাঁরা সরাসরি সিভিল সার্ভিসে যাবার লক্ষ্যে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন প্রস্তুতিকালীন সময়টা কাটাবার জন্য। আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছিলাম সেটা অত দ্রুত সম্ভব হতো না, যদি না আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সিভিল সার্ভিসে চলে যেতেন। সেকালে পদ খালি না হলে নতুন নিয়োগের কোনো সুযোগ ছিল না; আর পদসৃষ্টি ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আমার পিতা সরকারি চাকরি করতেন, তিনিও চেয়েছিলেন আমি সিভিল সার্ভিস মুখো হই, এবং না-হওয়াতে যে মনোক্ষুন্ন হন নি এমন নয়। রাষ্ট্র টানতো, বিশ্ববিদ্যালয়ও ঠেলে দিতো, কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরীতে সুযোগ-সুবিধাগুলো ছিল অত্যন্ত সীমিত।

বায়ান্নতে যখন প্রবেশ করি তখন আমাদের বিভাগে শিক্ষক ছিলেন অল্প কয়েকজন। অমলেন্দু বসু গেছিলেন অক্সফোর্ডে, ডক্টরেট শেষ করে তিনি আর ঢাকায় ফেরৎ আসেন নি, দেশভাগের কারণে। এফেসর এ জি স্টক এসেছিলেন অক্সফোর্ড থেকে, সাতচল্লিশের আগস্টের অল্পকিছু আগে। শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত খ্যাতিবান ছিলেন, পণ্ডিত হিসেবেও; এবং উপনিবেশবাদবিরোধী ছিলেন দৃষ্টিভঙ্গিতে, যে জন্য তাঁর ঢাকায় আসা। সাতচল্লিশের পর থেকেই ছাত্রবিক্ষোভে বিশ্ববিদ্যালয় তপ্ত হয়ে উঠছিল, প্রফেসর স্টক টের পাচ্ছিলেন যে তাঁকেও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে; তাঁর চিঠিপত্র গোয়েন্দারা নাড়াচাড়া করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল

এমন পরিস্থিতিতে তিনি ভাবলেন সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেওয়া ভালো। সেটাই তিনি করেছেন, চলে গেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আগেই। আমরা তাঁকে পাই নি। তবে আমাদের অনার্সের মৌখিক পরীক্ষা নিতে তিনি এসেছিলেন। প্রফেসর স্টক কিন্তু আবারও এলেন, এবং এবারও স্বেচ্ছায়; একাত্তরের পরে। ড. মুর্শিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, ব্যবস্থাটা তিনিই করেছিলেন। একান্নতে প্রফেসর স্টক চলে গেছিলেন যে-বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ দেখে, বায়াত্তরের এসে তারই বিজয় দেখতে পেলেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিস্থিতি যে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল এমনটা মনে হয় নি। এক বছর থাকার পর তিনি চলে গেলেন। যাবার আগে অবশ্য একটি বই লিখে গেছেন, মেময়ার্স অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি নাইনটিন ফরটি সেভেন-ফিফটিওয়ান নামে। চমৎকার বই। উপন্যাসের মতো।

স্টকের পরে আরেকজন ইংরেজ এসেছিলেন, প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। নাম জে এস টার্নার। তাঁর সময়ে আমরা ছাত্র। তিনি ছিলেন অনেকটা দার্শনিকের মতো। প্রিয় কবি ছিলেন মিল্টন ও ওরার্ডসওয়ার্থ; তিনি ওই দুই কবির কবিতা পড়াতেন, এবং আমরা টের পেতাম খুব আনন্দ পাচ্ছেন পড়িয়ে, এবং সচেষ্ট রয়েছেন নিজের আনন্দকে আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে। ১৯৭২-এ তিনিও একবার এসেছিলেন তাঁর প্রিয় ঢাকা ও পূর্ববঙ্গকে দেখতে। তখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

তাঁর সঙ্গে দেখা কলকাতার এক সেমিনারে, যেখানে আমি বাংলাদেশে জাতীয়তাবদ ও গণতন্ত্রের ওপর একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম; তিনি শুনলেন এবং শুনে বললেন, “তা ভালোই লিখেছ হে, কিন্তু বেশ পলিটিক্যাল”। মন্তব্যটা মনে আছে। সাহিত্যে পাঠদানের আরেকটি ধরন ছিল, সেটি ব্যাখ্যা করা, শব্দের অর্থ স্পষ্ট করা, উপমাগুলোর তাৎপর্য তুলে ধরা। এই রীতিতে পড়াতেন বি সি রায়। পড়তেন; এবং পড়াতে ভালোবাসতেন। ছিলেন অকৃতদার। ছাত্রজীবনে তো বটেই, যখন শিক্ষক হয়েছি তখনও টের পেয়েছি তেভরে ভেতরে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ। ধুতি পরে আসতেন; কিন্তু সে পরিধেয়তে থাকতে পারলেন না, ১৯৬৪-এর দাঙ্গার পরে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর শুভার্থীরা তাঁকে পোশাক বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন; বদলানো পোশাকে কয়েকদিন এসেছেনও; কিন্তু কাজটা তাঁর কাছে কতটা অপমানজনক মনে হয়েছে জানি না, আমরা কিন্তু অপরাধী মনে করেছি নিজেদেরকে। আমি তো চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকাতেই পারি নি; লজ্জায় ও অপরাধবোধে।

এর পরে অবশ্য তিনি বেশীদিন আমাদের সঙ্গে থাকেন নি, অবসর গ্রহণ করে কলকাতায় চলে গেছেন। শিক্ষা ছুটি নিয়ে কেম্ব্রিজ গেছিলেন সৈয়দ আলী আশরাফ, তিনি ফিরে এসেছিলেন আমরা যখন প্রথমবর্ষের ছাত্র তখনই। সাহিত্যপাঠে তখন নতুন একটি রীতির প্রবর্তন ঘটছিল; সেটা ছিল টেক্সটের পুঙ্খাণুপুঙ্খ বিশ্লেষণ; বৈজ্ঞানিক ভাবে নয়, নান্দনিক ভাবেই। এই পদ্ধতিতে সাহিত্যপাঠ ও সাহিত্যের মর্মোদ্ধার আরও গভীর হতো। সৈয়দ আলী আশরাফ ওই রীতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বেশী দিন রইলেন না, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার উপস্থিতিটা ছিল খুবই উজ্জ্বল। আমরা জানতাম তিনি এম এন রায়ের রাজনৈতিক মতাদর্শে আস্থাবান ছিলেন; যে আস্থার প্রতিফলন ঘটেছিল মুক্তি নামে একটি সাহিত্যপত্রিকার মধ্যে।

পত্রিকাটি তিনি যে সম্পাদনা করতেন তা নয়। তবে তিনি ছিলেন পেছনের অনুপ্রেরণা। মুক্তি কেবল যে নামের ওই বানানের জন্য বিশিষ্ট ছিল তা নয়, সেখানে যে আলোচনাগুলো বের হতো সেগুলোও ছিল মনোযোগ দিয়ে পড়বার মতো। কিন্তু পত্রিকাটি টেকে নি। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও তাঁর স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতা ছিলেন মনেপ্রাণে শিক্ষক; তাঁরা দেশ ছেড়ে যাবেন এমনটা কখনো ভাবেন নি; যাকে বলে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা অনেকটা সেভাবেই রয়ে গেলেন, এবং আমাদের এই শিক্ষক, যাঁর উপস্থিতিতে আমরা অনুপ্রাণিত বোধ করতাম। তিনি চলে গেলেন একাত্তরে, পাকিস্তানী হানাদারদের আক্রমণে।

তা একাত্তর আমাদের জন্য কেমন অভিজ্ঞতা ছিল তা বর্ণনা করা কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আক্রমণের প্রথম কেন্দ্রগুলোর একটি। ওই আক্রমণে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী- কোনো বাছবিচার করা হয় নি। পরে, ১৪ ডিসেম্বরে ঘটেছে ‘নির্বাচিত হত্যাকাণ্ড’। পঁচিশে মার্চ আমরা বেঁচে গেছি আমাদের আবাসিক এলাকাটিতে হানাদারেরা ঢোকে নি বলে, পরে আমি বাঁচলাম পলাতক থাকার দরুন। আল-বদর যাদের খুঁজেছিল আমিও তাঁদের একজন ছিলাম। সামরিক প্রশাসক হিসেবে বিদায় নেবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছয়জন শিক্ষককে সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছিল তাঁদের মধ্যে আমিও একজন। ওই প্রথম ও শেষবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়টা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনিরাপদ।

কলা ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্রকালের বিভাগীয় পাঠ্যসূচী সম্পর্কে একটু বলি। পাঠ্যসূচী ছিল খুবই সঙ্কীর্ণ, বলা যায় দরিদ্র। ধরা যাক, আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের তিনজন প্রধান ঔপন্যাসিক- কনরাড, ফরস্টার ও লরেন্সের কথা, তাঁরা কেউই কিন্তু আমাদের সময়কার পাঠ্যসূচিতে স্থান পান নি। কারণ হতে পারে দু’টো; একটি ভিক্টোরীয় নীতিবোধের অবশেষের উপস্থিতি; অন্যটি হয়তো মফস্বলের শিক্ষার্থীদের প্রতি কর্তৃপক্ষের করুণা। তা শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ণ কর্মক্ষেত্রেও ঘটেছে। প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের তেমন একটা পাত্তা দেওয়া হতো না, বিশেষভাবে চাকরীবাকরীর ক্ষেত্রে; পরে অবশ্য সেটা কেটে গেছে। তবে আমার মনে পড়ে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে একজন অধ্যাপিকার পড়ানোর কথা। তিনি আমাদের পড়িয়েছেন ‘দি রেইপ অব লক্’ নামের দীর্ঘ কবিতাটি। এমন ভাবে পড়ালেন যেন আমরা স্কুলের ছাত্রছাত্রী।

আমরা টের পাচ্ছিলাম যে আমেরিকার চোখ পড়েছে পূর্ববাংলার ওপরে। তাদের ভয় ছিল কমিউনিজমের। শুরুতে পাঠ্যসূচীতে কোনো আমেরিকান লেখকের উপস্থিতি ছিল না; কিছুদিন পরে দেখা গেল আমেরিকান সাহিত্য বলে একটি বিকল্প পত্র এসে গেছে। বইপত্র সব আমেরিকার দূতাবাস থেকে আসছে। বৃত্তিও দেওয়া হচ্ছে আমেরিকায় যাবার। আরও পরে দেখেছি বরিস পাস্তারনেকের ড. জিভাগো উপন্যাসটির কপি বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে শিক্ষকদের মধ্যে, কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমের বেনামিতে।

আগে বৃত্তি পাওয়া যেত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে, উচ্চশিক্ষার জন্য আমি যে বিদেশে গিয়েছিলাম সেটা ব্রিটিশ বৃত্তিতেই; পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে যুক্ত হলো আমেরিকায় যাবার সুযোগ। ততোদিনে রাষ্ট্রীয় ভাবে আমেরিকা পাকিস্তানের ঘাড়ে বেশ ভালো ভাবেই সওয়ার হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাদের চোখ তো পড়বেই। মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়া হলো আমেরিকায়, ভাষাতত্ত্ব পড়বার জন্য। তিন মাসের লীডারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে শিক্ষকদের কেউ কেউ গেলেন শিক্ষাভ্রমণে। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনও গিয়েছিলেন এবং আমেরিকা থেকে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায়।

১৯৫৮ সালে রকফেলার ফাউন্ডেশন আমাদের ইংরেজি বিভাগকে বেশ বড় অঙ্কের একটা অনুদান দিয়েছিল সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের ওপর আটটি সেমিনার করবার জন্য। ওদিকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে ইংরেজদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা পরিবর্তন দেখা গেল, তারা সাহিত্যপাঠের জন্য বৃত্তি না দিয়ে ভাষার পঠন-পাঠন লেখার জন্য বৃত্তি দেওয়াতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। ধারণাটা হয়তো এই ছিল যে সাহিত্য হলো গিয়ে উপরকাঠামোর ব্যাপার, ভাষা শেখাতে পারলে সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করা যাবে, এবং বাণিজ্যিক ভাবেও ওই শিক্ষাদান লাভজনক হবে।

আমরা যখন ছাত্র তখন রেডিওর প্রচার কেন্দ্রটি ছিল কলাভবনের খুব কাছে, নাজিমুদ্দিন রোডে। ওই ভবনটি আমাদেরকে খুব টানতো; সেখানে শিক্ষকরা যেতেন, আমরা ছাত্ররা যাদের অল্পস্বল্প লেখার অভ্যাস তারাও যাতায়াত করতাম। সেটা ছিল একটি বিশেষ সুযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য; সে-ঋণ যতো বেড়েছে বহন করে ততোই আমি সাবালক হয়েছি।

লেখক: বরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আনন্দ-বেদনার ঈদ ২০২৪



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
আনন্দ-বেদনার ঈদ ২০২৪

আনন্দ-বেদনার ঈদ ২০২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

 

‘কৃষকের ঈদ‘ কবিতায় নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ/ মুমুর্ষ সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?‘ বেঁচে থাকলে তিনি হয়ত তাঁর প্রশ্নটিকে আরো বড় ও প্র্রসারিত করতেন। বললেন এমন অনেক নিপীড়িত, অসহায় মানুষের কথা, যাদের বেদনার্থ জীবনে এসে উপস্থিত হয়েছে আনন্দের ঈদ।

যে পিতা কিশোর গ্যাং কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে জীবন দিয়েছে, তার পরিবারের ঈদ কোনো আনন্দ নিয়ে আসবে না। যে শিশু একটি লাল জুতা কিংবা সামান্য একটি জামার বায়না ধরে ছিল অপেক্ষমাণ, সে যখন মৃত্যুর স্পর্শ পায়, পরিস্থিতি তখন আনন্দের বিপরীতে বেদনার সমুদ্রে রূপান্তরিত হয়। আনন্দের ঈদের আবাহনে এমনই অসংখ্য বেদনার বৃত্তান্ত স্পর্শ করেছে বিশ্ববাসীতে ২০২৪ সাল।

