পাকিস্তান কি ‘বোবা চরিত্রে’ অভিনয় করতে পারবে?

জাভেদ পীরজাদা, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
পাকিস্তান বন্ধু করেছিল ইরানকে

পাকিস্তান বন্ধু করেছিল ইরানকে

  • Font increase
  • Font Decrease

একটা কথা সারা বিশ্বে চালু আছে—আমেরিকা যার বন্ধু তার আর শত্রুর দরকার হয় না। এ কথার মানে কী? মানে হলো আমেরিকা যার বন্ধু তার শক্রুর সংখ্যাও শেষ হয় না। আমেরিকার বন্ধু পাকিস্তান। পাকিস্তানের শক্র ভারত। ভারতের শক্র চীন। চীনের বন্ধু পাকিস্তান। এদিকে আমেরিকা ভারতেরও বন্ধু। পাকিস্তানও বন্ধু করেছিল তাই ইরানকে। কিন্তু এরই মধ্যে সোলাইমানি হত্যার ভেতর দিয়ে ইরান ও আমেরিকা মারমুখী। চারিদিকে এত বন্ধু এত শক্র, এত কূটকৌশল, কী করবে পাকিস্তান?

বন্ধু দিয়েছিল মনে আঘাত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের কারণে আমরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি দেখা দিয়েছে। এমন সময়ে এসেই সম্পর্কে উন্নতি ঘটছে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে। গতবছরের ১ জানুয়ারি ট্রাম্প অত্যন্ত অবমাননাকর এক টুইটার পোস্ট দেওয়ার পর ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক একেবার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।

ওই পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, গত ১৫ বছর ধরে আমেরিকা বোকার মতো পাকিস্তানকে তিন হাজার তিনশ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়া কিছুই দেয়নি; আমাদের নেতাদের বোকা মনে করেছে। আমরা যেসব সন্ত্রাসীকে আফগানিস্তানে ধরার জন্য খুঁজি, সে বিষয়ে পাকিস্তান সাহায্য করে না বরং তাদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়। তাই পাকিস্তানকে আর সাহায্য দেওয়া হবে না। এরমধ্যে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি। কী করবে পাকিস্তান? ইমরান সরকার চুপ থাকলেও সে দেশের বিশেষজ্ঞরা বসে নেই। লাভক্ষতির হিসাব কষছেন।

ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বেকায়দায়
পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাবেক এয়ার কমোডর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জামাল হোসাইন সাউথ এশিয়ান মনিটরকে দেওয়া এক ইন্টারভিউতে বলেছেন, কুদস বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে সোলাইমানি অন্য দেশে সামরিক ও গোপন অপারেশনের জন্য দায়ী। ফলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে বালুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশে, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর জন্য কূলভূষণ যাদবের মতো ভারতীয় এজেন্ট, সন্ত্রাসী ও অন্তর্ঘাতমূলক উপাদানকগুলোকে অবাধে সুযোগ দেওয়ার জন্যও দায়ী।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ টুইটার পোস্টে লিখেছেন, আমরা উত্তেজনা ত্বরান্বিত করতে বা যুদ্ধ চাই না। বরং আমরা যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করতে চাই। এতে মনে হয় ইরান আর হামলা চালাবে না। তার মতে, ট্রাম্প যদিও বলেছিলেন যে মার্কিন স্বার্থে হামলা করা হলে বোমা বর্ষণের জন্য তিনি ৫২টি স্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন, কিন্তু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর তিনি বলেছেন, ‘সবকিছু ঠিক আছে।’ এতে মনে হচ্ছে, কোনো পক্ষই আর উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। ট্রাম্প যদি ইরানের অভ্যন্তরে আর কোনো প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ না দেন, ইরানও যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আর কোনো সামরিক হামলা না চালায়, তবে বর্তমান সংকট প্রশমিত হবে।

পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের সাথে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে

পাকিস্তানি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সালমান রাফি শেখ বলেন, “ইরানের সাথে ভবিষ্যতে যে কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে পাকিস্তান যদি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হয়, তাহলে পাকিস্তানে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে কট্টর বিভাজন আরো বেড়ে যাবে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ যেভাবে পাকিস্তানের সুন্নী গ্রুপগুলোর মধ্যে চরমপন্থা সৃষ্টির জন্য সরাসরি দায়ী, তেমনি ইরানে যুদ্ধ লাগলে সেটাও প্রধান শিয়া গ্রুপগুলোর মধ্যে সামরিক তৎপরতা সৃষ্টির জন্য একটা আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে দেবে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৩৬-৬৪ মিলিয়ন শিয়া রয়েছে, এর মধ্যে পাকিস্তানেই রয়েছে ২৫ মিলিয়ন। ইরান যদিও এখন পর্যন্ত পাকিস্তানকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে দেখছে না, তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই পাকিস্তানের শিয়া গ্রুপগুলোর তেহরান ও বাগদাদের সাথে শক্ত যোগাযোগ রয়েছে। সত্য হলো, ইরাকে সোলাইমানির জানাজার নামাজ যিনি পড়িয়েছেন, সেই আয়াতুল্লাহ বাশির নাজাফিও একজন পাকিস্তানী শিয়া।”

