বিশ্ব খাদ্য দিবস ও এক মুঠো ভাত

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
এক মুঠো ভাতের জন্য প্রসারিত বহু হাত, ছবি: সংগৃহীত

এক মুঠো ভাতের জন্য প্রসারিত বহু হাত, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease
১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবসে মানুষের খাদ্যের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো  নিয়ে যেমন আলাপ-আলোচনা হয়, তেমনি খেতে-না-পারা বুভুক্ষু মানুষদের কথাও জানা যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা (এফএও) যে হিসাব দিয়েছে, তাতে বিশ্বের প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ১১ থেকে ১২ শতাংশ মানুষ খাদ্যহীন, যাদের মোট সংখ্যা আনুমানিকভাবে ৮৩০ থেকে ৮৫০ মিলিয়ন।

কারা অন্নহীন? খেতে পারছেন না? খাদ্যের সন্ধানে হাহাকার করছেন? মূলত এশিয়া ও আফ্রিকার দারিদ্র্য-পীড়িত দেশের মানুষেরা এই তালিকার শীর্ষে আছেন, যেখানে খরা বা দুর্ভিক্ষ কিংবা সংঘাত চলছে।    

প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্নহীন মানুষের মতোই অনাহারে আছেন শরণার্থী শিবিরের কোটি মানুষ, যারা স্বদেশ থেকে বিতাড়িত ও গৃহহীন এবং ছিন্নমূল হওয়ায় চাষাবাদ করে খাদ্য উৎপাদন করতে পারছেন না।

চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত মানুষেরাও প্রয়োজনীয় খাদ্য পাচ্ছেন না। বিশ্বে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ার কুফল ভোগ করছেন তারা মানবেতন জীবন-যাপন করে। গ্রামীণ দরিদ্রের সঙ্গে সঙ্গে শহুরে বা আরবান দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছেন বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষ। পৃথিবীর আধুনিক ও অগ্রসর শহরের ঝলমলে আলোর রোশনাই থেকে দূরে, প্রদীপের নীচে অন্ধকারে এইসব নিরন্ন মানুষের বাস।

খাদ্যহীনতার প্রকোপে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও শিশুরা। পুষ্টিহীনতা, রোগ ও বিকলাঙ্গতায় তারা বিশ্বের দেশে দেশে জর্জরিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে।

২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারি করোনার সঙ্কুল পরিস্থিতিতেও বরাবরের মতো পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ’। কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। 

জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮১ সাল থেকে পৃথিবীর দেশে দেশে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের মানুষের খাদ্য চাহিদা ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলো এদিন আলোচিত হয়। চেষ্টা করা হয় খাদ্য ঘাটতি ও বুভুক্ষু মানুষের সংখ্যা কমাতে।

সন্দেহ নেই, কৃষি বিজ্ঞানী ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরা নানা ধরনের গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন বীজ ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে এবং বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান ধারার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খাদ্যোৎপাদনও। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কৃষি ও খাদ্যোৎপাদনের মূল চালিকা শক্তি কৃষকের জীবনমান ও ভাগ্যোন্নয়ন হয় নি। ফড়িয়া, মজুদদার ও সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে মুনাফা আর কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না।

কৃষি ও কৃষককে অবহেলিত রেখে খাদ্যোৎপাদন বাড়বে না। তদুপরি খাদ্যের সরবরাহ, প্রাপ্যতা ও মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্নীতি, পেশিশক্তির নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবন্ধকতা বিদূরিত না করলেও মানুষের খাদ্যের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে না। সুশাসনের ও শক্ত নিয়মের অভাবে বিশ্বের বহু দেশেই খাদ্য সহজে ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় মানুষের কাছে পৌঁছে না এসব দুষ্টচক্রের কারসাজির কারণে।  

সামরিকতন্ত্রী রাষ্ট্র ও যুদ্ধবাজ মানুষের অমানবিক ও সহিংস তাণ্ডবে বিশ্বের বহু দেশের বিপুল সংখ্যক নাগরিক মৃত্যু ও রক্তপাতে নিপতিত, যারা খাদ্যের সংস্থান করা তো দূরস্থিত, জীবন বাঁচাতেই মরিয়া। রণাঙ্গনে, শরণার্থী শিবিরে, পথে পথে সংঘাতদগ্ধ এইসব বিপুল ভাসমান মানুষের জীবন কাটে অনাহারে, অর্ধাহারে, খাদ্যহীনতায়।

সুষম বণ্টন আর শান্তি বিরাজমান থাকলে বিপুলা এই পৃথিবীর উর্বর ভূমিতটে উৎপাদিত খাদ্যের দ্বারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য অন্ততপক্ষে এক মুঠো ভাত জুটতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু শোষণ, লুণ্ঠন, যুদ্ধ, দখল, রক্তপাতের ফলে তা হচ্ছে না। হিংসা, হানাহানি ও লুটপাটের তাণ্ডবতায় শান্তি, স্থিতি, নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের মুখের গ্রাস। 

বিশ্ব খাদ্য দিবসে খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধির নানা পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও পৃথিবীর প্রতি শোষক ও যুদ্ধবাজরা যে অন্যায় ও অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করে বিশ্ববাসীকে খাদ্যহীন করছে, এই ঘৃণ্য আচরণের নিন্দা, প্রতিবাদ ও প্রতিবিধানের বার্তাও উচ্চারিত হওয়া দরকার।