২০২৪ সাল মোতাবেক হিজরি ১৪৪৫ সালের ঈদ-উল-ফিতর বিশ্বময় এসেছে আনন্দ ও বেদনার যুগল কাব্য হয়ে। বাংলাদেশের একদল নাবিক জলদস্যু কবলিত হয়ে বন্দি জীবনে ঈদের অনুভূতি পাচ্ছে। নাড়ির টানে বাড়ি পথে ঈদের আনন্দ করতে যাওয়া বহু মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়ে নিমেষেই বিষাদের আখ্যানে পরিণত হয়েছেন। বিশ্বের দেশে দেশে, বাংলাদেশেও লক্ষ লক্ষ মানুষ ঈদ উদযাপন করছে বন্দিশিবির-তুল্য উদ্বাস্তু শিবিরে। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় হাজার হাজার নারী, শিশু, বৃদ্ধ রক্ত ও জীবন ছুঁয়ে ঈদ পালন করছেন সংঘাত-আকীর্ণ পরিস্থিতিতে জীবন ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন ইসরাইলের গণহত্যায় শিকার ফিলিস্তিনের গাজাবাসীরা।

সারা মুসলিম জাহান যখন পবিত্র ঈদের্‌ আনন্দে মাতোয়ারা, তখন গাজাবাসী অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে বিশ্বমানবতার দিকে। তাদের চারপাশে শুধু ধ্বংসস্তূপ আর মৃত্যুর মহামিছিল। বসবাসের উপযোগী কোনো স্থাপনা চোখে পড়ে না। পেটে খাবার নেই তাদের। অসুখে নেই ওষুধ। আছে বোমাতঙ্ক আর আক্রমণের নিত্য ভীতি। চোখেমুখে হতাশা। মিশরের রাজধানী কায়রোতে যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার কথা শোনা যাচ্ছে তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। মিশরীয় মিডিয়া থেকে বলা হচ্ছে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু হামাস কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের দাবি অব্যাহতভাবে প্রত্যাখ্যান করছে ইসরাইল। ইসরাইল আবির্ভূত হয়েছে ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রতীকে।

সরেজমিন রিপোর্ট জানাচ্ছে, দক্ষিণের খান ইউনুস থেকে ইসরাইলি সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়ার পর গাজাবাসী তাদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ফেরা শুরু করেছেন। যেপথে তারা হাঁটছেন, চোখে যতদূর দেখতে পান- সবটাই ধুলোবালির স্তূপ। কে বলবে মাত্র ৬ মাস আগেও এসব স্থানে জনবসতি ছিল! মানুষের কলরবে মুখরিত হতো পথঘাট, হাটবাজার, স্কুল, মসজিদ! মানুষ রমজানের নামাজ পড়েছেন ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের সামনে। ঈদের দিনটি তাদেরকে আলিঙ্গন করেছে প্রেতপুরীর নিস্তব্ধ বিভীষিকা।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বলেছেন, গাজা থেকে যেসব ইসরাইলি সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাদেরকে ভবিষ্যত অপারেশনের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। বিশেষ করে দক্ষিণের রাফা শহরে এই অপারেশন চালানো হবে। ফলে গাজায়, রাফায় ইসরাইল যে তাদের নৃশংসতা বন্ধ করছে এমনটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। বরং এই সেনা প্রত্যাহার হতে পারে তাদের ভবিষ্যত হামলার আরেক প্রস্তুতি। কৌশল বদলে বদলে ইসরাইল গণহত্যার উন্মত্ততা থেকে মোটেও সরে আসছে না। রক্তের নেশা তাদেরকে পরিণত করেছে আধুনিক দানবে।

গত বছরের ৭ই অক্টোবর হামাসের রকেট হামলার পর ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ শুরু করে। এ পর্যন্ত এই যুদ্ধে তারা কমপক্ষে ৩৫,০০০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭৫,৮৮৬ জনকে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধ। ধ্বংস করে দিয়েছে শহর, গ্রাম, জনপদ, স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদসহ যাবতীয় নির্মাণ। এতো ধ্বংসের চালচ্চিত্র আর মৃত্যুর মিছিল আধুনিক পৃথিবী ও সভ্যতার ইতিহাস আগে কখনোই দেখেনি, ইরাইল কর্তৃক একতরফাভাবে যা চলছে গাজায়।

বর্ষের পরিক্রমায় ঈদ আসছে পৃথিবীতে ইসলামের আর্বিভারের সঙ্গে সঙ্গেই। প্রতিবছরের ঈদে একই রকম পরিস্থিতি ছিল না। কখনো যুদ্ধ, বন্যা, মারী, দুর্ভিক্ষ পরিবেশ-পরিস্থিতিকে ভারী করেছে। আনন্দের শরীরে বিছিয়ে দিয়েছে বিষাদের কালো চাদর। কিন্তু অতীতে কখনোই এমন নিঠুর পরিস্থিতি হয়েছিল, যা হয়েছে চলতি ২০২৪ সালে? ২০২৪ সালের ঈদকে বিশ্বের ইতিহাস কিভাবে মনে রাখবে, সেটা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের ইতিহাস।

ইতিমধ্যেই খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, বিশ্বের নানা দেশে ঈদের সূচনা হয়েছে গাজায় নিহত ও আক্রান্ত মানুষের জন্য প্রার্থনার মাধ্যমে। কোথাও আনন্দ-উল্লাস হ্রাস করা হয়েছে বিপন্ন মানবতার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে। গেল বড়দিনেও (২০২৩) এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। ২৫ ডিসেম্বর গাজায় রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল ইসরাইল। বড়দিনের আনন্দও পরিণত হয়েছিল শোকে। ঈদের সময়ও সেই বেদনা আরো প্রলম্বিত হয়েছে। বেড়েছে মৃত্যু ও ধ্বংসের পরিসংখ্যান। আনন্দে উদ্বেলিত ঈদের সময় আমরা যেন সেই বেদনাকে ভুলে না যাই। উল্লাস ও উদযাপনের স্রোতে যেন মানবিকতাকে ভাসিয়ে না দিই। মানবিক আর্তিতে যেন আমরা আনন্দকে বিলিয়ে দিতে পারি বিপন্নদের মাঝেও। তাদের প্রতি জানাতে পারি সহানুভূতি ও প্রার্থনা।

;

ঈদ উৎসবের মর্মমূলে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ঈদ উৎসবের মর্মমূলে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি

ঈদ উৎসবের মর্মমূলে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ ওঠেছে। বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতর। মুসলমানদের দুই প্রধান ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম দিন। ঈদুল ফিতর আসে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করার বার্তা নিয়ে। ধনী-নির্ধন কেউ এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় না। লৌকিক ভেদাভেদ ভুলে সব মানুষ এক কাতারে সমবেত হয়, আলিঙ্গনে জড়ায় একে অন্যকে। এই দিনটি তাই সাম্যের, ভালোবাসার, সৌহার্দ্যের।

হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম মাস ছিল রমজান। এই মাস সংযত আচরণের শিক্ষা দিয়েছিল, সংযম পালনের বার্তা দিয়েছিল; বার্তা দিয়েছিল কৃচ্ছ্রসাধনার। এ বার্তা যারা গ্রহণ করেছে ব্যক্তি হিসেবে তারা সফল। এই সাফল্যের পুরস্কার হয়ত দৃশ্যমান নয়, তবে সন্তুষ্টি অর্জন হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জনের যে বার্তা সেটা অবিনাশী।

এবার দেশে ত্রিশ রমজান পালিত হয়েছে। ত্রিশের সন্ধ্যা শেষে পশ্চিমাকাশে দেখা মিলেছে বাঁকা যে চাঁদের সেটা আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে দেশবাসীকে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত সেই গান ভাসছে সন্ধ্যা থেকেই—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।’ গানটিকে অনেকেই বলে থাকেন ‘ঈদের সর্বজনীন সংগীত’; যদিও তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, তবু এটা সত্যি সত্যিই ঈদের জাতীয় অথবা সর্বজনীন সংগীতই। সেই শিশুকাল থেকে আমরা শুনে আসছি। ৯৩ বছর আগে লিখিত কবি নজরুলের গানটি এখনো সকল বয়েসি মানুষের কাছে সমান ভাবে আদৃত। গানটা না শুনলে ঈদের ঘোষণার যেন পূর্ণতাই পায় না।

ঈদ উৎসব ধর্মীয় হলেও এর রয়েছে সর্বজনীন রূপ। এই উৎসব কেবল ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই পালন করে তা না। ঈদ উৎসবের ছুটি থেকে শুরু করে সকল কিছুর সঙ্গে রয়েছে সকল মানুষের যোগ। এখানে চাইলেও আমরা কাউকে আলাদা করতে পারি না। এই উৎসবে সামিল হয় অন্য ধর্মাবলম্বীরাও। উৎসবের নানা পর্যায়ে তারাও অংশ নেয়, আনন্দ ভাগাভাগি করে। উদারমনস্করা এটাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখে না, উৎসবকে সর্বজনীন রূপ দিতে নানাভাবে চেষ্টা করে থাকে। সৌহার্দ্য, সাম্য ও মিথস্ক্রিয়তার এই চর্চা একদিনের নয়। এটা আমাদের উত্তরাধিকারী ধারা। চাইলেও এখানে ফাটল ধরানো কঠিন। এখানে যে চেষ্টা হচ্ছে না, তা না; হচ্ছে, তবে দিনশেষে মানুষ উৎসবে একে অন্যকে জড়াচ্ছে। মিলনের ক্ষেত্র প্রসারে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সাংবিধানিক স্বীকৃতিতে পরাভূত হলেও নৈতিকভাবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্রের বাসিন্দা। এখানে তাই 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'। ঈদ, পূজা-পার্বণ, নববর্ষ, বড়দিনসহ অন্য সকল ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসগুলো সর্বজনীনভাবে উদযাপিত হয়। রাষ্ট্রও এর পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। আমাদের রক্তে যে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা তা হুট করে ভাঙা অসম্ভব। তাই ধর্মের মোড়কে যত উৎসবই আসুক না কেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই সেই আনন্দে ভাসে, উৎসবে সামিল হয়। ঈদুল ফিতরও তেমনই এক উৎসব, যা মুসলমানদের প্রধান দুই ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম হলেও এই উৎসবে সবাই অংশগ্রহণ করে, শুভেচ্ছা জানায়।

ঈদ আমাদেরকে স্মৃতিকাতর করে। জীবনের এই পর্যায়ে আমরা যারা বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনকে হারিয়েছি, তাদের কাছে মা-বাবার স্মৃতি, স্বজনদের স্মৃতি উঁকি দেয় প্রবলভাবে। উৎসবের দিনে হাহাকার ভাসে। নিয়তির লিখন বলে আমরা সে বেদনা অনুভব করি ঠিক, আবার পরক্ষণে উৎসবের দিনকে অন্যের কাছে বেদনা-সিক্ত না করতে সেই হাহাকার বুকে চেপে রাখি। এ অন্য এক সংযম; বেদনা চাপা দেওয়ার শিক্ষা। আনন্দের বিপরীতে এই বেদনায় লীন হয় না, এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই সংযত থাকে। সংযম পালনের মাসব্যাপী যে শিক্ষা তার প্রভাব হাতেনাতে দেখা মেলে উৎসবের দিনেই। এক মাসের শিক্ষা যে কতখানি প্রভাববিস্তারি এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে!

ঈদে 'নাড়ির টানে' শহর ছাড়ে মানুষ। পরিবারপরিজন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে। উৎসবে-আনন্দে 'দেশে' ফেরে লোকজন। গ্রামটাই যে মানুষের কাছে প্রকৃতই 'দেশ'; তা ঈদের সময়ে ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়। ঢাকা ছাড়েন কোটি লোক। ঢাকার কথা আলাদাভাবে আসে, ওটা রাজধানী বলে। এরবাইরে প্রতি জেলা-উপজেলা সদর ছাড়েন লোকজন। যারা শহর ছাড়েন না, তারাও খোঁজখবর নেন স্বজনদের। মিলন আর সৌহার্দ্যের দেখা মেলে ঈদের সময়েই। দেশের ভেতর 'আরেক দেশের' অস্তিত্ব যেন মূর্ত হয়ে ওঠে ঈদের সময়ে। এই অস্তিত্ব বিভক্তির নয়, আনন্দের।

ঈদ উৎসবের মর্মমূলে রয়েছে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বার্তা। তাই শেষ করি কবি নজরুলকে দিয়েই—‘যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী/ সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ/ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।’ যারা অভাবগ্রস্ত, নিত্য উপবাসী, কিংবা গরিব অথবা এতিম তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়ার বার্তা আছে 'ঈদের সর্বজনীন সংগীতে'! নিজেকে অন্যের তরে বিলিয়ে দেওয়ার আসমানী এ তাগিদ গ্রহণে নিশ্চয় পূর্ণতা পায় ঈদের আনন্দ। নজরুলের কবিতা কিংবা গানে রয়েছে যার প্রকাশ, তার বিস্তৃত রূপের দেখা মেলে ঈদ উৎসবে।

সবাইকে ঈদ মুবারক!

;

১৯৪৭ সালের দেশভাগের নিরিখে দক্ষিণ এশিয়ার বিভাজন ও মানবমণ্ডলী



মাহফুজ পারভেজ
১৯৪৭ সালের দেশভাগের নিরিখে দক্ষিণ এশিয়ার বিভাজন ও মানবমণ্ডলী

১৯৪৭ সালের দেশভাগের নিরিখে দক্ষিণ এশিয়ার বিভাজন ও মানবমণ্ডলী

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রতিপাদ্যসার

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির দেশত্যাগের মাধ্যমে সূচিত হয়। যে ঘটনায় ব্রিটিশদের কাছে ‘ক্ষমতা হস্তান্তর’ নামে পরিচিত হলেও নব্য-সৃষ্ট ভারত ও পাকিস্তানের কাছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছর, যাতে একই সাথে ভারত উপমহাদেশ এবং বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হয়। যে কারণে সাধারণভাবে ঘটনাটিকে ‘দেশভাগ’ নামেও চিহ্নিত করা হয়। এতে ক্ষমতা হস্তান্তর, দেশভাগ ও দুটি দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তি ছাড়াও ১৪ থেকে ১৮ মিলিয়ন মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়, যাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দেশান্তরের বা গণঅভিবাসনের ঘটনা রূপে চিহ্নিত করা হয়, যে দেশত্যাগীদের অনেকেই জীবিত অবস্থায় নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতেপারেন নি। তাছাড়াও দেশভাগের আগে ও পরে সংঘটিত প্রবল সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত দাঙ্গা-হাঙ্গামায় কমপক্ষে এক মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ২০২২ সালে ‘দেশভাগ’ নামক মর্মান্তিক ঘটনার ৭৫ বছর পূর্তি হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সহিংস রক্তপাত ও হিংসার জন্ম দিয়েছিল, তা ৭৫ বছর পরেও পুরোপুরি মুছে গিয়েছে কিনা, তা বর্তমান প্রবন্ধে পর্যালোচনা করা হয়েছে। 

চাবিশব্দ: দেশভাগ, ক্ষমতা হস্তান্তর, সাম্প্রদায়িকতা, অভিবাসন, উদ্বাস্তু, দাঙ্গা, জাতিগত বিদ্বেষ।

১.