বালুচিস্তান এলাকার সিনেটর হাসিল বেজেঞ্জো বলেছেন, “পাকিস্তানের একটা বড় শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং ইসলামাবাদ যদি ওয়াশিংটনের পক্ষ নেয়, তাহলে দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হয়ে যাবে।” পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের সাথে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং সে কারণে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ফলে পাকিস্তান বুঝতে পারছে ইরানকেও চটানো যাবে না, আবার আমেরিকার খুব কাছেও ভেড়ার উপায় নেই।

শক্রর শক্র বন্ধু
ভারতের সাথে চীনের যুদ্ধ হয়েছে। কারগিল যুদ্ধ। বিশ্ব বাজার দখলে ভারত ও চীন দুই দেশই প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে এ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক সবসময়ই খারাপ। চীনের শক্র ভারত। ভারতের শক্রু পাকিস্তান। শক্রর শক্র বন্ধু—এই নীতিতে পাকিস্তানের পাশে থাকে চীন।

কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ বাতিলের মোদী সরকারের সিদ্ধান্তে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল পাকিস্তান এবং চীন। তবে, পশ্চিমা সমাজ এই ইস্যুতে মুখে কুলুপ এঁটে আছে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ‘বিশেষ মর্যাদা’ বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নতুন দিল্লি নিয়েছে তার কড়া সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এক ‘বর্ণবাদী মতাদর্শ’ অনুসরণ করে উল্লেখ করে তিনি সংসদে বলেন, “এই মতাদর্শ তুলে ধরতে তারা নিজেদের এবং আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে।”

ইমরান খান ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

মোদী সরকার ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চ্যালেঞ্জ করারও অঙ্গীকার করেছেন খান। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শান্তি ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তাও চেয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও তুলতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদের রূপ নেওয়া পাকিস্তানের এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, “আমি এটা পরিষ্কার করে বলতে চাই যে এই বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ সব ফোরামে লড়াই করব আমরা।”

এদিকে, চীনও কাশ্মীর ইস্যুতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীন এবং ভারতের মধ্যকার হিমালয় সীমান্তের বেশ কিছু এলাকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এরমধ্যে লাদাখ রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইয়াং এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, চীন-ভারত সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলের যে অংশকে বেইজিং নিজেদের এলাকা মনে করে, সেই অংশ ভারত নিজেদের অধিভুক্ত করায় আপত্তি জানাচ্ছে চীন। তিনি বলেছিলেন, “নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইন বাতিলের ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করছে৷ এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”

হইয়াও হইলা না শেষ
কিন্তু পরে দেখা গেল আমেরিকা গেলেন মোদী। মোদীর পরে গেলেন ইমরান। ডোনাল্ড ট্রাম্প দুজনকেই আলাদাভাবে বিষয়টি মীমাংসা করতে বললেন। তিনি ভালো লিয়াজোকারী। কিন্তু আজও বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেল। অংকটা কঠিন। বিশেষ করে রাজনীতির। কারণ আমেরিকার শক্র আবার চীন। এখন পাকিস্তান কোন কূল রাখবে?

ফলে পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ইরান’ ইস্যুতে আমরা আগে পরে নেই। আমেরিকাকেও ক্ষেপানোর দরকার নেই। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রেহান হাশমী ‘ডন’কে বলেন, “পাকিস্তানের এখন যে অর্থনৈতিক অবস্থা এটি ভীষণ খারাপ। ইমরান ক্ষমতায় বসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন বিশ্বের কাছে দরকারে তিনি ভিক্ষা করবেন। কিন্তু ভিক্ষাও দেওয়া হয় পছন্দমতো ভিক্ষুককে। আমেরিকা খুশি তো, চীন নারাজ, চীন খুশি তো ইরান নারাজ, ইরান খুশি তো আমেরিকা নারাজ। তাই পাকিস্তানের উচিত হবে চুপ থাকা।”

কথায় আছে বোবার কোনো শক্র নেই। পাকিস্তান কি সেই পথেই হাঁটবে?

আপনার মতামত লিখুন :