বাংলার লোকসাহিত্য ভা-ারে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’  নামের মণিমুক্তা-তুল্য  পালাগুলো সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। এসবের সিংহভাগই কিশোরগঞ্জের, কিছু পার্শ্ববতী নেত্রকোণার। ব্রিটিশ আমলের বৃহত্তম জেলা ময়মনসিংহের অংশভুক্ত হওয়ায় গ্রন্থের এরূপ নামকরণ। নিজস্বতার পাশাপাশি কিশোরগঞ্জের ভৌগোলিক সীমানা চারপাশ থেকে চার সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জনপদকে আলিঙ্গন করেছে: উত্তরে গারো পাহাড়ের উপত্যকা, দক্ষিণে ঢাকা-ভাওয়ালের অরণ্য, পূর্বে চিরায়ত সিলেট-কামরূপ, পূর্ব-দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লার নদী অববাহিকা, আর পশ্চিমে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাদবাকী অংশ। ঘটনাক্রমে কিশোরগঞ্জ আমাব জন্মস্থান এবং পুরনো ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ জনপদটি আমার শৈশব-কৈশোরের ভিত্তিভূমি। আমার পরিবারের বংশানুক্রমিক আদিবাসও কিশোরগঞ্জেই। কিশোরগঞ্জ সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়, যেমনভাবে সীমান্ত-সংলগ্ন নয় এপারের বিক্রমপুর, ফরিদপুর ইত্যাদি ও ওপারের বর্ধমান বা হুগলি। সীমান্তের জেলা চব্বিশ পরগণা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দিনাজপুর. কোচ বিহার ইত্যাদির মতো প্রত্যক্ষ আঁচড় বা ভৌগোলিক বিভাজন উভয় বঙ্গের সীমান্ত থেকে দূরবর্তী জেলা বা জনপদগুলোতে দৃশ্যমান হয় নি। কিন্তু দেশভাগের পরোক্ষ প্রভাবে সর্বত্রই জনবিন্যাস, সমাজ কাঠামো ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। ফলে দেশ, দেশভাগ, বিভাজন, মানবম-লী সংক্রান্ত আলোচনা বা পর্যবোষণ উপরতলার জাতীয় স্তরের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়কে আশ্রয় করে করারও অবকাশ রয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে ৭৫ বছর পরেও দেশভাগের ক্ষত সমাজের শেকড় পর্যায়ের মানুষের মধ্যে কীভাবে ও কেমন ভাবে বিরাজমান, তা অনুভব করা সম্ভব হতে পারে। 

ক) কিশোরগঞ্জ শহরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়কে পুরনো লোকজন ভূপেশ বাবুর বাড়ি বলে জানে। ভূপেশ গুপ্ত পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের কমিউনিস্ট নেতা। দেশভাগের আগেই তিনি কলকাতার বাসিন্দা। যেমনভাবে ইটনার আনন্দমোহন বসু, কটিয়াদীর উপেন্দ্র কিশোর রায় প্রমুখের বসতবাড়ি পড়ে আছে কিন্তু তাঁরা নেই। তাঁদের শূন্যতা দেশভাগের কথা বার বার মনে করিয়ে দেয়। দেশভাগের কারণে উদ্বাস্তু না হয়েও তাঁরা কেউই আর ফিরে আসেন নি। এমন পরিবার অনেক যারা দেশভাগের আগে এবং দেশভাগের কারণে জন্মভূমি ছেড়েছেন। কখনো কলকাতা বা ভারতের কোথায় কোথায় তেমন পরিবারগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন তাদের দেখা পেলে সেসব কথা ফিরে এসে সঘন আবেগের সঙ্গে বর্ণনা করেন এবং সমগ্র শহরে তা আলোচিত হয়। 

খ) কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে খাজা নাজিমুদ্দীনের বাড়ি, শেরে বাংলা ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের বাড়িগুলোও হাত বদল হয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। দেশভাগ কলকাতার এমন অসংখ্য বাড়ির বাসিন্দাদের প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ করেছে।  

গ) দেশভাগের তোড়ে শুধু বাঙালিরাই নয়, একদল বিহারি এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আমাদের কিশোরগঞ্জ শহরে। সাধারণত উদ্বাস্তুরা সীমান্তের আশেপাশেই বসতি গড়েন। যশোর-চব্বিশ পরগণা, নদীয়া-কুষ্টিয়া, মালদা-চাঁপাই নবাবগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ-রাজশাহী, উভয় দিনাজপুরে এমন পরিস্থিতি দৃশ্যমান। অপশন দিয়ে কিংবা সম্পত্তি অদলবদল করে উভয় অংশের উদ্বাস্তু বা দেশান্তরী মানুষেরা সীমান্তের কাছাকাছিই অবস্থান করেন। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে: ১. দেশের কাছাকাছি থাকা। ২. ঋাষা ও সংস্কৃতির নৈকট্যের মধ্যে থাকা। ৩. রাজধানী বা বড় শহরে আর্থিক বা অন্যবিধ কারণে জায়গা করতে না পারা।  তাছাড়া স্থানান্তরিত লোকজন নতুন বসতি স্থাপন করেছেন কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি এমন স্থানে। যে কারণে সীমান্ত-সংলগ্ন জেলাগুলোর মতোই শিল্পশহর খুলনা ও বগুড়া, রেলশহর ঈশ্বরদী, শান্তাহার, জয়পুরহাটে বাঙালি ও অবাঙালি উদ্বাস্তুর ভিড় বেশি। রেলের চাকরির সুবাদে বিহারিা সেসব জায়গাতেই সংখ্যায় অধিক। কিন্তু একদল বিহারি, পেশায় যারা ধুনকর, বাস্তুচ্যুৎ হয়ে কিশোরগঞ্জে বসতি স্থাপন করেন। শৈশব থেকেই আমরা তাদের অবাক চোখে দেখতাম ভাষা ও সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার কারণে। বর্তমানে অবশ্য এদের স্থানীয়দের চেয়ে আলাদা করা যায় না। তথাপি বিহারের পূর্ণিয়া বা মুঙ্গের থেকে কিছু কিছু আত্মীয় প্রতিবছরই তাদের দেখতে আসেন, তারাও পালা করে ভারতের বিহারের আদিভিটায় তাদের ভাষায় ‘জিয়ারত’  করতে যান। সেসব আসা-যাওয়া ও মিথস্কিয়ার সূত্র এতো দ্বন্দ্ব-সংঘাত-বিভক্তি ও তিক্ততার পরেও ছিন্ন হয় নি।        

অতএব, দেশভাগে কেবলমাত্র সীমান্তবর্তী জেলাগুলো বিভাজিত হলেও তা সমগ্র বঙ্গদেশ তথা ভারতবর্ষকেই নানা মাত্রা ও পরিমাণে স্পর্শ করেছে এবং ভূগোলের বিভাজন মানুষের হৃদয় ও আবেগকে বিদীর্ণ করেছে। দেশভাগ মোটেও রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ভাগাভাগিতেই আচ্ছন্ন কিংবা সীমিত থাকে নি, তীব্রভাবে বিভক্ত ও বিভাজিত করেছে মানবম-লীর নানা প্রসঙ্গ ও প্রপঞ্জকেও। ৭৫ বছর পর সেই ফাঁক ও ফারাক বেড়েছে নাকি কমেছে, এমন প্রশ্ন উত্থাপন করা কী অনুচিত হবে? হয়ত রাজনৈতিক তর্কে এই প্রশ্নের মীমাংসা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তথাপি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রশ্নটিকে আদৌ উপেক্ষা করা সম্ভব হয় কি? মানুষের ‘মানবিক মন’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অক্লান্ত ও বিরামহীন।

২.

অত্যল্প আকারে হলেও জন্মস্থানকে টেনে আনা এবং এর মাহাত্ম্য ও ভৌগোলিক গাম্ভীর্য বর্ণনার মূল কারণ এই যে, অবিভক্ত বৃহৎ বঙ্গদেশের সঙ্গে এর বহুমাত্রিক সম্পর্কের নিরিখে ‘দেশভাগ’ নামক বিষয়টিকে পর্যালোচনা করা। তাছাড়া দেশভাগের ফলে সৃষ্ট ফাঁক, ভেদ ও বিভেদ, ক্ষতগুলো এবং অর্জন ও বিসর্জনগুলো সম্পর্কে বিগত ৭৫ বছরের পরিসরকে সামনে রেখে একটি পর্যবেক্ষণ করা। যদিও দেশভাগকে বীক্ষণ করার নানা মাত্রা ও দৃষ্টিভঙ্গির অভাব নেই। নানা তাত্ত্বিক ও বিদ্যায়তনিক কাঠামোতে এসব প্রচেষ্টা কমবেশি সচল। এবং এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম কাজ শুরু করেন সাহিত্যিকগণ, পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মাতারা এবং সর্বশেষে, অতিসম্প্রতি ইতিাহাস ও সমাজবিজ্ঞানের নানা শাখার অ্যাকাডেমিশিয়ানগণ। বলাবাহুল্য, দেশভাগ সংক্রান্ত যাবতীয় চর্চার কাজে ভারতের পশ্চিম সীমান্তের পাঞ্জাব অঞ্চল যতটুকু অগ্রগামী ও তৎপর, পূর্ব সীমান্তের বাংলা ভাষাভাষীগণ ততটুকু নয়, যদিও উভয় প্রান্তই দেশভাগের আঘাতে রক্তাক্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত।

ভারতের পশ্চিমাংশে উর্দু ভাষায় ১৯৪৭ সালের আগে ও অব্যবহিত পরেই দেশভাগ নিয়ে তীব্রভাবে লেখালেখি, চর্চা ও ডিসকোর্স নির্মাণ শুরু হয়, যার প্রভাব সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং নাটক, চলচ্চিত্রসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিটি অঙ্গনকে প্রবলভাবে স্পর্শ করে। দেশভাগ বা স্বাধীনতার আদিভোরেই ঔপনিবেশোত্তর সমাজে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার জনগণের সম্পদে পরিণত হওয়ার বদলে নানা স্বার্থগোষ্ঠীর কুক্ষিগত হওয়ার প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়েছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (জন্ম. ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১১, মৃত্যু. ২০ নভেম্বর ১৯৮৪) তাঁর ‘স্বাধীনতার সকাল: আগস্ট ১৯৪৭’ শিরোনামের কবিতায়:

                “ইয়ে দাগ দাগ উজালা, ইয়ে শাব গাজিদা সাহার

                উযো ইন্তিজার থা জিস কা, ইয়ে উয়ো সাহার তো নেহি।”    

                [এই ফ্যাকাশে আলো, অন্ধকারে-মোড়া এই সকাল

                এর জন্য তো অপেক্ষায় ছিলাম না আমরা।]

বাংলা ভাষায় দেশভাগ বিষয়ক আলাপ-আলোচনার সূত্রপাত আরো অনেক পরে এবং ধীর লয়ে। ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু জীবনের নানা যন্ত্রণা চিত্রিত হতে থাকে, সঙ্গে কিছু স্মৃতিকথা। বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আগত লেখকগণ নিজের মাটি তৈরির কাজটি সামলিয়ে আরো পরে কলম ধরেন। কলকাতার চলচ্চিত্রে মূর্ত হওয়া দেশভাগ বৃহত্তর দর্শকদের আলোড়িত করে এবং দেশভাগ সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনার পরিধি বৃদ্ধি পায়। কলকাতার উপান্তের এক বস্তিতে নীতা, গীতাদের রিফিউজি বাবা কিশোরগঞ্জের মাস্টার মশাইয়ের পরিবারকে আবর্তিত ঘটনা দেশভাগের ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়াগুলোর উন্মোচনের মাধ্যমে স্পর্শ করে মানুষকে। সবাই তখন আশেপাশে তাকিয়ে এমন আরো শত-সহ¯্র উদ্বাস্তু পরিবারের সাক্ষাৎ পান এবং তাঁদের পরিবর্তিত আত্ম-পরিচিতির অন্তরালে জীবন-সংগ্রামের গভীর দিকগুলোকে অনুভব করেন। শক্তিপদ রাজগুরুর মূল কাহিনী থেকে ঋত্বিক ঘটক ‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রে তেমনই শৈল্পিক প্রতিফলন ঘটিয়েছেন দেশান্তরী মানুষের চিরন্তণ আর্তিতে।  বহু বছর পেরিয়ে দেশভাগের ফলে বিভাজিত মানবম-লীর আর্তি চাপা পড়লেও একেবারেই শেষ হয়ে যায় নি। নতুন পরিবেশ, নতুন পরিচিতি, নতুন জীবনের হাতছানির মধ্যেও বুক-চাপা দীর্ঘশ্বাস ভেসে ভেসে ঠিক চলে যায় পূর্ব-পুরুষের আদিভিটায়, যা হয়ত হাতছাড়া হয়ে পড়ে আছে বিভক্ত বাংলা বা পাঞ্জাব বা ভারতবর্ষের কোনো কোনো প্রান্তে ও উপান্তে।

৩.

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমার কর্মক্ষেত্র শুধু বাংলার নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সর্বদক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের চট্টগ্রামে অবস্থিত। কিন্তু আমার জন্মস্থানের অবস্থান পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশের মোটামুটিভাবে মধ্যভাগে, যে এলাকা অবিভক্ত বৃহৎ বঙ্গদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি তথা সর্বক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিস্তারিত বিবরণ এড়িয়ে কয়েকজনের নাম করছি, বিচক্ষণ লোকের জন্য সামান্য ‘ইশারাই কাফি’ হবে: কবি চন্দ্রাবতী (ষোড়শ/সপ্তদশ শতাব্দী) মসনদ-ই-আলা ঈসা খাঁ (১৫৩৬-১৫৯৯), আনন্দমোহন বসু (১৮৪৭-১৯০৬), উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫), নীরোদ সি, চৌধুরী (১৮৯৭-১৯৯৯), শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন (১৯১৪-১৯৭৬), মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (১৮৮৯-১৯৭০), রেবতীমোহন বর্মণ (১৯০৩-১৯৫২), ড. নীহাররঞ্জন রায় (১৯০৩-১৯৮১), দেবব্রত বিশ্বাস (১৯১১-১৯৮০), ভূপেশ গুপ্ত (১৯১৪-১৯৮১), চুনী গোম্বামী (১৯৩৮-২০২০)। এই তালিকা সংক্ষিপ্তেরও সংক্ষিপ্ততম। এইসব নমস্য মানুষেরা বলতে গেলে কেউই দেশভাগ-জনিত কারণে বাস্তুচ্যুৎ ও দেশান্তরী নন। এদেরকে চলতি ভাষায় পূর্ববঙ্গীয় অর্থে বাঙাল বলা হলেও রিফিউজি বলা যায় না। দেশভাগের বহু বছর আগে থেকেই তাঁরা অবিভক্ত বাঙলার অগ্রসর নাগরিক রূপে তৎকালের অবিভক্ত বঙ্গদেশের রাজধানী শহর কলকাতার বাসিন্দা এবং বঙ্গীয় সমাজের নানা ক্ষেত্রে প্রভাবশালী বলে পরিগণিত।  কিন্তু স্ব স্ব ক্ষেত্রে কৃতবিদ এইসব মানুষের বা তাঁদের উত্তর-পুরুষদের আর ঘরে ফেরা হয় নি। দেশভাগের রাজনৈতিক পালাবদল ও ভৌগোলিক বিভাজনের কারণে তাঁরাও চিরতরে তাঁদের ‘দ্যাশ’ হারিয়েছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল তৎকালের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে উন্মূল করেনি, পূর্বাপর প্রজন্মেরও হানি ঘটিয়েছে। প্রজন্মের পাশাপাশি পরম্পরা, ঐতিহ্য, ঐক্য ও সংহতিতেও ছেদ ঘটিয়েছে। দেশভাগ একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক কাঠামোর জন্ম দিয়েছে চিরায়ত সামাজিক পাটাতনের বিনাশ ঘটিয়ে। দেশভাগের ফলাফল হয়েছে মিশ্র: হারানোর বিনিময়ে পাওয়া। আর দেশভাগের অঙ্কটির দৃশ্যপট যদিও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর, তথাপি এর প্রচ- প্রভাব পড়েছে উভয় প্রান্তের বিভাজিত মানুষের আত্মপরিচিতি ও আত্মস্মৃতিমালায়। এবং যার সুপ্ত বা প্রকাশ্য পড়েছে সামাজিক বিন্যাসে, সাংস্কৃতিক বুননে, ব্যক্তিগত আবেগের স্তরে। চিন্তা ও  মননের পরিসরে এবং চেতনাপ্রবাহে দেশভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপস্থিতি ৭৫ বছর পরেও তিরোহিত হয় নি। বরং দেশভাগের বড় মাপের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিভাজনের আড়াল থেকে প্রান্তিক মানুষের হাহাকার , ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষত, পচন ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়ে সামনে চলে আসছে।  সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, সময়ের পরিবর্তনে দেশভাগ রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিতর্ক পেরিয়ে ক্রমেই ব্যক্তিগত স্মৃতিচর্চা ও সাহিত্য সাধনার মতো নিরাপদ ক্ষেত্রের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে তা এখনো জীবন্ত উপস্থিতিতে বিরাজমান এবং ‘জাতীয় ইতিহাস রচনার সমস্যা’  রূপে গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি, ব্রিটিশ-ভারতের রক্ষক্ষয়ী বিভক্তির কারণ সম্পর্কে জানা ৭৫ বছর পরেও শেষ হয় না। নতুন প্রযুক্তি এবং কৌশল ব্যবহার করে গবেষকরা ১৯৪৭ সালের বিপর্যয়ের কারণগুলোর জন্য এখনো উত্তর খুঁজছেন, যা লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল। 

৪.

শুধু ১৯৪৭ সালেই নয়, ব্রিটিশরা বাংলা হয়ে ভারতের ক্ষমতা দখলের কারণে বাংলাকে এবং পরবর্তীতে ভারতের নানা অংশকে সময়-সময় রাজনৈতিক প্রয়োজনে ও প্রশাসনিক সুবিধার্থে বিভক্ত ও বিন্যস্থ করে। ব্রিটিশদের যে ‘ভাগ করো ও শাসন করে’ নীতিকে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার নেপথ্য কারণ রূপে বিবেচনা করা হয়, মাটি ও ভূগোলের বিভাজনেও তা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল, যার দীর্ঘমেয়াদী কুপ্রভাব ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-কালে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। বাংলার প্রসঙ্গে বলা যায় যে, বাংলা তথা অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশ বা বেঙ্গল প্রভিন্সকে ভৌগোলিক বিপুলায়তন এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ‘পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা’ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলা’ নামে অভিহিত করা হতো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিভক্ত ভারত ও বিভক্ত বাংলায় পূর্ব ও পশ্চিমের অঞ্চল দুটি নতুন রাজনৈতিক ইউনিট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একটি হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং অপরটি পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গ। ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর প্রদেশগুলোর প্রধানমন্ত্রী পরিচিতি পায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আর প্রদেশগুলো পরিচিতি পায় রাজ্য হিসেবে। অন্যদিকে, ১৯৫৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ পরিচিতি পায় পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে, যা ১৯৭১ সাল থেকে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব পড়েছে মানুষের পরিচিতিতে। কখনো তাঁরা ভারতীয় হয়েছেন, কখনো পাকিস্তানি বা বাংলাদেশি। এর বাইরেও তাঁদের ধর্মীয় পরিচিতি হিন্দু বা মুসলিম, অনেক সময়ই প্রাধান্য পেয়েছে। এইসব রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় পরিচিতির চাপে তাঁদের জাতিগত মূল পরিচিতি ‘বাঙালি’ বহুলাংশেই চাপে পড়েছে। পূর্বাঞ্চলের বাঙালিরা পাকিস্তানি-পাঞ্জাবি-উর্দুর চাপ প্রতিহত ও পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে। এতে বাঙালির জাতিগত আত্মপরিচিতি দীর্ঘ অবদমনের পর রাষ্ট্রনৈতিক আত্মপরিচিতির সাংবিধানিক-রাজনৈতিক বৈধতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।  দেশভাগের ফলে বাঙালির আত্মপরিচিতিতে যে বিভক্তি ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তার কতটুকু উপশম হলো এবং বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্কট কতটুকু কমলো বা বাড়লো, ৭৫ বছর পর এমন প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের যৌক্তিকতা এবং আত্মসমীক্ষার প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করা যায় না।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে চিরতরে বিদায়ের আগে ব্রিটিশদের যাবতীয় লুণ্ঠন ও অপশাসনের ইতিবৃত্ত ও জাতিগত নিপীড়ন চাপা পড়ে স্বাধীনতা ও দেশভাগের দ্বৈরথে সৃষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবর্তে। ভারত ভাগের অংশ হিসেবে বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। অবিভক্ত বাঙলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তানের পূর্ব বাংলা এবং অবশিষ্টাংশ নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ গঠন করা হয়। তবে ব্রিটিশরাজের কাছ থেকে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি বা ভারতবিভক্তি, যা-ই বলা হোক না কেন, ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাঁক এবং পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বড় আকারের একটি দেশান্তরেরও ঘটনা। দেশভাগের ঘটনা ঐতিহাসিক নথিপথে যেমন লিপিবদ্ধ রয়েছে, তেমনিভাবে বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে। বিপর্যস্ত ও ভোক্তভোগী পরিবারের পরম্পরায় ঘটনাটি অমোচনীয়। পূর্বপুরুষের ভিটা দেখতে গিয়ে প্রতিবারই এসব দেশান্তরী মানুষের মনে জাগে দেশভাগের স্মৃতি। সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চপদাধিকারীও দেশভাগের রাজনৈতিক অভিঘাতের আবেগ থেকে বিযুক্ত হতে পারেন নি।

প্রসঙ্গত সিপিএম যখন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায়, তখন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও তাঁর স্ত্রীর বৃহত্তর ঢাকা জেলায় তাঁদের পৈত্রিক নিবাসে বাংলা ভাগের পর প্রথম আগমনের কথা স্মরণযোগ্য। বসু পরিবারের দেশের মাটি ছোঁয়ার সময়কার আবেগময় বর্ণনা তৎকালের গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছিল। এমনকি, যেখানে একসময় পরিবারের পূর্বপুরুষগণ তাঁদের দৈনন্দিন পূজা-আচার সম্পন্ন করতেন, সেই পরিত্যক্ত মন্দির থেকে জ্যোতি বসুর স্ত্রী ফিরে যাওয়ার সময় স্মৃতিস্বরূপ এক মুঠো মাটি নিয়ে গিয়েছিলেন। সন্দেহ নেই, দীর্ঘবছর পর পূর্বপুরুষের একদার আবাস দেখে বহুমাত্রিক অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা প্রকাশিত হওয়াই স্বাভাবিক। পূর্বপুরুষের ভিটা, স্মৃতিমন্দির, কবরগাহ, ধর্মস্থান হয়তো পরিত্যক্ত কিংবা কালের করাল গ্রাসে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু সেখানেই দেশভাগের ফলে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন পরবর্তী-প্রজন্ম কখনো ফিরে এসে ঐতিহ্য ও উত্তাধিকারের শেকড়ের ছোঁয়া পেয়েছেন। দেশভাগ ও ভৌগোলিক বিভাজন রাজনৈতিকভাবে মানুষকে বিছিন্ন করলেও মানবম-লীর আবেগ ও অনুভূতি, ঐতিহ্য ও পরম্পরার জায়গাটিকে নস্যাৎ করতে পারেনি, যদি না কেউ, খুবই ব্যতিক্রম স্বরূপ, স্বেচ্ছায় নিজের অতীত ও পরিচিতি থেকে বিস্মৃত ও বিযুক্ত না হয়। কারণ, অনেক উদ্বাস্তুই বিদ্যমান বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারেনা এবং পরিস্থিতির কাছে হার মানে এইজন্য যে, “Refugees often find a conflict between the identity they have left behind and the one that lies before them. The boundary between the ‘self’ and the ‘other’ becomes futher exacerbated in a space of strong national identy.”

তথাপি, দেশভাগ নিয়ে ব্যক্তিগত ও বিদ্যায়তনিক পর্যায়ে প্রশ্ন, সমীক্ষা, অনুসন্ধান ও দ্বিধার পাশাপাশি আত্মপরিচিতি পুনর্নিমাণের প্রচেষ্টা ৭৫ বছর পরেও তাৎপর্য হারায় না। রাজনৈতিকভাবে ‘সঠিক’ লেবেল এঁটে নেতৃবৃন্দ কর্তৃক ‘দেশভাগের সঙ্কুলতায় বিহ্বল’ জনতার উপর যে বিভাজন ও দুর্ভোগ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই জনতাও ঘোর কাটিয়ে সচকিত হয়। সচেতন মন তখন বাস্তবের মাটির একদিকে দেখতে পায় একদল লোককে, যারা বিভাজন চেয়েছিলেন, অন্যদিকে, আরেক দল লোক, যারা বাটোয়ারা চান নি।  তবে সবচেয়ে বড় যে দল বা অংশটি ছিলেন আমজনতা, তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রক্ত, আগুন, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ও সশস্ত্র-উত্তেজনার মধ্য দিয়ে ভাগাভাগি মানতে বাধ্য হয়েছিলেন, যে ভাগাভাগি সম্পন্ন করা হয়েছিল সুদূর দিল্লিতে তাদের মতামতকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে এবং তা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের পরিসরে। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ঘর-বাড়ি হারিয়েছেন এবং নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে মানব¯্রােতের সঙ্গে ভেসে গিয়েছেন। আর সেই নিরীহ জনতার বৃহদাংশই দাঙ্গা কবলিত ও দেশভাগের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুৎ হন। রাজনীতিবিদগণ তখন অনেকদুরে, ক্ষমতার অলিন্দে পদ-পদবী-সুযোগ-সুবিধা-সম্পদ ইত্যাদির ভাগ-বাটোয়ার ব্যস্ত ছিলেন। জনতার রক্তপাত দেখার মতো মানসিকতা তাঁদের অধিকাংশেরই তখন ছিল না। স্ব স্ব রাজনৈতিক বিজয়ে তাঁরা ছিলেন উৎফুল্ল ও খুশি এবং বিদ্যমান রক্তাক্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে নেতাদের অত্যল্প সংখ্যকই অনুভূতির প্রকাশ ও সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করতে ইচ্ছুক ছিলেন।

৬.

৭৫ বছরে নানাভাবে দেশভাগের ক্ষত মোচনের কাজ করা হয়েছে। উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের নানা রকম প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। সংগ্রামশীল মানুষও সঙ্কুলতা কাটিয়ে নিজস্ব মাটি তৈরি করে  পরিবর্তিত বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ‘দেশভাগ’ ঘটনাকে ভুলতে পারেন নি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই যে, দেশভাগ নিয়ে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আত্মসমীক্ষা, পরিচিতির সঙ্কট ও নানাবিধ চর্চা ও  বিতর্ক এখনো পণ্ডিত মহলে যেমন টাটকা, তেমনিভাবে জনমানসেও সজিব। সর্বসাম্প্রতিক সমীক্ষায় তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সমীক্ষাটি চালিয়েছিল ভারতের ‘সি ভোটার’ নামের একটি সংস্থা। দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে এই সমীক্ষায় অংশ নেন বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি নাগরিকগণ। এই সমীক্ষায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। ২০২২ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে পরিচালিত এই সমীক্ষায় চুয়াল্লিশ শতাংশ মানুষ মনে করেছেন, দেশভাগ তথা ভারত-পাকিস্তান ভাগ ঠিক হয় নি। কিন্তু ৪৬ শতাংশ মানুষ মনে করেছেন যে, দেশভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। বড়ো মাপের এই সমীক্ষায় পাঁচ হাজার আটশো পনেরো জন ভারতীয় অংশ নেন। এর মধ্যে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং গোয়ার মানুষজন দেশভাগ বা পার্টিশান-এর বিরুদ্ধে অভিমত দেন। সমীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতের জন্যে কারা সব থেকে নিরাপদ প্রতিবেশী? এই প্রশ্নের জবাবে ষাট শতাংশ বলেছেন, ভারতের সব থেকে নিরাপদ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলো বাংলাদেশ। ভারতের পক্ষে নিরাপদ কি পাকিস্তান? এই প্রশ্নের জবাবে ৮৬ শতাংশ বলেছেন, না, পাকিস্তান নিরাপদ প্রতিবেশী নয়। উল্লেখ্য, পনেরোটি ভাষায় এই সমীক্ষা চালানো হয়। ‘সি ভোটার’-এর সাহায্যকারী সংস্থা হিসাবে সমীক্ষায় কাজ করেছিল ‘সি পি আর’।  একই প্রশ্ন যদি একটু ঘুরিয়ে করা হয়, তাহলে কেমন উত্তর পাওয়া যাবে, সমীক্ষায় তার উল্লেখ করা হয় নি। তবে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘পাকিস্তানের পক্ষে নিরাপদ কি ভারত?’ এই প্রশ্নের জবাবে অধিকাংশই বলবেন, না, ভারত মোটেও পাকিস্তান নিরাপদ প্রতিবেশী নয়। যেমনটি ভারতীয়রা মনে করেন যে, পাকিস্তান নিরাপদ প্রতিবেশী নয়। যে বৈরিতার উত্তরাধিকার ৭৫ বছর আগে রক্ত ও মৃত্যুর পথে বিভাজন এনেছিল, সেই বৈরিতার অবসান যে এখনো হয় নি, জনসমীক্ষার তারও প্রমাণবহ। বিভক্তির জন্য সাতচল্লিশের যে নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, বছরের পর বছর দূরত্ব ও শত্রুতা জিইয়ে রাখার জন্য পরবর্তী নেতৃত্ব নিশ্চয় ইতিহাসের-কাঠগড়ায় নিজেদের দেখতে পাবেন।

সমীক্ষার আরেকটি প্রশ্ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তা হলো, ‘ভারতের জন্যে কারা সব থেকে নিরাপদ প্রতিবেশী?’ সিংহভাগের উত্তর ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এই প্রশ্নটি কিঞ্চিত বদলে যদি জানতে চাওয়া হয়, ‘বাংলাদেশের জন্যে কারা সব থেকে নিরাপদ প্রতিবেশী?’ এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় বিকল্প খুঁজে পাওয়াও সম্ভব হবে না। কারণ, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রায়-পুরোটাই ভারতের সঙ্গে। অতি সামান্য সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমানের সঙ্গে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানার ৪,১৫৬ কিলোমিটার ভারতের সঙ্গে আর মিয়ানমারের সঙ্গে রয়েছে মাত্র ২৭১ কিলোমিটার। ফলে ভারতের বাইরে অন্য কোনো নিকট-প্রতিবেশীর কথা বিবেচনায় আনা প্রাকৃতিক-ভূগোলের কারণেই প্রায়-অসম্ভব। তদুপরি মিয়ানমার প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের সীমান্তে সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে এবং তার দেশের দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে চরম বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে বৈরী-প্রতিবেশীর তকমা পেয়েছে।

পক্ষান্তরে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের আর্থ-সামাজিক-নিরাপত্তা ইত্যাদি যাবতীয় ইস্যু যেমনভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে নির্ভরশীল, তেমনিভাবে বাংলাদেশও তিন দিক দিয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত। সীমান্তের এই নিবিড় সম্পর্কের পাশাপাশি ছিটমহল, অভিন্ন নদীসহ আরো অনেক সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আছে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, যাকে নস্যাৎ করেছে দেশভাগ। দেশভাগের পরেও কিছু বিষয় ভাগ হতে পারেনি: আবেগ, পরম্পরা, স্মৃতি ও শেকড়, যা দুই দেশের মানুষই বহন করছেন। ফলে কার্যক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত যেন নিজেদের সবচেয়ে নিরাপদ প্রতিবেশি ভাবতে পারে, তার জন্য স্ব স্ব দেশের সরকারগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজের পক্ষেও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গৃহীত হওয়া উচিত। অন্তত, শান্তিকামী ও মুক্তমনা মানুষদের, যাদের নূন্যতম ইতিহাসবোধ, আত্মমর্যাদা ও স্বকীয় পরিচিতি আছে এবং হানাহানি, সাম্প্রদায়িকতা ও বিভেদের অতীত সম্পর্কে অত্যল্প হলেও পাঠ রয়েছে, তাদেরকে অবশ্যই উভয় দেশ ও দেশের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, মৈত্রী ও সম্মানজনক সহাবস্থানের প্রশ্নে আপোসহীন হতেই হবে।

৭.

সন্দেহ নেই, দেশভাগ বিভাজিত ভূগোলোর বিভাজিত মানুষের জীবন-ইতিহাস ভাঙা-গড়া, নির্মাণ-বিনির্মাণের ক্ষেত্রে একটি প্রধান প্রসঙ্গ। যে ইতিহাসের অর্ধেক দৃশ্যমান ও নিত্যসঙ্গী; বাকী অর্ধেক অদৃশ্য, যা ফেলে আসতে হয়েছে। রাজনৈতিক আইন কিংবা সাংবিধানিক আলোচনার পরিরিধিতে ব্যক্তি মানুষের এসব ত্যাগ স্থান পায় নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম, উভয় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের জীবনও যে বিভাজিত হলো, দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে, সে জীবনের বিপর্যয় ও অভিজ্ঞতাকে ‘সরকারি ভাষ্যে’ তুলে ধরার কোনো পরিসরই রাখা হয় নি। পরিবেশটি ছিল এমনই যে, কে কাকে তাড়িয়ে নিজের অবস্থান মজবুত করতে পারবে, সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য। রাজনীতিবিদগণ ক্ষমতা মজবুত করেছেন আর আমজনতা সামাজিক-আর্থিকভাবে তৃণমূল স্তরে নিজেকে সুসংহত করেছেন। এমতাবস্থায়, প্রান্তিক, সংখ্যালঘু, নিরিহ মানুষেরা আলিঙ্গণ করেছেন দেশভাগের জ্বালা, বিভাজন, সীমাহীন ত্যাগ ও দুর্ভোগ। এ কথাও আমরা ভুলে যাই যে, ব্রিটিশ-ভারতের বিভক্তিকরণ শুধু একটি সাংবিধানিক দেশবিভক্তিতেই আলোচনার টেবিলে বা আইনসভার বৈঠকে বসেই নিষ্পন্ন হয় নি, বরং দক্ষিণ এশিয়া নামের আসমুদ্রব্যাপী একক ও একটি জীবন্ত ভৌগোলিক ইউনিটকে কাটাছেড়া করা হয়েছে। বিভাজিত ও কর্তিত হয়েছে নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল, মানুষ ও পশু-পাখির আবাস। সুন্দরবন, কচ্ছের রান কিংবা থর মরুর জীববৈচিত্র ও প্রাণিকূল পর্যন্ত উন্মূল হয়েছে এই বিভাজনের কারণে। এবং বহু ক্ষেত্রেই অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত ও পরিবারিক জীবন পর্যন্ত তছনছ হয়ে গিয়েছে। সীমান্তরেখায় অসংখ্য ঘরগেরস্তালি, পরিবার ও মানুষের জীবনের মর্মান্তিক ব্যবচ্ছেদ যার প্রমাণবহ।

রাজনীতির চৌহদ্দীর বাইরে এসে মানবিক বিপর্যয়ের এইসব ইতিবৃত্ত ও স্মৃতিমালার গুরুত্ব কতটুকু? কিংবা এসবের আদৌ কোনো তুল্যমূল্য ও গুরুত্ব রয়েছে? ৭৫ বছর পর দেশভাগের বহুমুখী অভিঘাতসমূহ কতটুকু জীবন্ত রয়েছে? কিংবা কতটুকু জীবন্ত থাকা উচিত? এসব প্রশ্নের উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকমের হওয়াই স্বাভাবিক। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি তরুণী আনাম জাকারিয়া  যেমন দেশভাগ সম্পর্কে কয়েক প্রজন্ম পরের অভিব্যক্তি সংগ্রহ করেন তার গ্রন্থসমূহে  তেমনি অনেকেই রিফিউজি অতীত মুছে নতুন পরিচিতি নির্মাণে অতি সাবধানতায় তৎপর হন। দেশভাগ নিয়ে রাজনীতিতে যেমন দ্বিধার বিস্তার, ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আর জনমানসেও রয়েছে বিহ্বলতা। বরং বলা ভালো, একটি অভিযোজন ধারায় দেশভাগকে আত্মস্থ করেই এগিয়ে চলেছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুৎ মানুষজন। কলকাতার পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ বা আলিপুরের পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে নতুন বাসিন্দারা স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করছেন। ঢাকার উয়ারি, শাঁখারী বাজার, গেন্ডারিয়ায় নবাগতরা আরামে দিনযাপন করছেন। কলকাতার আশেপাশে যেসব ছিল ‘রিফিউজি কলোনি’, সেগুলোর চমৎকার নামকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ভারত প্রত্যাগতদের যে ‘রিফিউজি পাড়া’ ছিল, সেগুলো নতুন নতুন বর্ণাঢ্য নামে অলঙ্কৃত হয়েছে। রাজনীতি যে দেশভাগ এনেছিল, সামাজিক বিবর্তনে সেগুলোর বহুলাংশ হয়ত সহনীয় হয়ে গেছে। কিন্তু ৭৫ বছর পরেও দেশভাগের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে সমীক্ষার অন্ত নেই। দেশভাগের স্মৃতি ও দ্রষ্টব্য সংরক্ষণ বন্ধ নেই। দেশভাগের বহুমাত্রিক অভিঘাত মানুষ-সমাজ-রাজনীতিতে কতটুকু জীবন্ত রয়েছে কিংবা কতটুকু জীবন্ত থাকা উচিত, এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের ‘যুগান্তকারী আলোচ্য বিষয়বস্তু’  হিসেবে দেশভাগ নামক প্রপঞ্চটি সামনে এসে দাঁড়াবেই। আর তখনই দেখতে পাওয়া যায় যে, রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতায় জারিত উগ্র জাতীয়তাবাদী পেশাদার ঐতিহাসিকদের চেতনাবোধের প্রলেপ দেশভাগের যাবতীয় প্রপঞ্চে প্রবলভাবে আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। আবার ‘সাম্প্রদায়িকতা’র ইতিহাসবেত্তাগণ হিন্দু ও মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে যে ইতিহাস রচনা করেছেন, তা দেশভাগের পূর্ব ও পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের চর্বিকর্চবণ মাত্র। এই উভয়বিধ ইতিহাসচর্চার সীমাবদ্ধতা এই যে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভক্তিকালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, বিশেষত ভাষা ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রান্তিক, পশ্চাৎপদ ও সংখ্যালঘুতর মানুষের কথা সরকারি ইতিহাসভাষ্যে প্রায়-অনুপস্থিত। এতে দেশভাগের মূল¯্রােতের ঘটনাবলির আড়ালে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্রের ও সঙ্কটের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু উপাখ্যান চাপা পড়ে যায়। এবং দেশভাগ নামক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাসুল জনজাতি ও প্রান্তিক সম্প্রদায়সমূহের মানবম-লী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কীভাবে বহণ করেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটুকু আদৌ গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। বস্তুতপক্ষে, দেশভাগের অফিসিয়াল ইতিহাসের ভাষ্যে মূলত আলোচিত হয়েছে রাজনৈতিক সঙ্কটের বিষয়াবলি, যে ইতিহাস কখনোই সেইসব মানুষের জীবন আর অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করেনি. যাঁরা দেশভাগের সঙ্কটকাল পাড়ি দিয়েছিলেন। এটাও ইতিহাসের ব্যর্থতা যে, দেশভাগের পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ মানুষের মনে কেমন ছাপ ফেলেছিল, কীভাবে মানুষের পরিচিতির সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, অনিশ্চয়তার অমানিশা নেমে এসেছিল সমাজ জীবনে এবং সর্বপরি দেশভাগের কারণে সমাজে ও মানুষের জীবনে যে ক্ষত, হতাশা ও বেদনা আরোপিত হয়েছিল তা পুরোপুরিভাবে চিত্রিত করা হয়নি।  

বরং ইংরেজ, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আলাপ-আলোচনা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির টানাপোড়েনের বৃত্তেই আবর্তিত হয়েছে দেশভাগের যাবতীয় অনুষঙ্গ। দেশভাগের রেকর্ড বা নথিপত্রের বিশাল ভা-ারও এক মানব বিপর্যয় মিশ্রিত স্বাধীনতার তথ্য উপস্থাপন করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো ট্র্যাজিক দেশভাগ। জন্মভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার বাস্তবতা, উদ্বাস্তু মানুষের জন¯্রােত, সাম্প্রদায়িত দাঙ্গা, দেশত্যাগ, ধর্ষণ, অপহরণ, বলপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ প্রভৃতি নির্মম ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে যে দেশভাগ, যা আসলে দেশের ব্যবচ্ছেদ, মানুষের বিচ্ছেদ আর এসবই সংঘটিত হয়েছে একটি দীর্ঘ সময়কালের পরিধিতে এবং তা সুপ্তভাবে অব্যাহত থেকেছে সরকারিভাবে দেশবিভক্তির অনেক বছর পর্যন্ত। এমনকি, দেশভাগের ৭৫ বছর পরেও দেশভাগ ও বিভাজনের ঘটনাবলির ঐতিহাসিক দায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাড়িত করছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিকত্ব, জাতিত্ব, আত্মপরিচিতি, সীমান্ত, সমাজ ব্যবস্থা এবং সর্বপরি মানবমণ্ডলীকে।

৮.

বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার গণমাধ্যমে দেশভাগের ৭৫ বছরের পর্যালোচনায় অপ্রাপ্তির ঐতিহাসিক দায়বোধ থেকে উচ্চারিত কথাগুলোকেই উপসংহার হিসাবে বলা যেতে পারে। ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকের ভাষ্যে: ” Seventy-five years after the Partition of the Indian subcontinent, we are still a long way from understanding the complex ways in which this event affected the everyday lives of people and communities then, and how it still continues to shape our collective consciousness, politics and ways of being.”

কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ও এ বিষয়ে সরব। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ যে কতটাই উপরিতলের ভাগ ছিল, অন্তরটানে দুই বাংলা যে কতটা যুক্ত ছিল, শুধু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় তার সাক্ষ্য বলে মনে করে পত্রিকাটি। তাদের ভাষ্যে: অর্ধশতাধিক বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, ১৯৭১ সালের গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবে কেবল পূর্ববঙ্গের দিক থেকেই দেখা হয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেও যে তার একটা বিরাট ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল, তা যেন এখনো ততটা বোঝা হয় নি। সেই গুরুত্ব খতিয়ে দেখতে গিয়ে যদি দাবি করা হয়, বঙ্গীয় হিন্দু ও মুসলমান সমাজ এত বেশি কাছাকাছি তার আগে বা পরে কখনোই আসেনি, খুব ভুল হবে কি? বিশ শতকের ইতিহাসে এমন আর একটি মুহূর্ত পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না, যখন দুই বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্মিলিত জনসমাজ একই আবেগে থরোথরো, একই প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভাসিত। বঙ্গভঙ্গ-স্বদেশি যুগের কথা মনে করতে পারেন কেউ। ইতিহাস-পাঠক তাঁকে তখন মনে করিয়ে দিতে পারেন, আকারে ও প্রকারে দুই সময়ের আন্দোলিত জনসমাজের কোনো তুলনাই হয় না। একে তো স্বদেশি আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছিল কম, তার উপরে বাঙালি মুসলমান তাতে কতখানি অংশ নিয়েছিলেন, বিতর্কের বিষয়। পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোতেও একত্র রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রসার অতখানি ছিল না। ১৯৩০-এর দশক থেকে দুই সমাজ আরো দূরবর্তী হতে শুরু করে, যার চরম বিপর্যয় ঘটে কিংবা রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির মাধ্যমে ঘটানো হয় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়। আবার ১৯৭১ সালের দিনগুলো বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে এক দুর্লভ মাহাত্ম্যে ও সৌহার্দ্যে পরিপূর্ণ। আর সব পরিচয়, বিশেষত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দূরত্ব তুচ্ছ হয়ে যায় বাঙালি পরিচয়ের সামনে। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু-মুসলমান হাতে হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে দেখে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা চুপ থাকতে পারেনি। দেশভাগের বিশাল দূরত্ব ১৯৭১ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল আর কলকাতার বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক প্রকাশ্যে লিপিবদ্ধ করলেন ঐতিহাসিক ভাষ্য: যা প্রকাশ পায় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় ১৩ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সন্তোষকুমার ঘোষ লিখছেন: “ভুল, ভুল, একেবারে ভুল। সাত কোটি বাঙালিরে জননী মানুষও করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভুলটা ধরা পড়েছে এত দিনে। ওঁরা ধরিয়ে দিলেন। আমরা কৃতজ্ঞ।” 

দেশভাগের ক্ষত সারিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ ও একাকার করেছিল। বাঙালির আত্মপরিচয়ের দীপ্তিতে মুছে গিয়েছিল সাম্প্রদায়িক হানাহানির অতীতের গর্ভে লুক্কায়িত ভ্রাতৃঘাতের পাপ। বাংলার আকাশে মুক্তির লাল সূর্য উদ্ভাসিত করেছিল প্রতিটি বাঙালিকে। ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলো দেশভাগের বিভাজনের পথ-পরিক্রমায়। কিন্তু ১৯৭১-এর মতো আত্মপরিচিতির উদ্ভাস যুক্ত-বাঙালির ঐতিহাসিক ঐক্যের ছায়াপাতে আবার কবে দেখতে পাওয়া যাবে?

তথ্যসূত্র

আহমেদ কামাল, ‘দেশবিভাগের অভিজ্ঞতা ও জাতীয় ইতিহাস রচনার সমস্যা’, প্রতিচিন্তা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১১ সংখ্যা।

দীনেশচন্দ্র সেন, মৈমনসিংহ গীতিকা, ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য ভবন, ২০১৫। 

ঋত্বিককুমার ঘটক, মেঘে ঢাকা তারা: চিত্রনাট্য ও সমালোচনা, ঢাকা: নালন্দা, ২০১৬।

ঋত্বিককুমার ঘটক, চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০১৩।

মাহফুজ পারভেজ, বঙ্গবন্ধু: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, ঢাকা: স্টুডেন্ট ওয়েজ, ২০২৩.

মাহফুজ পারভেজ, ‘দেশভাগের রক্তাক্ত পদচিহ্ন’, কালি ও কলম, ২২ নভেম্বর ২০১৭।

মাহফুজ পারভেজ, ‘ঋত্বিক ঘটক: চলচ্চিত্রের শিল্পিত কারিগর’, বার্তা২৪.কম।

মাহফুজ পারভেজ, ‘সুবর্ণরেখা: নদী ও মানুষের আখ্যান’,বাতা২৪.কম।

প্রথম আলো, ২৯ মার্চ, ২০২৩

জয়া চ্যাচার্জি, বাংলা ভাগ হলো, ঢাকা: ইউপিএল, ২০১৪।

জয়া চ্যাটার্জি, দেশভাগের অর্জন: বাঙলা ও ভারত (১৯৪৭-১৯৬৭), ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০২২।

‘৬০ শতাংশ ভারতীয় মনে করে বাংলাদেশ নিরাপদ প্রতিবেশী’, মানব জমিন, ৫ অক্টোবর, ২০২২।

সেমন্তী ঘোষ, ‘একাত্তর ছিল এ বঙ্গের বাঙালির পরিচয় গৌরবের সেরা পরীক্ষা’, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ মার্চ, ২০২৩

Ali Madeeh Hashmi, Love and Revolution: Faiz Ahmed Faiz-The Authorized Biography, New Delhi: Rupa Publications India, 2016.

Alvin Powell, “Using new technology and techniques, scholars seek answers for 1947 cataclysm that killed millions”, Harvard Gazette, April 6, 2018.

Anam Zakaria, 1971: A People's History from Bangladesh, Pakistan and India, London: Penguin Random House, 2019.

Anam Zakaria, Between the Great Divide: A Journey into Pakistan-administered Kashmir, New Delhi: HarperCollins India, 2018.

Anam Zakaria, The Footprints of Partition: Narratives of Four Generations of Pakistanis and India, New York: HarperCollins, 2015.

Elena Montazemi Safari, ‘The Refugee Identity Crisis’, BizGees, 7 May 2021.

Estelle Dryland, Faiz Ahmed Faiz: Urdu Poet of Social Realism, Karachi: Vanguard Books, 1993.

Gopi Chand Narang, Urdu Language and Literature: Critical Perspectives, Delhi: Sterling Pub. Ltd., 1987.

John Zaw, ‘Suu Kyi’s Call for Peace Sounds Hollow’, UCANEWS, 13 October, 2017.

Rup Kumar Barman, ‘Partition of Bengal and Struggle for Existance of the Host Society: The Case of the Rajbanshis of North Bengal’ in Chhanda Chatterjee (ed.), The Partition of the Indian Subcontinent (1947) and Beyond: Uneasy Borders, New Delhi: Routledge India, 2023.

‘75 Years of Partition’ The Daily Star, 7 October, 2022.  

[1] ‘75 Years of Partition’ The Daily Star, 7 October, 2022.  

;

ছোটগল্প

একজন মিমির জন্য



ওমর শরীফ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রক্তিম লালে ভরে গেছে কৃষ্ণচূড়ার গাছটা। দোতলার বারান্দা থেকে সম্পূর্ণ গাছটাই দেখা যায় খুব চমৎকার ভাবে। শাহেদ সেইদিকেই আনমনে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিল, পেছনে কখন পরী এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি। ভাইয়া ডাকে চেতনা ফিরে পেল যেন। পরী শাহেদের মেজ খালার মেয়ে , তাদের বয়সের পার্থক্য খুব বেশি না হলেও ছয়-সাত বললে খুব বাড়িয়ে বলা হবে না । কারণ পরী যেখানে অনার্স শুরু করতে যাচ্ছে সেখানে শাহেদের মাস্টার্স প্রায় শেষের দিকে।

শাহেদ ছয় ফুটের কাছাকাছি শুঠাম দেহী, যাকে এক নজরে সুপুরুষ বললে ভুল হবে না, এরই সঙ্গে তার আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছিল তার গৌরবর্ণ, ধীর ও বুধিদীপ্ত স্বভাব । আর পরী শুশ্রী আয়তোচলনা, চোখে দিঘির গভীরতা, যেমন কোমল মন তেমনই কোমল স্বভাবের, থাকে চট্টগ্রামের খুলশিতে, এডমিশনের জন্য ঢাকায় এসেছে। শাহেদের সঙ্গে একটি বিষয়েই শুধু অমিল তা হচ্ছে পরী অনেক কথা বলতে ভালবাসে কিন্তু শাহেদ ঠিক তার উল্টো, খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা থেকে বিরত থাকে, যাকে বলে পারফেক্ট মিতভাষী।

পরীর ডাকে ঘুরে তাকাল শাহেদ আর ওকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো

- আরে পরী কখন এসেছ? তোমাদের না কালকে আসার কথা ছিল। খালামনি কোথায়? আসতে কোনও সমস্যা হয়নি তো ? আগে জানালে এয়ারপোর্টে আমি আনতে যেতাম। আহ কি যে করনা তোমারা? শাহেদ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল কথাগুলো।
পরী কথা শুনছিল আর এক দৃষ্টে শাহেদের দিকে চেয়ে ছিল। এত প্রশ্ন এত কথা, নিজের শরীরে চিমটি কেটে বোঝার চেষ্টা করলো- ইনি আদৌ শাহেদ কিনা?! শাহেদের দৃষ্টিতে শুন্যতা ছিল কিন্তু আন্তরিকতার কোনও অভাব ছিলনা এটা বেশ উপলব্ধি করলো পরী। স্বাভাবসুলভ মিষ্টি হাসিতে পরী উত্তরে বললো
তোমাকে অবাক করে দিতেই আমরা কালকে না এসে আজকেই চলে এলাম, কি কেমন সারপ্রাইজ দিলাম?
না একেবারে মন্দনা, বলতে পার পুরো ব্যাপারটাই হজম করতে কষ্ট হচ্ছে
- তার মানে খুশি হওনি, বলো? ধুর আসাটায় ভুল হয়েছে !!
- না না একেবারেই না । ভীষণ খুশি হয়েছি, কিন্তু ইচ্ছা ছিল তোমাদের এয়ারপোর্টে নিতে যাবো, কিন্তু তোমরাতো এসে উপস্থিত। হাসতে হাসতে বলল “সুস্বাগতম”। আর তোমার ভর্তির খবর কি?
- কালকে ফর্মালিটি সেরে ফেলবো ভাবছি।
- গুড এন্ড কংরাচুলেসন্স এগেইন
- ইউ আর ওয়েলকাম
বলেই দুজনে হেসে দিলো। শাহেদ পরীকে বললো চলো নিচে যাওয়া যাক, খালামনির সঙ্গে দেখা করি। নিচে নেমেই খালার সঙ্গে সালাম বিনিময় করে পাশের সোফায় গিয়ে বসলো শাহেদ। একথা সেকথার মধ্যে মা বললেন আগামী কাল তোকে পরীকে ইউনিভার্সিটি নিয়ে যেতে হবে ওর ভর্তির কিছু কাজ আছে। সাহেদ বললো কোন অসুবিধা নেই , আমাকে তো এমনিই যেতে হয়, একথা বলে ১০টার সময় রেডি থাকার কথা বললো শাহেদ পরীকে, পরীও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
রাতে খাবার টেবিলে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে শাহেদের মা ইনিয়ে বিনিয়ে বলার চেষ্টা করলো যে পরী খুব লক্ষ্মী মেয়ে, খুব ভাল গান গায় আবার রান্নাও করে । লেখা পড়াই খুব ভাল, বড়দের খুব সম্মান করে ইত্যাদি ইত্যাদি। শাহেদ হু সূচক মাথা নাড়ালো, শাহেদ মোটেও বোকা নয় এসকল কথার মানে সে হাড়ে হাড়ে বোঝে, কথাগুলোকে খুব বেশি পাত্তা না দিয়ে খাওয়া শেষে সে নিজের ঘরে চলে গেল।


মর্নিং ওয়াক শাহেদের অত্যন্ত পছন্দের একটা বিষয়। প্রতিদিন হাঁটা চাই ই চাই। সকালে হাঁটা শেষে ফিরে এসে দেখে পরী মুখ গোমরা করে ওর অপেক্ষা করছে। কিছু বলার আগেই পরী বলে উঠলো
- ইস আমাকেও তো নিয়ে যেতে পারতে, আমিও সকালটা উপভোগ করতাম এ তোমার ভারি অন্যায়।
- তুমি যে সকালে হাঁটতে ভালোবাসো তাতো জানা ছিল না। আর শুনেছি তুমি ঘুমকাতুরে, সকালে খুব ঘুমাতে পছন্দ করো। আচ্ছা মনে থাকবে, এরপর অবশ্যই নিয়ে যাবো।
- আচ্ছা তুমি কবে থেকে এতও কথা শিখলে, আগে তো হাজার কথা জিজ্ঞস করলে একটা দুটা কথা বলতে?
- মানুষ সদা পরিবর্তনশীল পরীমনি । আর ওটা অন্যদের জন্য, নিজের মানুষের জন্য না, বুঝেছো?

কথাটা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না পরীর, শুধু মাথার মধ্যে “নিজের মানুষের জন্য” কথাটি ঘুরতে লাগলো আর পরীহীন পুলকে শিহরিত হতে লাগলো।


পরের দিন ঠিক ১০টার সময় শাহেদ রেডি হয়ে বসে আছে ড্রয়িং রুমে কিন্তু পরীর দেখা নেই। মাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল পরী তখনও রেডি হচ্ছে। শাহেদ ভীষণ বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বললো না। শেষে ১ ঘণ্টা লেটে ১১ টা নাগাদ পরী যাওয়ার জন্য প্রস্তুত বলে জানান দিলো। দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে যেতেই, সাহেদের মা ও পরীর মা দুজন দুজনকে বলাবলি করতে লাগলো যে এদের couple হিসেবে খুব মানাবে, শাহেদের মা আরও বলল যে এইরকম মেয়েকেই তিনি এ বাড়ির বউ হিসেবে চান। এর পরেও দুই বোনের মাঝে অনেক কথায় হয়ে গেল অভিভাবকরা যেমন বিবাহ যোগ্য ছেলে মেয়ে নিয়ে কথা বলে ঠিক তেমন। তবে ঈশ্বর জানেন ছাইচাপা আগুন যেমন ধিকি ধিকি জ্বলে তেমনি এই প্রসঙ্গ হালকা স্ফুলিঙ্গ থেকে প্রকাণ্ড দাবদাহে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবেনা।

পরী আজ বাসন্তী রং এর কাপড় পড়েছে, গাড় লাল লিপস্টিক দিয়েছে, রক্তিম লাল চুড়ি, ম্যাচ করে টিপ, কানের দুল আর মালা পড়েছে। পরীকে আজ দেখতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে, যেন কচুর পাতার উপর এক বিন্দু জলকণা, সূর্য কিরণে যেমন দ্যুতি ছড়ায় ঠিক তেমনই দ্যুতিময়। কিন্তু শাহেদ তো শাহেদ, সে এই সৌন্দর্য লক্ষ্যই করলোনা, মুখে একটিবার সে প্রসঙ্গে কিছু বললোও না। পরী মনে আশা করেছিল শাহেদ হয়তো কিছু একটা বলবে কিন্তু হায় পাথরের কাছে জল চাওয়া আর শাহেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারা একই ব্যাপার।

পরী আর শাহেদ ইউনিভার্সিটি পৌঁছে আগে পরীর কাজ শেষ করার কথা ভাবল, ওখানে ক্লার্ক এর সঙ্গে কথা বলে যা দাঁড়ালো তার সারমর্ম হচ্ছে, যে কাজের জন্য পরী গিয়েছিল তা হতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে, আজ কাজ শেষ নাও হতে পারে, তবে কালকের মধ্যে হবে এটা নিশ্চিত। সাহেদ পরীকে বলল “যেহেতু আজ পুরো কাজ হবেনা, যতদূর সম্ভব আজ শেষ করে আমার বন্ধুদের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দি। এতে তোমার এইখানের পরিবেশ সম্বন্ধে একটা idea হবে, কি বল?”

পরী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালে দুজনে বিজনেস অনুষদের দিকে রওনা হল। পরী বরাবরই চট্টগ্রামে মানুষ, ঢাকা খুব বেশি চেনার কথা নয় তার। তবে শাহেদদের বাসায় বহুবার এসেছে এর আগে। ঢাকা বলতে ধানমণ্ডি, নিউ মার্কেট, এলিফাণ্টরোড এগুলোই পরীর পরিচিত নাম, গতবার শুধু এডমিশন পরীক্ষা দিতে এসেছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, সেই প্রথম সেই শেষ, এইবার দ্বিতীয় বারের মতো ইউনিভার্সিটি এলো।প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিদ্যাপিঠে পড়ার সুযোগ হওয়ায় নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছে ও। এমন অনেক কিছুই ভাবছে হঠাৎ ভাবনার ছেদ ঘটল যখন শাহেদ বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য পরী নাম ধরে সম্বোধন করলো।

- এ হচ্ছে সাকিব, রাইলা, বারেক আর নীরব। আর এ হচ্ছে পরী আমাদের ইউনিভার্সিটিতে এইবার এডমিশন নিচ্ছে।
সবাই পরীকে ওয়েলকাম জানালো। বিশেষ করে রাইলা পরীকে কাছে টেনে নিলো আর তার কেমন লাগছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতে লাগলো। সাকিব হেসে বলল কি রাইলা তুই কি একদিনে পরীকে পাঠ পরিয়ে ফেলবি নাকি? এ কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। এতে রায়লা কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সামলে নিয়ে হাসিতে যোগ দিলো। ঘোরা ঘুরি করে বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হল, পরিচয়ের এ পর্যায়ে পরীকে সবাই খুব আপন করেনিল, আগেই বলেছি পরীর আশ্চর্য মিশবার ক্ষমতা তার বন্ধু তৈরিতে খুব বেগ পেতে হয়না। আড্ডা চলল দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত। অনেক কথার মাঝে একটা ব্যাপার বন্ধুদের কারো দৃষ্টি এরালনা তা হল পরীর শাহেদের প্রতি অপ্রতিরোধ্য ভালোলাগা , কিন্তু কষ্টের হলেও সত্য শাহেদ এই ভালোলাগার ব্যাপারে ঘুণাক্ষরে কিছুই জানে না।

বাসা ফিরতে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল এ কারণে মায়ের কাছে অনেক কথা শুনতে হল শাহেদকে। খালামনির এই রকম ব্যবহারে পরী ভীষণ অপরাধবোধে ভুগছিল, এর অন্যতম কারণ সে নিজে, সন্ধ্যায় ফুচকা খাওয়ার বায়না সেই ধরেছিল শাহেদের কাছে ফলে বাসা ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। পরী ভাবল “যাই হোক যা হয়ে গেছে তা তো আর ফিরিয়ে আনা যাবেনা”। অপরাধবোধ থেকেই একবার খালামনিকে বোঝানোর চেষ্টা করলো কিন্তু উনি কিছু শুনতে নারাজ, উনার হিসাবে সব দোষ শাহেদের আর পরী তো ঢাকায় নতুন। রাতের ডিনার এর পর যখন শাহেদ নিজের বারান্দায় আনমনে তারা গুনছে তখন পরী তার পাশে এসে বলল
“সরি” ‘আমার জন্য তোমাকে এতগুলো কথা শুনতে হল’,
উত্তরে শাহেদ বললো
‘এটা এমন কোনও ব্যাপার না।’
পরী পাশের চেয়ারে বসে আনমনে তারা দেখতে লাগলো। কেউ কোনও কথা বলছেনা, সময় থেমে গেছে যেন। প্রথম শাহেদই নীরবতা ভাঙ্গলো, জিজ্ঞেস করলো
‘আজ তোমার কেমন লাগলো পরী? আমার বন্ধুরা তো তোমার ফ্যান হয়ে গেছে তুমি ওদের কি জাদু করেছো?’
পরী স্মিত হেসে উত্তর দিলো
‘সবাইকে জাদু করতে পারলেও একজনকে জাদু করতে পারলামনা, এ আমার পরম ব্যার্থতা’
অনেকটা অবাক হয়ে শাহেদ জিজ্ঞেস করলো
‘আর কাকে জাদু করতে চেয়েছিলে?
পরীর সোজা উত্তর ‘তোমাকে’।
শাহেদ ঠিক এই ভয়টাই করছিলো, পরীকে থামানো এখন কঠিন হবে বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল
- চলো ওঠা যাক খুব ঘুম পাচ্ছে
- ঘুম পাচ্ছে না ছাই, বলো পালাতে চাও
- না মানে সত্যি ঘুম পাচ্ছে
- শাহেদ একটা কথা বলবে আমাকে
- কি
- আমি কি তোমার যোগ্য নই? কি করলে তুমি আমাকে বুঝবে
- দেখ পরী তুমি খুব ভাল মেয়ে আর আমি তোমাকে আমার কাজিন হিসাবেই দেখি
- চুপ করো এত ভণিতা করতে হবেনা। আজ তোমাকে বলতেই হবে যে কি নেই আমার মধ্যে
- দেখ পরী তোমার সব আছে যা একজন পুরুষ তার জীবন সঙ্গীর মধ্যে চাই, আমার মতে তুমি যে কোনও পুরুষের প্রথম পছন্দ এ ব্যাপারে কোনও সন্ধেহর অবকাশ নেই
- তাহলে আমি তোমার হতে চাইলে বাধা কোথায়?
- পরী আছে অনেক বড় বাধা আছে, কিন্তু তুমি সেটা বুঝবেনা
- আমাকে ভালভাবে বুঝালেই বুঝবো
- আমার একটা অতিত আছে
- কি অতীত আমাকে বল প্লিজ

বেশ ৪/৫ বছর আগের ঘটনা তখন আমি hons দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র । আমাদের ক্লাসে পরী নামে এক অনিন্দ্য সুন্দরি মেয়ে পড়তো। যেমন পড়ালেখায় তেমনই স্মার্ট। পুরো ক্লাস তার জন্য পাগল ছিল প্রায়। কিভাবে পরীর মন পাওয়া যাবে এটায় ছিল সেই সময়ের উপজীব্য বিষয়। আমিও এদের বাইরে ছিলামনা কিন্তু ঠিক কি উপায়ে পরীর সঙ্গে ঘনিস্ঠ হওয়া যায় তারই প্রচেষ্টা চলছিল, যখন এই অবস্থা তখন আমারই একজন ঘনিস্ঠ বন্ধু বললো,
“আমি বাজি ধরে বলতে পারি পরীর মধ্যে জেলাসি তৈরি করতে পারলে তার মন পাওয়া সম্ভব, তুই শুধু একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় কর”।

আমি বললাম “তাতো বুঝলাম কিন্তু মেয়ে পাবো কোথায়?” বিপত্তির শুরু এখানেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়? এরই মাঝে আদিল নামের আমার একটা বন্ধু পরামর্শ দিলো আমি একজন কে চিনি যে তোকে হেল্প করতে পারবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আদিল আমাকে মিরপুর একটা রেস্টুরেন্টে যেতে বলল, আমি মিরপুরে সময়মতো রেস্টুরেন্ট উপস্থিত হলাম। রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতেই আদিলকে দেখতে পেলাম কিন্তু ওর সঙ্গে কোন মেয়ে না থাকায় আমি কিছুটা হতাশ হলাম, আদিল কে জিজ্ঞেস করতেই বলল, “এখনও আসেনি তবে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে”।

সময় কাটানোর জন্য আমরা দুজনে চা অর্ডার করে মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় ১৫ মিনিট পর একটি মেয়ে রেস্টুরেন্ট প্রবেশ করে সোজা আমাদের টেবিল বরাবর চলে এলো। আদিল মেয়েটিকে আমাদের টেবিল বসতে বললো আর আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো,
‘শাহেদ এ মিমি, মিমি এ আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু শাহেদ, যেমনটি বলেছিলাম এর জন্যেই তোমাকে কাজটা করতে হবে।”
আমি বললাম, “কাজের কথায় আশা যাক”

মেয়েটি কাস্ট হাসি হেসে বলল, “আপনার তো তর সইছেনা, কি মেয়েটিকে খুব বেশী ভালবাসেন বুঝি’?
মেয়েটির কথা শুনে প্রচণ্ড ক্ষেপে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললাম, “প্রেম ভালবাসার আপনি কি বুঝবেন, আপনার প্রয়োজন টাকায়, টাকা হলেইতো হয়।” মেয়েটি বলল “তা মন্দ বলেননি।”

মেয়েটিকে প্রপোজাল দেয়া হল সে যতদিন প্রয়োজন আমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করবে এবং মাস গেলে একটা আমাউন্ট পেয়ে যাবে। মেয়েটি রাজি হল এবং জিজ্ঞেস করলো কবে থেকে কাজ শুরু করতে হবে? আমরা বললাম “কাল থেকে হলে ভাল হয়।”


মিমিকে ঠিক যখন এবং যেখানে বলা হয়েছিল ঠিক সেখানেই উপস্থিত হয়েছে সে। আদিল পরামর্শ দিলো “শাহেদ তুই মিমির সঙ্গে সারাদিন আড্ডা দে এর পর সম্পর্কটা কিছুটা স্বাভাবিক হলে আসল অপারেশনে নামতে হবে”

আমার কাছেও কথাটা যৌক্তিক বলে মনে হলো। সেদিন সারাটা দিন আমি আর মিমি ক্যান্টিন, লাইব্রেরী, সুভাস ভবন, খোকা চত্বর আরও অনেক জাইগায় ঘোরাঘুরি করলাম, মিমির ব্যাপারে যতদূর জানলাম সে অনার্স করছে একটা ইউনিভার্সিটি কলেজে, ওর এক ভাই আর মা আছে কিন্তু বাবা নেই। বাসার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে নিজে। ছিমছাম গড়নের একটা মেয়ে মিমি, কথা বলে খুব গুছিয়ে, চলা ফেরা খুব স্মার্ট, প্রিয় রং নীল, হরিণের মতো টানাটানা চোখ আর চোখে রাজ্যের মায়া, পরিমিত সাজে আকর্ষণীয় লাগছিল খুব তাকে।

মিমি আর আমার ঘোরাঘুরির মধ্যেই কয়েকদিন চললো। মাঝে আদিল সুযোগ বুঝে মিমিকে পরীর সঙ্গেও পরিচয় করিয়া দিলো যা আগে থেকেই প্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিমি যে আমার খুব কাছের কেও, এমন অভিনয় চালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। এভাবে চললো বেশ কিছুদিন, আমার আর বন্ধুদের মনে হয়েছিল কিছুটা কাজও হচ্ছিলো, কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না ‘হতভাগা যে ডালই ধরে ভেঙ্গে যায়’ এমনই পোড়া কপাল।

শাহেদ আর মীম ক্যান্টিনে বসে আছে এমন সময় নীরব এসে জানালো দুঃসংবাদটা, “পরী পড়ালেখার কারণে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, কাল থেকে তাকে আর দেখা যাবেনা”

সবচেয়ে কষ্টের সময় উপনীত হল যখন পরী আমার কাছে বিদায় নিয়ে গেল। আমার অবস্থা দেখে মিমি বললো, “তোমার অবস্থা দেখে মনে হতে পারে কেউ তোমার দুটো কিডনিই হাতিয়ে নিয়েছে,” একথা বলে ও ভীষণ হাসতে লাগলো কিন্তু হাসি লুকানোর কোন চেষ্টাই সে করলো না।
মিমির হাসি দেখে আমার আরও রাগ হতে লাগলো, ক্ষেপে গিয়ে বললাম “সব প্ল্যান মাঠে মারা গেল আর তোমার হাসি পাচ্ছে, তুমি কি?” মিমি হাসতে হাসতেই বললো

- আমি যাই, আমি আর থেকে কি করবো, যখন পাত্রীই নেই তখন বেচারা পাত্র একা একা কি করবে?
- মজা নিচ্ছ তায় না, তোমার কি আমার জন্য একটুও মায়া হয়না? কেমন মানুষ তুমি?
- না হয় না। তোমার মতো বোকাদের এমনই হয়। উনি গেছেন নাটক করতে। আরে বাবা কাউকে পছন্দ করলে সরাসরি বলায় আসল সাহস , আর মেয়েরা সাহসী পুরুষ পছন্দ করে!!
- বুঝলাম এতো জ্ঞান দিতে হবেনা, মেজাজটা বিগড়ে গেল, চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আমি বাসায় ফিরবো।


সেদিন জলদি জলদি বাসা ফিরে নিজের রুমে শুয়ে পড়লাম, মা চিন্তিত হোয়ে জিজ্ঞেস করলো “কিরে শরীর টরির খারাপ নাকি? না খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লি যে?” শুধু উত্তরে বললাম ‘মা আমি খেয়ে এসেছি, খুব ক্লান্ত একটু ঘুমাবো’। দুপুরটা যেমনই ক্যাটুক রাতটা সহজে কাটতে চাইছিলনা, বিছানায় শুধু এপাশ ওপাশ করেছি আর অনুভব করছি, কি যেন হাত ছাড়া হোয়ে গেল। পরের দিন ভার্সিটি গেলাম, কেবলই অনুভব করলাম সবই আগের মতো আছে কিন্তু কি যেন নেই, কি যেন খালি খালি। আমাকে উদাস দেখে বন্ধুরা টিপ্পনী দিয়ে পরীকে নিয়ে যা নয় তা বলা শুরু করলো, কিন্তু এতো কিছুর পরও কোথায় যেন ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিলামনা, ঠিক যেন ঘটনাটা মিলছিলনা। অনেক ভেবে ভেবেও যখন কূল কিনারা করতে পারছিলামনা তখন আদিল প্রসঙ্গ ছাড়ায় বলে উঠলো,

“দোস্ত তোর কি মিমির জন্য মন কেমন কেমন করছে?” এই কথা শুনে আমিতো ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে আদিল কে প্রায় মারতে উঠেছিলাম, পরে অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। বাসা ফিরে নিজের রুমে গিয়ে অনেকবার ভাববার চেষ্টা করলাম যে আসল সমস্যাটা কি? ভেবে ভেবে কিছুই পেলাম না। কিছুক্ষণ চোখ বুজে ভাববার চেষ্টা করলাম, চোখ বন্ধ করে যার চেহারাটি ভেসে উঠলো তা বিশ্বাসই করতে পারছইলাম না। ঘটনার আকর্ষিকতায় যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেলম, বিদ্যুত স্পৃষ্টর মতো নিথর হয়ে পড়ে রইলাম। এও কি সম্ভব। ভাষা হারিয়ে নিজের মনে মনে বললাম মিমি আমি তোমাকে ছাড়া খুব একা। আবার মনে মনে নিজেকেই শাসন করলাম “এ কি বলছি আমি”!! সে রাতে কোন ভাবেই আর ঘুম এলো না।

ভারসিটির লাইব্রেরীতে বসে বইয়ের পাতা উলটাচ্ছি কিন্তু খেয়াল করলাম যে মগজে তেমন কিছু ঢুকছেনা, লক্ষ্য করলাম কি একটা অস্থিরতা পেয়ে বসেছে। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে মোবাইলে মিমিকে ফোন দিলাম, দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে মিমির কথা শোনা গেল, মিমির আওয়াজ কানে যেতেই আমার কেবলই মনে হতে লাগলো এইতো একেই তো খুজছিলাম। মুখে বললাম, কেমন আছ মিমি
- বাব্বাহ এতদিন পর মনে পড়লো আমাকে, ভালোই তো
- তুমি এখন কোথায়, দেখা করা যাবে?
- আমি কলেজে কিন্তু আজ যে খুব কঠিন হবে, একটু পরেই বাসা যেতে হবে কাজ আছে
- আমার তোমার সঙ্গে খুব দরকার, খুব জরুরি
- পরী কি আবার ফিরে এসেছে নাকি? বলেই হেসে দিলো
- ফাজলামি কোরনা প্লিস। তুমি কি এক ঘণ্টা মতো থাকবে?
- হুম এক ঘণ্টা থাকবো মনে হয়
উত্তেজনায় “আমি আসছি” বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবার কল করলে মিমি রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘তুমি কোথায়?’ মিমির সরল উত্তর, ‘ক্যান্টিনে’। মিমিকে কলেজের একটা জাইগাতে আসতে বলে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। মিমি যখন আমার মুখামুখি হল তখন কেবলই মনে হতে লাগলো, ‘এই মানুষটা কত চেনা কত আপন, একে কতদিন দেখিনা’ আমার একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা দেখে মিমি জিজ্ঞেস করলো “সব ঠিক আছে তো নাকি, কি এমন ব্যাপার যে এতো তারাহুড়ো করে দেখা করতে হলো”। আমি বললাম মিমি আমার তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে, মিমি শুধু আমার দিকে চেয়ে জরুরি কি কথা থাকতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো।
- আমি এ কদিন খুব খারাপ ছিলাম মিমি, খেতে, পড়তে এমনকি ঘুমাতে পর্যন্ত পারছিলাম না। খুব একা একা লাগছিল
- এর মানে কি
- আমি তোমাকে ভালোবাসি মিমি, আমি তোমাকে ছাড়া আমার এ জীবন ভাবতে পারছিনা, তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিওনা
- তুমি কি পাগল, মাথা কি পুরাই গেল
- হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি। তুমিই তো বলো মেয়েরা নাকি সাহসী পুরুষ পছন্দ করে। এই নাও আমি তোমার সামনে আমার মনের কথা বললাম।
- এ হয়না শাহেদ, আমি কি তুমি খুব ভালো ভাবেই জানো, আমি জেনে বুঝে তোমার জীবন নষ্ট করতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করো তুমি
- আমাকে ফিরিয়ে দিওনা মিমি

মিমি আর কথা না বাড়িয়ে ‘আমাকে বাসা যেতে হবে’ বলে সেখান থেকে চলে গেল, আমি মিমিকে আটকালামনা, শুদু মিমির যাবার দিকে করুন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। এরপর বহুবার মিমিকে ফোনে চেষ্টা করেছি কিন্তু প্রতিবারই মিমি ফোন কেটে দিয়েছে। মিমির কথা ভাবতে ভাবতে আমি রীতিমত জ্বর বাধিয়ে বসলাম, শরীর খারাপ হয়ে গেল খুব। যেহেতু মিমি আমার ফোন ধরছিলনা অগত্যা আদিলের শরণাপন্ন হলাম আর আদিলকে অনুনয় বিনয় করে মিমিকে আমার অবস্থার কথা বুঝিয়ে বলতে বললাম আরও বললাম মিমি যেন আমাদের বাসায় অবশ্যই আসে। আদিল প্রথমে আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলো এবং ইনিয়ে বিনিয়ে বলার চেষ্টা করলো যে মিমি আমার যোগ্য নয়। শেষে আমার অনুরোধে মিমিকে আমার প্রকৃত অবস্থার কথা বুঝিয়ে বলাতেই সে বাসায় এসে দেখা করতে রাজি হয়ে গেল। মিমি পরের দিনই আমাদের বাসায় এসেছিল। এসে মিমি জানতে চাইল
- এখন শরীর কেমন
- আগের থেকে ভালো, ফোন ধরণি কেন?
- ফোন ধরার তো কথা ছিল না
- আমি জানতাম না তুমি আসবে
- আসতাম না কিন্তু আদিল ভাই যেভাবে তোমার আসুস্থতার কথা বললেন না এসে পারলাম না
- তার মানে তুমি আমার কেয়ার করো
- মোটেও না
- দেখ মিমি সত্য কখনও চাপা থাকেনা। তুমি মান আর না মান তুমি আমাকে ভালোবাসো
- কি আজেবাজে কথা বলছো, এটা অসম্ভব
- তুমি কি চাও এভাবে আমি শেষ হয়ে যাই, আমি তোমাকে খুব চাই মিমি, অভিনয় করতে করতে কখন যে তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি আমি জানি না
- এখন এ কথা থাক শাহেদ তুমি আগে সুস্থ হোয়ে ওঠ তারপর কথা হবে
- চা খেয়ে মিমি আমার আর মার কাছ থেকে বিদায় নিলো

মিমির চলে যাওয়ার পর আমার খুব শান্তি শান্তি লাগছিল। মা মিমির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আমি ভার্সিটির বন্ধু বলেছিলাম। এ বিষয় নিয়ে আর কথা বাড়াইনি। সুস্থ হবের পর যে কাজটি প্রথম করলাম তা হল মিমিকে ফোন করে ক্যাম্পাসে ডাকা, মিমিও বাধ্য মেয়ের মতো রাজি না হোয়ে পারলনা। অবশেষে আমাদের দেখা হল নির্ধারিত সময়েই। অনেকটা সময় কাটলো আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতিচারণ করে। দুজনেই স্বীকার করলাম যে আগের বার অভিনয় করতে করতে কখন যে দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেলেছি কেউই বুঝতে পারেনি। তবে মিমি এভাবে সম্পর্ক টাকে এগিয়ে নিতে রাজি ছিলনা কিন্তু আমার যুক্তি হল ভালবাসার অধিকার সবার থাকা চাই । আমার যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে হল মিমির।

এভাবে প্রায়ই দুজনের দেখা হতে লাগলো আর দুজনেই মনের ভাব রসের অবাক্ত কথাগুলোকে নতুন নতুন রূপ দিতে লাগলাম। এখন এমন অবস্থার সৃষ্টি হল যে কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারিনা। সুযোগ পেলেই ফোনে কথা হয়, প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে দুজন দুজনকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে যায়, একেই বুঝি প্রেম বলে। এ এক অন্যরকম অনুভূতি, বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত আলোড়ন হতে থাকে যতক্ষণ একে অপরকে না দেখছি। আমাদের প্রেমের নৌকায় পালতুলে তর তর করে ছুটে চলেছে আর আমাদের অজান্তেই সমাজ নামক মোড়ল আমাদের দিকে আড় চোখে চেয়ে প্রতিনিয়ত ভৎসনা করে চলেছে। এমনই একদিন দুজনে রেস্টুরেন্ট এ খেতে যেয়ে একটা ভীষণ বিপত্তির সম্মুখীন হতে হল।

মিমি আর আমি অর্ডার করার পর বসে আছি, এমন সময় ৪/৫ জন ছেলে রেস্টুরেন্ট এ প্রবেশ করে ঠিক আমাদের পাশের টেবিলে বসলো। মিমি আর আমি নিজেদের নিয়ে এতো বুঁদ হয়ে ছিলাম যে নতুন আশা ছেলেরা যে আমাদের দেখিয়ে কিছু বলছে তা লক্ষই করেনি, পরে দুটি ছেলে তাদের টেবিলে উঠে এসে মিমিকে লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্য করায় আমি প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে হাতাহাতি শুরু করে ফেলি। যার ফলে একটা বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মিমি ঘটনার আকর্ষিকতায় লজ্জায় অপমানে কেঁদে ফেলেছিল। মিমি প্রায় ছুটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলে তার পিছু পিছু আমিও বেরিয়া আসি। এতো ডাকা ডাকির পরও মিমি থামতে চাইছিল না, মনে হল সে এইখান থেকে যত দ্রুত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অন্য কোথাও চলে যেতে চায়। একরকম বাধ্য হয়েই আমি মিমির হাত ধরে ওকে থামাতে চেষ্টা করলাম।

আমি বললাম,
- এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হবে ভাবিনি কিন্তু তোমার তো এতে কোনও দোষ নেই
- শাহেদ এ আমার কপালের দোষ, আমাকে অনেকটা বাধ্য হয়েই এ জীবন বেঁছে নিতে হয়েছে
- কিন্তু তুমি তো এখন এ সব কিছুর ঊর্ধ্বে
- সমাজ তো তা আর মানে না, তুমি চিন্তা করে দেখ এই ঘটনাটা যদি তোমার বাসাই ঘটে যেতো তবে তুমি বা আমি কিভাবে মুখ দেখাতাম, বলেই মিমি একটা সি এন জি ডেকে বাসার দিকে রওয়ানা হল
- মিমি আমার কথা শোন, আমার মুখের কথা মুখে মিলিয়ে গেল, তার আগেই মিমি অনেক দুরে চলে গেছে

আমাদের সমাজ এমন কেন? কেউ যদি জীবনে কখনও কোনও ভুল করে থাকে তবে তার আর ক্ষমা নেই কেন? সেই মানুষটার একটি বারের ভুল সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে। আমি নিজেও জানতাম না সেইবারই মিমির সঙ্গে আমার শেষ দেখা, চাইলেও আর কোনদিন মিমি হাসবেনা অথবা পাজি বলে ভৎসনা করবেনা। মিমি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছে আর আমার পৃথিবীকে শূন্য করে দিয়ে গেছে। মিমি শুধু একটা প্রেয়সীর নাম না, আমার সকল সত্ত্বা জরিয়ে থাকা অনুভূতির নাম।

এ কথাগুলো শাহেদ যখন পরীকে বলছে নিজের অজান্তেই শাহেদের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, ঠিক একই অবস্থা পরীরও। পরী শুধু শাহেদের হাতের উপর হাত রেখে বলল “এতো ভালোবাসো তুমি মিমিকে, মিমি সত্যি খুব ভাগ্যবতী” কিন্তু আমরাতো কষ্টটাকে ভাগাভাগি করে নিতে পারি তাইনা।. শাহেদ বলল,
- মিমি আমার আর তায় তাকে হারানোর কষ্টগুলোও আমার একান্ত নিজের। এটা ভাগাভাগি করা যায়না পরী
- আমি যদি তোমাকে ঠিক মিমির মতো আগলে রাখি, মিমির ছায়া হোয়ে তোমার পাশে পাশে থাকি
- তা হয়না পরী। মিমি আর ফিরবেনা আমিও না। যতদিন বাঁচবো মিমির স্মৃতি নিয়ে বাঁচবো। আমার পক্ষে অন্যকোন নারীকে মিমির জাইগা দেয়া অসম্ভব
- তাহলে আমি কি নিয়ে থাকবো শাহেদ, আমিও যে তোমাকে বড্ড ভালবেসেছি, আমার সকল সত্ত্বা জুড়ে শুদু তুমি। তুমি ছাড়া আমারও আর কাওকেই গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

দুজনের হাত দুজনের হাতের মাঝে পড়ে রইলো। বাইরে জোছনায় কৃষ্ণচুড়ার গাছে লালের প্লাবন বয়ে যাচ্ছে যেন। দুই ভগ্ন হৃদয় শুদু অশ্রু হয়ে দুচোখ বেয়ে প্লাবিত হতে লাগলো। শুধু বিধাতাই জানেন, এই দুটি তপ্ত হৃদয় মহাকাশের উল্কার মতো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে এসে ভস্মীভূত হয়ে সবার অলক্ষ্যে বিলীন হয়ে যাবে।

;